📄 একাধিক বিয়ের পটভূমি
বস্তুত একাধিক বিবাহ প্রথা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বহু সংখ্যক জাতিতে প্রচলিত ছিলো। তন্মধ্যে ইহুদী জাতি, জাহেলি যুগের আরব জাতি সিসিলীয় জাতিসমূহ, সাভ জাতিসমূহ উল্লেখযোগ্য। নিম্নোক্ত দেশগুলোর অধিবাসীদের অধিকাংশ এসব জাতিরই অন্তর্ভুক্ত:
রাশিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া (বর্তমানে দ্বিখণ্ডিত), যুগোস্লাভিয়া (বর্তমানে বহু খণ্ডে বিভক্ত)। অনুরূপ জার্মানী, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও ইংল্যান্ডেও বহু বিবাহের প্রচলন ছিলো। সুতরাং ইসলামই বহু বিবাহের প্রবর্তন করেছে বলে যে দাবি করা হয়, তা সঠিক নয়। এমনকি আজও চীন, জাপান, আফ্রিকা ও ভারত প্রভৃতি অমুসলিম অধ্যুষিত ভূখণ্ডে একাধিক বিয়ের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাই শুধু মুসলিম জাতি ও দেশসমূহেই এ প্রথা চালু রয়েছে একথাও সত্য নয়। অনুরূপ, একথাও সত্য যে, খৃস্টধর্মের মূল বিধানেও বহু বিবাহ নিষিদ্ধ ছিলনা। কেননা বাইবেলে একটি বাক্যও এমন পাওয়া যায়না যাতে সুস্পষ্টভাবে বহু বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সর্বাগ্রে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত ইউরোপবাসীর এক স্ত্রীর নীতির অনুসারী হওয়ার পেছনে যে কারণ নিহিত রয়েছে তা হলো, পৌত্তলিকতাবাদী ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে যারা সূচনালগ্নেই খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, যথা গ্রীস ও ইটালীয় জাতিদ্বয়, তাদের ঐতিহ্য তাদের জন্য একাধিক বিবাহিত স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ করেছিল। খৃস্টধর্ম গ্রহণের পরও গ্রীস ও ইটালীয় জাতি হয় তাদের উক্ত পৈতৃক কৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এক বিবাহ প্রথা তাদের কাছে নবাগত খৃস্টধর্মের আমদানিকৃত কোনো অপরিচিত ও আনকোরা প্রথা ছিলনা, বরং এটা ছিলো একটা প্রাচীন রীতি, যা তাদের আদিম পৌত্তলিক ধর্মের যুগে চালু হয়েছিল। পরবর্তীকালে গীর্জা প্রবর্তিত বিধিসমূহে বহু বিবাহকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই নিষেধাজ্ঞাকে ধর্মীয় শিক্ষার আওতাভুক্ত ধরে নেয়া হয়। অথচ বাইবেলের কোথাও এই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়না। একথাও অকাট্য সত্য, বহু বিবাহ প্রথা সভ্যতার পথে অগ্রগামী জাতিগুলোর মধ্যেই দর্শনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। পক্ষান্তরে প্রাচীন অনগ্রসর জাতিগুলোতে এ প্রথার প্রচলন খুবই বিরল অথবা একেবারেই নেই। বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করে এবং যারা সমাজ বিজ্ঞানে পারদর্শী, তারা এই মতই পোষণ করেন।
লক্ষ্য করা গেছে, এক বিবাহের প্রথা অধিকাংশ অনুন্নত ও প্রাচীনপন্থী জাতিগুলোতে সমধিক প্রচলিত। এগুলো হচ্ছে প্রধানত শিকার নির্ভর, ফলমূল উৎপাদক ও কৃষিনির্ভর জাতি। পক্ষান্তরে বহু বিবাহ প্রথা কেবল উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অনেকখানি অগ্রসর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই প্রচলিত। সমাজ বিজ্ঞানী ও সভ্যতার ইতিহাস প্রণেতাগণ মনে করেন অনাগতকালে বহু বিবাহ প্রথার ব্যাপকতর প্রসার অবধারিত এবং নগর জীবন ও সুসভ্য জীবনের ব্যাপ্তি ঘটার সাথে সাথে এই প্রথার অনুসারী জাতিগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। তাই এরূপ দাবি সঠিক নয় যে, বহু বিবাহ প্রথা সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট। বরং এর বিপরীত কথাই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যশীল। ঐতিহাসিক দিক দিয়েও এটা বহু বিবাহ প্রথার যথার্থ ও প্রকৃতস্বরূপ। এ সম্পর্কে খৃস্টবাদের দৃষ্টিভঙ্গীও এটাই। এ প্রথার প্রসার যতোটুকু ঘটেছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির সাথে এর যেটুকু সংশ্রব রয়েছে, এটাই তার বাস্তব রূপ। এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আমরা একথা বলিনি। শুধু সত্য ও ইতিহাসের বিকৃতি উদঘাটনের জন্যই এ কথাগুলো বলেছি।