📄 ইহরামরত ব্যক্তির বিয়ে
ইসলামে ইহরামরত ব্যক্তির (হজ্ব বা উমরাহর উদ্দেশ্যে ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তি) জন্য বিবাহ করা বা বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। এই নিষেধাজ্ঞা ইহরামের পবিত্রতা এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ বজায় রাখার জন্য আরোপ করা হয়েছে।
১. বিবাহের নিষেধাজ্ঞা: ইহরাম অবস্থায় থাকা পুরুষ বা নারী কেউই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এই বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এর কোনো শরীয়তসম্মত বৈধতা থাকবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইহরামরত ব্যক্তি নিজে বিবাহ করবে না, অন্যকে বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাবও দেবে না।” (মুসলিম)
২. বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া: ইহরাম অবস্থায় অন্য কোনো পুরুষ বা নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়াও নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা বিবাহের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক কাজকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
৩. যুক্তি: ইহরামের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি সকল ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার প্রতি মনোনিবেশ করা। বিবাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চুক্তি, যা পার্থিব আনন্দ ও সম্পর্কের সাথে জড়িত, তা এই সময়ের পবিত্রতার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই, হজ্ব বা উমরাহর সময়কালকে দুনিয়াবি ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখার জন্য এই বিধান আরোপ করা হয়েছে।
৪. ব্যতিক্রম: যদি কোনো ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করে ফেলে, তাহলে সেই বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্র হওয়া অবৈধ হবে। এই ধরনের ক্ষেত্রে, তাদেরকে অবিলম্বে আলাদা হতে হবে এবং ইহরামের অন্যান্য বিধি-নিষেধ পালন করতে হবে।
এই নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করে যে, হজ্ব ও উমরাহর সময় মানুষ আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে পূর্ণভাবে মনোযোগী থাকবে এবং কোনো পার্থিব সম্পর্ক যেন এই পবিত্র সময়ের মূল উদ্দেশ্য থেকে তাদের বিচ্যুত না করে।
📄 স্বাধীন নারী পাওয়া সত্ত্বেও দাসী বা বাদী বিয়ে করা
ইসলামে স্বাধীন নারীর বিবাহ সহজলভ্য থাকা সত্ত্বেও দাসী বা বাদী বিবাহ করার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই শর্তগুলো মূলত সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এবং স্বাধীন নারীর মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।
আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:
وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ۚ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُمْ ۚ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ ۚ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ كَمُحْصَنَاتٍ غَيْرِ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ
“তোমাদের মধ্যে যার স্বাধীন ঈমানদার নারী বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, সে তোমাদের দাসীদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদের বিবাহ করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে বেশি জানেন। তোমরা একে অপরের অংশ। সুতরাং তাদেরকে তাদের মালিকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ করো এবং তাদেরকে তাদের মোহরানা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করো, যেন তারা বিবাহিতা হয়, ব্যভিচারিণী না হয় এবং গোপন প্রেমিকা না হয়।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাসী বিবাহ করার অনুমতি কিছু নির্দিষ্ট শর্তে:
১. স্বাধীন নারী বিবাহে অক্ষমতা: দাসী বিবাহ করার প্রধান শর্ত হলো, স্বাধীন ঈমানদার নারীকে বিবাহ করার আর্থিক বা অন্য কোনো সামর্থ্য না থাকা। যদি কোনো পুরুষ স্বাধীন নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে, তাহলে দাসী বিবাহ করা তার জন্য উচিত নয়।
২. ব্যভিচারের ভয়: যদি কোনো পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ভয় করে এবং স্বাধীন নারী বিবাহ করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে দাসী বিবাহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধের একটি উপায়।
৩. দাসীর ঈমান: দাসীটিকে অবশ্যই ঈমানদার হতে হবে। অমুসলিম দাসী বিবাহ করার অনুমতি নেই।
৪. মালিকের অনুমতি: দাসীকে বিবাহ করার জন্য তার মালিকের অনুমতি অপরিহার্য। দাসীর নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই, কারণ সে অন্যের মালিকানাধীন।
৫. মোহরানা: দাসীর জন্যও মোহরানা প্রদান করতে হবে, যদিও এটি স্বাধীন নারীর মোহরানার চেয়ে কম হতে পারে। মোহরানা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করা আবশ্যক।
৬. ব্যভিচারিণী বা প্রেমিকা না হওয়া: দাসীটিকে অবশ্যই পবিত্র হতে হবে, অর্থাৎ সে ব্যভিচারিণী বা গোপন প্রেমিকা হওয়া যাবে না।
৭. সন্তানের মর্যাদা: দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বাধীন হিসেবে গণ্য হবে এবং তার পিতার বংশের অংশ হবে।
এই শর্তগুলো নির্দেশ করে যে, ইসলাম স্বাধীন নারীর মর্যাদাকে উচ্চ স্থান দিয়েছে এবং দাসী বিবাহকে কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি বিকল্প হিসেবে অনুমতি দিয়েছে, যখন স্বাধীন নারীকে বিবাহ করা সম্ভব না হয়।
📄 ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করা
ইসলামে ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ
“ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারী ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করবে না। আর ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ বিবাহ করবে না। আর মুমিনদের জন্য এটি হারাম করা হয়েছে।” (সূরা নূর: আয়াত ৩)
এই আয়াত দ্বারা নিম্নলিখিত বিধানগুলি স্পষ্ট হয়:
১. ব্যভিচারিণী নারীর বিবাহ: একজন ব্যভিচারিণী নারী বা একজন ব্যভিচারী পুরুষকে একজন মুমিন পুরুষ বা নারী বিবাহ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে।
২. তওবার শর্ত: যদি ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী তওবা করে এবং নিজেদের আচরণ সংশোধন করে, তাহলে তাদের বিবাহ করা বৈধ হতে পারে। কিন্তু তওবা না করা পর্যন্ত তাদের বিবাহ করা মুমিনদের জন্য হারাম। তওবা করার পর, ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার আগে তার ইদ্দতকাল (যদি গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) শেষ হতে হবে।
৩. বংশের বিশুদ্ধতা: ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে বংশের বিশুদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি ব্যভিচারের ফলে নারী গর্ভবতী হয়, তবে সেই গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই ইদ্দতকাল পালনের মাধ্যমে এই সমস্যা এড়ানো হয়।
৪. সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব: এই নিষেধাজ্ঞা সমাজের নৈতিক পবিত্রতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এটি ব্যভিচারের প্রতি একটি কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে এবং মুসলিমদেরকে পবিত্র জীবনযাপনের দিকে উৎসাহিত করে।
৫. মুমিনদের জন্য হারাম: আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই ধরনের বিবাহ মুমিনদের জন্য হারাম। এটি মুমিনদেরকে পবিত্র জীবনযাপন এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করে।
৬. ব্যভিচারের শাস্তি: ইসলামে ব্যভিচারের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত আছে। যদি ব্যভিচার প্রমাণিত হয় এবং শাস্তি কার্যকর হয়, তারপরেও তওবার শর্ত পূরণ হলে বিবাহ সম্ভব।
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “একজন ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার আগে তাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে এবং তার ইদ্দতকাল শেষ হতে হবে।”
এই বিধানটি সমাজের নৈতিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং মুসলিমদেরকে পবিত্র জীবনযাপনের জন্য উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
📄 যে স্ত্রীর সাথে লিয়ান হয়েছে তাকে বিয়ে করা হারাম
ইসলামে 'লিয়ান' (লি'আন) হলো একটি শপথ প্রক্রিয়া, যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটে যখন স্বামী তার স্ত্রীকে ব্যভিচারের অভিযোগ করে কিন্তু কোনো সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারে না, এবং স্ত্রী সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। এই পরিস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ই আল্লাহ তায়ালার নামে শপথ করে। লিয়ানের পর, সেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চিরতরে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং তারা একে অপরের জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায়।
কুরআন মাজীদে লিয়ানের বিধান বর্ণিত হয়েছে:
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ أَزْوَاجَهُمْ وَلَمْ يَكُن لَّهُمْ شُهَدَاءُ إِلَّا أَنفُسُهُمْ فَشَهَادَةُ أَحَدِهِمْ أَرْبَعُ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ * وَالْخَامِسَةُ أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ * وَيَدْرَأُ عَنْهَا الْعَذَابَ أَن تَشْهَدَ أَرْبَعَ شَهَادَاتٍ بِاللَّهِ إِنَّهُ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ * وَالْخَامِسَةَ أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِن كَانَتْ مِنَ الْكَاذِبِينَ
“যারা তাদের স্ত্রীদের প্রতি (ব্যভিচারের) অপবাদ আরোপ করে এবং তাদের নিজেদের ব্যতীত কোনো সাক্ষী থাকে না, তাদের একজনের সাক্ষ্য হলো আল্লাহ্র নামে চারবার শপথ করে বলা যে, সে অবশ্যই সত্যবাদী। এবং পঞ্চমবারে বলা যে, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আল্লাহ্র অভিশাপ তার ওপর পড়ুক। আর তার থেকে শাস্তি দূরীভূত হবে যদি সে আল্লাহ্র নামে চারবার শপথ করে বলে যে, স্বামী অবশ্যই মিথ্যাবাদী। এবং পঞ্চমবারে বলা যে, যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আল্লাহ্র ক্রোধ তার ওপর পড়ুক।” (সূরা নূর: আয়াত ৬-৯)
লিয়ানের পরিণতি:
১. চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ: লিয়ান সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে চূড়ান্ত বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এই বিচ্ছেদ তালাকের মতোই কার্যকর হয়, তবে এটি এমন এক ধরনের বিচ্ছেদ যেখানে তারা আর কখনো একে অপরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না।
২. হারাম সম্পর্ক: লিয়ানকৃত স্ত্রী তার প্রাক্তন স্বামীর জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায়। এর মানে হলো, এমনকি যদি তারা তওবাও করে বা তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে যায়, তবুও তারা আর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ফিরতে পারবে না।
৩. সন্তানের পিতৃত্ব: যদি স্ত্রী গর্ভবতী হয় এবং লিয়ান করা হয়, তাহলে সন্তানের পিতৃত্ব স্বামীর দিক থেকে অস্বীকার করা হয়। সন্তানকে মায়ের বংশের হিসেবে গণ্য করা হয়, এবং স্বামী সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়।
৪. ইজ্জত রক্ষা: লিয়ান হলো একটি প্রক্রিয়া যা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ইজ্জত রক্ষা করে যখন ব্যভিচারের অভিযোগের জন্য কোনো সাক্ষী থাকে না। এটি মিথ্যা অভিযোগ বা মিথ্যা অস্বীকারের শাস্তি হিসেবে কাজ করে এবং সত্যকে উদ্ঘাটনের একটি উপায়।
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “লিয়ান সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বন্ধন চিরতরে ছিন্ন হয়ে যায় এবং তারা আর কখনো একে অপরের জন্য হালাল হয় না।”
লিয়ান একটি গুরুতর বিষয় এবং এটি কেবল চরম পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা হয়, যখন পারিবারিক পবিত্রতা এবং সত্য উদ্ঘাটন অপরিহার্য হয়ে পড়ে।