📄 প্রতিনিধি নিয়োগের অধিকার কার আছে আর কার নেই
সুস্থ মস্তিষ্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক, স্বাধীন মানুষ মাত্রেরই প্রতিনিধি নিয়োগের অধিকার রয়েছে। কেননা সে পূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন। যে ব্যক্তি যোগ্যতাসম্পন্ন, সে নিজেই নিজের বিয়ে সম্পন্ন করার অধিকারী। আর নিজের বিয়ে সম্পাদনের অধিকার যার রয়েছে, সে অন্যকে তার প্রতিনিধি নিয়োগেরও ক্ষমতা রাখে। [প্রতিনিধি নিয়োগের সময় উল্লিখিত শর্তসমূহ পূর্ণ হয়েছে কিনা, তা দেখতে হবে। হানাফি ফকীহগণ বলেন: অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক যদি ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য বুঝে তবে সে প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারে। অনুরূপ ক্রীতদাস প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারে।]
কিন্তু যার মোটেই যোগ্যতা নেই, কিংবা পূর্ণ যোগ্যতা নেই, সে অন্যকে প্রতিনিধি নিয়োগের অধিকারী নয়। যেমন শিশু ও বালক, পাগল ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। এদের কেউই নিজের বিয়ে নিজেই সম্পাদন করার যোগ্যতা রাখেনা। তাই তারা প্রতিনধি নিয়োগেরও অযোগ্য।
প্রাপ্ত বয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্ক মহিলার প্রতিনিধি নিয়োগ শুদ্ধ কিনা, তা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেননা তার নিজের বিয়ে নিজে সম্পাদনের যোগ্যতা নিয়েও তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফা বলেন: যেহেতু তার নিজের বিয়ে নিজে সম্পাদনের ক্ষমতা রয়েছে, তাই অন্যকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করার ক্ষমতাও তার রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের বক্তব্য হলো, তার ওলির ক্ষমতা রয়েছে। প্রতিনিধি নিযুক্ত না হয়েও তার বিয়ে সম্পাদন করতে পারে। তবে মহিলার সম্মতি অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। শাফেয়িদের কেউ কেউ বাবা ও দাদার সাথে অন্যান্য ওলির পার্থক্য করেছেন। তারা বলেছেন: বাবা ও দাদাকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন রয়েছে।
📄 নির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে ও অনির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে প্রতিনিধি নিয়োগ
উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ দু'ভাবে বৈধ: নির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে এবং অনির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে। নির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে প্রতিনিধি নিয়োগের অর্থ হলো, নির্দিষ্ট মহিলার সাথে, অথবা একটি নির্দিষ্ট পরিবারের মহিলার সাথে অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণের মোহরানার ভিত্তিতে বিয়ে করিয়ে দেয়ার জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করা। আর অনির্দিষ্ট কর্মসীমার মধ্যে প্রতিনিধি নিয়োগের অর্থ হলো, যে কোনো মহিলা বা যে কোনো পরিবারের মহিলা বা যে কোনো পরিমাণ মোহরানার ভিত্তিতে বিয়ে করিয়ে দেয়ার জন্য প্রতিনিধি নিযুক্ত করা। অনির্দিষ্ট কর্মসীমায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হলে ইমাম আবু হানিফার মতে, প্রতিনিধি কেবল নিজের মেয়ে বা নিজের অভিভাবকত্বের অধীনস্থ মেয়ে বা অনুরূপ এমন কোনো মেয়ে, যার জন্য তার অভিযোগের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন মেয়ে ব্যতিত অন্য যে কোনো মেয়ে, যে কোনো পরিবারের মেয়ে এবং যে কোনো পরিমাণ মোহরানার ভিত্তিতে বিয়ে করানোর ব্যাপারে স্বাধীন। সে যদি কোনো ত্রুটিযুক্ত মেয়ে, 'কুফু'বিহীন মেয়ে বা মোহরে মিছলের চেয়ে বেশি মোহরানার ভিত্তিতে বিয়ে করায়, তবে সে বিয়ে বৈধ হবে এবং তা অগ্রাহ্য করা যাবেনা। তবে প্রতিনিধি যদি নিজের মেয়ে, নিজের অভিভাবকত্বের অধীনস্থ মেয়ে বা এমন কোনো মেয়েকে বিয়ে করায়, যার জন্য তার উপর অভিযোগ আরোপিত হতে পারে, তবে তা প্রতিনিধি নিয়োগকারীর অনুমোদন সাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে। ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ বলেন: প্রতিনিধি বা উকিল যতোই অনির্দিষ্টভাবে নিযুক্ত হয়ে থাকুক, তাকে অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত, কুফুধারী ও মোহরে মিছল সহকারে বিয়ে করাতে হবে। তবে মোহরে মিছলের চেয়ে যদি সামান্য কিছু বেশি মোহরানা ধার্য করা হয়, যা সাধারণত লোকেরা মেনে নিতে অভ্যস্ত, তবে তাতে আপত্তির কিছু নেই। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদের যুক্তি হলো, যে ব্যক্তি কাউকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে, সে এজন্যই নিযুক্ত করে, যাতে সে তার জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর ও উপযোগী মেয়ে বাছাই করে দেবে। নির্দিষ্ট করে না দেয়ার অর্থ এ নয় যে, সে যে কোনো একটা মহিলা এনে দিলেই চলবে। কারণ প্রতিনিধি নিযুক্ত করা দ্বারা সাধারণভাবে এটাই ধারণা করা হয় যে, সে মোহরে মিছল সহকারেই একটা মেয়ে বাছাই করে দেবে। এই সাধারণ ধারণা অবশ্যই পূর্ণ ও কার্যকর হওয়া চাই। কারণ প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যা উপলব্ধি করা হয়, তা আরোপিত শর্ত হিসেবেই মান্য করা জরুরি। এই মতটির উপর নির্ভর করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। পক্ষান্তরে নির্দিষ্ট কর্মসীমায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হলে সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করা বৈধ হবেনা। তবে ব্যতিক্রমের ফলে যদি উৎকৃষ্টতার কিছু পাওয়া যায়, তাহলে তা বৈধ। যেমন যে মহিলাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, প্রতিনধির বাছাই করা মহিলা তার চেয়ে সুন্দরী, অথবা প্রতিনিধির বাছাই করা মহিলার মোহরানা তার নির্ধারিত মোহরানার চেয়ে কম। কিন্তু ব্যতিক্রম যদি নির্দিষ্টকৃত অপেক্ষা উৎকৃষ্ট না হয়, তাহলেও আব্দ শুদ্ধ হবে। কিন্তু প্রতিনিধি নিয়োগকারীর জন্য তা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক থাকবেনা। ইচ্ছা করলে সে গ্রহণ করবে, নচেত প্রত্যাখ্যান করবে।
হানাফি ফকীহগণ বলেছেন: প্রতিনিধি নিয়োগকারী যদি মহিলা হয়, তবে সে কোনো নির্দিষ্ট পুরুষের সাথে ও নির্দিষ্ট মোহরানায় বিয়ে সম্পাদনের আদেশ দিলে তার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হওয়া জরুরি। আর যদি অনিষ্টভাবে যে কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে সম্পন্ন করার আদেশ দেয় এবং প্রতিনিধি নিজের সাথে নিজের পিতা বা পুত্রের সাথে তার বিয়ে সম্পাদন করে, তবে মহিলার অনুমোদন ব্যতিরেকে আব্দ কার্যকর হবেনা। কেননা, এখানে অভিযোগ বা অপবাদের সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি অপর কোনো কুফুধারী পুরুষের সাথে এবং মোহরে মিছল সহকারে বিয়ে দেয়, তাহলে আব্দ কার্যকর ও তা মেনে নেয়া বাধ্যতামূলক হবে, মহিলা বা তার ওলি তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকারী হবেনা। আর যদি পুরুষ কুফুধারী হয় কিন্তু মোহরানা মোহরে মিছলের চেয়ে অতিমাত্রায় কম হয়, তবে আব্দ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকরী হবেনা, বরং মহিলার ও তার ওলির অনুমতি পাওয়া পর্যন্ত মওকুফ তথা স্থগিত থাকবে। কেননা এর সাথে মহিলা ও তার ওলি উভয়ের প্রাপ্য জড়িত। আর যদি স্বামী কুফুহীন হয়, তবে আব্দ বাতিল হবে, চাই মোহরানা মোহরে মিছলের সমান, বেশি বা কম হোক। এখানে অনুমতি দিলেও লাভ নেই। কেননা, যে আব্দ মওকুফ থাকে তাতে অনুমতি কার্যকর হয়। যে আব্দ বাতিল, তাতে অনুমতি কার্যকর হয়না।
📄 বিয়েতে নিযুক্ত উকিল একাধারে নিয়োগকারীর দূত ও মনোবাঞ্ছা ব্যক্তকারী
অন্যান্য চুক্তির উকিলের সাথে বিয়ের উকিলের অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিয়ের উকিল নিয়োগকর্তার দূত ও মনোবাঞ্ছা ব্যক্তকারী মাত্র। কাজেই আকদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাপ্যাদির সাথে তার কোনো সংশ্রব নেই। তাই সে মোহorana আদায় করে দিতে বাধ্য নয়। [তবে যদি মোহরানা আদায় করে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকে, তাহলে আদায় করে দিতে বাধ্য। তবে এটা উকিল বা প্রতিনিধি হিসেবে তার দায়িত্ব নয়। এটা একটা স্বতন্ত্র দায়িত্ব।] সে যখন স্ত্রীর উকিল, তখন স্ত্রীকে স্বামীর অনুগত করে দেয়ার দায়িত্বও তার উপর আরোপিত হয়না। সে স্ত্রীর উকিল হলে স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর পক্ষে মোহরানা গ্রহণ করতেও পারবেনা। তবে স্ত্রী অনুমতি দিলে একটা অতিরিক্ত কাজ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে। এটা বিয়ের উকিল হিসেবে তার অতিরিক্ত কাজ। বিয়ের উকিল হিসেবে তার কাজ আব্দ সম্পাদন করার মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়।