📄 তালাক দেয়ার নিয়ত লুকিয়ে রেখে যে বিয়ে করা হয়
তালাকের নিয়ত লুকিয়ে রেখে যে বিবাহ করা হয়, তা ইসলামে বৈধ নয় এবং তা 'মুতআ' বিবাহের কাছাকাছি এক ধরনের প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই ধরনের বিবাহে উদ্দেশ্য থাকে সাময়িকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে নির্দিষ্ট সময়ের পর তালাক দেওয়া, যা সাধারণ বিবাহের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
সাধারণ বিবাহে উদ্দেশ্য থাকে স্থায়ী সম্পর্ক, পরিবার গঠন এবং বংশ বৃদ্ধি। যদি কেউ তালাকের নিয়ত লুকিয়ে রাখে এবং তা প্রকাশ না করে, তবে এটি একটি অসৎ উদ্দেশ্য এবং প্রতারণা। এই ধরনের বিবাহ শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি বিশ্বাস ও সততার ভিত্তিকে নষ্ট করে।
ফকীহদের মতে, যদি বিবাহ চুক্তির সময় তালাকের নিয়ত গোপন থাকে এবং এটি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে বিবাহটি বাতিল না হলেও এর নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইমাম আহমদের মতে, এটি মাকরূহ তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি)। অন্যান্য ইমামদের মতে, যদি বিবাহে তালাকের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে, তাহলে বাহ্যত বিবাহটি বৈধ, কিন্তু উদ্দেশ্যগতভাবে এটি মাকরুহ বা হারাম হতে পারে।
এই ধরনের বিবাহ থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা ও স্থায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করে।
📄 যৌতুক
যৌতুক হচ্ছে সেসব সামগ্রী যা স্ত্রী ও তার পরিজনরা তার জন্য প্রস্তুত করে, যাতে স্বামীর বসবাসের সময় সেগুলো তার সাথে থাকে। সমাজে এটা একটা প্রচলিত ও স্বীকৃত প্রথা, স্ত্রী ও তার পরিবার যৌতুক প্রস্তুত করে ও কন্যার বাড়িকে আসবাবপত্রে দিয়ে সুসজ্জিত করে। এটা বাসর উপলক্ষে স্ত্রীর জন্য আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টির একটা পন্থা। নাসায়ী আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ফাতেমাকে এক সেট মূল্যবান পোশাক, একটা পানির মশক, সুগন্ধিযুক্ত উদ্ভিদ ইযখির দিয়ে বানানো বালিশ যৌতুক হিসেবে দিয়েছিলেন। এটা সমাজে প্রচলিত প্রথামাত্র। আইনী দিক দিয়ে বাড়িকে সুসজ্জিত করা এবং আসবাবপত্র, বিছানা, গৃহসামগ্রী ও যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত করার দায়িত্ব স্বামীর। স্ত্রীর উপর এসবের কোনো দায় দায়িত্বই নেই, চাই তার মোহর যতোই হোক না কেন। এমনকি গৃহসামগ্রী সংগ্রহের লক্ষ্যেই যদি মোহর বাড়িয়ে দেয়া হয়ে থাকে, তথাপি এটা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। কেননা মোহর স্ত্রীর দ্বারা যৌন কামনা চরিতার্থ করার বিনিময়স্বরূপ একচ্ছত্রভাবে তারই প্রাপ্য। দাম্পত্য জীবন যাপনের জন্য গৃহসজ্জার উপকরণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মোহর নয়। মোহর নিরংকুশভাবে স্ত্রীর হক। তার পিতার, স্বামীর এবং অন্য কারো এতে কোনো হক বা অধিকার নেই।
কিন্তু মালেকি মাযহাব মতে, মোহরে স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার নেই। তাই তা থেকে নিজের জীবন যাপনের জন্য কিছু ব্যয় করা এবং তা থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা তার জন্য জায়েয নেই। অবশ্য একান্ত প্রয়োজনে সে তা থেকে কিছু ব্যয় করতে পারে এবং মোহরের পরিমাণ বেশি হলে তা থেকে সামান্য কিছু ঋণও পরিশোধ করতে পারে।
স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও নিরংকুশ প্রয়োজন পূরণে মোহরের অর্থ ব্যয় করা যাবেনা। কেননা প্রচলিত সামাজিক রীতি ও বিধি অনুসারে তার স্বামীর জন্য গৃহসজ্জা করা স্ত্রীর দায়িত্ব। এই গৃহসজ্জা তাকে বাসরের পূর্বে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত মোহরের অর্থ দিয়ে করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে বাসরের পূর্বে মোহরের কোনো অংশ না পেলে এটা তার দায়িত্ব থাকবেনা। তবে শর্ত থাকলে বা প্রচলিত রীতি থাকলে বাসরের পরে পাওয়া মোহর দিয়েই গৃহসজ্জা করতে হবে।
পারিবারিক আইন প্রণেতাগণ এক্ষেত্রে ইমাম মালেকের মাযহাবকে অনুসরণ করেছেন। পারিবারিক আইনের ৬৬ নং ধারায় বলা হয়েছে : "বাসরের পূর্বে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত মোহর দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা ও সজ্জিত করা স্ত্রীর কর্তব্য, যতোক্ষণ অন্য কোনো বিষয়ে ঐকমত্য না হয়। কিন্তু মোহরের কোনো অংশ তাৎক্ষণিকভাবে না পেলে কোনো প্রস্তুতি ও সাজসজ্জার দায়িত্ব স্ত্রীর উপর থাকবে না। অবশ্য ঐকমত্য ও স্বীকৃত সমাজরীতি অনুযায়ী যা করা প্রয়োজন, সেটুকু করতে হবে।"-পারিবারিক আইন, ড. ইউসুফ মূসা, পৃ. ২১৪।
স্ত্রী যখন নিজের অর্থ দিয়ে গৃহসামগ্রী কিনবে, কিংবা তার পিতা তার জন্য কিনবে, তখন তা তার একচ্ছত্র ও নিরংকুশ সম্পত্তি। স্বামী বা অন্য কারো তাতে কোনো অধিকার থাকবেনা। তবে সে ইচ্ছা করলে স্বামীকে ও তার অতিথিদেরকে তা ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে। আবার ইচ্ছা করলে নাও দিতে পারে। না দিতে চাইলে তাকে বাধ্য করা যাবেনা। ইমাম মালেকের মতে, প্রচলিত রীতি মোতাবেক স্ত্রীর গৃহসামগ্রী ব্যবহার করা স্বামীর জন্য বৈধ।
📄 স্ত্রীর মনস্তুষ্টির জন্য স্বামীর সাজসজ্জা
স্ত্রীর মনস্তুষ্টির খাতিরে স্বামীর সাজসজ্জা করা মুস্তাহাব। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: আমার স্ত্রী যেমন আমার জন্য সাজগোজ করে, আমিও তেমনি তার জন্য সাজগোজ করি। আমি তার কাছ থেকে সমস্ত অধিকার কড়ায় গণ্ডায় আদায় করা পছন্দ করিনা। কেননা তাহলে সেও আমার কাছ থেকে সকল অধিকার কড়ায় গণ্ডায় আদায় করতে চাইবে। আল্লাহ নিজেই তো বলেছেন: "স্ত্রীদের নিকট স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি স্বামীর নিকটও স্ত্রীদেরও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে।"
ইবনে আব্বাসের এই উক্তি সম্পর্কে কুরতুবী বলেন, আলেমগণ বলেছেন: “পুরুষদের সাজসজ্জার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। এটা নির্ভর করবে তারা তাদের বিচক্ষণতা ও পারিপার্শ্বিকতার সাথে সাযুজ্যকে কিভাবে বাস্তব রূপ দেবে তার উপর। কোনো বিশেষ ধরনের সাজসজ্জা চলমান সময়ের উপযোগী মনে হতে পারে, আবার কোনোটা অনুপযোগী মনে হতে পারে। কোনোটা যুবকদের উপযোগী ও বৃদ্ধদের অনুপযোগী হতে পারে। আবার কোনোটা যুবকদের অনুপযোগী ও বৃদ্ধদের উপযোগী হতে পারে। অনুরূপ, পোশাকের ব্যাপারেও। এসব কিছুতেই স্ত্রীর অধিকার ও মনোরঞ্জনকেই প্রাধান্য দিতে হবে এবং এভাবেই তার নিকট গ্রহণযোগ্যতা ও তার কামনা বাসনার সাথে সাযুজ্য অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। মূল লক্ষ্য হওয়া চাই স্ত্রীর ভালো লাগে ও তাকে আনন্দ দেয় এমন সাজসজ্জা, যাতে সে অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়। আর সুগন্ধী ব্যবহার, দাঁত পরিষ্কার করা, খিলাল করা, শরীর পরিষ্কার করা, অপ্রয়োজনীয় চুল ও লোম দূর করা, পাক পবিত্র থাকা, নখকাটা- এসব কিছু স্পষ্টতই সবার কাছে কাম্য। বুড়োদের জন্য পাকা চুলে মেহেদী দেয়া এবং যুবাবৃদ্ধ সবার জন্য আংটি ব্যবহার করা উত্তম সাজসজ্জা। আংটি পুরুষের বৈধ অলংকার। তাছাড়া পুরুষদের প্রতি স্ত্রীর চাহিদার প্রকৃত সময়টি জানা এবং তাকে ভিন্ন পুরুষের প্রতি আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখাও স্বামীর কর্তব্য। যদি কখনো স্ত্রীর যৌন চাহিদা পূরণে স্বামী নিজের ভেতরে দুর্বলতা রয়েছে বলে অনুভব করে, তবে তার যৌন ক্ষমতাবর্ধক ওষুধ সেবন করা উচিত, যাতে করে স্ত্রীকে ভিন্ন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে বিরত রাখা যায়। তবে এ উদ্দেশ্যে কিছু লোক গাঁজা, আফিম ইত্যাদি মাদক সেবনের ন্যায় ধ্বংসাত্মক ও ভুল পথে পা বাড়িয়েছে, যা একদিকে যৌন ক্ষমতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া এবং নিজের উপর ও নিজের পরিবারের উপর যুলুম ও অপরাধ করার নামান্তর। আলেমগণ সর্বসম্মতভাবে রায় দিয়েছেন যে, গাঁজা, আফিম প্রভৃতি মাদক সেবন সম্পূর্ণ হারাম ও মদপানের মতো শাস্তিযোগ্য। আর যে ব্যক্তি একে হালাল মনে করবে, সে ইসলাম থেকে মুরতাদ ও কাফের হয়ে যাবে। আর স্ত্রীর সাথে তার চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ অনিবার্য।
📄 বিয়ে পূর্বের খুতবা
বিয়ের আকদ সম্পাদনকারী বা অন্য কেউ বিয়ের আগে কমের পক্ষে আল্লাহর প্রশংসা ও রসূলুল্লাহ সা. এর জন্য দরূদ সম্বলিত একটা খুতবা বা ভাষণ দেবে। এটা মুস্তাহাব।