📄 কনে কর্তৃক বরকে দেখা
যেমন বর কনেকে দেখতে পারে, তেমনি কনেও বরকে দেখতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো, কনের বরের প্রতি সম্মতি এবং মানসিক স্বস্তি তৈরি করা। এই দেখা শরিয়তসম্মত উপায়ে হতে হবে।
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যদি কোনো মহিলা কোনো পুরুষকে দেখে, আর তার সৌন্দর্য তার মনে ধরে, তবে যেনো তা প্রকাশ না করে।" (মুসলিম)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কনেরও বরকে দেখার অধিকার আছে, এবং বরেরও উচিত তার ভালো দিকগুলো কনের সামনে প্রকাশ করা। এর ফলে, একটি সুখী ও স্থিতিশীল বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
📄 দৌরুতন সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া
বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পূর্বে পাত্র-পাত্রীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দৌরুতন বলতে এমন কিছু গোপন ত্রুটিকে বোঝানো হয়েছে যা বিবাহের পর সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে। এক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী উভয়েরই একে অপরের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা অবস্থা সম্পর্কে অবহিত থাকা উচিত, যা তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
১. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যদি কোনো পুরুষ কোনো মহিলাকে দেখে, আর তার সৌন্দর্য তার মনে ধরে, তবে যেনো তা প্রকাশ না করে।" (মুসলিম)
২. জাবির (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেছেন: "আমি একজন মহিলাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন: 'তুমি কি তাকে দেখেছ?' আমি বললাম: 'না।' তিনি বললেন: 'তবে তাকে দেখো, কারণ এতে তোমাদের দুজনের মধ্যে ভালোবাসা জন্মাবে।" (মুসলিম)
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, পাত্র-পাত্রী উভয়েরই একে অপরকে দেখার এবং পছন্দ করার অধিকার রয়েছে। তবে, এই দেখার উদ্দেশ্য কেবল শারীরিক সৌন্দর্য নয়, বরং উভয়ের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা লাভ করাও জরুরি। যদি কোনো গুরুতর শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থাকে যা বৈবাহিক জীবনে প্রভাব ফেলবে, তবে তা স্বচ্ছতার সাথে জানানো উচিত।
📄 পাত্র ও পাত্রীর নির্জনে মিলিত হওয়া নিষিদ্ধ
বিবাহের প্রস্তাবিত পাত্র ও পাত্রীর জন্য আকদ (বিবাহ চুক্তি) সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে নির্জনে মিলিত হওয়া বা একাকী অবস্থান করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এটি ইসলামে ফেতনা (বিশৃঙ্খলা ও পাপ) থেকে বাঁচার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান।
১. ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "কোনো পুরুষ যেনো কোনো মাহরাম মহিলা ব্যতীত অন্য কোনো মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত না হয়, এবং কোনো মহিলা যেনো কোনো মাহরাম পুরুষ ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষকে সাথে নিয়ে সফর না করে।" (বুখারি, মুসলিম)
২. উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "কোনো পুরুষ যখন কোনো মহিলার সাথে নির্জনে থাকে, তখন শয়তান তাদের তৃতীয় জন হয়।" (তিরমিযি)
এই হাদিসগুলো স্পষ্ট করে যে, বিবাহ-পূর্ব সম্পর্ক বা প্রস্তাবের সময়ও পাত্র-পাত্রীর মধ্যে নির্জনতা ইসলামে নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, নির্জনতা পাপের পথ খুলে দেয় এবং শয়তান মানুষকে খারাপ কাজে প্ররোচিত করার সুযোগ পায়। বিবাহের পবিত্রতা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য এই বিধানটি অত্যন্ত জরুরি।
📄 নির্জন সাক্ষাতের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের যুক্তি ও তার সম্ভাব্য কুফল
ইসলামে পাত্র ও পাত্রীর বিবাহ-পূর্ব নির্জন সাক্ষাতের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিছু লোক নির্জন সাক্ষাতের ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শন করে, যার পেছনে তারা বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে। তবে, শরিয়তের দৃষ্টিতে এই যুক্তিগুলো দুর্বল এবং এর সম্ভাব্য কুফলগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ।
শৈথিল্য প্রদর্শনের যুক্তি:
* 'মনের মিল' বা 'পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য নির্জনতা জরুরি': অনেকে মনে করে, বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে নির্জনে দীর্ঘ আলোচনা না হলে তারা একে অপরকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে না এবং এতে ভবিষ্যতে সম্পর্কে সমস্যা হতে পারে।
* 'আধুনিকতা ও উদারতা': কিছু লোক এটিকে আধুনিক সমাজের একটি অংশ মনে করে এবং এটিকে 'উদারতা' বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। তাদের মতে, ইসলামে এ বিষয়ে কঠোরতা অযৌক্তিক।
* 'পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস': অনেকে দাবি করে যে, তাদের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে, শয়তানের প্ররোচনা তাদের উপর প্রভাব ফেলবে না।
সম্ভাব্য কুফল:
* ফেতনা ও পাপের পথ উন্মুক্ত হওয়া: ইসলামে নির্জনতার নিষেধাজ্ঞা মূলত ফেতনা ও পাপের পথ বন্ধ করার জন্য। নির্জনতা শয়তানকে প্ররোচিত করার সুযোগ দেয়, যা অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করতে পারে। রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "কোনো পুরুষ যখন কোনো মহিলার সাথে নির্জনে থাকে, তখন শয়তান তাদের তৃতীয় জন হয়।" (তিরমিযি)। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের মানসিকতার উপর শয়তানের প্রভাব কত শক্তিশালী, এমনকি যদি তারা নিজেদেরকে 'বিশ্বাসী' মনে করে।
* মিথ্যা বোঝাপড়া: নির্জন সাক্ষাতে আবেগপ্রবণ আলোচনা আসল চরিত্র বা উদ্দেশ্যকে গোপন করতে পারে। মানুষ সাধারণত নিজেদের সেরা দিকটিই তুলে ধরে এবং ত্রুটিগুলো লুকিয়ে রাখে, যা পরবর্তীতে সমস্যার সৃষ্টি করে। এতে 'মনের মিল' এর নামে একটি মিথ্যা ধারণার সৃষ্টি হতে পারে।
* সামাজিক কলঙ্ক: বিবাহপূর্ব নির্জন সাক্ষাত সমাজে ভুল বার্তা দেয় এবং পাত্র-পাত্রী উভয়ের সম্মান ক্ষুণ্ন করতে পারে। এটি সমাজে অবৈধ সম্পর্কের প্রতি উৎসাহিত করে এবং নৈতিকতার মানদণ্ডকে দুর্বল করে দেয়।
* অবিশ্বাস ও সন্দেহ: যদি কোনো পক্ষ এই নির্জন সাক্ষাতের বিষয়ে সন্দেহপ্রবণ হয়, তবে বিবাহের পরেও অবিশ্বাস ও সন্দেহের বীজ বুনতে পারে, যা সুস্থ সম্পর্ক বিকাশে বাধা দেয়।
* বিবাহ বন্ধনের পবিত্রতা নষ্ট: বিবাহের পবিত্রতা ও গুরুত্ব হলো এটি একটি সুসংগঠিত ও দায়িত্বশীল চুক্তি। নির্জন সাক্ষাতে শৈথিল্য প্রদর্শন বিবাহের এই পবিত্রতাকে খাটো করে এবং এটিকে একটি সাধারণ সম্পর্কের মতো করে তোলে।
ইসলাম এসব কুফল থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্যই নির্জনতার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর পরিবর্তে, প্রস্তাবিত পাত্র-পাত্রী একে অপরের সঙ্গে অভিভাবকের উপস্থিতিতে বা জনসমক্ষে কথা বলতে পারে, এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।