📄 বিয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান
ইসলাম মানুষের জন্য বিবাহকে এমন একটি প্রাকৃতিক রীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা ছাড়া নারী ও পুরুষের স্বাভাবিক জীবন অসম্ভব। আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا
“তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে একটি মাত্র প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া বানিয়েছেন, যাতে সে তার কাছে স্বস্তি লাভ করে।” (সূরা আল-আ'রাফ: আয়াত ১৮৯)
অন্যত্র বলেছেন:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“আর তাঁর নিদর্শনসমূহের অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে স্বস্তি লাভ করো এবং তোমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা আর-রূম: আয়াত ২১)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও বিবাহকে উৎসাহিত করেছেন এবং তাকে জীবনের একটি অপরিহার্য প্রয়োজনরূপে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন:
১. ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্য থেকে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কেননা তা চোখের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে পবিত্র রাখে। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখেনা, সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা তার কাম প্রবৃত্তিকে দমন করে দেয়।” (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ)
২. আবু আইয়ুব আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “চারটি জিনিস নবীদের রীতি: লজ্জা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মেসওয়াক করা ও বিয়ে করা।” (তিরমিযি)
৩. আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পৃথিবী ভোগ করার একটি উপকরণ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপকরণ হলো সতী সাধ্বী স্ত্রী।” (মুসলিম)
৪. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ আমাকে যে জীবন ব্যবস্থা দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাতে বিয়ে করতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।” (বায়হাকি)
৫. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর দায়িত্ব: ১. আল্লাহর পথে যুদ্ধরত ব্যক্তি, ২. নিজের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ সংগ্রহে সচেষ্ট ব্যক্তি, এবং ৩. নিজের সততা রক্ষার উদ্দেশ্যে বিয়ে করার উদ্যোগ গ্রহণকারী ব্যক্তি।” (তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)
৬. আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা বিয়ে করো। এতে বংশ বৃদ্ধি পাবে। আমি কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের ওপর তোমাদের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করব।” (আবদুর রাজ্জাক)
৭. আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “স্ত্রীলোকের চারটি গুণের জন্য তাকে বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দীনদারী। তুমি দীনদারী দেখে বিবাহ করো, তাহলে তোমার হাতে বরকত আসবে।” (বুখারি, মুসলিম ও অন্য চারটি হাদিস গ্রন্থ)
৮. জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “চারটি বিষয় চরম সৌভাগ্যের লক্ষণ: ১. সতী সাধ্বী স্ত্রী, ২. নেক সন্তান, ৩. সৎ প্রতিবেশী, এবং ৪. নিজ শহরে জীবিকা উপার্জন।” (হাকেম)
৯. আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করার পর যে জিনিসের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ কল্যাণ অর্জন করতে পারে তা হলো: সতী সাধ্বী স্ত্রী। স্বামী তাকে আদেশ করলে মেনে চলে, স্বামী তাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়, স্বামী শপথ করলে তা রক্ষা করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও সততা রক্ষা করে।” (ইবনে মাজাহ)
১০. আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পৃথিবী ভোগ করার উপকরণ, আর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপকরণ হলো সতী সাধ্বী স্ত্রী।” (মুসলিম)
📄 বিয়ের উপকারিতা
বিবাহের অনেক উপকারিতা রয়েছে, যা মানুষের ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ নিশ্চিত করে। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
১. নফসের পবিত্রতা ও পাপ থেকে সুরক্ষা: বিবাহ মানুষের প্রবৃত্তিকে পবিত্র রাখে এবং তাকে যাবতীয় গুনাহ ও অপকর্ম থেকে রক্ষা করে। বিশেষত যুবক-যুবতীদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা তাদের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে।
২. মানবজাতির বংশ বৃদ্ধি: বিবাহের মাধ্যমে মানবজাতির বংশ বৃদ্ধি হয়, যা পৃথিবীর আবাদ ও উন্নতির জন্য অপরিহার্য। রসূলুল্লাহ (সা) তার উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে কিয়ামতের দিন গর্ব করার কথা বলেছেন।
৩. পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা: বিবাহ পরিবার গঠন করে, যা সমাজের মূল ভিত্তি। একটি স্থিতিশীল পরিবার একটি স্থিতিশীল সমাজের জন্ম দেয়, যেখানে শান্তি ও সৌহার্দ্য বিরাজ করে।
৪. মানসিক শান্তি ও প্রশান্তি: বিবাহিত জীবন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক শান্তি ও স্বস্তি নিয়ে আসে, যা আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তিনি তাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।
৫. দীনদারী ও আখিরাতের উন্নতি: সতী সাধ্বী স্ত্রী স্বামীর দীনদারী রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং আখিরাতের জীবনে কল্যাণ নিশ্চিত করে। বিবাহের মাধ্যমে অর্জিত সওয়াব ব্যক্তির আমলনামায় যুক্ত হয়।
৬. পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতা: স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে জীবনযাপন করে। তারা পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল হয় এবং যৌথভাবে পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করে।
৭. কাম প্রবৃত্তির স্বাভাবিক পরিতৃপ্তি: বিবাহের মাধ্যমে মানবীয় কাম প্রবৃত্তির স্বাভাবিক ও বৈধ পরিতৃপ্তি ঘটে, যা অবৈধ সম্পর্ক থেকে মানুষকে বিরত রাখে।
এই উপকারিতাগুলো মানুষকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে উৎসাহিত করে এবং এর গুরুত্ব তুলে ধরে।
📄 বিয়ের শরয়ী বিধান
বিবাহের শরয়ী বিধান হচ্ছে, সাধারণত এটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এটি এমন ব্যক্তিদের জন্য মুস্তাহাব যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে এবং সহবাসের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। যারা সহবাসে অক্ষম অথবা সহবাসের আকাঙ্ক্ষা নেই, তাদের জন্য এটা বৈধ। আবার এটা ওয়াজিবও হতে পারে, যদি কেউ সহবাসের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে এবং বিবাহ না করলে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। এমন ব্যক্তি যদি বিবাহ না করে, তবে সে গুনাহগার হবে। পক্ষান্তরে যারা বিবাহ করলে নিজেদের দীনদারী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা করে, তাদের জন্য বিবাহ মাকরূহ।
বিবাহের মাসয়ালা:
১. বিবাহকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে:
* আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "চারটি গুণের জন্য স্ত্রীলোককে বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দীনদারী। তুমি দীনদারী দেখে বিবাহ করো, তাহলে তোমার হাতে বরকত আসবে।" (বুখারি, মুসলিম)
* আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করার পর যে জিনিসের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ কল্যাণ অর্জন করতে পারে তা হলো: সতী সাধ্বী স্ত্রী। স্বামী তাকে আদেশ করলে মেনে চলে, স্বামী তাকে দেখলে মন প্রফুল্ল হয়, স্বামী শপথ করলে তা রক্ষা করে এবং স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও সততা রক্ষা করে।" (ইবনে মাজাহ)
২. ইসলামের বিধান হলো, বিয়ে না করে সারা জীবন অবিবাহিত থাকা অনুমোদিত নয়। বিয়ে করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা (যা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত পালন করতেন এবং তার গুরুত্বের উপর জোর দিতেন)। যারা শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রাখে, তাদের জন্য বিয়ে করা অত্যন্ত উৎসাহিত।
* ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "ইসলামে কারো চিরকুমার থাকা ও হজ্জবিহীন থাকা অনুমোদিত নয়।" (বায়হাকি)
৩. আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও বিবাহ করা যেতে পারে, যদি সে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে।
* আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: "তোমাদের মধ্য থেকে যারা অবিবাহিত পুরুষ ও নারী এবং তোমাদের সৎ দাস-দাসী, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করো। যদি তারা দরিদ্র হয়, তাহলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত ও সর্বজ্ঞানী।" (সূরা আন-নূর: আয়াত ৩২)
* আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত, তিনি তোমাদেরকে সচ্ছলতা দেবেন।" (তিরমিযি)
* আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত: "রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: "যদি সে আল্লাহকে ভয় করে, তাহলে আল্লাহ তাকে সচ্ছলতা দেবেন।" (আবু দাউদ)
📄 কনে নির্বাচন করা
ইসলামে কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা বরকে একটি সফল ও বরকতময় বৈবাহিক জীবন শুরু করতে সাহায্য করে। এই নির্বাচনের প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত দীনদারী ও উত্তম চরিত্র।
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “স্ত্রীলোককে চারটি গুণের জন্য বিবাহ করা হয়: তার ধন-সম্পদ, তার বংশ মর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দীনদারী। তুমি দীনদারী দেখে বিবাহ করো, তাহলে তোমার হাতে বরকত আসবে।” (বুখারি, মুসলিম ও অন্য চারটি হাদিস গ্রন্থ)
এই হাদিসটি কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে দীনদারীর গুরুত্ব তুলে ধরে। যদিও ধন-সম্পদ, বংশ মর্যাদা ও সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবেই মানুষের পছন্দের বিষয় হতে পারে, তবে দীনদারীকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। এর কারণ হলো, দীনদারীই একজন নারীর চরিত্রকে উত্তম করে তোলে এবং পারিবারিক জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। একজন দীনদার স্ত্রী কেবল স্বামীর প্রতি অনুগতই থাকে না, বরং সন্তানদেরকেও ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ফলে, দীনদারী পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং পরকালীন সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।