📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মাথার চুল কামানো বা ছাঁটা

📄 মাথার চুল কামানো বা ছাঁটা


চুল কাটা ও ছাঁটার বিধান কুরআন, হাদিস ও ইজমা তথা উম্মতের সর্বসম্মত রায় দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُؤُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ .
"আল্লাহ তাঁর রসূলের স্বপ্নকে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন। তোমরা অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। তখন তোমাদের কেউ মাথা মুড়াবে, কেউ চুল কাটবে। তখন তোমাদের কোনো ভয় থাকবেনা।"
বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করেন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ আর যারা চুল কেটেছে, তাদের উপরও? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করুন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ সা., আর যারা চুল কাটে তাদের উপরও? তিনি বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করুন। লোকেরা পুনরায় বললো: হে রসূলুল্লাহ সা. যারা চুল কেটেছে তাদের উপরও? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যারা চুল কেটেছে তাদের উপরও আল্লাহ রহম করুন। * বুখারি ও মুসলিমে আরো বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. মাথা মুড়িয়ে ফেললেন, আর সাহাবিদের একাংশ মাথা মুড়ালো এবং আরেক অংশে চুল কাটালো।”
মাথা মুড়ানো দ্বারা ক্ষুরের সাহায্যে চুল কামানো অথবা উপরে ফেলা বুঝায়। এমনকি মাথার তিনটে চুল কামালেও বৈধ হবে। আর চুল কাটা দ্বারা মাথার চুল থেকে আংগুল পরিমাণ ছেঁটে ফেলা বুঝায়। অধিকাংশ আলেম এ সম্পর্কে শরিয়তের বিধি নিয়ে মতভেদে লিপ্ত। তাদের অধিকাংশের মতে, এটা ওয়াজিব এবং এটা তরক করলে এর ক্ষতি পূরণে দম বা কুরবানি দিতে হবে। শাফেয়ীদের মতে এটা হজ্জের অন্যতম রুকন (অর্থাৎ ফরয)!
মাথা মুড়ানোর সময়: হাজিদের জন্য এর নির্দিষ্ট সময় হলো ১০ই জিলহজ আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপ্তের পর। কুরবানির পশু সংগে থাকলে (বা পূর্বাচ যবাই-এর পর চুল কামাবে।
মুয়াম্মার বর্ণিত হাদিসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. যখন মিনায় তার পশু কুরবানি করলেন। তখন বললেন: আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে চুল কামানোর জন্য। আহমদ, তাবরানি
ওমরার ক্ষেত্রে এর নির্ধারিত সময় হলো সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করার পর এবং যার সাথে কুরাবনির পশু আছে তার জন্য তা যবাই করার পর। এটি হারাম শরিকের অভ্যন্তরে হওয়া ওয়াজিব। আর আবু হানিফা, মালেক ও আহমদের মতে কুরবানির দিনগুলোতে হওয়া ওয়াজিব। পক্ষান্তরে শাফেয়ী, মুহাম্মদ এবং আহমদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে চুল কামানো ও কাটা হারাম শরিফে ও কুরবানির দিন ছাড়া হওয়া ওয়াজিব। চুল কামানো কুরবানির দিসগুলো পর পর্যন্ত বিলম্বিত করলেও চলবে, কোনো কাফফারা দেয়া লাগবেনা।
চুল কামানোতে যা যা করা মুস্তাহাব চুল কামানোর বেলায় ডান দিক থেকে শুরু করা, তার পর বা দিকে করা, কেবলামুখি হওয়া এবং চুল কামানো শেষ হওয়ার পর তকবীর বলা ও নামায পড়া মুস্তাহাব। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন: আমি হজ্জের পাঁচটি জায়গায় ভুল করেছিলাম। ভুল ধরিয়ে দিয়েছিল একজন নাপিত। আমি যখন মাথা কামানোর ইচ্ছা করলাম, তখন জনৈক নাপিতের কাছে গেলাম। তাকে বলালম: তুমি মাথা কামাতে কত নেবে? সে বললো: আপনি ইরাকী নাকি? আমি বলালম: হ্যাঁ। সে বললো: ইবাদতের কাজে দর কষাকষি করা যায়না। বসুন, আমি বসলাম, তবে কেবলামুখি হয়ে নয়। নাপিত বললো: আপনার মুখ কেবলার দিকে ঘোরান। তারপর আমি স্থির করেছিলাম, আমার মাথা বাম দিক থেকে কামানো শুরু করবো। নাপিত বললো: আপনার মাথার ডান দিকটা ঘুরিয়ে দিন। আমি ঘুরিয়ে দিলাম, সে চুল কামাতে লাগলো। আমি চুপ চাপ বসে রইলাম। এরপর সে বললো: তকবীর বলুন। আমি তকবীর বলতে বলতে উঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সে বললো: কোথায় যেতে চান? আমি বলালম: আমার কাফেলায়। সে বললো: আগে দু'রাকাত নামায পড়ুন, তারপর যান। আমি বললাম আমি ওখানে যা কিছু দেখলাম, তা একজন নাপিতের বুদ্ধি দ্বারা সংঘটিত হওয়ার কথা নয়। তুমি আমাকে যে ক'টা আদেশ দিলে তা কোথা থেকে পেয়েছ? সে বললো: আতা ইবনে আবি রিবাহ এ রকমই করেন। তাবারি।
টাক মাথার উপর ক্ষুর ঘোরানো মুস্তাহাব অধিকাংশ আলেমের মতে, টাক পড়া ব্যক্তি, যার মাথায় মোটেই চুল নেই, তার মাথায় ক্ষুর ঘোরানো মুস্তাহাব। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমদের মধ্য হতে যতো জনের নাম আমার মনে পড়ে, তারা সবাই একমত যে, টাক মাথা ওয়ালা তার মাথার উপর ক্ষুর ঘোরাবে। আবু হানিফা বলেছেন তার মাথার উপর ক্ষুর খোরানো ওয়াজিব। নখ কাটা ও গোঁফ ছাটা মুستahab।
যে ব্যক্তি চুল কামায় বা ছাঁটায়, তার জন্য গোঁফ ছাটা ও নখ কাটা মুস্তাহাব। ইবনে উমর রা. যখন কোনো হজ্জে বা ওমরায় চুল মুড়াতেন, তখন তিনি তার দাড়ি গোঁফও ছাটাতেন। ইবনুল, মুনযির বলেছেন: এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মাথা মুড়াতেন, তখন তার নখও কেটে ফেলতেন।
মহিলাদের প্রতি চুল হাঁটার আদেশ এবং কামানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা: আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মহিলাদের চুল কামাতে হবেনা, চুল ছাঁটতে হবে। ইবনুল মুনযির বলেন: এ বিষয়টিতে আলেমদের মধ্য মতৈক্য রয়েছে। কেননা মহিলাদের বেলায় মাথা কামানো চেহারার বিকৃতি ঘটানোর পর্যায়ভুক্ত।
মহিলারা মাথার চুল কতোটুকু ছোট করবে: ইবনে উমর রা. বলেছেন: কোনো মহিলা যখন চুল ছোট করার ইচ্ছা করবে, তখন তার চুলকে তার মাথার সামনের দিকে জমা করবে, তারপর তা থেকে আংগুল পরিমাণ ছেটে ফেলবে। আতা বলেন: কোনো মহিলা যখন তার চুল ছোট করবে, তখন সে তার চুলের প্রান্তভাগ থেকে ছেটে ফেলবে। সাঈদ বিন মানসুর। কেউ বলেন: মহিলারা কতটুকু ছাটবে তার কোনো ধরাবাধা পরিমাণ নেই। শাফেয়ী বলেন: ন্যূনপক্ষে তিনটে চুল ছাঁটা যথেষ্ট।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তওয়াফে এফাযা বা তওয়াফে যিয়ারত

📄 তওয়াফে এফাযা বা তওয়াফে যিয়ারত


এ ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর এজমা হয়েছে যে, তওয়াফুল এফাযা হজ্জের একটা রুকন তথা অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো হাজি এটা করতে ব্যর্থ হলে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ বলেন : وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ “তারা যেন প্রাচীন ঘরটির তওয়াফ করে।” ইমাম আহমদের মতে এজন্য নির্দিষ্টভাবে নিয়ত করা জরুরি। আর তিন ইমামের মতে, হজ্জের নিয়তই এর ওপর বলবত হবে, হাজির পক্ষ থেকে এটা বিশুদ্ধ ও যথেষ্ট হবে – যদিও সে সুনির্দিষ্টভাবে এই তওয়াফের নিয়ত না করে। অধিকাংশ আলেমের মতে, এর সাতটি চক্কর সব কটাই ফরয ও রুকন। আবু হানিফার মতে, সাতটি থেকে চারটি চক্কর হজ্জের রূকন। এ চারটা বাদ দিলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। অবশিষ্ট তিন চক্কর রুকন নয়, কিন্তু ওয়াজিব। কেউ এই তিনটে বা তার কোনো একটা তরক করলে সে ওয়াজিব তরককারী হবে। তার হজ্জ বাতিল হবেনা। তবে তাকে দম দিতে হবে।
তওয়াফে এফাযার সময়: শাফেয়ী ও আহমদের মতানুসারে এর সময় শুরু হয় ১০ই জিলহজ্জ দিবাগত মধ্য রাত থেকে এবং এর শেষ সময় নির্ধারিত নেই। তবে এই তওয়াফ না করা পর্যন্ত সহবাস হালাল হবেনা। আইয়ামে তাশরিক থেকে একে বিলম্বিত করলে কোনো দম বা কুরবানি ওয়াজিব হবেনা। তবে মাকরূহ হবে। দশই জিলহজের দুপুরে পূর্বাহ্নে এর জন্য সর্বোত্তম সময়। আবু হানিফা ও মালেকের মতে ১০ই জিলহজ্জের ফজর থেকেই এর সময় শুরু হয়। কিন্তু এর শেষ সময় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফার মতে, কুরবানির দিনগুলোর মধ্য থেকে যে কোনো দিন এটা সম্পন্ন করা ওয়াজিব। এ দিনগুলোর পরে করলে দম দেয়া লাগবে। মালেক বলেন: আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন পর্যন্ত একে বিলম্বিত করাতে কোনো ক্ষতি নেই। তবে ত্বরান্বিত করা উত্তম। এর সময় জিলহজ্জ মাসের শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপরও যদি আরো বিলম্বিত করা হয়, তবে দম দিতে হবে কিন্তু হজ্জ বিশুদ্ধ হবে। কেননা সমগ্র জilহজ্জ মাস তার মতে হজ্জের মাস।
মহিলাদের জন্য তওয়াফুল এফাযা ত্বরান্বিত করা: মহিলারা যদি ঋতুস্রাবের আশংকাবোধ করে, তবে ১০ই জিলহজ্জে এটা সমাধা করা মুস্তাহাব। আয়েশা রা. মহিলাদের ১০ই জিলহজ্জেই তওয়াফুল এফাযা সম্পন্ন করার আদেশ দিতেন, যাতে হঠাৎ ঋতুস্রাব এসে জটিলতার সৃষ্টি না করে। আর আতা বলেছেন: মহিলারা যদি ঋতুস্রাবের আশংকা করে, তাহলে জামারায় কংকর নিক্ষেপেরও পূর্বে এবং কুরবানি দেয়ারও পূর্বে বাইতুল্লাহর তওয়াফে এফাযা করে ফেলা উচিত। এমন ওষুধ ব্যবহারে কোনো দোষ নেই, যাতে ঋতু বিলম্বিত হয় এবং তওয়াফ সমাধা করা যায়।
সাঈদ বিন মানসুর ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কোনো মহিলা যদি তার মাসিক ঋতুস্রাব বিলম্বিত করার জন্য ওষুধ খরিদ করে, যাতে সময়মত দেশে ফিরতে পারে, তাহলে তাতে কোনো বাধা আছে কিনা, ইবনে উমরকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন: এতে কোনো বাধা নেই। তিনি এজন্য মহিলাদেরকে আরাক গাছের রস খেতে বলেন। তাবারি বলেন : এরূপ ক্ষেত্রে যদি ঋতুস্রাবকে বিলম্বিত করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে ঋতুস্রাবের মেয়াদ শেষ করার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা বিলম্বিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুরূপ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবকে এগিয়ে আনারও ব্যবস্থা জরুরি।
মুহাসসাবে যাত্রা বিরতি জাবালুন নূর ও হুজুনের মধ্যবর্তী উপত্যকার নাম মুহাসসাব। রসূলুল্লাহ সা. মিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মুহাসসাব উপত্যকায় যাত্রা বিরতি করেছিলেন বলে জানা যায়। এখানে তিনি যোহর আছর মাগরিব ও এশা পড়েন এবং কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেন। ইবনে উমরও এরূপ করতেন। এখানে যাত্রা বিরতি করা মুস্তাহাব কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। আয়েশা রা. বলেন : রসূলুল্লাহ সা. মুহাসসাবে যাত্রা বিরতি করেছিলেন শুধু এজন্য যেন তার যাত্রা সহজতর হয়, এটা কোনো সুন্নত নয়। যে কেউ ইচ্ছা করলে এখানে যাত্রা বিরতি করতে পারে, আবার নাও করতে পারে।
খাত্তাবি বলেন : এটা এক সময় করা হতো। পরে পরিত্যক্ত হয়েছে। তিরমিযি বলেন : কেউ কেউ এখানে যাত্রা বিরতি করা মুستahab মনে করেন, ওয়াজিব নয়। এখানে যাত্রা বিরতির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর শোকর আদায় করা। কেননা তিনি এখানে তার নবীকে তার সেসব শত্রুর উপর বিজয় দান করেছিলেন, যারা বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবকে এই মর্মে কসম খেয়ে এক ঘরে করেছিল যে, তারা যতোক্ষণ রসূলল্লাহ সা.-কে তাদের হাতে সমর্পণ না করবে ততোক্ষণ আরবের অন্যান্য গোত্র তাদের ক্রয়বিক্রয় ও বিয়ে শাদী করবেনা। ইবনুল কাইয়েম বলেন: মুহাসসাব উপত্যকায় যাত্রা বিরতির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সা. যে স্থানে শত্রুরা কুফরীকে এবং আল্লাহ ও তার রসূলের শত্রুতাকে বিজয়ী করেছিল, সেই একই স্থানে ইসলামের নিদর্শনাবলিকে বিজয়ী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটাই রসূলুল্লাহ সা. এর অভ্যাস ছিলো, তাওহীদের নিদর্শনাবলিকে তিনি কুফর ও শিরকের নিদর্শনাবলির লীলাভূমিতেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করতেন। যেমন তিনি লাত ও উমর পূজার জায়গায় তায়েফের মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওমরা

📄 ওমরা


ওমরার শাব্দিক অর্থ যিয়ারত অর্থাৎ ভ্রমণ। এখানে পবিত্র কা'বার ভ্রমণ তার চারপাশে তওয়াফ, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ এবং চুল কাটাসহ গোটা কর্মসূচিকে বুঝানো হয়েছে। আলেমরা একমত যে, এটা শরিয়ত প্রবর্তিত একটি ইবাদত।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: রমযানের একটা ওমরা একটা হজ্জের সমান। (অর্থাৎ রমযানে একটি ওমরা করার সওয়াব একটা নফল হজ্জের সওয়াবের সমান। তবে এ দ্বারা ফরয হজ্জের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবেনা।) -আহমদ, ইবনে মাজাহ।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এক ওমরা থেকে আর এক ওমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সমস্ত গুনাহর কাফফারা হয়ে যাবে। একটা হজ্জ মাবরূরের (গুনাহমুক্ত হজ্জ) প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। -আহমদ, বুখারি, মুসলিম। রসূলুল্লাহ সা.-এর এক হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে: "তোমরা হজ্জ ও ওমরা একটির পর একটি অব্যাহতভাবে করো।"
বারংবার ওমরা করা : নাফে' বলেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে যুবাইরের আমলে বহু বছর যাবত বছরে দুটো করে ওমরা করতেন।
কাসেম বলেছেন: আয়েশা রা. এক বছরে তিনটে ওমরা করেছেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, এতে কেউ কি তাঁর প্রতি দোষারোপ করেছেন? কাসেম বললেন: সুবহানাল্লাহ! তিনি না উম্মুল মুমিনীন? এজন্য অধিকাংশ আলেমের মতে বারংবার ওমরা করায় দোষের কিছু নেই। কিন্তু ইমাম মালেক বছরে একবারের বেশি ওমরা করা মাকরূহ মনে করেন।
হজ্জের পূর্বে ও হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করা জায়েয: হজ্জের মাসগুলোতে হজ্জ ছাড়া শুধু ওমরা করা জায়েয। উমর রা. শওয়াল মাসে ওমরা করে মদিনায় ফিরে এসেছিলেন হজ্জ না করেই। অনুরূপ, হজ্জের পূর্বে ওমরা করাও জায়েয, যেমন উমর রা. করতেন। তাউস বলেন: জাহেলী যুগের মানুষ হজ্জের মাসে ওমরাকে সবচেয়ে বড় গুনাহর কাজ মনে করতো এবং বলতো: সফর মাস যখন অতিক্রান্ত হবে, উটের পায়ের ঘা যখন শুকিয়ে যাবে, রাস্তা থেকে হজ্জের চিহ্ন যখন মুছে যাবে এবং হাজিরা ফিরে আসবে, তখন যার ওমরা করার ইচ্ছা, তার জন্য ওমরা বৈধ হবে। ইসলামের আগমনের পর জনগণকে হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করার আদেশ দেয়া হলো। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত হজ্জের মাসে ওমরা চালু হয়ে গেলো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের ওমরার সংখ্যা: ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বারটা ওমরা করেছেন, প্রথমটি হুদাইবিয়ার ওমরা, দ্বিতীয়টি ওমরাতুল কাযা, তৃতীয়টি জিরানা থেকে এবং চতুর্থটি তাঁর হজ্জের সাথে। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবেন মাজাহ।
ওমরা সম্পর্কে শরিয়তের বিধি: হানাফি ও মালেকি মযহাবে ওমরা সুন্নত। কেননা জাবের রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. কে ওমরা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা কি ওয়াজিব। তিনি বললেন: না।
শাফেয়ী ও আহমদের মতে, ওমরা ফরয। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ওমরা পূর্ণ করো।" যেহেতু হজ্জে ও ওমরার জন্য এক সাথেই আদেশ দেয়া হয়েছে, তাই এটা ফরয। তবে প্রথমোক্ত মতটি অগ্রগণ্য (অর্থাৎ সুন্নত)। তিরমিযি শাফেয়ীর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ওমরা সম্পর্কে এমন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস নেই যা থেকে এটি নফল প্রমাণিত হয়।
ওমরার সময়: অধিকাংশ আলেমের মতে, সারা বছরই ওমরার সময়। তাই বছরের যে কোনো সময় তা আদায় করা জায়েয। তবে আবু হানিফার মতে, আরাফার দিন, ১০ই জিলহজ্জ এবং আইয়ামে তাশরিকের তিন দিন ওমরা মাকরূহ। আবু ইউসুফের মতে, আরাফার দিন ও পরবর্তী তিন দিন ওমরা মাকরূহ। হজ্জের মাসে যে ওমরা বৈধ, সে ব্যাপারে সবাই একমত।
বুখারি ইকরামা থেকে বর্ণনা করেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে হজ্জের পূর্বে ওমরা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন: হজ্জের পূর্বে ওমরা করায় কোনো বাধা নেই। রসূলুল্লাহ সা. হজ্জের পূর্বে ওমরা করতেন।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত: আয়েশা রা. ঋতুবতী অবস্থায় বাইতুল্লাহর তওয়াফ ব্যতীত হজ্জ ও ওমরার যাবতীয় কাজ করেছেন। পবিত্র হওয়ার পর তিনি তওয়াফ করলেন এবং বললেন: হে রসূলুল্লাহ সা. আপনারা হজ্জ ও ওমরা দুটোই করে আসবেন। আর আমি শুধু হজ্জ করে আসবো নাকি? একথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. আব্দুর রহমানকে (আয়েশার সহোদর) আদেশ দিলেন আয়েশার সাথে তানয়ীম পর্যন্ত যেতে। তার পর তিনি জিলহজ্জ মাসের মধ্যেই হজ্জের পর ওমরা করলেন। ওমরার সর্বোত্তম সময় রমযান মাস। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
ওমরার ইহরামের মীকাত: প্রথমে দেখতে হবে, যে ব্যক্তি ওমরা করতে ইচ্ছুক, সে ইতিপূর্বে উল্লিখিত হজ্জের মীকাতসমূহের বাইরে অবস্থান করছে, না ভেতরে? যদি বাইরে হয়, তাহলে তার পক্ষে ইহরাম ছাড়া এই মীকাত অতিক্রম করা বৈধ নয়। কেননা বুখারি বর্ণনা করেছেন: যায়েদ ইবনে জুবাইর আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রা. নিকট এলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথা থেকে ওমরা করা আমার জন্য বৈধ হবে? তিনি বললেন: রসূলুল্লাহ সা. নাজদবাসীর জন্য 'কারণ', মদিনাবাসীর জন্য 'যুল হুলাইফা' ও সিরিয়াবাসীর জন্য 'জুহফা' নির্ধারণ করেছেন। আর যদি তার অবস্থান হয় মীকাতের অভ্যন্তরে, তাহলে ওমরার জন্য তার মীকাত হলো হারাম শরিফের সীমানার বাইরে, যদিও ওমরাকারী হারাম শরিফের মধ্যে অবস্থান করে। বুখারিতে এসেছে: আয়েশা রা. তানয়ীমে চলে গেলেন এবং সেখানে ইহরাম করলেন। আর এটা রসূলুল্লাহ সা. এর নির্দেশ ছিলো।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 বিদায়ী তওয়াফ

📄 বিদায়ী তওয়াফ


বিদায়ী তওয়াফকে তাওয়াফুস সদরও বলা হয়। কেননা এটা হাজিদের মক্কা ত্যাগের প্রাক্কালে করতে হয়। এই তওয়াফে কোনো রমল নেই। এটা মক্কায় থেকে মক্কার বাইরে যাওয়ার জন্যে হাজির করণীয় সর্বশেষ কাজ। যখন সে মক্কা থেকে বিদায় নিতে চায়, তখনই এটি করতে হয়। (যারা মক্কায় অবস্থান করে তাদের বেলায় বিদায়ী তওয়াফ প্রযোজ্য নয়।)
মালেক তাঁর গ্রন্থ মুয়াত্তায় বর্ণনা করেছেন, উমর রা. বলেছেন: হজ্জের সর্বশেষ কাজ হলো বাইতুল্লাহর তওয়াফ। (আর রওযাতুল নাদিয়াতে বলা হয়েছে: এই তাওয়াফের মূল কথা হলো বাইতুল্লাহর সম্মান। কেননা হজ্জের শুরুও হয় তওয়াফ দিয়ে (তওয়াফুল কুদুম) আর শেষও হয় তওয়াফ দিয়ে। এভাবে হজ্জের সফরের মূল উদ্দেশ্য বাইতুল্লাহর তওয়াফ, এটাই চিত্রিত করা হয়েছে।)
মক্কাবাসী ও ঋতুবর্তী মহিলার ক্ষেত্রে এ তওয়াফ প্রযোজ্য নয়। এ তওয়াফ ত্যাগ করায় তাদেরকে কোনো কাফফারাও দিতে হবেনা।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: কোনো মহিলা হাজির ঋতুস্রাব শুরু হলে তাকে বিদায়ী তওয়াফ ছাড়াই) বিদায় হওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। -বুখারি, মুসলিম।
অপর এক বর্ণনায় রয়েছে জনগণকে আদেশ দেয়া হয়েছে, যেন তাদের সর্বশেষ দায়িত্ব আল্লাহর ঘরে পালন করে। তবে ঋতুবতী মহিলার দায়িত্ব কিছুটা হালকা করা হয়েছে। -বুখারি ও মুসলিমে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সা. এর স্ত্রী সুফিয়া ঋতুবতী হলেন, (হজ্জের সময়) রসূলুল্লাহ সা. কে একথা জানানো হলে তিনি বললেন: তবে কি সুফিয়া আমাদেরকে আটকে রাখবে? লোকেরা জানালো যে, তিনি চলে গেছেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে আর কোনো সমস্যা নেই।
শরিয়তের বিধান: আলেমগণ একমত যে, বিদায়ী তওয়াফ শরিয়তের অঙ্গীভূত একটা ইবাদত। কেননা মুসলিম ও আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, লোকেরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো। এ অবস্থা দেখে রসূলুল্লাহ সা. বললেন তোমরা বাইতুল্লাহর সাথে সর্বশেষ দায়িত্ব পালন না করে বিদায় হয়োনা।
কিন্তু বিদায়ী তওয়াফ সম্পর্কে শরিয়তের বিধি কি, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে:
ইমাম মালেক, দাউদ, ও ইবনুল মুনযির বলেছেন: এটা সুন্নত। এটা তরক করলে কোনো কাফফারা দিতে হয়না। ইমাম শাফেয়ীর মতও এটাই।
আর হানাফী, হাম্বলী ও একটি বর্ণনা অনুযায়ী শাফেয়ীর মতে এটা ওয়াজিব এবং এটা তরক করলে দম দিতে হবে।
বিদায়ী তওয়াফের সময় : বিদায়ী তওয়াফের সময় তখনই হয়, যখন হাজিগণ তাদের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেন এবং ফেরত সফরের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে বাইতুল্লাহর তওয়াফই তার শেষ কাজ হয়। যেমন ইতিপূর্বের হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদায়ী তওয়াফ সম্পন্ন হলে তৎক্ষণাত বিদায়ী সফর শুরু করবে। এর পর আর কোনো কেনা বেচা করবেনা এবং মক্কায় কোনো সময় কাটাবেনা। এসব করলে পুনরায় বিদায়ী তওয়াফ করতে হবে। অবশ্য পথিমধ্যেই কোনো প্রয়োজন মেটালে কিংবা খাদ্য বা অনুরূপ কোনো অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কিনলে তওয়াফ-দোহারাতে হবেনা। কেননা এতে তার বিদায়ী তওয়াফকে বাইতুল্লাহর শেষ কাজে পরিণত করা ব্যাহত হবেনা।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত নিম্নোক্ত দোয়াটি বিদায়ী তওয়াফকারীর পড়া মুস্তাহাব:
اللَّهُمَّ إِنِّي عَبْدُكَ، وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ حَمَلْتَنِي عَلَى مَا سَخَّرْتَ لِي مِنْ خَلْقِكَ، وَسَتَرْتَنِي فِي بِلادِكَ حَتَّى بَلَغْتَنِي بِنِعْمَتِكَ إِلَى بَيْتِكَ، وَأَعَنْتَنِي عَلَى أَدَاءِ نُسْكِي، فَإِن كُنْتَ رَضِيْتَ عَنِّى فَاذْدَدْ عَنِى رِضًا، وَإِلَّا فَمِنَ الْآنَ فَارْضَ عَنِى قَبْلَ أَن تَنْأَى عَنْ بَيْتِكَ دَارِي فَهُذَا أَوَانُ انْصِرَانِي إِنْ أَذِنْتَ لِي غَيْرَ مُسْتَبْدِلِ بِكَ وَلَا بِبَيْتِكَ، وَلَا رَاغِبٍ عَنْكَ، وَلَا عَنْ بَيْتِكَ اللَّهُ فَاسْعَبْنِي الْعَافِيَةَ فِي بَدَنِي، وَالصّحة فِي جِسْمِي، وَالْعِصْمَةَ فِي دِينِي، وَأَحْسِنَ مُنْقَلَبِي، وَارْزُقْنِي طَاعَتِكَ مَا أَبْقَيْتَنِي وَاجْمَعْ لِى بَيْنَ خَيْرَى الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
"হে আল্লাহ, আমি তোমার বান্দা, তোমার বান্দার ছেলে, তোমার বান্দীর ছেলে, তোমার সৃষ্টির মধ্যে থেকে যে সৃষ্টিকে আমার অনুগত করেছো, তার উপর আমাকে আরোহণ করিয়েছ, তুমি আমাকে তোমার পৃথিবীতে সফর করিয়েছ এবং অবশেষে তোমার ঘরে পৌঁছায়েছ, এটা তোমারই অনুগ্রহ। আর আমাকে আমার ইবাদত আদায়ে সহায়তা করেছ, তুমি যদি আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকো, তাহলে আরো বেশি সন্তুষ্ট হও, নচেত এখন থেকে তুমি আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও তোমার ঘর থেকে দূরে চলে যাওয়ার আগে। এখন আমার বিদায় হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে যদি তুমি আমাকে অনুমতি দাও। তোমার ও তোমার ঘরের চেয়ে প্রিয় আমার কাছে আর কেউ নেই, কিছু নেই, তোমার কাছ থেকেও তোমার ঘর থেকে আমি-বিমুখ নই। হে আল্লাহ, আমার দেহে পরিপূর্ণ সুস্থতা দাও, আমার দীনদারীতে পাকাপোক্ত থাকার ক্ষমতা দাও। আমাকে উত্তম পরিণতি দাও, আমাকে তোমার অনুগত রাখো। যতোদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখো, আমাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সর্বময় কল্যাণ দাও, নিশ্চয় তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।"
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: বিদায়ী তওয়াফের মাধ্যমে বাইতুল্লাহকে বিদায় জানানোর সময় মুলতাযামে (হাজরে আসওয়াদ ও কা'বার দরজার মাঝখানে) কিছুক্ষণ অবস্থান করা আমি পছন্দ করি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00