📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কুরবানির পশু বা হাদি

📄 কুরবানির পশু বা হাদি


হাদি: আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানির জন্য হারাম শরিফে হাদিয়াস্বরূপ যে পশু পৌঁছানো হয়, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় আল-হাদয়, বা হাদি বলা হয়। আল্লাহ বলেন: وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ، لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ، فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَافٌ، فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَر كَذَلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ. لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا ، وَلَا دِمَاؤُهَا، وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ .
"উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি। এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো অবস্থায় তাদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম উমরণ করো। তারপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তোমরা তা থেকে কিছু নিজেরা খাও এবং কিছু খাওয়াও দরিদ্রজনকে এবং যে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি চায় তাকেও খাওয়াও। আমি এভাবেই এই পশুগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যেন তোমরা শোকর করো। আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশতও পৌঁছেনা, রক্তও পৌঁছেনা। তাঁর কাছে পৌঁছে শুধু তোমার তাকওয়া।"
উমর রা. বলেছেন: তোমরা (কুরবানির পশু) হাদিয়া পাঠাও। কারণ আল্লাহ হাদিয়া পছন্দ করেন, রসূলুল্লাহ সা. একশো উট নফল হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।
শ্রেষ্ঠ হাদিয়া: আলেমগণ একমত যে, হজ্জের সময়ে প্রেরিত হাদিয়া পশু ছাড়া অন্য কিছু থেকে দেয়া বৈধ নয়। উট, গরু ও ছাগল ভেড়া- চাই পুরুষ হোক বা মাদী হোক- হাদিয়া পাঠানো যায়। এর মধ্যে সর্বোত্তম হাদিয়া উট, তারপর গরু, তারপর ছাগল বা ভেড়া। কেননা উট আকারে সবচেয়ে বড় হওয়ায় তা দরিদ্রদের জন্য অধিকতর লাভজনক। অনুরূপ গরু, ছাগল, ভেড়ার চেয়ে বেশি লাভজনক। এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি উটের সাত ভাগের এক ভাগ, গরুর সাত ভাগের এক ভাগ ও একটা ছাগল এর কোন্টি উত্তম, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে দরিদ্রদের জন্য যেটা বেশি লাভজনক, সেটাই যে উত্তম- এ ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
ন্যূনতম হাদিয়া: হারাম শরিফের উদ্দেশ্যে উক্ত তিন প্রকারের মধ্য থেকে যে কোনো পশু হাদিয়া পাঠানো যায়। রসূলুল্লাহ সা. একশোটা উট নফল হাদিয়া হিসেবে কুরবানি করতে পাঠিয়েছিলেন। ন্যূনতম পক্ষে একজনের পক্ষ থেকে যে হাদিয়া পাঠানো যায় তা হচ্ছে একটা ছাগল, একটা উটের সাত ভাগের একভাগ কিংবা একটা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ। কেননা গরু বা উট সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানি দেয়া যায়।
জাবের রা. বলেছেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে হজ্জ করেছিলাম। তখন আমরা সাতজনের পক্ষ থেকে উট এবং সাতজনের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছিলাম। -আহমদ, মুসলিম। কুরবানির শরিকদের সবাই আল্লাহর নৈকট্যকামী হবে এটা শর্ত নয়। তাদের কতক আল্লাহর নৈকট্য চায়, কতক শুধু গোশত চায়, এমন হলেও কুরবানি বৈধ হবে। কিন্তু হানাফীরা এ মতের বিরোধী। তাদের নিকট সকল শরিকের আল্লাহর নৈকট্যকামী হওয়া শর্ত।
উট হাদিয়া দেয়া কখন ওয়াজিব একমাত্র বীর্যপাতজনিত অপবিত্রতাসহ বা হায়েয ও নেফাসসহ তওয়াফে যিয়ারত করলে, আরাফাতে অবস্থানের পর ও চুল কামানোর আগে স্ত্রী সহবাস করলে অথবা উট কুরবানির মানত করলেই উট হাদিয়া পাঠানো ওয়াজিব হয়। আর উট না পাওয়া গেলে সাতটা ছাগল কিনতে হবে।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এলো এবং বললো: আমার একটা উট কুরবানির দায় রয়েছে। উট কেনার ক্ষমতাও আমার রয়েছে। কিন্তু কেনার জন্য উট পাচ্ছিনা। তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে আদেশ দিলেন যেনো সাতটা ছাগল কিনে কুরবানি দেয়। -আহমদ, ইবনে মাজাহ।
হাদিয়ার প্রকারভেদ: হাদিয়া দুই প্রকারে মুস্তাহাব ও ওয়াজিব। মুস্তাহাব হাদিয়া হচ্ছে মুফরিদ হাজী ও মুফরিদ ওমরাহকারীর হাদিয়া। আর ওয়াজিব হাদিয়া হচ্ছে পাঁচ প্রকার: ১ ও ২. কিরান হজ্জ ও তামাত্তু হজ্জকারী ওপর কুরবানির হাদিয়া ওয়াজিব।
৩. হজ্জের কোনো ওয়াজিব তরককারীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয়। যেমন কংকর নিক্ষেপ, মিকাত থেকে ইহরাম, আরাফায় অবস্থানকালে রাত ও দিন একত্রিতকরণ, মুযদালিফায় রাত যাপন, মিনায় রাত যাপন, বিদায়ী তওয়াফ ইত্যাদি তরক করলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়।
৪. ইহরাম করার পর সহবাস ব্যতীত যে সকল কাজ হারাম হয়। যেমন, সুগন্ধি গ্রহণ ও চুল কামানো ইত্যাদির কোনো একটি করলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়।
৫. হারাম শরিফের সীমার মধ্যে শিকার করলে বা গাছ কাটলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়। এর প্রত্যেকটি যথাস্থানে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হাদিয়ার শর্তাবলি: হাদিয়া পাঠানোর জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করা জরুরি:
১. হাদিয়াস্বরূপ প্রদত্ত পশু যদি ভেড়া ব্যতীত অন্য কিছু হয়, তাহলে তা 'ছানী' হতে হবে। ভেড়া হলে তা 'জাযা' অর্থাৎ ছয় মাস বয়সের হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা হলেই চলবে। উটের মধ্য থেকে পাঁচ বছর, গরুর মধ্য থেকে দু'বছর এবং মাদী ছাগল থেকে পুরো এক বছর বয়স্ক পশুকে 'ছানী, বলা হয়। এসব পশু থেকে পাঠালে ছানী পাঠালে চলবে।
২. শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নিখুঁত হতে হবে। কানা, খোঁড়া, দাদ বা চর্মরোগধারী ও জীর্ণশীর্ণ পশু হলে চলবেনা।
হাসান বলেছেন: কোনো ব্যক্তি যখন সুস্থ পশু কেনে, কিন্তু কুরবানির দিনের আগে তা অন্ধ, খোঁড়া বা জীর্ণশীর্ণ হয়ে যায়, তাহরে সেটাই যবাই করা উচিত। তাতেই কুরবানি শুদ্ধ হবে। -সাঈদ বিন মানসুর।
হাদিয়া নির্বাচনের মুস্তাহাব পদ্ধতি: মালেক হিশাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তার সন্তানদেরকে বলতেন: হে আমার ছেলেরা তোমরা এমন উট আল্লাহর জন্য হাদিয়া পাঠিওনা, যা তোমাদের কোনো প্রিয় বন্ধুকে দিতে লজ্জা পাও। মনে রেখো, আল্লাহ সকল প্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তির চেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত। সাঈদ বর্ণনা করেন, ইবনে উমর একটা উটনীর পিঠে আরোহণ করে সমগ্র মক্কা শহরে ঘুরলেন। তার পর তার প্রশংসা করলেন। উটনীটা তার ভালো লাগলো। তিনি তা থেকে নেমে তাকে চিহ্নিত করলেন ও হাদিয়া পাঠালেন।
হাদিয়া বা কুরবানির পশুকে চিহ্নিত করা: দুই পদ্ধতিতে কুরবানির পশুকে চিহ্নিত করা হয়: ইশয়ার: উট বা গরুর কুঁজ থাকলে কুঁজের যে কোনো এক পাশ চিরে রক্ত বের করে দিয়ে একটা চিহ্ন তৈরি করা, যাতে ঐ জন্তুটি হাদিয়া বা কুরবানির পশু বলে চিহ্নিত হয় এবং কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
তাকলীদ: কুরবানির পশুর গলায় এক টুকরো চামড়া বা অন্য কোনো প্রতিক ঝুলিয়ে দেয়া, যাতে ওটা হাদিয়া বা কুরবানির পশু বলে পরিচিত হয়। রসূলুল্লাহ সা. একবার এক পাল মেশ হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন এবং তাকে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই মেষ পাল হিজরি ৯ সালের হজ্জে আবু বকরের সাথে পাঠিয়েছিলেন। তিনি কুরবানির পশুর গলায় প্রতিক ঝুলিয়ে দিয়ে ও কুঁজ চিরে চিহ্নিত করে হুদাইবিয়ার দিন ওমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন। ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত সকল আলেম এটিকে সুন্নত মনে করেন।
পশুকে চিহ্নিত করার যৌক্তিকতা: এর যৌক্তিকতা হলো আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করা, প্রকাশ করা, প্রচার করা যে, এগুলো কুরবানির পশু, যা আল্লাহর ঘরে পাঠানো হচ্ছে, তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানি করা ও তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য।
হাদিয়ার পশুর পিঠে আরোহণ: কুরবানির উটে আরোহণ ও অন্যান্যভাবে উপকৃত হওয়া বৈধ। কেননা আল্লাহ বলেছেন: لَكُمْ فِيهَا مَنَافِعُ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ مَحِلُّهَا إِلَى الْبَيْتِ الْعَتِيقِ “তোমাদের জন্য এসব পশুতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রচুর উপকারিতা রয়েছে, তারপর এগুলো প্রাচীন কাবাগৃহে পৌঁছবে।”
দাহহাক ও আতা বলেন: এই উপকারিতা হলো প্রয়োজনমত এগুলোর ওপর আরোহণ এবং এগুলোর দুধ, ও পশম ব্যবহার করা। নির্দিষ্ট সময় হলো: প্রতিক পরানোর পর 'হাদিয়ার পশু' হওয়া পর্যন্ত। আর প্রতীক কা'বাগৃহে পৌঁছা অর্থ মিনায় কুরবানির দিন পৌঁছা ও যবাই হওয়া।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. এক ব্যক্তিকে দেখলেন একটা উট হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাকে বললেন: ওর ওপর আরোহণ করো। সে বললো: এটা একটা কুরবানির উটনী। তিনি বললেন: আরে, তাতে কি হয়েছে, আরোহণ করো। এভাবে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার বললেন। বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী।
এটি আহমদ, ইসহাক ও মালেকের মযহাব। শাফেয়ী বলেছেন: খুব তীব্র প্রয়োজন হলে এর ওপর আরোহণ করা যায়।
কুরবানির সময়: কুরবানির সময় নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে এর সময় হলো ১০ই জিলহজ্জ ও তার পরবর্তী আইয়ামুত্ তাশরিক ১১,১২ ও ১৩ই জিলহজ্জ। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আইয়ামে তাশরিকের সকল দিন কুরবানির দিন। -আহমদ যদি সময় পার হয়ে যায়, তবে কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট পশুকে কাযা হিসেবে যবাই করবে। মালেক ও আহমদের নিকট কুরবানির পশু যবাইর সময় কুরবানির দিনসমূহ, চাই ওয়াজিব কুরবানি হোক বা নফল। তামাত্ত্ব ও কিরানের হাদিয়ার ব্যাপারে হানাফীদের অভিমত এটাই। পক্ষান্তরে মানত, কাফফারা ও নফল কুরবানির জন্য যে কোনো সময় যবাই করা যায়। ইবরাহিম নখয়ী প্রমুখের মতে এর সময় ১০ জিলহজ্জ থেকে জিলহজ্জ মাসের শেষ পর্যন্ত।
কুরবানির স্থান: হাদিয়ার পশু, চাই ওয়াজিব হোক বা নফল হোক, হারাম শরিফের বাইরে কোথাও যবাই করা যাবেনা। হারাম শরিফের যে কোনো স্থানে যবাই করা যাবে।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সমগ্র মিনা কুরবানির স্থান এবং সমগ্র মুযদালিফা অবস্থানের স্থান। মক্কার সকল ওলি গলি ও পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ চলাচলের পথ ও কুরবানির স্থান। আবু দাউদ ইবনে মাজাহ।
তবে হাজি সাহেবদের জন্য সর্বোত্তম স্থান মিনা এবং ওমরাকারীদের সর্বোত্তম স্থান মারওয়া। কেননা এটা উভয়ের ইহরাম মুক্ত হওয়ার স্থান।
মালেক থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এই মিনা যবাই করার স্থান, সমগ্র মিনা যবাইর স্থান, আর ওমরায় এই মারওয়া এবং মক্কার সকল গিরিপথ ও ওলি গলি যবাইর স্থান।
উটকে বুকে ও অন্যান্য পশুকে কণ্ঠনালীতে যবাই করা মুস্তাহাব : উটকে দাঁড়ানো ও বাম হাত বাঁধা অবস্থায় (পশুর হাত অর্থ সামনের পা) যবাই করা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে নিম্নের হাদিসগুলো লক্ষণীয় :
যিয়াদ বিন জুবাইর থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেখলেন, সে তার উটনীকে বসিয়ে যবাই করছে। তিনি বললেন: ওকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে বেঁধে নাও। এটা তোমাদের নবীর সুন্নত।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. ও তার সাহাবিগণ উটকে বাম পা বেঁধে ও অবশিষ্ট পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে যবাই করতেন। আবু দাউদ।
ইবনে আব্বাস রা. "তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অবস্থা তাদের ওপর আল্লাহর নাম উমরণ করো" এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন: فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافٌ অর্থাৎ তিন পায়ের ওপর দাঁড় করানো অবস্থায়......" -হাকেম।
পক্ষান্তরে গরু ও ছাগল শুইয়ে যবাই করা মুস্তাহাব। যে জন্তুকে কণ্ঠনালী কেটে যবাই করতে হবে তাকে যদি বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় আর যে পশুকে বুকে ছুরিকাঘাত করে যবাই করতে হবে, তাকে যদি কণ্ঠনালী কেটে যবাই করা হয়, তাহলে কেউ বলেন, মাকরূহ হবে, কেউ বলেন: মাকরূহ হবেনা। দক্ষতার সাথে যবাই করতে পারলে কুরবানি দাতার নিজের যবাই করা মুস্তাহাব। নচেত সে উপস্থিত থেকে যবাই প্রত্যক্ষ করবে।
কসাইকে কুরবানির পশুর গোশত দ্বারা পারিশ্রমিক দেয়া যাবেনা: যবাইকারীকে কুরবানির পশু থেকে পারিশ্রমিক দেয়া যাবেনা। তবে তাকে তা থেকে কিছু সদকা হিসেবে দেয়া যাবে। কেননা আলী রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে আদেশ দিয়েছেন যেন আমি কুরবানির উট যবাইর সময় তার সামনে দাঁড়াই, তার চামড়া ও তার গায়ের চট বিতরণ করে দেই এবং কসাইকে পশু থেকে কিছু না দেই। আলী রা. বললেন: তাকে আমরা নিজেদের থেকেই দিয়ে থাকি। সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
হাদিস থেকে এটাও প্রমাণিত যে: কুরবানির পশুর যবাই, গোশত বিলি বণ্টন এবং তার চামড়া ও তার গায়ের চট বিতরণের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ। কিন্তু পারিশ্রমিক হিসেবে কসাইকে পশু থেকে কিছু দেয়া বৈধ নয়। নিজের পকেট থেকে তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। (কুরবানির পশুর চামড়া ও তার যে কোনো অংশ বিক্রি করা সর্বসম্মতভাবে অবৈধ।) আর হাসান বর্ণনা করেছেন যে, কসাইকে চামড়া দেয়াতে ক্ষতি নেই।
কুরবানির পশুর গোশত থেকে খাওয়া: কুরবানির পশুর গোশত থেকে খাওয়ার জন্য আল্লাহ স্বয়ং আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ “তা থেকে তোমরা খাও এবং দুস্থ দরিদ্রকে খাওয়াও।” এ আদেশ স্পষ্টতই ওয়াজিব ও নফল উভয় প্রকারে কুরবানিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের ফকীহগণ এ বিষয়ে মতভেদ পোষণ করেন। আবু হানিফা ও আহমদের মতে, তামাত্তু ও কিরান হজ্জের কুরবানির গোশত ও নফল কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয। এ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের কুরবানির গোশত খাওয়া কুরবানি দাতার জন্য বৈধ নয়। মালেকের মতে, কুরবানি দাতার হজ্জ যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে বা সময় চলে যাওয়ায় হজ্জ হাতছাড়া হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সে ইতিপূর্বে পাঠানো পশুর গোশত সে খেতে পারবে। তামাতু হজ্জের কুরবানির গোশতও খেতে পারবে। কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যাজনিত অক্ষমতার ফিদিয়াস্বরূপ এবং শিকার করার শাস্তিস্বরূপ প্রদত্ত কুরবানির গোশত ব্যতিত এবং মিসকীনদের জন্য মানতকৃত কুরবানি ব্যতিত ও হারাম শরিফে পৌঁছার আগে যে মারা যাওয়া পশুর বাবদ দত্ত কুরবানির গোশত ব্যতীত আর সকল কুরবানির গোশত খাওয়া যাবে। সায়েরা'র মতে শিকার করার শাস্তি, হজ্জ নষ্ট করার ফিদিয়া, তামাত্তু ও কিরানের কুরবানি এবং নিজের ওপর আরোপিত মানতের কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয নেই। অনুরূপ যে কোনো ওয়াজিব কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয নেই। তবে নফল কুরবানির গোশত খেতেও পারবে, খাওয়াতেও পারবে, সদকা ও হাদিয়াস্বরূপ বন্টন করতেও পারবে।
কুরবানির গোশতের কী পরিমাণ খাওয়া বৈধ: হাদিয়াস্বরূপ কুরবানির পশু প্রেরক হাজির নিজের প্রেরিত পশুর গোশত যে পরিমাণ ইচ্ছা খাওয়া বৈধ, সে উক্ত পশুর গোশত যতো ইচ্ছা খেতে পারবে। অনুরূপ যতো ইচ্ছা হাদিয়া ও সদ্কারূপেও বন্টন করতে পারবে। কারো কারো মতে, অর্ধেক নিজে খাবে ও অর্ধেক সদকা করবে। কারো কারো মতে এক তৃতীয়াংশ নিজে খাবে, এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেবে ও এক তৃতীয়াংশ সদকা করবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মাথার চুল কামানো বা ছাঁটা

📄 মাথার চুল কামানো বা ছাঁটা


চুল কাটা ও ছাঁটার বিধান কুরআন, হাদিস ও ইজমা তথা উম্মতের সর্বসম্মত রায় দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
لَقَدْ صَدَقَ اللهُ رَسُولَهُ الرُّؤْيَا بِالْحَقِّ لَتَدْخُلُنَّ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ إِنْ شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ مُحَلِّقِينَ رُؤُوسَكُمْ وَمُقَصِّرِينَ لَا تَخَافُونَ .
"আল্লাহ তাঁর রসূলের স্বপ্নকে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন। তোমরা অবশ্যই আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে। তখন তোমাদের কেউ মাথা মুড়াবে, কেউ চুল কাটবে। তখন তোমাদের কোনো ভয় থাকবেনা।"
বুখারি ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করেন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ আর যারা চুল কেটেছে, তাদের উপরও? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করুন। লোকেরা বললো: হে রসূলুল্লাহ সা., আর যারা চুল কাটে তাদের উপরও? তিনি বললেন: আল্লাহ মাথা মুণ্ডনকারীদের উপর রহমত করুন। লোকেরা পুনরায় বললো: হে রসূলুল্লাহ সা. যারা চুল কেটেছে তাদের উপরও? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যারা চুল কেটেছে তাদের উপরও আল্লাহ রহম করুন। * বুখারি ও মুসলিমে আরো বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. মাথা মুড়িয়ে ফেললেন, আর সাহাবিদের একাংশ মাথা মুড়ালো এবং আরেক অংশে চুল কাটালো।”
মাথা মুড়ানো দ্বারা ক্ষুরের সাহায্যে চুল কামানো অথবা উপরে ফেলা বুঝায়। এমনকি মাথার তিনটে চুল কামালেও বৈধ হবে। আর চুল কাটা দ্বারা মাথার চুল থেকে আংগুল পরিমাণ ছেঁটে ফেলা বুঝায়। অধিকাংশ আলেম এ সম্পর্কে শরিয়তের বিধি নিয়ে মতভেদে লিপ্ত। তাদের অধিকাংশের মতে, এটা ওয়াজিব এবং এটা তরক করলে এর ক্ষতি পূরণে দম বা কুরবানি দিতে হবে। শাফেয়ীদের মতে এটা হজ্জের অন্যতম রুকন (অর্থাৎ ফরয)!
মাথা মুড়ানোর সময়: হাজিদের জন্য এর নির্দিষ্ট সময় হলো ১০ই জিলহজ আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপ্তের পর। কুরবানির পশু সংগে থাকলে (বা পূর্বাচ যবাই-এর পর চুল কামাবে।
মুয়াম্মার বর্ণিত হাদিসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. যখন মিনায় তার পশু কুরবানি করলেন। তখন বললেন: আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে চুল কামানোর জন্য। আহমদ, তাবরানি
ওমরার ক্ষেত্রে এর নির্ধারিত সময় হলো সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করার পর এবং যার সাথে কুরাবনির পশু আছে তার জন্য তা যবাই করার পর। এটি হারাম শরিকের অভ্যন্তরে হওয়া ওয়াজিব। আর আবু হানিফা, মালেক ও আহমদের মতে কুরবানির দিনগুলোতে হওয়া ওয়াজিব। পক্ষান্তরে শাফেয়ী, মুহাম্মদ এবং আহমদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে চুল কামানো ও কাটা হারাম শরিফে ও কুরবানির দিন ছাড়া হওয়া ওয়াজিব। চুল কামানো কুরবানির দিসগুলো পর পর্যন্ত বিলম্বিত করলেও চলবে, কোনো কাফফারা দেয়া লাগবেনা।
চুল কামানোতে যা যা করা মুস্তাহাব চুল কামানোর বেলায় ডান দিক থেকে শুরু করা, তার পর বা দিকে করা, কেবলামুখি হওয়া এবং চুল কামানো শেষ হওয়ার পর তকবীর বলা ও নামায পড়া মুস্তাহাব। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন: আমি হজ্জের পাঁচটি জায়গায় ভুল করেছিলাম। ভুল ধরিয়ে দিয়েছিল একজন নাপিত। আমি যখন মাথা কামানোর ইচ্ছা করলাম, তখন জনৈক নাপিতের কাছে গেলাম। তাকে বলালম: তুমি মাথা কামাতে কত নেবে? সে বললো: আপনি ইরাকী নাকি? আমি বলালম: হ্যাঁ। সে বললো: ইবাদতের কাজে দর কষাকষি করা যায়না। বসুন, আমি বসলাম, তবে কেবলামুখি হয়ে নয়। নাপিত বললো: আপনার মুখ কেবলার দিকে ঘোরান। তারপর আমি স্থির করেছিলাম, আমার মাথা বাম দিক থেকে কামানো শুরু করবো। নাপিত বললো: আপনার মাথার ডান দিকটা ঘুরিয়ে দিন। আমি ঘুরিয়ে দিলাম, সে চুল কামাতে লাগলো। আমি চুপ চাপ বসে রইলাম। এরপর সে বললো: তকবীর বলুন। আমি তকবীর বলতে বলতে উঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সে বললো: কোথায় যেতে চান? আমি বলালম: আমার কাফেলায়। সে বললো: আগে দু'রাকাত নামায পড়ুন, তারপর যান। আমি বললাম আমি ওখানে যা কিছু দেখলাম, তা একজন নাপিতের বুদ্ধি দ্বারা সংঘটিত হওয়ার কথা নয়। তুমি আমাকে যে ক'টা আদেশ দিলে তা কোথা থেকে পেয়েছ? সে বললো: আতা ইবনে আবি রিবাহ এ রকমই করেন। তাবারি।
টাক মাথার উপর ক্ষুর ঘোরানো মুস্তাহাব অধিকাংশ আলেমের মতে, টাক পড়া ব্যক্তি, যার মাথায় মোটেই চুল নেই, তার মাথায় ক্ষুর ঘোরানো মুস্তাহাব। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমদের মধ্য হতে যতো জনের নাম আমার মনে পড়ে, তারা সবাই একমত যে, টাক মাথা ওয়ালা তার মাথার উপর ক্ষুর ঘোরাবে। আবু হানিফা বলেছেন তার মাথার উপর ক্ষুর খোরানো ওয়াজিব। নখ কাটা ও গোঁফ ছাটা মুستahab।
যে ব্যক্তি চুল কামায় বা ছাঁটায়, তার জন্য গোঁফ ছাটা ও নখ কাটা মুস্তাহাব। ইবনে উমর রা. যখন কোনো হজ্জে বা ওমরায় চুল মুড়াতেন, তখন তিনি তার দাড়ি গোঁফও ছাটাতেন। ইবনুল, মুনযির বলেছেন: এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মাথা মুড়াতেন, তখন তার নখও কেটে ফেলতেন।
মহিলাদের প্রতি চুল হাঁটার আদেশ এবং কামানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা: আবু দাউদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মহিলাদের চুল কামাতে হবেনা, চুল ছাঁটতে হবে। ইবনুল মুনযির বলেন: এ বিষয়টিতে আলেমদের মধ্য মতৈক্য রয়েছে। কেননা মহিলাদের বেলায় মাথা কামানো চেহারার বিকৃতি ঘটানোর পর্যায়ভুক্ত।
মহিলারা মাথার চুল কতোটুকু ছোট করবে: ইবনে উমর রা. বলেছেন: কোনো মহিলা যখন চুল ছোট করার ইচ্ছা করবে, তখন তার চুলকে তার মাথার সামনের দিকে জমা করবে, তারপর তা থেকে আংগুল পরিমাণ ছেটে ফেলবে। আতা বলেন: কোনো মহিলা যখন তার চুল ছোট করবে, তখন সে তার চুলের প্রান্তভাগ থেকে ছেটে ফেলবে। সাঈদ বিন মানসুর। কেউ বলেন: মহিলারা কতটুকু ছাটবে তার কোনো ধরাবাধা পরিমাণ নেই। শাফেয়ী বলেন: ন্যূনপক্ষে তিনটে চুল ছাঁটা যথেষ্ট।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তওয়াফে এফাযা বা তওয়াফে যিয়ারত

📄 তওয়াফে এফাযা বা তওয়াফে যিয়ারত


এ ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর এজমা হয়েছে যে, তওয়াফুল এফাযা হজ্জের একটা রুকন তথা অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো হাজি এটা করতে ব্যর্থ হলে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ বলেন : وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ “তারা যেন প্রাচীন ঘরটির তওয়াফ করে।” ইমাম আহমদের মতে এজন্য নির্দিষ্টভাবে নিয়ত করা জরুরি। আর তিন ইমামের মতে, হজ্জের নিয়তই এর ওপর বলবত হবে, হাজির পক্ষ থেকে এটা বিশুদ্ধ ও যথেষ্ট হবে – যদিও সে সুনির্দিষ্টভাবে এই তওয়াফের নিয়ত না করে। অধিকাংশ আলেমের মতে, এর সাতটি চক্কর সব কটাই ফরয ও রুকন। আবু হানিফার মতে, সাতটি থেকে চারটি চক্কর হজ্জের রূকন। এ চারটা বাদ দিলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে। অবশিষ্ট তিন চক্কর রুকন নয়, কিন্তু ওয়াজিব। কেউ এই তিনটে বা তার কোনো একটা তরক করলে সে ওয়াজিব তরককারী হবে। তার হজ্জ বাতিল হবেনা। তবে তাকে দম দিতে হবে।
তওয়াফে এফাযার সময়: শাফেয়ী ও আহমদের মতানুসারে এর সময় শুরু হয় ১০ই জিলহজ্জ দিবাগত মধ্য রাত থেকে এবং এর শেষ সময় নির্ধারিত নেই। তবে এই তওয়াফ না করা পর্যন্ত সহবাস হালাল হবেনা। আইয়ামে তাশরিক থেকে একে বিলম্বিত করলে কোনো দম বা কুরবানি ওয়াজিব হবেনা। তবে মাকরূহ হবে। দশই জিলহজের দুপুরে পূর্বাহ্নে এর জন্য সর্বোত্তম সময়। আবু হানিফা ও মালেকের মতে ১০ই জিলহজ্জের ফজর থেকেই এর সময় শুরু হয়। কিন্তু এর শেষ সময় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফার মতে, কুরবানির দিনগুলোর মধ্য থেকে যে কোনো দিন এটা সম্পন্ন করা ওয়াজিব। এ দিনগুলোর পরে করলে দম দেয়া লাগবে। মালেক বলেন: আইয়ামে তাশরিকের শেষ দিন পর্যন্ত একে বিলম্বিত করাতে কোনো ক্ষতি নেই। তবে ত্বরান্বিত করা উত্তম। এর সময় জিলহজ্জ মাসের শেষ পর্যন্ত বিস্তৃত। এরপরও যদি আরো বিলম্বিত করা হয়, তবে দম দিতে হবে কিন্তু হজ্জ বিশুদ্ধ হবে। কেননা সমগ্র জilহজ্জ মাস তার মতে হজ্জের মাস।
মহিলাদের জন্য তওয়াফুল এফাযা ত্বরান্বিত করা: মহিলারা যদি ঋতুস্রাবের আশংকাবোধ করে, তবে ১০ই জিলহজ্জে এটা সমাধা করা মুস্তাহাব। আয়েশা রা. মহিলাদের ১০ই জিলহজ্জেই তওয়াফুল এফাযা সম্পন্ন করার আদেশ দিতেন, যাতে হঠাৎ ঋতুস্রাব এসে জটিলতার সৃষ্টি না করে। আর আতা বলেছেন: মহিলারা যদি ঋতুস্রাবের আশংকা করে, তাহলে জামারায় কংকর নিক্ষেপেরও পূর্বে এবং কুরবানি দেয়ারও পূর্বে বাইতুল্লাহর তওয়াফে এফাযা করে ফেলা উচিত। এমন ওষুধ ব্যবহারে কোনো দোষ নেই, যাতে ঋতু বিলম্বিত হয় এবং তওয়াফ সমাধা করা যায়।
সাঈদ বিন মানসুর ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কোনো মহিলা যদি তার মাসিক ঋতুস্রাব বিলম্বিত করার জন্য ওষুধ খরিদ করে, যাতে সময়মত দেশে ফিরতে পারে, তাহলে তাতে কোনো বাধা আছে কিনা, ইবনে উমরকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন: এতে কোনো বাধা নেই। তিনি এজন্য মহিলাদেরকে আরাক গাছের রস খেতে বলেন। তাবারি বলেন : এরূপ ক্ষেত্রে যদি ঋতুস্রাবকে বিলম্বিত করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে ঋতুস্রাবের মেয়াদ শেষ করার এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা বিলম্বিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। অনুরূপ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবকে এগিয়ে আনারও ব্যবস্থা জরুরি।
মুহাসসাবে যাত্রা বিরতি জাবালুন নূর ও হুজুনের মধ্যবর্তী উপত্যকার নাম মুহাসসাব। রসূলুল্লাহ সা. মিনা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে মুহাসসাব উপত্যকায় যাত্রা বিরতি করেছিলেন বলে জানা যায়। এখানে তিনি যোহর আছর মাগরিব ও এশা পড়েন এবং কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেন। ইবনে উমরও এরূপ করতেন। এখানে যাত্রা বিরতি করা মুস্তাহাব কিনা তা নিয়ে মতভেদ আছে। আয়েশা রা. বলেন : রসূলুল্লাহ সা. মুহাসসাবে যাত্রা বিরতি করেছিলেন শুধু এজন্য যেন তার যাত্রা সহজতর হয়, এটা কোনো সুন্নত নয়। যে কেউ ইচ্ছা করলে এখানে যাত্রা বিরতি করতে পারে, আবার নাও করতে পারে।
খাত্তাবি বলেন : এটা এক সময় করা হতো। পরে পরিত্যক্ত হয়েছে। তিরমিযি বলেন : কেউ কেউ এখানে যাত্রা বিরতি করা মুستahab মনে করেন, ওয়াজিব নয়। এখানে যাত্রা বিরতির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর শোকর আদায় করা। কেননা তিনি এখানে তার নবীকে তার সেসব শত্রুর উপর বিজয় দান করেছিলেন, যারা বনু হাশেম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবকে এই মর্মে কসম খেয়ে এক ঘরে করেছিল যে, তারা যতোক্ষণ রসূলল্লাহ সা.-কে তাদের হাতে সমর্পণ না করবে ততোক্ষণ আরবের অন্যান্য গোত্র তাদের ক্রয়বিক্রয় ও বিয়ে শাদী করবেনা। ইবনুল কাইয়েম বলেন: মুহাসসাব উপত্যকায় যাত্রা বিরতির মাধ্যমে রসূলুল্লাহ সা. যে স্থানে শত্রুরা কুফরীকে এবং আল্লাহ ও তার রসূলের শত্রুতাকে বিজয়ী করেছিল, সেই একই স্থানে ইসলামের নিদর্শনাবলিকে বিজয়ী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এটাই রসূলুল্লাহ সা. এর অভ্যাস ছিলো, তাওহীদের নিদর্শনাবলিকে তিনি কুফর ও শিরকের নিদর্শনাবলির লীলাভূমিতেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করতেন। যেমন তিনি লাত ও উমর পূজার জায়গায় তায়েফের মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ওমরা

📄 ওমরা


ওমরার শাব্দিক অর্থ যিয়ারত অর্থাৎ ভ্রমণ। এখানে পবিত্র কা'বার ভ্রমণ তার চারপাশে তওয়াফ, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ এবং চুল কাটাসহ গোটা কর্মসূচিকে বুঝানো হয়েছে। আলেমরা একমত যে, এটা শরিয়ত প্রবর্তিত একটি ইবাদত।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: রমযানের একটা ওমরা একটা হজ্জের সমান। (অর্থাৎ রমযানে একটি ওমরা করার সওয়াব একটা নফল হজ্জের সওয়াবের সমান। তবে এ দ্বারা ফরয হজ্জের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবেনা।) -আহমদ, ইবনে মাজাহ।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এক ওমরা থেকে আর এক ওমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সমস্ত গুনাহর কাফফারা হয়ে যাবে। একটা হজ্জ মাবরূরের (গুনাহমুক্ত হজ্জ) প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। -আহমদ, বুখারি, মুসলিম। রসূলুল্লাহ সা.-এর এক হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে: "তোমরা হজ্জ ও ওমরা একটির পর একটি অব্যাহতভাবে করো।"
বারংবার ওমরা করা : নাফে' বলেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইবনে যুবাইরের আমলে বহু বছর যাবত বছরে দুটো করে ওমরা করতেন।
কাসেম বলেছেন: আয়েশা রা. এক বছরে তিনটে ওমরা করেছেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, এতে কেউ কি তাঁর প্রতি দোষারোপ করেছেন? কাসেম বললেন: সুবহানাল্লাহ! তিনি না উম্মুল মুমিনীন? এজন্য অধিকাংশ আলেমের মতে বারংবার ওমরা করায় দোষের কিছু নেই। কিন্তু ইমাম মালেক বছরে একবারের বেশি ওমরা করা মাকরূহ মনে করেন।
হজ্জের পূর্বে ও হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করা জায়েয: হজ্জের মাসগুলোতে হজ্জ ছাড়া শুধু ওমরা করা জায়েয। উমর রা. শওয়াল মাসে ওমরা করে মদিনায় ফিরে এসেছিলেন হজ্জ না করেই। অনুরূপ, হজ্জের পূর্বে ওমরা করাও জায়েয, যেমন উমর রা. করতেন। তাউস বলেন: জাহেলী যুগের মানুষ হজ্জের মাসে ওমরাকে সবচেয়ে বড় গুনাহর কাজ মনে করতো এবং বলতো: সফর মাস যখন অতিক্রান্ত হবে, উটের পায়ের ঘা যখন শুকিয়ে যাবে, রাস্তা থেকে হজ্জের চিহ্ন যখন মুছে যাবে এবং হাজিরা ফিরে আসবে, তখন যার ওমরা করার ইচ্ছা, তার জন্য ওমরা বৈধ হবে। ইসলামের আগমনের পর জনগণকে হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করার আদেশ দেয়া হলো। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত হজ্জের মাসে ওমরা চালু হয়ে গেলো।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের ওমরার সংখ্যা: ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বারটা ওমরা করেছেন, প্রথমটি হুদাইবিয়ার ওমরা, দ্বিতীয়টি ওমরাতুল কাযা, তৃতীয়টি জিরানা থেকে এবং চতুর্থটি তাঁর হজ্জের সাথে। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবেন মাজাহ।
ওমরা সম্পর্কে শরিয়তের বিধি: হানাফি ও মালেকি মযহাবে ওমরা সুন্নত। কেননা জাবের রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. কে ওমরা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, এটা কি ওয়াজিব। তিনি বললেন: না।
শাফেয়ী ও আহমদের মতে, ওমরা ফরয। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তোমরা আল্লাহর জন্য হজ্জ ও ওমরা পূর্ণ করো।" যেহেতু হজ্জে ও ওমরার জন্য এক সাথেই আদেশ দেয়া হয়েছে, তাই এটা ফরয। তবে প্রথমোক্ত মতটি অগ্রগণ্য (অর্থাৎ সুন্নত)। তিরমিযি শাফেয়ীর এ উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ওমরা সম্পর্কে এমন কোনো বিশুদ্ধ হাদিস নেই যা থেকে এটি নফল প্রমাণিত হয়।
ওমরার সময়: অধিকাংশ আলেমের মতে, সারা বছরই ওমরার সময়। তাই বছরের যে কোনো সময় তা আদায় করা জায়েয। তবে আবু হানিফার মতে, আরাফার দিন, ১০ই জিলহজ্জ এবং আইয়ামে তাশরিকের তিন দিন ওমরা মাকরূহ। আবু ইউসুফের মতে, আরাফার দিন ও পরবর্তী তিন দিন ওমরা মাকরূহ। হজ্জের মাসে যে ওমরা বৈধ, সে ব্যাপারে সবাই একমত।
বুখারি ইকরামা থেকে বর্ণনা করেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে হজ্জের পূর্বে ওমরা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন: হজ্জের পূর্বে ওমরা করায় কোনো বাধা নেই। রসূলুল্লাহ সা. হজ্জের পূর্বে ওমরা করতেন।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত: আয়েশা রা. ঋতুবতী অবস্থায় বাইতুল্লাহর তওয়াফ ব্যতীত হজ্জ ও ওমরার যাবতীয় কাজ করেছেন। পবিত্র হওয়ার পর তিনি তওয়াফ করলেন এবং বললেন: হে রসূলুল্লাহ সা. আপনারা হজ্জ ও ওমরা দুটোই করে আসবেন। আর আমি শুধু হজ্জ করে আসবো নাকি? একথা শুনে রসূলুল্লাহ সা. আব্দুর রহমানকে (আয়েশার সহোদর) আদেশ দিলেন আয়েশার সাথে তানয়ীম পর্যন্ত যেতে। তার পর তিনি জিলহজ্জ মাসের মধ্যেই হজ্জের পর ওমরা করলেন। ওমরার সর্বোত্তম সময় রমযান মাস। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
ওমরার ইহরামের মীকাত: প্রথমে দেখতে হবে, যে ব্যক্তি ওমরা করতে ইচ্ছুক, সে ইতিপূর্বে উল্লিখিত হজ্জের মীকাতসমূহের বাইরে অবস্থান করছে, না ভেতরে? যদি বাইরে হয়, তাহলে তার পক্ষে ইহরাম ছাড়া এই মীকাত অতিক্রম করা বৈধ নয়। কেননা বুখারি বর্ণনা করেছেন: যায়েদ ইবনে জুবাইর আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের রা. নিকট এলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কোথা থেকে ওমরা করা আমার জন্য বৈধ হবে? তিনি বললেন: রসূলুল্লাহ সা. নাজদবাসীর জন্য 'কারণ', মদিনাবাসীর জন্য 'যুল হুলাইফা' ও সিরিয়াবাসীর জন্য 'জুহফা' নির্ধারণ করেছেন। আর যদি তার অবস্থান হয় মীকাতের অভ্যন্তরে, তাহলে ওমরার জন্য তার মীকাত হলো হারাম শরিফের সীমানার বাইরে, যদিও ওমরাকারী হারাম শরিফের মধ্যে অবস্থান করে। বুখারিতে এসেছে: আয়েশা রা. তানয়ীমে চলে গেলেন এবং সেখানে ইহরাম করলেন। আর এটা রসূলুল্লাহ সা. এর নির্দেশ ছিলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00