📄 বিয়ের শরয়ী বিধান
বিবাহের শরয়ী বিধান হচ্ছে, সাধারণত এটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এটি এমন ব্যক্তিদের জন্য মুস্তাহাব যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে এবং সহবাসের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। যারা সহবাসে অক্ষম অথবা সহবাসের আকাঙ্ক্ষা নেই, তাদের জন্য এটা বৈধ। আবার এটা ওয়াজিবও হতে পারে, যদি কেউ সহবাসের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে এবং বিবাহ না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। এমন ব্যক্তি যদি বিবাহ না করে, তবে সে গুনাহগার হবে। পক্ষান্তরে যারা বিবাহ করলে নিজেদের দীনদারী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করে, তাদের জন্য বিবাহ মাকরূহ।
বিবাহের মাসয়ালা:
১. বিবাহকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে:
* আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "চারটি গুণের জন্য স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দীনদারী। তুমি দীনদারী দেখে বিবাহ করো, তাহলে তোমার হাতে বরকত আসবে।" (বুখারি, মুসলিম)
* আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করার পর যে জিনিসের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ কল্যাণ অর্জন করতে পারে তা হলো: সতী সাধ্বী স্ত্রী। স্বামী তাকে আদেশ করলে মেনে চলে, স্বামী তাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়, স্বামী শপথ করলে তা রক্ষা করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও সততা রক্ষা করে।" (ইবনে মাজাহ)
২. ইসলামের বিধান হলো, বিয়ে না করে সারা জীবন অবিবাহিত থাকা অনুমোদিত নয়। বিয়ে করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত পালন করতেন এবং তার গুরুত্বের উপর জোর দিতেন)। যারা শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রাখে, তাদের জন্য বিয়ে করা অত্যন্ত উৎসাহিত।
* ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "ইসলামে কারো চিরকুমার থাকা ও হজ্জবিহীন থাকা অনুমোদিত নয়।" (বায়হাকি)
৩. আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও বিবাহ করা যেতে পারে, যদি সে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে।
* আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "তোমাদের মধ্য থেকে যারা অবিবাহিত পুরুষ ও নারী এবং তোমাদের সৎ দাস-দাসী, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করো। যদি তারা দরিদ্র হয়, তাহলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত ও সর্বজ্ঞানী।" (সূরা আন-নূর: আয়াত ৩২)
* আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত, তিনি তোমাদেরকে সচ্ছলতা দেবেন।" (তিরমিযি)
* আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত: "রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "যদি সে আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দেবেন।" (আবু দাউদ)
📄 কনে নির্বাচন করা
ইসলামে কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা বরকে একটি সফল ও বরকতময় বৈবাহিক জীবন শুরু করতে সাহায্য করে। এই নির্বাচনের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত দীনদারী ও উত্তম চরিত্র।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “স্ত্রীলোককে চারটি গুণের জন্য বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দীনদারী। তুমি দীনদারী দেখে বিবাহ করো, তাহলে তোমার হাতে বরকত আসবে।” (বুখারি, মুসলিম ও অন্য চারটি হাদিস গ্রন্থ)
এই হাদিসটি কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীনদারীর গুরুত্ব তুলে ধরে। যদিও ধন-সম্পদ, বংশ মর্যাদা ও সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের পছন্দের বিষয় হতে পারে, তবে দীনদারীকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। এর কারণ হলো, দীনদারীই একজন নারীর চরিত্রকে উত্তম করে তোলে এবং পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। একজন দীনদার স্ত্রী কেবল স্বামীর প্রতি অনুগতই থাকে না, বরং সন্তানদেরকেও ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ফলে, দীনদারী পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং পরকালীন সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
📄 তালাক দেয়ার নিয়ত লুকিয়ে রেখে যে বিয়ে করা হয়
তালাকের নিয়ত লুকিয়ে রেখে যে বিবাহ করা হয়, তা ইসলামে বৈধ নয় এবং তা 'মুতআ' বিবাহের কাছাকাছি এক ধরনের প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই ধরনের বিবাহে উদ্দেশ্য থাকে সাময়িকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে নির্দিষ্ট সময়ের পর তালাক দেওয়া, যা সাধারণ বিবাহের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
সাধারণ বিবাহে উদ্দেশ্য থাকে স্থায়ী সম্পর্ক, পরিবার গঠন এবং বংশ বৃদ্ধি। যদি কেউ তালাকের নিয়ত লুকিয়ে রাখে এবং তা প্রকাশ না করে, তবে এটি একটি অসৎ উদ্দেশ্য এবং প্রতারণা। এই ধরনের বিবাহ শরিয়তের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি বিশ্বাস ও সততার ভিত্তিকে নষ্ট করে।
ফকীহদের মতে, যদি বিবাহ চুক্তির সময় তালাকের নিয়ত গোপন থাকে এবং এটি প্রকাশ না করা হয়, তাহলে বিবাহটি বাতিল না হলেও এর নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইমাম আহমদের মতে, এটি মাকরূহ তাহরিমী (হারামের কাছাকাছি)। অন্যান্য ইমামদের মতে, যদি বিবাহে তালাকের শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকে, তাহলে বাহ্যত বিবাহটি বৈধ, কিন্তু উদ্দেশ্যগতভাবে এটি মাকরুহ বা হারাম হতে পারে।
এই ধরনের বিবাহ থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ এটি দাম্পত্য জীবনের পবিত্রতা ও স্থায়িত্বকে ক্ষুণ্ন করে।
📄 যৌতুক
যৌতুক হচ্ছে সেসব সামগ্রী যা স্ত্রী ও তার পরিজনরা তার জন্য প্রস্তুত করে, যাতে স্বামীর বসবাসের সময় সেগুলো তার সাথে থাকে। সমাজে এটা একটা প্রচলিত ও স্বীকৃত প্রথা, স্ত্রী ও তার পরিবার যৌতুক প্রস্তুত করে ও কন্যার বাড়িকে আসবাবপত্রে দিয়ে সুসজ্জিত করে। এটা বাসর উপলক্ষে স্ত্রীর জন্য আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টির একটা পন্থা। নাসায়ী আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ফাতেমাকে এক সেট মূল্যবান পোশাক, একটা পানির মশক, সুগন্ধিযুক্ত উদ্ভিদ ইযখির দিয়ে বানানো বালিশ যৌতুক হিসেবে দিয়েছিলেন। এটা সমাজে প্রচলিত প্রথামাত্র। আইনী দিক দিয়ে বাড়িকে সুসজ্জিত করা এবং আসবাবপত্র, বিছানা, গৃহসামগ্রী ও যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস প্রস্তুত করার দায়িত্ব স্বামীর। স্ত্রীর উপর এসবের কোনো দায় দায়িত্বই নেই, চাই তার মোহর যতোই হোক না কেন। এমনকি গৃহসামগ্রী সংগ্রহের লক্ষ্যেই যদি মোহর বাড়িয়ে দেয়া হয়ে থাকে, তথাপি এটা স্ত্রীর দায়িত্ব নয়। কেননা মোহর স্ত্রীর দ্বারা যৌন কামনা চরিতার্থ করার বিনিময়স্বরূপ একচ্ছত্রভাবে তারই প্রাপ্য। দাম্পত্য জীবন যাপনের জন্য গৃহসজ্জার উপকরণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মোহর নয়। মোহর নিরংকুশভাবে স্ত্রীর হক। তার পিতার, স্বামীর এবং অন্য কারো এতে কোনো হক বা অধিকার নেই।
কিন্তু মালেকি মাযহাব মতে, মোহরে স্ত্রীর একচ্ছত্র অধিকার নেই। তাই তা থেকে নিজের জীবন যাপনের জন্য কিছু ব্যয় করা এবং তা থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা তার জন্য জায়েয নেই। অবশ্য একান্ত প্রয়োজনে সে তা থেকে কিছু ব্যয় করতে পারে এবং মোহরের পরিমাণ বেশি হলে তা থেকে সামান্য কিছু ঋণও পরিশোধ করতে পারে।
স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও নিরংকুশ প্রয়োজন পূরণে মোহরের অর্থ ব্যয় করা যাবেনা। কেননা প্রচলিত সামাজিক রীতি ও বিধি অনুসারে তার স্বামীর জন্য গৃহসজ্জা করা স্ত্রীর দায়িত্ব। এই গৃহসজ্জা তাকে বাসরের পূর্বে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত মোহরের অর্থ দিয়ে করতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে বাসরের পূর্বে মোহরের কোনো অংশ না পেলে এটা তার দায়িত্ব থাকবেনা। তবে শর্ত থাকলে বা প্রচলিত রীতি থাকলে বাসরের পরে পাওয়া মোহর দিয়েই গৃহসজ্জা করতে হবে।
পারিবারিক আইন প্রণেতাগণ এক্ষেত্রে ইমাম মালেকের মাযহাবকে অনুসরণ করেছেন। পারিবারিক আইনের ৬৬ নং ধারায় বলা হয়েছে : "বাসরের পূর্বে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাপ্ত মোহর দ্বারা ভারসাম্যপূর্ণভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা ও সজ্জিত করা স্ত্রীর কর্তব্য, যতোক্ষণ অন্য কোনো বিষয়ে ঐকমত্য না হয়। কিন্তু মোহরের কোনো অংশ তাৎক্ষণিকভাবে না পেলে কোনো প্রস্তুতি ও সাজসজ্জার দায়িত্ব স্ত্রীর উপর থাকবে না। অবশ্য ঐকমত্য ও স্বীকৃত সমাজরীতি অনুযায়ী যা করা প্রয়োজন, সেটুকু করতে হবে।"-পারিবারিক আইন, ড. ইউসুফ মূসা, পৃ. ২১৪।
স্ত্রী যখন নিজের অর্থ দিয়ে গৃহসামগ্রী কিনবে, কিংবা তার পিতা তার জন্য কিনবে, তখন তা তার একচ্ছত্র ও নিরংকুশ সম্পত্তি। স্বামী বা অন্য কারো তাতে কোনো অধিকার থাকবেনা। তবে সে ইচ্ছা করলে স্বামীকে ও তার অতিথিদেরকে তা ব্যবহারের অনুমতি দিতে পারে। আবার ইচ্ছা করলে নাও দিতে পারে। না দিতে চাইলে তাকে বাধ্য করা যাবেনা। ইমাম মালেকের মতে, প্রচলিত রীতি মোতাবেক স্ত্রীর গৃহসামগ্রী ব্যবহার করা স্বামীর জন্য বৈধ।