📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 একাধিক বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করা

📄 একাধিক বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করা


ইসলামী আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ইসলামী শিক্ষার অনুসরণ না করাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধকরণের প্রবক্তারা এটিকে সীমিত করতে চেয়েছে এবং স্বামীকে বিচারক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার অবস্থা, তার আর্থিক সামর্থ্য পর্যালোচনাপূর্বক পুনরায় বিয়ে করার অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আর একজন স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করতে চেয়েছে। কারণ পারিবারিক জীবন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই একাধিক বিয়ের দরুন পরিবারের লোকসংখ্যা বাড়লে স্বামীর দায়দায়িত্ব বাড়বে, সে তাদের ব্যয়ভার বহনে অক্ষম হবে। তাদেরকে সৎ মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা দেয়া প্রয়োজন, জীবন যাপনের ব্যয় নির্বাহে প্রয়োজনীয় জীবিকা উপার্জনের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা দিতে পারবেনা। ফলে মূর্খতা ও অশিক্ষা ব্যাপক আকার ধারণ করবে, বেকারত্ব বাড়বে, মুসলিম উম্মাহর বহু সদস্য বাস্তুভিটে ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটবে।
তাছাড়া আজকাল কোনো পুরুষ অর্থের লোভ অথবা যৌন লালসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য ব্যতিত আর কোনো উদ্দেশ্যে একাধিক বিয়ে করেনা। তাই সে একাধিক বিয়ের কোনো যুক্তি আছে কিনা বা তাতে কোনো কল্যাণ আছে কিনা, তা খুঁজে দেখে না। বরং প্রায়শঃ পূর্ববর্তী স্ত্রীর হক ও স্বার্থ নষ্ট করে, তার পক্ষের সন্তানদের ক্ষতিসাধন করে ও তাদেরকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। এর ফলে সতিনদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে, সেই প্রতিহিংসার আগুন পরিবারগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে শত্রুতা তীব্র আকার ধারণ করে, প্রত্যেক স্ত্রী অপর স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে তৎপর হয় এবং এসব ছোটখাটো বিরোধ বৃহত্তর আকার ধারণপূর্বক কখনো কখনো হত্যাকাণ্ড পর্যন্তও ঘটিয়ে ছাড়ে। এভাবেই বহু বিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে তা থেকে বিয়ের সংখ্যা সীমিত করার পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
এর জবাবে আমরা বলতে চাই: আল্লাহ যা বৈধ করেছেন, তাকে অবৈধ করা এ সমস্যার সমাধান নয়। সমাধান খুঁজতে হবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এবং জনগণকে ইসলামের বিধান শেখানোর মাধ্যমে। মানুষের জন্য পানাহারও আল্লাহ বৈধ করেছেন কিন্তু এই শর্তে যে, সে যেন সীমালঙ্ঘন না করে। পানাহারে অপব্যয় ও অপচয় করে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে সেজন্য পানাহার দায়ী হবেনা। দায়ী হবে পানাহারে অপচয় ও বাড়াবাড়ি। এ ধরনের সমস্যার সমাধান পানাহার নিষিদ্ধ করে করা যাবেনা। সমাধান করা যাবে শুধু নিয়ম ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে। ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যার অনুসরণ করা হবে। বিচারকের অনুমতি ব্যতিরেকে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধকরণের প্রবক্তারা যদিও একাধিক বিয়ের ফলে সংঘটিত ক্ষতির বাস্তবতাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে, কিন্তু তারা এটা নিষিদ্ধ করার ফলে যে বৃহত্তর ক্ষতি সংঘটিত হওয়া অনিবার্য, তা হয় জানেননা, অথবা জেনেও না জানার ভান করে। প্রকৃতপক্ষে বহু বিবাহ অনুমোদনের ক্ষতির চেয়ে তা নিষিদ্ধকরণের ক্ষতি ঢের বেশি। তাই লঘুতর ক্ষতিকে মেনে নিয়ে গুরুতর ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করা জরুরি। কেননা মূলনীতি হলো দুই ক্ষতির মধ্যে যেটি লঘুতর, সেটিকেই মেনে নিতে হয়। আর যেখানে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেখানে বিষয়টি বিচাররকের নিয়ন্ত্রণে সোপর্দ করা বাঞ্ছনীয়। কেননা মানুষের অবস্থা জানার কোনো নিখুঁত মাপকাঠি নেই। আবার কখনো কখনো একাধিক বিয়ে বন্ধ করার ক্ষতি তার উপকারিতার চেয়ে নিকটতম হয়ে থাকে। মুসলমানরা প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত একাধিক বিয়ে করতে অভ্যস্ত ছিলো। তাদের কেউ এভাবে একাধিক বিয়েকে নিষিদ্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করেছে বলে শোনা যায়নি যেভাবে এখন করতে বলা হচ্ছে। সুতরাং যে রীতিকে তারা মেনে নিয়েছেন ও বহাল রেখেছেন তা আমাদেরও মেনে নেয়া ও বহাল রাখা উচিত। আল্লাহ সুপ্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করা আমাদের পক্ষে শোভনীয় নয়। আর যে আইনের উত্তম বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে আমাদের বন্ধুরা তো বটেই, শত্রুরাও সাক্ষ্য দিয়েছে, তাতে খুঁত ধরতে চেষ্টা করা আমাদের উচিত নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 একাধিক বিয়ের পটভূমি

📄 একাধিক বিয়ের পটভূমি


বস্তুত একাধিক বিবাহ প্রথা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বহু সংখ্যক জাতিতে প্রচলিত ছিলো। তন্মধ্যে ইহুদী জাতি, জাহেলি যুগের আরব জাতি সিসিলীয় জাতিসমূহ, সাভ জাতিসমূহ উল্লেখযোগ্য। নিম্নোক্ত দেশগুলোর অধিবাসীদের অধিকাংশ এসব জাতিরই অন্তর্ভুক্ত:
রাশিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া (বর্তমানে দ্বিখণ্ডিত), যুগোস্লাভিয়া (বর্তমানে বহু খণ্ডে বিভক্ত)। অনুরূপ জার্মানী, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও ইংল্যান্ডেও বহু বিবাহের প্রচলন ছিলো। সুতরাং ইসলামই বহু বিবাহের প্রবর্তন করেছে বলে যে দাবি করা হয়, তা সঠিক নয়। এমনকি আজও চীন, জাপান, আফ্রিকা ও ভারত প্রভৃতি অমুসলিম অধ্যুষিত ভূখণ্ডে একাধিক বিয়ের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাই শুধু মুসলিম জাতি ও দেশসমূহেই এ প্রথা চালু রয়েছে একথাও সত্য নয়। অনুরূপ, একথাও সত্য যে, খৃস্টধর্মের মূল বিধানেও বহু বিবাহ নিষিদ্ধ ছিলনা। কেননা বাইবেলে একটি বাক্যও এমন পাওয়া যায়না যাতে সুস্পষ্টভাবে বহু বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সর্বাগ্রে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত ইউরোপবাসীর এক স্ত্রীর নীতির অনুসারী হওয়ার পেছনে যে কারণ নিহিত রয়েছে তা হলো, পৌত্তলিকতাবাদী ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে যারা সূচনালগ্নেই খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, যথা গ্রীস ও ইটালীয় জাতিদ্বয়, তাদের ঐতিহ্য তাদের জন্য একাধিক বিবাহিত স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ করেছিল। খৃস্টধর্ম গ্রহণের পরও গ্রীস ও ইটালীয় জাতি হয় তাদের উক্ত পৈতৃক কৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এক বিবাহ প্রথা তাদের কাছে নবাগত খৃস্টধর্মের আমদানিকৃত কোনো অপরিচিত ও আনকোরা প্রথা ছিলনা, বরং এটা ছিলো একটা প্রাচীন রীতি, যা তাদের আদিম পৌত্তলিক ধর্মের যুগে চালু হয়েছিল। পরবর্তীকালে গীর্জা প্রবর্তিত বিধিসমূহে বহু বিবাহকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই নিষেধাজ্ঞাকে ধর্মীয় শিক্ষার আওতাভুক্ত ধরে নেয়া হয়। অথচ বাইবেলের কোথাও এই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়না। একথাও অকাট্য সত্য, বহু বিবাহ প্রথা সভ্যতার পথে অগ্রগামী জাতিগুলোর মধ্যেই দর্শনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। পক্ষান্তরে প্রাচীন অনগ্রসর জাতিগুলোতে এ প্রথার প্রচলন খুবই বিরল অথবা একেবারেই নেই। বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করে এবং যারা সমাজ বিজ্ঞানে পারদর্শী, তারা এই মতই পোষণ করেন।
লক্ষ্য করা গেছে, এক বিবাহের প্রথা অধিকাংশ অনুন্নত ও প্রাচীনপন্থী জাতিগুলোতে সমধিক প্রচলিত। এগুলো হচ্ছে প্রধানত শিকার নির্ভর, ফলমূল উৎপাদক ও কৃষিনির্ভর জাতি। পক্ষান্তরে বহু বিবাহ প্রথা কেবল উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অনেকখানি অগ্রসর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই প্রচলিত। সমাজ বিজ্ঞানী ও সভ্যতার ইতিহাস প্রণেতাগণ মনে করেন অনাগতকালে বহু বিবাহ প্রথার ব্যাপকতর প্রসার অবধারিত এবং নগর জীবন ও সুসভ্য জীবনের ব্যাপ্তি ঘটার সাথে সাথে এই প্রথার অনুসারী জাতিগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। তাই এরূপ দাবি সঠিক নয় যে, বহু বিবাহ প্রথা সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট। বরং এর বিপরীত কথাই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যশীল। ঐতিহাসিক দিক দিয়েও এটা বহু বিবাহ প্রথার যথার্থ ও প্রকৃতস্বরূপ। এ সম্পর্কে খৃস্টবাদের দৃষ্টিভঙ্গীও এটাই। এ প্রথার প্রসার যতোটুকু ঘটেছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির সাথে এর যেটুকু সংশ্রব রয়েছে, এটাই তার বাস্তব রূপ। এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আমরা একথা বলিনি। শুধু সত্য ও ইতিহাসের বিকৃতি উদঘাটনের জন্যই এ কথাগুলো বলেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00