📄 যখন স্বামী ছাড়া স্ত্রী একাই ইসলাম গ্রহণ করে
স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে অমুসলিম হলে এবং সহবাসের পর স্ত্রী একাই স্বামী ব্যতিত ইসলাম গ্রহণ করলে তার ভরণপোষণের অধিকার রহিত হবেনা। কেননা স্ত্রীর সাথে সহবাস অসম্ভব হয়েছে স্বামীর কারণেই। সে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এই কারণটি দূর করতে সক্ষম ছিলো। কাজেই এক্ষেত্রে স্ত্রীর ভরণপোষণ থেকে সে অব্যাহতি পাবেনা, একই কারণে স্ত্রীকে রেখে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মুসলমান স্বামীও ভরণপোষণ থেকে অব্যাহতি পাবেনা।
📄 স্বামী মুরতাদ হলে
সহবাসের পর স্বামী মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগী) হয়ে গেলে তার উপর থেকে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব রহিত হয়না। কেননা এখন স্বামী যে সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তার কারণ সে নিজেই সৃষ্টি করেছে। ইসলামে ফিরে এসে সে এই কারণ দূর করতে পারতো। পক্ষান্তরে স্ত্রী যদি মুরতাদ হয়, তাহলে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেনা। কেননা সে নিজের পক্ষ থেকে গুনাহ করে সহবাসের পথ রুদ্ধ করেছে, যেমন স্বামীর অবাধ্য স্ত্রী করে থাকে।
📄 ভরণপোষণ পাওয়া ও না পাওয়ার বিষয়ে যাহেরি মাযহাবের মত
ভরণপোষণ ওয়াজিব হবার কারণ সম্পর্কে যাহেরি মাযহাবের স্বতন্ত্র মত রয়েছে। তাদের মতে, দাম্পত্য সম্পর্কই ভরণপোষণের কারণ। দাম্পত্য সম্পর্ক যতোক্ষণ থাকবে, ততোক্ষণ স্ত্রী ভরণপোষণ পাবে। এ মতের ভিত্তিতে তারা অপ্রাপ্ত বয়স্কা স্ত্রী ও স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীকেও ভরণপোষণ দেয়া ওয়াজিব বলে রায় দেন। অন্যান্য ফকিহগণ এজন্য যেসব শর্ত আরোপ করেন, সেগুলো যাহেরীগণ মানেননা। ইবনে হাযম বলেন : যে মুহূর্তে বিয়ের আকদ সম্পন্ন হয়েছে, সেই মুহূর্ত থেকেই স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে বাধ্য, চাই তাদের সংসার পাতা হোক বা না হোক, স্ত্রী প্রাপ্ত বয়স্কা হোক বা দোলনার শিশু হোক, ধনাঢ্য হোক বা দরিদ্র হোক, পিতৃহীনা হোক বা না হোক, কুমারী হোক বা অকুমারী হোক, স্বাধীন হোক বা দাসী হোক। ভরণপোষণ সর্বাবস্থায়ই স্বামীর সামর্থ্য অনুপাতে দিতে হবে। (আল মুয়াল্লা, ১০ খণ্ড)
ইবনে হাযম বলেন, আবু সুলায়মান ও তার শিষ্যগণ এবং সুফিয়ান ছাওরি বলেছেন: বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্ত থেকেই অপ্রাপ্ত বয়স্কা স্ত্রীর ভরণপোষণ করা ওয়াজিব। ক্রোধবশত স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া জনৈকা মহিলা সম্পর্কে হাকাম বিন উতাইবাকে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাব দেন যে, তাকে ভরণপোষণ করতে হবে। স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেয়া লাগবেনা এমন কথা কোনো সাহাবির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, এটা শুধু নাখয়ী, শাবী, হাম্মাদ, হাসান ও যুহরি থেকে বর্ণিত। এর সপক্ষে নাখয়ী প্রমুখ কী প্রমাণ দর্শান, তাও জানা যায়নি। তারা শুধু বলেছেন : ভরণপোষণ হলো সহবাসের বদলা। সহবাস যখন করতে দেয়না, তখন ভরণপোষণও পাবেনা।
📄 ভরণপোষণের পরিমাণ ও ভিত্তি
স্ত্রী যখন তার স্বামীর সাথে একত্রে বসবাস করে, স্বামী তার ভরণপোষণ চালায় এবং তার খাদ্য, পোশাক ইত্যাদি পর্যাপ্তভাবে দিতে থাকে, তখন স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণের দাবি জানাতে পারবেনা। কেননা স্বামী তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তবে স্বামী যদি এতটা কৃপণ হয় যে, স্ত্রীকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভরণপোষণ করেনা, অথবা তাকে অন্যায়ভাবে ভরণপোষণ ছাড়াই ফেলে রাখে, তাহলে স্ত্রীর অধিকার রয়েছে তার জন্য খাদ্য, বস্ত্র বাসস্থান ইত্যাদির নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দের দাবি জানানোর। আদালতও তার জন্য ভরণপোষণের পক্ষে ফায়সালা করতে পারবে এবং স্ত্রীর দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হলে আদালত স্বামীর উপর ভরণপোষণের দায়িত্ব আরোপ করতে পারবে। স্ত্রী যদি নীতিবান ও আল্লাহভীরু হয় এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্রহণ না করে, তাহলে সে নিজেও যুক্তিসঙ্গত পরিমাণে স্বামীর সম্পত্তি থেকে নিজের প্রয়োজনীয় ভরণপোষণ নিয়ে নিতে পারে। এটা সে স্বামীর অজান্তে নিতে পারে। কেননা স্বামী তার দায়িত্ব পালনে বিরত রয়েছে এবং তার কাছে স্ত্রীর খোরপোষ পাওনা রয়েছে। হকদার যখন নিজের পাওনা স্বহস্তে গ্রহণের সমর্থ হয়, তখন তা তার গ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। এই অধিকারের উৎস হলো আহমদ, বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ী কর্তৃক আয়েশা থেকে বর্ণিত হাদিস:
আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বললো, হে রসূলুল্লাহ, (আমার স্বামী) আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ লোক, আমার ও আমার সন্তানকে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খোরপোষ দেয়না। আমি তার অজান্তে যেটুকু নিয়ে নেই, তাছাড়া আর কিছু সে আমাকে দেয়না।” রসূল সা. বললেন, যুক্তিসঙ্গত ও বিধিসম্মতভাবে যতোটুকু নিলে তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজন মিটবে, ততোটুকু তুমি নিয়ে নাও।” এ হাদিস থেকে প্রমাণিত, ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারিত হবে স্ত্রীর ন্যূনতম প্রয়োজনের আলোকে এবং ন্যায়সঙ্গত ও বিধিসম্মত হওয়া সাপেক্ষে। অর্থাৎ স্ত্রীর পরিবারে সর্বাধিক সমর্থনপুষ্ট মত হিসেবে যা সকল পক্ষের নিকট পরিচিত ও স্বীকৃত। আর এটা স্থান, কাল, অবস্থা ও ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। আর রওযাতুন নাদিয়া গ্রন্থের লেখকের মতে, খাদ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রয়োজন বলতে স্ত্রীর প্রয়োজনীয় সব কিছুই বুঝায়। তাই ফলমূলও এর আওতাধীন। বিভিন্ন উৎসবাদির সময় যে বাড়তি ব্যয় হয়ে থাকে এবং অন্য যেসব জিনিস চিরদিনই প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়ে থাকে, যা না হলে ক্ষতি হয়, অথবা মন খারাপ হয় অথবা অস্বস্তি বোধ হয় সেসবও এর আওতায় এসে যায়। ওষুধপত্রও এর আওতায় আসে। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন: "বিধিসম্মতভাবে মায়েদের জীবিকা দেয়া পিতার কর্তব্য"। বস্তুত এ আয়াত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এক প্রকারের ভরণপোষণের বিবরণ দিয়েছে। সেটি হলো, ভরণপোষণের দায়িত্ব যার, তার কর্তব্য যার ব্যয় নির্বাহ করার দায়িত্ব তার উপর রয়েছে তার জীবিকা সরবরাহ করা। কী কী জিনিস এই জীবিকার অন্তর্ভুক্ত, তা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তিনি কোনো কোনো ফকিহের মত উল্লেখ করেন যে, ওষুধের মূল্য ও চিকিৎসকের ফি দেয়া ওয়াজিব নয়। কেননা এর উদ্দেশ্যে শরীর সংরক্ষণ করা। তবে তিনি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যয়কে ভরণপোষণের আওতাভুক্ত করার পক্ষপাতিও এবং এটা তার মতে ওয়াজিব। 'আল গাইস' এর গ্রন্থকার বলেন: ওষুধ হচ্ছে জীবন রক্ষার উপকরণ। তাই এটা ভরণপোষণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং তার অঙ্গীভূত। তিনি বলেন: এটাই সঠিক। কেননা রসূল (সা) হিন্দকে বলেছিলেন, "যতোটুকু নিলে তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজন মিটবে, ততোটুকু নিয়ে নাও।” তার এই উক্তি সর্বব্যাপী অর্থবোধক। অনুরূপ, উপরোক্ত আয়াতের "পিতার কর্তব্য মায়েদের জীবিকা দেয়া” এ উক্তিটিও সর্বব্যাপী অর্থবোধক। মোটকথা, যার উপর যার ভরণপোষণের দায়িত্ব অর্পিত, বিধিসম্মতভাবে যা কিছু ন্যূনতম প্রয়োজনীয় তা সরবরাহ করাই তার কর্তব্য। এর অর্থ ভরণপোষণের অধিকার যার প্রাপ্য তাকেই তা স্বহস্তে নিয়ে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া নয়। কেননা তাতে ক্ষেত্র বিশেষে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সীমা অতিক্রম ও অপব্যয়ের আশংকা যেনো না থাকে এমনভাবে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খোরপোষ দিতে হবে এটাই তার মর্মার্থ। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের তথ্য ও অভিজ্ঞদের অভিজ্ঞতার আলোকেই ন্যূনতম প্রয়োজনের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। এটাই রসূল (সা)-এর 'বিধিসম্মতভাবে' কথার মর্মার্থ। অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে নয় এবং অমিতব্যয়িতা বা কৃপণতার মাধ্যমেও নয়। অবশ্য যখন স্বামী তার উপর অর্পিত ভরণপোষণের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত হয়না, তখন যার ভরণপোষণ পাওয়ার হক রয়েছে, তাকে তার ন্যূনতম ও অত্যাবশ্যকীয় পরিমাণ জীবিকা নিজেই নিয়ে নেয়ার অধিকার দেয়া হয়েছে। এই অধিকার দেয়া হয়েছে এমন মহিলাকে, যার যথেষ্ট বিবেকবুদ্ধি ও বিবেচনা ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যার অপব্যয়ের প্রবণতা রযেছে, তাকে নয়। অপব্যয়ী ও অমিতব্যয়ীকে যার উপর ভরণপোষণের দায়িত্ব ন্যস্ত তার সম্পত্তি থেকে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী জীবিকা গ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের সম্পদ অর্পণ করোনা।” তবে যার উপর কারো ভরণপোষণের দায়িত্ব অর্পিত, সে যদি দায়িত্ব সচেতন না হয় ও ভরণপোষণের দিতে প্রস্তুত না হয়; অপরদিকে যার ভরণপোষণ প্রাপ্য, সেও যদি নির্বোধ হয়, তাহলে আমাদের কর্তব্য, নির্বোধের ভরণপোষণ গ্রহণের দায়িত্ব তার অভিভাবকের নিকট অথবা কোনো ন্যায়বান ব্যক্তির নিকট সোপর্দ করা। তেল, সাবান, চিরুনী এবং অন্য যেসব উপকরণ পরিচ্ছন্নতার জন্য জরুরি, তাও স্ত্রীর অত্যাবশ্যকীয় ভরণপোষণের উপকরণের আওতাভুক্ত। শাফেয়ী মাযহাবের মতে, সুগন্ধী দ্রব্য যদি দুর্গন্ধ দূর করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা অত্যাবশ্যকীয় ভরণপোষণের আওতাভুক্ত। কেননা পরিচ্ছন্নতার জন্য তার আবশ্যকতা রয়েছে। আর যদি সুগন্ধী দ্রব্যের উদ্দেশ্য হয় বিনোদন ও বিলাসিতা, তাহলে তা দেয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। কেননা এটা তার ইচ্ছাধীন। এজন্য তাকে বাধা দেয়া বা বাধ্য করা যাবেনা।