📄 বিয়ে বৈধ হওয়ার শর্ত দুটি
বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য দুটি শর্ত অপরিহার্য:
১. ইজাব-কবুল: ইজাব হলো বরের পক্ষ থেকে বিবাহে সম্মত হওয়ার প্রস্তাব, আর কবুল হলো কনের পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাবে সম্মতি জানানো। ইজাব-কবুল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শব্দে হতে হবে, যেমন—'আমি তোমাকে বিবাহ করলাম' অথবা 'আমি নিজেকে তোমার কাছে বিবাহ দিলাম'। ইজাব-কবুল অতীত কালবাচক শব্দে হওয়া উত্তম, যেমন—'আমি বিবাহ করলাম' অথবা 'আমি বিবাহ দিলাম'। কারণ, এর দ্বারা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “বিবাহের জন্য ইজাব-কবুল অপরিহার্য। যদি ইজাব-কবুল স্পষ্ট না হয়, তাহলে বিবাহ বাতিল হবে।”
২. বিবাহের বৈধতা: বিবাহটি শরীয়ত অনুযায়ী বৈধ হতে হবে। অর্থাৎ, বর ও কনের মধ্যে কোনো প্রকার নিষিদ্ধ সম্পর্ক থাকতে পারবে না, যেমন—রক্ত সম্পর্কীয় বা দুধ সম্পর্কীয় আত্মীয়তা। বিবাহের সময় কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি বা প্রতারণা থাকা যাবে না।
ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “বিবাহের বৈধতার জন্য শরীয়তসম্মত শর্তগুলো পূরণ করা আবশ্যক। যদি এই শর্তগুলো পূরণ না হয়, তাহলে বিবাহ বাতিল হবে।”
এই দুটি শর্ত পূরণ হলে বিবাহ শরীয়ত অনুযায়ী বৈধ বলে গণ্য হবে।
📄 বিয়ের সাক্ষ্য সংক্রান্ত বিধি
বিবাহের সাক্ষ্য সংক্রান্ত বিধানাবলী নিম্নরূপ:
১. সাক্ষী অপরিহার্য: বিবাহের জন্য দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন, ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী অপরিহার্য। সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বৈধ হবে না। যদি কোনো কারণে পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও দুজন নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। তবে, শুধু নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সাক্ষী ছাড়া বিবাহ হয় না।” (তিরমিযী)
২. সাক্ষীর যোগ্যতা: সাক্ষীদেরকে অবশ্যই মুসলিম, ন্যায়পরায়ণ এবং নির্ভরযোগ্য হতে হবে। যারা অসৎ বা অবিচারী, তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষীগণকে বিবাহের প্রস্তাব ও কবুলের সময় উপস্থিত থাকতে হবে এবং স্পষ্টভাবে তা শুনতে ও বুঝতে হবে।
ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “বিয়ের জন্য সাক্ষী অপরিহার্য। যদি সাক্ষী না থাকে, তাহলে বিবাহ বাতিল হবে।”
৩. ঘোষণা: বিবাহকে গোপন না রেখে সমাজে ঘোষণা করা উচিত। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এর দ্বারা বিবাহিত সম্পর্কটি বৈধতা লাভ করে এবং অবৈধ সম্পর্ক থেকে পার্থক্য সৃষ্টি হয়। ঘোষণাটি বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে, যেমন—ওয়ালিমা (বিবাহের পর ভোজ), দাওয়াত, অথবা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়া।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “বিবাহকে ঘোষণা করো এবং এর জন্য ওয়ালিমা করো।” (তিরমিযী)
এই বিধিগুলো পালন করলে বিবাহ শরীয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ হয় এবং সামাজিক বৈধতা লাভ করে।
📄 বিয়ের কার্যকারিতার শর্তাবলি
বিবাহের কার্যকারিতার জন্য নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ করা আবশ্যক:
১. মোহরানা: মোহরানা হলো বিবাহের শর্ত হিসেবে কনেকে প্রদত্ত আর্থিক বা অন্য কোনো উপহার। এটি কনের অধিকার এবং বর তা পরিশোধ করতে বাধ্য। মোহরানা নির্দিষ্ট করা আবশ্যক, তবে তা পরিশোধ না হলেও বিবাহ বৈধ থাকে। পরবর্তীতে তা পরিশোধ করতে হয়। মোহরানা কনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যা সে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারে।
২. ওয়ালিমা: ওয়ালিমা হলো বিবাহের পর বরের পক্ষ থেকে প্রদত্ত ভোজ। এটি বিবাহের ঘোষণা এবং সামাজিক স্বীকৃতির একটি অংশ। ওয়ালিমা করা মুস্তাহাব (ঐচ্ছিক কিন্তু সাওয়াবের কাজ)। এর মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বিবাহিত সম্পর্কটি পরিচিত হয়।
৩. সহবাস: বিবাহ কার্যকর হওয়ার পর বর ও কনের মধ্যে সহবাসের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বিবাহের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তবে, যদি কোনো কারণে সহবাস সম্ভব না হয়, তাহলে বিবাহ বাতিল হয় না।
৪. ভরণপোষণ: বিবাহ কার্যকর হওয়ার পর স্বামী তার স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য দায়ী। এতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা অন্তর্ভুক্ত। যদি স্বামী এই দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে স্ত্রী তার জন্য দাবি করতে পারে।
৫. তালাকের অধিকার: স্বামী এবং স্ত্রী উভয়েরই তালাকের (বিবাহবিচ্ছেদ) অধিকার রয়েছে, তবে এটি শরীয়ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্তাবলী মেনে পালন করতে হয়। তালাক একটি শেষ অবলম্বন এবং এটি অপছন্দনীয় কাজ।
এই শর্তগুলো বিবাহের সামাজিক এবং ব্যক্তিগত কার্যকারিতা নিশ্চিত করে এবং স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে।