📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বৈবাহিক সম্পর্কভিত্তিক নিষিদ্ধ নারী

📄 বৈবাহিক সম্পর্কভিত্তিক নিষিদ্ধ নারী


বৈবাহিক সম্পর্কভিত্তিক যেসব নারীকে বিবাহ করা হারাম, তাদেরকে 'হুরমাতুল মুসাহারাত' বলা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা অস্থায়ী বা স্থায়ী হতে পারে, যা বিবাহের কারণে সৃষ্টি হয়। সূরা নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এই সম্পর্কগুলো উল্লেখ করেছেন:

وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُمْ مِنْ نِسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلَائِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِينَ مِنْ أَصْلَابِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا

“তোমাদের জন্য (হারাম করা হয়েছে) তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, যদি তোমরা তাদের সাথে সহবাস করে থাকো। যদি সহবাস না করে থাকো, তাহলে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই। এবং তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রীদেরকে (হারাম করা হয়েছে)। আর দুই বোনকে একত্রে (বিবাহ করা হারাম), তবে যা অতীত হয়ে গেছে।” (সূরা নিসা: আয়াত ২৩)

এই আয়াতে উল্লেখিত সম্পর্কগুলো নিম্নরূপ:

১. স্ত্রীর মা: স্ত্রীর সাথে বিবাহের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই স্ত্রীর মা (শাশুড়ি) এবং তার ঊর্ধ্বতন সকল নারী (যেমন—স্ত্রীর দাদী, নানী) হারাম হয়ে যায়, সহবাস হোক বা না হোক। এটি একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।

২. সৎ মেয়ে (স্ত্রীর পূর্ববর্তী স্বামীর সন্তান): যদি স্বামী তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে থাকে, তবে সেই স্ত্রীর পূর্ববর্তী স্বামীর মেয়ে (সৎ মেয়ে) এবং তাদের অধস্তন সকল নারী (যেমন—সৎ নাতনি) হারাম হয়ে যায়। যদি সহবাস না করে, তবে সৎ মেয়েকে বিবাহ করা বৈধ। এটি একটি শর্তসাপেক্ষ স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।

৩. পুত্রবধূ: নিজের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী (পুত্রবধূ) চিরতরে হারাম। দত্তক পুত্রের স্ত্রী এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না। এটি একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।

৪. দুই বোনকে একত্রে বিবাহ: একই সময়ে দুজন আপন বোনকে বিবাহ করা হারাম। তবে, যদি একজন বোনকে তালাক দেওয়া হয় বা সে মারা যায়, তাহলে তার অন্য বোনকে বিবাহ করা বৈধ। এটি একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।

৫. ফুফু ও ভাতিজি, খালা ও ভাগ্নিকে একত্রে বিবাহ: একই সময়ে একজন নারীকে তার ফুফু বা খালার সাথে অথবা একজন পুরুষকে তার ভাতিজি বা ভাগ্নির সাথে বিবাহ করা হারাম। এটিও একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা।

৬. দুধ সম্পর্কীয় স্ত্রী: দুধ সম্পর্কের কারণেও কিছু নারী হারাম হয়ে যায়, যা রক্ত সম্পর্কের মতোই। এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরবর্তী অংশে আসবে।

এই নিষেধাজ্ঞাগুলো পারিবারিক সম্পর্ক, পবিত্রতা, এবং সম্মান বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বাবার স্ত্রী

📄 বাবার স্ত্রী


বাবার স্ত্রী (সৎ মা) কে বিবাহ করা চিরতরে হারাম, সেটা নিজের জন্মদাতা পিতার স্ত্রী হোক বা দুধ পিতার স্ত্রী হোক, বা কোনো পুরুষের স্ত্রীর সাথে সহবাস করার পর সেই স্ত্রীকে তালাক দিলেও সেই স্ত্রী তার ছেলের জন্য চিরতরে হারাম। এই নিষেধাজ্ঞা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَلَا تَنكِحُوا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاءَ سَبِيلًا

“তোমাদের পিতার বিবাহিত কোনো নারীকে বিবাহ করো না, তবে যা অতীত হয়ে গেছে। এটা ছিল নিশ্চয়ই অশ্লীল ও ঘৃণ্য কাজ, আর কতই না মন্দ পথ।” (সূরা নিসা: আয়াত ২২)

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে:

১. পিতার স্ত্রী: যে কোনো পুরুষ তার পিতার বিবাহিত নারীকে (সৎ মা) বিবাহ করতে পারবে না। এই নিষেধাজ্ঞা স্থায়ী, অর্থাৎ যদি পিতা সেই স্ত্রীকে তালাকও দিয়ে থাকেন, তবুও সে তার ছেলের জন্য হারাম থাকবে।

২. ঘৃণ্য কাজ: আল্লাহ তায়ালা এই ধরনের বিবাহকে 'ফাহিশা' (অশ্লীল) এবং 'মাকত' (ঘৃণ্য) বলে উল্লেখ করেছেন, যা এর জঘন্যতাকে বোঝায়।

৩. সামাজিক প্রভাব: এই নিষেধাজ্ঞা পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্মান বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতার স্ত্রীর প্রতি পুত্র সন্তানেরা মাতার মতো সম্মান প্রদর্শন করবে, এবং এই সম্পর্কটি পবিত্র রাখা ইসলামে অপরিহার্য।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে সকল নারী দুধপানজনিত কারণে নিষিদ্ধ

📄 যে সকল নারী দুধপানজনিত কারণে নিষিদ্ধ


দুধপানজনিত কারণে যেসব নারীকে বিবাহ করা হারাম, তাদেরকে 'দুধ-মাহরাম' বলা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা রক্ত সম্পর্কের নিষেধাজ্ঞার মতোই চিরস্থায়ী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “দুধ সম্পর্কীয় কারণে যা হারাম হয়, রক্ত সম্পর্কীয় কারণেও তাই হারাম হয়।” (বুখারী, মুসলিম)

দুধপানজনিত কারণে নিষিদ্ধ নারীরা নিম্নরূপ:

১. দুধ মা: যে নারী কোনো শিশুকে দুধ পান করিয়েছেন, সেই নারী সেই শিশুর দুধ মা। এই দুধ মাকে বিবাহ করা সেই শিশুর জন্য হারাম। দুধ মায়ের মা (দুধ নানী) এবং দুধ মায়ের দাদীও হারাম।

২. দুধ বোন: একই মায়ের দুধ পানকারী নারী বা পুরুষ একে অপরের দুধ ভাই বা বোন হয়। দুধ বোনকে বিবাহ করা হারাম।

৩. দুধ কন্যা: দুধ মায়ের অন্য স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া কন্যা, বা দুধ ভাইয়ের কন্যা, বা দুধ বোনের কন্যা—এদের সকলকেই দুধ কন্যা হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের বিবাহ করা হারাম।

৪. দুধ ফুফু: পিতার দুধ বোনকে দুধ ফুফু বলা হয়। এদের বিবাহ করা হারাম।

৫. দুধ খালা: মাতার দুধ বোনকে দুধ খালা বলা হয়। এদের বিবাহ করা হারাম।

৬. দুধ ভাতিজি ও দুধ ভাগ্নি: দুধ ভাই বা দুধ বোনের কন্যাকেও বিবাহ করা হারাম।

৭. দুধ মায়ের স্বামী: দুধ মায়ের স্বামী, যিনি শিশুর দুধ পিতা, তার অন্যান্য স্ত্রীরাও শিশুর জন্য হারাম।

এই সম্পর্কগুলো দুধপানের কারণে সৃষ্টি হয় এবং রক্ত সম্পর্কের মতোই বিবাহে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হয়। এর উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক সম্পর্কগুলোকে পবিত্র রাখা এবং নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিয়ে নিষিদ্ধকরণের যৌক্তিকতা

📄 বিয়ে নিষিদ্ধকরণের যৌক্তিকতা


বিবাহ নিষিদ্ধকরণের পেছনে ইসলামের গভীর সামাজিক, নৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞাগুলো কেবল আদেশ নয়, বরং মানুষের সুস্থ পারিবারিক জীবন, পারস্পরিক সম্মান, এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য অপরিহার্য।

১. পারিবারিক পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা: রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করার প্রধান কারণ হলো পারিবারিক পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষা করা। মা, বোন, কন্যা, ফুফু, খালা—এদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করা হলে পারিবারিক কাঠামোতে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞা আত্মীয়দের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার সম্পর্ককে নির্ভেজাল রাখে, যা যৌন সম্পর্কের ঊর্ধ্বে। এটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে, যেখানে শিশুরা যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় ছাড়াই বড় হতে পারে।

২. নৈতিক অবক্ষয় রোধ: ইনসেস্ট (নিকট আত্মীয়ের সাথে যৌন সম্পর্ক) পৃথিবীর প্রায় সকল সংস্কৃতিতেই একটি গুরুতর অন্যায় হিসেবে বিবেচিত। ইসলামে এই ধরনের সম্পর্ককে 'ফাহিশা' (অশ্লীল ও জঘন্য কাজ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায়। এই নিষেধাজ্ঞা সমাজে সুস্থ যৌন সম্পর্ক এবং বিবাহের ভিত্তি স্থাপন করে।

৩. সামাজিক সংহতি: যদি নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ বৈধ হতো, তাহলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে মিশ্র সম্পর্ক তৈরি হতো, যা সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করতে পারত। এই নিষেধাজ্ঞা বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারের মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনকে উৎসাহিত করে, যা বৃহত্তর সামাজিক বন্ধন ও ঐক্য সুদৃঢ় করে।

৪. মনস্তাত্ত্বিক কারণ: মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, নিকট আত্মীয়দের মধ্যে যৌন সম্পর্ক মানব প্রকৃতিতে এক ধরনের অস্বস্তি ও মানসিক বিকৃতি তৈরি করতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞা মানুষের সহজাত শুচিতা এবং মানসিক শান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৫. জেনেটিক সুস্থতা: যদিও কুরআনে সরাসরি জেনেটিক সুস্থতার কথা উল্লেখ করা হয়নি, আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বংশানুক্রমিক বিবাহে জেনেটিক ত্রুটি এবং রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এই নিষেধাজ্ঞা পরোক্ষভাবে বংশের সুস্থতা রক্ষায় সহায়তা করে।

৬. আল্লাহর আদেশ পালন: সর্বোপরি, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ। একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহর আদেশ পালন করা ইবাদতের অংশ। এই আদেশগুলো মেনে চলার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শন করে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলে।

এই যৌক্তিকতাগুলো একত্রিত হয়ে বিবাহ নিষিদ্ধকরণের পেছনে ইসলামের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে তুলে ধরে, যা মানবজাতির কল্যাণ ও উন্নতির জন্য অপরিহার্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00