📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করা ওয়াজিব

📄 স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করা ওয়াজিব


আল্লাহ একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন, তবে এর সংখ্যা চারের মধ্যে সীমিত করেছেন। তাদের মধ্যে খাদ্য, বাসস্থান, পোশাক, রাত্র যাপন ও অন্যসব বস্তুগত বিষয়ে ইনসাফ বজায় রাখা এবং ধনী ও দরিদ্র, অভিজাত ও সাধারণে কোনো বিভেদ ও বৈষম্য না করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। কেউ যদি আশংকা করে, সকল স্ত্রীর সাথে সুবিচার করতে ও সবার অধিকার দিতে পারবে না, তাহলে তার জন্য একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করা হারাম। যদি তিনজনের অধিকার দিতে পারে কিন্তু চতুর্থ জনের অধিকার দিতে না পারে, তাহলে চতুর্থ স্ত্রী গ্রহণ করা হারাম। অনুরূপ যে ব্যক্তি মনে করে দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি তার অবিচার করার আশংকা আছে, তার পক্ষে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করা হারাম। কেননা আল্লাহ বলেছেন: "তোমরা দু'জন তিনজন বা চারজন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারো। তবে যদি আশংকা করো, সুবিচার করতে পারবেনা, তাহলে মাত্র একজন স্ত্রী গ্রহণ করো অথবা দাসীকে (নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো)। এটাই সুবিচারের নিকটতম পন্থা।"
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে ব্যক্তির দু'জন স্ত্রী থাকে এবং সে তাদের একজনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে কেয়ামতের দিন যখন উপস্থিত হবে তখন তার শরীরের একাংশ বাঁকা থাকবে।" আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
কারো ধারণা হতে পারে, একদিকে এ আয়াতে আল্লাহ স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করা বাধ্যতামূলক করে বিধি নাযিল করেছেন, অপরদিকে সূরা নিসার অপর আয়াতে মানুষ কখনো সুবিচার করতে পারবে না বলেছেন। এভাবে এ দু'আয়াতে বৈপরিত্য রয়েছে। আসলে এ ধারণা ঠিক নয়। অপর আয়াতটি হলো:
وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَمْتُمْ فَلَا تَمِيلُوا كُلِّ الْمَيْلِ فَتَذَرُواهَا كَالْمُعَلَّقَةِ .
অর্থ: তোমরা স্ত্রীদের প্রতি সুবিচার করতে চাইলেও তা কখনো করতে পারবেনা। কাজেই একজনের প্রতি সর্বোতভাবে ঝুঁকে পড়ো না। যার ফলে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখবে।” (সূরা নিসা : আয়াত ১২৯)
বস্তুত যে সুবিচারের আদেশ দেয়া হয়েছে, তা হলো বাহ্যিক সুবিচার যা মানুষের সাধ্যের আওতাভুক্ত। প্রীতি ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে সুবিচার করার আদেশ দেয়া হয়নি। কেননা সেটা কেউ করতে সক্ষম নয়। শেষোক্ত আয়াতে যে বলা হয়েছে "তোমরা কখনো স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার করতে পারবেনা" সেটা প্রীতি, ভালোবাসা ও সহবাসের সুবিচার। মুহাম্মদ ইবনে সিরীন বলেছেন: আমি উবায়দাকে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন” “ওটা হচ্ছে ভালোবাসা ও সহবাসে সুবিচার।" আবু বকর ইবনুল আরাবী বলেন: "এটা সঠিক। কেননা ভালোবাসায় সমতা ও সুবিচার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা প্রত্যেক মানুষের মন আল্লাহর দুই আংগুলের মাঝে অবস্থান করে। তিনি তাকে যেভাবে ইচ্ছা ঘুরাতে থাকেন। সহবাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এক নারীর প্রতি যতোখানি কামোত্তেজনা সৃষ্টি হয়, ততোখানি অপর নারীর প্রতি নাও হতে পারে। এটা যখন মানুষের ইচ্ছাকৃত নয়, তখন এতে তার কোনো জবাবদিহিতা থাকতে পারেনা। কেননা এটা তার সাধ্যাতীত ব্যাপার। তাই এ বিষয়ে কাউকে দায়ী করা চলেনা। আয়েশা রা. বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সা. স্ত্রীদের মাঝে সুবিচারসহকারে সবকিছু বণ্টন করতেন এবং বলতেন:
اللَّهُمَّ هَذَا قَسْمِي فِيهَا أَمْلِكُ، فَلَا تَلْمْنِي فِيْمَا تَمْلِكُ وَلَا أَمْلِكُ .
“হে আল্লাহ, আমার যে বিষয়ে সুবিচার করার ক্ষমতা আছে, সে বিষয়ে সুবিচার করলাম। যে বিষয়ে আমার সুবিচারের ক্ষমতা নেই, বরং তোমার আছে, সে বিষয়ে আমাকে ভর্ৎসনা করোনা।"
আবু দাউদ বলেছেন: "যে বিষয়ে সুবিচারের ক্ষমতা নেই।” এ দ্বারা হৃদয়কে বুঝানো হয়েছে। আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
খাত্তাবী বলেছেন: এ হাদিসে স্বাধীন সতিনদের মধ্যে সমবণ্টনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর মেলামেশার ক্ষেত্রে একজনের দিকে এমনভাবে ঝুঁকে পড়া অপছন্দনীয় যা কারো হক নষ্ট করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হৃদয়ের টান ও ঝোঁক দূষণীয় নয়। কেননা হৃদয় কারো আয়ত্তে ও নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। এজন্য রসূলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীদের মাঝে যাবতীয় বস্তু সমানভাবে বণ্টন করে বলতেন: "হে আল্লাহ, এ ক্ষেত্রে আমার সমবণ্টনের ক্ষমতা আছে। আমি এখানে সমবণ্টন করলাম ..." আর এ সম্পর্কেই সূরা নিসার আয়াত "তোমরা কখনো তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করতে পারবেনা..." নাযিল হয়েছে।
স্বামী যখন সফরে যাবে, তখন যে স্ত্রীকে ইচ্ছা সাথে নিতে পারবে। তবে তাদের মাঝে লটারি করে বাছাই করলে ভালো হয়। স্ত্রীদের মধ্য থেকে কেউ নিজের হকের দাবি ছেড়ে ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। সেটা একান্তভাবে তার নিজের এখতিয়ারভুক্ত। নিজের পাওনা সে অন্যকে দিয়ে দিতে পারে। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: "রসূলুল্লাহ সা. যখন কোনো সফরে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন তার স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন। যার নামে 'লটারি উঠতো, তাকে সাথে নিয়ে যেতেন। প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য তার প্রাপ্য দিন ধার্য করতেন। কেবল সওদা বিনতে যামা' তার দিনটি আয়েশা রা. কে দিয়ে দিয়েছিলেন।
খাত্তাবী বলেছেন: এ হাদিস থেকে (অধিকারের বিষয়ে) লটারি শরিয়তসম্মত প্রমাণিত হয়। আরো প্রমাণিত হয় যে, দিন অথবা রাত, উভয়টিই বণ্টনের আওতায় আসতে পারে। অনুরূপ, দাম্পত্য সাহচর্য বা সম্পদ সংক্রান্ত হক, উভয়টিই অন্য সতিনকে দেয়া যেতে পারে। অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, যে স্ত্রী স্বামীর সাথে সফরে যাবে সে যদি লটারি অনুযায়ী গিয়ে থাকে তবে তার সফরের সেই দিনগুলো অন্যান্য সতিনদের প্রাপ্য হবেনা এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তারা যেদিনগুলোতে স্বামীর সঙ্গ ত্যাগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তা তাদের বেলায় গণনায় আসবেনা। কোনো কোনো আলেমের মতে, গণনায় আসবে এবং অবশিষ্ট স্ত্রীদেরকে তাদের স্বামী সঙ্গ বঞ্চিত দিনগুলো পরিশোধ করে সমতা বিধান করতে হবে। তবে প্রথমোক্ত মতটিই অগ্রগণ্য। কেননা অধিকাংশ আলেম এ ব্যাপারে একমত। এর সপক্ষে একটা বাড়তি যুক্তি হলো, তাকে সফরের অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয় বলেই এই অতিরিক্ত দিনগুলো দিয়ে তাকে সফরসঙ্গিনী করা হয়েছে। যারা ঘরে বসে থাকে, তাদের এই কষ্ট ভোগ করতে হয়না। তাই এ ক্ষেত্রে তাকে যদি অন্যান্য স্ত্রীর সমপর্যায়ে নিয়ে আসা হয়, তাহলে সে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় তার উপর আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ না করার শর্ত আরোপের যৌক্তিকতা

📄 স্ত্রীর অধিকার রক্ষায় তার উপর আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ না করার শর্ত আরোপের যৌক্তিকতা


স্বামীর সুবিচারের সামর্থ্য থাকলে ইসলাম যেমন তাকে চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণের অধিকার দিয়েছে, তেমনি স্ত্রীকে বা তার অভিভাবককে এই অধিকারও দিয়েছে যে, তার উপর আর কোনো স্ত্রী গ্রহণ না করার শর্ত আরোপ করতে পারে। আকদে স্বামীর উপর এরূপ শর্ত আরোপ করলে সে শর্ত বৈধ এবং তা পালন করা বাধ্যতামূলক হবে। স্বামী এ শর্ত পূরণ না করলে স্ত্রীর বিয়ে ভেংগে দেয়ার ক্ষমতা থাকবে এবং স্ত্রী স্বয়ং এ অধিকার রহিত করা ও স্বামী কর্তৃক শর্ত লঙ্ঘন করায় সম্মত হওয়া ব্যতিত তার বিয়ে ভাংগার এ ক্ষমতা রহিত হবেনা। এটাই ইমাম আহমদেরও অভিমত এবং ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কাইয়েম এ মতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। ক্রয়-বিক্রয় ও ভাড়া ইত্যাদির ক্ষেত্রে শর্ত যতোটা ঝুঁকিপূর্ণ, বিয়ের ক্ষেত্রে তা ততোধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তাই শর্ত পূরণ করা বিয়ের ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক।
তাঁদের এই অভিমতের পক্ষে তারা নিম্নোক্ত প্রমাণসমূহ উপস্থাপন করেছেন:
১. বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে শর্তের বিনিময়ে তোমরা স্ত্রীদের সাথে যৌন মিলন বৈধ করেছ, সে শর্তগুলো পালন করাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।"
২. বুখারি ও মুসলিম আব্দুল্লাহ ইবনে আবু মুলাইকা থেকে বর্ণনা করেছেন: মিসওয়ার বিন মাখরামা তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সা.কে মিম্বরে বলতে শুনেছেন: বনু হিশাম তাদের মেয়েকে আলী বিন আবু তালিবের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য আমার অনুমতি চেয়েছে। আমি তাদেরকে অনুমতি দিচ্ছিনা। আবারো বলছি, অনুমতি দিচ্ছিনা। আবার বলছি, অনুমতি দিচ্ছিনা। কেবল তখন অনুমতি দিতে পারি, যখন আলী আমার মেয়েকে তালাক দিতে ইচ্ছুক হয় এবং তাদের মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। কেননা আমার মেয়ে আমারই অংশ। যে জিনিস থেকে তার মনে সংশয় জন্মে, সে জিনিস থেকে আমারও সংশয় জন্মে, আর যে জিনিস তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে: "ফাতেমা আমার অংশ। আমি আশংকা করি, সে তার ধর্মের ব্যাপারে ফেতনায় পড়ে যাবে। (অর্থাৎ বনু হিশাম গোত্রের মেয়ে তার সতিন হয়ে এলে সে অনেক গঞ্জনা দেবে, ফলে ফাতেমা সঠিকভাবে দীনী দায়িত্ব পালন করতে পারবেনা।) এরপর তিনি বনু আবদ শামস গোত্রে তার জনৈক জামাই-এর নামোল্লেখ করলেন, অতপর তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তার প্রচুর প্রশংসা করলেন। বললেন: সে আমার সাথে যা ওয়াদা করেছে, তা পূরণ করেছে, যে কথা বলেছে সত্য বলেছে। আর আমি কোনো হালালকে হারাম করছিনা এবং কোনো হারামকে হালাল করছি না। তবে আল্লাহর কসম, আল্লাহর রসূলের মেয়ে ও আল্লাহর দুশমনের মেয়ে (অর্থাৎ আবু জাহলের মেয়ে) কখনো এক পরিবার একত্রিত হতে পারেনা।
ইবনুল কাইয়েম বলেন: এই বিধি থেকে কয়েকটি বিষয় জানা যায়: স্বামী যখন স্ত্রীকে এই শর্তে বিয়ে করে যে, তার জীবদ্দশায় সে আর কোনো বিয়ে করবেনা, তখন তার জন্য এই শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। যদি তার জীবদ্দশায় বিয়ে করে, তবে স্ত্রীর বিয়ে বাতিল করার অধিকার থাকবে। যেহেতু রসূল সা. জানিয়েছেন, ফাতেমা বেঁচে থাকতে আলীর অন্য বিয়ে করলে তা ফাতেমাকে সন্দেহ-সংশয় ও মনোকষ্টে জর্জরিত করবে। আর ফাতেমার মনোকষ্ট স্বয়ং রসূল সা.-এর মনোকষ্টের কারণ হবে। অথচ এ কথা সুনিশ্চিতভাবে জানা যে, আলীর সাথে ফাতেমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছে এই শর্তে যে, তিনি ফাতেমাকে ও তাঁর পিতাকে কোনো প্রকার কষ্ট দেবেননা এবং তাদের মনে কোনো ধরনের সংশয় সৃষ্টি করবেননা। যদিও আকদের ভাষ্যে সরাসরি এ শর্তের উল্লেখ ছিলনা। কিন্তু এ শর্ত যে আরোপিত ছিলো, তা সবারই সুনিশ্চিতভাবে জানা ছিলো।
অন্য জামাতার উল্লেখ এবং সে সত্যভাষী ও ওয়াদা পালনকারী ছিলো বলে তার প্রশংসা দ্বারা রসূল সা. আলী রা.কে পরোক্ষভাবে তার অনুকরণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এ দ্বারা এটাও বুঝা যায় যে, আলীও এই মর্মে তার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, ফাতেমার মনে কষ্ট দেবেননা ও সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করবেননা। অন্য জামাতার মতো আলীও যাতে এই ওয়াদা পালন করেন সেজন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, প্রচলিত রীতি ও প্রথার আলোকে যে শর্ত আরোপিত হয়, তা শাব্দিকভাবে আরোপিত শর্তের মতোই। সে শর্ত পূরণ না করলে শর্ত আরোপকারী সংশ্লিষ্ট চুক্তিটি ভেঙ্গে দিতে পারে। যদি ধরে নেয়া যায়, কোনো সমাজে এরূপ রীতি চালু রয়েছে যে, তারা তাদের মহিলাদেরকে তাদের বাড়ি থেকে বের করেনা, স্বামীকে কোনক্রমেই বাড়ি থেকে বাইরে নিয়ে যেতে দেয়না এবং তাদের এই রীতি অব্যাহত থাকে। তাহলে এটা একটা কথিত বা লিখিত শর্তের মতোই গণ্য হবে। বস্তুতঃ এটা মদিনার অধিবাসীদের রীতি প্রথার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইমাম আহমদের মূলনীতি হলো, প্রথাসিদ্ধ শর্ত কথিত বা লিখিত শর্ত সমান মর্যাদা সম্পন্ন। এজন্য প্রথাগতভাবে মজুরি নিয়ে কাজ করে এমন ধোপার কাছে যদি কাপড় ধুতে দেয়া হয়, এমন বাবুর্চির কাছে রুটি বানাতে আটা বা অন্য কোনো খাবার রান্না করতে খাবারের উপকরণ দেয়া হয়, অথবা গোসলখানায় গিয়ে এমন ব্যক্তিকে কাপড় ধোয়ার কাজে লাগানো হয়, মজুরির বিনিময়ে কাজ করাই যার অভ্যাস, তাহলে মজুরির শর্ত আরোপ না হলেও প্রচলিত হারে তাকে মজুরি দিতে হবে। অনুরূপ, এমন কোনো পরিবার থেকে যদি মেয়ে বিয়ে করে আনা হয়, যে পরিবারের মেয়ের উপর স্বামী কখনো সতিন চাপিয়ে দেয়না। তাকে সে সুযোগও দেয়া হয়না এবং এটাই তাদের চিরাচরিত রীতি, তাহলে সেটা হবে আরোপিত শর্তের মতো।
সুতরাং যে মহিলা সারা দুনিয়ার নারীদের নেত্রী এবং সমগ্র মানব জাতির নেতার মেয়ে, তিনি অন্য সকল নারীর তুলনায় এ অধিকারের সব চেয়ে বেশি হকদার। আলী রা. যদি আকদের ভাষ্যের মধ্যেই একটা শর্ত হিসেবে উল্লেখ করতেন, তাহলে তা দ্বারা তিনি ফাতেমার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতেননা। বরং সংহত ও জোরদার করতেন মাত্র। আর একই পরিবারে এক সাথে ফাতেমা রা. ও আবু জাহলের মেয়েকে একত্রিত থেকে আলী রা.কে নিবৃত্ত করার পেছনে অত্যন্ত মনোজ্ঞ যুক্তি রয়েছে। সেটি হলো স্ত্রী সাধারণভাবে মর্যাদার দিক দিয়ে স্বামীর অনুগামী হয়ে থাকে। কোনো স্ত্রী যদি নিজেই উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হয়, আর স্বামীও তদ্রূপ হয়, তাহলে সে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যেও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন, স্বামীর বৈশিষ্ট্যের সুবাদেও উচ্চ মর্যাদার অধিকারিণী। ফাতেমা রা.-এর অবস্থা এ রকমই। আবু জাহলের মেয়েকে ফাতেমার সাথে একই মর্যাদার অধিকারিণী করতে আল্লাহ ইচ্ছুক ছিলেননা, চাই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের বলেই হোক বা স্বামীর সুবাদেই হোক। তাদের মাঝে যে বিরাট ব্যবধান ছিলো সেটাতো সুবিদিত। সুতরাং সে সারা বিশ্বের নারীদের নেত্রী'র সতিন হয়ে আসুক, এটা কোনভাবেই পছন্দনীয় ছিলনা। রসূলুল্লাহ সা. এই অমোঘ সত্যের দিকেই ইংগিত করেছেন এই বলে: "আল্লাহর কসম, একই পরিবারে আল্লাহর রসূলের মেয়ে ও আল্লাহর শত্রুর মেয়ে কখনো একত্রে বাস করতে পারেনা।" এ ধরনের শর্ত আরোপ করার অধিকার যে মহিলাদের রয়েছে, সে সম্পর্কে ফকীহদের মতামত ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 একাধিক বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করা

📄 একাধিক বিয়ে সীমিত বা নিষিদ্ধ করা


ইসলামী আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন না হওয়া এবং ইসলামী শিক্ষার অনুসরণ না করাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে একাধিক বিয়ে নিষিদ্ধকরণের প্রবক্তারা এটিকে সীমিত করতে চেয়েছে এবং স্বামীকে বিচারক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তার অবস্থা, তার আর্থিক সামর্থ্য পর্যালোচনাপূর্বক পুনরায় বিয়ে করার অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত আর একজন স্ত্রী গ্রহণ নিষিদ্ধ করতে চেয়েছে। কারণ পারিবারিক জীবন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই একাধিক বিয়ের দরুন পরিবারের লোকসংখ্যা বাড়লে স্বামীর দায়দায়িত্ব বাড়বে, সে তাদের ব্যয়ভার বহনে অক্ষম হবে। তাদেরকে সৎ মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা দেয়া প্রয়োজন, জীবন যাপনের ব্যয় নির্বাহে প্রয়োজনীয় জীবিকা উপার্জনের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা দিতে পারবেনা। ফলে মূর্খতা ও অশিক্ষা ব্যাপক আকার ধারণ করবে, বেকারত্ব বাড়বে, মুসলিম উম্মাহর বহু সদস্য বাস্তুভিটে ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটবে।
তাছাড়া আজকাল কোনো পুরুষ অর্থের লোভ অথবা যৌন লালসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য ব্যতিত আর কোনো উদ্দেশ্যে একাধিক বিয়ে করেনা। তাই সে একাধিক বিয়ের কোনো যুক্তি আছে কিনা বা তাতে কোনো কল্যাণ আছে কিনা, তা খুঁজে দেখে না। বরং প্রায়শঃ পূর্ববর্তী স্ত্রীর হক ও স্বার্থ নষ্ট করে, তার পক্ষের সন্তানদের ক্ষতিসাধন করে ও তাদেরকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। এর ফলে সতিনদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে, সেই প্রতিহিংসার আগুন পরিবারগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে শত্রুতা তীব্র আকার ধারণ করে, প্রত্যেক স্ত্রী অপর স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণে তৎপর হয় এবং এসব ছোটখাটো বিরোধ বৃহত্তর আকার ধারণপূর্বক কখনো কখনো হত্যাকাণ্ড পর্যন্তও ঘটিয়ে ছাড়ে। এভাবেই বহু বিবাহের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে তা থেকে বিয়ের সংখ্যা সীমিত করার পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়।
এর জবাবে আমরা বলতে চাই: আল্লাহ যা বৈধ করেছেন, তাকে অবৈধ করা এ সমস্যার সমাধান নয়। সমাধান খুঁজতে হবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এবং জনগণকে ইসলামের বিধান শেখানোর মাধ্যমে। মানুষের জন্য পানাহারও আল্লাহ বৈধ করেছেন কিন্তু এই শর্তে যে, সে যেন সীমালঙ্ঘন না করে। পানাহারে অপব্যয় ও অপচয় করে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে সেজন্য পানাহার দায়ী হবেনা। দায়ী হবে পানাহারে অপচয় ও বাড়াবাড়ি। এ ধরনের সমস্যার সমাধান পানাহার নিষিদ্ধ করে করা যাবেনা। সমাধান করা যাবে শুধু নিয়ম ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে। ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যার অনুসরণ করা হবে। বিচারকের অনুমতি ব্যতিরেকে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধকরণের প্রবক্তারা যদিও একাধিক বিয়ের ফলে সংঘটিত ক্ষতির বাস্তবতাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে, কিন্তু তারা এটা নিষিদ্ধ করার ফলে যে বৃহত্তর ক্ষতি সংঘটিত হওয়া অনিবার্য, তা হয় জানেননা, অথবা জেনেও না জানার ভান করে। প্রকৃতপক্ষে বহু বিবাহ অনুমোদনের ক্ষতির চেয়ে তা নিষিদ্ধকরণের ক্ষতি ঢের বেশি। তাই লঘুতর ক্ষতিকে মেনে নিয়ে গুরুতর ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করা জরুরি। কেননা মূলনীতি হলো দুই ক্ষতির মধ্যে যেটি লঘুতর, সেটিকেই মেনে নিতে হয়। আর যেখানে ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সেখানে বিষয়টি বিচাররকের নিয়ন্ত্রণে সোপর্দ করা বাঞ্ছনীয়। কেননা মানুষের অবস্থা জানার কোনো নিখুঁত মাপকাঠি নেই। আবার কখনো কখনো একাধিক বিয়ে বন্ধ করার ক্ষতি তার উপকারিতার চেয়ে নিকটতম হয়ে থাকে। মুসলমানরা প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত একাধিক বিয়ে করতে অভ্যস্ত ছিলো। তাদের কেউ এভাবে একাধিক বিয়েকে নিষিদ্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করেছে বলে শোনা যায়নি যেভাবে এখন করতে বলা হচ্ছে। সুতরাং যে রীতিকে তারা মেনে নিয়েছেন ও বহাল রেখেছেন তা আমাদেরও মেনে নেয়া ও বহাল রাখা উচিত। আল্লাহ সুপ্রশস্ত রহমতকে সংকীর্ণ করা আমাদের পক্ষে শোভনীয় নয়। আর যে আইনের উত্তম বৈশিষ্ট্যগুলোর পক্ষে আমাদের বন্ধুরা তো বটেই, শত্রুরাও সাক্ষ্য দিয়েছে, তাতে খুঁত ধরতে চেষ্টা করা আমাদের উচিত নয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 একাধিক বিয়ের পটভূমি

📄 একাধিক বিয়ের পটভূমি


বস্তুত একাধিক বিবাহ প্রথা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে বহু সংখ্যক জাতিতে প্রচলিত ছিলো। তন্মধ্যে ইহুদী জাতি, জাহেলি যুগের আরব জাতি সিসিলীয় জাতিসমূহ, সাভ জাতিসমূহ উল্লেখযোগ্য। নিম্নোক্ত দেশগুলোর অধিবাসীদের অধিকাংশ এসব জাতিরই অন্তর্ভুক্ত:
রাশিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া (বর্তমানে দ্বিখণ্ডিত), যুগোস্লাভিয়া (বর্তমানে বহু খণ্ডে বিভক্ত)। অনুরূপ জার্মানী, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও ইংল্যান্ডেও বহু বিবাহের প্রচলন ছিলো। সুতরাং ইসলামই বহু বিবাহের প্রবর্তন করেছে বলে যে দাবি করা হয়, তা সঠিক নয়। এমনকি আজও চীন, জাপান, আফ্রিকা ও ভারত প্রভৃতি অমুসলিম অধ্যুষিত ভূখণ্ডে একাধিক বিয়ের প্রথা প্রচলিত রয়েছে। তাই শুধু মুসলিম জাতি ও দেশসমূহেই এ প্রথা চালু রয়েছে একথাও সত্য নয়। অনুরূপ, একথাও সত্য যে, খৃস্টধর্মের মূল বিধানেও বহু বিবাহ নিষিদ্ধ ছিলনা। কেননা বাইবেলে একটি বাক্যও এমন পাওয়া যায়না যাতে সুস্পষ্টভাবে বহু বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সর্বাগ্রে খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত ইউরোপবাসীর এক স্ত্রীর নীতির অনুসারী হওয়ার পেছনে যে কারণ নিহিত রয়েছে তা হলো, পৌত্তলিকতাবাদী ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে যারা সূচনালগ্নেই খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল, যথা গ্রীস ও ইটালীয় জাতিদ্বয়, তাদের ঐতিহ্য তাদের জন্য একাধিক বিবাহিত স্ত্রী রাখা নিষিদ্ধ করেছিল। খৃস্টধর্ম গ্রহণের পরও গ্রীস ও ইটালীয় জাতি হয় তাদের উক্ত পৈতৃক কৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এক বিবাহ প্রথা তাদের কাছে নবাগত খৃস্টধর্মের আমদানিকৃত কোনো অপরিচিত ও আনকোরা প্রথা ছিলনা, বরং এটা ছিলো একটা প্রাচীন রীতি, যা তাদের আদিম পৌত্তলিক ধর্মের যুগে চালু হয়েছিল। পরবর্তীকালে গীর্জা প্রবর্তিত বিধিসমূহে বহু বিবাহকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং এই নিষেধাজ্ঞাকে ধর্মীয় শিক্ষার আওতাভুক্ত ধরে নেয়া হয়। অথচ বাইবেলের কোথাও এই নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়না। একথাও অকাট্য সত্য, বহু বিবাহ প্রথা সভ্যতার পথে অগ্রগামী জাতিগুলোর মধ্যেই দর্শনীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। পক্ষান্তরে প্রাচীন অনগ্রসর জাতিগুলোতে এ প্রথার প্রচলন খুবই বিরল অথবা একেবারেই নেই। বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করে এবং যারা সমাজ বিজ্ঞানে পারদর্শী, তারা এই মতই পোষণ করেন।
লক্ষ্য করা গেছে, এক বিবাহের প্রথা অধিকাংশ অনুন্নত ও প্রাচীনপন্থী জাতিগুলোতে সমধিক প্রচলিত। এগুলো হচ্ছে প্রধানত শিকার নির্ভর, ফলমূল উৎপাদক ও কৃষিনির্ভর জাতি। পক্ষান্তরে বহু বিবাহ প্রথা কেবল উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অনেকখানি অগ্রসর প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই প্রচলিত। সমাজ বিজ্ঞানী ও সভ্যতার ইতিহাস প্রণেতাগণ মনে করেন অনাগতকালে বহু বিবাহ প্রথার ব্যাপকতর প্রসার অবধারিত এবং নগর জীবন ও সুসভ্য জীবনের ব্যাপ্তি ঘটার সাথে সাথে এই প্রথার অনুসারী জাতিগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। তাই এরূপ দাবি সঠিক নয় যে, বহু বিবাহ প্রথা সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে পড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট। বরং এর বিপরীত কথাই বাস্তবতার সাথে পুরোপুরিভাবে সামঞ্জস্যশীল। ঐতিহাসিক দিক দিয়েও এটা বহু বিবাহ প্রথার যথার্থ ও প্রকৃতস্বরূপ। এ সম্পর্কে খৃস্টবাদের দৃষ্টিভঙ্গীও এটাই। এ প্রথার প্রসার যতোটুকু ঘটেছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির সাথে এর যেটুকু সংশ্রব রয়েছে, এটাই তার বাস্তব রূপ। এই প্রথাকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আমরা একথা বলিনি। শুধু সত্য ও ইতিহাসের বিকৃতি উদঘাটনের জন্যই এ কথাগুলো বলেছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00