📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 হিল্লা বিয়ে সম্পর্কে শরিয়তের বিধান

📄 হিল্লা বিয়ে সম্পর্কে শরিয়তের বিধান


হিল্লা বিয়ে এমন একটি বিবাহ চুক্তি, যা একজন স্ত্রীলোককে তার প্রথম স্বামী তিন তালাক দেওয়ার পর, সেই স্বামীর জন্য পুনরায় বৈধ করার উদ্দেশ্যে করা হয়। ইসলামে এই ধরনের বিয়ে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। এর কারণ হলো, এই বিয়েতে শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য, অর্থাৎ পরিবার গঠন ও স্থায়িত্বের পরিবর্তে একটি কৃত্রিম ও সাময়িক উদ্দেশ্য থাকে।

১. ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ লানত করেছেন (অভিশাপ দিয়েছেন) হিল্লাকারীকে এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় তাকে।" (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)

২. উকবা ইবনে আমির (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আমি কি তোমাদেরকে ভাড়া করা বকরের কথা বলব না?" সাহাবিরা বললেন: "হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল!" তিনি বললেন: "সে হলো হিল্লাকারী পুরুষ।" (ইবনে মাজাহ)

এই হাদিসগুলো স্পষ্ট করে যে, হিল্লা বিয়ে একটি ঘৃণিত কাজ। এর মাধ্যমে বিবাহকে একটি খেলার বস্তুতে পরিণত করা হয় এবং তালাকের গুরুতর বিধানের প্রতি উপহাস করা হয়। যে বিয়েতে তালাকের নিয়ত থাকে বা তালাকের জন্য অন্য পুরুষকে ব্যবহার করার উদ্দেশ্য থাকে, সেই বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে বাতিল এবং পাপপূর্ণ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইবনুল কাইয়েমের অভিমত

📄 ইবনুল কাইয়েমের অভিমত


ইবনুল কাইয়েম (রহ.) হিল্লা বিয়েকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এটিকে হারাম ও বাতিল বলে গণ্য করেছেন। তার মতে, হিল্লা বিয়ে শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য ও বিধানের পরিপন্থী। তিনি বলেন:

১. হিল্লা বিয়ে একটি প্রতারণামূলক কাজ: ইবনুল কাইয়েম যুক্তি দেন যে, হিল্লা বিয়ের উদ্দেশ্য হলো তালাকের বিধানকে ফাঁকি দেওয়া এবং স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও বৈধ করা। এটি আল্লাহর বিধানের সাথে প্রতারণার শামিল।

২. এটি শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী: বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী সম্পর্ক, পরিবার গঠন এবং বংশ বৃদ্ধি। কিন্তু হিল্লা বিয়েতে এই উদ্দেশ্য থাকে না, বরং এটি একটি সাময়িক চুক্তি হিসেবে সম্পাদিত হয়, যার একমাত্র লক্ষ্য থাকে প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রীকে হালাল করা। এটি বিবাহের পবিত্রতাকে নষ্ট করে।

৩. লানতের কারণ: ইবনুল কাইয়েম হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়, উভয়ের প্রতি রসূলুল্লাহ (সা)-এর লানত (অভিশাপ) বর্ষণের হাদিসকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই লানত প্রমাণ করে যে, এটি একটি কবিরা গুনাহ।

৪. 'ভাড়া করা বকর': তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর 'ভাড়া করা বকর' উপমাটিকে হিল্লাকারীর জন্য একটি তীব্র নিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা এই কাজের জঘন্যতাকে বোঝায়।

ইবনুল কাইয়েমের মতে, যে বিয়েতে 'হিল্লা'র শর্ত থাকে বা গোপন উদ্দেশ্য থাকে, সেই বিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল এবং এর কোনো বৈধতা নেই। এমনকি যদি বিবাহ চুক্তিতে এই শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করা হয়, কিন্তু পক্ষগণের মনে এই উদ্দেশ্য থাকে, তবে সেই বিয়েও হারাম।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অভিমত

📄 ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অভিমত


ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) হিল্লা বিয়েকে সম্পূর্ণ হারাম ও বাতিল বলে ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন এবং এটিকে শরিয়তের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করেন। তাঁর মতে, হিল্লা বিয়ে একটি ফাসিক কাজ এবং এটি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিধানকে উপহাস করার শামিল।

ইমাম তাইমিয়া তাঁর যুক্তিগুলো নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করেছেন:

১. ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস: তিনি এই হাদিসটিকে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে রসূলুল্লাহ (সা) হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়, উভয়ের প্রতি লানত করেছেন। এই লানত প্রমাণ করে যে, এটি একটি গুরুতর পাপ এবং শরিয়তে এটি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

২. বিবাহের উদ্দেশ্য নস্যাৎ: ইমাম তাইমিয়া মনে করেন, বিবাহের মূল উদ্দেশ্য হলো সাকিনা (শান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রাহমাহ (দয়া) সহ একটি স্থায়ী ও পবিত্র সম্পর্ক স্থাপন করা। হিল্লা বিয়েতে এই উদ্দেশ্য থাকে না, বরং এটি কেবল তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য বৈধ করার একটি কৌশল মাত্র। এতে বিবাহকে একটি সাময়িক চুক্তি বা খেলার বস্তুতে পরিণত করা হয়।

৩. ফাসিক ও বাতিল: তাঁর মতে, যে কোনো চুক্তিতে যদি শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়, তবে সেই চুক্তি বাতিল। হিল্লা বিয়েতে তালাকের বিধানকে ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকায় এটি ফাসিক এবং বাতিল। এটি কোনোভাবেই প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রীকে হালাল করে না, কারণ বিয়েটিই অবৈধ।

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার অভিমত অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি হিল্লার উদ্দেশ্যে বিবাহ করে, তাহলে সেই বিবাহটি শরিয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হয় না। প্রথম স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক পূর্বের মতোই অবৈধ থাকে এবং স্ত্রীকে পুনরায় প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইমাম শাফেয়ীর অভিমত

📄 ইমাম শাফেয়ীর অভিমত


ইমাম শাফেয়ী (রহ.) হিল্লা বিয়েকে মাকরূহ তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি) বলে ফতোয়া দিয়েছেন। যদিও তিনি এটিকে সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেননি, তবে এর অবৈধতা ও নিন্দনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, হিল্লা বিয়েতে একটি অসৎ উদ্দেশ্য নিহিত থাকে, যা বিবাহের পবিত্রতাকে ক্ষুণ্ন করে।

ইমাম শাফেয়ীর যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:

১. নিয়তের গুরুত্ব: শাফেয়ী মাযহাব নিয়তের (উদ্দেশ্যের) উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। হিল্লা বিয়েতে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করার যে নিয়ত থাকে, তা বিবাহের মৌলিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। এই অসৎ নিয়তের কারণেই এটি নিন্দনীয়।

২. হাদিসের ব্যাখা: তিনি ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস, যেখানে হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়ের প্রতি লানত করা হয়েছে, সেটিকে মাকরূহ তাহরিমী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, এই লানত বিবাহের বৈধতাকে সম্পূর্ণ বাতিল না করলেও এর নৈতিকতাকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

৩. সহবাসের শর্ত: ইমাম শাফেয়ী মনে করেন যে, যদি হিল্লাকারী ব্যক্তি সহবাস করে এবং তারপর তালাক দেয়, তাহলে সেই তালাক কার্যকর হবে এবং ইদ্দত শেষে মহিলাটি প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হতে পারে। তবে, এটি একটি বৈধ বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে না এবং হিল্লাকারীর জন্য এই কাজটি নিন্দনীয়।

যদিও ইমাম শাফেয়ী হিল্লা বিয়েকে সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেননি, তবে তাঁর মাযহাবে এটিকে অত্যন্ত অপছন্দনীয় এবং অনৈতিক কাজ হিসেবে দেখা হয়, যা থেকে মুসলমানদের বিরত থাকা উচিত। এটি একটি কৌশল, যা তালাকের কঠোর বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00