📄 যমযমের পানি পান করা
তওয়াফকারী যখন তওয়াফ সম্পন্ন করবে এবং মাকামে ইবরাহিমে দু'রাকাত নামায পড়বে, তখন যমযমের পানি পান করা তার জন্য মুস্তাহাব।
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. যমযমের পানি পান করলেন এবং বললেন: এটা বরকতময়, তৃপ্তিদায়ক ও রোগ নিরাময়কারী। জিবরাইল মেরাজের রাতে এই পানি দিয়ে রসূল সা.-এর হৃদয় ধুয়ে দিয়েছিলেন। আর তাবারানি ও ইবনে হিব্বান ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হচ্ছে যমযমের পানি।
যমযমের পানি পান করার সময় রোগ থেকে মুক্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণের নিয়ত করা সুন্নত। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে তা সফল হবে। সুয়াইদ বিন সাঈদ বলেছেন: আমি মক্কায় আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে দেখেছি, যমযমের কুয়ার কাছে এলেন। তা থেকে পানি পান করলো, তারপর কিবলামুখি হয়ে বললেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: 'যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে সে উদ্দেশ্য সফল হবে।' আমি এটা কেয়ামতের পিপাসার জন্য পান করছি। তারপর পান করলেন। -আহমদ ও বায়হাকি। আর ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন : যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে সে উদ্দেশ্য সফল হবে। তুমি যদি রোগ মুক্তির উদ্দেশ্যে তা পান করো, আল্লাহ তোমাকে রোগমুক্ত করবেন। তৃপ্তি লাভের জন্য যদি পান করো, তবে আল্লাহ তোমাকে পরিতৃপ্ত করবেন। আর যদি তোমার পিপাসা মেটানোর জন্য পান করো তবে আল্লাহ পিপাসা মিটিয়ে দেবেন। এ কৃয়া জিবরাইল খনন করেছেন এবং ইসমাঈলকে পান করানোর জন্য আল্লাহ এর আবির্ভাব ঘাটয়েছেন। -দার কুতনি ও হাকেম। হাকেম একথাও সংযুক্ত করেছেন: তুমি যদি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে এ পানি পান করো, তবে আল্লাহ তোমাকে আশ্রয় দেবেন।"
যমযমের পানি তিন নিঃশ্বাসে পান করা, কিবলামুখি হয়ে পান করা এবং পেট পুরে পান করা, পান করার পর আলহামদুলিল্লাহ বলা ও ইবনে আব্বাসের দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
আবু মুলাইকা বলেন: এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের কাছে এলো। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোথা থেকে এলে? সে বললো: যmযমের পানি পান করে এলাম। তিনি বললেন: যেভাবে যমযমের পানি পান করা উচিত, সেভাবে পান করেছ তো? সে বললো কিভাবে? তিনি বললেন: যখন যমযমের পানি পান করতে চাইবে, তখন কিবলামুখি হবে। আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিন নিঃশ্বাসে পেট ভরে পান করবে। তারপর আল্লাহর প্রশংসা করবে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমাদের ও মুনাফেকদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, তারা যমযম থেকে পেট ভরে পানি পান করেনা।" ইবনে মাজাহ, দার কুতনি আর ইবনে আব্বাস যমযমের পানি পান করার সময় এ দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ .
"হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী তিনি, প্রশস্ত জীবিকা ও সকল রোগ থেকে মুক্তি চাই।"
যমযম কুয়ার ইতিহাস: বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: যখন হাজেরা ও তার ছেলের তীব্র পিপাসা লাগলো এবং হাজেরা মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করলেন। তখন একটা আওয়ায শুনতে পেলেন। তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেন। চুপ করো এবং পুনরায় সে আওয়াযটা শুনতে চেষ্টা করলেন। তখন আবারো সেই আওয়াযটা শুনতে পেলেন। হাজেরা বললেন: আমি শুনতে পেয়েছি। তোমার কাছে কোনো সাহায্য যদি থেকে থাকে বলো। সহসা যমযমের স্থানে জনৈক ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা তার পায়ের গোড়ালী দিয়ে অথবা ডানা দিয়ে মাটি খুঁড়লো। অমনি পানি বেরিয়ে এলো। তখন হাজেরা চৌবাচ্চা বানিয়ে পানি জমা করতে এবং হাতের আজলা ভরে তার মশকে পানি ভরতে লাগলেন। যতোই আজলা ভরে পানি নিচ্ছিলেন ততোই পানি উথলে উঠছিল। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। তিনি যদি যমযমকে ছেড়ে দিতেন, অথবা যদি তা থেকে আজলা ভরে পানি না নিতেন, তাহলে যমযম প্রবহমান ঝর্ণা হতোনা। তারপর হাজেরা নিজে পানি পান করলেন এবং তার ছেলেকে পান করালেন। তারপর ফেরেশতা তাকে বললো তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় পেয়োনা। এখানে আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু ও তার পিতা তাকে পুনঃনির্মাণ করবে। এই ঘরের অধিবাসীদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন না। আল্লাহর ঘর তখন একটা টিলার মতো ছিলো। বন্যার ঢল তার দিকে ধেয়ে আসতো, তারপর তা তার ডান দিকে ও বাম দিকে চলে যেতো।
মুলতাযামের নিকট দোয়া করা মুستাহাব: যমযমের পানি পান করার পর মুলতাযামের নিকট গিয়ে দোয়া করা মুstahab। বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে আব্বাস কাবার দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে কা'বার সাথে লেগে থাকতেন ও তা জড়িয়ে ধরতেন এবং বলতেন: হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মাঝখানে কা'বার প্রাচীর জড়িয়ে ধরে দোয়া করবে। যে ব্যক্তি এই দুটির মাঝখানে জড়িয়ে ধরে আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে। আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেবেন। আমর ইবনে শুয়াইবের দাদা বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা.কে দেখেছি, তাঁর মুখ ও বুক মুলতাযামের সাথে সেঁটে দিতেন।
কেউ কেউ বলেন: হাতীমই মুলতাযাম। বুখারির মতে হাজরে আসওয়াদই হাতীম। এর প্রমাণ হিসেবে মেরাজের হাদিস পেশ করেন যাতে রসূল সা. বলেছেন: আমি যখন হাতীমে ঘুমিয়ে ছিলাম, হয়তোবা বলেছেন: হাজরে আসওয়াদের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। বুখারি বলেছেন: হাজরে আসওয়াদই হাতীম।
কা'বার অভ্যন্তরে ও হাজারে ইসমাঈলে প্রবেশ করা মুস্তাহাব: বুখারি ও মুসলিম ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: মক্কা বিজয়ের পর রসূলুল্লাহ সা. উসামা ও উসমান বিন তালহা কা'বা শরিফের ভেতরে প্রবেশ করলেন। দরজা বন্ধ করলেন। তারপর যখন দরজা খুললেন, বিলাল আমাকে জানালো যে, রসূলুল্লাহ সা. কা'বার ভেতরে দুই ইয়ামানী স্তম্ভের মাঝে নামায পড়েছেন। আলেমগণ এ থেকে প্রমাণ করলো যে, কা'বার ভেতরে প্রবেশ করা ও নামায পড়া সুন্নত। তবে তারা একথাও বলেছেন যে, এটা সুন্নত হলেও হজ্জের অংশ নয়। কেননা ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: হে জনতা, বাইতুল্লাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা তোমাদের হজ্জের অন্তর্ভুক্ত নয়। -হাকেম। আর যে ব্যক্তি কা'বায় প্রবেশ করার সুযোগ পায়না, তার জন্য হাজরে ইসমাঈলে প্রবেশ করা ও সেখানে নামায পড়া মুস্তাহাব। কেননা তার একটা অংশ কা'বা শরিফের অংশ।
📄 সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ
কিভাবে এটি শরিয়তের বিধিবদ্ধ হলো: বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবরাহিম আ. তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য ছেলে ইসমাঈলকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। তারপর উভয়কে বাইতুল্লাহর নিকট যমযমের উপরে একটা বিশাল গাছের নিচে রাখলেন। তখন মক্কায় কোনো মানুষের বসতি ছিলনা এবং পানিও ছিলনা। ইবরাহিম আ. তাদের উভয়ের নিকট খোরমা ভর্তি একটা ব্যাগ এবং পানি ভর্তি একটা মশক রেখে বিদায় হয়ে চলে যেতে লাগলেন। ইসমাঈলের মা তাকে অনুসরণ করে গেলেন এবং বললেন: হে ইবরাহিম, আপনি আমাদেরকে এই জনমানবহীন ও শস্যলতাহীন ভূমিতে রেখে কোথায় চলে যাচ্ছেন? তিনি তাকে কয়েকবার একথা বললেন। কিন্তু ইবরাহিম তাঁর দিকে ভ্রূক্ষেপই করলেন না। তখন হাজেরা বললেন: আল্লাহ কি আপনাকে এরূপ আদেশ দিয়েছেন? ইবরাহিম বললেন: হাঁ। তখন হাজেরা বললেন তাহলে তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অন্য, হাদিসে আছে, হাজেরা বললেন: আমাদেরকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? ইবরাহিম আ. বললেন: আল্লাহর কাছে। হাজেরা বললেন: আমি সন্তুষ্ট। তারপর হাজেরা ফিরে এলেন।
এরপর ইবরাহিম চলতে লাগলেন। যখন পাহাড়ের রাস্তার কাছে পৌছিলেন যেখানে কেউ তাকে দেখতে পায়না। তখন বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে হাত তুলে এই দোয়া করলেন:
رَبَّنَا إِنِّى أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ . رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً من النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ ، وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ .
“হে প্রতিপালক, আমি আমার বংশধরকে তোমার পবিত্র ঘরের নিকট একটা চাষাবাদহীন উপত্যকায় রেখে এসেছি। হে প্রভু, ওখানে রেখে এসেছি এজন্য যেনো তারা নামায কায়েম করে। সুতরাং মানুষের মন তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে কিছু ফল ও ফসল দাও, যেনো তারা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।"
আর ইসমাঈলের মা গাছটির নিচে বসে রইলেন তার ছেলেটিকে নিজের পাশে রাখলেন এবং তার ছোট পুরানো পানির মশকটি ঝুলিয়ে রাখলেন, যাতে তা থেকে প্রয়োজনের সময় পানি পান করতে পারেন এবং ছেলেকে দুধ খাওয়াতে পারেন। এক সময় মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে তার দুধও শুকিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। আর তার ছেলের ক্ষুধা তীব্র হলো। হাজেরা হতবুদ্ধি ও দিশেহারা হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন এবং দূরে সরে যেতে লাগলেন। তার দিকে তাকাতেও তার ভালো লাগছিলনা। তাই ছেলেকে রেখে অন্য কোথাও রওনা হলেন। নিকটতম পাহাড় সাফার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপত্যকার দিকে দৃষ্টি দিলেন। কোথাও কাউকে দেখা যায় কিনা? না, কাউকেই তিনি দেখতে পেলেন না। এরপর তিনি সাফা থেকে নামলেন। নেমে যখন উপত্যকায় পৌঁছিলেন, তখন তাঁর জামার কোচা টেনে উঁচু করলেন এবং অতিশয় ক্লান্ত ও
বিপর্যস্ত মানুষের মতো হন্যে হয়ে দৌড়াতে শুরু করলেন। দৌড়ে উপত্যকা পার হলেন। পুনরায় মারওয়ায় এলেন। মারওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলেন কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এভাবে সাতবার সাফা ও মারওয়ায় চক্কর দিলেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন: এজন্যই মানুষ এ দুই পাহাড়ের মাঝে চক্কর দিয়ে থাকে।
সাফা ও মারওয়ার মাঝে চক্কর দেয়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান: সাফা ও মারওয়ার মাঝে চক্কর দেয়া সংক্রান্ত শরিয়তের বিধান নিয়ে আলেমদের তিনটে মত পাওয়া যায়।:
১. সাহাবিদের মধ্য থেকে ইবনে উমর, জাবের ও আয়েশা রা. এবং ইমামদের মধ্য থেকে মালেক, শাফেয়ী ও একটি বর্ণনা অনুযায়ী আহমদ বলেছেন, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা হজ্জের একটি রুকন তথা ফরয। কোনো হাজি এটা বাদ দিলে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং কোনো কুরবানি ইত্যাদি দ্বারা এর ক্ষতিপূরণ হবেনা। তাদের এ মতের পক্ষে নিম্নোক্ত প্রমাণাদি পেশ করেছেন:
বুখারি যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন: উরওয়া আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এ আয়াত নিয়ে ভেবে দেখেছেন কি?
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا .
"নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম। তাই যে ব্যক্তি হজ্জ বা ওমরা করবে, সে এই দুটির তওয়াফ করলে আপত্তি নেই।" আল্লাহর কসম, এ থেকে তো বুঝা যায়, সাফা ও মারওয়ায় তওয়াফ না করলেও আপত্তি নেই। আয়েশা রা. বললেন: হে আমার ভাইপো, তুমি ভুল বললে। তুমি এ আয়াতের যেভাবে ব্যাখ্যা করলে, তাতে তো এটাই দাঁড়ায় যে, তওয়াফ না করলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু এ আয়াত আনসারদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মানাত দেবীর পূজা করতো এবং তার নামে তালবিয়া পড়তো। ইসলাম গ্রহণের পর সেই তালবিয়া পাঠকারীরা সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করতে সংকোচ বোধ করতো। ইসলাম গ্রহণের পর তারা রসূলুল্লাহ সা.কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমরা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ (সাঈ) করতে সংকোচ বোধ করতাম। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম ....................
আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে তওয়াফ চালু করেছেন। কাজেই সাফা ও মারওয়ার মাঝের তওয়াফ (সাঙ্গ) বর্জন করার অধিকার কারোর নেই।
মুসলিম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানরা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করেছেন। তাই এটা সুন্নতে পরিণত হয়েছে। যে ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করবেনা, আল্লাহ তার হজ্জ পূর্ণ করবেন না।
বনু আবদুদ্ দারের জনৈক মহিলা হাবিবা বলেছেন: একদল কুরাইশী মহিলার সাথে আবু হুসাইনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, রসূলুল্লাহ সা. সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করছেন। তার দৌড়াদৌড়ির প্রচণ্ডতায় তার লুংগি তার কোমরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আমি তা দেখে বললাম: আমি রসূলুল্লাহর সা. হাঁটু দেখতে পাচ্ছি। তাকে বলতে শুনলাম: "তোমরা সাঈ করো। কেননা আল্লাহ তোমাদের জন্য সাঈ বাধ্যতামূলক করেছেন। ইবনে মাজাহ, আহমদ, শাফেয়ী।
আর যেহেতু সাঈ হজ্জ ও ওমরা উভয়টিতেই ইবাদত হিসেবে অংগীভূত, তাই বাইতুল্লাহর তওয়াফের মতো এটিও হজ্জ ও ওমরা উভয়ের রুকন তথা অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অপরিহার্য কর্তব্য বা ফরয।
২. পক্ষান্তরে ইবনে আব্বাস, আনাস, ইবনে যুবায়ের, ইবনে সিরীন ও একটি বর্ণনা অনুযায়ী আহমদের মত হলো, এটি সুন্নত। আর সুন্নত হওয়ার কারণে এটি তরক করলে কোনো ফিদিয়া বা কাফফারা দেয়া ওয়াজিব হয়না।
এই মতের প্রবক্তাদের প্রমাণ কুরআনের উল্লিখিত উক্তি: "সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করলে কোনো আপত্তি নেই।" কোনো কাজের কর্তাকে একথা বলা যে, “এই কাজ করলে আপত্তি নেই" স্বতই প্রমাণ করে যে, ঐ কাজ ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক নয়। সুতরাং এ দ্বারা কাজটি 'মুবাহ' অর্থাৎ করা ও বর্জন করা সমান। করলেও গুনাহ নেই, না করলেও গুনাহ নেই। তবে 'সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন' এই উক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাজটি সুন্নত। যেহেতু এটা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ইবাদত, যা বাইতুল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তাই কংকর নিক্ষেপের ন্যায় রুকনে পরিণত হয়নি।
৩. আবু হানিফা, ছাওরী ও হাসানের মতে এটি ওয়াজিব, রুকন বা ফরয নয়। এটি তরক করলে হজ্জ বা ওমরা বাতিল হবেনা। তবে তরক করলে দম দিতে অর্থাৎ একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে। আল মুগনীর প্রণেতা এই মতকে অগ্রগণ্য মনে করেছেন। তিনি বলেছেন: এটা অগ্রগণ্য। কেননা যিনি এটিকে ওয়াজিব বলে রায় দিয়েছেন, তার প্রদর্শিত প্রমাণ থেকে সাব্যস্ত হয় যে, এটা শর্তমুক্ত ওয়াজিব। এমন ওয়াজিব নয় যে, এটি বাদ দিলে মূল দায়িত্ব পালিতই হবেনা।
আয়েশা রা. যে বক্তব্য দিয়েছেন অন্যান্য সাহাবির বক্তব্যে তার বিরোধিতা করা হয়েছে। বনু আবদুদ দারের মহিলা হাবিবার হাদিসটি যদিও বিতর্কিত, তথাপি তা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এটি বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব।
সাফা ও মারওয়া সংক্রান্ত আয়াতটি কিছু লোকের সাঈ সংক্রান্ত সংকোচ দূর করার জন্য এসেছে। কেননা তারা জাহেলি যুগে সাফা ও মারওয়ায় রক্ষিত দুটো মূর্তির পূজার খাতিরে ঐ দুই পাহাড়ের মাঝে সাঈ করতো। তাই ওখানে সাঈ করলে গুনাহ হবে কিনা ভেবে তারা শংকিত ছিলো।
সাঈর শর্তাবলি: সাঈর বিশুদ্ধতার জন্য কয়েকটি শর্ত পালন করা জরুরি: ১. সাঈ সবসময় তওয়াফের পরে হওয়া চাই। ২. সাঈ সাত চক্কর পূর্ণ করা চাই। ৩. সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় প্রতিটি চক্কর শেষ করা চাই। ৪. সাঈ সবসময় সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী পথে করা চাই। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এরূপ করেছেন এবং বলেছেন: "তোমরা তোমাদের ইবাদতগুলো আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো।" সুতরাং কেউ তওয়াফের আগে সাঈ করলে কিংবা মারওয়া থেকে সাঈ শুরু করে সাফায় শেষ করলে অথবা সাফা ও মারওয়ার মাঝখানের নির্ধারিত পথ ছাড়া অন্যত্র সাঈ করলে সাঈ শুদ্ধ হবেনা। (হানাফী মযহাব অনুযায়ী ৩ ও ৪ নং কাজ দুটি শর্ত নয়, বরং ওয়াজিব। কেউ তওয়াফের আগে সাঈ করলে অথবা মারওয়া থেকে চক্কর শুরু করে সাফায় শেষ করলে সাঈ বাতিল হবেনা। তবে দম দিতে হবে।)
সাফায় আরোহণ: সাঈর বিশুদ্ধতার জন্য সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করা শর্ত নয়। তবে উভয় পাহাড়কে সাঈর আওতাভুক্ত করা ওয়াজিব। তাই যাওয়া ও আসার সময় উভয় পাহাড়ে লাগাতে হবে। কোনো অংশ সাঈর আওতাভুক্ত করতে ব্যর্থ হলে সাঈ বিশুদ্ধ হবেনা, যতক্ষণ না তা এর আওতায় আসবে।
সাঈর চক্করগুলো এক নাগাড়ে করা: সাঈর চক্করগুলো ক্রমাগতভাবে ও এক নাগাড়ে করা শর্ত নয়। (তবে ইমাম মালেকের মতে চক্করগুলোর মাঝে বেশি বিরতি না দিয়ে এক নাগাড়ে
করা শর্ত।) এমন কোনো সমস্যা যদি দেখা দেয় যা এক নাগাড়ে সাঈ করার পথে বাধার সৃষ্টি হয়, অথবা নামায শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেই কারণে সাঈতে বিরতি দেয়া জায়েয হবে। যখন বাধা দূর হবে, তখন যে কয় চক্কর সম্পন্ন হয়েছে, তার সাথে অবশিষ্ট চক্করগুলো যুক্ত করে সাঈ পূর্ণ করবে। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: তিনি সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করছিলেন। সহসা তার পেশাবের প্রয়োজন দেখা দিলো। তিনি এক পাশে সরে গিয়ে পানি চাইলেন, ওযু করলেন, তারপর অবশিষ্ট চক্করগুলো সম্পন্ন করলেন। -সাঈদ বিন মনসূর।
অনুরূপ, তওয়াফ ও সাঈর মাঝেও বিরতিহীন ধারাবাহিকতা রক্ষা করা শর্ত নয়। আল মুগনিতে বলা হয়েছে: ইমাম আহমদ বলেছেন: তওয়াফের পর বিশ্রাম করা পর্যন্ত কিংবা বিকাল পর্যন্ত সাঈ বিলম্বিত করাতে কোনো ক্ষতি নেই। আতা ও হাসান মনে করতেন : যে ব্যক্তি দিনের প্রথম ভাগে বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেছে, সে সাফা ও মারওয়ার সাঈকে বিকাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে চাইলে করতে পারে। সাঈদ ও কাসেম এরূপ করেছেন। কেননা সাঈর চক্করগুলোর যখন বিরতিহীন ধারাবাহিকতা রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা নেই, তখন সাঈ ও তওয়াফের মাঝে এর বাধ্যবাধকতা না থাকা অধিকতর বাঞ্ছনীয়। সাঈদ বিন মানসূর বর্ণনা করেছেন, উরওয়া বিন যুবাইরের স্ত্রী সওদা সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করেন। তারপর তিন দিনের মধ্যে তিনি তার তওয়াফ কাযা করেন। কারণ তিনি খুবই বিশালদেহী ছিলেন।
সাঈর জন্য পবিত্রতা : অধিকাংশ আলেম বলেন: সাফা ও মারওয়ার সাঈর জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। কেননা রসূলুল্লাহ সা. ঋতুবতী আয়েশা রা.কে বলেছিলেন: অন্যান্য হাজী যা যা করে, তুমি তার সবই করতে পারো। কেবল বাইতুল্লাহর তওয়াফ গোসল না করা পর্যন্ত করবেনা। -মুসলিম। আর আয়েশা রা. ও উম্মে সালমা রা. বলেছেন: নারী যখন বাইতুল্লাহর তওয়াফ ও তওয়াফের পর দু'রাকাত নামায আদায় সম্পন্ন করে এবং তারপর ঋতুবতী হয়। তখন তার সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ সম্পন্ন করা উচিত। সাঈদ বিন মানসুর। তবে সকল ইবাদতেই পবিত্রাবস্থা বজায় রাখা মুস্তাহাব। কেননা পবিত্রতা শরিয়তে খুবই কাঙ্ক্ষিত বিষয়।
সাঈতে হেঁটে চলা ও বাহনে চলা : সাঈ হেঁটেও করা যাবে, বাহনে চড়েও করা যাবে। তবে হেঁটে করা উত্তম। ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিস থেকে জানা যায় যে, তিনি হেঁটে সাঈ করতেন। তারপর যখন মানুষের ভিড় বেড়ে গেলো, তখন বাহনে আরোহণ করে করতে শুরু করলেন, যাতে লোকেরা তাকে দেখতে পায় এবং জিজ্ঞাসা করতে পারে। আবুত তুফাইল ইবনে আব্বাস রা.কে বললেন: আমাকে বলুন, বাহনে আরোহণ করে সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ (সাঈ) করা সুন্নত কি? কেননা আপনার জনগণ এটাকে সুন্নত দাবি করে।
ইবনে আব্বাস রা. বললেন : তাদের দাবি সত্যও, মিথ্যাও। আবুত তুফাইল বললেন : এ কী বলছেন: সত্যও, মিথ্যাও? ইবনে আব্বাস বললেন : রসূলুল্লাহ সা. এর ওপর মানুষের ভিড় বেড়ে গিয়েছিল। লোকেরা এসে বলতো, এই যে মুহাম্মদ, এই যে মুহাম্মদ। এমনকি যুবতী মেয়েরাও ঘর থেকে বেরিয়ে যেতো। রসূলুল্লাহ সা. তাঁর সামেন ভিড় করা লোকজনেক ধাক্কা দিয়ে হটিয়ে দিতেননা। যখন ভিড় বেড়ে গেলো, তখন বাহনে আরোহণ করলেন। হেঁটে চলা ও দৌড়ে চলা উত্তম। (সমতল ভূমিতে দুই খুঁটির মাঝখানে দৌড়াবে, আর অবশিষ্ট জায়গায় হেঁটে চলবে।) সাঈতে বাহনে আরোহণ বৈধ হলেও মাকরূহ। তিরমিযি বলেছেন: আলেমদের একটি দল বাইতুল্লাহ ও সাফা মারওয়ায় বিনা ওযরে বাহনে আরোহণ করে তওয়াফ করা অপছন্দ করেছেন। এটা ইমাম শাফেয়ীরও মত। মালেকীদের মতে, যে ব্যক্তি বিনা ওযরে বাহনে আরোহণ করে সাঈ করে, সময় থাকলে তার পুনরায় সাঈ করা জরুরি। সময় না থাকলে তাকে দম দিতে হবে। কেননা হেঁটে চলতে সক্ষম ব্যক্তির হেঁটে সাঈ করা তাদের
নিকট ওয়াজিব। আবু হানিফাও এই মতের প্রতিনিধিত্ব করে বলেন: রসূলুল্লাহ সা. এর বাহনে আরোহণের কারণ ছিলো তাঁর পাশে জনগণের অতিমাত্রায় ভিড় করা ও ঘিরে ধরা। এটা একটা ওযর। এজন্য আরোহণ করা বৈধ।
চিহ্নিত দুটো খুঁটির মাঝে দৌঁড়ানো মুস্তাহাব দুই চিহ্নিত খুঁটির মাঝে ছাড়া সাফা ও মারওয়ার সাঈ হেঁটে করা মুস্তাহাব। দুই খুঁটির মাঝে রমল করা মুستাহাব। ইতিপূর্বে হাবিবার হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে: "রসূলুল্লাহ সা. এতো জোরে দৌড়াতেন যে, তাঁর পরনের লুংগি প্রবল ঘুরপাক খাচ্ছিলো।"
তবে জোরে দৌড়ানো ছড়া সাঈ বা তওয়াফ করলে তা শুদ্ধ হবে। সাঈদ বিন জুবাইর রা. বলেন: আমি ইবনে উমরকে সাফা ও মারওয়ার মাঝে ধীরে হাঁটতে দেখেছি। তারপর তিনি বললেন: “যদি ধীর স্থিরভাবে হেঁটে থাকি, তাহলে তা জায়েয হবে। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সা.কে ধীরে হাঁটতে দেখেছি। আর যদি দ্রুত দৌড়ে থাকি তবে রসূলুল্লাহ সা.কে আমি দ্রুত দৌড়াতেও দেখেছি। আমি তো অতিশয় বৃদ্ধ মানুষ।" আবু দাউদ, তিরমিযি।
একমাত্র পুরুষদের জন্যই এটা মুস্তাহাব। মহিলাদের জন্য দ্রুত চলা নয় বরং স্বাভাবিক গতিতে চলা মুস্তাহাব।
শাফেয়ী আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: কিছু মহিলাকে দ্রুত চলতে দেখে আয়েশা রা. বললেন: তোমাদের মহিলাদের জন্য কি আমাদের নিকট কোনো আদর্শ নেই? তোমাদের জন্য জোরে জোরে চলা জরুরি নয়।
কা'বার দিকে মুখ করে সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ ও দোয়া করা: সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করা ও কেবলামুখি হয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব। রসূলুল্লাহ সা. এর সম্পর্কে বর্ণিত: তিনি সাফার দরজার দিক থেকে বের হলেন, তারপর সাফার কাছাকাছি পৌঁছেই সাফা ও মারওয়া সংক্রান্ত আয়াত পাঠ করলেন: "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন।" তারপর বললেন: আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন, আমি সেভাবে শুরু করবো। তারপর সাফা দিয়ে শুরু করলেন এবং সাফার উপরে আরোহণ করলেন। আরোহণ করে যখন বাইতুল্লাহকে দেখতে পেলেন তখন কেবলামুখি হয়ে তিনবার করে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ বললেন। তারপর বললেন :
لا إله إلا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
তারপর এর মাঝে দোয়া করলেন এবং তিনবার এই দোয়া পড়লেন। তারপর নেমে এসে মারওয়ার দিকে গেলেন। তার উপর আরোহণ করলেন। বাইতুল্লাহর দিকে দৃষ্টি দিলেন। এভাবে সাফায় যা যা করেছিলেন, মারওয়ায়ও তা তা করলেন।
নাফে বলেছেন: আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে সাফায় থাকা অবস্থায় এরূপ দোয়া করতে শুনেছি:
اللهُمَّ إِنَّكَ قُلْتَ : ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ وَإِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ، وَإِنِّي أَسْأَلُكَ - كَمَا هَدَيْتَنِي لِلْإِسْلَامِ - أَنْ لَا تَنْزِعَهُ مِنِّي حَتَّى تَتَوَفَّانِي وَأَنَا مُسْلِمٌ .
"হে আল্লাহ, তুমি বলেছো, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। তুমি তো ওয়াদা ভংগ করোনা। আমি তোমার কাছে চাই, আমাকে যেমন ইসলামে দিক্ষিত করেছো তেমনি মৃত্যু পর্যন্ত আমার কাছ থেকে ইসলামকে ছিনিয়ে নিওনা।"
সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে যে দোয়া করা মুস্তাহাব: সাফা ও মারওয়ার মাঝে দোয়া করা, আল্লাহকে স্মরণ করা ও কুরআন তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সা. তার সাঈ চলাকালে এই দোয়া করতেন : رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَاهْدِنِي السَّبِيلَ الأقوم "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো ও দয়া করো এবং আমাকে সর্বাপেক্ষা সঠিক পথে চালাও।" এই দোয়াও বর্ণিত হয়েছে : رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَرِ إِنَّكَ الْأَعَز الأكرم "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো ও দয়া করো। তুমি পরম সম্মানিত ও মহৎ।"
তওয়াফ ও সাঈর মাধ্যমে হজ্জ ও ওমরার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়। ইহরামকারী যদি তামাত্তু হজ্জকারী হয়, তবে সে এরপর চুল কামিয়ে বা ছেঁটে ইহরামমুক্ত হবে। আর কিরান হজ্জকারী হলে তার ইহরাম ১০ই জিলহজ্জ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কিরানকারী এই সাঈ করলে তার আর ফরয তওয়াফের পর সাঈ করতে হবেনা। তামাত্তুকারী হলে ফরয তওয়াফের পর পুনরায় সাঈ করবে এবং সে ৮ই জিলহজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করবে।
📄 মিনায় গমন
৮ই জিলহজ্জ মিনায় যাওয়া সুন্নত। হাজি যদি কিরানকারী হয় অথবা ইফরাদকারী হয় তবে সে ইতিপূর্বে কৃত ইহরামসহই মিনায় যাবে। আর যদি তামাত্তুকারী হয় তবে হজ্জের ইহরাম বাঁধবে এবং মীকাতে যা যা করেছিল তা করবে। সুন্নত হলো, সে যে জায়গায় অবস্থান করে সেখান থেকেই ইহরাম করবে। মক্কায় থাকলে মক্কা থেকে এবং মক্কার বাইরে থাকলে সেখান থেকেই ইহরাম করবে। হাদিসে এসেছে: "যার বাসস্থান মক্কার বাইরে সে তার বাসস্থান থেকেই ইহরাম করবে। আর যার বাসস্থান মক্কায় সে মক্কা থেকেই ইহরাম করবে।" আর মিনায় রওয়ানা হওয়ার সময় বেশি করে দোয়া করা ও তালবিয়া পড়া এবং মিনায় যোহর, আসর, মাগরিব, এশা পড়া ও রাত যাপন মুস্তাহাব। ৯ তারিখ সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত মিনা থেকে বের না হওয়া মুস্তাহাব, যাতে রসূলুল্লাহ সা. এর অনুকরণ নিশ্চিত হয়। এর কোনো একটি বা সবগুলো তরক করলে সুন্নত তরক করা হবে। এজন্য কোনো কাফফারা দিতে হবেনা। ইবনুল মুনযিরের বর্ণনা অনুসারে আয়েশা (রা) ৮ই জিলহজ্জ রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত মক্কা থেকে মিনার উদ্দেশ্যে বের হননি।
৮ই জিলহজ্জের পূর্বে মিনার উদ্দেশ্যে বের হওয়া বৈধ: হাসান থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি ৮ই জিলহজ্জের একদিন বা দু'দিন আগেই মক্কা থেকে মিনায় চলে যেতেন। কিন্তু মালেক এটা অপছন্দ করেছেন। তিনি ৮ই জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত মক্কায় থাকাটাও অপছন্দ করেছেন। অবশ্য মক্কায় জুমার সময় হয়ে গেলে ভিন্ন কথা। সেরূপ ক্ষেত্রে মক্কা থেকে বের হবার আগে জুমা পড়ে নেয়া কর্তব্য।
📄 আরাফার উদ্দেশ্যে যাত্রা
৯ই জিলহজ্জ সূর্যোদয়ের পর 'দব' এর রাস্তা ধরে আল্লাহ আকবর, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ও তালবিয়া পড়তে পড়তে আরাফাত রওয়ানা হওয়া সুন্নত।
মুহাম্মদ বিন আবু বরর ছাকাফি বলেন: মিনা থেকে আরাফাত যাওয়ার সময় আমি আনাস রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা রসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে কিভাবে তালবিয়া পড়তেন? তিনি বললেন: যার ইচ্ছ হতো তালবিয়া পড়তো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। যার ইচ্ছা হতো তকবীর বলতো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। যার ইচ্ছা হতো কলেমা তাইয়েবা পড়তো, কেউ তাতে আপত্তি করতোনা। বুখারি প্রভৃতি হাদিস।
আরাফায় অবস্থানের উদ্দেশ্যে নামেরাতে যাত্রা বিরতি করা ও তার কাছেই গোসল করা মুস্তাহাব। সূর্য ঢলে পড়ার পরই আরাফায় অবস্থানের সময় শুরু। এর পূর্বে আরাফায় না ঢোকা মুস্তাহাব।