📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মিনায় গমন

📄 মিনায় গমন


৮ই জিলহজ্জ মিনায় যাওয়া সুন্নত। হাজি যদি কিরানকারী হয় অথবা ইফরাদকারী হয় তবে সে ইতিপূর্বে কৃত ইহরামসহই মিনায় যাবে। আর যদি তামাত্তুকারী হয় তবে হজ্জের ইহরাম বাঁধবে এবং মীকাতে যা যা করেছিল তা করবে। সুন্নত হলো, সে যে জায়গায় অবস্থান করে সেখান থেকেই ইহরাম করবে। মক্কায় থাকলে মক্কা থেকে এবং মক্কার বাইরে থাকলে সেখান থেকেই ইহরাম করবে। হাদিসে এসেছে: "যার বাসস্থান মক্কার বাইরে সে তার বাসস্থান থেকেই ইহরাম করবে। আর যার বাসস্থান মক্কায় সে মক্কা থেকেই ইহরাম করবে।" আর মিনায় রওয়ানা হওয়ার সময় বেশি করে দোয়া করা ও তালবিয়া পড়া এবং মিনায় যোহর, আসর, মাগরিব, এশা পড়া ও রাত যাপন মুস্তাহাব। ৯ তারিখ সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত মিনা থেকে বের না হওয়া মুস্তাহাব, যাতে রসূলুল্লাহ সা. এর অনুকরণ নিশ্চিত হয়। এর কোনো একটি বা সবগুলো তরক করলে সুন্নত তরক করা হবে। এজন্য কোনো কাফফারা দিতে হবেনা। ইবনুল মুনযিরের বর্ণনা অনুসারে আয়েশা (রা) ৮ই জিলহজ্জ রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত মক্কা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে বের হননি।

৮ই জিলহজ্জের পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে বের হওয়া বৈধ: হাসান থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি ৮ই জিলহজ্জের একদিন বা দু'দিন আগেই মক্কা থেকে মিনায় চলে যেতেন। কিন্তু মালেক এটা অপছন্দ করেছেন। তিনি ৮ই জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত মক্কায় থাকাটাও অপছন্দ করেছেন। অবশ্য মক্কায় জুমার সময় হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। সেরূপ ক্ষেত্রে মক্কা থেকে বের হবার আগে জুমা পড়ে নেয়া কর্তব্য।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আরাফার উদ্দেশ্যে যাত্রা

📄 আরাফার উদ্দেশ্যে যাত্রা


৯ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর 'দব' এর রাস্তা ধরে আল্লাহ আকবর, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ও তালবিয়া পড়তে পড়তে আরাফাত রওয়ানা হওয়া সুন্নত।

মুহাম্মদ বিন আবু বরর ছাকাফি বলেন: মিনা থেকে আরাফাত যাওয়ার সময় আমি আনাস রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কিভাবে তালবিয়া পড়তেন? তিনি বললেন: যার ইচ্ছ হতো তালবিয়া পড়তো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। যার ইচ্ছা হতো তকবীর বলতো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। যার ইচ্ছা হতো কলেমা তাইয়েবা পড়তো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। বুখারি প্রভৃতি হাদিস।

আরাফায় অবস্থানের উদ্দেশ্যে নামেরাতে যাত্রা বিরতি করা ও তার কাছেই গোসল করা মুস্তাহাব। সূর্য ঢলে পড়ার পরই আরাফায় অবস্থানের সময় শুরু। এর পূর্বে আরাফায় না ঢোকা মুস্তাহাব।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 আরাফায় অবস্থান

📄 আরাফায় অবস্থান


আরাফার দিনের ফযিলত: জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যিলহজ্জের দশ দিনের চেয়ে ভালো দিন আল্লাহর কাছে আর নেই। এক ব্যক্তি বললো: আল্লাহর পথে জিহাদে কাটানো কতগুলো দিনের চেয়েও কি এই দশ দিন ভালো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এ দশ দিন আল্লাহর পথে জিহাদে অতিবাহিত দিনগুলোর চেয়েও ভালো। আর আরাফার দিনের চেয়ে ভালো দিন আল্লাহর কাছে আর নেই। এ দিন আল্লাহ সর্বনিম্ন আকাশে নেমে আসেন। তারপর আকাশবাসীর সামনে পৃথিবীবাসীদের নিয়ে গর্ব করেন। তিনি বলেন: আমার বান্দাদের দিকে দৃষ্টি দাও। তারা এলোমেলো চুলে ধুলামলিন দেহে দুপুর না হতেই আমার নিকট এসেছে। তারা এসেছে দূর দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। তারা আমার রহমতের আশা করে। অথচ আমার আযাব তারা দেখেনি। ইয়াওমে আরাফায় যতো বিপুল সংখ্যক লোক দোযখ থেকে মুক্তি পায়, ততো কোনো দিন পায়না" -আবু ইয়ালা, বাযযার, ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান।

ইবনুল মুবারক আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. এমন সময় আরাফায় অবস্থান নিলেন যে সূর্য তখন প্রত্যাবর্তনে উদ্যত। (অর্থাৎ পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেছে।) তিনি বললেন: “হে বিলাল, আমার কথা শোনার জন্য জনতাকে নীরব হতে বলো।" বিলাল দাঁড়িয়ে বললেন: "আপনারা চুপ করুন। রসূলুল্লাহ সা. ভাষণ দিবেন। মনোযোগ দিয়ে শুনুন।" লোকেরা নীরব হয়ে গেলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হে জনতা, আমার কাছে এই মাত্র জিবরীল এসেছিলেন। তিনি আমাকে আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সালাম জানালেন। তারপর বললেন: আল্লাহ আরাফাবাসীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। মাশয়ারুল হারামবাসীকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর তাদের সকল ক্ষতির প্রতিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।" একথা শুনে উমর রা. দাঁড়ালেন। তিনি বললেন: হে রসূল, এ সুসংবাদ কি শুধু আমাদের জন্য? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এটা তোমাদের জন্য এবং তোমাদের পর কেয়ামত পর্যন্ত যারা আরাফায় আসবে তাদের সকলের জন্য। উমর রা. বললেন: আল্লাহর মহানুভবতা প্রচুর ও উৎকৃষ্ট। আর মুসলিম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনে আল্লাহ তার যতো বান্দাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেন, তার চেয়ে বেশি আর কোনো দিন দেননা। আল্লাহ তায়ালা এই দিন নিকটবর্তী হন। ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং বলেন: এরা কী চায়? আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনে শয়তানকে যতো বেঁটে, লজ্জিত ও ক্ষিপ্ত হতে দেখা গেছে, বদরের দিন ব্যতিত আর কোনো দিন তাকে এমন দেখা যায়নি। আর এর কারণ শুধু এই যে, এই দিন সে আল্লাহর অশেষ রহমত নাযিল হতে ও তার বান্দাদের বড় বড় গুনাহ মাফ হতে দেখেছে। একমাত্র বদরের দিন তাকে এ রকম ক্ষিপ্ত ও লজ্জিত দেখা গেছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রসূলুল্লাহ, বদরের দিন সে কী দেখেছিল? রসূলুল্লাহ সা. বললেন : সে দেখেছে, জিবরীল ফেরেশতাদের বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মালেক।

আরাফায় অবস্থান সম্পর্কে শরিয়তের বিধান: আলেমগণ একমত যে, আরাফায় অবস্থান হজ্জের শ্রেষ্ঠতম রুকন। কেননা আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ আবদুর রহমান ইবনে ইয়ামার থেকে বর্ণনা করেছেন : রসূলুল্লাহ সা. জনৈক ঘোষণাকারীকে এই মর্মে ঘোষণা করতে আদেশ দিলেন যে, হজ্জ হলো আরাফা। (অর্থাৎ ইয়াওমে আরাফায় অবস্থানকারীর হজ্জই বিশুদ্ধ হজ্জ।) যে ব্যক্তি ৯ই জিলহজ্জ দিবাগত রাতে ও ফজর হওয়ার আগে আরাফায় অবস্থান করবে, তার হজ্জ আদায় হয়ে যাবে। (অর্থাৎ আরাফার যে কোনো অংশে ৯ তারিখের দিনে বা রাতে এক মুহূর্তের জন্য হলেও অবস্থান করতেই হবে।)

উকুফে আরাফার (আরাফায় অবস্থানের) সময়: অধিকাংশ আলেমের মতে, ৯ই জিলহজ্জের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার পর থেকে দশই জিলহজ্জের ফজর পর্যন্ত আরাফায় অবস্থানের সময়। এই সময় রাত ও দিনের যে কোনো অংশে অবস্থান যথেষ্ট হবে। তবে দিনে অবস্থান করলে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। তবে রাতে অবস্থান করলে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যতোক্ষণ ইচ্ছা অবস্থান করতে পরে। শাফেয়ী মযহাব অনুসারে রাত পর্যন্ত অবস্থান করা সুন্নত।

অবস্থানের উদ্দেশ্য: অবস্থানের উদ্দেশ্য হলো আরাফার যে কোনো অংশে উপস্থিতি, চাই ঘুমিয়ে হোক, জেগে হোক, শুয়ে হোক, বসে হোক, পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে থাকা অবস্থায় হোক বা বাহনে আরোহী হয়ে হোক পবিত্র অবস্থায় হোক অথবা অপবিত্র অবস্থায় হোক, যথা ঋতুবতী মহিলারা কিংবা বীর্যপাতজনিত অপবিত্র পুরুষ। যে ব্যক্তি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আরাফায় অবস্থান করে এবং আরাফা থেকে বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তার সংজ্ঞা ফেরেনি, তার সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আবু হানিফা ও মালেক বলেছেন: তার অবস্থান শুদ্ধ। শাফেয়ী, আহমদ, হাসান, আবুজর, ইসহাক ও ইবনুল মুনযির বলেন: শুদ্ধ হবেনা। কেননা এটা হজ্জের রুকন। সুতরাং সঙজ্ঞাহীন ব্যক্তির দ্বারা অন্য কোনো রুকন যেমন শুদ্ধ হয়না। তেমনি এটাও শুদ্ধ হবেনা।

তিরমিযি উপরোক্ত ইবনে ইয়ামারের হাদিস উদ্ধৃত করার পর বলেছেন, সুফিয়ান ছাওরী বলেন : সাহাবিগণসহ সকল আলেমদের আমল ইবনে ইয়ামারের হাদিস অনুসারে। অর্থাৎ জিলহজ্জের দশ তারিখের ফজরের পূর্বে যে ব্যক্তি আরাফায় অবস্থান করলনা তার হজ্জ হবেনা। সূর্যোদয়ের পরে এলে হজ্জ হবেনা। এটা ওমরায় পরিণত হবে। তাকে পরবর্তী বছর হজ্জ করতে হবে। এটা শাফেয়ী ও আহমদ প্রমুখের মত।

আরাফার প্রস্তরময় স্থানে অবস্থান করা মুস্তাহাব: আরাফার যে কোনো স্থানে অবস্থান করাই যথেষ্ট ও শুদ্ধ। কেননা সমগ্র আরাফার ময়দানই অবস্থানের জায়গা কেবল পশ্চিমে অবস্থিত 'বাতনে আরাফা' নামক ময়দান বাদে। কেননা সেখানে অবস্থান সর্বসম্মতভাবে অশুদ্ধ। প্রস্তরপূর্ণ জায়গাগুলোতে বা তার সন্নিকটে অবস্থান করা মুস্তাহাব। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এই জায়গায়ই অবস্থান করেছেন এবং বলেছেন: আমি এখানে অবস্থান করলাম। তবে সমগ্র আরাফাত ময়দানই অবস্থানের স্থান। আহমদ, মুসলিম আবু দাউদ। জাবালুর রহমতে আরোহণ করা এবং সেখানে অবস্থান করা অন্যান্য জায়গার চেয়ে ভালো এরূপ ধারণা করা ভুল। এটা সুন্নত নয়।

গোসল করা মুস্তাহাব: আরাফাতে অবস্থানের জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. আরাফায় বিকালে অবস্থানের জন্য গোসল করতেন। মালেক। উমর রা. আরাফার ময়দানে তালবিয়া পড়তে পড়তে গোসল করেছেন।

অবস্থানের নিয়ম-কানুন ও দোয়া: পূর্ণ পবিত্রতা বজায় রাখা, কেবলামুখি থাকা, বেশি করে তওবা ইসতিগফার ও যিকর করা, নিজের জন্য, অন্যের জন্য এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের যা কিছু মনে চায়। আল্লাহর কাছে অত্যন্ত ভীতিসহকারে ও মনোযোগসহকারে দু'হাত তুলে দোয়া করবে।

উসামা বিন যায়েদ বলেছেন: "আমি আরাফাতে রসূলুল্লাহ সা. এর সহ-আরোহী ছিলাম। তিনি হাত উঁচু করে দোয়া করতে বলেছেন। নাসায়ী।

আমর বিন শুয়াইব তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন: আরাফাতের দিন রসূলুল্লাহ সা. যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি পড়তেন তা হলো:
লَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
আহমদ, তিরমিযি। রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফার দিনের দোয়া হচ্ছে শ্রেষ্ঠ দোয়া। আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীরা যেসব দোয়া করতেন তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দোয়া হলো:
লَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
(আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁর, প্রশংসাও তাঁর, তিনি সব বিষয়ে শক্তিমান)। হুসাইন ইবনে হাসান বলেন: আমি সুফিয়ান বিন উয়াইনাকে জিজ্ঞাসা করলাম: ইয়াওমে আরাফার শ্রেষ্ঠ দোয়া কী? তিনি বললেন:
لا إلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ .
আমি বললাম: এতো আল্লাহর প্রশংসা। এটা দোয়া নয়। (অর্থাৎ এতে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হয়নি।) তিনি বললেন: তুমি মালেক বিন মানযুরের হাদিস জানো? ঐ হাদিসেই এর ব্যাখ্যা রয়েছে। আমি বললাম: হাদিসটি কি আপনি আমাকে বলুন। তিনি বললেন: হাদিসটি হলো: আল্লাহ বলেন: আমার বান্দা যখন আমার ওপর প্রশংসা করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু চাওয়ার সুযোগ পায়না। তখন আমি প্রার্থনাকারীদেরকে যা দেই, তার চেয়েও ভালো জিনিস তাকে দেই।" তিনি বললেন: এটাই উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা। পুনরায় সুফিয়ান বললেন: তুমি কি জানোনা উমাইয়া ইবনে আবিস্ সান্ত যখন আবদুল্লাহ বিন জাদয়ানের কাছে তার দান পাওয়ার জন্য এসেছিলেন তখন কি বলেছিলেন? হুসাইন বলেন। না। তিনি বললেন: উমাইয়া বলেছিলেন: "আমি কি নিজের চাহিদার উল্লেখ করবো, না আপনার লজ্জা আমার জন্য যথেষ্ট। লজ্জা তো আপনার বৈশিষ্ট্য। মানুষের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাও আপনার বৈশিষ্ট্য। কেননা আপনি একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আপনর বংশ মর্যাদা অতীব মহৎ ও উত্তম। যখন কেউ আপনাকে একদিন প্রশংসা করে তার সেই প্রশংসা করাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।" এরপর সুফিয়ান বললেন: হে হুসাইন, এ হলো সৃষ্টি অবস্থা। প্রশংসা করেই সে ক্ষান্ত হয়। চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা। তাহলে স্রষ্টা সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?
বায়হাকি আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আরাফায় আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যে দোয়া সবচেয়ে বেশি করতেন এবং আমি যে দোয়া সবচেয়ে বেশি করি তা হলো:
লা ইلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ . اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي بَصَرِي نورًا، وَفِي سَمْعِي نُورًا، وَفِي قَلْبِي نُورًا . اللهم اشْرَحْ لِي صَدْرِي، وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي، اللهم أَعُوذُ بِكَ مِنْ وسواس الصَّدْرِ، وَشَتَاسِ الْأَمْرِ ، وَشَرِّ فِتْنَةِ الْقَبْرِ، وَشَرِّ مَا يَلِجُ فِي اللَّيْلِ، وَشَرِّ مَا يَلِعُ فِي النَّمَارِ ، وَشَرِّ مَا تَعِبُ بِهِ الرِّيَاحُ وَمَرْ بَوَائِقِ الدَّمْرِ.
"আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজ্য তাঁরই, প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সর্বশক্তিমান। হে আল্লাহ, আমার চোখে নূর দাও, কানে নূর দাও, হৃদয়ে নূর দাও। হে আল্লাহ, আমার বক্ষ উন্মুক্ত করে দাও। আমার কাজ সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, আমি তোমার আশ্রয় চাই অন্তরের কুপ্ররোচনা থেকে, কবরের আযাব থেকে। রাতের বেলা প্রবেশকারীর অনিষ্ট থেকে, দিনের বেলায় প্রবেশকারী অনিষ্ট থেকে। বহমান বাতাসের অনিষ্ট থেকে এবং যুগের ধ্বংসাত্মক জিনিসসমূহের অনিষ্ট থেকে।"
তিরমিযি বর্ণনা করেছেন: ইয়াওমে আরাফায় রসূলুল্লাহ সা. সর্বাধিক যে দোয়া আরাফার ময়দানের নিজের অবস্থান স্থলে বসে করতেন তা হলো:
اللهم لَكَ الْحَمْدُ كَالَّذِي نَقُولُ، وَخَيْرًا مِمَّا نَقُولُ : اللَّهُمَّ لَكَ مَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي، وَإِلَيْكَ مَا بِي، وَلَكَ رَبِّ تُرَائِي، اَللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَوَسْوَسَةِ الصَّدْرِ، وَشَتَاتِ الأمر، اللهم إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا تَهِبَ بِهِ الرِّيحُ .
"হে আল্লাহ, তুমি যেমন বলো সেভাবেই তোমার প্রশংসা, আমরা যেভাবে বলি তার চেয়ে উত্তম। হে আল্লাহ, তোমার জন্যই আমার নামায, তোমার জন্যই আমার কুরবানি তোমার জন্যই আমার জীবন, তোমার জন্যই আমার মরণ, তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন, তোমার দিকেই আমার প্রত্যাবর্তন। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে কবরের আযাব থেকে, বুকের কুপ্ররোচনা থেকে, বাতিল কার্যকলাপ থেকে এবং বহমান বাতাসের অনিষ্ট থেকে তোমার আশ্রয় চাই।"

আরাফায় অবস্থান ইবরাহিম আ.-এর সুন্নত: মিরবা আনসারী বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমরা তোমাদের ইবাদতের স্থানগুলোতে অবস্থান করো। কেননা তোমরা ইবরাহিমের উত্তরাধিকার থেকে কিছুটা উত্তরাধিকার পেয়েছো। তিরমিযি।
আরাফার রোযা: বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ সা. আরাফার দিনে রোযা রাখেননি। উপরন্তু তিনি বলেছেন: আরাফার দিন, ঈদের দিন ও আইয়ামুত তাশরিক আমরা মুসলমানদের উৎসব। এ দিনগুলো পানাহারের দিন। এও প্রমাণিত যে, তিনি আরাফাতের ময়দানে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন।

এসব হাদিস থেকে অধিকাংশ আলেম এই মর্মে প্রমাণ দর্শিয়েছেন যে, আরাফার দিন হাজিদের জন্য রোযা না রাখা মুস্তাহাব, যাতে সে দোয়া ও বিকরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পায়। আর আরাফার দিনে রোযা রাখার ফযিলত সম্পর্কে যে হাদিসগুলো পাওয়া যায়, সেগুলো যারা হজ্জ করতে আরাফার ময়দানে যায়নি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
যোহর ও আসরের নামায একত্রিত করা: সহীহ হাদিসে এসেছে রসূলুল্লাহ সা. আরাফায় যোহর ও আসরের নামায একত্রিত করেছেন। আযান হলো, ইকামত হলো, তারপর তিনি যোহর পড়লেন, তারপর পুনরায় ইকামত হলো, তারপর আসরের নামায পড়লেন। আসওয়াদ ও আলকামা বলেছেন: আরাফায় ইমামের সাথে যোহর ও আসর পড়া হজ্জের পূর্ণতা দান করে। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমগণ একমত যে, ইমাম আরাফায় যোহর ও আসর একত্রে (অর্থাৎ একই সাথে যোহরের ওয়াক্তে) পড়বে। অনুরূপ করবে, ইমামের সাথে যারা নামায পড়বেনা তারাও। কেউ যদি ইমামের সাথে এই দুই নামায একত্র না করে তবে একা একাই একত্র করবে। ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত: তিনি মক্কায় বাস করতেন। তারপর যখন তিনি মিনায় যেতেন অথবা নামায কসর করতেন। আমর ইবনে দিনার থেকে বর্ণিত: জাবের বলেছেন: আরাফায় নামায কসর করো। সাঈদ বিন মানসুর।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান

📄 মুযদালিফার উদ্দেশ্যে আরাফা থেকে প্রস্থান


সূর্য অস্ত যাওয়ার পর শান্তভাবে আরাফাত থেকে রওয়ানা হওয়া সুন্নত। রসূলুল্লাহ সা. শান্তভাবে ও ধীরে ধীরে আরাফাত ত্যাগ করেছিলেন। তাঁর উটনীর লাগাম ধারণ করেছিলেন, তারপর বলেছিলেন: হে জনতা, তোমরা ধীরে পদক্ষেপে চলো। দ্রুত চলাতে কোনো সওয়াব নেই। - বুখারি ও মুসলিম। বুখারি ও মুসলিম আরো বর্ণনা করেন যে, জনগণের সাথে বিনম্র ব্যবহারের অভ্যাসের কারণেই তিনি ধীর গতিতে চলতেন। যখনই রাস্তা একটু ফাঁকা পেতেন অমনি কিছুটা দ্রুত চলতেন।
এ সময় তালবিয়া ও যিকর মুস্তাহাব। কেননা জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়তেন।
আশয়াস বিন সুলাইম রা. তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন: আমি ইবনে উমরের সাথে আরাফাত থেকে মুযদালিফায় এসেছিলাম। মুযদালিফায় আসা পর্যন্ত তিনি ক্রমাগত তালবিয়া পড়ছিলেন। একটুও ক্লান্ত হননি। - আবু দাউদ।
মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা এক ওয়াক্তে পড়া : মুযদালিফায় পৌঁছার পর রসূল সা. এক আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশা পড়েছেন। মাঝে কোনো নফল পড়েননি।
মুসলিমের হাদিসে এসেছে: রসূলুল্লাহ সা. মুযদালিফায় এসে মাগরিব ও এশা এক আযানে ও দুই ইকামতে পড়লেন। মাঝে কোনো নামায পড়লেন না। এই একত্রিকরণ সর্বসম্মতভাবে একটি সুন্নত।
কেউ যদি প্রত্যেক নামায স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়ে, তাহলে তা নিয়ে মতভেদে রয়েছে। অধিকাংশ আলেমদের মতে এটা জায়েয। তবে রসূল সা.-এর কাজকে অগ্রগণ্য বলে অভিহিত করেছে। ছাওরী ও যুক্তবাদী আলেমগণ বলেছেন: মাগরিব যদি মুযদালিফা ব্যতিত অন্য কোথাও পড়ে তবে তা দোহরাতে হবে। তারা যোহর ও আসর স্ব স্ব ওয়াক্তে পড়াকে জায়েয বলেছেন। কিন্তু মাকরূহ হবে বলে রায় দিয়েছেন।
মুযদালিফায় অবস্থান ও রাত্রি যাপন: জাবের রা.-এর হাদিসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সা. যখন মুযদালিফায় এলেন তখন মাগরিব ও এশা পড়লেন। তারপর শুয়ে পড়লেন এবং যখন ভোর হলো, উঠে ফজর পড়লেন। তারপর কাসওয়ায় আরোহণ করলেন এবং মাশয়ারুল হারামে এলেন। তারপর প্রভাত খুব ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রইলেন। তারপর সূর্যোদয়ের আগে রওয়ানা হলেন। তিনি এখানে সারা রাত জেগেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মুযদাফিলায় রাত্র যাপন ও অবস্থান সম্পর্কে হাদিস থেকে এটুকুই জানা গেছে। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীরা বাদে সকলের ওপরই মুযদালিফায় রাত যাপন ওয়াজিব বলে আহমদ রায় দিয়েছেন। রাখাল ও পানি সরবরাহকারীদের উপর এটা ওয়াজিব নয়। অবশিষ্ট ইমামগণ বলেছেন, মুযদালিফায় অবস্থান সকলের জন্য ওয়াজিব। রাত্র যাপন ওয়াজিব নয়। অবস্থান দ্বারা যে কোনো উপায়ে উপস্থিতি বুঝানো হয়েছে। চাই দাঁড়িয়ে হোক, বসে হোক, চলমান অবস্থায় হোক বা ঘুমন্ত অবস্থায় হোক।
হানাফী মাযহাবের মত হলো, ১০ই জিলহজ্জের ফজরের পূর্বে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। উপস্থিত না হলে দম দিতে হবে। অবশ্য ওযর থাকলে ভিন্ন কথা। ওযর থাকলে উপস্থিত হওয়া জরুরি নয়। কোনো দমও দিতে হবেনা। আর মালেকীদের মত হলো, কোনো ওযর না থাকলে আরাফা থেকে মিনা যাওয়ার পথে মুযদালিফায় রাতের বেলা ফজরের পূর্বে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যাত্রা বিরতি করা ওয়াজিব। ওযর থাকলে বিরতি ওয়াজিব নয়।
শাফেয়ীদের মতে আরাফায় অবস্থানের পর ১০ই জিলহজ্জের পূর্বের রাতের দ্বিতীয়ার্ধে মুযদালিফায় উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব। মুযদালিফায় অবস্থান করা শর্ত নয়। এমনকি স্থানটি মুযদালিফা কিনা তাও জানা শর্ত নয়। শুধু ওখান দিয়ে অতিক্রম করাই যথেষ্ট। চাই জায়গাটা মুযদালিফা, একথা জানুক বা না জানুক। প্রথম ওয়াক্তে ফজরের নামায পড়া অত:পর প্রভাত হওয়া পর্যন্ত মাশয়ারুল হারামে অবস্থান করা সুন্নত। সূর্যোদয়ের পূর্বে আকাশ খুব পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত এখানে অবস্থানপূর্বক বেশি করে দোয়া ও যিকর করা সুন্নত। আল্লাহ বলেন:
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ، وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَدَاكُمْ، وَإِن كُنتُم مِّن قَبْلِهِ لَمِنَ الضَّالِّينَ . ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ، وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"তারপর যখন তোমরা আরাফা থেকে রওয়ানা হবে তখন মাশয়ারুল হারামের নিকটে আল্লাহর যিকর করো। তিনি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে সেভাবে আল্লাহর যিকর করো। ইতিপূর্বে তো তোমরা গোমরাহ ছিলে। তারপর লোকেরা যে পথ ধরে চলে, তোমরাও সেই পথ ধরে চলো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে রওয়ানা হও। মুহাসসারে এলে দ্রুত গতিতে তা অতিক্রম করবে।
মুযদালিফায় অবস্থানের জায়গা: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থান করার উপযুক্ত স্থান কেবল মুহাসসার নামাক উপত্যকা বাদে। (এটি মিনা ও মুযদালিফার মাঝে অবস্থিত।) জুবাইর বিন মুতয়াম রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: সমগ্র মুযদালিফাই অবস্থানের যোগ্য স্থান। তবে মুহাসসার থেকে দ্রুত পার হয়ে যাও।"-আহমদ। কুযাহ নামক পাহাড়ের নিকট অবস্থান করা সর্বোত্তম।
আলী রা. বর্ণনা করেছেন: যখন 'কুযাতে' রসূলুল্লাহ সা.-এর ভোর হলো, তখন তিনি কুযাহ'তে এলেন এবং সেখানে অবস্থান করলেন। তিনি বললেন: "সমগ্র কুযাহ অবস্থানের যোগ্য এবং সমগ্র কুযা' অবস্থানের যোগ্য।" আবু দাউদ, তিরমিযি। (কুযাহ মুযদালিফার একটি জায়গা। জাহেলি যুদ্ধে কুরাইশ যখন আরাফাতে অবস্থান করতোনা তখন এখানে অবস্থান করতো। জাওহারীর মতে, এটি মুযদালিফার একটি পাহাড়ের নাম। বহু সংখ্যক ফকীহর নিকট এটাই মাশয়ারুল হারাম।)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00