📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইহুদি ও খৃষ্টান ব্যতিত অন্যান্য কিতাবপন্থীদের সাথে বিয়ে

📄 ইহুদি ও খৃষ্টান ব্যতিত অন্যান্য কিতাবপন্থীদের সাথে বিয়ে


ইসলামী শরীয়তে ইহুদি ও খ্রিষ্টান (আহলে কিতাব) ব্যতীত অন্যান্য কিতাবপন্থীদের সাথে বিবাহের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট অনুমতি নেই। কুরআন মাজীদে শুধুমাত্র ইহুদি ও খ্রিষ্টান নারীদের (যারা সতী-সাধ্বী) বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে (সূরা মায়েদা: আয়াত ৫)। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের, যেমন—সাবেয়ী (যদি তারা মুশরিক হয়), অগ্নি উপাসক (মাজুসি), বৌদ্ধ, হিন্দু, বা অন্য কোনো কিতাবপন্থী, তাদের ক্ষেত্রে বিবাহ করা হারাম বলে গণ্য হয়, যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করে।

এই নিষেধাজ্ঞা 'মুশরিক' (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপনকারী) নারীর বিবাহ নিষিদ্ধ করার আয়াতের (সূরা বাকারা: আয়াত ২২১) অধীনে আসে। যদি কোনো ধর্মাবলম্বী আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে বিশ্বাস না করে বা শিরক করে, তাহলে তাদেরকে মুশরিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইসলামিক পন্ডিতদের মতামত:

১. সাবেয়ী: সাবেয়ীদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কিছুটা মতভেদ থাকলেও, যদি তাদের বিশ্বাসে শিরকের উপাদান থাকে (যেমন—তারা যদি তারকা বা ফেরেশতাদের উপাসনা করে), তাহলে তাদের নারীকে বিবাহ করা হারাম।

২. অগ্নি উপাসক (মাজুসি): অগ্নি উপাসকদেরকে মুসলিম পন্ডিতগণ মুশরিক হিসেবে গণ্য করেন এবং তাদের নারীকে বিবাহ করা হারাম।

৩. অন্যান্য ধর্মাবলম্বী: হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী যারা তাওহীদ বা আসমানী কিতাবের মৌলিক ধারণা পোষণ করে না এবং শিরকের সাথে জড়িত, তাদের নারীকে বিবাহ করা হারাম।

যুক্তি:

* তাওহীদের সুরক্ষা: বিবাহের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধন তৈরি হয়। যদি জীবনসঙ্গী এমন হয় যার বিশ্বাস শিরকের সাথে জড়িত, তাহলে মুসলিম পরিবারের মৌলিক তাওহীদি বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

* সন্তানের ধর্মীয় শিক্ষা: সন্তানের ধর্মীয় প্রতিপালন এবং ইসলামিক মূল্যবোধের শিক্ষাদান কঠিন হয়ে পড়ে যদি মা অমুসলিম হয় এবং তার বিশ্বাস মুসলিম বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়। ইসলামে সন্তানের ধর্ম পিতার ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত হলেও, মায়ের ধর্মীয় প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

* সামাজিক সংহতি: মুসলিম উম্মাহর সামাজিক সংহতি এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঐক্য বজায় রাখার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

সারসংক্ষেপ:

শুধুমাত্র ইহুদি ও খ্রিষ্টান নারীদের বিবাহ করার বিশেষ অনুমতি রয়েছে, তবে অন্যান্য কিতাবপন্থী বা মুশরিক নারীদের বিবাহ করা মুসলিম পুরুষের জন্য হারাম, যতক্ষণ না তারা ইসলাম গ্রহণ করে। মুসলিম পুরুষের জন্য সর্বোত্তম হলো একজন ঈমানদার মুসলিম নারীকে বিবাহ করা, যিনি তার ধর্মীয় জীবনে সহায়তা করবেন এবং সন্তানদের ইসলামিক মূল্যবোধে প্রতিপালনে অংশগ্রহণ করবেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অমুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে

📄 অমুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম নারীর বিয়ে


ইসলামে একজন মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম পুরুষকে বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম, তা সে আহলে কিতাব (ইহুদি বা খ্রিষ্টান) হোক বা মুশরিক (মূর্তিপূজারী বা অন্য কোনো অমুসলিম ধর্মাবলম্বী) হোক। এই নিষেধাজ্ঞা কুরআন ও সুন্নাহতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এবং মুসলিম উম্মাহর ইজমা (সর্বসম্মত মত) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:

وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا ۚ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ ۗ أُولَٰئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۖ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ ۖ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

“আর মুশরিক পুরুষদের সাথে (তোমাদের নারীদের) বিবাহ দিও না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনে। আর একজন ঈমানদার দাসও একজন মুশরিক পুরুষের চেয়ে উত্তম, যদিও সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। তারা (মুশরিকরা) জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ তাঁর অনুমতিক্রমে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। আর তিনি তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দেন, যেন তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা বাকারা: আয়াত ২২১)

এই আয়াতে 'মুশরিক' শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে, যা সকল অমুসলিমকে অন্তর্ভুক্ত করে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানসহ, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ না করে।

এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ ও যৌক্তিকতা:

১. কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের প্রশ্ন: ইসলামে পরিবারের প্রধান এবং সন্তানের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পুরুষকে দায়িত্বশীল ধরা হয়। যদি একজন মুসলিম নারী অমুসলিম পুরুষকে বিবাহ করে, তাহলে সেই পুরুষ মুসলিম নারীর ওপর কর্তৃত্ব করবে, যা ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম একজন মুসলিম নারীকে একজন অমুসলিমের অধীনে থাকতে অনুমতি দেয় না।

২. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সুরক্ষা: মুসলিম নারীর ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং তার ইসলামিক জীবনধারার সুরক্ষা এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। অমুসলিম পুরুষ মুসলিম নারীর ধর্মীয় অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাও হতে পারে, যা তার ঈমান এবং আমলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

৩. সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়: সন্তানের ধর্ম সাধারণত পিতার ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি মুসলিম নারীর সন্তান অমুসলিম পিতার অধীনে বড় হয়, তাহলে তার মুসলিম পরিচয় এবং ইসলামিক শিক্ষা দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইসলাম মুসলিম উম্মাহর ধারাবাহিকতা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়।

৪. ধর্মীয় মূল্যবোধের সংঘাত: মুসলিম নারীর ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং অমুসলিম পুরুষের মূল্যবোধের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, যা পারিবারিক শান্তি এবং ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর।

৫. জান্নাত ও জাহান্নামের দিকে আহ্বান: আয়াতে বলা হয়েছে যে, অমুসলিমরা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। মুসলিম নারী জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বানকারী পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া উচিত।

৬. নারীর মর্যাদা: ইসলামে মুসলিম নারীকে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অমুসলিম পুরুষের সাথে বিবাহ করাকে এই মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা হয় না।

সুতরাং, মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম পুরুষকে বিবাহ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং অবৈধ। যদি কোনো মুসলিম নারী অমুসলিম পুরুষকে বিবাহ করে, তবে সেই বিবাহ শরীয়ত অনুযায়ী বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তাদের সম্পর্ক অবৈধ হবে। এই বিধানটি মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় ভিত্তি, পারিবারিক পবিত্রতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঈমানের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00