📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর স্ব-অভিভাবকত্ব

📄 বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর স্ব-অভিভাবকত্ব


বহু সংখ্যক আলেম মত ব্যক্ত করেছেন যে, নারী নিজে নিজেকেও বিয়ে দিতে পারেনা, অন্যকেও নয়। তার কর্তৃত্বে বিয়ের চুক্তি সম্পাদিত হয়না। কেননা অভিভাবক থাকা বিয়ের বিশুদ্ধতার জন্য শর্ত। অন্য কথায় বলা যায়, অভিভাবকই বিয়ের চুক্তি সম্পাদনকারী। এর সপক্ষে নিম্নোক্ত প্রমাণগুলো উপস্থাপন করা হয়:
১. সূরা নূরের ৩২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَأَمَائِكُمْ .
"তোমরা তোমাদের মধ্যকার বিবাহহীনদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ ও যোগ্য তাদেরও।" (সূরা নূর: আয়াত ৩২)
২. সূরা বাকারার ২২২ নং আয়াতে বলা হয়েছে: 'মুশরিক পুরুষদের সাথে তোমরা তোমাদের মেয়েদেরকে বিয়ে দিওনা, যতোক্ষণ না তারা ঈমান আনে।" এ দু'টি আয়াত থেকে প্রমাণ দর্শানো হয়েছে এভাবে যে, আল্লাহ তায়ালা বিয়ে দেয়ার আদেশটি পুরুষদেরকে সম্বোধন করে দিয়েছেন, মহিলাদেরকে নয়। অন্য কথায় শেষোক্ত আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এ রকম: হে পুরুষ অভিভাবকগণ, তোমরা তোমাদের অধীনস্থ নারীদেরকে মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দিওনা।"
৩. আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: অভিভাবক ব্যতিত বিয়ে হবেনা। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে হিব্বান, হাকেম।
হাদিসটিতে “বিয়ে হবেনা” একথার অর্থ হলো, বিয়ে শুদ্ধ হবেনা। কাজেই অভিভাবক বা ওলি ব্যতিত সম্পাদিত বিয়ে বাতিল গণ্য হবে।
৪. বুখারি হাসান থেকে বর্ণনা করেছেন: মা'কাল বিন ইয়াসার বলেছেন: সূরা বাকারার ২৩২ নং আয়াত তার সম্পর্কেই নাযিল হয়েছে। তিনি বলেন: আমি আমার এক বোনকে এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিয়েছিলাম। পরে সে তাকে তালাক দিল (অর্থাৎ দুই তালাক)। তারপর ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর পুনরায় তাকে বিয়ে করার জন্য এসে প্রস্তাব দিল। আমি তাকে বললাম: আমি তোমাকে বিয়ে করালাম, তোমার বাসস্থান প্রস্তুত করে দিলাম এবং তোমাকে সম্মানের সাথে প্রতিষ্ঠিত করলাম, তারপরও তুমি আমার বোনকে তালাক দিলে। এখন আবার তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব নিয়ে এসেছ। না, আল্লাহর কসম, তুমি আর কখনো তাকে ফিরে পাবেনা। আসলে লোকটি মন্দ ছিলনা। বোনটিও তার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছুক ছিলো। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাযিল করলেন। ইদ্দত পূর্ণ হবার পর তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদেরকে তাদের স্বামীর সাথে পুনবিবাহে বাধা দিওনা। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ, (যেহেতু আল্লাহ এ ধরণের বিয়েতে বাধা দিতে নিষেধ করেছেন, তাই) এখন আমি বিয়ে দেব। তারপর তাকে তার সাথে পুনরায় বিয়ে দিলাম।
হাফেয ইবনে হাজার ফাতহুল বারীতে বলেছেন: উল্লিখিত আয়াতে নাযিল হওয়ার উক্ত কারণই এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। এখানেই অভিভাবকের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার সবচেয়ে অকাট্য ও সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। নচেত ভাইয়ের বাধা দেয়ার কোনো অর্থ থাকতোনা। আর বোনটির যদি নিজের বিয়ে করার বৈধতা থাকতো তাহলে সে তার ভাই এর মুখাপেক্ষী হতোনা। যে ব্যক্তি নিজের কাজে স্বনির্ভর, তার সম্পর্কে একথা খাটেনা যে, অমুক তাকে তার কাজে বাধা দিয়েছে।
৫. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে মহিলা নিজের অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল, তার বিয়ে বাতিল। এভাবে বিয়ে সম্পাদিত হওয়ার পর স্বামী যদি তার সাথে সহবাস করে, তবে তার সাথে যৌন সম্ভোগ করার কারণে সে মোহরানার অধিকারী হবে। আর যদি তার কোনো নির্দিষ্ট অভিভাবক না থাকে এবং সবাই তাকে বিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকে, তাহলে অভিভাবকহীনের জন্য শাসকই অভিভাবক।" আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী। কুরতুবি বলেছেন, এ হাদিসটি বিশুদ্ধ। এ হাদিস উম্মুল মুমিনীন আয়েশা, উম্মে সালামা, ও যয়নব থেকেও বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে বলে হাকেম উল্লেখ করেছেন। ইবনুল মুনযির বলেছেন: এ হাদিসের বিপক্ষে কিছু পাওয়া যায়নি।
৬. ফকীহগণ যুক্তি প্রদর্শন করে বলেছেন: বিয়ের একাধিক উদ্দেশ্য রয়েছে। মহিলারা প্রায়ই ভাবাবেগ দ্বারা চালিত হয়। ফলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনা। তাই তারা বিয়ের উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করতে পারেনা। এজন্যই তাদেরকে আকদ সম্পাদন করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং এ কাজটি তার অভিভাবকের নিকট সমর্পণ করা হয়েছে, যাতে বিয়ের যাবতীয় উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জিত হয়।
তিরমিযি বলেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব, আলী ইবনে আবি তালেব, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা, ইবনে উমর, ইবনে মাসউদ ও আয়েশা রা. প্রমুখ বিজ্ঞ সাহাবির মতে, অভিভাবক ব্যতিত বিয়ে হবেনা- রসূল সা.-এর এই হাদিস অনুসারেই আমল হবে। তাবেয়িদের মধ্য হতে, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, হাসান বসরি, শুরাইহ, ইবরাহিম নাখয়ি ও উমর ইবনে আব্দুল আযিয প্রমুখেরও মত এটাই। এ মত সুফিয়ান সাওরি, আওযায়ি, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, শাফেয়ি, ইবনে শাবraমা, আহমদ, ইসহাক, ইবনে হাযম, ইবনে আবি লায়লা, তাবারি ও আবু সাওরও সমর্থন করেন।
তাবারি বলেছেন: হাফসা যখন স্বামীহীনা হলেন, তার পিতা উমর রা. তার বিয়ে সম্পাদন করলেন, হাফসা নিজে করলেননা। এ থেকেই জানা যায়, নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম প্রাপ্ত বয়স্কা মহিলার অভিভাবক ছাড়াই নিজের বিয়ে সম্পাদনের অধিকার রয়েছে একথা ভুল। যদি এ অধিকার কোনো মহিলার থাকতো, তবে রসূলুল্লাহ সা. হাফসার বিয়ের প্রস্তাব তার কাছে দেয়া থেকে বিরত থাকতেননা। কেননা হাফসা রা. তার নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে তার পিতার চেয়ে অধিকতর যোগ্য ও অগ্রগণ্যা ছিলেন।
আবু হানিফা ও আবু ইউসুফের মতে, প্রাপ্ত বয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কের মহিলা কুমারী হোক বা অ-কুমারী হোক, নিজের বিয়ে নিজেই সম্পাদন করতে পারে। তবে অভিভাবকের উপর এ কাজ সমর্পণ করা মুস্তাহাব, যাতে এক দল অপরিচিত পুরুষের মাঝে বিয়ের চুক্তি সম্পাদন করতে গিয়ে তাকে বিব্রত ও লজ্জিত না হতে হয়।
মহিলার অভিভাবক যদি তার উত্তরাধিকারী হয় তবে তার বিয়ে সম্পাদনে আপত্তি উত্থাপনের অধিকার অভিভাবকের কেবল তখনই থাকবে, যখন সে কোনো 'কুফু'হীন (অসম) পুরুষের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে চাইবে এবং তার মোহরানা 'মোহরে মিছল' এর চেয়ে কম হবে। আর যদি সে 'কুফু'হীন পুরুষের সাথে নিজের বিয়ে সম্পাদন করে এবং তাতে তার ওলি বা অভিভাবকের অনুমতি না থাকে, তাহলে আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ থেকে যে মত বর্ণিত হয়েছে তা হলো, তার বিয়ে শুদ্ধ হবেনা। এই মত অনুসারেই হানাফী মাযহাবে ফতোয়া দেয়া হয়ে থাকে। কেননা সকল ওলি ভালোভাবে আদালতে অভিযোগ তোলেনা, আর সকল বিচারক ন্যায় বিচারও করেনা। তাই তারা বিয়ে শুদ্ধ হবেনা বলে ফতোয়া দিয়েছেন, যাতে, আদালতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের অবকাশ সৃষ্টি না হয়।
কোনো কোনো বর্ণনা হতে, ওলির আপত্তি তোলার অধিকার রয়েছে। সে শাসকের কাছ থেকে বিয়ের বিচ্ছেদ চাইতে পারে, যাতে কলঙ্কের বোঝা বইতে না হয়। স্বামীর দ্বারা সে গর্ভবতী না হওয়া পর্যন্ত বা প্রকাশ্য গর্ভ না দেখা যাওয়া পর্যন্ত এই অধিকার থাকে। কেননা গর্ভবতী হওয়া বা গর্ভ প্রকাশ্য হওয়ার পর তার বিচ্ছেদ-দাবি করার অধিকার রহিত হয়ে যায়। কারণ গর্ভের সন্তান নষ্ট হতে দেয়া যায়না। সন্তান গর্ভে এসে যাওয়ার পর তার সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট সকলের কর্তব্য। আর যদি স্বামী 'কুফু' হয় এবং মোহর মোহরে 'মিছল'-এর চেয়ে কম হয়, তবে সে ক্ষেত্রে স্বামী আকদ গ্রহণ করলে তা আবশ্যিকভাবে সম্পাদিত হবে, আর প্রত্যাখ্যান করলে তা বাতিল করার জন্য বিচারকের নিকট তোলা হবে। আর যদি মহিলার এমন কোনো ওলি না থাকে যে উত্তরাধিকারী হবে, চাই আদৌ কোনো ওলিই রইলনা, অথবা ওলি আছে কিন্তু সে উত্তরাধিকারী হবেনা, তাহলে মহিলার সম্পাদিত আকদের উপর আপত্তি তোলার অধিকার কারো থাকবেনা, চাই সে 'কুফু'সহ বিয়ে করুক কিংবা 'কুফু'বিহীন বিয়ে করুক, কিংবা মোহরে 'মিসল'-এর চেয়ে কম মোহরে বিয়ে করুক। কেননা এ ক্ষেত্রে বিয়ের যাবতীয় দায়দায়িত্ব এককভাবে শুধু ঐ মহিলার উপরই বর্তাবে। কারণ সে নিজের নিরঙ্কুশ অধিকারেই হস্তক্ষেপ করেছে। 'কুফু' ছাড়া বিয়ে করাতে কলঙ্ক বোধ করতে পারে এমন কোনো ওলি তার নেই। আর মোহরে মিছলের দাবি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেয়ায় তা রহিত হয়ে গেছে।
অধিকাংশ হানাফী ফকীহ তাদের এই মতের সপক্ষে নিম্নোক্ত প্রমাণাদি পেশ করেন:
১. মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدِ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ .
"এরপর যদি সে স্ত্রীকে তালাক দেয়, (অর্থাৎ তৃতীয় তালাক) তাহলে সে স্ত্রী তারপর আর তার জন্য হালাল হবেনা যতোক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।” (বাকারা: ২৩২)।
২. আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
وَإِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَبَلَغْنَ أَجَلَهُنَّ فَلَا تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يُنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ .
অর্থ: যখন তোমরা স্ত্রীদেরকে (দুই বারে) তালাক দাও, আর তারা যখন ইদ্দত পূর্ণ করে, তখন তাদেরকে তাদের স্বামীদের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে বাধা দিওনা।" (সূরা বাকারা: আয়াত ২৩২)
এ দুটো আয়াতে বিয়ের ক্ষমতা স্ত্রীকে দেয়া হয়েছে। আর ক্ষমতা তাকেই দেয়া যায়, যার হাতে প্রকৃত কর্তৃত্ব থাকে।
৩. তাছাড়া ক্রয় বিক্রয় প্রভৃতি সংক্রান্ত চুক্তিতে যখন মহিলারা স্বাধীন, তখন বিয়ের চুক্তিতেও স্বাধীন। কেননা এক চুক্তির সাথে অন্য চুক্তির কোনো পার্থক্য নেই। বিয়ের চুক্তিতে যদিও তার ওলির কিছু অধিকার থাকে, কিন্তু ওলি এ চুক্তিকে বাতিল করতে পারেনা। কারণ বাতিল করতে পারে কেবল তখনই, যখন মহিলা তার অধিকারের অপব্যবহার করে এবং কুফুহীন বিয়ে করে। আর অধিকারের অপব্যবহার ওলির মুখেই কলঙ্ক লেপন করে।
হানাফি ইমামদের যুক্তি হলো, বিয়েতে ওলি বা অভিভাবকের শর্ত কেবল এমন মেয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যার যোগ্যতা ও পরিপক্বতার অভাব রয়েছে যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্কা বা পাগলিনী। অবশ্য উসুলে ফিকহ শাস্ত্রবিদদের কেউ কেউ 'কিয়াস' প্রয়োগের মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে উক্ত শর্ত প্রয়োগ বৈধ মনে করেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিয়ের আগে কনের অনুমতি নেয়া জরুরি

📄 বিয়ের আগে কনের অনুমতি নেয়া জরুরি


কনের অভিভাবকত্ব নিয়ে যতো রকম মতামতই থাক, তার মতামত নিয়ে বিয়ের আয়োজন শুরু করা এবং আকদের আগে তার সম্মতি নেয়া ওলির জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ বিয়ে হচ্ছে পুরুষ ও স্ত্রীর মাঝে একটা স্থায়ী সহাবস্থান ও যৌথ জীবন যাপনের নাম। কনের সম্মতি জ্ঞাত না হওয়া পর্যন্ত দু'জনের মধ্যে টেকসই ভালোবাসা, সমন্বয় ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি হতে পারেনা। এজন্য শরিয়ত কনেকে বিয়েতে বাধ্য করতে নিষেধ করেছে, চাই সে কুমারী হোক বা অকুমারী। যে বিয়েতে কনের মত নেই, সে বিয়ে জোরপূর্বক সম্পাদন করা জায়েয নয়। তার অনুমতি ব্যতিত তার উপর আব্দ চাপিয়ে দেয়া অবৈধ। কোনো ওলি বলপূর্বক এ ধরনের আব্দ চাপিয়ে দিলে তা বাতিল করার দাবি জানানোর অধিকার কনের রয়েছে। এর প্রমাণ নিম্নরূপ:
১. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “অকুমারী মেয়ে নিজের বিয়ের ব্যাপারে তার ওলির চেয়ে অধিক ক্ষমতার অধিকারী। আর কুমারীর বিয়ের জন্য তার অনুমতি নিতে হবে। কুমারী মেয়ের নিরবতাই তার অনুমতি।" -বুখারি ব্যতিত সকল সহিহ হাদিস গ্রন্থ। "অকুমারী মেয়ে নিজের বিয়ের ব্যাপারে তার ওলির চেয়ে অধিক ক্ষমতার অধিকারী" অর্থাৎ তার সম্মতি ব্যতিরেকে ওলি তার বিয়ে সম্পাদন করতে পারবে না এই বিষয়ে তার ক্ষমতা অকুমারীর তুলনায় বেশি। আর "কুমারীর নিরবতাই তার অনুমতি” এর অর্থ হলো, সে যদি কিছুই না বলে, তাহলে বুঝতে হবে সে সম্মতি দিয়েছে। আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ ও নাসায়ীর অপর এক বর্ণনায় রয়েছে: "কুমারী মেয়ের পিতা তার মতামত গ্রহণ করবে।" অর্থাৎ আকদের আগে তার সম্মতি গ্রহণ করতে হবে।
২. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "বিধবা বা স্বামীহারাকে তার সুস্পষ্ট সম্মতি ও কুমারীকে তার অনুমতি ব্যতিত বিয়ে দেয়া যাবেনা।” লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো: হে রসূলুল্লাহ, কিভাবে কুমারীর অনুমতি নেয়া হবে। তিন বললেন: তার নিরবতাই অনুমতি।” বিধবা বা স্বামীহারার সুস্পষ্ট উচ্চারিত বা অন্য কোনোভাবে ব্যক্ত সম্মতি অপরিহার্য।
৩. হাসনা বিনতে খাদ্দাম রা. থেকে বর্ণিত: তার পিতা তাকে তার অমতে বিয়ে দিয়েছিল। অথচ তিনি ছিলেন অকুমারী। অতপর তিনি রসূল সা.-এর নিকট অভিযোগ করলেন। ফলে রসূল সা. তার বিয়ে বাতিল করে দিলেন। -মুসলিম ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
৪. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: জনৈকা কুমারী দাসী রসূল সা.-এর নিকট এসে জানালো, তার পিতা তার অসম্মতি সত্ত্বেও তাকে বিয়ে দিয়েছে। রসূল সা. তাকে বিয়ে বাতিল করা বা বহাল রাখার স্বাধীনতা দিলেন। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারু কুতনি।
৫. আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট জনৈকা যুবতী এসে জানালো, তার পিতা তাকে তার ভাতিজার সাথে বিয়ে দিয়েছেন, যাতে আমার দ্বারা তার বদ স্বভাব দূর হয়ে যায়। রসূল সা. তাকে তার বিয়ের ব্যাপারে স্বাধীনতা দিলেন। সে বললো: আমি আমার পিতা যা করেছেন, তা মেনে নিয়েছি। তবে মহিলাদেরকে জানাতে চাই, এ ব্যাপারে পিতার কোনো কর্তৃত্ব নেই।” -ইবনে মাজাহ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিয়েতে অভিভাবকত্ব

📄 অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিয়েতে অভিভাবকত্ব


এতোক্ষণ যা কিছু আলোচিত হলো, তা ছিলো প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ে সংক্রান্ত। এক্ষণে অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিষয়ে আলোচনা করা যাচ্ছে।
যেহেতু অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের মতামত থাকেনা, সে বাবা বা দাদা দ্বারা লালিত পালিত হয় ও তাদের হেফাজতে থাকে, তাই তার অনুমতি ছাড়া তাকে বিয়ে দেয়া বৈধ। আবু বকর সিদ্দিক রা. উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.কে বালিকা বয়সে তার অনুমতি ছাড়াই রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা তখন তার যে বয়স ছিলো, তাতে তার মতামত বিবেচনার যোগ্য ছিলনা। অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর যখন সে বয়োপ্রাপ্ত হয়, তখন সে ঐ বিয়ে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। শাফেয়ী মাযহাবে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার আগে ও অনুমতি ছাড়া বিয়ে না দেয়াকে মুস্তাহাব মনে করা হয়, যাতে সে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাম্পত্য বন্দীদশায় নিক্ষিপ্ত না হয়। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, বাবা, দাদা প্রভৃতি ওলির পক্ষে অপ্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েকে বিয়ে দেয়া জায়েয নেই এবং বিয়ে দিলে তা শুদ্ধ হবেনা। আবু হানিফা, আওয়াযি ও প্রাচীন ইমামদের একটি দল বলেন, সকল ওলির পক্ষেই এটা জায়েয, তবে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পর মেয়ের স্বাধীনতা থাকবে বিয়ে বাতিল করা বা বহাল রাখার। কেননা রসূলুল্লাহ সা. হামযার মেয়ে উমামাকে অপ্রাপ্ত বয়স্কা অবস্থায় বিয়ে দিয়েছিলেন এবং বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার স্বাধীনতা থাকবে বলেও জানিয়ে দিয়েছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. তাকে নিজের আত্মীয় হিসেবে এবং তার অভিভাবক হিসেবে বিয়ে দিয়েছিলেন। নারী হিসেবে বিয়ে দেননি। নারী হিসেবে যদি বিয়ে দিতেন, তাহলে বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার পরও উমামা বিয়ে বাতিল করার অধিকারী হতোনা। কারণ আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللهُ وَرَسُولَهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِ
"আল্লাহ ও তার রসূল যখন কোনো ব্যাপারে ফায়সালা করেন, তখন কোনো মুমিন নারী কিংবা পুরুষের তাদের নিজস্ব ব্যাপারে কোনো স্বাধীনতা থাকেনা।" (সূরা আহযাব: ৩৬) সাহাবিদের মধ্য হতে উমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা এই মত অবলম্বন করেছেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওলির ক্ষমতা

📄 ওলির ক্ষমতা


ভালোমন্দ বাছবিচারে অক্ষম অধীনস্থ ব্যক্তি, যথা পাগল ও বালক বালিকা এবং ভালোমন্দ বাছবিচারে আংশিক অক্ষম বালক বালিকা বা নির্বোধ অধীনস্থ ব্যক্তির উপর ওলির নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে। এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকার অর্থ হলো, অধীনস্থের সম্মতি ছাড়াই তাকে বিয়ে দেয়ার ক্ষমতা ওলির রয়েছে। সে সম্মতি না দিলেও এই বিয়ে বৈধ ও কার্যকর হবে। শরিয়ত ওলিকে এই ক্ষমতা দিয়েছে অধীনস্থের কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কেননা সে তার অযোগ্যতা বা অপরিপক্কতার কারণে নিজের কল্যাণ অকল্যাণ বুঝতে পারেনা। সে যেসব চুক্তি সম্পাদন করবে বা যেসব কাজ করবে, তাতে কিভাবে তার স্বার্থরক্ষা হবে, তা বুঝবার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা তার নেই তার অপ্রাপ্ত বয়স্কতা, পাগলামি বা নির্বুদ্ধিতার কারণে। এজন্য এসব অযোগ্য বা আংশিক অযোগ্যদের যাবতীয় কাজের ক্ষমতা তাদের ওলির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। উক্ত দুই শ্রেণী, অযোগ্য ও আংশিক অযোগ্যদের মধ্যে পার্থক্য শুধু এই যে, অযোগ্য ব্যক্তি কোনো বিয়ের আক্দ সম্পন্ন করলে সে আক্দ বাতিল হয়ে যাবে। কেননা তার ভালোমন্দ বাছবিচারের ক্ষমতা নেই। অথচ এই ক্ষমতাটাই যে কোনো চুক্তি সম্পাদনের যোগ্যতার ভিত্তি ও মূল উপাদান। পক্ষান্তরে আংশিক অযোগ্য ব্যক্তি যখন বিয়ের আক্দ সম্পাদন করবে, তখন সে আক্দ যদি সকল শর্ত পূরণ করে সম্পাদন করা হয়ে থাকে, তবে তা শুদ্ধ হবে, তবে তার কার্যকারিতা ওলির অনুমতির উপর নির্ভরশীল থাকবে। সে চাইলে তা অনুমোদন করবে, নচেত বাতিল করে দেবে। হানাফিদের মতে, এ ধরনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা একমাত্র পিতৃকূলীয় ওলির থাকবে অধীনস্থ অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক-বালিকা, পাগল ও নির্বোধ ব্যক্তির উপর। কিন্তু হানাফি ব্যতিত অন্যান্য মাযহাবের ফকিহদের মতে, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে এবং পাগল ও নির্বোধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তারা এ ব্যাপারে একমত যে, পাগল, ও নির্বোধের ওলি হওয়ার যোগ্যতা পিতা, পিতামহ, ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শাসকের রয়েছে। কিন্তু অপ্রাপ্ত বয়স্কা বালক ও বালিকার ওলি হওয়ার যোগ্যতা কার কার রয়েছে, সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক ও ইমাম আহমদ বলেছেন: এ যোগ্যতা শুধু পিতা ও ওসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তির রয়েছে, আর কারো নেই। ইমাম শাফেয়ির মতে, এটা রয়েছে পিতা ও পিতামহের।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00