📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান

📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান


সূর্য অস্ত যাওয়ার পর শান্তভাবে আরাফাত থেকে রওয়ানা হওয়া সুন্নত। রসূলুল্লাহ সা. শান্তভাবে ও ধীরে ধীরে আরাফাত ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর উটনীর লাগাম ধারণ করেছিলেন, তারপর বলেছিলেন: হে জনতা, তোমরা ধীরে পদক্ষেপে চলো। দ্রুত চলাতে কোনো সওয়াব নেই। - বুখারি ও মুসলিম। বুখারি ও মুসলিম আরো বর্ণনা করেন যে, জনগণের সাথে বিনম্র ব্যবহারের অভ্যাসের কারণেই তিনি ধীর গতিতে চলতেন। যখনই রাস্তা একটু ফাঁকা পেতেন অমনি কিছুটা দ্রুত চলতেন।
এ সময় তালবিয়া ও যিকর মুস্তাহাব। কেননা জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়তেন।
আশয়াস বিন সুলাইম রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি ইবনে উমরের সাথে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় এসেছিলাম। মুযদালিফায় আসা পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়ছিলেন। একটুও ক্লান্ত হননি। - আবু দাউদ।
মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা এক ওয়াক্তে পড়া : মুযদালিফায় পৌঁছার পর রসূল সা. এক আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশা পড়েছেন। মাঝে কোনো নফল পড়েননি।
মুসলিমের হাদিসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও এশা এক আযানে ও দুই ইকামতে পড়লেন। মাঝে কোনো নামায পড়লেন না। এই একত্রিকরণ সর্বসম্মতভাবে একটি সুন্নত।
কেউ যদি প্রত্যেক নামায স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়ে, তাহলে তা নিয়ে মতভেদে রয়েছে। অধিকাংশ আলেমদের মতে এটা জায়েয। তবে রসূল সা.-এর কাজকে অগ্রগণ্য বলে অভিহিত করেছে। ছাওরী ও যুক্তবাদী আলেমগণ বলেছেন: মাগরিব যদি মুযদালিফা ব্যতিত অন্য কোথাও পড়ে তবে তা দোহরাতে হবে। তারা যোহর ও আসর স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়াকে জায়েয বলেছেন। কিন্তু মাকরূহ হবে বলে রায় দিয়েছেন।
মুযদালিফায় অবস্থান ও রাত্রি যাপন: জাবের রা.-এর হাদিসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মুযদালিফায় এলেন তখন মাগরিব ও এশা পড়লেন। তারপর শুয়ে পড়লেন এবং যখন ভোর হলো, উঠে ফজর পড়লেন। তারপর কাসওয়ায় আরোহণ করলেন এবং মাশয়ারুল হারামে এলেন। তারপর প্রভাত খুব ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রইলেন। তারপর সূর্যোদয়ের আগে রওয়ানা হলেন। তিনি এখানে সারা রাত জেগেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মুযদাফিলায় রাত্র যাপন ও অবস্থান সম্পর্কে হাদিস থেকে এটুকুই জানা গেছে। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীরা বাদে সকলের ওপরই মুযদালিফায় রাত যাপন ওয়াজিব বলে আহমদ রায় দিয়েছেন। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীদের উপর এটা ওয়াজিব নয়। অবশিষ্ট ইমামগণ বলেছেন, মুযদালিফায় অবস্থান সকলের জন্য ওয়াজিব। রাত্র যাপন ওয়াজিব নয়। অবস্থান দ্বারা যে কোনো উপায়ে উপস্থিতি বুঝানো হয়েছে। চাই দাঁড়িয়ে হোক, বসে হোক, চলমান অবস্থায় হোক বা ঘুমন্ত অবস্থায় হোক।
হানাফী মাযহাবের মত হলো, ১০ই জিলহজ্জের ফজরের পূর্বে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। উপস্থিত না হলে দম দিতে হবে। অবশ্য ওযর থাকলে ভিন্ন কথা। ওযর থাকলে উপস্থিত হওয়া জরুরি নয়। কোনো দমও দিতে হবেনা। আর মালেকীদের মত হলো, কোনো ওযর না থাকলে আরাফা থেকে মিনা যাওয়ার পথে মুযদালিফায় রাতের বেলা ফজরের পূর্বে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যাত্রা বিরতি করা ওয়াজিব। ওযর থাকলে বিরতি ওয়াজিব নয়।
শাফেয়ীদের মতে আরাফায় অবস্থানের পর ১০ই জিলহজ্জের পূর্বের রাতের দ্বিতীয়ার্ধে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। মুযদালিফায় অবস্থান করা শর্ত নয়। এমনকি স্থানটি মুযদালিফা কিনা তাও জানা শর্ত নয়। শুধু ওখান দিয়ে অতিক্রম করাই যথেষ্ট। চাই জায়গাটা মুযদালিফা, একথা জানুক বা না জানুক। প্রথম ওয়াক্তে ফজরের নামায পড়া অত:পর প্রভাত হওয়া পর্যন্ত মাশয়ারুল হারামে অবস্থান করা সুন্নত। সূর্যোদয়ের পূর্বে আকাশ খুব পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত এখানে অবস্থানপূর্বক বেশি করে দোয়া ও যিকর করা সুন্নত। আল্লাহ বলেন:
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ، وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ، وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ . ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ، وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"তারপর যখন তোমরা আরাফা থেকে রওয়ানা হবে তখন মাশয়ারুল হারামের নিকটে আল্লাহর যিকর করো। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে সেভাবে আল্লাহর যিকর করো। ইতিপূর্বে তো তোমরা গোমরাহ ছিলে। তারপর লোকেরা যে পথ ধরে চলে, তোমরাও সেই পথ ধরে চলো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হও। মুহাসসারে এলে দ্রুত গতিতে তা অতিক্রম করবে।
মুযদালিফায় অবস্থানের জায়গা: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থান করার উপযুক্ত স্থান কেবল মুহাসসার নামাক উপত্যকা বাদে। (এটি মিনা ও মুযদালিফার মাঝে অবস্থিত।) জুবাইর বিন মুতয়াম রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থানের যোগ্য স্থান। তবে মুহাসসার থেকে দ্রুত পার হয়ে যাও।"-আহমদ। কুযাহ নামক পাহাড়ের নিকট অবস্থান করা সর্বোত্তম।
আলী রা. বর্ণনা করেছেন: যখন 'কুযাতে' রসূলুল্লাহ সা.-এর ভোর হলো, তখন তিনি কুযাহ'তে এলেন এবং সেখানে অবস্থান করলেন। তিনি বললেন: "সমগ্র কুযাহ অবস্থানের যোগ্য এবং সমগ্র কুযা' অবস্থানের যোগ্য।" আবু দাউদ, তিরমিযি। (কুযাহ মুযদালিফার একটি জায়গা। জাহেলি যুদ্ধে কুরাইশ যখন আরাফাতে অবস্থান করতোনা তখন এখানে অবস্থান করতো। জাওহারীর মতে, এটি মুযদালিফার একটি পাহাড়ের নাম। বহু সংখ্যক ফকীহর নিকট এটাই মাশয়ারুল হারাম।)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইয়াওমুন নহর (১০ই জিলহজ্জ)-এর কার্যাবলি

📄 ইয়াওমুন নহর (১০ই জিলহজ্জ)-এর কার্যাবলি


ইয়াওমুন নাহরের (কুরবানির দিনের) কাজগুলো নিম্নরূপ ধারাবাহিকতার সাথে পালন করতে হবে: প্রথমে কংকর নিক্ষেপ। তারপর কুরবানি। তারপর চুল কামানো। তারপর বাইতুল্লাহর তওয়াফ। এই ধারাবাহিকতা সুন্নত। তবে এর কোনো একটি কাজকে যদি অপর কাজের আগে করা হয় তাহলে কোনো কাফফারা বা দম দেয়া লাগবেনা। এটা অধিকাংশ আলেমের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের মত।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জে মিনায় অবস্থান করলেন। সেখানে লোকেরা তাঁকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। তখন এক ব্যক্তি এসে বললো: হে রসূল! আমি অজ্ঞতাবশত কুরবানির আগেই মাথা কামিয়েছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ঠিক আছে, কুরবানি দিয়ে দাও। কোনো ক্ষতি হবেনা। তারপর আরেকজন এলো। সে বললো: হে রসূল! আমি না জেনে শুনে কংকর নিক্ষেপের আগে কুরবানি করে ফেলেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ঠিক আছে, কংকর নিক্ষেপ করো, কোনো ক্ষতি হবেনা। এভাবে রসূলুল্লাহ সা.কে যে কাজের কথাই জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিলো যে, আগে বা পরে করা হয়েছে, তাতে তিনি বলেছেন: করে নাও, ক্ষতি নেই।
আবু হানীফা বলেন: ধারাবাহিকতা ঠিক না রেখে এক কাজের আগে আরেক কাজ করলে দম দিতে হবে। "কোনো ক্ষতি নেই" একথার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ফিদিয়া বা দম না দিলেও কোনো গুনাহ হবেনা।
ইহরাম মুক্ত হওয়ার দুই পর্যায়: ইয়াওমুন নাহর অর্থাৎ ১০ই জিলহজ্জ তারিখে জামরায় কংকর নিক্ষেপ এবং মাথার চুল ছাটা বা ন্যাড়া করা দ্বারা ইহরামকারীর জন্য ইহরাম দ্বারা যা যা হারাম হয়ে গিয়েছিল, তার প্রায় সব হালাল হয়ে যায়। এরপর তার জন্য একমাত্র স্ত্রী সহবাস ব্যতীত সুগন্ধি ব্যবহার ও সেলাই করা কাপড় পরা ইত্যাদি বৈধ হয়ে যায়। এটা ইহরাম মুক্ত হওয়ার প্রথম পর্যায়। এরপর যখন তওয়াফে এযাফা বা তওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করবে, তখন তার জন্য স্ত্রী সহবাসসহ সবকিছুই বৈধ হয়ে যায়। এটা ইহরাম মুক্ত হওয়ার দ্বিতীয় ও শেষ পর্যায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কংকর নিক্ষেপ

📄 কংকর নিক্ষেপ


মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে যে কংকর নিক্ষেপ করা হয় তা তিন জায়গায় নিক্ষেপ করা হয়: ১. জামরাতুল আকাবা: মিনায় প্রবেশের সময় সর্বপ্রথম যেটি বাম দিকে দৃষ্টিগোচর হয়। ২. জামরাতুল উসতা বা মধ্যবর্তী জামারা: এটি প্রথমটির পরে ১১৬৭৭ মিটার দূরে অবস্থিত। ৩. জামরাতুস সুগরা: এটি দ্বিতীয়টি থেকে ১৫৬০৪ মি: দূরে মাসজিদুল খায়ফের নিকটে অবস্থিত।
কংকর নিক্ষেপের গোড়ার কথা: বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন কুরবানি করতে মিনায় এলেন, তখন জামরাতুল আকাবার নিকট তাঁর সামনে শয়তান আবির্ভূত হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে লক্ষ্য করে সাতটা কংকর নিক্ষেপ করলেন। অমনি সে মাটির নিচে ডেবে অদৃশ্য হয়ে গেলো। পুনরায় দ্বিতীয় জামরায় আবির্ভূত হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে লক্ষ্য করে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। ফলে সে মাটির নিচে ধ্বসে গেলো। তারপর পুনরায় তৃতীয় জামরায় আবির্ভূত হলো। তিনি এবারও তাকে লক্ষ্য করে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। ফলে সে মাটির নিচে ধ্বসে উধাও হয়ে গেলো। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: তোমরা শয়তানকে লক্ষ্য করে কংকর নিক্ষেপ করবে এবং ইবরাহিমের আদর্শ অনুসরণ করবে। ইবনে খুযায়মা, হাকেম।
কংকর নিক্ষেপের যুক্তি: ইমাম আবু হামেদ গাযযালী রহ. ইহয়াউল উলুম গ্রন্থে লিখেছেন: কংকর নিক্ষেপের সময় নিক্ষেপকারীর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর ও রসূলের আদেশ পালন, আল্লাহ্র দাসত্ব ও আনুগত্য প্রকাশ, নিছক আদেশ পালনের উদ্দেশ্য প্রস্তুত ও উদ্বুদ্ধ হওয়ার নমুনা প্রদর্শন এবং এতে নিজের প্রবৃত্তি ও বুদ্ধির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এই মনোভাব ব্যক্ত করা। উপরন্তু এর মাধ্যমে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে নিজের সাদৃশ্য প্রমাণ করার ইচ্ছাও পোষণ করা উচিত। সেখানে অভিশপ্ত ইবলিস তার সামনে উপস্থিত হয়ে তার হজ্জের ব্যাপারে তাঁর মনে সন্দেহ সৃষ্টি অথবা তাকে কোনো গুনাহে লিপ্ত করতে চেয়েছিল। তাই আল্লাহ তাকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে ইবরাহিম আ. কে আদেশ দিয়েছিলেন।
তোমার মনে যদি এরূপ চিন্তা আসে যে, ইবরাহিম আ.-এর সামনে শয়তান আবির্ভূত ও উপস্থিত হয়েছিল বলে তিনি পাথর মেরেছিলেন। কিন্তু আমার সামনে তো শয়তান আসেনি। আমি কেন পাথর মারবো? এরূপ চিন্তার উদ্রেক হলে জেনে নিও, এটা শয়তানেরই প্ররোচনা এবং এটা তার পক্ষ থেকেই এসেছে। এ ধারণা সে-ই তোমার মনে ঢুকিয়েছে, যাতে পাথর নিক্ষেপে তোমার প্রেরণা ও উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যায় এবং তোমাকে বুঝানো যায় যে, এতে কোনো লাভ নেই এবং এটা একটা বাহুল্য কাজ। এতে তুমি কেনো লিপ্ত হবে? এ চিন্তাধারা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য কঠোর সংকল্প নিয়ে পাথর নিক্ষেপ করো। এভাবেই তুমি শয়তানকে পরাভূত করতে পারবে। জেনে রাখো, বাহ্যত যদিও দেখা যাচ্ছে, তুমি আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করছো, কিন্তু আসলে তুমি পাথর নিক্ষেপ করছ শয়তানের মুখের ওপর এবং তার মেরুদণ্ড ভেংগে দিচ্ছো। কেননা মহান আল্লাহর আদেশ পালন ও তাকে সবকিছুর উর্ধ্বে তুলে ধরা ছাড়া আর কোনো উপায়ে তুমি শয়তানকে পরাভূত করতে পারোনা। আর এই আদেশ পালনে তোমার প্রবৃত্তি যেন তোমাকে কিছু মাত্র পিছু হটাতে না পারে এবং আল্লাহর হুকুমই যেন তোমাকে সকল বাধা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাতে যথেষ্ট হয়।
কংকর নিক্ষেপ সম্পর্কে শরিয়তের বিধান : অধিকাংশ আলেমের মতে কংকর নিক্ষেপ ওয়াজিব, হজ্জের রুকন নয়। এটা তরক করলে দম দিয়ে অর্থাৎ একটা ছাগল কুরবানি করে এর ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। কেননা আহমদ, মুসলিম ও নাসায়ী জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি রসূলুল্লাহ সা. কে দেখেছি নিজের উটের ওপর বসে ইয়াওমুন নাহরে (১০ই জিলহজ্জ তারিখে) কংকর নিক্ষেপ করছেন এবং বলছেন: তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের ইবাদতের পদ্ধতি শিখে নাও। কেননা আমি জানিনা, এই হজ্জের পর আমি আর হজ্জ করতে পারবো কিনা। আব্দুর রহমান তাইমী বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জে আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যেনো আংগুল দিয়ে ছোড়া যায় এমন ছোট ছোট কংকর নিক্ষেপ করি। - তাবারানি।
কংকরের আকৃতি কেমন হবে এবং কোন্ জাতের : উপরোক্ত হাদিসে বলা হয়েছে নিক্ষেপ কংকরের আকৃতি হবে আংগুল দিয়ে নিক্ষেপণযোগ্য শিমের বিচির মতো ক্ষুদ্র। এজন্য আলেমগণ মনে করেন, অনুরূপ ক্ষুদ্র আকৃতির কংকর বা নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করা মুস্তাহাব। বড় আকারের পাথর নিক্ষেপ করলে অধিকাংশ আলেমের মতে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে, তবে মাকরূহ হবে। আহমদ বলেছেন : ক্ষুদ্র কংকর না হলে আদায় হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এগুলোই নিক্ষেপ করতে আদেশ করেছেন এবং বড় পাথর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন।
আবু দাউদ বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে জনতা, তোমরা একে অপরকে হত্যা করোনা। কংকর যখন নিক্ষেপ করবে, তখন ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। (অর্থাৎ বড় আকারের পাথর নিক্ষেপ করলে তা হাজিদের গায়ে পড়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।) ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে বললেন: আমাকে দাও, আমার জন্য পাথর কুড়াও।” তখন আমি তার জন্য শিমের বিচির মতো ছোট ছোট নুড়ি পাথর কুড়িয়ে আনলাম। পাথরগুলো যখন রসূলুল্লাহ সা. এর হাতে দিলাম, তখন তিনি বললেন: এ রকম ছোট পাথরই তো চাই। সাবধান, তোমরা ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করোনা। কেননা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করেছে। (কেউ কেউ বড় পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানের প্রতি নিজের প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করে। এটা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে।)- আহমদ, নাসায়ী।
অধিকাংশ আলেমের মতে এ হাদিসগুলো অগ্রগণ্যতা ও মুstahab নির্দেশক। তারা এ ব্যাপারে একমত যে, পাথর ছাড়া অন্য কিছু যথা লোহা, শিসা ইত্যাদি নিক্ষেপ অবৈধ। কিন্তু হানাফীদের মত এর বিপরীত। তাদের মতে, মাটি থেকে নির্গত যে কোনো জিনিস যথা পাথর, মাটি, ইট, পোড়ামাটি নিক্ষেপ বৈধ। কেননা কংকর নিক্ষেপ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর ভাষা অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক। রসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিগণ কাজের মাধ্যমে যা দেখিয়ে গেছেন সেটা সর্বোত্তম। তবে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এমন নয়। প্রথম মতটি অগ্রগণ্য (অর্থাৎ পাথর জাতীয় জিনিসই নিক্ষেপ করতে হবে- লোহা, ইট ইত্যাদি নিক্ষেপ করা চলবেনা), কেননা রসূলুল্লাহ সা. ক্ষুদ্র পাথর নিক্ষেপ করেছেন এবং আংগুল দিয়ে ছুড়ে মারা যায় এমন ক্ষুদ্র পাথর নিক্ষেপ করার আদেশ দিয়েছেন। কাজেই পাথরের যতো শ্রেণী ও প্রকার হোক চলবে, কিন্তু পাথর ছাড়া অন্য কিছু চলবেনা।
কংকর বা নুড়ি পাথর কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে : ইবনে উমর রা. মুযদালিফা থেকে কংকর সংগ্রহ করতেন। সাঈদ বিন জুবাইরও তদ্রূপ করতেন এবং বলতেন, মুযদালিফা থেকেই এগুলো যোগাড় করা হতো। শাফেয়ী মুযদালিফা থেকে নেয়া মুস্তাহাব মনে করেন। আহমদ বলেছেন: যেখান থেকে ইচ্ছা নুড়ি পাথর সংগ্রহ করো। আতা ও ইবনুল মুনযিরের মতও তদ্রূপ। কেননা ইতিপূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসের হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. কংকর কুড়িয়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু কোথা থেকে তা বলেননি। জামারায় অন্যদের নিক্ষেপিত পাথর কুড়িয়েও কংকর মারা যায়। কিন্তু তা মাকরূহ। এটা হানাফী, শাফেয়ী ও আহমদের মত। ইবনে হাযম বলেন: এটা মাকরূহ নয়। অনুরূপ তার মতে বাহনের ওপর বসে কংকর নিক্ষেপও বৈধ এবং মাকরূহ নয়। অন্যের নিক্ষিপ্ত কংকর কুড়িয়ে নিক্ষেপ করা বৈধ হওয়ার কারণ এই যে, কুরআন ও সুন্নাহ এটাকে নিষিদ্ধ করেনি। তিনি আবার বলেন: কেউ হয়তো বলবে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, জামরার কংকরগুলোর মধ্য থেকে যেগুলো কবুল হয়, তা ওপরে তুলে নেয়া হয়। আর যা কবুল হয়না তা ওখানে পড়ে থাকে (কাজেই পড়ে থাকা কবুল না হওয়া পাথর কুড়িয়ে নিক্ষেপ করা ঠিক নয়)। যদি কবুল হওয়া পাথর তুলে নেয়া না হতো তাহলে ওখানে এতদিন বিশাল পাহাড় হয়ে যেতো এবং চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যেতো। এর জবাবে আমি বলবো: ঠিক আছে, তাতে কী হয়েছে? এসব কংকর যদি একজনের কাছ থেকে কবুল না করা হয়ে থাকে, তবে আরেক জনের কাছ থেকে কবুল করা হবে। কখনো কখনো একজনের সদকা কবুল হয়না। কিন্তু সেই সদকা গ্রহণকারী পুনরায় তা সদকা করে দিলে তা কবুল হয়ে যায়। বাহনের ওপর বসে কংকর নিক্ষেপ বৈধ এজন্য যে, কুদামা বিন আবদুল্লাহ বলেছেন, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে ১০ই জিলহজ্জ তার একটি লালচে রং এর উটনীর পিঠে চড়ে কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। কাউকে মারপিটও করতে হয়নি, তাড়াতেও হয়নি, এদিক সরো ওদিক যাও ইত্যাদি বলে হাঁকাহাঁকিও করতে হয়নি।
কংকরের সংখ্যা: নিক্ষেপণযোগ্য কংকরের সংখ্যা হবে সত্তর অথবা উনপঞ্চাশ। তন্মধ্য থেকে সাতটি নিক্ষেপ করা হবে প্রথম জামারা অর্থাৎ জামরাতুল আকাবায় ১০ই জিলহজ্জ তারিখে। তারপর এগারোই জিলহজ্জ তিন জামারাতে সাতটা করে মোট একুশটি নিক্ষেপ করা হবে। অনুরূপ ১২ই জিলহজ্জ তারিখে তিন জামারায় প্রতিটিতে ৭টি করে, মোট একুশটি কংকর নিক্ষেপ করা হবে। অনুরূপ, প্রতি জামারায় সাতটি করে সর্বমোট একুশটি নিক্ষেপ করা হবে ১৩ই জিলহজ্জ তারিখেও। এভাবে কংকরের সংখ্যা হবে সত্তর। তবে কেউ যদি ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্জ কংকর নিক্ষেপের পর ১৩ তারিখে আর নিক্ষেপ না করে, তবে তা বৈধ হবে। এভাবে হাজি কর্তৃক নিক্ষেপিত কংকরের সংখ্যা দাঁড়ায় উনপঞ্চাশ। আহমদের মযহাব অনুসারে সাতটা কংকর নিক্ষেপও যথেষ্ট। আতা বলেন: পাঁচটা কংকর নিক্ষেপ যথেষ্ট। মুজাহিদ বলেন: ছয়টা কংকর নিক্ষেপ যথেষ্ট। এজন্য কোনো কাফফার দিতে হবেনা। সাঈদ বিন মালেক বলেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে হজ্জে অংশ নেয়ার পর যখন ফিরেছি তখন আমাদের কেউ কেউ বলতো: আমি ছয়টা পাথর নিক্ষেপ করেছি। কেউ বলতো: সাতটা নিক্ষেপ করেছি। এতে কেউ কাউকে তিরস্কার করতোনা।
কংকর নিক্ষেপের দিন: কংকর নিক্ষেপের দিন তিন দিন বা চার দিন। ১০ই জিলহজ্জ এবং আইয়ামে তাশরিকের দুই বা তিন দিন। আল্লাহ বলেন: وَٱذْكُرُوا ٱللَّهَ فِىٓ أَيَّامٍ مَّعْدُودَٰتٍۚ فَمَن تَعَجَّلَ فِى يَوْمَيْنِ فَلَآ إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَآ إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ ٱتَّقَىٰ ۗ তোমরা নির্দিষ্ট কতক দিনে আল্লাহর যিকর করো। যে ব্যক্তি দু'দিনেই কাজ সম্পন্ন করে তার কোনো গুনাহ নেই। আর যে ব্যক্তি (১৩ তারিখ পর্যন্ত) বিলম্বিত করতে চায়, তারও কোনো গুনাহ নেই।
১০ই জিলহজ্জের কংকর নিক্ষেপ: কংকর নিক্ষেপের নির্বাচিত সময় হলো ১০ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর থেকে দুপুর পর্যন্ত। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এই দিনের দুপুরের আগেই কংকর নিক্ষেপ করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের কাছে গিয়ে বললেন: সূর্যোদয়ের পরে ব্যতীত ছোট জামারায় (জামারাতুল আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করোনা। -তিরমিযি।
দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত করলেও তা বৈধ হবে। ইবনে আব্দুল বার বলেন: আলেমগণ একমত যে ব্যক্তি ১০ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ করবে, তার কংকর নিক্ষেপ বৈধ হবে। অবশ্য এটা মুস্তাহাব নয়।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: মিনায় ১০ই জিলহজ্জ তারিখে রসূলুল্লাহ সা. কে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হতো। এক ব্যক্তি বললো: আমি সন্ধ্যার পর কংকর নিক্ষেপ করেছি। তিনি বললেন: কোনো ক্ষতি নেই। -বুখারি
কংকর নিক্ষেপকে রাত পর্যন্ত বিলম্বিত করা যাবে কি: যখন কোনো ওযরের কারণে দিনের বেলা কংকর নিক্ষেপ সম্ভব হয়না, তখন রাত পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ বিলম্বিত করা বৈধ। কেননা মালেক নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমরের স্ত্রী সুফিয়ার এক মেয়ের মুযদালিফায় নেফাস শুরু হলো। ফলে সেই মেয়ে ও সুফিয়া মুযদালিফায় থেকে গেলেন এবং ১০ই জিলহজ্জের সূর্যাস্তের পর মিনায় পৌঁছলেন। ইবনে উমর রা. তাদেরকে আদেশ দিলেন কংকর নিক্ষেপ করতে। তিনি তাদেরকে কোনো কাফফারা দিতে বলেননি। তবে ওযর না থাকলে বিলম্বিত করা মাকরূহ। রাতে নিক্ষেপ করলে হানাফী, শাফেয়ী ও মালেকের একটি রেওয়ায়াত অনুযায়ী দম দেয়া লাগবেনা। ইতিপূর্বে ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদিসই তার প্রমাণ।
আহমদের মতানুসারে কংকর নিক্ষেপ যদি এতোটা বিলম্বিত করে যে, ১০ই জিলহজ্জ দিন পার হয়ে যায়, তাহলে রাতে কংকর নিক্ষেপ করা যাবেনা। পরের দিন সূর্য পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পর নিক্ষেপ করতে হবে।
দুর্বল ও ওযরধারীদের জন্য ১০ই জিলহজ্জ দিবাগত রাত দুপুরের পর কংকর নিক্ষেপের অনুমতি: রাতের প্রথমার্ধের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ করা সর্বসম্মতভাবে অবৈধ। তবে নারী, শিশু, দুর্বল ওযরধারী ও পশুপালকদের জন্য ১০ই জিলহজ্জ মধ্যরাত থেকে জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের অনুমতি রয়েছে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. উম্মে সালামা রা. কে ১০ই জিলহজ্জ রাতে কংকর নিক্ষেপের জন্য পাঠালেন। উম্মে সালামা ফজরের আগে কংকর নিক্ষেপ করে চলে আসলেন। -আবু দাউদ, বায়হাকি, ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. উটের রাখালদেরকে রাতে কংকর নিক্ষেপের অনুমতি দিয়েছেন। -বাযযার। উরওয়া রা. বলেন: ১০ই জিলহজ্জ তারিখে রসূলুল্লাহ সা. উম্মে সালামার কাছে বারবার ঘুরলেন এবং তাকে আদেশ দিলেন যেন দ্রুত পাথর নিক্ষেপ করে মক্কায় চলে আসেন এবং মক্কায় ফজরের নামায পড়েন। সেদিনটি তার পালা ছিলো। তাই রসূলুল্লাহ সা. চেয়েছিলেন উম্মে সালামা তাঁর সংগী হোন। শাফেয়ী ও বায়হাকি। আতা বলেন: আসমা সম্পর্কে এক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি জামারায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন। আমি বললাম আমরা রাত্রে জামারায় কংকর নিক্ষেপ করেছি। আসমা বললেন: রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে আমরাও এ রকম করতাম। আবু দাউদ।
তাবারি বলেছেন: উম্মে সালামা ও আসমার হাদীস থেকে শাফেয়ী প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, মধ্য রাতের পর যাত্রা করা বৈধ- তাঁর এই মত সঠিক।
ইবনে হাযম বলেছেন: রাতে কংকর নিক্ষেপ শুধু মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। পুরুষদের জন্য নয়, চাই সবল পুরুষ হোক বা দুর্বল পুরুষ হোক।
কিন্তু হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যাদের ওযর আছে, তাদের জন্য রাতে যাত্রা করা ও কংকর নিক্ষেপ করা বৈধ। ইবনুল মুনযির বলেছেন: সূর্যোদয়ের পরে ছাড়া কংকর নিক্ষেপ না করা সুন্নত। যেমন রসূলুল্লাহ সা. করতেন। ফজর হওয়ার আগে কংকর নিক্ষেপ করা জায়েয নেই। কেননা এটা সুন্নতের বিরোধী। তবে যে ব্যক্তি ফজরের আগে কংকর নিক্ষেপ করবে, তার আর এটা দোহরাতে হবেনা। কেননা এটা শুদ্ধ হবেনা- এমন কথা কেউ বলেছে বলে জানিনা।
জামারার উপর থেকে কংকর নিক্ষেপ: আসওয়াদ বলেন: আমি উমর রা-কে দেখেছি জামারার ওপর থেকে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। আতা বলেছেন: জামারার উপর থেকে কংকর নিক্ষেপ করা বৈধ।
জিলহজ্জের তিন দিনে কংkor নিক্ষেপ: তিন দিন ব্যাপী কংকর নিক্ষেপের সবচেয়ে ভালো সময় হলো সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. সূর্য হেলে পড়ার সময় অথবা তার পরে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। -আহমদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। বায়হাকি নাফে' থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর রা. বলতেন: আমরা এই তিনদিন সূর্য হেলে পড়ার পর ছাড়া কংকর নিক্ষেপ করিনা।
কংকর নিক্ষেপকে কেউ যদি রাত পর্যন্ত বিলম্বিত করে, তবে তা মাকরূহ হবে। তবে রাতে নিক্ষেপ করলে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করবে, তারপর নয়।
এটা ইমাম আবু হানিফা ব্যতিত সকল ইমামের সর্বসম্মত মত। আবু হানিফার মতে, তৃতীয় দিন সূর্য হেলার আগে কংকর নিক্ষেপের অনুমতি আছে। কেননা ইবনে আব্বাস বলেছেন: বিদায়ী যাত্রার শেষ দিনে সূর্য উত্তপ্ত হলে কংকর নিক্ষেপ ও মিনা থেকে বিদায় হওয়া জায়েয।
আইয়ামে তাশরিকে কংকর নিক্ষেপের পর অবস্থান করা: কংকর নিক্ষেপের পর কেবলামুখি হয়ে অবস্থান করা। আল্লাহর নিকট দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসা করা এবং নিজের জন্য, সকল মুমিন ভাই এর জন্য গুনাহ মাফ চাওয়া মুস্তাহাব।
আহমদ ও বুখারি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন : মসজিদুল খায়েফের পার্শ্ববর্তী প্রথম জামারাতে যখন কংকর নিক্ষেপ করতেন, তখন সাতটা কংকর নিক্ষেপ করতেন, প্রত্যেক কংকরের সাথে আল্লাহু আকবার বলতেন, তারপর বাতনুল ওয়াদীতে বাম দিকে চলে যেতেন, সেখানে কেবলামুখি হয়ে দু'হাত উঁচু করে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন, পুনরায় রওনা হয়ে আকাবার নিকটবর্তী জামারাতে এসে সাতটা কংকর নিক্ষেপ করতেন, প্রত্যেকটা কংকরে আল্লাহু আকবার বলতেন, অতঃপর আর অবস্থান না করে চলে যেতেন। হাদিসে আছে, তিনি আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপের পর অবস্থান করতেন না। অবস্থান করতেন শেষ জামারা দুটিতে কংকর নিক্ষেপের পর। আলেমগণ আবস্থানের জন্য একটা মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো: যে কংকর নিক্ষেপের পর সেই দিন আর কোনো কংকর নিক্ষেপ নেই, তার পরে কোনো অবস্থান নেই। আর যে কংকর নিক্ষেপের পর একই দিন আরো কংকর নিক্ষেপ আছে, তারপর অবস্থান করতে হবে। ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. যখন আকাবার জামরায় কংকর নিক্ষেপ করতেন, তখন সামনে চলে যেতেন, অবস্থান করতেন না।
কংকর নিক্ষেপ ধারাবাহিকতা: রসূলুল্লাহ সা. থেকে বিশ্বস্ত সনদে প্রমাণিত যে, তিনি মিনার সংলগ্ন প্রথম জামারায় কংকর নিক্ষেপ শুরু করতেন, তারপর তার সন্নিহিত মধ্যবর্তী জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতেন, তারপর আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতো। তিনি বলেছেন: "তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের ইবাদতগুলো গ্রহণ করো।" এ থেকে তিনজন ইমাম প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, জামারাগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা শর্ত এবং রসূলুল্লাহ সা. যেরূপ ধারাবাহিকভাবে নিক্ষেপ করেছেন, সেভাবেই নিক্ষেপ করতে হবে। তবে হানাফীদের গৃহীত মত হলো, ধারাবাহিকতা সুন্নত; শর্ত নয়।
প্রতিটি কংকরের সাথে তকবীর ও দোয়া এবং কংকরকে আংগুলের মাঝে ধরে রাখা মুস্তাহাব : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও ইবনে উমর রা. জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের সময় বলতেন: হে আল্লাহ, আমার হজ্জকে গুনাহমুক্ত হজ্জ বানাও এবং আমার গুনাহ মাফ করো। ইবরাহিম বলেছেন: আকাবার জামারা করার পর এই দোয়াটি পড়া পুরুষদের জন্য পছন্দ করা হতো। ইবরাহিমকে বলা হলো: প্রত্যেক জামারাতেই আপনি এই দোয়া করেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। দোয়াটি হলো: اللَّهُمَّ اجْعَلْ حَجًّا مَبْرُورًا وَ ذَنْبًا مَغْفُورًا আতা বলেছেন: যখনই কংকর নিক্ষেপ করো তকবীর বলবে, তকবীরের অব্যবহিত পর কংকর নিক্ষেপ করবে।
মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. প্রতিটা কংকরের সাথে তকবীর বলতেন। ফাতহুল বারীতে আছে: এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, তাবকীর না দিলে কোনো কাফফারা লাগবেনা।
সালমান বিন আহওয়াসের মাতা বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা.কে আকাবার জামারার নিকট উটের ওপর আরোহী অবস্থায় দেখেছি, তাঁর আংগুলের মাঝে কংকর দেখেছি, সেই কংকর তিনি নিক্ষেপ করলেন, আর তার সাথে অন্যেরাও নিক্ষেপ করলো।
কংকর নিক্ষেপে অন্যকে প্রতিনিধি করা কোনো ব্যক্তির যদি এমন কোনো ওযর যথা রোগ ইত্যাদি থাকে, যা তাকে কংকর নিক্ষেপে অক্ষম করে দেয়, তবে সে নিজের পক্ষ থেকে কাউকে পাথর নিক্ষেপ করার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে।
জাবের রা. বলেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে নারী ও শিশুসহ হজ্জ করেছি। আমরা শিশুদের পক্ষ হতে তালবিয়া পড়তাম এবং কংকর নিক্ষেপ করতাম। -ইবনে মাজাহ।
মিনায় রাত যাপন: তিন ইমামের মতে (আবু হানিফা ব্যতীত) ১০, ১১, ১২ জিলহজ্জ এই তিন রাত অথবা ১১ ও ১২ জিলহজ্জ এই দুই দিবাগত রাত মিনায় যাপন করা ওয়াজিব। হানাফীদের নিকট রাত যাপন সুন্নত।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: তোমার কংকর মারা যখন সম্পন্ন হয়, তখন যেখানে ইচ্ছা রাত যাপন করো। -ইবনে আবি শায়বা। মুজাহিদ বলেন: রাতের প্রথম ভাগ মক্কায় ও শেষ ভাগ মিনায় অথবা প্রথম ভাগ মিনায় ও শেষ ভাগ মক্কায় কাটানো যেতে পারে। ইবনে হাযম বলেন : যে ব্যক্তি মিনার রাতগুলো মিনায় যাপন করেনা, সে অন্যায় করে। তবে এজন্য কোনো কাফফারা নেই। এটা সর্বসম্মত মত যে, যাদের ওযর আছে, যেমন পানি সরবরাহকারী ও উটের রক্ষক, তাদের রাত যাপনের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তারা রাত যাপন বর্জন করলে তাদের ওপর কোনো কাফফারাও নেই। বুখারি প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, আব্বাস রা. রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট পানি সরবরাহের দায়িত্ব পালনার্থে মিনার রাতগুলো মক্কায় যাপনের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছেন। আসেম বিন আদী থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. রাখালদেরকে মিনায় রাত যাপন বর্জনের অনুমতি দিয়েছেন। -তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন করবে কবে ও কখন মিনা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের নির্ধারিত সময় তিন ইমামের মতে ১২ই জিলহজ্জ কংকর নিক্ষেপের পর সূর্যাস্তের পূর্বে। আর হানাফীদের মতে, ১৩ই জিলহজ্জ ফজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মক্কায় প্রত্যাবর্তন করা যাবে। তবে সূর্যাস্তের পর রওনা হওয়া মাকরূহ। এটা সুন্নতের পরিপন্থী। কিন্তু তাতে কোনো কাফফারা দিতে হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কুরবানির পশু বা হাদি

📄 কুরবানির পশু বা হাদি


হাদি: আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানির জন্য হারাম শরিফে হাদিয়াস্বরূপ যে পশু পৌঁছানো হয়, তাকে শরিয়তের পরিভাষায় আল-হাদয়, বা হাদি বলা হয়। আল্লাহ বলেন: وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ، لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ، فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَافٌ، فَإِذَا وَجَبَتْ جُنُوبُهَا فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَر كَذَلِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ. لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا ، وَلَا دِمَاؤُهَا، وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ .
"উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি। এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো অবস্থায় তাদের উপর তোমরা আল্লাহর নাম উমরণ করো। তারপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তোমরা তা থেকে কিছু নিজেরা খাও এবং কিছু খাওয়াও দরিদ্রজনকে এবং যে অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি চায় তাকেও খাওয়াও। আমি এভাবেই এই পশুগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যেন তোমরা শোকর করো। আল্লাহর কাছে এগুলোর গোশতও পৌঁছেনা, রক্তও পৌঁছেনা। তাঁর কাছে পৌঁছে শুধু তোমার তাকওয়া।"
উমর রা. বলেছেন: তোমরা (কুরবানির পশু) হাদিয়া পাঠাও। কারণ আল্লাহ হাদিয়া পছন্দ করেন, রসূলুল্লাহ সা. একশো উট নফল হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।
শ্রেষ্ঠ হাদিয়া: আলেমগণ একমত যে, হজ্জের সময়ে প্রেরিত হাদিয়া পশু ছাড়া অন্য কিছু থেকে দেয়া বৈধ নয়। উট, গরু ও ছাগল ভেড়া- চাই পুরুষ হোক বা মাদী হোক- হাদিয়া পাঠানো যায়। এর মধ্যে সর্বোত্তম হাদিয়া উট, তারপর গরু, তারপর ছাগল বা ভেড়া। কেননা উট আকারে সবচেয়ে বড় হওয়ায় তা দরিদ্রদের জন্য অধিকতর লাভজনক। অনুরূপ গরু, ছাগল, ভেড়ার চেয়ে বেশি লাভজনক। এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে একটি উটের সাত ভাগের এক ভাগ, গরুর সাত ভাগের এক ভাগ ও একটা ছাগল এর কোন্টি উত্তম, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে দরিদ্রদের জন্য যেটা বেশি লাভজনক, সেটাই যে উত্তম- এ ব্যাপারে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
ন্যূনতম হাদিয়া: হারাম শরিফের উদ্দেশ্যে উক্ত তিন প্রকারের মধ্য থেকে যে কোনো পশু হাদিয়া পাঠানো যায়। রসূলুল্লাহ সা. একশোটা উট নফল হাদিয়া হিসেবে কুরবানি করতে পাঠিয়েছিলেন। ন্যূনতম পক্ষে একজনের পক্ষ থেকে যে হাদিয়া পাঠানো যায় তা হচ্ছে একটা ছাগল, একটা উটের সাত ভাগের একভাগ কিংবা একটা গরুর সাত ভাগের এক ভাগ। কেননা গরু বা উট সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানি দেয়া যায়।
জাবের রা. বলেছেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে হজ্জ করেছিলাম। তখন আমরা সাতজনের পক্ষ থেকে উট এবং সাতজনের পক্ষ থেকে গরু কুরবানি করেছিলাম। -আহমদ, মুসলিম। কুরবানির শরিকদের সবাই আল্লাহর নৈকট্যকামী হবে এটা শর্ত নয়। তাদের কতক আল্লাহর নৈকট্য চায়, কতক শুধু গোশত চায়, এমন হলেও কুরবানি বৈধ হবে। কিন্তু হানাফীরা এ মতের বিরোধী। তাদের নিকট সকল শরিকের আল্লাহর নৈকট্যকামী হওয়া শর্ত।
উট হাদিয়া দেয়া কখন ওয়াজিব একমাত্র বীর্যপাতজনিত অপবিত্রতাসহ বা হায়েয ও নেফাসসহ তওয়াফে যিয়ারত করলে, আরাফাতে অবস্থানের পর ও চুল কামানোর আগে স্ত্রী সহবাস করলে অথবা উট কুরবানির মানত করলেই উট হাদিয়া পাঠানো ওয়াজিব হয়। আর উট না পাওয়া গেলে সাতটা ছাগল কিনতে হবে।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এলো এবং বললো: আমার একটা উট কুরবানির দায় রয়েছে। উট কেনার ক্ষমতাও আমার রয়েছে। কিন্তু কেনার জন্য উট পাচ্ছিনা। তখন রসূলুল্লাহ সা. তাকে আদেশ দিলেন যেনো সাতটা ছাগল কিনে কুরবানি দেয়। -আহমদ, ইবনে মাজাহ।
হাদিয়ার প্রকারভেদ: হাদিয়া দুই প্রকারে মুস্তাহাব ও ওয়াজিব। মুস্তাহাব হাদিয়া হচ্ছে মুফরিদ হাজী ও মুফরিদ ওমরাহকারীর হাদিয়া। আর ওয়াজিব হাদিয়া হচ্ছে পাঁচ প্রকার: ১ ও ২. কিরান হজ্জ ও তামাত্তু হজ্জকারী ওপর কুরবানির হাদিয়া ওয়াজিব।
৩. হজ্জের কোনো ওয়াজিব তরককারীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব হয়। যেমন কংকর নিক্ষেপ, মিকাত থেকে ইহরাম, আরাফায় অবস্থানকালে রাত ও দিন একত্রিতকরণ, মুযদালিফায় রাত যাপন, মিনায় রাত যাপন, বিদায়ী তওয়াফ ইত্যাদি তরক করলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়।
৪. ইহরাম করার পর সহবাস ব্যতীত যে সকল কাজ হারাম হয়। যেমন, সুগন্ধি গ্রহণ ও চুল কামানো ইত্যাদির কোনো একটি করলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়।
৫. হারাম শরিফের সীমার মধ্যে শিকার করলে বা গাছ কাটলে যে কুরবানি ওয়াজিব হয়। এর প্রত্যেকটি যথাস্থানে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হাদিয়ার শর্তাবলি: হাদিয়া পাঠানোর জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো পালন করা জরুরি:
১. হাদিয়াস্বরূপ প্রদত্ত পশু যদি ভেড়া ব্যতীত অন্য কিছু হয়, তাহলে তা 'ছানী' হতে হবে। ভেড়া হলে তা 'জাযা' অর্থাৎ ছয় মাস বয়সের হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা হলেই চলবে। উটের মধ্য থেকে পাঁচ বছর, গরুর মধ্য থেকে দু'বছর এবং মাদী ছাগল থেকে পুরো এক বছর বয়স্ক পশুকে 'ছানী, বলা হয়। এসব পশু থেকে পাঠালে ছানী পাঠালে চলবে।
২. শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ নিখুঁত হতে হবে। কানা, খোঁড়া, দাদ বা চর্মরোগধারী ও জীর্ণশীর্ণ পশু হলে চলবেনা।
হাসান বলেছেন: কোনো ব্যক্তি যখন সুস্থ পশু কেনে, কিন্তু কুরবানির দিনের আগে তা অন্ধ, খোঁড়া বা জীর্ণশীর্ণ হয়ে যায়, তাহরে সেটাই যবাই করা উচিত। তাতেই কুরবানি শুদ্ধ হবে। -সাঈদ বিন মানসুর।
হাদিয়া নির্বাচনের মুস্তাহাব পদ্ধতি: মালেক হিশাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা তার সন্তানদেরকে বলতেন: হে আমার ছেলেরা তোমরা এমন উট আল্লাহর জন্য হাদিয়া পাঠিওনা, যা তোমাদের কোনো প্রিয় বন্ধুকে দিতে লজ্জা পাও। মনে রেখো, আল্লাহ সকল প্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তির চেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত। সাঈদ বর্ণনা করেন, ইবনে উমর একটা উটনীর পিঠে আরোহণ করে সমগ্র মক্কা শহরে ঘুরলেন। তার পর তার প্রশংসা করলেন। উটনীটা তার ভালো লাগলো। তিনি তা থেকে নেমে তাকে চিহ্নিত করলেন ও হাদিয়া পাঠালেন।
হাদিয়া বা কুরবানির পশুকে চিহ্নিত করা: দুই পদ্ধতিতে কুরবানির পশুকে চিহ্নিত করা হয়: ইশয়ার: উট বা গরুর কুঁজ থাকলে কুঁজের যে কোনো এক পাশ চিরে রক্ত বের করে দিয়ে একটা চিহ্ন তৈরি করা, যাতে ঐ জন্তুটি হাদিয়া বা কুরবানির পশু বলে চিহ্নিত হয় এবং কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে।
তাকলীদ: কুরবানির পশুর গলায় এক টুকরো চামড়া বা অন্য কোনো প্রতিক ঝুলিয়ে দেয়া, যাতে ওটা হাদিয়া বা কুরবানির পশু বলে পরিচিত হয়। রসূলুল্লাহ সা. একবার এক পাল মেশ হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন এবং তাকে চিহ্নিত করেছিলেন। সেই মেষ পাল হিজরি ৯ সালের হজ্জে আবু বকরের সাথে পাঠিয়েছিলেন। তিনি কুরবানির পশুর গলায় প্রতিক ঝুলিয়ে দিয়ে ও কুঁজ চিরে চিহ্নিত করে হুদাইবিয়ার দিন ওমরার ইহরাম বেঁধেছিলেন। ইমাম আবু হানিফা ব্যতীত সকল আলেম এটিকে সুন্নত মনে করেন।
পশুকে চিহ্নিত করার যৌক্তিকতা: এর যৌক্তিকতা হলো আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে সম্মান প্রদর্শন করা, প্রকাশ করা, প্রচার করা যে, এগুলো কুরবানির পশু, যা আল্লাহর ঘরে পাঠানো হচ্ছে, তাঁর উদ্দেশ্যে কুরবানি করা ও তাঁর নৈকট্য লাভের জন্য।
হাদিয়ার পশুর পিঠে আরোহণ: কুরবানির উটে আরোহণ ও অন্যান্যভাবে উপকৃত হওয়া বৈধ। কেননা আল্লাহ বলেছেন: لَكُمْ فِيهَا مَنَافِعُ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى ثُمَّ مَحِلُّهَا إِلَى الْبَيْتِ الْعَتِيقِ “তোমাদের জন্য এসব পশুতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রচুর উপকারিতা রয়েছে, তারপর এগুলো প্রাচীন কাবাগৃহে পৌঁছবে।”
দাহহাক ও আতা বলেন: এই উপকারিতা হলো প্রয়োজনমত এগুলোর ওপর আরোহণ এবং এগুলোর দুধ, ও পশম ব্যবহার করা। নির্দিষ্ট সময় হলো: প্রতিক পরানোর পর 'হাদিয়ার পশু' হওয়া পর্যন্ত। আর প্রতীক কা'বাগৃহে পৌঁছা অর্থ মিনায় কুরবানির দিন পৌঁছা ও যবাই হওয়া।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. এক ব্যক্তিকে দেখলেন একটা উট হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাকে বললেন: ওর ওপর আরোহণ করো। সে বললো: এটা একটা কুরবানির উটনী। তিনি বললেন: আরে, তাতে কি হয়েছে, আরোহণ করো। এভাবে দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার বললেন। বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী।
এটি আহমদ, ইসহাক ও মালেকের মযহাব। শাফেয়ী বলেছেন: খুব তীব্র প্রয়োজন হলে এর ওপর আরোহণ করা যায়।
কুরবানির সময়: কুরবানির সময় নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ হয়েছে। শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে এর সময় হলো ১০ই জিলহজ্জ ও তার পরবর্তী আইয়ামুত্ তাশরিক ১১,১২ ও ১৩ই জিলহজ্জ। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আইয়ামে তাশরিকের সকল দিন কুরবানির দিন। -আহমদ যদি সময় পার হয়ে যায়, তবে কুরবানির জন্য নির্দিষ্ট পশুকে কাযা হিসেবে যবাই করবে। মালেক ও আহমদের নিকট কুরবানির পশু যবাইর সময় কুরবানির দিনসমূহ, চাই ওয়াজিব কুরবানি হোক বা নফল। তামাত্ত্ব ও কিরানের হাদিয়ার ব্যাপারে হানাফীদের অভিমত এটাই। পক্ষান্তরে মানত, কাফফারা ও নফল কুরবানির জন্য যে কোনো সময় যবাই করা যায়। ইবরাহিম নখয়ী প্রমুখের মতে এর সময় ১০ জিলহজ্জ থেকে জিলহজ্জ মাসের শেষ পর্যন্ত।
কুরবানির স্থান: হাদিয়ার পশু, চাই ওয়াজিব হোক বা নফল হোক, হারাম শরিফের বাইরে কোথাও যবাই করা যাবেনা। হারাম শরিফের যে কোনো স্থানে যবাই করা যাবে।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সমগ্র মিনা কুরবানির স্থান এবং সমগ্র মুযদালিফা অবস্থানের স্থান। মক্কার সকল ওলি গলি ও পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথ চলাচলের পথ ও কুরবানির স্থান। আবু দাউদ ইবনে মাজাহ।
তবে হাজি সাহেবদের জন্য সর্বোত্তম স্থান মিনা এবং ওমরাকারীদের সর্বোত্তম স্থান মারওয়া। কেননা এটা উভয়ের ইহরাম মুক্ত হওয়ার স্থান।
মালেক থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: এই মিনা যবাই করার স্থান, সমগ্র মিনা যবাইর স্থান, আর ওমরায় এই মারওয়া এবং মক্কার সকল গিরিপথ ও ওলি গলি যবাইর স্থান।
উটকে বুকে ও অন্যান্য পশুকে কণ্ঠনালীতে যবাই করা মুস্তাহাব : উটকে দাঁড়ানো ও বাম হাত বাঁধা অবস্থায় (পশুর হাত অর্থ সামনের পা) যবাই করা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে নিম্নের হাদিসগুলো লক্ষণীয় :
যিয়াদ বিন জুবাইর থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেখলেন, সে তার উটনীকে বসিয়ে যবাই করছে। তিনি বললেন: ওকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে বেঁধে নাও। এটা তোমাদের নবীর সুন্নত।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. ও তার সাহাবিগণ উটকে বাম পা বেঁধে ও অবশিষ্ট পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে যবাই করতেন। আবু দাউদ।
ইবনে আব্বাস রা. "তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো অবস্থা তাদের ওপর আল্লাহর নাম উমরণ করো" এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলেন: فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا صَوَافٌ অর্থাৎ তিন পায়ের ওপর দাঁড় করানো অবস্থায়......" -হাকেম।
পক্ষান্তরে গরু ও ছাগল শুইয়ে যবাই করা মুস্তাহাব। যে জন্তুকে কণ্ঠনালী কেটে যবাই করতে হবে তাকে যদি বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় আর যে পশুকে বুকে ছুরিকাঘাত করে যবাই করতে হবে, তাকে যদি কণ্ঠনালী কেটে যবাই করা হয়, তাহলে কেউ বলেন, মাকরূহ হবে, কেউ বলেন: মাকরূহ হবেনা। দক্ষতার সাথে যবাই করতে পারলে কুরবানি দাতার নিজের যবাই করা মুস্তাহাব। নচেত সে উপস্থিত থেকে যবাই প্রত্যক্ষ করবে।
কসাইকে কুরবানির পশুর গোশত দ্বারা পারিশ্রমিক দেয়া যাবেনা: যবাইকারীকে কুরবানির পশু থেকে পারিশ্রমিক দেয়া যাবেনা। তবে তাকে তা থেকে কিছু সদকা হিসেবে দেয়া যাবে। কেননা আলী রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে আদেশ দিয়েছেন যেন আমি কুরবানির উট যবাইর সময় তার সামনে দাঁড়াই, তার চামড়া ও তার গায়ের চট বিতরণ করে দেই এবং কসাইকে পশু থেকে কিছু না দেই। আলী রা. বললেন: তাকে আমরা নিজেদের থেকেই দিয়ে থাকি। সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
হাদিস থেকে এটাও প্রমাণিত যে: কুরবানির পশুর যবাই, গোশত বিলি বণ্টন এবং তার চামড়া ও তার গায়ের চট বিতরণের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ। কিন্তু পারিশ্রমিক হিসেবে কসাইকে পশু থেকে কিছু দেয়া বৈধ নয়। নিজের পকেট থেকে তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। (কুরবানির পশুর চামড়া ও তার যে কোনো অংশ বিক্রি করা সর্বসম্মতভাবে অবৈধ।) আর হাসান বর্ণনা করেছেন যে, কসাইকে চামড়া দেয়াতে ক্ষতি নেই।
কুরবানির পশুর গোশত থেকে খাওয়া: কুরবানির পশুর গোশত থেকে খাওয়ার জন্য আল্লাহ স্বয়ং আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ “তা থেকে তোমরা খাও এবং দুস্থ দরিদ্রকে খাওয়াও।” এ আদেশ স্পষ্টতই ওয়াজিব ও নফল উভয় প্রকারে কুরবানিকেই অন্তর্ভুক্ত করে। তবে বিভিন্ন অঞ্চলের ফকীহগণ এ বিষয়ে মতভেদ পোষণ করেন। আবু হানিফা ও আহমদের মতে, তামাত্তু ও কিরান হজ্জের কুরবানির গোশত ও নফল কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয। এ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের কুরবানির গোশত খাওয়া কুরবানি দাতার জন্য বৈধ নয়। মালেকের মতে, কুরবানি দাতার হজ্জ যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে বা সময় চলে যাওয়ায় হজ্জ হাতছাড়া হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সে ইতিপূর্বে পাঠানো পশুর গোশত সে খেতে পারবে। তামাতু হজ্জের কুরবানির গোশতও খেতে পারবে। কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যাজনিত অক্ষমতার ফিদিয়াস্বরূপ এবং শিকার করার শাস্তিস্বরূপ প্রদত্ত কুরবানির গোশত ব্যতিত এবং মিসকীনদের জন্য মানতকৃত কুরবানি ব্যতিত ও হারাম শরিফে পৌঁছার আগে যে মারা যাওয়া পশুর বাবদ দত্ত কুরবানির গোশত ব্যতীত আর সকল কুরবানির গোশত খাওয়া যাবে। সায়েরা'র মতে শিকার করার শাস্তি, হজ্জ নষ্ট করার ফিদিয়া, তামাত্তু ও কিরানের কুরবানি এবং নিজের ওপর আরোপিত মানতের কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয নেই। অনুরূপ যে কোনো ওয়াজিব কুরবানির গোশত খাওয়া জায়েয নেই। তবে নফল কুরবানির গোশত খেতেও পারবে, খাওয়াতেও পারবে, সদকা ও হাদিয়াস্বরূপ বন্টন করতেও পারবে।
কুরবানির গোশতের কী পরিমাণ খাওয়া বৈধ: হাদিয়াস্বরূপ কুরবানির পশু প্রেরক হাজির নিজের প্রেরিত পশুর গোশত যে পরিমাণ ইচ্ছা খাওয়া বৈধ, সে উক্ত পশুর গোশত যতো ইচ্ছা খেতে পারবে। অনুরূপ যতো ইচ্ছা হাদিয়া ও সদ্কারূপেও বন্টন করতে পারবে। কারো কারো মতে, অর্ধেক নিজে খাবে ও অর্ধেক সদকা করবে। কারো কারো মতে এক তৃতীয়াংশ নিজে খাবে, এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেবে ও এক তৃতীয়াংশ সদকা করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00