📄 ইমাম শাফেয়ীর অভিমত
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) হিল্লা বিয়েকে মাকরূহ তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি) বলে ফতোয়া দিয়েছেন। যদিও তিনি এটিকে সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেননি, তবে এর অবৈধতা ও নিন্দনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, হিল্লা বিয়েতে একটি অসৎ উদ্দেশ্য নিহিত থাকে, যা বিবাহের পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ন করে।
ইমাম শাফেয়ীর যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
১. নিয়তের গুরুত্ব: শাফেয়ী মাযহাব নিয়তের (উদ্দেশ্যের) উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। হিল্লা বিয়েতে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার যে নিয়ত থাকে, তা বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। এই অসৎ নিয়তের কারণেই এটি নিন্দনীয়।
২. হাদিসের ব্যাখা: তিনি ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস, যেখানে হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়ের প্রতি লানত করা হয়েছে, সেটিকে মাকরূহ তাহরিমী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই লানত বিবাহের বৈধতাকে সম্পূর্ণ বাতিল না করলেও এর নৈতিকতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৩. সহবাসের শর্ত: ইমাম শাফেয়ী মনে করেন যে, যদি হিল্লাকারী ব্যক্তি সহবাস করে এবং তারপর তালাক দেয়, তাহলে সেই তালাক কার্যকর হবে এবং ইদ্দত শেষে মহিলাটি প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হতে পারে। তবে, এটি একটি বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে না এবং হিল্লাকারীর জন্য এই কাজটি নিন্দনীয়।
যদিও ইমাম শাফেয়ী হিল্লা বিয়েকে সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেননি, তবে তাঁর মাযহাবে এটিকে অত্যন্ত অপছন্দনীয় এবং অনৈতিক কাজ হিসেবে দেখা হয়, যা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত। এটি একটি কৌশল, যা তালাকের কঠোর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না।
📄 ইমাম আবু হানিফার অভিমত
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, হিল্লা বিয়ে বাহ্যত বৈধ, যদি বিবাহ চুক্তি (আকদ) এবং সহবাসের শর্ত পূরণ হয়। তবে, এর পেছনে যদি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ করার উদ্দেশ্য থাকে, তবে এটি মাকরূহ তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি) হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি এটিকে 'তাবাররুজ' বা নিন্দনীয় কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম আবু হানিফার যুক্তির ভিত্তি হলো:
১. আকদের বৈধতা: তাঁর মতে, যদি বিবাহ চুক্তিটি শরিয়তের বাহ্যিক শর্তাবলী পূরণ করে (যেমন ইজাব, কবুল, সাক্ষী, মোহরানা), তবে তা বৈধ। এমনকি যদি পক্ষগণের মনে একটি গোপন উদ্দেশ্য থাকে, তবুও আকদটি বাহ্যত শুদ্ধ।
২. সহবাসের শর্ত: আবু হানিফার মতে, স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার জন্য হিল্লাকারী পুরুষের সাথে সহবাস আবশ্যক। যদি সহবাস না হয়, তবে স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হবে না।
৩. নিন্দনীয় উদ্দেশ্য: যদিও আকদ বাহ্যত বৈধ, কিন্তু হিল্লার উদ্দেশ্য থাকার কারণে এটি মাকরূহ তাহরিমী। এটি আল্লাহর বিধানের সাথে তামাশা করার শামিল এবং এর জন্য আল্লাহ লানত করেছেন, যা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
তবে, এই বিবাহের মাধ্যমে যদি সহবাস সম্পন্ন হয় এবং তারপর তালাক দেওয়া হয়, এবং এরপর ইদ্দত পালন করা হয়, তাহলে প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী বৈধ হবে বলে আবু হানিফা মনে করেন। যদিও এই কাজটি নৈতিকভাবে নিন্দনীয় এবং এর সাথে জড়িতদের প্রতি লানত বর্ষিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফার এই ফতোয়াটি বাহ্যিক বৈধতার উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু উদ্দেশ্যগতভাবে এর নিন্দনীয়তা তিনি স্বীকার করেন।
📄 কোন বিয়ে দ্বারা তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হয়
তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী (যার প্রতি তিন তালাক দেওয়া হয়েছে) কেবল তখনই প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হবে, যখন সে অন্য একজন পুরুষের সাথে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, সেই পুরুষের সাথে সহবাস করবে, এবং তারপর সেই পুরুষের দ্বারা তালাকপ্রাপ্ত হবে অথবা সেই পুরুষ মারা যাবে। এরপর সেই স্ত্রীকে তার নতুন স্বামী থেকে ইদ্দত পালন করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পরই সে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল (বৈধ) হবে।
আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ
“যদি সে (স্বামী) তাকে (স্ত্রীকে) তালাক দেয় (অর্থাৎ তৃতীয় তালাক), তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য কোনো স্বামী গ্রহণ করে। অতঃপর সে (দ্বিতীয় স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয়, তবে তাদের উভয়ের জন্য কোনো পাপ নেই যে তারা একে অপরের কাছে ফিরে আসবে, যদি তারা মনে করে যে তারা আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে পারবে।” (সূরা আল-বাকারা: আয়াত ২৩০)
এই আয়াতের ভিত্তিতে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হওয়ার শর্তগুলো নিম্নরূপ:
১. দ্বিতীয় বিবাহ: স্ত্রীকে অবশ্যই অন্য একজন পুরুষের সাথে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। এটি কোনো কৃত্রিম বা হিল্লার উদ্দেশ্যে করা বিবাহ হবে না, বরং একটি প্রকৃত বিবাহ হতে হবে, যার উদ্দেশ্য হলো পরিবার গঠন ও স্থায়িত্ব।
২. সহবাস: দ্বিতীয় স্বামীর সাথে অবশ্যই সহবাস সম্পন্ন হতে হবে। কেবল আকদ (বিবাহ চুক্তি) যথেষ্ট নয়।
৩. দ্বিতীয় তালাক বা মৃত্যু: দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেবে, অথবা দ্বিতীয় স্বামী মারা যাবে।
৪. ইদ্দত পালন: দ্বিতীয় স্বামীর কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর বা তার মৃত্যুর পর স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে।
এই শর্তগুলো পূরণ না হলে, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ হবে না।
📄 হিল্লা বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার যৌক্তিকতা
হিল্লা বিয়ে ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে গভীর যৌক্তিকতা রয়েছে, যা শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য ও বিধানের পবিত্রতা রক্ষা করে। এই যৌক্তিকতাগুলো নিম্নরূপ:
১. তালাকের বিধানের পবিত্রতা ও গুরুত্ব রক্ষা: ইসলামে তালাক একটি গুরুতর বিষয়, যা চরম প্রয়োজনে বৈধ করা হয়েছে। তিন তালাকের বিধানের উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে তালাকের ব্যাপারে সতর্ক করা এবং এটিকে হালকাভাবে না নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা। হিল্লা বিয়ের মাধ্যমে এই বিধানের গুরুত্বকে খেলো করা হয় এবং এটিকে একটি কৌশলে পরিণত করা হয়, যা তালাকের পবিত্রতাকে নষ্ট করে।
২. বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যের পরিপন্থী: বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী সম্পর্ক, সাকিনা (শান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা), রাহমাহ (দয়া), পরিবার গঠন এবং বংশ বৃদ্ধি। হিল্লা বিয়েতে এই কোনো উদ্দেশ্যই থাকে না, বরং এটি কেবল তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ করার একটি কৌশল মাত্র। এতে বিবাহকে একটি সাময়িক চুক্তি বা খেলার বস্তুতে পরিণত করা হয়।
৩. প্রতারণা ও অসৎ উদ্দেশ্য: হিল্লা বিয়েতে একটি গোপন বা অসৎ উদ্দেশ্য থাকে, যা উভয় পক্ষ বা অন্তত এক পক্ষ জেনে থাকে। এই অসৎ উদ্দেশ্য শরিয়তের বিধানের সাথে প্রতারণার শামিল। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি অসততা প্রদর্শন ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৪. 'লানত' (অভিশাপ) বর্ষণ: রসূলুল্লাহ (সা) হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়, উভয়ের প্রতি লানত করেছেন। এই লানত প্রমাণ করে যে, এটি একটি কবিরা গুনাহ এবং আল্লাহ তা'আলা এটিকে কঠোরভাবে অপছন্দ করেন। এই অভিশাপ এই কাজের জঘন্যতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
৫. সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়: হিল্লা বিয়ে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় এবং বিবাহের পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ন করে। এটি নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ককে হালকা করে তোলে এবং অবৈধ সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে, সমাজের পারিবারিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়।
৬. নারীর সম্মানহানি: হিল্লা বিয়েতে নারীকে একটি পণ্যের মতো ব্যবহার করা হয়, যা তার সম্মান ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। একজন নারীর মানসিক ও আত্মিক মর্যাদার প্রতি এটি একটি অবমাননাকর আচরণ।
সুতরাং, হিল্লা বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ কেবল আইনি দিক থেকে নয়, বরং এর নৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকেও এর ভয়াবহতা স্পষ্ট। ইসলাম একটি সুস্থ, পবিত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই ধরনের প্রতারণামূলক ও উদ্দেশ্যহীন বিবাহ পদ্ধতির বিরোধিতা করে।