📄 হজ্জ আদায়ের পদ্ধতি
যখন কোনো হজ্জ আদায়েচ্ছু ব্যক্তি মীকাতের কাছাকাছি হবে, তখন তার গোঁফ ছোট করা, চুল ছাঁটা, নখ কাটা, গোসল করা, ওযু করা, সুগন্ধি লাগানো এবং ইহরামের পোশাক পরা মুستাহাব। মীকাতে পৌঁছার পর দু'রাকাত নামায পড়বে ও ইহরাম বাঁধবে, ইফরাদ হজ্জ করতে চাইলে শুধু হজ্জ, তামাতু করতে চাইলে শুধু ওমরা এবং কিরান করতে চাইলে হজ্জ ওমরা উভয়টির নিয়ত করবে। এই ইহরাম ফরয ও হজ্জের রুকন। এটি ছাড়া হজ্জ ও ওমরা আদায় হবেনা। কিন্তু কি ধরনের হজ্জ করবে, ইফরাদ, না কিরান, না তামাত্তু, সেটা স্থির করা ফরয নয়। হজ্জের ধরন উল্লেখ না করে সাধারণভাবে নিয়ত করলে ইহরাম শুদ্ধ হবে। সাধারণভাবে নিয়ত করার পর উক্ত তিন ধরনের হজ্জের যে কোনোটি করতে পারবে।
ইহরাম বাঁধা মাত্রই তার জন্য উচ্চ কণ্ঠে তালবিয়া পড়া শরিয়তের হুকুম। যখনই কোনো উঁচু জায়গায় আরোহণ করবে কিংবা নিচু উপত্যকায় নামবে, কাউকে দেখবে, শেষ রাতে এবং প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তালবিয়া পড়বে। ইহরামকারীর জন্য সহবাস ও যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী যে কোনো কাজ এবং সহযাত্রিদের সাথে ঝগড়া, তর্ক ও বিবাদ বিসম্বাদ থেকে বিরত থাকা এবং নিজে বিয়ে না করা এবং অন্যকে বিয়ে না দেয়া অপরিহার্য কর্তব্য। ইহরামকারীকে সেলাই করা পোশাক ও পায়ের গিরের ওপরের কোনো অংশ আবৃত করে এমন জুতা পরা পরিহার করতে হবে। ইহরামকারী মাথা ঢাকতে পারবেনা। সুগন্ধি লাগাতে পারবেনা। কোনো চুল বা পশম কামাতে পারবেনা। কোনো নখ কাটতে পারবেনা, স্থলের কোনো শিকার ধরা বা বধ করার চেষ্টা করতে পারবেনা। হারাম শরিফের কোনো গাছ বা ঘাসপাতা কাটতে পারবেনা।
তারপর যখন মক্কায় প্রবেশ করবে তখন মক্কায় উঁচু স্থান দিয়ে প্রবেশ করা মুستাহাব। সম্ভব হলে তার আগে যাহেরে অবস্থিত যীতুয়ার কুয়া থেকে গোসল করাও মুستাহাব। তারপর কা'বার দিকে রওনা হবে এবং 'বাবুস সালাম' দিয়ে প্রবেশ করবে। প্রবেশের সময় মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়বে, মসজিদে প্রবেশের আদব ও নিয়ম পালন করবে, তালবিয়া পড়বে এবং একাগ্রতা ও বিনয়সহকারে প্রবেশ করবে। কা'বার ওপর দৃষ্টি পড়া মাত্র দু'হাত উঁচু করে আল্লাহর অনুগ্রহ চাইবে এবং এজন্য নির্ধারিত মুস্তাহাব দোয়া পড়বে।
এরপর সরাসরি হাজরে আসওয়াদের দিকে যাবে, তাতে বিনা শব্দে চুমু দেবে অথবা হাত দিয়ে স্পর্শ করবে এবং হাতকে চুমু দেবে। এর কোনোটা সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করবে।
তারপর হাজরে আসওয়াদ সোজাসুজি দাঁড়াবে, হাদিস ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত দোয়া পড়বে, দোয়া মাছূরা পড়বে, অতপর তওয়াফ শুরু করবে। প্রথম তিন চক্করে (ইতিপূর্বে বর্ণিত নিয়মে) ইযতিবা ও রমল করবে এবং অবশিষ্ট চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে ও ধীরে সুস্থে করবে। প্রত্যেক চক্করে রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা সুন্নত।
তওয়াফ শেষ হলে "ওয়াত্তাখিযু মিন মাকামি ইবরাহিমা মুসাল্লা" (মাকামে ইবরাহিমকে নামাযের জায়গারূপে গ্রহণ করো) এই আয়াত পড়তে পড়তে মাকামে ইবরাহিমে যাবে, সেখানে দু'রাকাত তওয়াফের নামায পড়বে। তারপর যমযমে আসবে, সেখানে থেকে তৃপ্তিসহকারে পানি পান করবে। তারপর 'মুলতাযামে' আসবে, তারপর দুনিয়া ও আখেরাতের সঠিক কল্যাণসহ যা মনে চাইবে তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। তারপর হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করবে ও চুমু দেবে।
তারপর সাফার দরজা দিয়ে সাফার দিকে চলে যাবে। যাওয়ার সময় পড়বে "ইন্নাস্ সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শায়ারিল্লাহ” (সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন)।” সাফার উপর আরোহণ করবে, সেখান থেকে কা'বার দিকে মুখ করবে, হাদিস থেকে প্রাপ্ত দোয়া পড়বে, তারপর সেখানে থেকে নামবে, তারপর সাঈ করার চত্তরটিতে যিকর ও ইচ্ছা অনুযায়ী দোয়া করতে করতে সাঈ করবে। চিহ্নিত দুই খুঁটির মাঝখানে পৌঁছলে জোরে জোরে হাঁটবে। তারপর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে হাঁটতে মারওয়া চলে যাবে। সিঁড়িতে উঠে কা'বার দিকে মুখ করবে, মুখ করে যিকর ও দোয়া করবে। এভাবে এক চক্কর পূর্ণ করবে। একইভাবে সাঈ করতে করতে সাত চক্কর পূর্ণ করবে। এই সাঈ ওয়াজিব এবং এটা তরক করলে দম দিতে হবে, চাই পুরো তরক করুক বা অংশ বিশেষ তরক করুক।
এরপর ইহরামকারী যদি তামাত্তুকারী হয়, তবে সে তার মাথা কামাবে অথবা ছাঁটবে। এর মাধ্যমে তার ওমরা পূর্ণ হবে। এরপর ইহরাম দ্বারা তার উপর যেসব কাজ নির্দিষ্ট ছিলো তা হালাল হয়ে যাবে, এমনকি স্ত্রী-সহবাসও। কিন্তু কিরানকারী ও ইফরাদকারীর ইহরাম বহাল থাকবে।
তারপর জিলহজ্জের আট তারিখে তামাত্তুকারী তার বাসস্থান থেকেই ইহরাম করবে। সে ও অন্য যারা আগের ইহরামে বহাল আছে, তারা মিনা অভিমুখে যাত্রা করবে এবং মিনায় রাত যাপন করবে।
অতপর যখন সূর্য উঠবে তখন সেখানে থেকে আরাফাত রওনা হয়ে যাবে, মসজিদে নামেরার কাছে গিয়ে যাত্রাবিরতি করবে, গোসল করবে এবং ইমামের সাথে জামাতে যোহর ও আসর যোহরের সময় একত্র পড়বে এবং কসর পড়বে। ইমামের সাথে পড়া সম্ভব হলে এভাবে পড়বে। নচেত কসর ও দুই নামাযকে একত্রে যোহরের সময় পড়বে যেভাবে সম্ভব। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার পরে ব্যতীত আরাফায় অবস্থান করবেনা। আরাফাতের প্রস্তরপূর্ণ স্থানে বা তার কাছাকাছি অবস্থান করবে। কেননা এটা রসূলুল্লাহ সা. এর অবস্থানের স্থান। আরাফায় অবস্থান হজ্জের শ্রেষ্ঠতম রুকন। জাবালুর রহমতে আরোহণ করা সুন্নতও নয়, উচিতও নয়। কেবলামুখি হয়ে থাকবে এবং যিকর ও কাকুতি মিনতি সহকারে দোয়া করতে থাকবে যতক্ষণ না সন্ধ্যা হয়।
অতপর সন্ধ্যা নেমে আসার পর মুযদালিফা অভিমুখে রওনা হবে, সেখানে মাগরিব ও এশা এশার সময়ে পড়বে এবং রাত যাপন করবে। ফজর হওয়া মাত্রই মাশয়ারুল হারামে বস্থান নেবে এবং সকাল পুরোপুরি উজ্জ্বল হওয়ার আগ পর্যন্ত বেশি করে আল্লাহর যিকর করতে থাকবে, এখান থেকে কংকর সংগ্রহ করে যাত্রা শুরু করবে এবং মিনায় ফিরে যাবে। মাশয়ারুল হারামে অবস্থান করা ওয়াজিব এবং তা তরক করলে দম দিতে হবে।
সূর্যোদয়ের পর আকাবার জামরায় সাতটা কংকর নিক্ষেপ করবে। এরপর সম্ভব হলে তার পশু কুরবানি করবে। অতপর মাথার চুল কামাবে অথবা ছোট করবে। চুল কামানো বা ছাঁটার মাধ্যমে একমাত্র স্ত্রী সহবাস ব্যতীত আর যতো কাজ তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলো, সবই হালাল হয়ে যাবে। অতপর মক্কায় ফিরে যাবে। সেখানে তওয়াফে এফাযা করবে। এটা একটা রুকন ও ফরয তওয়াফ তওয়াফে কুদুমের ন্যায়। এ তওয়াফ সম্পন্ন করবে। এ তওয়াফকে তওয়াফে যিয়রাতও বলা হয়। আর তামাত্তুকারী হলে তওয়াফে ইযাফার পরে সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করবে। আর ইফরাদকারী বা কিরানকারী হলে এবং তওয়াফে কুদুম করে থাকলে তার এ সময় সাঈ করতে হবেনা। এই তওয়াফের পর তার জন্য স্ত্রী সহবাসসহ সমস্ত নিষিদ্ধ কাজ হালাল হয়ে যাবে।
এরপর পুনরায় মিনায় ফিরে যাবে ও রাত্র যাপন করবে। এই রাত্র যাপন ওয়াজিব। এটা তরক করলে দম দিতে হবে। আর যখন ১১ই জিলহজ্জ সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়বে, তিনটি জামরাতে কংকর নিক্ষেপ করবে। মিনার সাথে সংলগ্ন জামরা থেকে শুরু করবে, তারপর মধ্যবর্তী জামরায় কংকর নিক্ষেপ করবে। কংকর নিক্ষেপের পর কিছুক্ষণ অবস্থান করে দোয়া ও যিকর করবে। তারপর আকাবার জামরায় কংকর নিক্ষেপ করবে। এই কংকর নিক্ষেপের পর তার কাছে অবস্থান করবেনা। সবকটা জামরায় সাতটা করে কংকর নিক্ষেপের কাজ সূর্যাস্তের আগেই সমাধা করে ফেলা উত্তম। ১২ই জিলহজ্জ তারিখেও তদ্রূপ করবে। এরপর দুটো কাজের যে কোনো একটা করার স্বাধীনতা তার থাকবে : হয় ১২ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের আগে মক্কায় চলে যাবে, নচেত মিনায় রাত যাপন ও সেই সাথে পরবর্তী দিন ১৩ই জিলহজ্জ কংকর নিক্ষেপ করবে। কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। এটা তরক করলে দম দিয়ে ক্ষতিপূরণ করা যায়। যখন মক্কায় ফিরবে এবং স্বদেশে ফেরার ইচ্ছা করবে, তখন তওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তওয়াফ করবে। বিদায়ী তওয়াফ ওয়াজিব। বিদায়ী তওয়াফ তরক করে যে ব্যক্তি মক্কা ছেড়ে চলে যাবে, সে যদি মীকাত অতিক্রম না করে এবং তার পক্ষে যদি মক্কায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে ফিরে গিয়ে বিদায়ী তওয়াফ করবে, নচেত একটা ছাগল কুরবানি করবে।
এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো, তা থেকে জানা গেলো যে, হজ্জ ও ওমরার কাজ হলো, মীকাত থেকে ইহরাম করা, তওয়াফ, সাঈ, চুল কাটা, এগুলো করলে ওমরা শেষ হয়। এর উপর বৃদ্ধি পায় হজ্জ, আরাফায় অবস্থান, মিনায় কংকর নিক্ষেপ, তওয়াফে এফাযা, মিনায় রাত যাপন, মুযদালিফায় রাত যাপন, কুরবানি, চুল কামানো বা ছাঁটা। এই হচ্ছে হজ্জ ও ওমরার সংক্ষিপ্ত সার।
দ্রুত দেশে ফেরা মুস্তাহাব : আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : সফর হচ্ছে আযাবের একটা অংশ। তোমাদের পানাহার এ দ্বারা বিঘ্নিত হয়। কাজেই তোমরা যখন সফরের উদ্দেশ্য অর্জন করো, তখন দ্রুত তোমাদের পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত। -বুখারি, মুসলিম।
আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তোমাদের কেউ তার হজ্জ সম্পন্ন করে, তখন তার দ্রুত নিজের পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত। কেননা এটা তার জন্য অধিকতর পুরস্কার নিশ্চিত করবে। -দারু কুতনি। আর মুসলিম বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মুহাজির তার যাবতীয় ইবাদত (হজ্জ ওমরা কুরবানি ইত্যাদি) সম্পন্ন করার পর তিন দিন অবস্থান করবে।
📄 ইহসার
ইহসার শব্দের অর্থ বাধা দেয়া, আটক করা। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: فَإِنْ أُحْصِرْتُمْ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْي "তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ ও ওমরা পূর্ণ করো। কিন্তু যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তাহলে কুরবানির জন্য যা কিছু সহজে হস্তগত হয় তাই কুরবানি করো।"
হুদাইবিয়াতে যখন রসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিদের মসজিদুল হারামে গমন থেকে বাধা দেয়া ও বিরত রাখা হয়, তখন এ আয়াত নাযিল হয়। এ দ্বারা ওমরার ক্ষেত্রে তওয়াফ থেকে অথবা হজ্জের ক্ষেত্রে আরাফায় অবস্থান বা তওয়াফে এফাযা থেকে বাধা দেয়া ও বিরত রাখা বুঝানো হয়েছে।
যে যে কারণে হজ্জ ও ওমরা থেকে বাধা দেয়া হলে তা ইহসার হিসেবে গণ্য হবে তা নিয়ে মতভেদ হয়েছে।
মালেক ও শাফেয়ী বলেছেন: ইহসার শত্রু কর্তৃক সংঘটিত হলেই তা শরিয়তের দৃষ্টিতে ইহসার বলে গণ্য হবে। কেননা আয়াতটি নাযিল হয়েছেই রসূলুল্লাহ সা. কে বাধা দানের ঘটনা প্রসঙ্গে। ইবনে আব্বাসের মতও অদ্রূপ। তিনি বলেছেন: শত্রু কর্তৃক বাধা দান ব্যতীত আর কোনো বাধা দান ইহসার নয়।
কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মত, তাদের মধ্যে আহমদ ও হানাফী ইমামগণ রয়েছেন- ইহসার যে কোনো প্রতিবন্ধকতা থেকেই সংঘটিত হতে পারে, যা হজ্জ গমনেচ্ছু ব্যক্তির হজ্জে গমন প্রতিহত করে। যেমন কোনো শত্রু, চাই সে কাফের হোক বা কোনো রাষ্ট্রদ্রোহী শক্তি, রোগব্যাধি যা স্থানান্তরে বাধ্য করে, আন্দোলন, ভয়, খরচের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পথিমধ্যে বিনষ্ট হয়ে যাওয়া, পথিমধ্যে স্ত্রীর মুহরিম সংগীর মৃত্যু, ইত্যাকার এমন ওযর, যা সফরকে অসম্ভব করে তোলে। এমনকি এক ব্যক্তিকে পথিমধ্যে সাপ বা বিচ্ছু ইত্যাদিতে দংশন করলে তার সম্পর্কেও ইবনে মাসউদ ফতোয়া দেন যে, সে ইহসারের শিকার বা বাধাপ্রাপ্ত। ইবনে মাসউদ ও তাঁর সমমনা অধিকাংশ আলেমের যুক্তি এই যে, "কিন্তু যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হয়" আয়াতের এ অংশটিতে বাধার ধরন সম্পর্কে নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে, তাই বাধাটা যে ধরনেরই হোক, তা বাধা বলে গণ্য হবে। যদিও আয়াতটি রসূলুল্লাহ সা. এর বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা উপলক্ষেই নাযিল হয়েছিল এবং রসূলুল্লাহ সা. শত্রু কর্তৃকই বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আয়াতে যখন কারণ অনির্দিষ্ট রাখা হয়েছে, তখন নাযিল হওয়ার কারণের মধ্যে তা সীমিত থাকবেনা ও নির্দিষ্ট হয়ে যাবেনা। বস্তুত অন্যান্য মত অপেক্ষা এই মতটিই অধিকতর শক্তিশালী।
বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে: উল্লিখিত আয়াতে স্পষ্টভাবে আদেশ দেয়া হয়েছে যে, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সহজলভ্য জন্তু কুরবানি করতে হবে। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. যখন বাধাপ্রাপ্ত হলেন, তখন চুল কামালেন, স্ত্রীদের সাথে মিলিত হলেন এবং তাঁর সংগে করে আনা জন্তু কুরবানি করলেন। তারপর পরবর্তী বছর ওমরা করলেন। -বুখারি।
অধিকাংশ আলেম এ হাদিস থেকে প্রমাণ করেছেন যে, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপর একটি ছাগল, বা গরু বা উট কুরবানি করা ওয়াজিব। কিন্তু ইমাম মালেক বলেন: ওয়াজিব নয়। 'ফাতহুল আল্লাম' গ্রন্থে ইমাম মালেকের মত সমর্থন করে যুক্তি দেখা হয়েছে যে, সকল বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির সাথে কুরবানির পশু ছিলনা। কেবল রসূলুল্লাহ সা. মদিনা থেকে নফল হাদিয়াস্বরূপ কুরবানির পশু সাথে করে এনেছিলেন। একথাই আল্লাহ তায়ালা বুঝিয়েছেন তার এই উক্তিতে : তারা তোমাদেরকে বাধা দিয়েছে কুরবানির জন্য অপেক্ষমান পশুগুলোকে সেগুলোর যবাই করার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে।" এ আয়াতে কুরবানি করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয়না।
বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি কুরবানি করবে কোথায়: ফাতহুল আল্লাম গ্রন্থে বলা হয়েছে: হুদাইবিয়ার দিন পশু কুরবানি করা হয়েছিল হারাম শরিফের ভেতরে না বাইরে, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। "তারা তোমাদেরকে বাধা দিয়েছে কুরবানির পশুগুলোকে সেগুলোর যবাই করার নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে" আয়াতের এ অংশে স্পষ্টতই প্রমাণ করে, হারাম শরিফের বাইরে যবাই করা হয়েছিল।
তথাপি বাধাপ্রাপ্তের কুরবানির স্থান নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। প্রথমত, অধিকাংশ আলেমের মত : বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেখানে অবস্থান করছে, সেখানেই যবাই করবে, চাই হারাম শরিফের ভেতরে হোক বা বাইরে। দ্বিতীয়ত, হানাফীদের মত : শুধু হারাম শরিফেই কুরবানি করতে হবে। তৃতীয়ত ইবনে আব্বাস ও একটি দলের মত, বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি পশুকে হারামে পাঠাতে সক্ষম হয়, তবে সেখানে পাঠানোই ওয়াজিব এবং হারাম শরিফে পৌঁছে ওগুলো সেখানে যবাই না হওয়া পর্যন্ত সে ইহরাম মুক্ত হবেনা। আর যদি হারাম শরিফে পাঠাতে না পারে তাহলে যেখানে সে বাধাপ্রাপ্ত বা অবরুদ্ধ আছে সেখানেই যবাই করবে।
বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপর হজ্জ ফরয না হলে তার কাযা করার প্রয়োজন নেই: "যদি তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হও, তবে সহজলভ্য পশু কুরবানি দাও” এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ্জ বা ওমরার ইহরাম বেঁধেছে, তারপর বাইতুল্লায় যাওয়া থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, তার উপর একটি সহজলভ্য পশু, ছাগল বা তদুর্ধ্ব কোনো জন্তু, কুরবানি করা ওয়াজিব। সে যদি ফরয হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধে থাকে, তাহলে তাকে তার কাযা করতে হবে। আর যদি ফরয হজ্জ আদায়ের পর আরেকটি হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধে থাকে, তবে কাযা করতে হবেনা। ইমাম মালেক বলেছেন: তিনি জানতে পেরেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. তার সাহাবিদের সাথে নিয়ে হুদাইবিয়ায় এসেছিলেন, তারা তাদের সাথে করে আনা পশু কুরবানি করেছিলেন, মাথা মুড়িয়েছিলেন এবং বাইতুল্লাহর তওয়াফ করা ও কুরবানির পশু বাইতুল্লাহয় পৌঁছার আগেই তারা ইহরাম মুক্ত হয়েছিলেন। এরপর তিনি উল্লেখ করেননি যে, রসূলুল্লাহ সা. তার কোনো সাহাবিকে বা তাঁর সংগে আগত কাউকে কোনো কিছু কাযা করার আদেশ দিয়েছিলেন বা দোহরানোর আদেশ দিয়েছিলেন কিনা। অথচ হুদাইবিয়া হারাম শরিফের বাইরে অবস্থিত। -বুখারি।
ইমাম শাফেয়ী বলেন: সুতরাং যেখানেই বাধাপ্রাপ্ত ও অবরুদ্ধ হবে সেখানেই যবাই করে ইহরাম মুক্ত হতে পারবে এবং কোনো কিছু তাকে কাযা করতে হবেনা। কেননা আল্লাহ কোনো কাযার কথা উল্লেখ করেননি। তাছাড়া যেহেতু আমরা নির্ভরযোগ্যভাবে জানতে পেরেছি। হুদাইবিয়ার বছর রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে বহু সংখ্যক পরিচিত পুরুষ ছিলো, এরপর তারা ওমরাতুল কাযাও আদায় করেছেন, কিন্তু তাদের কেউ কেউ মদিনায় ওমরাতুল কাযা আদায় থেকে বিরত থেকেছে, অথচ তাদের শারীরিক বা আর্থিক কোনো সমস্যা ছিলনা। যদি কাযা করা জরুরি হতো, তাহলে তাদেরকে আদেশ দিতেন যেন কাযা আদায়ে বিরত না হয়। শাফেয়ী আরো বলেন: পরবর্তী বছরের ওমরাকে ওমরাতুল কাযা নামকরণের কারণ এটা নয় যে, ইহসারের কারণে পরিত্যক্ত ওমরার কাযা করা জরুরি, বরং তার কারণ এই যে, ঐ ওমরা সংঘটিত হয়েছিল রসূলুল্লাহ সা. ও কুরাইশের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতার ভিত্তিতে।
রোগ বা অনুরূপ ওযর দেখা দিলে ইহরাম মুক্ত হবো এই শর্তে ইহরাম: বহু সংখ্যক আলেম বলেছেন, ইহরামকারীর ইহরাম করার সময় এরূপ শর্ত আরোপ করা বৈধ যে, সে রোগাক্রান্ত হলে ইহরাম মুক্ত হয়ে যাবে। কেননা ইবনে আব্বাস রা. থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. জনৈক মহিলাকে বলেছেন: তুমি হজ্জ করো এবং এরূপ শর্ত আরোপ করো যে, যেখানেই রোগ আমাকে আটকে দেবে, সেখানেই আমি ইহরাম মুক্ত হবো। সুতরাং যখন কেউ রোগ বা অনুরূপ অন্য কোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হবে এবং সে ইতিপূর্বে তার ইহরামে যদি অনুরূপ শর্ত আরোপ করে থাকে, তাহলে সে ইহরাম মুক্ত হয়ে যাবে। এতে তাকে কোনো দমও দিতে হবেনা, রোযাও রাখতে হবেনা।
📄 হারামাইনের মর্যাদা
কা'বা শরিফে পর্দা বা গিলাফ পরানো লোকেরা জাহেলী যুগে কা'বা শরিফে পর্দা পরাতো। ইসলাম এসে পর্দাকে বহাল রেখেছে। ওয়াকেদী বর্ণনা করেছেন: জাহেলী যুগে কা'বা শরিফকে লাল রং এর চামড়া দিয়ে তৈরি মাটিতে বিছানো পর্দা দিয়ে মোড়ানো হতো। তারপর রসূলুল্লাহ সা. তাকে ইয়ামানী কাপড় পরান। উমর ও উসমান রা. মিশরীয় কাপড় 'কাবাতী' পরাতেন। তারপর হাজ্জাজ রেশমী গেলাফ পরান। বর্ণিত আছে, সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি কা'বায় গিলাফ পরায়, সে ছিলো তুববা বংশীয় আসয়াদ আল-হিময়ারী।
মালেক বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর রা. তার উটনীকে সাদা পাতলা মিশরীয় কাপড় কাবাতী, নামাত ও ইয়ামানী কাপড় পরাতেন। তারপর ঐ কাপড় কা'বায় পাঠাতেন এবং কা'বায় তা পরাতেন। ওয়াকেদী আরো বর্ণনা করেছেন: লোকেরা কা'বা শরিফের জন্য পোশাক হাদিয়া পাঠাতো এবং ইয়ামানী নকশাযুক্ত চাদর পরা উট হাদিয়া পাঠাতো, অতপর সেই চাদরগুলোকে বাইতুল্লায় গিলাফ হিসেবে পাঠানো হতো। পরে ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া রেশমী গিলাফ পরালো। ইবনুয যুবাইর সেই পদাংক অনুসরণ করেন।
প্রতি বছর কা'বায় গিলাফ পরানোর জন্য মুসয়াব ইবনুয যুবাইরের নিকট রেশমী গিলাফ পাঠানো হতো। তিনি আশুরার দিন গিলাফ পরাতেন। সাঈদ বিন মানসূর বর্ণনা করেন: উমর রা. প্রতি বছর কা'বার গিলাফ খুলে ফেলতেন, সেগুলো হাজিদের মধ্যে বিতরণ করতেন, এবং হাজিরা মক্কার গাছে টানিয়ে তা দ্বারা ছায়া বানাতেন।
কা'বা শরীফকে সুবাসিত করা: আয়েশা রা. বলেছেন: তোমরা আল্লাহর ঘরকে সুবাসিত করো। এটা তাকে পবিত্র করার শামিল। ইবনুয যুবাইর কা'বার অভ্যন্তরভাগকে পুরোপুরি সুবাসিত করেন। তিনি প্রতিদিন এক রতল সুগন্ধি কাঠ জ্বালিয়ে এবং প্রতি শুক্রবার দুই রতল সুগন্ধি কাঠ জ্বালিয়ে সুবাসিত করতেন।
হারাম শরিফে গুনাহর কাজ থেকে নিষেধ করা: আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَمَن يُرِدْ فِيهِ بِالْعَادِ بِظُلْمِ نُذِقَهُ مِنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ “যে ব্যক্তি এর ভেতরে গুনাহ করতে চাইবে, তাকে আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগ করাবো।” আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হারাম শরিফে খাদ্য গোলাজাত করা গুনাহর কাজ।" বুখারি বর্ণনা করেন উমর রা. বলেছেন: খাদ্য গোলাজাত করা আল্লাহ নাফরমানি।" আহমদ বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর ইবনে যুবায়েরের কাছে এলেন। তখন তিনি হাজরে আসওয়াদের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বললেন: হে ইবনুয যুবাইর, আল্লাহর পবিত্র হারামে গুনাহ থেকে সাবধান। আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি: কুরাইশের এক ব্যক্তি হারাম শরিফকে হালাল বানিয়ে ফেলবে। (অর্থাৎ সেখানে গুনাহ সংঘটিত হবার সুযোগ সৃষ্টি করবে)। অন্য বর্ণনায়: কুরাইশের এক ব্যক্তি এর ভেতরে গুনাহ সংঘটিত করবে, তার গুনাহগুলো যদি সকল জিন ও মানুষের গুনাহর সাথে ওযন করা হয় তবে তার ওযন বেশি হবে। কাজেই সাবধান, তুমি যেন সেই ব্যক্তি না হও।”
মুজাহিদ বলেছেন: মক্কায় যেমন সৎ কাজের সওয়াব বহু গুণ বাড়ে, তেমনি খারাপ কাজের গুনাহও বহু গুণ বাড়ে। ইমাম আহমদকে জিজ্ঞাসা করা হলো: কোনো খারাপ কাজের গুনাহ কি একটার বেশি লেখা হয়? তিনি বললেন: না, কেবল মক্কায় ব্যতিত। মক্কার মর্যাদার জন্য এটা করা হয়।
কা'বা শরিফে আগ্রাসনের ভবিষ্যদ্বাণী: বুখারি ও মুসলিম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: একটি সেনাবাহিনী কা'বার উপর আক্রমণ চালাবে। তারা যখন মরুভূমিতে থাকবে, তখন তাদের প্রথম জন থেকে শেষ জন সমেত সবাইকে মাটির নিচে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ সা., এটা কেমন কথা, তাদের ভেতরে তো খারাপ লোক ও সৎ লোক উভয়ই থাকবে। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: প্রথম জন থেকে শেষ জনকে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে। তারপর প্রত্যেককে তার নিয়ত অনুযায়ী কেয়ামতের দিন ওঠানো হবে। (যাদের আক্রমণের ইচ্ছা ছিলনা তারা আখেরাতের আযাব থেকে রেহাই পাবে। কিন্তু দুনিয়ার আযাব থেকে রেহাই পাবেনা।)
তিন মসজিদ অভিমুখে সফর মুস্তাহাব : আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তিনটি মসজিদ ব্যতিত অন্য কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা বৈধ নয়। মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ ও মসজিদুল আকসা। -বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ। আবু যর রা. বলেন, আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ সা., পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন্ মসজিদ নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন: মসজিদুল হারাম। বললাম: তারপর কোন্টি? তিনি বললেন: মসজিদুল আকসা। আমি বললাম : এ দুটোর মধ্যে কত দিনের ব্যবধান? বললেন: চল্লিশ বছর। এরপর যেখানেই তোমার নামাযের সময় হয়, সেখানেই নামায পড়ো। কেননা সেখানেই আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে।
এই তিন মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর বৈধ হওয়ার একমাত্র কারণ হলো, এগুলোতে এতো বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা রয়েছে, যা অন্য কোনোটার নেই।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমার মসজিদে একটি নামায মসজিদুল হারাম ব্যতীত অন্য সকল মসজিদে এক হাজার নামাযের চেয়ে উত্তম। আর মসজিদুল হারামে একটি নামায অন্য সকল মসজিদের এক লক্ষ নামাযের চেয়ে উত্তম। - আহমদ।
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি আমার মসজিদে চল্লিশ ওয়াক্ত নামায পড়বে এবং তা থেকে একটিও বাদ পড়বেনা তার জন্য দোযখ থেকে মুক্তি, আযাব থেকে মুক্তি ও মুনাফেকী থেকে মুক্তি লিখে রাখা হবে। -আহমদ, তাবারানি। হাদিসে আরো বলা হয়েছে: বাইতুল মাকদিসে নামাযের সওয়াব, মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী ব্যতিত অন্য সকল মসজিদের তুলনায় পাঁচশো গুণ বেশি।
১. মসজিদে নববীতে প্রবেশের ও রওযা মুবারক যিয়ারতের নিয়ম ও আদব: ১. মসজিদে নববীতে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে, ভাবগম্ভীরতাসহকারে, সুগন্ধি মেখে, সুন্দর পোশাক পরে, ডান পা প্রথমে ঢুকিয়ে প্রবেশ করা মুস্তাহাব। আর প্রবেশের সময় নিম্নোক্ত দোয়া পড়া মুস্তাহাব :
أعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ، بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَسَلَّمُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذُنُوبِي، وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ .
"মহান আল্লাহর কাছে, তার সুমহান সত্তার কাছে, তাঁর অনাদি অনন্ত রাজত্বের কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, মুহাম্মদ ও তার বংশধরের ওপর দরূদ ও সালাম পাঠাও। হে আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার জন্যে তোমার রহমতের দরজাগুলো খুলে দাও।"
২. প্রথমে রওযা শরিফে গিয়ে পূর্ণ আদব ও একাগ্রতা সহকারে সেখানে তাহিয়াতুল মসজিদ নামায পড়বে। এটাও মুستahab।
৩. তাহিয়াতুল মসজিদ নামায শেষ হলে পবিত্র কবরের দিকে মুখ করে ও কেবলা পেছনে রেখে রসূলুল্লাহ সা. কে নিম্নরূপ সালাম দেবে:
السَّلامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ اللهِ ، السَّلامُ عَلَيْكَ يَا نَبِيَ اللهِ ، السَّلامُ عَلَيْكَ يَا خَلْقِ اللَّهِ مِنْ خَلْقِهِ، السَّلامُ عَلَيْكَ يَا خَيْرَ خَلْقِ اللهِ، السّلامُ عَلَيْكَ يَا حَبِيبَ اللهِ، السّلامُ عَلَيْكَ يَا سَيِّدَ الْمُرْسَلِينَ، السَّلامُ عَلَيْكَ يَا رَسُولَ رَبِّ الْعَالَمِينَ، اَلسَّلامُ عَلَيْكَ يَا قَائِنَ الْغُرِّ الْمُعَجِّلِينَ . أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَحْمَدُ أَنَّكَ عَبْدَهُ وَرَسُولَهُ وَأَمِينُهُ وَخِيرَتُهُ مِنْ خَلْقِهِ . وَأَشْهَدُ أَنَّكَ مَنْ بَلَغَسَ الرِّسَالَةَ وَأَدِّيْنَ الْأَمَانَةَ، وَنَصَحْنَ الْآمَةَ، وَجَاهَدْتَ فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ.
"হে আল্লাহর রসূল, আপনার উপর সালাম। হে আল্লাহর নবী, আপনার উপর সালাম। হে সৃষ্টির সেরা, আপনার উপর সালাম, হে আল্লাহর বন্ধু, আপনার উপর সালাম। হে নবীদের নেতা, আপনার উপর সালাম, হে বিশ্বপ্রভুর রসূল, আপনার উপর সালাম। হে গৌরবান্বিত মানুষদের নেতা, আপনাকে সালাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর বান্দা, রসূল, বিশ্বস্ত ও সৃষ্টির সেরা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, আমানত ফিরিয়ে দিয়েছেন, উম্মতের হিত কামনা করেছেন এবং আল্লাহর পথে যথাযথভাবে জিহাদ করেছেন।"
৪. তারপর ডান দিকে হাতখানেক সরে দাঁড়াবে। আবু বকর সিদ্দিক রা. কে সালাম দেবে, তারপর আরো হাত খানেক সরে দাঁড়াবে এবং উমর ফারুক রা. কে সালাম জানাবে।
৫. এরপর কেবলামখি হয়ে নিজের জন্য, নিজের বন্ধু, ভাই ও অন্য সকল মুসলমানের জন্য দোয়া করবে। তারপর এখান থেকে চলে যাবে।
৬. যিয়ারতকারীর কর্তব্য যেন তার আওয়ায নিজে শুনতে পায় এর চেয়ে বেশি উঁচু না করে। প্রহরীর কর্তব্য, উঁচু শব্দ করা থেকে ভদ্রভাবে বিরত রাখবে। বর্ণিত আছে, উমর রা. দুই ব্যক্তিকে মসজিদে নববীতে উচ্চ কণ্ঠে কথা বলতে দেখলেন। তিনি বললেন, আমি যদি জানতাম তোমরা এই শহর থেকেই এসেছো, তাহলে তোমাদেরকে এমন প্রহার করতাম যে ব্যথা পাও।
৭. কবরকে হাত দিয়ে স্পর্শ করবেনা এবং চুমু দেবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এটা করতে নিষেধ করেছেন।
আবু দাউদ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে এবং আমার কবরকে উৎসব স্থলে পরিণত করানো। আমার উপর দরূদ পাঠাও। কেননা তোমরা যেখানেই থাকো, তোমাদের প্রেরিত দরূদ আমার নিকট পৌঁছে। আব্দুল্লাহ ইবনুল হাসান এক ব্যক্তিকে দেখলেন, রসূলুল্লাহ সা. এর কবরে অন্য এক ব্যক্তির প্রতিনিধি হয়ে দোয়া পাঠাচ্ছে। তিনি বললেন, হে অমুক, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থল বানিওনা, তোমরা যেখানেই থাকো আমার উপর দরূদ পাঠাও। কেননা তোমাদের দরূদ আমার নিকট পৌঁছে। সুতরাং তুমি এবং স্পেনে যে ব্যক্তি রয়েছে, উভয়ে সমান।
রওযা মুবারকে বেশি করে নফল ইবাদত করা মুستahab বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মাঝখানে রয়েছে বেহেশতের একটি রওযা (বাগান)। আমার মিম্বর আমার হাউসের উপর অবস্থিত। (অর্থাৎ আমার রওযায় বেশি করে ইবাদত ও ইসলামী জ্ঞান বিতরণ করলে তা ঐ স্থানটিকে বেহেশতের বাগানে পরিণত করবে।)
মসজিদে কুবা পরিদর্শন ও সেখানে নামায পড়া মুস্তাহাব : রসূলুল্লাহ সা. প্রত্যেক শনিবার এখানে আসতেন এবং দু'রাকাত নামায পড়তেন। তিনি সবাইকে এরূপ করতে উৎসাহ দিতেন এবং বলতেন: যে ব্যক্তি নিজের বাড়ি থেকে পবিত্রতা অর্জন করে মসজিদে কুবায় আসবে ও সেখানে নামায পড়বে। সে একটি ওমরার সমান সওয়াব পাবে। -আহমদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
মদিনার ফযিলত : বুখারি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ঈমান মদিনায় সেভাবে গুটিয়ে এসে পুঞ্জীভূত হবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে গুটিয়ে থাকে। তাবারানি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মদিনা হচ্ছে ইসলামের গম্বুজ, ঈমানের ঘর, হিজরতের ভূখণ্ড এবং হালাল ও হারামের আশ্রয়স্থল। উমর রা. বলেন : মদিনার মূল্য বেড়ে গেছে। তাই তার জন্য সাধনা তীব্রতর হয়েছে।
রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : তোমরা সবর করো এবং সুসংবাদ গ্রহণ করো। আমি তোমাদের খাদ্যে বরকত কামনা করেছি, তোমরা খাও ও বিভেদে লিপ্ত হয়োনা। কেননা একজনের খাদ্য দু'জনের জন্য যথেষ্ট হয়ে থাকে, দুজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট হয়ে থাকে এবং চারজনের খাদ্য পাঁচজন ও ছয়জনের জন্য যথেষ্ট হয়ে তাকে। বরকত থাকে দল ও সংহতির মধ্যে। স্বজনদের দুঃখ ও কষ্টে যারা ধৈর্যধারণ করে, আমি তার জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবো। আর যে ব্যক্তি জামাত থেকে বের হবে, আল্লাহ তার পরিবর্তে ঐ জামাতে তার চেয়ে উত্তম ব্যক্তিকে আনবেন। আর যে ব্যক্তি জামাতের বিরুদ্ধে দূরভিসন্ধি পোষণ করবে, আল্লাহ তাকে এমনভাবে গলিয়ে দেবেন যেভাবে পানিতে লবণ গলে যায়। -বাযযার
মদিনায় মৃত্যুর ফযিলত : তাবারানি ছাকীফ গোত্রীয় জনৈক এতিম মহিলা থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : তোমাদের মধ্যে যে কেউ মদিনায় মৃত্যু বরণ করতে পারে, সে যেনো তাই করে। কেননা যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যু বরণ করবে, কেয়ামতের দিন আমি তার জন্য সাক্ষী ও সুপারিশকারী হবো।"
যায়েদ বিন আসলাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, উমর রা. দোয়া করতেন : হে আল্লাহ, আমাকে তোমার পথে শাহাদত দান করো এবং তোমার নবীর হারামে আমাকে মৃত্যু দাও।” -বুখারি।