📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী

📄 তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী


ইসলামে একজন স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পর সেই স্বামী পুনরায় সেই স্ত্রীকে বিবাহ করতে পারে না, যতক্ষণ না স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে বিবাহ করে, তার সাথে সহবাস করে এবং তারপর সেই স্বামী তাকে তালাক দেয় বা সে মারা যায়। এই প্রক্রিয়াকে 'হিল্লা' বলা হয়। এটি তিন তালাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যা তালাকের গুরুতর পরিণতি নির্দেশ করে।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

“যদি সে (স্বামী) তাকে (স্ত্রীকে) তৃতীয়বার তালাক দেয়, তবে সে (স্ত্রী) তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামীকে বিবাহ করে। অতঃপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের (প্রথম স্বামী ও স্ত্রী) জন্য কোনো গুনাহ নেই যে, তারা যদি আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারবে বলে ধারণা করে, তবে তারা (পুনরায়) ফিরে আসবে। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা, যা তিনি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন।” (সূরা বাকারা: আয়াত ২৩০)

এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয় যে:

১. তিন তালাকের পরিণতি: একবারে বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তিন তালাক দেওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটি আর সাধারণ তালাকের মতো নয়, যেখানে ইদ্দতকালে বা ইদ্দত শেষে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

২. হিল্লার শর্ত: প্রথম স্বামীকে সেই স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করার জন্য, স্ত্রীর জন্য অন্য পুরুষকে বিবাহ করা, তার সাথে সহবাস করা, এবং তারপর সেই দ্বিতীয় স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকপ্রাপ্ত হওয়া বা তার মৃত্যু হওয়া আবশ্যক। এই প্রক্রিয়াটি 'হিল্লা' নামে পরিচিত।

৩. উদ্দেশ্য: হিল্লার বিধানটি তালাকের ব্যাপারে মুসলিম পুরুষদেরকে দায়িত্বশীল হতে উৎসাহিত করে। এটি দ্রুত ও অপরিকল্পিত তালাক দেওয়া থেকে বিরত রাখে এবং তালাকের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এর মাধ্যমে তালাকের গুরুত্ব বোঝানো হয় এবং পারিবারিক সম্পর্ককে হালকাভাবে না নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়।

৪. দ্বিতীয় বিবাহের উদ্দেশ্য: দ্বিতীয় বিবাহটি অবশ্যই সত্যিকার অর্থে এবং স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে হতে হবে। এটি কেবল প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রীকে হালাল করার উদ্দেশ্যে সাজানো কোনো বিবাহ হলে তা শরীয়তসম্মত হবে না।

৫. জ্ঞান ও সীমা: আল্লাহ এই বিধানগুলোকে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যা বোঝায় যে, এই নিয়মগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা এবং এর লঙ্ঘন গুরুতর অপরাধ।

তিন তালাকের এই বিধানটি মুসলিম সমাজে তালাকের হার কমানো এবং পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়ার জন্য একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইহরামরত ব্যক্তির বিয়ে

📄 ইহরামরত ব্যক্তির বিয়ে


ইসলামে ইহরামরত ব্যক্তির (হজ্ব বা উমরাহর উদ্দেশ্যে ইহরাম অবস্থায় থাকা ব্যক্তি) জন্য বিবাহ করা বা বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। এই নিষেধাজ্ঞা ইহরামের পবিত্রতা এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ বজায় রাখার জন্য আরোপ করা হয়েছে।

১. বিবাহের নিষেধাজ্ঞা: ইহরাম অবস্থায় থাকা পুরুষ বা নারী কেউই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এই বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এর কোনো শরীয়তসম্মত বৈধতা থাকবে না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইহরামরত ব্যক্তি নিজে বিবাহ করবে না, অন্যকে বিবাহ করাবে না এবং বিবাহের প্রস্তাবও দেবে না।” (মুসলিম)

২. বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া: ইহরাম অবস্থায় অন্য কোনো পুরুষ বা নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়াও নিষিদ্ধ। এই নিষেধাজ্ঞা বিবাহের পূর্ব প্রস্তুতিমূলক কাজকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

৩. যুক্তি: ইহরামের মূল উদ্দেশ্য হলো দুনিয়াবি সকল ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার প্রতি মনোনিবেশ করা। বিবাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চুক্তি, যা পার্থিব আনন্দ ও সম্পর্কের সাথে জড়িত, তা এই সময়ের পবিত্রতার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই, হজ্ব বা উমরাহর সময়কালকে দুনিয়াবি ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখার জন্য এই বিধান আরোপ করা হয়েছে।

৪. ব্যতিক্রম: যদি কোনো ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় বিবাহ করে ফেলে, তাহলে সেই বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের একত্র হওয়া অবৈধ হবে। এই ধরনের ক্ষেত্রে, তাদেরকে অবিলম্বে আলাদা হতে হবে এবং ইহরামের অন্যান্য বিধি-নিষেধ পালন করতে হবে।

এই নিষেধাজ্ঞা নিশ্চিত করে যে, হজ্ব ও উমরাহর সময় মানুষ আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে পূর্ণভাবে মনোযোগী থাকবে এবং কোনো পার্থিব সম্পর্ক যেন এই পবিত্র সময়ের মূল উদ্দেশ্য থেকে তাদের বিচ্যুত না করে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 স্বাধীন নারী পাওয়া সত্ত্বেও দাসী বা বাদী বিয়ে করা

📄 স্বাধীন নারী পাওয়া সত্ত্বেও দাসী বা বাদী বিয়ে করা


ইসলামে স্বাধীন নারীর বিবাহ সহজলভ্য থাকা সত্ত্বেও দাসী বা বাদী বিবাহ করার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এই শর্তগুলো মূলত সামাজিক ও পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এবং স্বাধীন নারীর মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।

আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:

وَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ مِنكُمْ طَوْلًا أَن يَنكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِن مَّا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُم مِّن فَتَيَاتِكُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ۚ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيمَانِكُمْ ۚ بَعْضُكُم مِّن بَعْضٍ ۚ فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ وَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ كَمُحْصَنَاتٍ غَيْرِ مُسَافِحَاتٍ وَلَا مُتَّخِذَاتِ أَخْدَانٍ

“তোমাদের মধ্যে যার স্বাধীন ঈমানদার নারী বিবাহ করার সামর্থ্য নেই, সে তোমাদের দাসীদের মধ্যে যারা ঈমানদার তাদের বিবাহ করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে বেশি জানেন। তোমরা একে অপরের অংশ। সুতরাং তাদেরকে তাদের মালিকদের অনুমতিক্রমে বিবাহ করো এবং তাদেরকে তাদের মোহরানা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করো, যেন তারা বিবাহিতা হয়, ব্যভিচারিণী না হয় এবং গোপন প্রেমিকা না হয়।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৫)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, দাসী বিবাহ করার অনুমতি কিছু নির্দিষ্ট শর্তে:

১. স্বাধীন নারী বিবাহে অক্ষমতা: দাসী বিবাহ করার প্রধান শর্ত হলো, স্বাধীন ঈমানদার নারীকে বিবাহ করার আর্থিক বা অন্য কোনো সামর্থ্য না থাকা। যদি কোনো পুরুষ স্বাধীন নারীকে বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে, তাহলে দাসী বিবাহ করা তার জন্য উচিত নয়।

২. ব্যভিচারের ভয়: যদি কোনো পুরুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ভয় করে এবং স্বাধীন নারী বিবাহ করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে দাসী বিবাহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধের একটি উপায়।

৩. দাসীর ঈমান: দাসীটিকে অবশ্যই ঈমানদার হতে হবে। অমুসলিম দাসী বিবাহ করার অনুমতি নেই।

৪. মালিকের অনুমতি: দাসীকে বিবাহ করার জন্য তার মালিকের অনুমতি অপরিহার্য। দাসীর নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই, কারণ সে অন্যের মালিকানাধীন।

৫. মোহরানা: দাসীর জন্যও মোহরানা প্রদান করতে হবে, যদিও এটি স্বাধীন নারীর মোহরানার চেয়ে কম হতে পারে। মোহরানা ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করা আবশ্যক।

৬. ব্যভিচারিণী বা প্রেমিকা না হওয়া: দাসীটিকে অবশ্যই পবিত্র হতে হবে, অর্থাৎ সে ব্যভিচারিণী বা গোপন প্রেমিকা হওয়া যাবে না।

৭. সন্তানের মর্যাদা: দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান স্বাধীন হিসেবে গণ্য হবে এবং তার পিতার বংশের অংশ হবে।

এই শর্তগুলো নির্দেশ করে যে, ইসলাম স্বাধীন নারীর মর্যাদাকে উচ্চ স্থান দিয়েছে এবং দাসী বিবাহকে কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি বিকল্প হিসেবে অনুমতি দিয়েছে, যখন স্বাধীন নারীকে বিবাহ করা সম্ভব না হয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করা

📄 ব্যভিচারিণীকে বিয়ে করা


ইসলামে ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বলেছেন:

الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالزَّانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ ۚ وَحُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ

“ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারী ব্যতীত অন্য কাউকে বিবাহ করবে না। আর ব্যভিচারিণীকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষ ব্যতীত অন্য কেউ বিবাহ করবে না। আর মুমিনদের জন্য এটি হারাম করা হয়েছে।” (সূরা নূর: আয়াত ৩)

এই আয়াত দ্বারা নিম্নলিখিত বিধানগুলি স্পষ্ট হয়:

১. ব্যভিচারিণী নারীর বিবাহ: একজন ব্যভিচারিণী নারী বা একজন ব্যভিচারী পুরুষকে একজন মুমিন পুরুষ বা নারী বিবাহ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আন্তরিকভাবে তওবা করে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে।

২. তওবার শর্ত: যদি ব্যভিচারী বা ব্যভিচারিণী তওবা করে এবং নিজেদের আচরণ সংশোধন করে, তাহলে তাদের বিবাহ করা বৈধ হতে পারে। কিন্তু তওবা না করা পর্যন্ত তাদের বিবাহ করা মুমিনদের জন্য হারাম। তওবা করার পর, ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার আগে তার ইদ্দতকাল (যদি গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) শেষ হতে হবে।

৩. বংশের বিশুদ্ধতা: ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার ক্ষেত্রে বংশের বিশুদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি ব্যভিচারের ফলে নারী গর্ভবতী হয়, তবে সেই গর্ভের সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই ইদ্দতকাল পালনের মাধ্যমে এই সমস্যা এড়ানো হয়।

৪. সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব: এই নিষেধাজ্ঞা সমাজের নৈতিক পবিত্রতা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এটি ব্যভিচারের প্রতি একটি কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে এবং মুসলিমদেরকে পবিত্র জীবনযাপনের দিকে উৎসাহিত করে।

৫. মুমিনদের জন্য হারাম: আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই ধরনের বিবাহ মুমিনদের জন্য হারাম। এটি মুমিনদেরকে পবিত্র জীবনযাপন এবং আল্লাহর আদেশ মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করে।

৬. ব্যভিচারের শাস্তি: ইসলামে ব্যভিচারের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত আছে। যদি ব্যভিচার প্রমাণিত হয় এবং শাস্তি কার্যকর হয়, তারপরেও তওবার শর্ত পূরণ হলে বিবাহ সম্ভব।

ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “একজন ব্যভিচারিণী নারীকে বিবাহ করার আগে তাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে এবং তার ইদ্দতকাল শেষ হতে হবে।”

এই বিধানটি সমাজের নৈতিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং মুসলিমদেরকে পবিত্র জীবনযাপনের জন্য উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00