📄 বিয়ের আগে কনের অনুমতি নেয়া জরুরি
কনের অভিভাবকত্ব নিয়ে যতো রকম মতামতই থাক, তার মতামত নিয়ে বিয়ের আয়োজন শুরু করা এবং আকদের আগে তার সম্মতি নেয়া ওলির জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ বিয়ে হচ্ছে পুরুষ ও স্ত্রীর মাঝে একটা স্থায়ী সহাবস্থান ও যৌথ জীবন যাপনের নাম। কনের সম্মতি জ্ঞাত না হওয়া পর্যন্ত দু'জনের মধ্যে টেকসই ভালোবাসা, সমন্বয় ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি হতে পারেনা। এজন্য শরিয়ত কনেকে বিয়েতে বাধ্য করতে নিষেধ করেছে, চাই সে কুমারী হোক বা অকুমারী। যে বিয়েতে কনের মত নেই, সে বিয়ে জোরপূর্বক সম্পাদন করা জায়েয নয়। তার অনুমতি ব্যতিত তার উপর আব্দ চাপিয়ে দেয়া অবৈধ। কোনো ওলি বলপূর্বক এ ধরনের আব্দ চাপিয়ে দিলে তা বাতিল করার দাবি জানানোর অধিকার কনের রয়েছে। এর প্রমাণ নিম্নরূপ:
১. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “অকুমারী মেয়ে নিজের বিয়ের ব্যাপারে তার ওলির চেয়ে অধিক ক্ষমতার অধিকারী। আর কুমারীর বিয়ের জন্য তার অনুমতি নিতে হবে। কুমারী মেয়ের নিরবতাই তার অনুমতি।" -বুখারি ব্যতিত সকল সহিহ হাদিস গ্রন্থ। "অকুমারী মেয়ে নিজের বিয়ের ব্যাপারে তার ওলির চেয়ে অধিক ক্ষমতার অধিকারী" অর্থাৎ তার সম্মতি ব্যতিরেকে ওলি তার বিয়ে সম্পাদন করতে পারবে না এই বিষয়ে তার ক্ষমতা অকুমারীর তুলনায় বেশি। আর "কুমারীর নিরবতাই তার অনুমতি” এর অর্থ হলো, সে যদি কিছুই না বলে, তাহলে বুঝতে হবে সে সম্মতি দিয়েছে। আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ীর অপর এক বর্ণনায় রয়েছে: "কুমারী মেয়ের পিতা তার মতামত গ্রহণ করবে।" অর্থাৎ আকদের আগে তার সম্মতি গ্রহণ করতে হবে।
২. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "বিধবা বা স্বামীহারাকে তার সুস্পষ্ট সম্মতি ও কুমারীকে তার অনুমতি ব্যতিত বিয়ে দেয়া যাবেনা।” লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো: হে রসূলুল্লাহ, কিভাবে কুমারীর অনুমতি নেয়া হবে। তিন বললেন: তার নিরবতাই অনুমতি।” বিধবা বা স্বামীহারার সুস্পষ্ট উচ্চারিত বা অন্য কোনোভাবে ব্যক্ত সম্মতি অপরিহার্য।
৩. হাসনা বিনতে খাদ্দাম রা. থেকে বর্ণিত: তার পিতা তাকে তার অমতে বিয়ে দিয়েছিল। অথচ তিনি ছিলেন অকুমারী। অতপর তিনি রসূল সা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন। ফলে রসূল সা. তার বিয়ে বাতিল করে দিলেন। -মুসলিম ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
৪. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: জনৈকা কুমারী দাসী রসূল সা.-এর নিকট এসে জানালো, তার পিতা তার অসম্মতি সত্ত্বেও তাকে বিয়ে দিয়েছে। রসূল সা. তাকে বিয়ে বাতিল করা বা বহাল রাখার স্বাধীনতা দিলেন। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারু কুতনি।
৫. আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট জনৈকা যুবতী এসে জানালো, তার পিতা তাকে তার ভাতিজার সাথে বিয়ে দিয়েছেন, যাতে আমার দ্বারা তার বদ স্বভাব দূর হয়ে যায়। রসূল সা. তাকে তার বিয়ের ব্যাপারে স্বাধীনতা দিলেন। সে বললো: আমি আমার পিতা যা করেছেন, তা মেনে নিয়েছি। তবে মহিলাদেরকে জানাতে চাই, এ ব্যাপারে পিতার কোনো কর্তৃত্ব নেই।” -ইবনে মাজাহ।
📄 অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিয়েতে অভিভাবকত্ব
এতোক্ষণ যা কিছু আলোচিত হলো, তা ছিলো প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ে সংক্রান্ত। এক্ষণে অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিষয়ে আলোচনা করা যাচ্ছে।
যেহেতু অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের মতামত থাকেনা, সে বাবা বা দাদা দ্বারা লালিত পালিত হয় ও তাদের হেফাজতে থাকে, তাই তার অনুমতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেয়া বৈধ। আবু বকর সিদ্দিক রা. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.কে বালিকা বয়সে তার অনুমতি ছাড়াই রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা তখন তার যে বয়স ছিলো, তাতে তার মতামত বিবেচনার যোগ্য ছিলনা। অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর যখন সে বয়োপ্রাপ্ত হয়, তখন সে ঐ বিয়ে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। শাফেয়ী মাযহাবে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার আগে ও অনুমতি ছাড়া বিয়ে না দেয়াকে মুস্তাহাব মনে করা হয়, যাতে সে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাম্পত্য বন্দীদশায় নিক্ষিপ্ত না হয়। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, বাবা, দাদা প্রভৃতি ওলির পক্ষে অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েকে বিয়ে দেয়া জায়েয নেই এবং বিয়ে দিলে তা শুদ্ধ হবেনা। আবু হানিফা, আওয়াযি ও প্রাচীন ইমামদের একটি দল বলেন, সকল ওলির পক্ষেই এটা জায়েয, তবে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পর মেয়ের স্বাধীনতা থাকবে বিয়ে বাতিল করা বা বহাল রাখার। কেননা রসূলুল্লাহ সা. হামযার মেয়ে উমামাকে অপ্রাপ্ত বয়স্কা অবস্থায় বিয়ে দিয়েছিলেন এবং বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার স্বাধীনতা থাকবে বলেও জানিয়ে দিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে নিজের আত্মীয় হিসেবে এবং তার অভিভাবক হিসেবে বিয়ে দিয়েছিলেন। নারী হিসেবে বিয়ে দেননি। নারী হিসেবে যদি বিয়ে দিতেন, তাহলে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পরও উমামা বিয়ে বাতিল করার অধিকারী হতোনা। কারণ আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولَهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِ
"আল্লাহ ও তার রসূল যখন কোনো ব্যাপারে ফায়সালা করেন, তখন কোনো মুমিন নারী কিংবা পুরুষের তাদের নিজস্ব ব্যাপারে কোনো স্বাধীনতা থাকেনা।" (সূরা আহযাব: ৩৬) সাহাবিদের মধ্য হতে উমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা এই মত অবলম্বন করেছেন।
📄 ওলির ক্ষমতা
ভালোমন্দ বাছবিচারে অক্ষম অধীনস্থ ব্যক্তি, যথা পাগল ও বালক বালিকা এবং ভালোমন্দ বাছবিচারে আংশিক অক্ষম বালক বালিকা বা নির্বোধ অধীনস্থ ব্যক্তির উপর ওলির নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকার অর্থ হলো, অধীনস্থের সম্মতি ছাড়াই তাকে বিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ওলির রয়েছে। সে সম্মতি না দিলেও এই বিয়ে বৈধ ও কার্যকর হবে। শরিয়ত ওলিকে এই ক্ষমতা দিয়েছে অধীনস্থের কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কেননা সে তার অযোগ্যতা বা অপরিপক্কতার কারণে নিজের কল্যাণ অকল্যাণ বুঝতে পারেনা। সে যেসব চুক্তি সম্পাদন করবে বা যেসব কাজ করবে, তাতে কিভাবে তার স্বার্থরক্ষা হবে, তা বুঝবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা তার নেই তার অপ্রাপ্ত বয়স্কতা, পাগলামি বা নির্বুদ্ধিতার কারণে। এজন্য এসব অযোগ্য বা আংশিক অযোগ্যদের যাবতীয় কাজের ক্ষমতা তাদের ওলির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। উক্ত দুই শ্রেণী, অযোগ্য ও আংশিক অযোগ্যদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এই যে, অযোগ্য ব্যক্তি কোনো বিয়ের আক্দ সম্পন্ন করলে সে আক্দ বাতিল হয়ে যাবে। কেননা তার ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা নেই। অথচ এই ক্ষমতাটাই যে কোনো চুক্তি সম্পাদনের যোগ্যতার ভিত্তি ও মূল উপাদান। পক্ষান্তরে আংশিক অযোগ্য ব্যক্তি যখন বিয়ের আক্দ সম্পাদন করবে, তখন সে আক্দ যদি সকল শর্ত পূরণ করে সম্পাদন করা হয়ে থাকে, তবে তা শুদ্ধ হবে, তবে তার কার্যকারিতা ওলির অনুমতির উপর নির্ভরশীল থাকবে। সে চাইলে তা অনুমোদন করবে, নচেত বাতিল করে দেবে। হানাফিদের মতে, এ ধরনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র পিতৃকূলীয় ওলির থাকবে অধীনস্থ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক-বালিকা, পাগল ও নির্বোধ ব্যক্তির উপর। কিন্তু হানাফি ব্যতিত অন্যান্য মাযহাবের ফকিহদের মতে, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে এবং পাগল ও নির্বোধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তারা এ ব্যাপারে একমত যে, পাগল, ও নির্বোধের ওলি হওয়ার যোগ্যতা পিতা, পিতামহ, ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শাসকের রয়েছে। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালক ও বালিকার ওলি হওয়ার যোগ্যতা কার কার রয়েছে, সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ বলেছেন: এ যোগ্যতা শুধু পিতা ও ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তির রয়েছে, আর কারো নেই। ইমাম শাফেয়ির মতে, এটা রয়েছে পিতা ও পিতামহের।
📄 ওলি কাউকে অভিভাবকত্বে বিয়ে করা বৈধ
কোনো ব্যক্তি তার অধীনস্থ মহিলাকে অন্য কোনো ওলির মুখাপেক্ষি হওয়া ছাড়াই সরাসরি বিয়ে করতে পারে, যদি উক্ত মহিলা তাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণে সম্মত হয়। কেননা উম্মে হাকিম বিনতে কারেয আব্দুর রহমান বিন আওফকে বলেছিলেন: আমাকে বিয়ে করার জন্য একাধিক ব্যক্তি প্রস্তাব দিয়েছে। আপনি তাদের মধ্য হতে যাকে ভালো মনে করেন তার সাথে আমাকে বিয়ে দিন। আব্দুর রহমান বিন আওফ বললেন: তুমি আমাকে এই ক্ষমতা দিচ্ছো? সে বললো: হ্যাঁ। তিনি বললেন: আমিই তোমাকে বিয়ে করলাম।
ইমাম মালেক বলেছেন: কোনো অকুমারী যদি তার ওলিকে বলে, আপনি যাকে ভালো মনে করেন, তার সাথে আমাকে বিয়ে দিন। এরপর ওলি যদি তাকে নিজের সাথে বা অন্য কোনো মনোনীত ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেয়, তবে সেই বিয়ে মেনে নেয়া উক্ত মহিলার জন্য বাধ্যতামূলক হবে, চাই সে নির্দিষ্টভাবে নাই জানুক কে তার স্বামী। এটাই হানাফি মাযহাব, লায়েস, সাওরি ও আওযায়ির অভিমত। ইমাম শাফেয়ি ও দাউদ বলেন: ওলির সাথে বিয়ে সম্পাদন করতে হলে শাসক, অন্য কোনো ওলি বা তার চেয়ে দূরবর্তী কোনো ব্যক্তির তা করতে হবে। কেননা বিয়েতে একজন ওলি থাকা শর্ত। যিনি বিয়ে করবেন, তিনিই বিয়ের ওলি বা ব্যবস্থাপক হতে পারেননা। কিন্তু ইবনে হাযম শাফেয়ির উক্ত মতের বিরোধিতা করে তার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. সফিয়াকে মুক্ত করে তাকে বিয়ে করেন এবং তার মুক্তিকে তার মোহরানা গণ্য করেন। রসূল সা. তার অধীনস্থ মহিলাকে নিজেই বিয়ে করে নিলেন, এটাই সকলের জন্য অকাট্য প্রমাণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَانْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ مَا إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
অর্থ: তোমাদের মধ্যে যারা স্বামীহীনা এবং তোমাদের দাসদাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য, তাদেরকে বিয়ে করাও। তারা যদি অভাবী হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ নিজ মহানুভবতা দ্বারা তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ তো সুপ্রশস্ত ও মহাজ্ঞানী।" (সূরা নূর: আয়াত ৩২)
এখন যে ব্যক্তি কোনো স্বামীহীনাকে তার সম্মতিক্রমে নিজেই বিয়ে করলো, সে তো আল্লাহর আদেশ অনুযায়ীই কাজ করলো। আল্লাহ তো বলেননি, কোনো স্বামীহীনাকে যে বিয়ে করায়, সে নিজেই তাকে বিয়ে করতে পারবেনা। কাজেই এটা শুদ্ধ ও কার্যকর।