📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ভরণপোষণের হকদার হওয়ার শর্তাবলি

📄 ভরণপোষণের হকদার হওয়ার শর্তাবলি


ভরণপোষণের হকদার হওয়ার জন্য শর্তাবলী প্রযোজ্য:
১. বিয়ের আকদ সঠিক ও বিশুদ্ধ হওয়া চাই।
২. স্ত্রীর স্বামীর নিকট নিজেকে সমর্পণ করা চাই।
৩. স্বামীর সন্তুষ্টি অনুযায়ী স্ত্রীর স্বামীকে যৌন মিলন করতে দেয়া চাই।
৪. স্বামী যেখানে বাসস্থান স্থানান্তর করে যেতে চায়, সেখানে যেতে স্ত্রীর আপত্তি না করা চাই। (অবশ্য স্ত্রী যদি মনে করে স্বামী তার ক্ষতি সাধন করতে চায়, কিংবা স্থানান্তরে গেলে নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সে শংকিত হয়, তাহলে স্ত্রী অসম্মত হতে পারে।)
৫. উভয়ে যৌন মিলনে সক্ষম হওয়া চাই।
এসব শর্তের একটিও যদি অপূর্ণ থাকে তবে ভরণপোষণ দেয়া ওয়াজিব হবেনা। কেননা আকদ যদি বিশুদ্ধ না হয়, বরং অবৈধ বা অশুদ্ধ হয়, তাহলে তো স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ অনিবার্য ও ওয়াজিব হয়ে যায়, যাতে বিশৃংখলা ও বিপর্যয় রোধ করা যায়। অনুরূপ, স্ত্রী যদি স্বামীর নিকট নিজেকে সমর্পণ না করে, কিংবা নিজেকে উপভোগ করার সুযোগ স্বামীকে না দেয়, অথবা স্বামী যে জায়গায় যেতে চায় সেখানে যেতে স্ত্রী সম্মত না হয়, তাহলে এসব অবস্থায় স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে স্বামী বাধ্য নয়। কেননা স্ত্রীকে অবরুদ্ধ করে রাখা, যা ভরণপোষণ ওয়াজিব হওয়ার কারণ, তা এখানে অনুপস্থিত। যেমন বিক্রেতা যদি বিক্রীত পণ্য ক্রেতার নিকট হস্তান্তরে অসম্মত হয়, অথবা ক্রেতা যে জায়গায় ক্রয় করেছে, সে জায়গা বাদে অন্যত্র গিয়ে করতে চায়, তাহলে সে পণ্যের মূল্য পাওয়ার হকদার হয়না। তাছাড়া, রসূলুল্লাহ সা. আয়েশা রা.কে বিয়ে করার দু'বছর পর বাসর করেন, শুধু বাসর করার পর থেকেই তার ভরণপোষণ করেন এবং অতীত সময়ের ভরণপোষণ করা জরুরি মনে করেননি। স্ত্রী যদি এত কম বয়স্কা হয় যে, অত কম বয়স্কা মেয়ের সাথে সহবাস করা যায়না, অথচ সে স্বামীর নিকট নিজেকে সপে দিয়েছে, তাহলে মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে ভরণপোষণ করা ওয়াজিব হবেনা। কেননা যৌন মিলনের সুযোগ পুরোপুরিভাবে উপস্থিত নেই। তাই সে বিনিময়স্বরূপ ভরণপোষণের হকদান হবেনা। আর যদি স্ত্রী বয়স্কা এবং স্বামী অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তাহলে ভরণপোষণ ওয়াজিব হবে। কেননা স্ত্রী তার দিক থেকে তাকে ভোগ করার অনুমতি দিতে কসুর করেনি, কেবল স্বামীর দিক থেকে সুযোগ গ্রহণ সম্ভব হয়নি। কাজেই ভরণপোষণ করা জরুরি। অনুরূপ, স্বামীর নিকট যদি স্ত্রী আত্মপমর্পণ করে এবং স্বামী বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে ছেড়ে পালিয়ে যায়, তবে সে ক্ষেত্রেও ভরণপোষণ করা ওয়াজিব হবে। হানাফিদের নিকট যে মতটি কার্যকর তা হলো, স্বামী যদি অপ্রাপ্ত বয়স্কা স্ত্রীকে তার সাথে ঘনিষ্ঠ ও আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে নিজের বাড়িতে আটকে রাখে, তবে এই আটকাবস্থার উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থাকলেও এতে স্বামীর সম্মতি থাকার কারণে স্ত্রীর ভরণপোষণ করা তার উপর ওয়াজিব হবে। তবে সে যদি তাকে নিজের বাড়িতে আটকে না রাখে, তাহলে ভরণপোষণ ওয়াজিব হবেনা।
(এটা ইমাম আবু ইউসুফের মত। আবু হানিফা ও মুহাম্মদের মত শাফেয়ীর মতের অনুরূপ। কেননা স্ত্রীকে আটক রাখা ও না রাখা উভয় সমান। এখানে বিয়ের উদ্দেশ্য অর্জিত হয়না বিধায় ভরণপোষণ ওয়াজিব নয়।)
আর যখন স্ত্রী নিজেকে স্বামীর নিকট সমর্পণ করে, কিন্তু সে এমন রোগে আক্রান্ত যে, স্বামীর পক্ষে তার সাথে সহবাস করা সম্ভব নয়, তখন তাকে ভরণপোষণ করা স্বামীর উপর ওয়াজিব। রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণে স্ত্রী ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হবে, এটা কোনো সুষ্ঠু দাম্পত্য আচরণ নয় এবং আল্লাহ যে সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন, তারও দাবি নয়। যে স্ত্রীর যোনিদ্বার রুদ্ধ এবং যে স্ত্রী এত দুর্বল কিংবা এমন কোনো শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী যে, স্বামী তার সাথে সহবাস করতে অপরাগ, সেও রোগাক্রান্ত স্ত্রীর পর্যায়ভুক্ত।
অনুরূপ, স্বামী নপুংসক, পুরুষাঙ্গ কর্তিত বা স্ত্রী সহবাসের অন্তরায় এমন রোগে আক্রান্ত হলে কিংবা ঋণের দায়ে বা কৃত অপরাধের দায়ে বন্দী হলেও স্ত্রীর ভরণপোষণ করা তার উপর ওয়াজিব হবে। কেননা এক্ষেত্রে স্ত্রীর পক্ষ থেকে সহবাস করার সুযোগ দেয়াতে কোনো কসুর নেই। এখানে যা কিছু অক্ষমতা, তা কেবল স্বামীর। এ অক্ষমতার অজুহাতে সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেতে পারেনা। এটা শুধু তার নিজের অধিকার থেকেই তাকে বঞ্চিত করে। আর স্ত্রী যখন শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়াই স্বামীর অনুমতি ব্যতিরেকে স্বামীর বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যায়, অথবা তার অনুমতি ছাড়া সফরে যায়, অথবা হজ্জের ইহরাম বাঁধে, তখন তাকে ভরণপোষণ দেয়া স্বামীর উপর ওয়াজিব নয়। স্বামীর অনুমতি নিয়ে সফর করলে, ইহরাম বাধলে কিংবা স্বামী তার সঙ্গী হলে খোরপোষ দেয়া থেকে স্বামী অব্যাহতি পাবেনা। কেননা এক্ষেত্রে স্ত্রী তার অবাধ্য হয়নি, তার নিয়ন্ত্রণের বাইরেও যায়নি। পক্ষান্তরে এমন যদি হয় যে স্ত্রী তার নিজের বাড়িতে স্বামীর সাথে বসবাসরত থাকাকালে স্বামীকে তার সাথে সহবাস করতে বাধা দিয়েছে এবং অন্য বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে স্বামীকে বলেনি, আর স্বামীও তাতে অসম্মত হয়নি, তাহলে তাকে ভরণপোষণ করা তার ওয়াজিব হবেনা। তবে যদি স্বামীকে স্থানান্তরিত হতে বলে থাকে কিন্তু তাতে স্বামী অসম্মত হয়ে থাকে এবং স্ত্রী তাকে তার সাথে সহবাস করতে দিতে অসম্মত হয়, তাহলে ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপর থেকে রহিত হবেনা।
অনুরূপ, স্ত্রী যদি কোনো অপরাধের দায়ে কারাবন্দী হয়, অথবা ঋণের কারণে অথবা অন্যায়ভাবে জেল খাটে, তাহলেও তার ভরণপোষণ করা স্বামীর উপর ওয়াজিব হবেনা। তবে যদি কখনো স্বামীই স্ত্রীকে তার পাওনা কোনো দেনার দায়ে আটক করেন, তখন স্ত্রীর ভরণপোষণ করা স্বামীর উপর ওয়াজিব হবে। কেননা এক্ষেত্রে স্বামী নিজেই তার পাওনা হাতছাড়া করেছে। অনুরূপ স্ত্রীকে যদি কোনো অপহরণকারী অপহরণ করে এবং সে স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে স্ত্রী যতোক্ষণ বা যতোদিন অপহৃত অবস্থায় থাকবে, ততোদিন ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য হবেনা। অনুরূপ, কোনো পেশাজীবী স্ত্রীকে যদি তার স্বামী পেশার কাজ করার জন্য বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করে এবং সে নিষেধ না মানে, তাহলে সে ভরণপোষণ পাওয়ার যোগ্য হবেনা। অনুরূপ যখন স্ত্রী নফল রোযা ও নফল ইতিকাফ দ্বারা নিজেকে স্বামীর যৌন মিলন থেকে নিবৃত রাখে, তখনও সে ভরণপোষণ পাবেনা। কেননা এসবে ক্ষেত্রে স্ত্রী কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া স্বামীকে সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। শরিয়তসম্মত কারণে বঞ্চিত করে থাকলে ভরণপোষণ পেতো। যেমন বাসস্থান অবৈধ হওয়ার কারণে কিংবা স্বামী তার জান ও মালের জন্য নিরাপদ না হওয়ার কারণে যদি স্বামীর অবাধ্য হয়। তাহলেও স্ত্রী ভরণপোষণ পাওয়ার হকদার থাকবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যখন স্বামী ছাড়া স্ত্রী একাই ইসলাম গ্রহণ করে

📄 যখন স্বামী ছাড়া স্ত্রী একাই ইসলাম গ্রহণ করে


স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে অমুসলিম হলে এবং সহবাসের পর স্ত্রী একাই স্বামী ব্যতিত ইসলাম গ্রহণ করলে তার ভরণপোষণের অধিকার রহিত হবেনা। কেননা স্ত্রীর সাথে সহবাস অসম্ভব হয়েছে স্বামীর কারণেই। সে ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে এই কারণটি দূর করতে সক্ষম ছিলো। কাজেই এক্ষেত্রে স্ত্রীর ভরণপোষণ থেকে সে অব্যাহতি পাবেনা, একই কারণে স্ত্রীকে রেখে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মুসলমান স্বামীও ভরণপোষণ থেকে অব্যাহতি পাবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্বামী মুরতাদ হলে

📄 স্বামী মুরতাদ হলে


সহবাসের পর স্বামী মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগী) হয়ে গেলে তার উপর থেকে স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব রহিত হয়না। কেননা এখন স্বামী যে সহবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তার কারণ সে নিজেই সৃষ্টি করেছে। ইসলামে ফিরে এসে সে এই কারণ দূর করতে পারতো। পক্ষান্তরে স্ত্রী যদি মুরতাদ হয়, তাহলে স্বামীর কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবেনা। কেননা সে নিজের পক্ষ থেকে গুনাহ করে সহবাসের পথ রুদ্ধ করেছে, যেমন স্বামীর অবাধ্য স্ত্রী করে থাকে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ভরণপোষণ পাওয়া ও না পাওয়ার বিষয়ে যাহেরি মাযহাবের মত

📄 ভরণপোষণ পাওয়া ও না পাওয়ার বিষয়ে যাহেরি মাযহাবের মত


ভরণপোষণ ওয়াজিব হবার কারণ সম্পর্কে যাহেরি মাযহাবের স্বতন্ত্র মত রয়েছে। তাদের মতে, দাম্পত্য সম্পর্কই ভরণপোষণের কারণ। দাম্পত্য সম্পর্ক যতোক্ষণ থাকবে, ততোক্ষণ স্ত্রী ভরণপোষণ পাবে। এ মতের ভিত্তিতে তারা অপ্রাপ্ত বয়স্কা স্ত্রী ও স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীকেও ভরণপোষণ দেয়া ওয়াজিব বলে রায় দেন। অন্যান্য ফকিহগণ এজন্য যেসব শর্ত আরোপ করেন, সেগুলো যাহেরীগণ মানেননা। ইবনে হাযম বলেন : যে মুহূর্তে বিয়ের আকদ সম্পন্ন হয়েছে, সেই মুহূর্ত থেকেই স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণ করতে বাধ্য, চাই তাদের সংসার পাতা হোক বা না হোক, স্ত্রী প্রাপ্ত বয়স্কা হোক বা দোলনার শিশু হোক, ধনাঢ্য হোক বা দরিদ্র হোক, পিতৃহীনা হোক বা না হোক, কুমারী হোক বা অকুমারী হোক, স্বাধীন হোক বা দাসী হোক। ভরণপোষণ সর্বাবস্থায়ই স্বামীর সামর্থ্য অনুপাতে দিতে হবে। (আল মুয়াল্লা, ১০ খণ্ড)
ইবনে হাযম বলেন, আবু সুলায়মান ও তার শিষ্যগণ এবং সুফিয়ান ছাওরি বলেছেন: বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্ত থেকেই অপ্রাপ্ত বয়স্কা স্ত্রীর ভরণপোষণ করা ওয়াজিব। ক্রোধবশত স্বামীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া জনৈকা মহিলা সম্পর্কে হাকাম বিন উতাইবাকে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাব দেন যে, তাকে ভরণপোষণ করতে হবে। স্বামীর অবাধ্য স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেয়া লাগবেনা এমন কথা কোনো সাহাবির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, এটা শুধু নাখয়ী, শাবী, হাম্মাদ, হাসান ও যুহরি থেকে বর্ণিত। এর সপক্ষে নাখয়ী প্রমুখ কী প্রমাণ দর্শান, তাও জানা যায়নি। তারা শুধু বলেছেন : ভরণপোষণ হলো সহবাসের বদলা। সহবাস যখন করতে দেয়না, তখন ভরণপোষণও পাবেনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00