📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মোহরের পরিমাণ অত্যধিক বাড়ানো মাকরুহ

📄 মোহরের পরিমাণ অত্যধিক বাড়ানো মাকরুহ


মোটকথা, ইসলাম যতো বেশি সংখ্যক পারা যায় নারী ও পুরুষের বিয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে উদগ্রীব, যাতে সবাই হালাল উপায়ে বিপরীত লিঙ্গকে সম্ভোগ করতে পারে। কিন্তু এ কাজটিকে সহজ ও সুলভ করে দেয় এমন উপায় হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব নয়। বিয়ের কাজটি এতটা সহজ হওয়া দরকার যাতে সমাজের বৃহত্তম অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে এটি সহজসাধ্য হয়। কারণ বেশি অর্থ ব্যয় করা তাদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। তাই ইসলাম মোহরের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানোকে অপছন্দ করেছে এবং জানিয়েছে, মোহর যতো কম হবে, বিয়ে ততোই কল্যাণকর ও বরকতময় হবে। আর মোহর কম হওয়া নারীর সৌভাগ্যের ব্যাপার। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "যে বিয়েতে যতো কম ব্যয় সে বিয়ে ততোই বরকতময়।” তিনি আরো বলেছেন, "নারীর সৌভাগ্য তার মোহর কম হওয়ায়, বিয়ে সহজ হওয়ায় এবং চরিত্র মাধুর্যে নিহিত। আর তার দুর্ভাগ্য তার মোহরের পরিমাণ বৃদ্ধিতে, বিয়ের জটিলতায় ও চরিত্রের কদর্যতায়।” এসব শিক্ষা অনেকেরই অজানা, অনেকেই তার বিরুদ্ধাচরণে এবং জাহেলী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। এই জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার কারণেই তারা মোহর নিয়ে দরকষাকষি করে এবং বরপক্ষ অনেক সম্পদ না দেয়া পর্যন্ত বিয়েতে রাযী হয়না। কনে পক্ষ বরপক্ষের নিকট এত বেশি অর্থ চায় যে, তা দিতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়। যেন নারী একটা বাণিজ্যিক পণ্য, যা নিয়ে দরকষাকষি করা যায়। এই কু-প্রথা সামাজিক সমস্যার জন্ম দিয়েছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ বিয়ে থেকে সৃষ্ট সমস্যায় নিরন্তর ভুগছে। এক কথায় বলা যায়, এর ফলে বিয়ের বাজারই মন্দা হয়ে গেছে এবং সমাজে হালালের চেয়ে হারাম কাজ সহজ হয়ে গেছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নগদ মোহর ও বাকী মোহর

📄 নগদ মোহর ও বাকী মোহর


মোহর আকদের সময় নগদও দেয়া যায়, বিলম্বেও দেয়া যায়। অংশবিশেষ নগদ এবং অপর অংশ বিলম্বে দিতে চাইলে তাও দেয়া যায়। এটা নির্ভর করে জনগণের রীতিপ্রথা ও অভ্যাসের উপর। তবে অন্তত একাংশ তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া মুস্তাহাব। কেননা ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, "রসূলুল্লাহ সা. ফাতেমাকে কিছু না দিয়ে তার সাথে বাসর করতে আলী রা. কে নিষেধ করেছিলেন। আলী রা. বললেন, "আমার তো কিছুই নেই। রসূল সা. বললেন, "তোমার সেই হুতামি বর্মটা কোথায়?" তখন আলী রা. সেই বর্মটি ফাতেমাকে দিলেন। -আবু দাউদ, নাসায়ী, হাকেম।
পক্ষান্তরে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেনে, আয়েশা রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) জনৈকা মহিলাকে তার স্বামীর সাথে কোনো প্রকার মোহর দেয়ার আগেই বাসর ঘরে ঢুকিয়ে দিতে আমাকে আদেশ করেছিলেন।” এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, স্বামী মোহরের কোনো অংশ দেয়ার আগেও স্ত্রী তার বাসর ঘরে যেতে পারে। আর ইবনে আব্বাসের হাদিস প্রমাণ করে যে, মোহরের অন্তত অংশবিশেষ না দিয়ে বাসর করতে না দেয়া মুস্তাহাব।
আওযায়ি বলেছেন: মোহরের অংশবিশেষ না দিয়ে বাসর না করা উত্তম মনে করা হতো। যুহরি বলেছেন, সুন্নত থেকে আমরা জেনেছি, অন্তত কিছু খোরপোষ না দিয়ে কোনো পুরুষের নব পরিনীতা স্ত্রীর সাথে বাসর করা অনুচিত। এটা মুসলমানদের রীতি ছিলো।
তবে মোহরের অংশ তাৎক্ষণিকভাবে দেয়ার শর্ত আকদে ছিলো, সেটা যদিও সহবাসের আগেই দিতে আদালত থেকে হুকুম দেয়া হতো, কিন্তু তা তাৎক্ষণিকভাবে না দিলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করার অধিকার স্বামীর রয়েছে, আর স্ত্রীরও কর্তব্য স্বামীর নিকট নিজেকে সঁপে দেয়া এবং সহবাস করতে বাধা না দেয়া।
ইবনে হাযম বলেছেন, যে ব্যক্তি মোহর ধার্য করে বা ধার্য না করে বিয়ে করেছে, তার সহবাস করার অধিকার রয়েছে, চাই স্ত্রীর তা পছন্দ হোক বা না হোক। আর স্বামীকে তার ধার্য করা মোহর দেয়ার আদেশ দেয়া হবে, চাই তা তার পছন্দ হোক বা না হোক। তবে এ জন্য তাকে সহবাসে বাধা দেয়া যাবেনা। তাকে আকদের পর অবিলম্বেই সহবাস করার অনুমতি দেয়া হবে এবং তাকে স্ত্রীর জন্য মোহরও অবিলম্বেই দিতে বাধ্য করা হবে। তার কাছে যা কিছুই পাওয়া যায় তা থেকেই মোহর আদায় করা হবে। যদি পূর্বাহ্নে মোহর ধার্য না করা হয়ে থাকে, তাহলে মোহর মিছল দিতে আদেশ দেয়া হবে। তবে স্বামী স্ত্রী উভয়ে যদি তার চেয়ে কমে বা বেশিতে সম্মত হয়, তাহলে সেটাই দিতে হবে। আবু হানিফা বলেছেন, বিলম্বিত মোহরে বিয়ে করলে স্ত্রীর সাথে সহবাস করার অধিকার স্বামীর রয়েছে, চাই স্ত্রী তা পছন্দ করুক বা না করুক। কেননা স্ত্রী নিজেই মোহর বিলম্বিত করতে সম্মত হয়েছে। তাই এতে স্বামীর সহবাসের অধিকার রহিত হতে পারেনা। আর যদি সমস্ত মোহর অথবা তার একাংশ নগদ প্রদানের শর্ত থেকে থাকে তাহলে যতোটুকু ত্বরিত প্রদানের শর্ত রয়েছে, ততোটুকু না দেয়া পর্যন্ত সহবাস করা স্বামীর জন্য বৈধ হবেনা। যতোটুকু মোহর ত্বরিত প্রদানের শর্ত সর্বসম্মতভাবে আরোপ করা হয়েছে, তা না দেয়া পর্যন্ত স্ত্রীরও সহবাস করতে না দেয়ার অধিকার রয়েছে।
ইবনুল মুনযির বলেন, যে সকল আলেমের নাম আমাদের জানা আছে, তারা সবাই একমত, প্রদেয় মোহর না দেয়া পর্যন্ত স্বামীকে সহবাস করতে না দেয়ার অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। আল মুহাল্লা গ্রন্থের লেখক এই মতটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, কোনো মুসলমানের এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই যে, বিয়ের আক্দ সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তারা উভয়ে স্বামী ও স্ত্রী। তাই উভয়ে উভয়ের জন্য হালাল। মোহর বা অন্য কিছু স্ত্রীকে না দেয়া পর্যন্ত সহবাস করতে যে ব্যক্তি বাধা দেয়, সে আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই স্বামী ও স্ত্রীর মিলনে অন্তরায় হয়।
কিন্তু আমরা যা বলেছি, সেটাই প্রকৃত সত্য কথা। তা হলো, স্ত্রীর সাথে সহবাসেও স্বামীকে বাধা দেয়া যাবেনা। স্বামীর কাছে প্রাপ্য মোহর থেকেও কেউ স্ত্রীকে বঞ্চিত করতে পারবেনা। স্ত্রী পছন্দ করুক বা না করুক, স্বামী তার সাথে সহবাস করতে পারবে এবং স্বামীর যা কিছু সম্পদ আছে, তা থেকেই স্ত্রীর মহর আদায় করা হবে, চাই তা স্বামীর পছন্দ হোক বা না হোক। রসূল সা.-এর পক্ষ থেকে এই মর্মে হাদিস বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, "প্রত্যেক হকদারকে তার হক দাও।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যেসব অবস্থায় সম্পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব

📄 যেসব অবস্থায় সম্পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব


নিম্নে বর্ণিত অবস্থাগুলোর যে কোনোটি দেখা দিলেই সম্পূর্ণ মোহর দেয়া বাধ্যতামূলক:
১. যখন প্রকৃত অর্থে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যৌন মিলন ঘটে: কেননা আল্লাহ বলেছেন: "আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে ইচ্ছা করো এবং তাদের একজনকে প্রচুর অর্থও দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিওনা। তোমরা কি তা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপাচারের মাধ্যমে ফেরত নেবে? কিভাবে তোমরা তা ফেরত নেবে? অথচ তোমরা পরস্পরে সংগম করেছ এবং সে নারীরা তোমাদের কাছ থেকে কঠোর অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে? (সূরা নিসা: আয়াত ২০, ২১)
২. স্বামী স্ত্রীর কোনো একজন যদি যৌন মিলনের পূর্বেই মারা যায়। এটা সর্বসম্মত মত।
৩. আবু হানিফার মতে, স্বামী যখন তার বধূর সাথে যৌন মিলন করা যায় এমন নিভৃত সাক্ষাতে মিলিত হয়, তখনই নির্ধারিত পুরো মোহর বধূর পাপ্য হয়ে যায়। এই নিভৃত সাক্ষাতকার দ্বারা উভয়ের এমন জায়গায় সাক্ষাৎ করা বুঝায় যেখানে তাদের উপস্থিতি কেউ টের পাবে না মর্মে উভয়ে নিশ্চিত থাকে। তাদের দু'জনের কেউ এমন অবস্থার শিকার থাকেনা যা শরিয়ত অনুযায়ী যৌন মিলনের অন্তরায়। যেমন কোনো একজন ফরয রোযা রেখেছে, অথবা মাসিক ঋতুস্রাব চলছে কিংবা এমন কোনো বাধা রয়েছে যা অতিক্রম করা কার্যত অসম্ভব। যেমন এমন কোনো রোগে আক্রান্ত যার কারণে বর্তমানে যৌন মিলন সম্ভব নয়। অথবা কোনো স্বাভাবিক বাধা বিদ্যমান, যেমন তাদের দুইজনের মাঝে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি। ইমাম আবু হানিফা তার মতের সপক্ষে যে প্রমাণ তুলে ধরেছেন তা হলো: আবু উবায়দা যায়েদ ইবনে আবি আওফা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের সিদ্ধান্ত ছিলো, যখন কক্ষের দরজা বন্ধ করা হয় এবং সতর খুলে ফেলা হয়। তখনই মোহর প্রাপ্য হয়ে যায়। ওয়াকী নাফে বিন জুবাইর থেকে বর্ণনা করেন: রসূল সা.-এর সাহাবিগণ বলতেন, যখন সতর খোলা হয় ও দরজা বন্ধ করা হয়, তখনই মোহর পাওনা হয়ে যায়।
তাছাড়া, তিনি এ যুক্তিও প্রদর্শন করেন, যেহেতু স্ত্রীর পক্ষ থেকে নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমর্পণ করা হয়েছে, সেহেতু এর বদলায় মোহর প্রাপ্য হবেই। ইমাম শাফেয়ী মালেক ও দাউদ এ মতের বিরোধিতা করে বলেন, সহবাস ব্যতিত পুরো মোহর প্রাপ্য হয়না।
তবে ইমাম মালেক বলেছেন, স্বামী যখন সংগমের উদ্যোগ নিয়ে স্ত্রীর উপর চড়াও হয় এবং স্ত্রী সহবাসের উপযুক্তভাবে শুয়ে পড়ে, তখন কার্যত সহবাস না করলেও মোহর প্রাপ্য হয়ে যায়।
সংগমের উপযুক্ত নিভৃত সাক্ষাতকার দ্বারা অর্ধেক মোহরের বেশি প্রাপ্য হয়না। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنْ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةٌ فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ .
"যদি তোমরা মোহর ধার্য করার পর স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, তবে যে মোহর তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক দিতে হবে।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৩৭)
অর্থাৎ স্পর্শের আগে তালাক দেয়া হলে ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক স্ত্রীর প্রাপ্য হবে। আর স্পর্শের অর্থ হলো প্রকৃত ও পূর্ণ যৌন মিলন। নিছক নিভৃতে সাক্ষাৎ করলেই যৌন মিলন হয়না। কাজেই সে ক্ষেত্রে পুরো মোহর প্রাপ্য হয়না।
শুরাইহ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কোনো দরজা বা সতরের উল্লেখ করেছেন বলে আমি শুনিনি। স্বামী যদি দাবি করে, সে স্ত্রীকে স্পর্শ করেছে, তবে তাকে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। আর ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, যখন কোনো পুরুষের নিকট তার স্ত্রী আসে, অতপর সে স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং দাবি করে, সে তাকে স্পর্শ করেনি, তখন তার উপর অর্ধেক মোহর ওয়াজিব হবে। আব্দুর রাজ্জাক ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, "স্ত্রীর সাথে সহবাস না করা পর্যন্ত পুরো মোহর স্বামীর নিকট প্রাপ্য হবেনা।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অবৈধ বিয়েতে সহবাসের কারণে পূর্ণ মোহর প্রাপ্য

📄 অবৈধ বিয়েতে সহবাসের কারণে পূর্ণ মোহর প্রাপ্য


যখন কোনো পুরুষ বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে সহবাস করে, অতপর কোনো কারণে বিয়ে অবৈধ প্রমাণিত হয়, তখন পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব হয়। কেননা আবু দাউদ বর্ণনা করেন: “বাসরা বিন আকসাম জনৈক কুমারী মেয়েকে বিয়ে করার পর তার সাথে সহবাস করার সময় দেখতে পায় সে গর্ভবতী। পরে সে যখন বিষয়টি রসূল সা.কে জানালো, তখন তিনি বললেন, তার সাথে তুমি সহবাস করেছ বিধায় সে মোহর পাবে.... অতপর তিনি তাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন।
এ হাদিস থেকে জানা গেলো, অবৈধ বিয়েতে ও সহবাসের কারণে নির্ধারিত মোহর সম্পূর্ণই দিতে হবে। অনুরূপ এও জানা গেলো যে, বিয়ের পর ব্যভিচারজনিত গর্ভ ধরা পড়লে বিয়ে বাতিল হয়ে যাবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00