📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওলির ক্ষমতা

📄 ওলির ক্ষমতা


ভালোমন্দ বাছবিচারে অক্ষম অধীনস্থ ব্যক্তি, যথা পাগল ও বালক বালিকা এবং ভালোমন্দ বাছবিচারে আংশিক অক্ষম বালক বালিকা বা নির্বোধ অধীনস্থ ব্যক্তির উপর ওলির নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকার অর্থ হলো, অধীনস্থের সম্মতি ছাড়াই তাকে বিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ওলির রয়েছে। সে সম্মতি না দিলেও এই বিয়ে বৈধ ও কার্যকর হবে। শরিয়ত ওলিকে এই ক্ষমতা দিয়েছে অধীনস্থের কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কেননা সে তার অযোগ্যতা বা অপরিপক্কতার কারণে নিজের কল্যাণ অকল্যাণ বুঝতে পারেনা। সে যেসব চুক্তি সম্পাদন করবে বা যেসব কাজ করবে, তাতে কিভাবে তার স্বার্থরক্ষা হবে, তা বুঝবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা তার নেই তার অপ্রাপ্ত বয়স্কতা, পাগলামি বা নির্বুদ্ধিতার কারণে। এজন্য এসব অযোগ্য বা আংশিক অযোগ্যদের যাবতীয় কাজের ক্ষমতা তাদের ওলির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। উক্ত দুই শ্রেণী, অযোগ্য ও আংশিক অযোগ্যদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এই যে, অযোগ্য ব্যক্তি কোনো বিয়ের আক্দ সম্পন্ন করলে সে আক্দ বাতিল হয়ে যাবে। কেননা তার ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা নেই। অথচ এই ক্ষমতাটাই যে কোনো চুক্তি সম্পাদনের যোগ্যতার ভিত্তি ও মূল উপাদান। পক্ষান্তরে আংশিক অযোগ্য ব্যক্তি যখন বিয়ের আক্দ সম্পাদন করবে, তখন সে আক্দ যদি সকল শর্ত পূরণ করে সম্পাদন করা হয়ে থাকে, তবে তা শুদ্ধ হবে, তবে তার কার্যকারিতা ওলির অনুমতির উপর নির্ভরশীল থাকবে। সে চাইলে তা অনুমোদন করবে, নচেত বাতিল করে দেবে। হানাফিদের মতে, এ ধরনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র পিতৃকূলীয় ওলির থাকবে অধীনস্থ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক-বালিকা, পাগল ও নির্বোধ ব্যক্তির উপর। কিন্তু হানাফি ব্যতিত অন্যান্য মাযহাবের ফকিহদের মতে, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে এবং পাগল ও নির্বোধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তারা এ ব্যাপারে একমত যে, পাগল, ও নির্বোধের ওলি হওয়ার যোগ্যতা পিতা, পিতামহ, ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শাসকের রয়েছে। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালক ও বালিকার ওলি হওয়ার যোগ্যতা কার কার রয়েছে, সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ বলেছেন: এ যোগ্যতা শুধু পিতা ও ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তির রয়েছে, আর কারো নেই। ইমাম শাফেয়ির মতে, এটা রয়েছে পিতা ও পিতামহের।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওলি কাউকে অভিভাবকত্বে বিয়ে করা বৈধ

📄 ওলি কাউকে অভিভাবকত্বে বিয়ে করা বৈধ


কোনো ব্যক্তি তার অধীনস্থ মহিলাকে অন্য কোনো ওলির মুখাপেক্ষি হওয়া ছাড়াই সরাসরি বিয়ে করতে পারে, যদি উক্ত মহিলা তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণে সম্মত হয়। কেননা উম্মে হাকিম বিনতে কারেয আব্দুর রহমান বিন আওফকে বলেছিলেন: আমাকে বিয়ে করার জন্য একাধিক ব্যক্তি প্রস্তাব দিয়েছে। আপনি তাদের মধ্য হতে যাকে ভালো মনে করেন তার সাথে আমাকে বিয়ে দিন। আব্দুর রহমান বিন আওফ বললেন: তুমি আমাকে এই ক্ষমতা দিচ্ছো? সে বললো: হ্যাঁ। তিনি বললেন: আমিই তোমাকে বিয়ে করলাম।
ইমাম মালেক বলেছেন: কোনো অকুমারী যদি তার ওলিকে বলে, আপনি যাকে ভালো মনে করেন, তার সাথে আমাকে বিয়ে দিন। এরপর ওলি যদি তাকে নিজের সাথে বা অন্য কোনো মনোনীত ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেয়, তবে সেই বিয়ে মেনে নেয়া উক্ত মহিলার জন্য বাধ্যতামূলক হবে, চাই সে নির্দিষ্টভাবে নাই জানুক কে তার স্বামী। এটাই হানাফি মাযহাব, লায়েস, সাওরি ও আওযায়ির অভিমত। ইমাম শাফেয়ি ও দাউদ বলেন: ওলির সাথে বিয়ে সম্পাদন করতে হলে শাসক, অন্য কোনো ওলি বা তার চেয়ে দূরবর্তী কোনো ব্যক্তির তা করতে হবে। কেননা বিয়েতে একজন ওলি থাকা শর্ত। যিনি বিয়ে করবেন, তিনিই বিয়ের ওলি বা ব্যবস্থাপক হতে পারেননা। কিন্তু ইবনে হাযম শাফেয়ির উক্ত মতের বিরোধিতা করে তার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. সফিয়াকে মুক্ত করে তাকে বিয়ে করেন এবং তার মুক্তিকে তার মোহরানা গণ্য করেন। রসূল সা. তার অধীনস্থ মহিলাকে নিজেই বিয়ে করে নিলেন, এটাই সকলের জন্য অকাট্য প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ مَا إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা স্বামীহীনা এবং তোমাদের দাসদাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য, তাদেরকে বিয়ে করাও। তারা যদি অভাবী হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ নিজ মহানুভবতা দ্বারা তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ তো সুপ্রশস্ত ও মহাজ্ঞানী।" (সূরা নূর: আয়াত ৩২)
এখন যে ব্যক্তি কোনো স্বামীহীনাকে তার সম্মতিক্রমে নিজেই বিয়ে করলো, সে তো আল্লাহর আদেশ অনুযায়ীই কাজ করলো। আল্লাহ তো বলেননি, কোনো স্বামীহীনাকে যে বিয়ে করায়, সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে পারবেনা। কাজেই এটা শুদ্ধ ও কার্যকর।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওলির অনুপস্থিতি

📄 ওলির অনুপস্থিতি


ওলি হওয়ার যাবতীয় শর্ত ও যোগ্যতার আধিকারী ওলি যখন উপস্থিত থাকে, তখন তার চেয়ে দূরবর্তী ব্যক্তি ওলি হওয়ার যোগ্য গণ্য হবেনা। যেমন পিতা যদি উপস্থিত থাকে তবে ভাই বা চাচা প্রভৃতি ওলি হতে পারবেনা। উক্ত ভাই বা চাচা যদি পিতার অনুমতি ছাড়া কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্কা বা অনুরূপ অধীনস্থ মেয়ের বিয়ে সম্পাদন করে, তবে অনুমতির উপর এ বিয়ে মওকুফ থাকবে। কিন্তু যদি নিকটতম ওলি অনুপস্থিত থাকে এবং বিয়ের সুযোগ্য ও কুফুসম্পন্ন প্রস্তাবক তার মত জানার অপেক্ষা করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে অভিভাবকত্ব তার পরবর্তী ব্যক্তির নিকট স্থানান্তরিত হবে, যাতে একজন মহিলার স্বার্থহানি না ঘটে। অতপর অনুপস্থিত ওলি ফিরে এসে তার পরবর্তী ওলি কর্তৃক সম্পাদিত বিয়েতে আপত্তি তোলার অধিকারী হবে না। কেননা সে তার অনুপস্থিতির কারণে অস্তিত্বহীন বিবেচিত হবে এবং তার পরবর্তী ব্যক্তিই ন্যায্য ওলি গণ্য হবে। এটা হানাফি মাযহাবের মত। কিন্তু শাফেয়ি বলেন: নিকটতম ওলি উপস্থিত থাকতে দূরবর্তী ওলি বিয়ে সম্পাদন করলে সে বিয়ে বাতিল। আর যখন নিকটতম ওলি অনুপস্থিত থাকবে, তখন পরবর্তী ব্যক্তি তার বিয়ে সম্পাদন করতে পারবেনা। তখন বিয়ে সম্পাদন করবে বিচারক।
বিদায়াতুল মুজতাহিদ গ্রন্থে বলা হয়েছে : এ বিষয়ে ইমাম মালেক বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। এরপর বলেছেন, নিকটতম ব্যক্তির উপস্থিতিতে দূরবর্তী ব্যক্তি বিয়ে সম্পাদন করলে বিয়ে বাতিল হবে। আবার অন্য সময় বলেছেন : বিয়ে বৈধ। অন্য একবার বলেছেন : নিকটতর ওলি এ বিয়ে অনুমোদনও করতে পারবে, বাতিলও করতে পারবে। তবে এই বিভিন্নতা পিতা কর্তৃক কুমারী কন্যার ও ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি কর্তৃক পালিত কন্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা এ ক্ষেত্রে তার এই বক্তব্য বহাল থাকবে যে, বিয়ে বাতিল হবে। অর্থাৎ পিতা ছাড়া আর কেউ কুমারী কন্যার বিয়ে পিতার উপস্থিতিতেই সম্পাদন করলে কিংবা ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে অন্য কেউ পালিত কন্যার বিয়ে সম্পাদন করলে সে বিয়ে বাতিল হবে। ইমাম মালেক আবু হানিফার এই মত সমর্থন করেন যে, নিকটতর ওলির অনুপস্থিতিতে দূরবর্তী ওলির নিকট অভিভাবকত্ব স্থানান্তরিত হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নিকট আত্মীয় ওলি অনুপস্থিত থাকলে তিনি দূরের আত্মীয় ওলির মতো

📄 নিকট আত্মীয় ওলি অনুপস্থিত থাকলে তিনি দূরের আত্মীয় ওলির মতো


আল-মুগনীতে বলা হয়েছে : যখন নিকটাত্মীয় ওলি আটক বা বন্দী থাকে যেখানে তার মতামত গ্রহণ করা সম্ভব হয়না, তখন তিনি দূরের আত্মীয় ওলির মতো গণ্য হবেন। কেননা দূরত্ব কেবল তার ব্যক্তিগত অবস্থানের কারণে বিবেচিত হয়নি, বরং তার তদারকীতে বিয় সম্পাদন অসম্ভব হওয়ার কারণে বিবেচিত হয়েছে। এখানে এই শেষোক্ত কারণই বিদ্যমান। তাই যখন জানা যাবেনা ওলি নিকটাত্মীয়, না দূরের আত্মীয়, অথবা নিকটাত্মীয় কিন্তু তার অবস্থান জানা যায়না, তখন তিনি দূরের আত্মীয় গণ্য হবেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00