📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আরাফায় অবস্থান

📄 আরাফায় অবস্থান


আরাফার দিনের ফযিলত: জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যিলহজ্জের দশ দিনের চেয়ে ভালো দিন আল্লাহর কাছে আর নেই। এক ব্যক্তি বললো: আল্লাহর পথে জিহাদে কাটানো কতগুলো দিনের চেয়েও কি এই দশ দিন ভালো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এ দশ দিন আল্লাহর পথে জিহাদে অতিবাহিত দিনগুলোর চেয়েও ভালো। আর আরাফার দিনের চেয়ে ভালো দিন আল্লাহর কাছে আর নেই। এ দিন আল্লাহ সর্বনিম্ন আকাশে নেমে আসেন। তারপর আকাশবাসীর সামনে পৃথিবীবাসীদের নিয়ে গর্ব করেন। তিনি বলেন: আমার বান্দাদের দিকে দৃষ্টি দাও। তারা এলোমেলো চুলে ধুলামলিন দেহে দুপুর না হতেই আমার নিকট এসেছে। তারা এসেছে দূর দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। তারা আমার রহমতের আশা করে। অথচ আমার আযাব তারা দেখেনি। ইয়াওমে আরাফায় যতো বিপুল সংখ্যক লোক দোযখ থেকে মুক্তি পায়, ততো কোনো দিন পায়না" -আবু ইয়ালা, বাযযার, ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান।

ইবনুল মুবারক আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. এমন সময় আরাফায় অবস্থান নিলেন যে সূর্য তখন প্রত্যাবর্তনে উদ্যত। (অর্থাৎ পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেছে।) তিনি বললেন: “হে বিলাল, আমার কথা শোনার জন্য জনতাকে নীরব হতে বলো।" বিলাল দাঁড়িয়ে বললেন: "আপনারা চুপ করুন। রসূলুল্লাহ সা. ভাষণ দিবেন। মনোযোগ দিয়ে শুনুন।" লোকেরা নীরব হয়ে গেলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হে জনতা, আমার কাছে এই মাত্র জিবরীল এসেছিলেন। তিনি আমাকে আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সালাম জানালেন। তারপর বললেন: আল্লাহ আরাফাবাসীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। মাশয়ারুল হারামবাসীকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর তাদের সকল ক্ষতির প্রতিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।" একথা শুনে উমর রা. দাঁড়ালেন। তিনি বললেন: হে রসূল, এ সুসংবাদ কি শুধু আমাদের জন্য? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এটা তোমাদের জন্য এবং তোমাদের পর কেয়ামত পর্যন্ত যারা আরাফায় আসবে তাদের সকলের জন্য। উমর রা. বললেন: আল্লাহর মহানুভবতা প্রচুর ও উৎকৃষ্ট। আর মুসলিম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনে আল্লাহ তার যতো বান্দাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেন, তার চেয়ে বেশি আর কোনো দিন দেননা। আল্লাহ তায়ালা এই দিন নিকটবর্তী হন। ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং বলেন: এরা কী চায়? আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনে শয়তানকে যতো বেঁটে, লজ্জিত ও ক্ষিপ্ত হতে দেখা গেছে, বদরের দিন ব্যতিত আর কোনো দিন তাকে এমন দেখা যায়নি। আর এর কারণ শুধু এই যে, এই দিন সে আল্লাহর অশেষ রহমত নাযিল হতে ও তার বান্দাদের বড় বড় গুনাহ মাফ হতে দেখেছে। একমাত্র বদরের দিন তাকে এ রকম ক্ষিপ্ত ও লজ্জিত দেখা গেছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রসূলুল্লাহ, বদরের দিন সে কী দেখেছিল? রসূলুল্লাহ সা. বললেন : সে দেখেছে, জিবরীল ফেরেশতাদের বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মালেক।

আরাফায় অবস্থান সম্পর্কে শরিয়তের বিধান: আলেমগণ একমত যে, আরাফায় অবস্থান হজ্জের শ্রেষ্ঠতম রুকন। কেননা আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আবদুর রহমান ইবনে ইয়ামার থেকে বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ সা. জনৈক ঘোষণাকারীকে এই মর্মে ঘোষণা করতে আদেশ দিলেন যে, হজ্জ হলো আরাফা। (অর্থাৎ ইয়াওমে আরাফায় অবস্থানকারীর হজ্জই বিশুদ্ধ হজ্জ।) যে ব্যক্তি ৯ই জিলহজ্জ দিবাগত রাতে ও ফজর হওয়ার আগে আরাফায় অবস্থান করবে, তার হজ্জ আদায় হয়ে যাবে। (অর্থাৎ আরাফার যে কোনো অংশে ৯ তারিখের দিনে বা রাতে এক মুহূর্তের জন্য হলেও অবস্থান করতেই হবে।)

উকুফে আরাফার (আরাফায় অবস্থানের) সময়: অধিকাংশ আলেমের মতে, ৯ই জিলহজ্জের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার পর থেকে দশই জিলহজ্জের ফজর পর্যন্ত আরাফায় অবস্থানের সময়। এই সময় রাত ও দিনের যে কোনো অংশে অবস্থান যথেষ্ট হবে। তবে দিনে অবস্থান করলে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। তবে রাতে অবস্থান করলে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যতোক্ষণ ইচ্ছা অবস্থান করতে পরে। শাফেয়ী মযহাব অনুসারে রাত পর্যন্ত অবস্থান করা সুন্নত।

অবস্থানের উদ্দেশ্য: অবস্থানের উদ্দেশ্য হলো আরাফার যে কোনো অংশে উপস্থিতি, চাই ঘুমিয়ে হোক, জেগে হোক, শুয়ে হোক, বসে হোক, পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে থাকা অবস্থায় হোক বা বাহনে আরোহী হয়ে হোক পবিত্র অবস্থায় হোক অথবা অপবিত্র অবস্থায় হোক, যথা ঋতুবতী মহিলারা কিংবা বীর্যপাতজনিত অপবিত্র পুরুষ। যে ব্যক্তি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আরাফায় অবস্থান করে এবং আরাফা থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তার সংজ্ঞা ফেরেনি, তার সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফা ও মালেক বলেছেন: তার অবস্থান শুদ্ধ। শাফেয়ী, আহমদ, হাসান, আবুজর, ইসহাক ও ইবনুল মুনযির বলেন: শুদ্ধ হবেনা। কেননা এটা হজ্জের রুকন। সুতরাং সঙজ্ঞাহীন ব্যক্তির দ্বারা অন্য কোনো রুকন যেমন শুদ্ধ হয়না। তেমনি এটাও শুদ্ধ হবেনা।

তিরমিযি উপরোক্ত ইবনে ইয়ামারের হাদিস উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, সুফিয়ান ছাওরী বলেন : সাহাবিগণসহ সকল আলেমদের আমল ইবনে ইয়ামারের হাদিস অনুসারে। অর্থাৎ জিলহজ্জের দশ তারিখের ফজরের পূর্বে যে ব্যক্তি আরাফায় অবস্থান করলনা তার হজ্জ হবেনা। সূর্যোদয়ের পরে এলে হজ্জ হবেনা। এটা ওমরায় পরিণত হবে। তাকে পরবর্তী বছর হজ্জ করতে হবে। এটা শাফেয়ী ও আহমদ প্রমুখের মত।

আরাফার প্রস্তরময় স্থানে অবস্থান করা মুস্তাহাব: আরাফার যে কোনো স্থানে অবস্থান করাই যথেষ্ট ও শুদ্ধ। কেননা সমগ্র আরাফার ময়দানই অবস্থানের জায়গা কেবল পশ্চিমে অবস্থিত 'বাতনে আরাফা' নামক ময়দান বাদে। কেননা সেখানে অবস্থান সর্বসম্মতভাবে অশুদ্ধ। প্রস্তরপূর্ণ জায়গাগুলোতে বা তার সন্নিকটে অবস্থান করা মুস্তাহাব। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এই জায়গায়ই অবস্থান করেছেন এবং বলেছেন: আমি এখানে অবস্থান করলাম। তবে সমগ্র আরাফাত ময়দানই অবস্থানের স্থান। আহমদ, মুসলিম আবু দাউদ। জাবালুর রহমতে আরোহণ করা এবং সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য জায়গার চেয়ে ভালো এরূপ ধারণা করা ভুল। এটা সুন্নত নয়।

গোসল করা মুস্তাহাব: আরাফাতে অবস্থানের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. আরাফায় বিকালে অবস্থানের জন্য গোসল করতেন। মালেক। উমর রা. আরাফার ময়দানে তালবিয়া পড়তে পড়তে গোসল করেছেন।

অবস্থানের নিয়ম-কানুন ও দোয়া: পূর্ণ পবিত্রতা বজায় রাখা, কেবলামুখি থাকা, বেশি করে তওবা ইসতিগফার ও যিকর করা, নিজের জন্য, অন্যের জন্য এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের যা কিছু মনে চায়। আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ভীতিসহকারে ও মনোযোগসহকারে দু'হাত তুলে দোয়া করবে।

উসামা বিন যায়েদ বলেছেন: "আমি আরাফাতে রসূলুল্লাহ সা. এর সহ-আরোহী ছিলাম। তিনি হাত উঁচু করে দোয়া করতে বলেছেন। নাসায়ী।

আমর বিন শুয়াইব তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন: আরাফাতের দিন রসূলুল্লাহ সা. যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়তেন তা হলো:
লَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
আহমদ, তিরমিযি। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনের দোয়া হচ্ছে শ্রেষ্ঠ দোয়া। আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীরা যেসব দোয়া করতেন তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দোয়া হলো:
লَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
(আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁর, প্রশংসাও তাঁর, তিনি সব বিষয়ে শক্তিমান)। হুসাইন ইবনে হাসান বলেন: আমি সুফিয়ান বিন উয়াইনাকে জিজ্ঞাসা করলাম: ইয়াওমে আরাফার শ্রেষ্ঠ দোয়া কী? তিনি বললেন:
لا إلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ .
আমি বললাম: এতো আল্লাহর প্রশংসা। এটা দোয়া নয়। (অর্থাৎ এতে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হয়নি।) তিনি বললেন: তুমি মালেক বিন মানযুরের হাদিস জানো? ঐ হাদিসেই এর ব্যাখ্যা রয়েছে। আমি বললাম: হাদিসটি কি আপনি আমাকে বলুন। তিনি বললেন: হাদিসটি হলো: আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা যখন আমার ওপর প্রশংসা করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু চাওয়ার সুযোগ পায়না। তখন আমি প্রার্থনাকারীদেরকে যা দেই, তার চেয়েও ভালো জিনিস তাকে দেই।" তিনি বললেন: এটাই উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা। পুনরায় সুফিয়ান বললেন: তুমি কি জানোনা উমাইয়া ইবনে আবিস্ সান্ত যখন আবদুল্লাহ বিন জাদয়ানের কাছে তার দান পাওয়ার জন্য এসেছিলেন তখন কি বলেছিলেন? হুসাইন বলেন। না। তিনি বললেন: উমাইয়া বলেছিলেন: "আমি কি নিজের চাহিদার উল্লেখ করবো, না আপনার লজ্জা আমার জন্য যথেষ্ট। লজ্জা তো আপনার বৈশিষ্ট্য। মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও আপনার বৈশিষ্ট্য। কেননা আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আপনর বংশ মর্যাদা অতীব মহৎ ও উত্তম। যখন কেউ আপনাকে একদিন প্রশংসা করে তার সেই প্রশংসা করাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।" এরপর সুফিয়ান বললেন: হে হুসাইন, এ হলো সৃষ্টি অবস্থা। প্রশংসা করেই সে ক্ষান্ত হয়। চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা। তাহলে স্রষ্টা সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?
বায়হাকি আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফায় আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যে দোয়া সবচেয়ে বেশি করতেন এবং আমি যে দোয়া সবচেয়ে বেশি করি তা হলো:
লা ইلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي بَصَرِي نورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي قَلْبِي نُورًا . اللهم اشْرَحْ لِي صَدْرِي، وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي، اللهم أَعُوذُ بِكَ مِنْ وسواس الصَّدْرِ، وَشَتَاسِ الْأَمْرِ ، وَشَرِّ فِتْنَةِ الْقَبْرِ، وَشَرِّ مَا يَلِجُ فِي اللَّيْلِ، وَشَرِّ مَا يَلِعُ فِي النَّمَارِ ، وَشَرِّ مَا تَعِبُ بِهِ الرِّيَاحُ وَمَرْ بَوَائِقِ الدَّمْرِ.
"আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজ্য তাঁরই, প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সর্বশক্তিমান। হে আল্লাহ, আমার চোখে নূর দাও, কানে নূর দাও, হৃদয়ে নূর দাও। হে আল্লাহ, আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দাও। আমার কাজ সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, আমি তোমার আশ্রয় চাই অন্তরের কুপ্ররোচনা থেকে, কবরের আযাব থেকে। রাতের বেলা প্রবেশকারীর অনিষ্ট থেকে, দিনের বেলায় প্রবেশকারী অনিষ্ট থেকে। বহমান বাতাসের অনিষ্ট থেকে এবং যুগের ধ্বংসাত্মক জিনিসসমূহের অনিষ্ট থেকে।"
তিরমিযি বর্ণনা করেছেন: ইয়াওমে আরাফায় রসূলুল্লাহ সা. সর্বাধিক যে দোয়া আরাফার ময়দানের নিজের অবস্থান স্থলে বসে করতেন তা হলো:
اللهم لَكَ الْحَمْدُ كَالَّذِي نَقُولُ، وَخَيْرًا مِمَّا نَقُولُ : اللَّهُمَّ لَكَ مَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي، وَإِلَيْكَ مَا بِي، وَلَكَ رَبِّ تُرَائِي، اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَوَسْوَسَةِ الصَّدْرِ، وَشَتَاتِ الأمر، اللهم إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَهِبَ بِهِ الرِّيحُ .
"হে আল্লাহ, তুমি যেমন বলো সেভাবেই তোমার প্রশংসা, আমরা যেভাবে বলি তার চেয়ে উত্তম। হে আল্লাহ, তোমার জন্যই আমার নামায, তোমার জন্যই আমার কুরবানি তোমার জন্যই আমার জীবন, তোমার জন্যই আমার মরণ, তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন, তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে কবরের আযাব থেকে, বুকের কুপ্ররোচনা থেকে, বাতিল কার্যকলাপ থেকে এবং বহমান বাতাসের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই।"

আরাফায় অবস্থান ইবরাহিম আ.-এর সুন্নত: মিরবা আনসারী বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা তোমাদের ইবাদতের স্থানগুলোতে অবস্থান করো। কেননা তোমরা ইবরাহিমের উত্তরাধিকার থেকে কিছুটা উত্তরাধিকার পেয়েছো। তিরমিযি।
আরাফার রোযা: বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সা. আরাফার দিনে রোযা রাখেননি। উপরন্তু তিনি বলেছেন: আরাফার দিন, ঈদের দিন ও আইয়ামুত তাশরিক আমরা মুসলমানদের উৎসব। এ দিনগুলো পানাহারের দিন। এও প্রমাণিত যে, তিনি আরাফাতের ময়দানে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন।

এসব হাদিস থেকে অধিকাংশ আলেম এই মর্মে প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, আরাফার দিন হাজিদের জন্য রোযা না রাখা মুস্তাহাব, যাতে সে দোয়া ও বিকরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পায়। আর আরাফার দিনে রোযা রাখার ফযিলত সম্পর্কে যে হাদিসগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো যারা হজ্জ করতে আরাফার ময়দানে যায়নি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
যোহর ও আসরের নামায একত্রিত করা: সহীহ হাদিসে এসেছে রসূলুল্লাহ সা. আরাফায় যোহর ও আসরের নামায একত্রিত করেছেন। আযান হলো, ইকামত হলো, তারপর তিনি যোহর পড়লেন, তারপর পুনরায় ইকামত হলো, তারপর আসরের নামায পড়লেন। আসওয়াদ ও আলকামা বলেছেন: আরাফায় ইমামের সাথে যোহর ও আসর পড়া হজ্জের পূর্ণতা দান করে। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমগণ একমত যে, ইমাম আরাফায় যোহর ও আসর একত্রে (অর্থাৎ একই সাথে যোহরের ওয়াক্তে) পড়বে। অনুরূপ করবে, ইমামের সাথে যারা নামায পড়বেনা তারাও। কেউ যদি ইমামের সাথে এই দুই নামায একত্র না করে তবে একা একাই একত্র করবে। ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত: তিনি মক্কায় বাস করতেন। তারপর যখন তিনি মিনায় যেতেন অথবা নামায কসর করতেন। আমর ইবনে দিনার থেকে বর্ণিত: জাবের বলেছেন: আরাফায় নামায কসর করো। সাঈদ বিন মানসুর।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান

📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান


সূর্য অস্ত যাওয়ার পর শান্তভাবে আরাফাত থেকে রওয়ানা হওয়া সুন্নত। রসূলুল্লাহ সা. শান্তভাবে ও ধীরে ধীরে আরাফাত ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর উটনীর লাগাম ধারণ করেছিলেন, তারপর বলেছিলেন: হে জনতা, তোমরা ধীরে পদক্ষেপে চলো। দ্রুত চলাতে কোনো সওয়াব নেই। - বুখারি ও মুসলিম। বুখারি ও মুসলিম আরো বর্ণনা করেন যে, জনগণের সাথে বিনম্র ব্যবহারের অভ্যাসের কারণেই তিনি ধীর গতিতে চলতেন। যখনই রাস্তা একটু ফাঁকা পেতেন অমনি কিছুটা দ্রুত চলতেন।
এ সময় তালবিয়া ও যিকর মুস্তাহাব। কেননা জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়তেন।
আশয়াস বিন সুলাইম রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি ইবনে উমরের সাথে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় এসেছিলাম। মুযদালিফায় আসা পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়ছিলেন। একটুও ক্লান্ত হননি। - আবু দাউদ।
মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা এক ওয়াক্তে পড়া : মুযদালিফায় পৌঁছার পর রসূল সা. এক আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশা পড়েছেন। মাঝে কোনো নফল পড়েননি।
মুসলিমের হাদিসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও এশা এক আযানে ও দুই ইকামতে পড়লেন। মাঝে কোনো নামায পড়লেন না। এই একত্রিকরণ সর্বসম্মতভাবে একটি সুন্নত।
কেউ যদি প্রত্যেক নামায স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়ে, তাহলে তা নিয়ে মতভেদে রয়েছে। অধিকাংশ আলেমদের মতে এটা জায়েয। তবে রসূল সা.-এর কাজকে অগ্রগণ্য বলে অভিহিত করেছে। ছাওরী ও যুক্তবাদী আলেমগণ বলেছেন: মাগরিব যদি মুযদালিফা ব্যতিত অন্য কোথাও পড়ে তবে তা দোহরাতে হবে। তারা যোহর ও আসর স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়াকে জায়েয বলেছেন। কিন্তু মাকরূহ হবে বলে রায় দিয়েছেন।
মুযদালিফায় অবস্থান ও রাত্রি যাপন: জাবের রা.-এর হাদিসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মুযদালিফায় এলেন তখন মাগরিব ও এশা পড়লেন। তারপর শুয়ে পড়লেন এবং যখন ভোর হলো, উঠে ফজর পড়লেন। তারপর কাসওয়ায় আরোহণ করলেন এবং মাশয়ারুল হারামে এলেন। তারপর প্রভাত খুব ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রইলেন। তারপর সূর্যোদয়ের আগে রওয়ানা হলেন। তিনি এখানে সারা রাত জেগেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মুযদাফিলায় রাত্র যাপন ও অবস্থান সম্পর্কে হাদিস থেকে এটুকুই জানা গেছে। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীরা বাদে সকলের ওপরই মুযদালিফায় রাত যাপন ওয়াজিব বলে আহমদ রায় দিয়েছেন। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীদের উপর এটা ওয়াজিব নয়। অবশিষ্ট ইমামগণ বলেছেন, মুযদালিফায় অবস্থান সকলের জন্য ওয়াজিব। রাত্র যাপন ওয়াজিব নয়। অবস্থান দ্বারা যে কোনো উপায়ে উপস্থিতি বুঝানো হয়েছে। চাই দাঁড়িয়ে হোক, বসে হোক, চলমান অবস্থায় হোক বা ঘুমন্ত অবস্থায় হোক।
হানাফী মাযহাবের মত হলো, ১০ই জিলহজ্জের ফজরের পূর্বে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। উপস্থিত না হলে দম দিতে হবে। অবশ্য ওযর থাকলে ভিন্ন কথা। ওযর থাকলে উপস্থিত হওয়া জরুরি নয়। কোনো দমও দিতে হবেনা। আর মালেকীদের মত হলো, কোনো ওযর না থাকলে আরাফা থেকে মিনা যাওয়ার পথে মুযদালিফায় রাতের বেলা ফজরের পূর্বে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যাত্রা বিরতি করা ওয়াজিব। ওযর থাকলে বিরতি ওয়াজিব নয়।
শাফেয়ীদের মতে আরাফায় অবস্থানের পর ১০ই জিলহজ্জের পূর্বের রাতের দ্বিতীয়ার্ধে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। মুযদালিফায় অবস্থান করা শর্ত নয়। এমনকি স্থানটি মুযদালিফা কিনা তাও জানা শর্ত নয়। শুধু ওখান দিয়ে অতিক্রম করাই যথেষ্ট। চাই জায়গাটা মুযদালিফা, একথা জানুক বা না জানুক। প্রথম ওয়াক্তে ফজরের নামায পড়া অত:পর প্রভাত হওয়া পর্যন্ত মাশয়ারুল হারামে অবস্থান করা সুন্নত। সূর্যোদয়ের পূর্বে আকাশ খুব পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত এখানে অবস্থানপূর্বক বেশি করে দোয়া ও যিকর করা সুন্নত। আল্লাহ বলেন:
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ، وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ، وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ . ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ، وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"তারপর যখন তোমরা আরাফা থেকে রওয়ানা হবে তখন মাশয়ারুল হারামের নিকটে আল্লাহর যিকর করো। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে সেভাবে আল্লাহর যিকর করো। ইতিপূর্বে তো তোমরা গোমরাহ ছিলে। তারপর লোকেরা যে পথ ধরে চলে, তোমরাও সেই পথ ধরে চলো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হও। মুহাসসারে এলে দ্রুত গতিতে তা অতিক্রম করবে।
মুযদালিফায় অবস্থানের জায়গা: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থান করার উপযুক্ত স্থান কেবল মুহাসসার নামাক উপত্যকা বাদে। (এটি মিনা ও মুযদালিফার মাঝে অবস্থিত।) জুবাইর বিন মুতয়াম রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থানের যোগ্য স্থান। তবে মুহাসসার থেকে দ্রুত পার হয়ে যাও।"-আহমদ। কুযাহ নামক পাহাড়ের নিকট অবস্থান করা সর্বোত্তম।
আলী রা. বর্ণনা করেছেন: যখন 'কুযাতে' রসূলুল্লাহ সা.-এর ভোর হলো, তখন তিনি কুযাহ'তে এলেন এবং সেখানে অবস্থান করলেন। তিনি বললেন: "সমগ্র কুযাহ অবস্থানের যোগ্য এবং সমগ্র কুযা' অবস্থানের যোগ্য।" আবু দাউদ, তিরমিযি। (কুযাহ মুযদালিফার একটি জায়গা। জাহেলি যুদ্ধে কুরাইশ যখন আরাফাতে অবস্থান করতোনা তখন এখানে অবস্থান করতো। জাওহারীর মতে, এটি মুযদালিফার একটি পাহাড়ের নাম। বহু সংখ্যক ফকীহর নিকট এটাই মাশয়ারুল হারাম।)

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইয়াওমুন নহর (১০ই জিলহজ্জ)-এর কার্যাবলি

📄 ইয়াওমুন নহর (১০ই জিলহজ্জ)-এর কার্যাবলি


ইয়াওমুন নাহরের (কুরবানির দিনের) কাজগুলো নিম্নরূপ ধারাবাহিকতার সাথে পালন করতে হবে: প্রথমে কংকর নিক্ষেপ। তারপর কুরবানি। তারপর চুল কামানো। তারপর বাইতুল্লাহর তওয়াফ। এই ধারাবাহিকতা সুন্নত। তবে এর কোনো একটি কাজকে যদি অপর কাজের আগে করা হয় তাহলে কোনো কাফফারা বা দম দেয়া লাগবেনা। এটা অধিকাংশ আলেমের মত এবং শাফেয়ী মাযহাবের মত।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জে মিনায় অবস্থান করলেন। সেখানে লোকেরা তাঁকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে। তখন এক ব্যক্তি এসে বললো: হে রসূল! আমি অজ্ঞতাবশত কুরবানির আগেই মাথা কামিয়েছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ঠিক আছে, কুরবানি দিয়ে দাও। কোনো ক্ষতি হবেনা। তারপর আরেকজন এলো। সে বললো: হে রসূল! আমি না জেনে শুনে কংকর নিক্ষেপের আগে কুরবানি করে ফেলেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ঠিক আছে, কংকর নিক্ষেপ করো, কোনো ক্ষতি হবেনা। এভাবে রসূলুল্লাহ সা.কে যে কাজের কথাই জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিলো যে, আগে বা পরে করা হয়েছে, তাতে তিনি বলেছেন: করে নাও, ক্ষতি নেই।
আবু হানীফা বলেন: ধারাবাহিকতা ঠিক না রেখে এক কাজের আগে আরেক কাজ করলে দম দিতে হবে। "কোনো ক্ষতি নেই" একথার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ফিদিয়া বা দম না দিলেও কোনো গুনাহ হবেনা।
ইহরাম মুক্ত হওয়ার দুই পর্যায়: ইয়াওমুন নাহর অর্থাৎ ১০ই জিলহজ্জ তারিখে জামরায় কংকর নিক্ষেপ এবং মাথার চুল ছাটা বা ন্যাড়া করা দ্বারা ইহরামকারীর জন্য ইহরাম দ্বারা যা যা হারাম হয়ে গিয়েছিল, তার প্রায় সব হালাল হয়ে যায়। এরপর তার জন্য একমাত্র স্ত্রী সহবাস ব্যতীত সুগন্ধি ব্যবহার ও সেলাই করা কাপড় পরা ইত্যাদি বৈধ হয়ে যায়। এটা ইহরাম মুক্ত হওয়ার প্রথম পর্যায়। এরপর যখন তওয়াফে এযাফা বা তওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করবে, তখন তার জন্য স্ত্রী সহবাসসহ সবকিছুই বৈধ হয়ে যায়। এটা ইহরাম মুক্ত হওয়ার দ্বিতীয় ও শেষ পর্যায়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কংকর নিক্ষেপ

📄 কংকর নিক্ষেপ


মিনায় শয়তানকে লক্ষ্য করে যে কংকর নিক্ষেপ করা হয় তা তিন জায়গায় নিক্ষেপ করা হয়: ১. জামরাতুল আকাবা: মিনায় প্রবেশের সময় সর্বপ্রথম যেটি বাম দিকে দৃষ্টিগোচর হয়। ২. জামরাতুল উসতা বা মধ্যবর্তী জামারা: এটি প্রথমটির পরে ১১৬৭৭ মিটার দূরে অবস্থিত। ৩. জামরাতুস সুগরা: এটি দ্বিতীয়টি থেকে ১৫৬০৪ মি: দূরে মাসজিদুল খায়ফের নিকটে অবস্থিত।
কংকর নিক্ষেপের গোড়ার কথা: বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন কুরবানি করতে মিনায় এলেন, তখন জামরাতুল আকাবার নিকট তাঁর সামনে শয়তান আবির্ভূত হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে লক্ষ্য করে সাতটা কংকর নিক্ষেপ করলেন। অমনি সে মাটির নিচে ডেবে অদৃশ্য হয়ে গেলো। পুনরায় দ্বিতীয় জামরায় আবির্ভূত হলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে লক্ষ্য করে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। ফলে সে মাটির নিচে ধ্বসে গেলো। তারপর পুনরায় তৃতীয় জামরায় আবির্ভূত হলো। তিনি এবারও তাকে লক্ষ্য করে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। ফলে সে মাটির নিচে ধ্বসে উধাও হয়ে গেলো। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: তোমরা শয়তানকে লক্ষ্য করে কংকর নিক্ষেপ করবে এবং ইবরাহিমের আদর্শ অনুসরণ করবে। ইবনে খুযায়মা, হাকেম।
কংকর নিক্ষেপের যুক্তি: ইমাম আবু হামেদ গাযযালী রহ. ইহয়াউল উলুম গ্রন্থে লিখেছেন: কংকর নিক্ষেপের সময় নিক্ষেপকারীর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আল্লাহর ও রসূলের আদেশ পালন, আল্লাহ্র দাসত্ব ও আনুগত্য প্রকাশ, নিছক আদেশ পালনের উদ্দেশ্য প্রস্তুত ও উদ্বুদ্ধ হওয়ার নমুনা প্রদর্শন এবং এতে নিজের প্রবৃত্তি ও বুদ্ধির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এই মনোভাব ব্যক্ত করা। উপরন্তু এর মাধ্যমে ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সাথে নিজের সাদৃশ্য প্রমাণ করার ইচ্ছাও পোষণ করা উচিত। সেখানে অভিশপ্ত ইবলিস তার সামনে উপস্থিত হয়ে তার হজ্জের ব্যাপারে তাঁর মনে সন্দেহ সৃষ্টি অথবা তাকে কোনো গুনাহে লিপ্ত করতে চেয়েছিল। তাই আল্লাহ তাকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করতে ইবরাহিম আ. কে আদেশ দিয়েছিলেন।
তোমার মনে যদি এরূপ চিন্তা আসে যে, ইবরাহিম আ.-এর সামনে শয়তান আবির্ভূত ও উপস্থিত হয়েছিল বলে তিনি পাথর মেরেছিলেন। কিন্তু আমার সামনে তো শয়তান আসেনি। আমি কেন পাথর মারবো? এরূপ চিন্তার উদ্রেক হলে জেনে নিও, এটা শয়তানেরই প্ররোচনা এবং এটা তার পক্ষ থেকেই এসেছে। এ ধারণা সে-ই তোমার মনে ঢুকিয়েছে, যাতে পাথর নিক্ষেপে তোমার প্রেরণা ও উদ্দীপনা নষ্ট হয়ে যায় এবং তোমাকে বুঝানো যায় যে, এতে কোনো লাভ নেই এবং এটা একটা বাহুল্য কাজ। এতে তুমি কেনো লিপ্ত হবে? এ চিন্তাধারা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য কঠোর সংকল্প নিয়ে পাথর নিক্ষেপ করো। এভাবেই তুমি শয়তানকে পরাভূত করতে পারবে। জেনে রাখো, বাহ্যত যদিও দেখা যাচ্ছে, তুমি আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করছো, কিন্তু আসলে তুমি পাথর নিক্ষেপ করছ শয়তানের মুখের ওপর এবং তার মেরুদণ্ড ভেংগে দিচ্ছো। কেননা মহান আল্লাহর আদেশ পালন ও তাকে সবকিছুর উর্ধ্বে তুলে ধরা ছাড়া আর কোনো উপায়ে তুমি শয়তানকে পরাভূত করতে পারোনা। আর এই আদেশ পালনে তোমার প্রবৃত্তি যেন তোমাকে কিছু মাত্র পিছু হটাতে না পারে এবং আল্লাহর হুকুমই যেন তোমাকে সকল বাধা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাতে যথেষ্ট হয়।
কংকর নিক্ষেপ সম্পর্কে শরিয়তের বিধান : অধিকাংশ আলেমের মতে কংকর নিক্ষেপ ওয়াজিব, হজ্জের রুকন নয়। এটা তরক করলে দম দিয়ে অর্থাৎ একটা ছাগল কুরবানি করে এর ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। কেননা আহমদ, মুসলিম ও নাসায়ী জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি রসূলুল্লাহ সা. কে দেখেছি নিজের উটের ওপর বসে ইয়াওমুন নাহরে (১০ই জিলহজ্জ তারিখে) কংকর নিক্ষেপ করছেন এবং বলছেন: তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের ইবাদতের পদ্ধতি শিখে নাও। কেননা আমি জানিনা, এই হজ্জের পর আমি আর হজ্জ করতে পারবো কিনা। আব্দুর রহমান তাইমী বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জে আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন যেনো আংগুল দিয়ে ছোড়া যায় এমন ছোট ছোট কংকর নিক্ষেপ করি। - তাবারানি।
কংকরের আকৃতি কেমন হবে এবং কোন্ জাতের : উপরোক্ত হাদিসে বলা হয়েছে নিক্ষেপ কংকরের আকৃতি হবে আংগুল দিয়ে নিক্ষেপণযোগ্য শিমের বিচির মতো ক্ষুদ্র। এজন্য আলেমগণ মনে করেন, অনুরূপ ক্ষুদ্র আকৃতির কংকর বা নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করা মুস্তাহাব। বড় আকারের পাথর নিক্ষেপ করলে অধিকাংশ আলেমের মতে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে, তবে মাকরূহ হবে। আহমদ বলেছেন : ক্ষুদ্র কংকর না হলে আদায় হবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এগুলোই নিক্ষেপ করতে আদেশ করেছেন এবং বড় পাথর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন।
আবু দাউদ বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে জনতা, তোমরা একে অপরকে হত্যা করোনা। কংকর যখন নিক্ষেপ করবে, তখন ক্ষুদ্র কংকর নিক্ষেপ করবে। (অর্থাৎ বড় আকারের পাথর নিক্ষেপ করলে তা হাজিদের গায়ে পড়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।) ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাকে বললেন: আমাকে দাও, আমার জন্য পাথর কুড়াও।” তখন আমি তার জন্য শিমের বিচির মতো ছোট ছোট নুড়ি পাথর কুড়িয়ে আনলাম। পাথরগুলো যখন রসূলুল্লাহ সা. এর হাতে দিলাম, তখন তিনি বললেন: এ রকম ছোট পাথরই তো চাই। সাবধান, তোমরা ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করোনা। কেননা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়িই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদেরকে ধ্বংস করেছে। (কেউ কেউ বড় পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানের প্রতি নিজের প্রচণ্ড ক্রোধ প্রকাশ করে। এটা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পড়ে।)- আহমদ, নাসায়ী।
অধিকাংশ আলেমের মতে এ হাদিসগুলো অগ্রগণ্যতা ও মুstahab নির্দেশক। তারা এ ব্যাপারে একমত যে, পাথর ছাড়া অন্য কিছু যথা লোহা, শিসা ইত্যাদি নিক্ষেপ অবৈধ। কিন্তু হানাফীদের মত এর বিপরীত। তাদের মতে, মাটি থেকে নির্গত যে কোনো জিনিস যথা পাথর, মাটি, ইট, পোড়ামাটি নিক্ষেপ বৈধ। কেননা কংকর নিক্ষেপ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর ভাষা অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক। রসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিগণ কাজের মাধ্যমে যা দেখিয়ে গেছেন সেটা সর্বোত্তম। তবে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে এমন নয়। প্রথম মতটি অগ্রগণ্য (অর্থাৎ পাথর জাতীয় জিনিসই নিক্ষেপ করতে হবে- লোহা, ইট ইত্যাদি নিক্ষেপ করা চলবেনা), কেননা রসূলুল্লাহ সা. ক্ষুদ্র পাথর নিক্ষেপ করেছেন এবং আংগুল দিয়ে ছুড়ে মারা যায় এমন ক্ষুদ্র পাথর নিক্ষেপ করার আদেশ দিয়েছেন। কাজেই পাথরের যতো শ্রেণী ও প্রকার হোক চলবে, কিন্তু পাথর ছাড়া অন্য কিছু চলবেনা।
কংকর বা নুড়ি পাথর কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে : ইবনে উমর রা. মুযদালিফা থেকে কংকর সংগ্রহ করতেন। সাঈদ বিন জুবাইরও তদ্রূপ করতেন এবং বলতেন, মুযদালিফা থেকেই এগুলো যোগাড় করা হতো। শাফেয়ী মুযদালিফা থেকে নেয়া মুস্তাহাব মনে করেন। আহমদ বলেছেন: যেখান থেকে ইচ্ছা নুড়ি পাথর সংগ্রহ করো। আতা ও ইবনুল মুনযিরের মতও তদ্রূপ। কেননা ইতিপূর্বে বর্ণিত ইবনে আব্বাসের হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. কংকর কুড়িয়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু কোথা থেকে তা বলেননি। জামারায় অন্যদের নিক্ষেপিত পাথর কুড়িয়েও কংকর মারা যায়। কিন্তু তা মাকরূহ। এটা হানাফী, শাফেয়ী ও আহমদের মত। ইবনে হাযম বলেন: এটা মাকরূহ নয়। অনুরূপ তার মতে বাহনের ওপর বসে কংকর নিক্ষেপও বৈধ এবং মাকরূহ নয়। অন্যের নিক্ষিপ্ত কংকর কুড়িয়ে নিক্ষেপ করা বৈধ হওয়ার কারণ এই যে, কুরআন ও সুন্নাহ এটাকে নিষিদ্ধ করেনি। তিনি আবার বলেন: কেউ হয়তো বলবে, ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, জামরার কংকরগুলোর মধ্য থেকে যেগুলো কবুল হয়, তা ওপরে তুলে নেয়া হয়। আর যা কবুল হয়না তা ওখানে পড়ে থাকে (কাজেই পড়ে থাকা কবুল না হওয়া পাথর কুড়িয়ে নিক্ষেপ করা ঠিক নয়)। যদি কবুল হওয়া পাথর তুলে নেয়া না হতো তাহলে ওখানে এতদিন বিশাল পাহাড় হয়ে যেতো এবং চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যেতো। এর জবাবে আমি বলবো: ঠিক আছে, তাতে কী হয়েছে? এসব কংকর যদি একজনের কাছ থেকে কবুল না করা হয়ে থাকে, তবে আরেক জনের কাছ থেকে কবুল করা হবে। কখনো কখনো একজনের সদকা কবুল হয়না। কিন্তু সেই সদকা গ্রহণকারী পুনরায় তা সদকা করে দিলে তা কবুল হয়ে যায়। বাহনের ওপর বসে কংকর নিক্ষেপ বৈধ এজন্য যে, কুদামা বিন আবদুল্লাহ বলেছেন, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে ১০ই জিলহজ্জ তার একটি লালচে রং এর উটনীর পিঠে চড়ে কংকর নিক্ষেপ করতে দেখেছি। কাউকে মারপিটও করতে হয়নি, তাড়াতেও হয়নি, এদিক সরো ওদিক যাও ইত্যাদি বলে হাঁকাহাঁকিও করতে হয়নি।
কংকরের সংখ্যা: নিক্ষেপণযোগ্য কংকরের সংখ্যা হবে সত্তর অথবা উনপঞ্চাশ। তন্মধ্য থেকে সাতটি নিক্ষেপ করা হবে প্রথম জামারা অর্থাৎ জামরাতুল আকাবায় ১০ই জিলহজ্জ তারিখে। তারপর এগারোই জিলহজ্জ তিন জামারাতে সাতটা করে মোট একুশটি নিক্ষেপ করা হবে। অনুরূপ ১২ই জিলহজ্জ তারিখে তিন জামারায় প্রতিটিতে ৭টি করে, মোট একুশটি কংকর নিক্ষেপ করা হবে। অনুরূপ, প্রতি জামারায় সাতটি করে সর্বমোট একুশটি নিক্ষেপ করা হবে ১৩ই জিলহজ্জ তারিখেও। এভাবে কংকরের সংখ্যা হবে সত্তর। তবে কেউ যদি ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্জ কংকর নিক্ষেপের পর ১৩ তারিখে আর নিক্ষেপ না করে, তবে তা বৈধ হবে। এভাবে হাজি কর্তৃক নিক্ষেপিত কংকরের সংখ্যা দাঁড়ায় উনপঞ্চাশ। আহমদের মযহাব অনুসারে সাতটা কংকর নিক্ষেপও যথেষ্ট। আতা বলেন: পাঁচটা কংকর নিক্ষেপ যথেষ্ট। মুজাহিদ বলেন: ছয়টা কংকর নিক্ষেপ যথেষ্ট। এজন্য কোনো কাফফার দিতে হবেনা। সাঈদ বিন মালেক বলেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে হজ্জে অংশ নেয়ার পর যখন ফিরেছি তখন আমাদের কেউ কেউ বলতো: আমি ছয়টা পাথর নিক্ষেপ করেছি। কেউ বলতো: সাতটা নিক্ষেপ করেছি। এতে কেউ কাউকে তিরস্কার করতোনা।
কংকর নিক্ষেপের দিন: কংকর নিক্ষেপের দিন তিন দিন বা চার দিন। ১০ই জিলহজ্জ এবং আইয়ামে তাশরিকের দুই বা তিন দিন। আল্লাহ বলেন: وَٱذْكُرُوا ٱللَّهَ فِىٓ أَيَّامٍ مَّعْدُودَٰتٍۚ فَمَن تَعَجَّلَ فِى يَوْمَيْنِ فَلَآ إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلَآ إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ ٱتَّقَىٰ ۗ তোমরা নির্দিষ্ট কতক দিনে আল্লাহর যিকর করো। যে ব্যক্তি দু'দিনেই কাজ সম্পন্ন করে তার কোনো গুনাহ নেই। আর যে ব্যক্তি (১৩ তারিখ পর্যন্ত) বিলম্বিত করতে চায়, তারও কোনো গুনাহ নেই।
১০ই জিলহজ্জের কংকর নিক্ষেপ: কংকর নিক্ষেপের নির্বাচিত সময় হলো ১০ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর থেকে দুপুর পর্যন্ত। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এই দিনের দুপুরের আগেই কংকর নিক্ষেপ করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. তাঁর পরিবারের দুর্বল লোকদের কাছে গিয়ে বললেন: সূর্যোদয়ের পরে ব্যতীত ছোট জামারায় (জামারাতুল আকাবায়) কংকর নিক্ষেপ করোনা। -তিরমিযি।
দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিলম্বিত করলেও তা বৈধ হবে। ইবনে আব্দুল বার বলেন: আলেমগণ একমত যে ব্যক্তি ১০ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ করবে, তার কংকর নিক্ষেপ বৈধ হবে। অবশ্য এটা মুস্তাহাব নয়।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: মিনায় ১০ই জিলহজ্জ তারিখে রসূলুল্লাহ সা. কে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হতো। এক ব্যক্তি বললো: আমি সন্ধ্যার পর কংকর নিক্ষেপ করেছি। তিনি বললেন: কোনো ক্ষতি নেই। -বুখারি
কংকর নিক্ষেপকে রাত পর্যন্ত বিলম্বিত করা যাবে কি: যখন কোনো ওযরের কারণে দিনের বেলা কংকর নিক্ষেপ সম্ভব হয়না, তখন রাত পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ বিলম্বিত করা বৈধ। কেননা মালেক নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমরের স্ত্রী সুফিয়ার এক মেয়ের মুযদালিফায় নেফাস শুরু হলো। ফলে সেই মেয়ে ও সুফিয়া মুযদালিফায় থেকে গেলেন এবং ১০ই জিলহজ্জের সূর্যাস্তের পর মিনায় পৌঁছলেন। ইবনে উমর রা. তাদেরকে আদেশ দিলেন কংকর নিক্ষেপ করতে। তিনি তাদেরকে কোনো কাফফারা দিতে বলেননি। তবে ওযর না থাকলে বিলম্বিত করা মাকরূহ। রাতে নিক্ষেপ করলে হানাফী, শাফেয়ী ও মালেকের একটি রেওয়ায়াত অনুযায়ী দম দেয়া লাগবেনা। ইতিপূর্বে ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদিসই তার প্রমাণ।
আহমদের মতানুসারে কংকর নিক্ষেপ যদি এতোটা বিলম্বিত করে যে, ১০ই জিলহজ্জ দিন পার হয়ে যায়, তাহলে রাতে কংকর নিক্ষেপ করা যাবেনা। পরের দিন সূর্য পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পর নিক্ষেপ করতে হবে।
দুর্বল ও ওযরধারীদের জন্য ১০ই জিলহজ্জ দিবাগত রাত দুপুরের পর কংকর নিক্ষেপের অনুমতি: রাতের প্রথমার্ধের পূর্বে কংকর নিক্ষেপ করা সর্বসম্মতভাবে অবৈধ। তবে নারী, শিশু, দুর্বল ওযরধারী ও পশুপালকদের জন্য ১০ই জিলহজ্জ মধ্যরাত থেকে জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের অনুমতি রয়েছে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. উম্মে সালামা রা. কে ১০ই জিলহজ্জ রাতে কংকর নিক্ষেপের জন্য পাঠালেন। উম্মে সালামা ফজরের আগে কংকর নিক্ষেপ করে চলে আসলেন। -আবু দাউদ, বায়হাকি, ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. উটের রাখালদেরকে রাতে কংকর নিক্ষেপের অনুমতি দিয়েছেন। -বাযযার। উরওয়া রা. বলেন: ১০ই জিলহজ্জ তারিখে রসূলুল্লাহ সা. উম্মে সালামার কাছে বারবার ঘুরলেন এবং তাকে আদেশ দিলেন যেন দ্রুত পাথর নিক্ষেপ করে মক্কায় চলে আসেন এবং মক্কায় ফজরের নামায পড়েন। সেদিনটি তার পালা ছিলো। তাই রসূলুল্লাহ সা. চেয়েছিলেন উম্মে সালামা তাঁর সংগী হোন। শাফেয়ী ও বায়হাকি। আতা বলেন: আসমা সম্পর্কে এক ব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি জামারায় কংকর নিক্ষেপ করেছেন। আমি বললাম আমরা রাত্রে জামারায় কংকর নিক্ষেপ করেছি। আসমা বললেন: রসূলুল্লাহ সা. এর আমলে আমরাও এ রকম করতাম। আবু দাউদ।
তাবারি বলেছেন: উম্মে সালামা ও আসমার হাদীস থেকে শাফেয়ী প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, মধ্য রাতের পর যাত্রা করা বৈধ- তাঁর এই মত সঠিক।
ইবনে হাযম বলেছেন: রাতে কংকর নিক্ষেপ শুধু মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট। পুরুষদের জন্য নয়, চাই সবল পুরুষ হোক বা দুর্বল পুরুষ হোক।
কিন্তু হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যাদের ওযর আছে, তাদের জন্য রাতে যাত্রা করা ও কংকর নিক্ষেপ করা বৈধ। ইবনুল মুনযির বলেছেন: সূর্যোদয়ের পরে ছাড়া কংকর নিক্ষেপ না করা সুন্নত। যেমন রসূলুল্লাহ সা. করতেন। ফজর হওয়ার আগে কংকর নিক্ষেপ করা জায়েয নেই। কেননা এটা সুন্নতের বিরোধী। তবে যে ব্যক্তি ফজরের আগে কংকর নিক্ষেপ করবে, তার আর এটা দোহরাতে হবেনা। কেননা এটা শুদ্ধ হবেনা- এমন কথা কেউ বলেছে বলে জানিনা।
জামারার উপর থেকে কংকর নিক্ষেপ: আসওয়াদ বলেন: আমি উমর রা-কে দেখেছি জামারার ওপর থেকে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। আতা বলেছেন: জামারার উপর থেকে কংকর নিক্ষেপ করা বৈধ।
জিলহজ্জের তিন দিনে কংkor নিক্ষেপ: তিন দিন ব্যাপী কংকর নিক্ষেপের সবচেয়ে ভালো সময় হলো সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সা. সূর্য হেলে পড়ার সময় অথবা তার পরে কংকর নিক্ষেপ করেছেন। -আহমদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। বায়হাকি নাফে' থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবনে উমর রা. বলতেন: আমরা এই তিনদিন সূর্য হেলে পড়ার পর ছাড়া কংকর নিক্ষেপ করিনা।
কংকর নিক্ষেপকে কেউ যদি রাত পর্যন্ত বিলম্বিত করে, তবে তা মাকরূহ হবে। তবে রাতে নিক্ষেপ করলে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত কংকর নিক্ষেপ করবে, তারপর নয়।
এটা ইমাম আবু হানিফা ব্যতিত সকল ইমামের সর্বসম্মত মত। আবু হানিফার মতে, তৃতীয় দিন সূর্য হেলার আগে কংকর নিক্ষেপের অনুমতি আছে। কেননা ইবনে আব্বাস বলেছেন: বিদায়ী যাত্রার শেষ দিনে সূর্য উত্তপ্ত হলে কংকর নিক্ষেপ ও মিনা থেকে বিদায় হওয়া জায়েয।
আইয়ামে তাশরিকে কংকর নিক্ষেপের পর অবস্থান করা: কংকর নিক্ষেপের পর কেবলামুখি হয়ে অবস্থান করা। আল্লাহর নিকট দোয়া করা, আল্লাহর প্রশংসা করা এবং নিজের জন্য, সকল মুমিন ভাই এর জন্য গুনাহ মাফ চাওয়া মুস্তাহাব।
আহমদ ও বুখারি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন : মসজিদুল খায়েফের পার্শ্ববর্তী প্রথম জামারাতে যখন কংকর নিক্ষেপ করতেন, তখন সাতটা কংকর নিক্ষেপ করতেন, প্রত্যেক কংকরের সাথে আল্লাহু আকবার বলতেন, তারপর বাতনুল ওয়াদীতে বাম দিকে চলে যেতেন, সেখানে কেবলামুখি হয়ে দু'হাত উঁচু করে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন, পুনরায় রওনা হয়ে আকাবার নিকটবর্তী জামারাতে এসে সাতটা কংকর নিক্ষেপ করতেন, প্রত্যেকটা কংকরে আল্লাহু আকবার বলতেন, অতঃপর আর অবস্থান না করে চলে যেতেন। হাদিসে আছে, তিনি আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপের পর অবস্থান করতেন না। অবস্থান করতেন শেষ জামারা দুটিতে কংকর নিক্ষেপের পর। আলেমগণ আবস্থানের জন্য একটা মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন। সেটি হলো: যে কংকর নিক্ষেপের পর সেই দিন আর কোনো কংকর নিক্ষেপ নেই, তার পরে কোনো অবস্থান নেই। আর যে কংকর নিক্ষেপের পর একই দিন আরো কংকর নিক্ষেপ আছে, তারপর অবস্থান করতে হবে। ইবনে মাজাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলুল্লাহ সা. যখন আকাবার জামরায় কংকর নিক্ষেপ করতেন, তখন সামনে চলে যেতেন, অবস্থান করতেন না।
কংকর নিক্ষেপ ধারাবাহিকতা: রসূলুল্লাহ সা. থেকে বিশ্বস্ত সনদে প্রমাণিত যে, তিনি মিনার সংলগ্ন প্রথম জামারায় কংকর নিক্ষেপ শুরু করতেন, তারপর তার সন্নিহিত মধ্যবর্তী জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতেন, তারপর আকাবার জামারায় কংকর নিক্ষেপ করতো। তিনি বলেছেন: "তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের ইবাদতগুলো গ্রহণ করো।" এ থেকে তিনজন ইমাম প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, জামারাগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা শর্ত এবং রসূলুল্লাহ সা. যেরূপ ধারাবাহিকভাবে নিক্ষেপ করেছেন, সেভাবেই নিক্ষেপ করতে হবে। তবে হানাফীদের গৃহীত মত হলো, ধারাবাহিকতা সুন্নত; শর্ত নয়।
প্রতিটি কংকরের সাথে তকবীর ও দোয়া এবং কংকরকে আংগুলের মাঝে ধরে রাখা মুস্তাহাব : আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও ইবনে উমর রা. জামারাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের সময় বলতেন: হে আল্লাহ, আমার হজ্জকে গুনাহমুক্ত হজ্জ বানাও এবং আমার গুনাহ মাফ করো। ইবরাহিম বলেছেন: আকাবার জামারা করার পর এই দোয়াটি পড়া পুরুষদের জন্য পছন্দ করা হতো। ইবরাহিমকে বলা হলো: প্রত্যেক জামারাতেই আপনি এই দোয়া করেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। দোয়াটি হলো: اللَّهُمَّ اجْعَلْ حَجًّا مَبْرُورًا وَ ذَنْبًا مَغْفُورًا আতা বলেছেন: যখনই কংকর নিক্ষেপ করো তকবীর বলবে, তকবীরের অব্যবহিত পর কংকর নিক্ষেপ করবে।
মুসলিমে জাবের রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. প্রতিটা কংকরের সাথে তকবীর বলতেন। ফাতহুল বারীতে আছে: এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, তাবকীর না দিলে কোনো কাফফারা লাগবেনা।
সালমান বিন আহওয়াসের মাতা বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা.কে আকাবার জামারার নিকট উটের ওপর আরোহী অবস্থায় দেখেছি, তাঁর আংগুলের মাঝে কংকর দেখেছি, সেই কংকর তিনি নিক্ষেপ করলেন, আর তার সাথে অন্যেরাও নিক্ষেপ করলো।
কংকর নিক্ষেপে অন্যকে প্রতিনিধি করা কোনো ব্যক্তির যদি এমন কোনো ওযর যথা রোগ ইত্যাদি থাকে, যা তাকে কংকর নিক্ষেপে অক্ষম করে দেয়, তবে সে নিজের পক্ষ থেকে কাউকে পাথর নিক্ষেপ করার ক্ষমতা অর্পণ করতে পারে।
জাবের রা. বলেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে নারী ও শিশুসহ হজ্জ করেছি। আমরা শিশুদের পক্ষ হতে তালবিয়া পড়তাম এবং কংকর নিক্ষেপ করতাম। -ইবনে মাজাহ।
মিনায় রাত যাপন: তিন ইমামের মতে (আবু হানিফা ব্যতীত) ১০, ১১, ১২ জিলহজ্জ এই তিন রাত অথবা ১১ ও ১২ জিলহজ্জ এই দুই দিবাগত রাত মিনায় যাপন করা ওয়াজিব। হানাফীদের নিকট রাত যাপন সুন্নত।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: তোমার কংকর মারা যখন সম্পন্ন হয়, তখন যেখানে ইচ্ছা রাত যাপন করো। -ইবনে আবি শায়বা। মুজাহিদ বলেন: রাতের প্রথম ভাগ মক্কায় ও শেষ ভাগ মিনায় অথবা প্রথম ভাগ মিনায় ও শেষ ভাগ মক্কায় কাটানো যেতে পারে। ইবনে হাযম বলেন : যে ব্যক্তি মিনার রাতগুলো মিনায় যাপন করেনা, সে অন্যায় করে। তবে এজন্য কোনো কাফফারা নেই। এটা সর্বসম্মত মত যে, যাদের ওযর আছে, যেমন পানি সরবরাহকারী ও উটের রক্ষক, তাদের রাত যাপনের বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তারা রাত যাপন বর্জন করলে তাদের ওপর কোনো কাফফারাও নেই। বুখারি প্রমুখ বর্ণনা করেন যে, আব্বাস রা. রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট পানি সরবরাহের দায়িত্ব পালনার্থে মিনার রাতগুলো মক্কায় যাপনের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছেন। আসেম বিন আদী থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. রাখালদেরকে মিনায় রাত যাপন বর্জনের অনুমতি দিয়েছেন। -তিরমিযি, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
মিনা থেকে প্রত্যাবর্তন করবে কবে ও কখন মিনা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের নির্ধারিত সময় তিন ইমামের মতে ১২ই জিলহজ্জ কংকর নিক্ষেপের পর সূর্যাস্তের পূর্বে। আর হানাফীদের মতে, ১৩ই জিলহজ্জ ফজর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মক্কায় প্রত্যাবর্তন করা যাবে। তবে সূর্যাস্তের পর রওনা হওয়া মাকরূহ। এটা সুন্নতের পরিপন্থী। কিন্তু তাতে কোনো কাফফারা দিতে হবেনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00