📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মোহরের পরিমাণ

📄 মোহরের পরিমাণ


ইসলামী শরিয়ত মোহরের কোনো সীমা নির্ধারণ করেনি। কেননা মানুষের দারিদ্র্য ও ধনাঢ্যতার মান বিভিন্ন রকমের। তাদের সচ্ছলতা ও অনটনের স্তরেরও রকমফের রয়েছে। আবার প্রত্যেক পক্ষেরই নিজস্ব কৃষ্টি আদত অভ্যাস ও ঐতিহ্য সংস্কৃতি রয়েছে। তাই সীমা নির্ধারণ না করে প্রত্যেকের নিজ নিজ সাধ্য ও ক্ষমতার উপর ছেড়ে দিয়েছে। প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থা ভেদে এবং নিজ নিজ গোত্রের রীতি প্রথার আলোকে তা স্থির করে নেবে। এ সংক্রান্ত সকল ভাষ্য এবং ইংগিতই দেয় যে, স্থায়ী মূল্য আছে এমন কিছুই মোহর হিসেবে দেয়া উচিত। চাই তা কম হোক বা বেশি হোক। একটা ধাতব আংটি, কিংবা এক ঝুড়ি খোরমা কিংবা কুরআনের কোনো শিক্ষাও মোহর হিসেবে দেয়া যেতে পারে যদি তাতে উভয় পক্ষ একমত হয়।
আমের বিন রবিয়া থেকে বর্ণিত, বনু ফাযারার জনৈক মহিলা এক জোড়া জুতাকে মোহর হিসেবে গ্রহণ করে বিয়ে করে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তুমি কি এক জোড়া জুতার বিনিময়ে নিজেকে সমর্পণ করতে সম্মত হয়েছ? সে বললো: হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সা. তাকে অনুমতি দিলেন।" -আহমদ ইবনে মাজাহ, তিরমিযি।
সাইল বিন সা'দ থেকে বর্ণিত, জনৈক মহিলা রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট এলো এবং বললো : হে রসূলুল্লাহ, আমি নিজেকে আপনার নিকট সমর্পণ করলাম। এরপর সে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইল। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো: হে রসূলুল্লাহ! এই মহিলার যদি আপনার প্রয়োজন না থাকে, তবে ওকে আমার সাথে বিয়ে দিন। রসূল সা. বললেন: ওকে মোহর দেয়ার মতো কিছু তোমার কাছে আছে কি? সে বললো: আমার কাছে আমার এই লুঙ্গী ছাড়া আর কিছু নেই। রসূলুল্লাহ সা. বললেন, তুমি যদি তোমার লুঙ্গী ওকে দিয়ে দাও, তাহলে তুমি তো বিনা লুঙ্গিতেই বসে থাকবে। কাজেই অন্য কিছু যোগাড় করে নিয়ে এসো। সে বললো: আমি আর কিছু পাইনা। রসূল সা. বললেন: খুঁজে দেখো, এমনকি লোহার একটা আংটিও যদি পাও। অতপর সে খুঁজলো। কিন্তু কিছুই পেলনা। রসূল সা. বললেন: তোমার কাছে কি কুরআনের কিছু আছে? সে বললো: জ্বি, অমুক সূরা। রসূল সা. বললেন: ঠিক আছে, তোমার যেটুকু কুরআন জানা আছে, তার (সেটুকু শিক্ষা দানের) বিনিময়ে তোমাদের দু'জনের বিয়ে সম্পাদন করলাম। (বুখারি, মুসলিম)। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল সা. বিশটি আয়াত স্থির করলেন।
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, আবু তালহা উম্মে সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। উম্মে সুলাইম বললেন: আল্লাহর কসম, আপনার মতো লোককে প্রত্যাখ্যান করা যায়না। কিন্তু আপনি কাফের আর আমি মুসলমান। আপনাকে বিয়ে করা আমার জন্য বৈধ নয়। তবে আপনি যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে সেটাই আমার মোহর। এ ছাড়া আমি আপনার কাছে আর কিছু চাইনা। অতপর ওটাই তার মোহর হলো।
এসব হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, যে কোনো সামান্য জিনিসকেও মোহর হিসেবে ধার্য করা যায়। এমনকি কোনো সেবামূলক কাজকেও মোহর হিসেবে ধার্য করা যায়। কুরআন শিখানোও একটা সেবামূলক কাজ। হানাফি ফকিহগণ ন্যূনতম মোহর স্থির করেছেন দশ দিরহাম, আর মালেকিরা স্থির করেছন তিন দিরহাম। তবে এই ন্যূনতম মোহর ধার্যকরণের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। হাফেয ইবনে হাজার বলেছেন, ন্যূনতম মোহর সম্পর্কে বেশ কিছু হাদিস পাওয়া গেছে। কিন্তু তার কোনোটিই সহীহ সাব্যস্ত হয়নি। উল্লিখিত হাদিসগুলোর পর্যালোচনা করতে গিয়ে ইবনুল কাইয়েম বলেছেন: আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করলে তা দ্বারা যে উপকার পাওয়া যাবে, তাকেই উম্মে সুলাইম মোহর হিসেবে মেনে নিয়েছেন এবং তার বিনিময়ে তিনি নিজেকে তার নিকট সমর্পণ করতে প্রস্তুত হয়েছেন। এটা তার নিকট স্বামীর অর্থ সম্পদের চেয়েও প্রিয়। বস্তুত মোহর স্ত্রীর উপকারের জন্যই তার প্রাপ্য হিসেবে ধার্য হয়েছে। সে যখন ইসলামের জ্ঞান ও দীনদারিতেই সম্মত হয়ে গেলো এবং স্বামীর কুরআন পড়া ও ইসলাম গ্রহণেই রাযী হলো, তখন এটা হয়ে গেলো শ্রেষ্ঠ মোহর। এটা হলো সবচেয়ে উপকারী মোহর। কাজেই এখানে মোহরবিহীন আব্দ হয়নি। এর সাথে তিন দিরহাম বা দশ দিরহামকে মোহর ধার্য করার কোনো তুলনা হয়না।
যে মহিলা রসূল সা.-এর নিকট নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। এটি তারও সমপর্যায়ের নয়। আর ঐ মহিলার ব্যাপারটা ছিলো একান্তভাবেই রসূল সা.-এর সাথে নির্দিষ্ট। কেননা সে নিজেকে রসূল সা.-এর নিকট সঁপে দেয়ার সময় কোনো ওলি বা মোহরেরও তোয়াক্কা করেনি। অথচ এখন আমরা যে বিয়ে শাদি করে থাকি, তাতে ওলিও থাকে। মোহরও থাকে যদিও সে মোহর এমন কোনো ধনসম্পদ নয় যার মূল্য মুদ্রার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। বস্তুত এ ক্ষেত্রে মহিলা স্বামী কর্তৃক তাকে কুরআন শিখানোর কাজকে সম্পদের বিকল্প হিসেবে মেনে নিয়েছে। কেননা এ দ্বারা সে উপকৃত হবে। সে নিজেকে ঐ মহিলার ন্যায় মোহরাবিহীনভাবে সঁপে দেয়নি এবং তার কোনো দ্রব্যসামগ্রী উপহার দেয়ার মতো করে নিজেকে উপহার দেয়নি। এ হলো উপরে বর্ণিত হাদিসগুলোর সার নির্যাস। কেউ কেউ এ মতের বিরোধিতা করে বলেছেন; মোহর অবশ্যই সম্পদ হতে হবে। কোনো সেবা বা উপকার দ্বারা মোহর আদায় হবে না। স্বামীর বিদ্যা বা শিক্ষাদান আবু হানিফা ও আহমদের মতে, মোহর হিসেবে গণ্য হবে না। ইমাম আবু হানিফার মতে, দশ দিরহামের কমে এবং মালেকের মতে তিন দিরহামের কমে মোহর আদায় হবেনা। এ ব্যাপারে আরো কিছু মতামত রয়েছে, যার সপক্ষে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস এবং কোনো ইমাম বা ফকিহর উক্তি নেই। যারা উপরোক্ত হাদিসগুলো সম্পর্কে দাবি করেন যে, তা শুধু রসূল সা.-এর জন্য নির্দিষ্ট অথবা তা রহিত বা মানসূখ হয়ে গেছে, অথবা মদিনাবাসীর বাস্তব কার্যকলাপ এর বিপরীত, তাদের এসব দাবির পক্ষে কোনোই প্রমাণ নেই। তাছাড়া ফিকহের মূলনীতি এসব দাবির বিপক্ষে। মদিনাবাসীর শীর্ষ নেতা বিশিষ্ট তাবেয়ী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব তাঁর মেয়েকে মাত্র দুই দিরহামে বিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ কেউ এর বিরোধিতা করেনি বরং এটা তাঁর মহৎ গুণ ও মহানুভবতা বলে স্বীকৃত হয়েছে। আব্দুর রহমান বিন আওফ পাঁচ দিরহাম মোহরের বিনিময়ে বিয়ে করেছেন এবং রসূল সা. তা বহাল রেখেছেন। বস্তুত মোহরের পরিমাণ ধার্য করা শরিয়ত প্রণেতা আল্লাহ ও রসূল সা. ব্যতিত আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। মোহরের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে তার কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। বর্ণিত আছে, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে দাঁড়িয়ে চারশো দিরহামের চেয়ে বেশি মোহর ধার্য করতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর তিনি মিম্বর থেকে নামমাত্র জনৈকা কুরাইশী মহিলা তার কাছে আসেন এবং প্রতিবাদ করে বলেন, আপনি কি কুরআনের এ আয়াত পড়েননি- "যদি তোমরা তোমাদের কোনো স্ত্রীকে বিপুল পরিমাণ সম্পদও দিয়ে থাকো, তবে তার কোনো অংশ ফেরত নিওনা” (সূরা নিসা) উমর রা. তৎক্ষণাত বললেন, "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো। সবাই উমরের চেয়ে বেশি ফিকহ জানে।" তারপর তিনি মসজিদে ফিরে গেলেন এবং মিম্বরে আরোহণ করে বললেন, "আমি তোমাদেরকে চারশো দিরহামের চেয়ে বেশি মোহর দিতে নিষেধ করেছিলাম। এখন বলছি, যে কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে যতো খুশি দিতে পারে।" (সাঈদ বিন মানসুর, আবু ইয়ালী) আব্দুল্লাহ ইবনে মুসয়াব রা. থেকে বর্ণিত, উমর রা. বলেছেন, "চল্লিশ উকিয়া স্বর্ণের চেয়ে বেশি মোহর দিওনা। যে ব্যক্তি এর বেশি দেবে, তার অতিরিক্ত মোহর বাইতুল মালে জমা করা হবে।" জনৈকা মহিলা বললেন, "এটা করার অধিকার আপনার নেই।” তিনি বললেন, কেন? সে বললো, কারণ আল্লাহ বলেছেন: "যদি তোমরা বিপুল পরিমাণ অর্থও দিয়ে থাকো, তবে তা ফেরত নিওনা।" উমর রা. বললেন, “একজন মহিলা সঠিক কথা বলতে পারলো, আর একজন পুরুষ ভুল করে ফেললো।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মোহরের পরিমাণ অত্যধিক বাড়ানো মাকরুহ

📄 মোহরের পরিমাণ অত্যধিক বাড়ানো মাকরুহ


মোটকথা, ইসলাম যতো বেশি সংখ্যক পারা যায় নারী ও পুরুষের বিয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে উদগ্রীব, যাতে সবাই হালাল উপায়ে বিপরীত লিঙ্গকে সম্ভোগ করতে পারে। কিন্তু এ কাজটিকে সহজ ও সুলভ করে দেয় এমন উপায় হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব নয়। বিয়ের কাজটি এতটা সহজ হওয়া দরকার যাতে সমাজের বৃহত্তম অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে এটি সহজসাধ্য হয়। কারণ বেশি অর্থ ব্যয় করা তাদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। তাই ইসলাম মোহরের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বাড়ানোকে অপছন্দ করেছে এবং জানিয়েছে, মোহর যতো কম হবে, বিয়ে ততোই কল্যাণকর ও বরকতময় হবে। আর মোহর কম হওয়া নারীর সৌভাগ্যের ব্যাপার। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "যে বিয়েতে যতো কম ব্যয় সে বিয়ে ততোই বরকতময়।” তিনি আরো বলেছেন, "নারীর সৌভাগ্য তার মোহর কম হওয়ায়, বিয়ে সহজ হওয়ায় এবং চরিত্র মাধুর্যে নিহিত। আর তার দুর্ভাগ্য তার মোহরের পরিমাণ বৃদ্ধিতে, বিয়ের জটিলতায় ও চরিত্রের কদর্যতায়।” এসব শিক্ষা অনেকেরই অজানা, অনেকেই তার বিরুদ্ধাচরণে এবং জাহেলী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। এই জাহেলি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার কারণেই তারা মোহর নিয়ে দরকষাকষি করে এবং বরপক্ষ অনেক সম্পদ না দেয়া পর্যন্ত বিয়েতে রাযী হয়না। কনে পক্ষ বরপক্ষের নিকট এত বেশি অর্থ চায় যে, তা দিতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হয়। যেন নারী একটা বাণিজ্যিক পণ্য, যা নিয়ে দরকষাকষি করা যায়। এই কু-প্রথা সামাজিক সমস্যার জন্ম দিয়েছে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ বিয়ে থেকে সৃষ্ট সমস্যায় নিরন্তর ভুগছে। এক কথায় বলা যায়, এর ফলে বিয়ের বাজারই মন্দা হয়ে গেছে এবং সমাজে হালালের চেয়ে হারাম কাজ সহজ হয়ে গেছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নগদ মোহর ও বাকী মোহর

📄 নগদ মোহর ও বাকী মোহর


মোহর আকদের সময় নগদও দেয়া যায়, বিলম্বেও দেয়া যায়। অংশবিশেষ নগদ এবং অপর অংশ বিলম্বে দিতে চাইলে তাও দেয়া যায়। এটা নির্ভর করে জনগণের রীতিপ্রথা ও অভ্যাসের উপর। তবে অন্তত একাংশ তাৎক্ষণিকভাবে দেয়া মুস্তাহাব। কেননা ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, "রসূলুল্লাহ সা. ফাতেমাকে কিছু না দিয়ে তার সাথে বাসর করতে আলী রা. কে নিষেধ করেছিলেন। আলী রা. বললেন, "আমার তো কিছুই নেই। রসূল সা. বললেন, "তোমার সেই হুতামি বর্মটা কোথায়?" তখন আলী রা. সেই বর্মটি ফাতেমাকে দিলেন। -আবু দাউদ, নাসায়ী, হাকেম।
পক্ষান্তরে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেনে, আয়েশা রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) জনৈকা মহিলাকে তার স্বামীর সাথে কোনো প্রকার মোহর দেয়ার আগেই বাসর ঘরে ঢুকিয়ে দিতে আমাকে আদেশ করেছিলেন।” এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, স্বামী মোহরের কোনো অংশ দেয়ার আগেও স্ত্রী তার বাসর ঘরে যেতে পারে। আর ইবনে আব্বাসের হাদিস প্রমাণ করে যে, মোহরের অন্তত অংশবিশেষ না দিয়ে বাসর করতে না দেয়া মুস্তাহাব।
আওযায়ি বলেছেন: মোহরের অংশবিশেষ না দিয়ে বাসর না করা উত্তম মনে করা হতো। যুহরি বলেছেন, সুন্নত থেকে আমরা জেনেছি, অন্তত কিছু খোরপোষ না দিয়ে কোনো পুরুষের নব পরিনীতা স্ত্রীর সাথে বাসর করা অনুচিত। এটা মুসলমানদের রীতি ছিলো।
তবে মোহরের অংশ তাৎক্ষণিকভাবে দেয়ার শর্ত আকদে ছিলো, সেটা যদিও সহবাসের আগেই দিতে আদালত থেকে হুকুম দেয়া হতো, কিন্তু তা তাৎক্ষণিকভাবে না দিলেও স্ত্রীর সাথে সহবাস করার অধিকার স্বামীর রয়েছে, আর স্ত্রীরও কর্তব্য স্বামীর নিকট নিজেকে সঁপে দেয়া এবং সহবাস করতে বাধা না দেয়া।
ইবনে হাযম বলেছেন, যে ব্যক্তি মোহর ধার্য করে বা ধার্য না করে বিয়ে করেছে, তার সহবাস করার অধিকার রয়েছে, চাই স্ত্রীর তা পছন্দ হোক বা না হোক। আর স্বামীকে তার ধার্য করা মোহর দেয়ার আদেশ দেয়া হবে, চাই তা তার পছন্দ হোক বা না হোক। তবে এ জন্য তাকে সহবাসে বাধা দেয়া যাবেনা। তাকে আকদের পর অবিলম্বেই সহবাস করার অনুমতি দেয়া হবে এবং তাকে স্ত্রীর জন্য মোহরও অবিলম্বেই দিতে বাধ্য করা হবে। তার কাছে যা কিছুই পাওয়া যায় তা থেকেই মোহর আদায় করা হবে। যদি পূর্বাহ্নে মোহর ধার্য না করা হয়ে থাকে, তাহলে মোহর মিছল দিতে আদেশ দেয়া হবে। তবে স্বামী স্ত্রী উভয়ে যদি তার চেয়ে কমে বা বেশিতে সম্মত হয়, তাহলে সেটাই দিতে হবে। আবু হানিফা বলেছেন, বিলম্বিত মোহরে বিয়ে করলে স্ত্রীর সাথে সহবাস করার অধিকার স্বামীর রয়েছে, চাই স্ত্রী তা পছন্দ করুক বা না করুক। কেননা স্ত্রী নিজেই মোহর বিলম্বিত করতে সম্মত হয়েছে। তাই এতে স্বামীর সহবাসের অধিকার রহিত হতে পারেনা। আর যদি সমস্ত মোহর অথবা তার একাংশ নগদ প্রদানের শর্ত থেকে থাকে তাহলে যতোটুকু ত্বরিত প্রদানের শর্ত রয়েছে, ততোটুকু না দেয়া পর্যন্ত সহবাস করা স্বামীর জন্য বৈধ হবেনা। যতোটুকু মোহর ত্বরিত প্রদানের শর্ত সর্বসম্মতভাবে আরোপ করা হয়েছে, তা না দেয়া পর্যন্ত স্ত্রীরও সহবাস করতে না দেয়ার অধিকার রয়েছে।
ইবনুল মুনযির বলেন, যে সকল আলেমের নাম আমাদের জানা আছে, তারা সবাই একমত, প্রদেয় মোহর না দেয়া পর্যন্ত স্বামীকে সহবাস করতে না দেয়ার অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। আল মুহাল্লা গ্রন্থের লেখক এই মতটির পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেন, কোনো মুসলমানের এ ব্যাপারে দ্বিমত নেই যে, বিয়ের আক্দ সম্পন্ন হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তারা উভয়ে স্বামী ও স্ত্রী। তাই উভয়ে উভয়ের জন্য হালাল। মোহর বা অন্য কিছু স্ত্রীকে না দেয়া পর্যন্ত সহবাস করতে যে ব্যক্তি বাধা দেয়, সে আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই স্বামী ও স্ত্রীর মিলনে অন্তরায় হয়।
কিন্তু আমরা যা বলেছি, সেটাই প্রকৃত সত্য কথা। তা হলো, স্ত্রীর সাথে সহবাসেও স্বামীকে বাধা দেয়া যাবেনা। স্বামীর কাছে প্রাপ্য মোহর থেকেও কেউ স্ত্রীকে বঞ্চিত করতে পারবেনা। স্ত্রী পছন্দ করুক বা না করুক, স্বামী তার সাথে সহবাস করতে পারবে এবং স্বামীর যা কিছু সম্পদ আছে, তা থেকেই স্ত্রীর মহর আদায় করা হবে, চাই তা স্বামীর পছন্দ হোক বা না হোক। রসূল সা.-এর পক্ষ থেকে এই মর্মে হাদিস বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, "প্রত্যেক হকদারকে তার হক দাও।"

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যেসব অবস্থায় সম্পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব

📄 যেসব অবস্থায় সম্পূর্ণ মোহর দেয়া ওয়াজিব


নিম্নে বর্ণিত অবস্থাগুলোর যে কোনোটি দেখা দিলেই সম্পূর্ণ মোহর দেয়া বাধ্যতামূলক:
১. যখন প্রকৃত অর্থে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যৌন মিলন ঘটে: কেননা আল্লাহ বলেছেন: "আর যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করতে ইচ্ছা করো এবং তাদের একজনকে প্রচুর অর্থও দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফেরত নিওনা। তোমরা কি তা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপাচারের মাধ্যমে ফেরত নেবে? কিভাবে তোমরা তা ফেরত নেবে? অথচ তোমরা পরস্পরে সংগম করেছ এবং সে নারীরা তোমাদের কাছ থেকে কঠোর অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে? (সূরা নিসা: আয়াত ২০, ২১)
২. স্বামী স্ত্রীর কোনো একজন যদি যৌন মিলনের পূর্বেই মারা যায়। এটা সর্বসম্মত মত।
৩. আবু হানিফার মতে, স্বামী যখন তার বধূর সাথে যৌন মিলন করা যায় এমন নিভৃত সাক্ষাতে মিলিত হয়, তখনই নির্ধারিত পুরো মোহর বধূর পাপ্য হয়ে যায়। এই নিভৃত সাক্ষাতকার দ্বারা উভয়ের এমন জায়গায় সাক্ষাৎ করা বুঝায় যেখানে তাদের উপস্থিতি কেউ টের পাবে না মর্মে উভয়ে নিশ্চিত থাকে। তাদের দু'জনের কেউ এমন অবস্থার শিকার থাকেনা যা শরিয়ত অনুযায়ী যৌন মিলনের অন্তরায়। যেমন কোনো একজন ফরয রোযা রেখেছে, অথবা মাসিক ঋতুস্রাব চলছে কিংবা এমন কোনো বাধা রয়েছে যা অতিক্রম করা কার্যত অসম্ভব। যেমন এমন কোনো রোগে আক্রান্ত যার কারণে বর্তমানে যৌন মিলন সম্ভব নয়। অথবা কোনো স্বাভাবিক বাধা বিদ্যমান, যেমন তাদের দুইজনের মাঝে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি। ইমাম আবু হানিফা তার মতের সপক্ষে যে প্রমাণ তুলে ধরেছেন তা হলো: আবু উবায়দা যায়েদ ইবনে আবি আওফা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের সিদ্ধান্ত ছিলো, যখন কক্ষের দরজা বন্ধ করা হয় এবং সতর খুলে ফেলা হয়। তখনই মোহর প্রাপ্য হয়ে যায়। ওয়াকী নাফে বিন জুবাইর থেকে বর্ণনা করেন: রসূল সা.-এর সাহাবিগণ বলতেন, যখন সতর খোলা হয় ও দরজা বন্ধ করা হয়, তখনই মোহর পাওনা হয়ে যায়।
তাছাড়া, তিনি এ যুক্তিও প্রদর্শন করেন, যেহেতু স্ত্রীর পক্ষ থেকে নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমর্পণ করা হয়েছে, সেহেতু এর বদলায় মোহর প্রাপ্য হবেই। ইমাম শাফেয়ী মালেক ও দাউদ এ মতের বিরোধিতা করে বলেন, সহবাস ব্যতিত পুরো মোহর প্রাপ্য হয়না।
তবে ইমাম মালেক বলেছেন, স্বামী যখন সংগমের উদ্যোগ নিয়ে স্ত্রীর উপর চড়াও হয় এবং স্ত্রী সহবাসের উপযুক্তভাবে শুয়ে পড়ে, তখন কার্যত সহবাস না করলেও মোহর প্রাপ্য হয়ে যায়।
সংগমের উপযুক্ত নিভৃত সাক্ষাতকার দ্বারা অর্ধেক মোহরের বেশি প্রাপ্য হয়না। কেননা আল্লাহ বলেছেন:
وَإِنْ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ وَقَدْ فَرَضْتُمْ لَهُنَّ فَرِيضَةٌ فَنِصْفُ مَا فَرَضْتُمْ .
"যদি তোমরা মোহর ধার্য করার পর স্ত্রীকে স্পর্শ করার আগে তালাক দাও, তবে যে মোহর তোমরা ধার্য করেছ তার অর্ধেক দিতে হবে।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৩৭)
অর্থাৎ স্পর্শের আগে তালাক দেয়া হলে ধার্যকৃত মোহরের অর্ধেক স্ত্রীর প্রাপ্য হবে। আর স্পর্শের অর্থ হলো প্রকৃত ও পূর্ণ যৌন মিলন। নিছক নিভৃতে সাক্ষাৎ করলেই যৌন মিলন হয়না। কাজেই সে ক্ষেত্রে পুরো মোহর প্রাপ্য হয়না।
শুরাইহ বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কোনো দরজা বা সতরের উল্লেখ করেছেন বলে আমি শুনিনি। স্বামী যদি দাবি করে, সে স্ত্রীকে স্পর্শ করেছে, তবে তাকে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। আর ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, যখন কোনো পুরুষের নিকট তার স্ত্রী আসে, অতপর সে স্ত্রীকে তালাক দেয় এবং দাবি করে, সে তাকে স্পর্শ করেনি, তখন তার উপর অর্ধেক মোহর ওয়াজিব হবে। আব্দুর রাজ্জাক ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, "স্ত্রীর সাথে সহবাস না করা পর্যন্ত পুরো মোহর স্বামীর নিকট প্রাপ্য হবেনা।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00