📄 মক্কা শরিফ ও মসজিদুল হারামে প্রবেশের জন্য যা করা মুস্তাহাব
মক্কায় প্রবেশের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো করা মুস্তাহাব :
১. গোসল করা। বর্ণিত আছে, ইবনে উমর রা. মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করতেন। ২. আয যাহের অঞ্চলের যীতুয়াতে রাত যাপন। কেননা রসূলুল্লাহ সা. সেখানে রাত্র যাপন করছেন। নাফে বলেছেন: ইবনে উমরও এরূপ করতেন। -বুখারি ও মুসলিম।
৩. সর্বোচ্চ গিরিপথ ছানিয়া কিদা দিয়ে প্রবেশ করা। রসূলুল্লাহ সা. মুয়াল্লার দিক দিয়ে প্রবেশ করেছেন। যার পক্ষে এটা সহজ সাধ্য হয়, সে এই পথ দিয়ে প্রবেশ করবে। নচেত যেদিক দিয়ে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভব সেদিক দিয়ে প্রবেশ করবে। এতে কোনো বাধা নেই।
৪. কোনো নিরাপদ জায়গায় জিনিসপত্র রেখে আল্লাহর ঘরে যাওয়া এবং বনু শায়বার প্রবেশ দ্বার বাবুস সালাম দিয়ে প্রবেশ করা এবং একাগ্রতা ও কাকুতি মিনতি সহকারে বলা: أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَسَلَّمَ.
"মহামহিম আল্লাহর নিকট তারা মহিমান্বিত সত্তার নিকট তার অনাদি ও অনন্ত পরাক্রমের নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ মুহাম্মদের উপর ও তাঁর বংশধর ও অনুসারিদের ওপর রহমত ও সালাম পাঠাও। হে আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার জন্য তোমার রহমতের দুয়ার খুলে দাও।"
৫. আল্লাহর ঘরের ওপর দৃষ্টি পড়া মাত্রই হাত উঁচু করে বলবে: اللَّهُمَّ زِدْ هُذَا الْبَيْتَ تَشْرِيفًا، وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةٌ، وَزِدْ مَنْ شَرَّفَهُ وَكَرَمَهُ مِمَّنْ حَجَّهُ، أَوْ اعْتَمَرَهُ وَتَشْرِيفًا وَتَكْرِيمًا وَتَعْظِيمًا وَبِرًا .
"হে আল্লাহ, এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করো, এ ঘরের প্রতাপ বৃদ্ধি করো, যে সকল হাজি ও ওমরাকারী এ ঘরকে সম্মান করবে তাদেরও সম্মান ও নেক আমল বৃদ্ধি করো।" -শাফেয়ী কর্তৃক বর্ণিত। তারপর বলবে: اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، فَحَيِّنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ
"হে আল্লাহ, তুমি শান্তি, তোমার কাছ থেকেই শান্তি আসে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে শান্তিতে জীবন যাপন করাও।"
৬. এরপর হাজরে আসওয়াদের কাছে যাবে এবং তাকে বিনা শব্দে চুমু দেবে। চুমু দিতে না পারলে হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করবে ও হাতকে চুমু দেবে। তাও করতে না পারলে হাজরে আসওয়াদের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করবে।
৭. তারপর হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে তওয়াফ শুরু করবে।
৮. তাহিয়াতুল মসজিদ নামায পড়বেনা। কেননা এখানে তওয়াফই তাহিয়াতুল মসজিদ (মসজিদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও অভিবাদন)। তবে ফরয নামায শুরু হয়ে গেলে বা আসন্ন হলে ইমামের সাথে তা পড়বে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যখন জামাতে নামায শুরু হয় তখন ফরয ব্যতিত আর কোনো নামায নেই।" অনুরূপ যদি আশংকা হয় নামাযের ওয়াক্ত চলে যাবে তা হলে আগে ফরয নামায পড়ে নেবে তারপর তওয়াফ করবে।
📄 তাওয়াফ
তওয়াফের নিয়ম: ১. বগলের নিচে দিয়ে বাম কাঁধে চাদর জড়িয়ে (যদি চাদর গায়ে থাকে) হাত উঁচু করে হাজরে আসওয়াদকে বরাবর রেখে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে, তাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করে অথবা তার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করে, কা'বা শরিফকে বামে রেখে নিম্নোক্ত দোয়া পড়ে তওয়াফ শুরু করা:
بِسْمِ اللهِ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ، وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ، وَوَفَاء بِعَهْدِكَ، وَإِتِّبَاعًا لِسُنَّةِ النَّبِيِّ ﷺ
আল্লাহর নামে। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ, তোমার প্রতি ঈমান সহকারে। তোমার কিতাবকে মান্য করে, তোমার সাথে কৃত অংগীকার পূরণার্থে এবং তোমার নবীর সুন্নত পালনার্থে (তওয়াফ শুরু করছি)।
২. যখন তওয়াফ শুরু করবে, তখন প্রথম তিন চক্করে রমল করা মুস্তাহাব। রমলের নিয়ম হলো, জোরে জোরে ঘন ঘন পা ফেলে কা'বার নিকটবর্তী হবার চেষ্টা সহকারে হাঁটবে। অবশিষ্ট চারটি চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবে। রমল করতে অসমর্থ হলে কিংবা তওয়াফকারীদের ভিড়ের কারণে কা'বার নিকটবর্তী হতে না পারলে যেভাবে সহজতর হয় সেভাবেই তওয়াফ করবে। সাত চক্করের প্রত্যেক চক্করে রুকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করা এবং হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেয়া কিংবা স্পর্শ করা মুস্তাহাব।
৩. তওয়াফের সময় যতো বেশি পারা যায় দোয়া ও যিকর করা। যে দোয়া ও যিকর নিজের মনোপূত তা করা এবং কোনো নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকর কিংবা তওয়াফ গাইডের শেখানো দোয়া ও যিকরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকা মুস্তাহাব। কেননা শরিয়ত প্রণেতা আমাদের জন্য কোনো নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকর করা বাধ্যতামূলক করেননি। কেউ কেউ যেভাবে প্রথম চক্করের জন্য কিছু নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকর এবং দ্বিতীয় চক্করের জন্য অন্য কিছু নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকরের উপদেশ দেয় তার কোনো ভিত্তি নেই। রসূলুল্লাহ সা. এর কাছ থেকে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট দোয়া ও যিকর পাওয়া যায়নি। তওয়াফকারীর পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে নিজের জন্য, নিজের ভাই বন্ধুদের জন্য যেমন ইচ্ছা দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণ চেয়ে দোয়া করতে পারে। হাদিস থেকে যে কটি দোয়া জানা গেছে, তা এখানে উল্লেখ করা যাচ্ছে।
১. রসূলুল্লাহ সা. থেকে মরফু সূত্রে বর্ণিত: যখন হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করবে তখন বলবে: اللَّهُمَّ إِيْمَانًا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ، وَوَفَاء بِعَهْدِكَ، وَإِتِّبَاعًا لِسُنَّةِ نَبِيِّكَ بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ. “হে আল্লাহ, তোমার প্রতি ঈমান সহকারে, তোমার কিতাবের প্রতি মান্যতা সহকারে। তোমার সাথে কৃত অংগীকার পালনের উদ্দেশ্যে এবং তোমার নবীর সুন্নতের অনুসরণের লক্ষ্যে, বিসমিল্লাহ, আল্লাহ আকবর।"
২. ইবনে মাজাতে বর্ণিত, তওয়াফ শুরু করেই বলবে: سُبْحَانَ اللَّهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ.
৩. রুকনে ইয়ামানীর কাছে পৌঁছলে বলবে: رَبَّنَا أَتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ. “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দাও, আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আমাদেরকে দোযখের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দাও।" - আবু দাউদ, শাফেয়ী।
৪. ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: যখনই হাজরে আসওয়াদ বরাবর আসবে, আল্লাহু আকবর বলবে এবং রমলের সময় বলবে: হে আল্লাহ, এ হজ্জকে হজ্জ মাবরুর (যে হজ্জ সকল গুনাহ থেকে মুক্ত করে) বানাও। সকল গুনাহ মাফ করো এবং সকল চেষ্টা সাধনা কবুল করো। আর তওয়াফের প্রত্যেক চক্করে বলবে: "হে আল্লাহ, মাফ করো ও দয়া করো। যতো গুনাহর কথা তুমি জান তা সব মাফ করো। তুমিই তো সবচেয়ে প্রতাপশালী। সর্বাপেক্ষা সম্মানিত। হে আল্লাহ, আমাদেরকে দুনিয়ার কল্যাণ দাও, আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং দোযখের আযাব থেকে নিষ্কৃতি দাও।" ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: তিনি (ইবনে আব্বাস) উভয় রুকনের মাঝে বলতেন:
"হে আল্লাহ যে জীবিকা তুমি দিয়েছো, তাতেই আমাকে তৃপ্তি দাও। তাতে বরকত দাও এবং আমার যা কিছু হারিয়েছে তার চেয়ে উত্তম জিনিস দ্বারা ক্ষতিপূরণ করো।" হাফেয সাঈদ বিন মানসূর এবং হাকিম।
৫. তারপর যখন সাত চক্কর তওয়াফ সমাপ্ত করবে তখন মাকামে ইবরাহিমের নিকট দু'রাকাত নামায পড়বে এবং পবিত্র কুরআনের এই অংশটি পড়তে থাকবে : وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى "মাকামে ইবরাহিম (ইবরাহিমের দাঁড়ানোর জায়গা) থেকে একটি জায়গা নামাযের জন্য নির্বাচন করো।" এর মাধ্যমে তওয়াফ সমাপ্ত হয়। তওয়াফকারী যদি ইফরাদ হজ্জ আদায়কারী হয় তাহলে এই তওয়াফকে 'তওয়াফ কুদুম' (আগমনের তওয়াফ), তওয়াফুত্ তাহিয়া (অভিবাদনের বা শ্রদ্ধা ভাজনের তওয়াফ) এবং তাওয়াফুদ দুখুল (প্রবেশের তওয়াফ) নামে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এ তওয়াফ হজ্জের রুকন অর্থাৎ অপরিহার্য অংশ নয় এবং ওয়াজিব নয়। আর কিরান বা তামাতু হজ্জ আদায়কারীর জন্য এ তওয়াফ 'ওমরার তওয়াফ' হিসেবে গণ্য। এ তওয়াফ দ্বারা তার তওয়াফুত তাহিয়া ও তওয়াফ কুদুমও আদায় হয়ে যাবে। কিরান ও তামাত্তু হজ্জ আদায়কারীকে এরপর সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করার মধ্য দিয়ে ওমরা সমাপ্ত করতে হবে।
তওয়াফকারীর কুরআন তেলাওয়াত: তওয়াফকারী তওয়াফের সময় কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে। কারণ তওয়াফ আল্লাহর যিকরের জন্যই শরিয়তে বিধিবদ্ধ হয়েছে। আর কুরআন হলো যিকর।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আল্লাহর ঘরে ও সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ এবং কংকর নিক্ষেপের উদ্দেশ্য আল্লাহর স্মরণকে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া আর কিছু নয়। - আবু দাউদ, তিরমিযি।
তওয়াফের ফযিলত: বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আল্লাহ তাঁর মহিমান্বিত ঘরে এসে হজ্জ আদায়কারীদের জন্য একশো বিশিষ্ট রহমত বরাদ্দ করেছেন। ষাটটি তওয়াফকারীর জন্য, চল্লিশটি নামায আদায়কারীদের জন্য এবং বিশটি দর্শকদের জন্য। (অর্থাৎ আল্লাহর ঘরের প্রতি দৃষ্টিপাতকারীদের জন্য)
তওয়াফ কয় প্রকার ও কী কী তাওয়াফ চার প্রকার। যেমন: ১. তওয়াফ কুদুম, ২. তওয়াফ ইযাকা, ৩. তওয়াফ বিদা ও ৪. নফল তওয়াফ। এসব তাওয়াফ করা প্রত্যেক হাজির কর্তব্য। মক্কায় উপস্থিত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যতো বেশি সম্ভব নফল তওয়াফ করা ও মসজিদুল হারামে নামায পড়া দরকার। কেননা মসজিদুল হারামের নামাযের সওয়াব অন্যান্য মসজিদের চেয়ে এক লক্ষ গুণ বেশি। নফল তওয়াফে রমল ও চাদর বগলের নিচ দিয়ে বাম কাঁধে জড়ানো জরুরি নয়। মসজিদুল হারামে যতোবার প্রবেশ করা হয়, ততোবার তওয়াফ দ্বারা তাকে সম্মান প্রদর্শন করা সুন্নত। অন্যান্য মসজিদের বেলায় 'তাহিয়াতুল মসজিদ'-এর দু'রাকাত নফল দ্বারা সম্মান প্রদর্শন করতে হয়।
তওয়াফের 'কিছু শর্ত', কিছু সুন্নত ও কিছু আদব রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা যাচ্ছে:
তওয়াফের শর্তাবলি: তওয়াফের জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পালন করা আবশ্যক:
১. সর্বপ্রকারের নাপাকি থেকে: যথা ছোট নাপাকি থেকে (ওযুর মাধ্যমে) বড় নাপাকি থেকে (গোসলের মাধ্যমে) এবং নাপাক রক্ত থেকে (সংশ্লিষ্ট জায়গা ধুয়ে ফেলার মাধ্যমে) পবিত্র হওয়া। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তওয়াফ এক প্রকার নামায। ব্যতিক্রম শুধু এই যে, আল্লাহ এতে কথ বলা বৈধ করেছেন। যে ব্যক্তি কথা বলছে, সে যেনো ভালো বিষয়ে ছাড়া কথা না বলে।" তিরমিযি, দার কুতনি। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. তার কাছে গিয়ে
দেখলেন, আয়েশা কাঁদছেন। তিনি বললেন: তোমার কি হায়েয হয়েছে? আয়েশা বললেন! হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: এটা এমন একটা জিনিস, যা আল্লাহ আদমের মেয়েদের জন্য অনিবার্য করে দিয়েছেন। সুতরাং অন্যান্য হাজি যা যা করে, তুমি তার সবই করো। কেবল কা'বা শরিফে তওয়াফ করোনা যতোক্ষণ না গোসল করো।-মুসলিম।
আয়েশা রা. আরো বলেন: রসূলুল্লাহ সা. যখনই মক্কায় আসতেন। সর্বাগ্রে ওযু করে আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করতেন। বুখারি ও মুসলিম। যে ব্যক্তি এমন নাপাকি বহন করে যা দূর করা সম্ভব নয়। যেমন অবিরাম পেশাব-এর রোগ এবং মহিলাদের ইস্তিহাযা রোগ, যা অবিরাম রক্তস্রাব ঘটায়, সে তওয়াফ করতে পারবে। এতে কোনো কাফফারা দিতে হবেনা। এটা সর্বসম্মত মত।
মালেক বর্ণনা করেন: এক মহিলা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের কাছে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করলো। সে বললো: আমি আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করার উদ্দেশ্যে এসেছি। মসজিদুল হারামের দরজার কাছে আসতেই আমার রক্তস্রাব শুরু হয়ে গেছে। তাই আমি ফিরে গেলাম। তারপর আমি তা থেকে মুক্ত হলাম। তারপর আবার তওয়াফ করতে এলাম। কিন্তু যখনই মসজিদুল হারামের দরজার কাছে এসেছি, অমনি স্রাব শুরু হলো। এভাবে তিনবার হলো। আব্দুল্লাহ বললেন: এটা শয়তানের পক্ষ থেকে একটা আঘাত। অতএব তুমি গোসল করো, একটা নেকড়া দিয়ে স্রাবের মুখে পট্টি বাঁধ এবং তওয়াফ করো। (হানাফীদের মতে ছোট নাপাকি থেকে পবিত্র হওয়া তওয়াফের শর্ত নয়। এটা ওয়াজিব এবং একটা কুরবানি (দম) দ্বারা এর ক্ষতি পূরণ হয়। ছোট নাপাকি নিয়ে বিনা ওযুতে তওয়াফ করলে তওয়াফ শুদ্ধ হবে এবং একটা ছাগল কুরবানি করা ওয়াজিব হবে। আর বড় নাপাকি নিয়ে অথবা ঋতুবতী অবস্থায় তওয়াফ করলে তাও শুদ্ধ হবে কিন্তু একটা উট কুরবানি করতে হবে এবং মক্কায় অবস্থান কালে কাযা করতে হবে। আর কাপড় বা শরীরে লেগে থাকা নাপাকি থেকে পবিত্র হওয়া সুন্নত মাত্র।)
২. শরীরের গোপনীয় অংশ আবৃত করা: আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: বিদায় হজ্জের আগের যে হজ্জটিতে রসূল সা. আবু বকর রা.কে হজ্জের আমির নিযুক্ত করেছিলেন, সেই হজ্জে আবু বকর আমাকে একটি দলের সদস্য করে মক্কায় পাঠালেন। এই দলের দায়িত্ব ছিলো এই মর্মে ঘোষণা দেয়া যে, এ বছরের পর কোনো মোশরেক আর হজ্জ করতে পারবেনা এবং কা'বা শরিফে কোনো ব্যক্তি উলংগ হয়ে তওয়াফ করতে পারবেনা। বুখারি ও মুসলিম। (হানাফীদের মতে, শরীরের গোপনীয় অংশ ঢাকা শর্ত নয়, ওয়াজিব। কেউ যদি নগ্ন হয়েও তওয়াফ করে। তবে তা শুদ্ধ হবে এবং তা কাযা করতে হবে। তবে মক্কা থেকে বের হয়ে গেলে একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে।)
৩. তওয়াফে সাতটি চক্কর পূর্ণ করতে হবে। কোনো চক্করে এক কদম যদি বাকি থাকে, তবে তওয়াফ শুদ্ধ হবেনা। আর যদি চক্করের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হয়। তাহলে অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যাটি ধরে গণনা করবে। যাতে সাতটি চক্কর নিশ্চিত হয়। তওয়াফ শেষ করার পর সন্দেহ হলে তার আর কিছুই করণীয় থাকবেনা। তওয়াফ শুদ্ধ হবে।
৪. হাজরে আসওয়াদ থেকে তওয়াফ শুরু করা এবং হাজরে আসওয়াদ এসে শেষ করা।
৫. বাইতুল্লাহ (কা'বা) কে বাম দিকে রেখে তওয়াফ করতে হবে। ডান দিকে রেখে তওয়াফ করলে তওয়াফ শুদ্ধ হবেনা। কেননা জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. যখন মক্কায় এলেন। হাজরে আসওয়াদের কাছে এলেন এবং তা স্পর্শ করলেন। তারপর তার ডান দিক দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। তিন চক্করে রমল করলেন এবং চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে চললেন। (ঘাড় ঝুলিয়ে জোরে জোরে হাঁটার নাম রমল। হানাফীদের মতে, তওয়াফের রুকন অর্থাৎ অপরিহার্য সর্বনিম্ন পরিমাণ হজ্জে চার চক্কর। বাকি তিন চক্কর ওয়াজিব এবং তা বাদ পড়লে একটা ছাগল কুরবানি দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা যায়।) মুসলিম।
৬. তওয়াফ বাইতুল্লাহর (কা'বার) বাইরে দিয়ে করতে হবে। হাজরে ইসমাঈলের ভেতরে তওয়াফ করলে তওয়াফ শুদ্ধ হবেনা। কেননা হাজরে ইসমাঈল ও সাজরাওয়ান বাইতুল্লাহর অংশ। (হাজরে ইসমাঈল কা'বার উত্তরে একটি অর্ধবৃত্তাকার বেষ্টনীতে আবদ্ধ। এই হাজরে ইসমাঈল পুরোটা বাইতুল্লাহর অংশ নয়। এর প্রায় তিন মিটার বাইতুল্লাহর অংশ। চার সাজরাওয়ান হচ্ছে কা'বার ভিত্তির সংলগ্ন স্থাপনটির নাম, যার ওপর কা'বার পর্দার রিং রাখা হয়।) আল্লাহ তায়ালা বাইতুল্লাহর পাশে তওয়াফ করতে বলেছেন। বাইতুল্লাহর ভেতরে নয়। তিনি বলেছেন: তারা যেনো প্রাচীন কা'বা গৃহের তওয়াফ করে।” (তওয়াফ শব্দের অর্থই কোনো জিনিসের বাইরের পাশ দিয়ে ঘোরা) সম্ভব হলে বাইতুল্লাহর কাছাকাছি থেকে তওয়াফ করা মুস্তাহাব।
৭. বিরতিহীনভাবে তওয়াফ করা মালেক ও আহমাদের মতে শর্ত। বিনা ওযরে স্বল্প বিরতি এবং ওযর থাকলে কিছুটা বেশি বিরতি দেয়াতে ক্ষতি নেই। হানাফী ও শায়েফীদের মতে বিরতিহীন তওয়াফ করা সুন্নত, শর্ত নয়। বিনা ওযরে তওয়াফের মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি দিলে তওয়াফ বাতিল হবেনা। বিরতির পূর্বে যতটুকু তওয়াফ করা হয়েছিল বিরতি পর বাকিটুকু করে তওয়াফ শেষ করবে। সাঈদ বিন মনসূর বর্ণনা করেন: হামিদ বিন যায়দ বলেছেন: আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে দেখেছি। বাইতুল্লাহর তিন বা চার চক্কর তওয়াফ করে বিশ্রাম নিচ্ছেন এবং তার জনৈক খাদেম তাকে বাতাস করছে। কিছুক্ষণ পর তিনি উঠলেন এবং তওয়াফের যেটুকু সম্পন্ন করেছিলেন তার পরবর্তী অংশ সম্পন্ন করলেন। শাফেয়ী ও হানাফী মতানুসারে তওয়াফের মাঝখানে ওযু ছুটে গেলে ওযু করে নেবে এবং তওয়াফের অবশিষ্ট অংশ সম্পন্ন করবে। নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন নেই, চাই বিরতি যতো দীর্ঘ হোক না কেনো।
ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি বাইতুল্লাহর তওয়াফ করছিলেন। ইতিমধ্যে নামাযের জামাত দাঁড়িয়ে গেলো। তিনি জামাতের সাথে নামায পড়লেন। তারপর তওয়াফের যেটুকু বাকি ছিলো তা শেষ করলেন। আতা বললেন: কোনো ব্যক্তি তওয়াফের একাংশ শেষ করার পর জানাযা উপস্থিত হলে তওয়াফ স্থগিত করে জানাযার নামায পড়ে নেবে। তারপর তওয়াফে ফিরে যাবে এবং যেটুকু বাকি ছিলো তা সম্পূর্ণ করবে।
তওয়াফের সুন্নতসমূহ: তওয়াফের কিছু সুন্নত রয়েছে, যা নিম্নে উল্লেখ করা যাচ্ছে:
১. তওয়াফের শুরুতে হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করে নামাযের মতো দু'হাত উঁচু করে আল্লাহু আকবর ও লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে। হাজরে আসওয়াদের উপর দু'হাত রেখে তা স্পর্শ করে ও বিনা শব্দে চুমু দিয়ে তার ওপর কপাল রাখবে। কপাল রাখা সম্ভব না হলে শুধু হাত দিয়ে স্পর্শ করবে ও চুমু দেবে অথবা নিজের কাছে থাকা কোনো জিনিস দ্বারা স্পর্শ করবে ও তাকে চুমু দেবে। অথবা তার দিকে কোনো লাঠি ইত্যাদি দ্বারা ইশারা করবে। এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি:
ইবনে উমর রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. হাজরে আসওয়াদের দিকে মুখ করলেন ও তাকে স্পর্শ করলেন। তারপর নিজের ঠোঁটদ্বয় রাখলেন এবং দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। উমরও রা. দীর্ঘক্ষণ কাঁদলেন। তখন রসূল সা. বললেন: হে উমর এই জায়গাতেই বেশি করে চোখের পানি ফেলতে হয়। -হাকেম।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, উমর রা. হাজরে আসওয়াদের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন: আমি জানি তুমি একটা পাথর। কোনো ক্ষতি বা উপকার করতে পারোনা। আমি যদি না দেখতাম আমার প্রিয় নবী তোমাকে চুমু দিচ্ছেন ও স্পর্শ করছেন, তবে আমি তোমাকে স্পর্শও করতামনা, চুমুও দিতামনা। আল্লাহ বলেছেন: لَقَنْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْلِ اللَّهِ أُسْوَةً حَسَنَةٌ "আল্লাহর রসূলের মধ্যে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।" -আহমদ এবং অন্যান্য।
নাফে বলেন, ইবনে উমর রা. কে দেখেছি প্রথমে হাজরে আসওয়াদ হাত দিয়ে স্পর্শ করেছেন।
তারপর হাতকে চুমু খেয়েছেন এবং বলেছেন: রসূল সা. কে এরূপ করতে দেখার পর থেকে আমি কখনো এরূপ করা বন্ধ করিনি। -বুখারি ও মুসলিম।
সুয়াইদ বিন গাফলা রা. বলেছেন, উমর রা. কে দেখেছি হাজরে আসওয়াদকে চুমু খেতেন এটা সব সময় অব্যাহত রাখতেন এবং বলতেন: রসূলুল্লাহ সা. কে তোমার প্রতি অতিশয় অনুরক্ত ও সমাদরকারী দেখেছি। মুসলিম।
ইবনে উমর রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বাইতুল্লায় এসেই হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করতেন এবং বলতেন: 'বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবর।' আহমদ
আবুত তুফাইল বলেছেন: রসূল সা. কে বাইতুল্লাহর তওয়াফ করতে দেখেছি এবং তার কাছে থাকা একটা বাঁকা মাথা বিশিষ্ট লাঠি ধারা হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করছেন। অতপর সেই লাঠিকে চুম্বন করেছেন। মুসলিম।
বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন, উমর রা. হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করতেন। তারপর বলতেন: আমি জানি তুমি একটা পাথর। কোনো ক্ষতি বা উপকার করতে পারোনা। আমি যদি না দেখতাম রসূলুল্লাহ সা. তোমাকে চুম্বন করছেন, তবে আমি তোমাকে চুম্বন করতামনা।
খাত্তাবি বলেন: এ হাদিস থেকে জানা যায় যে, সুন্নতের অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক যদিও তার কোনো কারণ বা যুক্তি জানা না যায়। যখনই কোনো সুন্নত কেউ জানতে পারবে, তখন তার যুক্তি না বুঝলেও তা পালন করা তার জন্য অপরিহার্য। অবশ্য মোটামুটিভাবে এটা সবার জানা আছে যে, রসূল সা. কর্তৃক হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করার উদ্দেশ্য তাকে সম্মান প্রদর্শন করা। তার যথাযথ মর্যাদা দান ও তার দ্বারা বরকত লাভ করা ব্যতিত কিছু নয়। আল্লাহ তায়ালা কিছু পাথরকে অন্যান্য পাথরের উপর কিছু শহর ও স্থানকে অন্যান্য শহর ও স্থানের উপর এবং কিছু রাত দিন ও মাসকে অন্যান্য রাত দিন ও মাসের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। এসব কিছুর ভিত্তি হলো, আল্লাহর রসূলের প্রদর্শিত কার্যধারার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য।
কোনো কোনো হাদিসে একটা কথা বলা হয়েছে, যা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। সেটি হলো: "হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত।" এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি হাজরে আসওয়াদকে হাত দিয়ে স্পর্শ করবে, আল্লাহর কাছে সে একটা প্রতিশ্রুতি লাভ করবে। রাজা বাদশারা যেমন কাউকে মিত্র হিসেবে পেতে চাইলে বা কারো সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হলে তার সাথে হাত মিলিয়ে সে ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে অথবা রাজা বাদশাদের হাতে যেমন হাত দিয়ে বায়াত করা হয়, এটাও তেমনি। অনুরূপ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাত চুম্বন করে যেমন চাকর নকররা তার নৈকট্য লাভ করে, এটাও তারই সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
কিন্তু মুহাল্লাব বলেছেন: "হাজরে আসওয়াদ পৃথিবীতে আল্লাহর ডান হাত, এ দ্বারা যে বান্দার সাথে তিনি ইচ্ছা করেন হাত মেলান।" অবশ্য কথিত এই হাদিসটি উমর বা তার উক্ত হাদিস দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কেননা আল্লাহর হাত থাকতে পারে এমন কথা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত। হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করার আদেশ দিয়েছেন শুধু এজন্য যেনো কে কতটা আল্লাহর অনুগত তা চাক্ষুসভাবে পরীক্ষা হয়ে যায়। আদমকে সাজদা করতে ইবলিসকে আদেশ দানের ঘটনার মধ্যে এর নজীর বিদ্যমান। উল্লেখ্য যে, ইবরাহিম আ. কর্তৃক কাবার যেসব পাথর স্থাপিত হয়েছিল তার মধ্য থেকে হাজরে আসওয়াদ ব্যতীত আর কোনো পাথর অবশিষ্ট আছে কিনা, নিশ্চিতভাবে জানা যায়না।
হাজরে আসওয়াদের কাছে প্রতিযোগিতা করা জায়েয। হাজরে আসওয়াদে কাউকে কষ্ট না দেয়ার শর্তে প্রতিযোগিতা করাতে কোনো দোষ নেই। ইবনে উমর রা. প্রতিযোগিতা করতে
গিয়ে নিজের নাককে রক্তাক্ত করে ফেলেছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. উমর রা.-কে বলেছিলেন: ওহে আবু হাফস, তুমি অতিশয় শক্তিশালী মানুষ। তুমি হাজরে আসওয়াদের কাছে প্রতিযোগিতা করোনা তাহলে তুমি দুর্বলকে কষ্ট দেবে। তবে যখন জায়গাটা নির্জন পাও তখন হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করো। নচেৎ তকবীর দাও এবং সামনে এগিয়ে যাও। সুনানু শাফেয়ী।
২. তওয়াফের আরেকটি সুন্নত হলো, ইযতিবা করা (চাদরের মধ্যাংশ ডান বগলের নিচে ও চাদরের দুই প্রান্ত বাম কাঁধের ওপর রাখা)। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবিগণ জারানা থেকে ওমরা করলেন। তারা তাদের চাদর বগলের নিচে ও চাদরের প্রান্তভাগ বাম কাঁধের উপর রাখলেন। - আহমদ, আবু দাউদ।
এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। আলেমগণ এর যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, ইযতিবা তওয়াফে রমল করার সহায়ক। মালেক বলেন! এটা মুস্তাহাব নয়। কেননা কেউ এটা করেছেন বলে তিনি জানেনওনা। দেখেনওনি তওয়াফের নামাযে সর্বসম্মতভাবে ইযতিবা মুstahab নয়।
৩. আরেকটি সুন্নত হলো, তওয়াফের প্রথম তিন চক্কর রমল করা এবং অবশিষ্ট চার চক্করে স্বাভাবিকভাবে হাঁটা। (রমল হলো, ঘাড় দুলিয়ে দ্রুত গতিতে ও ঘন পা ফেলে হাঁটা, যাতে শক্তিমত্তা ও সাহসিকতা প্রকাশ পায়।)
ইবনে উমর রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. হাজরে আসওয়াদ থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত তিন চক্কর রমল সহকারে এবং চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে তওয়াফ করেছেন। -আহমদ ও মুসলিম।
যদি কেউ প্রথম তিন চক্করে রমল ত্যাগ করে, তবে পরবর্তী চার চক্করে তা কাযা করতে হবেনা। ইযতিবা ও রমল শুধুমাত্র ওমরার তওয়াফে এবং হজ্জের যে তওয়াফের পর সাফা ও মারওয়ার সাঈ করতে হয় সেই তওয়াফে পুরুষদের জন্য করণীয়। শাফেয়ীদের মতে তওয়াফ কুদুমে রমল করে তার পর সাঈ করলে তওয়াফে ইফাযাতে পুনরায় ইযতিবা ও রমল করার প্রয়োজন নেই। আর যদি তওয়াফে কুদুমের পর সাঈ না করে থাকে এবং তওয়াফে যিয়ারতের পর পর্যন্ত সাঈকে বিলম্বিত করে থাকে, তাহলে তওয়াফে যিয়ারতে রমল ও ইযতিবা করতে হবে।
মহিলাদের কোনো ইযতিবা নেই কেননা এতে তাদের শরীরের গোপনীয় অংশ প্রকাশিত হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। মহিলাদের রমলের ও প্রয়োজন নেই। কেননা ইবনে উমর রা. বলেছেন : মহিলাদের বাইতুল্লার ও সাফা মারওয়ায় রমল করার প্রয়োজন নেই।
রমলের যৌক্তিকতা কি? ইবনে আব্বাসের বর্ণিত হাদিসে এর যৌক্তিকতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. একবার এমন অবস্থায় মক্কায় এলেন যে, মুসলমানদেরকে মদিনার জ্বর দুর্বল করে দিয়েছিল। মোশরেকরা প্রচার করলো যে তোমাদের কাছে এমন এক দল লোক আসবে, যারা জ্বরের কারণে দুর্বল হয়ে গেছে এবং খুবই খারাপ পরিণতির শিকার হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা রসূল সা. কে মোশরেকদের এই রটনার কথা জানিয়ে দিলেন। এর ফলে রসূল সা. মুসলমানদেরকে আদেশ দিলেন, যেনো তারা প্রথম তিন চক্করে রমল করে এবং উভয় রুকনের মাঝে (অর্থাৎ রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে) স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে বললেন। মোশরেকরা যখন তাদের রমল করা দেখলো, তখন তারা পরস্পরকে বললো। এদের সম্পর্কেই কি তোমরা বলেছিলে যে, জ্বর তাদেরকে কাহিল করে ফেলেছে? ওরা তো দেখছি আমাদের চেয়েও শক্তিশালী। ইবনে আব্বাস বলেন: মুসলমানদের শক্তি যাতে বেশি ক্ষয় না হয় এবং তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সকল চক্করে রমল করতে আদেশ দেননি। বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ।
উপরোক্ত কারণ দূর হয়ে যাওয়ায় উমর রা. এর মনে হয়েছিল যে, এখন রমল ত্যাগ করা যেতে পারে। কেননা আল্লাহ পৃথিবীতে মুসলমানদেরকে বিজয়, স্বাধীনতা ও প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। কিন্তু
পরে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, রসূল সা. এর জীবদ্দশায় যেমন রমল চালু ছিলো এখনও তেমনি থাকুক যাতে পরবর্তী প্রজন্মগুলোর মধ্যে এই প্রেরণা উজ্জীবিত থাকে। মুহিব্বুদ্দীন তাবারি বলেছেন: কোনো বিশেষ কারণে শরীয়তের কোনো বিধান কার্যকর হতে পারে। কিন্তু পরে সেই কারণ দূর হয়ে গেলেও ঐ বিধান বহাল থাকে।
যায়দ বিন আসলাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, উমর রা. বললেন: আজও আমরা রমল করি এবং ঘাড় অনাবৃত করি যখন আল্লাহ ইসলামকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং কুফর ও তার ধারক বাহকদেরকে বিতাড়িত করেছেন? কারণ আমরা রসূল সা. এর আমলে যে কাজ করতাম, তা কখনো ত্যাগ করবোনা।
৪. রুকনে ইয়ামানীকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা তওয়াফের একটি সুন্নত। ইবনে উমর রা. বলেছেন: আমি যে দিন রসূল সা. কে হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীকে স্পর্শ করতে দেখেছি, তারপর থেকে আমি এই দুটিকে স্পর্শ করা ত্যাগ করিনি, সুখে দুঃখে কোনো অবস্থায়ই নয়। বুখারি ও মুসলিম।
তওয়াফকারী এই দুটি রুকনকে স্পর্শ করে এজন্য যে, এ দুটির বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। হাজরে আসওয়াদের দুটো বৈশিষ্ট্য হলো: প্রথমত, এটি ইবরাহিম আ. এর নির্মিত স্থাপনার উপর প্রতিষ্ঠিত। দ্বিতীয়ত এটি তওয়াফের শুরু ও শেষ বিন্দু। এর ঠিক বিপরীতে অবস্থিত রুকনে ইয়ামানীও ইবরাহিম আ. এর ভিত্তির উপর নির্মিত। আবু দাউদ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আয়েশা রা. বলেছেন: হাজরে আসওয়াদের অংশ বিশেষ বাইতুল্লাহর অংশ। ইবনে উমর রা. বললেন: আল্লাহর কসম আমার ধারণা, আয়েশা রা. এ কথাটা রসূল সা.-এর কাছ থেকেই শুনে থাকবেন। আমি মনে করি রসূল সা. এ কারণেই এ দুটি স্পর্শ করা ত্যাগ করেননি। তবে এ দুটো বাইতুল্লাহর ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। আর এজন্যই লোকেরা হাজরে আসওয়াদের পাশ দিয়ে তওয়াফ করে। আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা মুস্তাহাব এবং তওয়াফকারী অন্য দুটি রুকন স্পর্শ করবেনা।
ইবনে হিব্বান বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানী বিপুলভাবে গুনাহ মোচন করে।
তওয়াফের পর দু'রাকাত নামায প্রত্যেক তওয়াফের পর চাই ফরয বা নফল যে রকম তওয়াফই হোক না কেনো মাকামে, ইবরাহিমের কাছে অথবা মসজিদের অন্য যে কোনো স্থানে, দু'রাকাত নামায পড়া সুন্নত। আবু হানিফার মতে এ নামায ওয়াজিব।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. যখন মক্কায় আসলেন, বাইতুল্লায় সাত চক্কর তওয়াফ করলেন এবং মাকামে ইবরাহিমে এসে পড়ছেন তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে নামাযের জায়গারূপে গ্রহণ করো। তারপর মাকামে ইবরাহিমের পেছনে নামায পড়তেন। তারপর হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তা স্পর্শ করতেন। তিরমিযি।
এই নামাযের প্রথম রাকাতে ফাতেহার পর সূরা কাফেরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া সুন্নত। এটা রসূল সা. থেকে প্রমাণিত। মুসলিম
এই দু'রাকাত নামায সবসময় পড়া যায়। এমনকি নিষিদ্ধ সময়েও কেননা জুবায়ের বিন মুতয়িম থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে বনু আবদ মানাফ কাউকে এই ঘর তওয়াফ করতে এবং দিন ও রাতের যে কোনো সময়ে এখানে নামায পড়তে বাধা দিওনা। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি। এটা শাফেয়ী ও আহমদের মাযহাব।
তওয়াফের পরে নামায মসজিদুল হারামে পড়া সুন্নত হলেও তার বাইরে পড়াও জায়েয। বুখারি
উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন উম্মে সালামা উটের পিঠে চড়ে তওয়াফ করেছেন এবং সেখান থেকে বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত নামায পড়েননি। মালেক বর্ণনা করেন যে, উমর রা. এ দু'রাকাত যুতুয়াতে গিয়ে পড়েছেন। বুখারি বলেছেন: উমর রা. হারাম শরিফের বাইরেও নামায পড়েছেন। আর তওয়াফের পর যদি ফরয নামায পড়ে, তা হলে এই দু'রাকাত পড়ার প্রয়োজন নেই। এটা শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত ও আহমদের মত। মালেক ও হানাফীরা বলেছেন: অন্য কোনো নামায এই দু'রাকাতের স্থলাভিষিক্ত হয়না।
মক্কার হারাম শরিফে নামাযের সামনে দিয়ে যাতায়াত: মসজিদুল হারামে মুসল্লী নামায পড়বে আর তার সামনে দিয়ে নারী ও পুরুষ যাতায়াত করবে এটা সম্পূর্ণ জায়েয। এমনকি মাকরূহও নয়। এটা মসজিদুল হারামের বৈশিষ্ট্য। কাছীর বিন কাছীর বিন মুত্তালিব বিন বিদায়া থেকে বর্ণিত: তিনি রসূল সা. কে বনু তাহমের সংলগ্ন এলাকায়, নামায পড়তে দেখেছেন। অথচ লোকজন তার সামনে দিয়ে যাতায়াত করছে এবং তাঁর সামনে কোনো সুতরাও (আড়াল) ছিলনা।
সুফিয়ান বিন উবাইনা বলেছেন: রসূল সা. ও কা'বার মাঝে কোনো সুতরা ছিলোনা। - আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ।
মহিলাদের সাথে পুরুষদের তওয়াফ: বুখারি ইবনে জুরাইজ থেকে বর্ণনা করেন, ইবনে জুরাইজ বলেন: আমাকে আতা জানিয়েছেন যে, ইবনে হিশাম যখন নারীদেরকে পুরুষদের সাথে তওয়াফ করতে নিষেধ করলেন তখন তিনি (আতা) বললেন: আপনি কিভাবে মহিলাদেরকে নিষেধ করছেন? অথচ রসূল সা.-এর স্ত্রীরা পুরুষদের সাথে তওয়াফ করতেন। আমি বললাম: পর্দার আগে না পরে? তিনি বললেন: আমি তাদের পর্দার পরে পেয়েছি। আমি বললাম: নারীরা কিভাবে পুরুষদের সাথে মিশতো?
তিনি বললেন: মহিলারা পুরুষদের সাথে মিশতোনা। আয়েশা রা. পুরুষদের থেকে পৃথকভাবে তওয়াফ করতেন। মিশতেন না তাদের সাথে। জনৈক মহিলা বললেন: হে উম্মুল মুমিনীন, চলুন হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করি। আয়েশা রা. বললেন: তুমি যাও। এই বলে তিনি তার সাথে যেতে অস্বীকার করলেন।
মহিলারা ছদ্মবেশে রাতের বেলা বের হতো এবং পুরুষদের সাথে তওয়াফ করতো। তবে তারা যখন বাইতুল্লায় প্রবেশ করতো, তখন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতো। তারা ঢোকার সাথে সাথে পুরুষদেরকে বের করে দেয়া হতো যেনো মহিলারা নির্জনে ও পুরুষদের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে পারে। কেননা আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: তিনি জনৈকা মহিলাকে উপদেশ দিলেন, হাজরে আসওয়াদে ভিড় করোনা। নির্জন দেখলে স্পর্শ করো। ভিড় দেখলে হাজরে আসওয়াদের বরাবর এসে দূর থেকে আল্লাহু আকবর ও লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো এবং কাউকে কষ্ট দিওনা।
তওয়াফকারীর বাহনে আরোহণ: হেঁটে তওয়াফ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাহনে আরোহণের কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে আরোহণ করা বৈধ। কেননা ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বিদায় হজ্জে একটা উটে আরোহণ করে তওয়াফ করলেন এবং একটা মাথা বাঁকা লাঠি দিয়ে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন। -বুখারি ও মুসলিম। জাবের রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. তাঁর উটনীর পিঠে চড়ে বিদায় হজ্জে বাইতুল্লাহ ও সাফা মারওয়া তওয়াফ করলেন, যাতে জনগণ তাকে দেখতে পায়। তিনি তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাঁরা তাকে প্রয়োজনীয় কথা জিজ্ঞাসা করতে পারে। কেননা লোকেরা তার পাশে ভিড় জমিয়েছিল।
সাধারণ তওয়াফকারীদের সাথে কুষ্ঠ রোগীর তওয়াফ মালেক বর্ণনা করেবেন যে, উমর
ইবনুল খাত্তাব রা. জনৈক কুষ্ঠ রোগিণীকে বাইতুল্লাহর তওয়াফ করতে দেখলেন। দেখে তাকে বললেন: ওহে আল্লাহর বান্দী, মানুষকে কষ্ট দিওনা। তুমি নিজের বাড়িতে বসে থাকলেই ভালো হতো। অতপর মহিলা বাড়ি গিয়ে বসে রইল। পরে এক সময়ে এক ব্যক্তি ঐ মহিলার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। সে মহিলাকে বললো: যে ব্যক্তি তোমাকে নিষেধ করেছিল সে মারা গেছে। এখন বের হও। মহিলা বললো: আমি তাঁর জীবিতাবস্থায় আনুগত্য করবো আর মৃত্যুর পর তাঁর কথা অমান্য করবো এজন্য আমি প্রস্তুত নই।
📄 যমযমের পানি পান করা
তওয়াফকারী যখন তওয়াফ সম্পন্ন করবে এবং মাকামে ইবরাহিমে দু'রাকাত নামায পড়বে, তখন যমযমের পানি পান করা তার জন্য মুস্তাহাব।
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. যমযমের পানি পান করলেন এবং বললেন: এটা বরকতময়, তৃপ্তিদায়ক ও রোগ নিরাময়কারী। জিবরাইল মেরাজের রাতে এই পানি দিয়ে রসূল সা.-এর হৃদয় ধুয়ে দিয়েছিলেন। আর তাবারানি ও ইবনে হিব্বান ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পানি হচ্ছে যমযমের পানি।
যমযমের পানি পান করার সময় রোগ থেকে মুক্তি এবং দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যাণের নিয়ত করা সুন্নত। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে তা সফল হবে। সুয়াইদ বিন সাঈদ বলেছেন: আমি মক্কায় আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে দেখেছি, যমযমের কুয়ার কাছে এলেন। তা থেকে পানি পান করলো, তারপর কিবলামুখি হয়ে বললেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: 'যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে সে উদ্দেশ্য সফল হবে।' আমি এটা কেয়ামতের পিপাসার জন্য পান করছি। তারপর পান করলেন। -আহমদ ও বায়হাকি। আর ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন : যমযমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হবে সে উদ্দেশ্য সফল হবে। তুমি যদি রোগ মুক্তির উদ্দেশ্যে তা পান করো, আল্লাহ তোমাকে রোগমুক্ত করবেন। তৃপ্তি লাভের জন্য যদি পান করো, তবে আল্লাহ তোমাকে পরিতৃপ্ত করবেন। আর যদি তোমার পিপাসা মেটানোর জন্য পান করো তবে আল্লাহ পিপাসা মিটিয়ে দেবেন। এ কৃয়া জিবরাইল খনন করেছেন এবং ইসমাঈলকে পান করানোর জন্য আল্লাহ এর আবির্ভাব ঘাটয়েছেন। -দার কুতনি ও হাকেম। হাকেম একথাও সংযুক্ত করেছেন: তুমি যদি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে এ পানি পান করো, তবে আল্লাহ তোমাকে আশ্রয় দেবেন।"
যমযমের পানি তিন নিঃশ্বাসে পান করা, কিবলামুখি হয়ে পান করা এবং পেট পুরে পান করা, পান করার পর আলহামদুলিল্লাহ বলা ও ইবনে আব্বাসের দোয়া পড়া মুস্তাহাব।
আবু মুলাইকা বলেন: এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের কাছে এলো। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোথা থেকে এলে? সে বললো: যmযমের পানি পান করে এলাম। তিনি বললেন: যেভাবে যমযমের পানি পান করা উচিত, সেভাবে পান করেছ তো? সে বললো কিভাবে? তিনি বললেন: যখন যমযমের পানি পান করতে চাইবে, তখন কিবলামুখি হবে। আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তিন নিঃশ্বাসে পেট ভরে পান করবে। তারপর আল্লাহর প্রশংসা করবে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমাদের ও মুনাফেকদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, তারা যমযম থেকে পেট ভরে পানি পান করেনা।" ইবনে মাজাহ, দার কুতনি আর ইবনে আব্বাস যমযমের পানি পান করার সময় এ দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءٌ مِنْ كُلِّ دَاءٍ .
"হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী তিনি, প্রশস্ত জীবিকা ও সকল রোগ থেকে মুক্তি চাই।"
যমযম কুয়ার ইতিহাস: বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: যখন হাজেরা ও তার ছেলের তীব্র পিপাসা লাগলো এবং হাজেরা মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করলেন। তখন একটা আওয়ায শুনতে পেলেন। তিনি নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেন। চুপ করো এবং পুনরায় সে আওয়াযটা শুনতে চেষ্টা করলেন। তখন আবারো সেই আওয়াযটা শুনতে পেলেন। হাজেরা বললেন: আমি শুনতে পেয়েছি। তোমার কাছে কোনো সাহায্য যদি থেকে থাকে বলো। সহসা যমযমের স্থানে জনৈক ফেরেশতাকে দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা তার পায়ের গোড়ালী দিয়ে অথবা ডানা দিয়ে মাটি খুঁড়লো। অমনি পানি বেরিয়ে এলো। তখন হাজেরা চৌবাচ্চা বানিয়ে পানি জমা করতে এবং হাতের আজলা ভরে তার মশকে পানি ভরতে লাগলেন। যতোই আজলা ভরে পানি নিচ্ছিলেন ততোই পানি উথলে উঠছিল। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইসমাঈলের মাকে আল্লাহ রহম করুন। তিনি যদি যমযমকে ছেড়ে দিতেন, অথবা যদি তা থেকে আজলা ভরে পানি না নিতেন, তাহলে যমযম প্রবহমান ঝর্ণা হতোনা। তারপর হাজেরা নিজে পানি পান করলেন এবং তার ছেলেকে পান করালেন। তারপর ফেরেশতা তাকে বললো তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে এ ভয় পেয়োনা। এখানে আল্লাহর ঘর রয়েছে। এই শিশু ও তার পিতা তাকে পুনঃনির্মাণ করবে। এই ঘরের অধিবাসীদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করবেন না। আল্লাহর ঘর তখন একটা টিলার মতো ছিলো। বন্যার ঢল তার দিকে ধেয়ে আসতো, তারপর তা তার ডান দিকে ও বাম দিকে চলে যেতো।
মুলতাযামের নিকট দোয়া করা মুستাহাব: যমযমের পানি পান করার পর মুলতাযামের নিকট গিয়ে দোয়া করা মুstahab। বায়হাকি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে আব্বাস কাবার দরজা ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে কা'বার সাথে লেগে থাকতেন ও তা জড়িয়ে ধরতেন এবং বলতেন: হাজরে আসওয়াদ ও দরজার মাঝখানে কা'বার প্রাচীর জড়িয়ে ধরে দোয়া করবে। যে ব্যক্তি এই দুটির মাঝখানে জড়িয়ে ধরে আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে। আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেবেন। আমর ইবনে শুয়াইবের দাদা বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা.কে দেখেছি, তাঁর মুখ ও বুক মুলতাযামের সাথে সেঁটে দিতেন।
কেউ কেউ বলেন: হাতীমই মুলতাযাম। বুখারির মতে হাজরে আসওয়াদই হাতীম। এর প্রমাণ হিসেবে মেরাজের হাদিস পেশ করেন যাতে রসূল সা. বলেছেন: আমি যখন হাতীমে ঘুমিয়ে ছিলাম, হয়তোবা বলেছেন: হাজরে আসওয়াদের কাছে ঘুমিয়ে ছিলাম। বুখারি বলেছেন: হাজরে আসওয়াদই হাতীম।
কা'বার অভ্যন্তরে ও হাজারে ইসমাঈলে প্রবেশ করা মুস্তাহাব: বুখারি ও মুসলিম ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: মক্কা বিজয়ের পর রসূলুল্লাহ সা. উসামা ও উসমান বিন তালহা কা'বা শরিফের ভেতরে প্রবেশ করলেন। দরজা বন্ধ করলেন। তারপর যখন দরজা খুললেন, বিলাল আমাকে জানালো যে, রসূলুল্লাহ সা. কা'বার ভেতরে দুই ইয়ামানী স্তম্ভের মাঝে নামায পড়েছেন। আলেমগণ এ থেকে প্রমাণ করলো যে, কা'বার ভেতরে প্রবেশ করা ও নামায পড়া সুন্নত। তবে তারা একথাও বলেছেন যে, এটা সুন্নত হলেও হজ্জের অংশ নয়। কেননা ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: হে জনতা, বাইতুল্লাহর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা তোমাদের হজ্জের অন্তর্ভুক্ত নয়। -হাকেম। আর যে ব্যক্তি কা'বায় প্রবেশ করার সুযোগ পায়না, তার জন্য হাজরে ইসমাঈলে প্রবেশ করা ও সেখানে নামায পড়া মুস্তাহাব। কেননা তার একটা অংশ কা'বা শরিফের অংশ।
📄 সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ
কিভাবে এটি শরিয়তের বিধিবদ্ধ হলো: বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: ইবরাহিম আ. তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য ছেলে ইসমাঈলকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। তারপর উভয়কে বাইতুল্লাহর নিকট যমযমের উপরে একটা বিশাল গাছের নিচে রাখলেন। তখন মক্কায় কোনো মানুষের বসতি ছিলনা এবং পানিও ছিলনা। ইবরাহিম আ. তাদের উভয়ের নিকট খোরমা ভর্তি একটা ব্যাগ এবং পানি ভর্তি একটা মশক রেখে বিদায় হয়ে চলে যেতে লাগলেন। ইসমাঈলের মা তাকে অনুসরণ করে গেলেন এবং বললেন: হে ইবরাহিম, আপনি আমাদেরকে এই জনমানবহীন ও শস্যলতাহীন ভূমিতে রেখে কোথায় চলে যাচ্ছেন? তিনি তাকে কয়েকবার একথা বললেন। কিন্তু ইবরাহিম তাঁর দিকে ভ্রূক্ষেপই করলেন না। তখন হাজেরা বললেন: আল্লাহ কি আপনাকে এরূপ আদেশ দিয়েছেন? ইবরাহিম বললেন: হাঁ। তখন হাজেরা বললেন তাহলে তিনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। অন্য, হাদিসে আছে, হাজেরা বললেন: আমাদেরকে কার কাছে রেখে যাচ্ছেন? ইবরাহিম আ. বললেন: আল্লাহর কাছে। হাজেরা বললেন: আমি সন্তুষ্ট। তারপর হাজেরা ফিরে এলেন।
এরপর ইবরাহিম চলতে লাগলেন। যখন পাহাড়ের রাস্তার কাছে পৌছিলেন যেখানে কেউ তাকে দেখতে পায়না। তখন বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে হাত তুলে এই দোয়া করলেন:
رَبَّنَا إِنِّى أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِي بِوَادٍ غَيْرِ ذِي زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ . رَبَّنَا لِيُقِيمُوا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً من النَّاسِ تَهْوِي إِلَيْهِمْ ، وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُونَ .
“হে প্রতিপালক, আমি আমার বংশধরকে তোমার পবিত্র ঘরের নিকট একটা চাষাবাদহীন উপত্যকায় রেখে এসেছি। হে প্রভু, ওখানে রেখে এসেছি এজন্য যেনো তারা নামায কায়েম করে। সুতরাং মানুষের মন তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে কিছু ফল ও ফসল দাও, যেনো তারা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।"
আর ইসমাঈলের মা গাছটির নিচে বসে রইলেন তার ছেলেটিকে নিজের পাশে রাখলেন এবং তার ছোট পুরানো পানির মশকটি ঝুলিয়ে রাখলেন, যাতে তা থেকে প্রয়োজনের সময় পানি পান করতে পারেন এবং ছেলেকে দুধ খাওয়াতে পারেন। এক সময় মশকের পানি ফুরিয়ে গেলে তার দুধও শুকিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। আর তার ছেলের ক্ষুধা তীব্র হলো। হাজেরা হতবুদ্ধি ও দিশেহারা হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন এবং দূরে সরে যেতে লাগলেন। তার দিকে তাকাতেও তার ভালো লাগছিলনা। তাই ছেলেকে রেখে অন্য কোথাও রওনা হলেন। নিকটতম পাহাড় সাফার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উপত্যকার দিকে দৃষ্টি দিলেন। কোথাও কাউকে দেখা যায় কিনা? না, কাউকেই তিনি দেখতে পেলেন না। এরপর তিনি সাফা থেকে নামলেন। নেমে যখন উপত্যকায় পৌঁছিলেন, তখন তাঁর জামার কোচা টেনে উঁচু করলেন এবং অতিশয় ক্লান্ত ও
বিপর্যস্ত মানুষের মতো হন্যে হয়ে দৌড়াতে শুরু করলেন। দৌড়ে উপত্যকা পার হলেন। পুনরায় মারওয়ায় এলেন। মারওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলেন কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। এভাবে সাতবার সাফা ও মারওয়ায় চক্কর দিলেন। ইবনে আব্বাস বলেছেন: এজন্যই মানুষ এ দুই পাহাড়ের মাঝে চক্কর দিয়ে থাকে।
সাফা ও মারওয়ার মাঝে চক্কর দেয়া সম্পর্কে শরিয়তের বিধান: সাফা ও মারওয়ার মাঝে চক্কর দেয়া সংক্রান্ত শরিয়তের বিধান নিয়ে আলেমদের তিনটে মত পাওয়া যায়।:
১. সাহাবিদের মধ্য থেকে ইবনে উমর, জাবের ও আয়েশা রা. এবং ইমামদের মধ্য থেকে মালেক, শাফেয়ী ও একটি বর্ণনা অনুযায়ী আহমদ বলেছেন, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা হজ্জের একটি রুকন তথা ফরয। কোনো হাজি এটা বাদ দিলে তার হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং কোনো কুরবানি ইত্যাদি দ্বারা এর ক্ষতিপূরণ হবেনা। তাদের এ মতের পক্ষে নিম্নোক্ত প্রমাণাদি পেশ করেছেন:
বুখারি যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন: উরওয়া আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এ আয়াত নিয়ে ভেবে দেখেছেন কি?
إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ فَمَنْ حَجَّ الْبَيْتَ أَوِ اعْتَمَرَ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَطَّوَّفَ بِهِمَا .
"নিশ্চয় সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম। তাই যে ব্যক্তি হজ্জ বা ওমরা করবে, সে এই দুটির তওয়াফ করলে আপত্তি নেই।" আল্লাহর কসম, এ থেকে তো বুঝা যায়, সাফা ও মারওয়ায় তওয়াফ না করলেও আপত্তি নেই। আয়েশা রা. বললেন: হে আমার ভাইপো, তুমি ভুল বললে। তুমি এ আয়াতের যেভাবে ব্যাখ্যা করলে, তাতে তো এটাই দাঁড়ায় যে, তওয়াফ না করলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু এ আয়াত আনসারদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। তারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মানাত দেবীর পূজা করতো এবং তার নামে তালবিয়া পড়তো। ইসলাম গ্রহণের পর সেই তালবিয়া পাঠকারীরা সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করতে সংকোচ বোধ করতো। ইসলাম গ্রহণের পর তারা রসূলুল্লাহ সা.কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমরা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ (সাঈ) করতে সংকোচ বোধ করতাম। তখন আল্লাহ নাযিল করলেন: সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম ....................
আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে তওয়াফ চালু করেছেন। কাজেই সাফা ও মারওয়ার মাঝের তওয়াফ (সাঙ্গ) বর্জন করার অধিকার কারোর নেই।
মুসলিম আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানরা সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করেছেন। তাই এটা সুন্নতে পরিণত হয়েছে। যে ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করবেনা, আল্লাহ তার হজ্জ পূর্ণ করবেন না।
বনু আবদুদ্ দারের জনৈক মহিলা হাবিবা বলেছেন: একদল কুরাইশী মহিলার সাথে আবু হুসাইনের বাড়িতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, রসূলুল্লাহ সা. সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করছেন। তার দৌড়াদৌড়ির প্রচণ্ডতায় তার লুংগি তার কোমরে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আমি তা দেখে বললাম: আমি রসূলুল্লাহর সা. হাঁটু দেখতে পাচ্ছি। তাকে বলতে শুনলাম: "তোমরা সাঈ করো। কেননা আল্লাহ তোমাদের জন্য সাঈ বাধ্যতামূলক করেছেন। ইবনে মাজাহ, আহমদ, শাফেয়ী।
আর যেহেতু সাঈ হজ্জ ও ওমরা উভয়টিতেই ইবাদত হিসেবে অংগীভূত, তাই বাইতুল্লাহর তওয়াফের মতো এটিও হজ্জ ও ওমরা উভয়ের রুকন তথা অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অপরিহার্য কর্তব্য বা ফরয।
২. পক্ষান্তরে ইবনে আব্বাস, আনাস, ইবনে যুবায়ের, ইবনে সিরীন ও একটি বর্ণনা অনুযায়ী আহমদের মত হলো, এটি সুন্নত। আর সুন্নত হওয়ার কারণে এটি তরক করলে কোনো ফিদিয়া বা কাফফারা দেয়া ওয়াজিব হয়না।
এই মতের প্রবক্তাদের প্রমাণ কুরআনের উল্লিখিত উক্তি: "সাফা ও মারওয়ার মাঝে তওয়াফ করলে কোনো আপত্তি নেই।" কোনো কাজের কর্তাকে একথা বলা যে, “এই কাজ করলে আপত্তি নেই" স্বতই প্রমাণ করে যে, ঐ কাজ ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক নয়। সুতরাং এ দ্বারা কাজটি 'মুবাহ' অর্থাৎ করা ও বর্জন করা সমান। করলেও গুনাহ নেই, না করলেও গুনাহ নেই। তবে 'সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন' এই উক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাজটি সুন্নত। যেহেতু এটা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক ইবাদত, যা বাইতুল্লাহর সাথে সংশ্লিষ্ট নয়, তাই কংকর নিক্ষেপের ন্যায় রুকনে পরিণত হয়নি।
৩. আবু হানিফা, ছাওরী ও হাসানের মতে এটি ওয়াজিব, রুকন বা ফরয নয়। এটি তরক করলে হজ্জ বা ওমরা বাতিল হবেনা। তবে তরক করলে দম দিতে অর্থাৎ একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে। আল মুগনীর প্রণেতা এই মতকে অগ্রগণ্য মনে করেছেন। তিনি বলেছেন: এটা অগ্রগণ্য। কেননা যিনি এটিকে ওয়াজিব বলে রায় দিয়েছেন, তার প্রদর্শিত প্রমাণ থেকে সাব্যস্ত হয় যে, এটা শর্তমুক্ত ওয়াজিব। এমন ওয়াজিব নয় যে, এটি বাদ দিলে মূল দায়িত্ব পালিতই হবেনা।
আয়েশা রা. যে বক্তব্য দিয়েছেন অন্যান্য সাহাবির বক্তব্যে তার বিরোধিতা করা হয়েছে। বনু আবদুদ দারের মহিলা হাবিবার হাদিসটি যদিও বিতর্কিত, তথাপি তা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এটি বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব।
সাফা ও মারওয়া সংক্রান্ত আয়াতটি কিছু লোকের সাঈ সংক্রান্ত সংকোচ দূর করার জন্য এসেছে। কেননা তারা জাহেলি যুগে সাফা ও মারওয়ায় রক্ষিত দুটো মূর্তির পূজার খাতিরে ঐ দুই পাহাড়ের মাঝে সাঈ করতো। তাই ওখানে সাঈ করলে গুনাহ হবে কিনা ভেবে তারা শংকিত ছিলো।
সাঈর শর্তাবলি: সাঈর বিশুদ্ধতার জন্য কয়েকটি শর্ত পালন করা জরুরি: ১. সাঈ সবসময় তওয়াফের পরে হওয়া চাই। ২. সাঈ সাত চক্কর পূর্ণ করা চাই। ৩. সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় প্রতিটি চক্কর শেষ করা চাই। ৪. সাঈ সবসময় সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী পথে করা চাই। কেননা রসূলুল্লাহ সা. এরূপ করেছেন এবং বলেছেন: "তোমরা তোমাদের ইবাদতগুলো আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো।" সুতরাং কেউ তওয়াফের আগে সাঈ করলে কিংবা মারওয়া থেকে সাঈ শুরু করে সাফায় শেষ করলে অথবা সাফা ও মারওয়ার মাঝখানের নির্ধারিত পথ ছাড়া অন্যত্র সাঈ করলে সাঈ শুদ্ধ হবেনা। (হানাফী মযহাব অনুযায়ী ৩ ও ৪ নং কাজ দুটি শর্ত নয়, বরং ওয়াজিব। কেউ তওয়াফের আগে সাঈ করলে অথবা মারওয়া থেকে চক্কর শুরু করে সাফায় শেষ করলে সাঈ বাতিল হবেনা। তবে দম দিতে হবে।)
সাফায় আরোহণ: সাঈর বিশুদ্ধতার জন্য সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করা শর্ত নয়। তবে উভয় পাহাড়কে সাঈর আওতাভুক্ত করা ওয়াজিব। তাই যাওয়া ও আসার সময় উভয় পাহাড়ে লাগাতে হবে। কোনো অংশ সাঈর আওতাভুক্ত করতে ব্যর্থ হলে সাঈ বিশুদ্ধ হবেনা, যতক্ষণ না তা এর আওতায় আসবে।
সাঈর চক্করগুলো এক নাগাড়ে করা: সাঈর চক্করগুলো ক্রমাগতভাবে ও এক নাগাড়ে করা শর্ত নয়। (তবে ইমাম মালেকের মতে চক্করগুলোর মাঝে বেশি বিরতি না দিয়ে এক নাগাড়ে
করা শর্ত।) এমন কোনো সমস্যা যদি দেখা দেয় যা এক নাগাড়ে সাঈ করার পথে বাধার সৃষ্টি হয়, অথবা নামায শুরু হয়ে যায়, তাহলে সেই কারণে সাঈতে বিরতি দেয়া জায়েয হবে। যখন বাধা দূর হবে, তখন যে কয় চক্কর সম্পন্ন হয়েছে, তার সাথে অবশিষ্ট চক্করগুলো যুক্ত করে সাঈ পূর্ণ করবে। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: তিনি সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করছিলেন। সহসা তার পেশাবের প্রয়োজন দেখা দিলো। তিনি এক পাশে সরে গিয়ে পানি চাইলেন, ওযু করলেন, তারপর অবশিষ্ট চক্করগুলো সম্পন্ন করলেন। -সাঈদ বিন মনসূর।
অনুরূপ, তওয়াফ ও সাঈর মাঝেও বিরতিহীন ধারাবাহিকতা রক্ষা করা শর্ত নয়। আল মুগনিতে বলা হয়েছে: ইমাম আহমদ বলেছেন: তওয়াফের পর বিশ্রাম করা পর্যন্ত কিংবা বিকাল পর্যন্ত সাঈ বিলম্বিত করাতে কোনো ক্ষতি নেই। আতা ও হাসান মনে করতেন : যে ব্যক্তি দিনের প্রথম ভাগে বাইতুল্লাহর তওয়াফ করেছে, সে সাফা ও মারওয়ার সাঈকে বিকাল পর্যন্ত বিলম্বিত করতে চাইলে করতে পারে। সাঈদ ও কাসেম এরূপ করেছেন। কেননা সাঈর চক্করগুলোর যখন বিরতিহীন ধারাবাহিকতা রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা নেই, তখন সাঈ ও তওয়াফের মাঝে এর বাধ্যবাধকতা না থাকা অধিকতর বাঞ্ছনীয়। সাঈদ বিন মানসূর বর্ণনা করেছেন, উরওয়া বিন যুবাইরের স্ত্রী সওদা সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করেন। তারপর তিন দিনের মধ্যে তিনি তার তওয়াফ কাযা করেন। কারণ তিনি খুবই বিশালদেহী ছিলেন।
সাঈর জন্য পবিত্রতা : অধিকাংশ আলেম বলেন: সাফা ও মারওয়ার সাঈর জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। কেননা রসূলুল্লাহ সা. ঋতুবতী আয়েশা রা.কে বলেছিলেন: অন্যান্য হাজী যা যা করে, তুমি তার সবই করতে পারো। কেবল বাইতুল্লাহর তওয়াফ গোসল না করা পর্যন্ত করবেনা। -মুসলিম। আর আয়েশা রা. ও উম্মে সালমা রা. বলেছেন: নারী যখন বাইতুল্লাহর তওয়াফ ও তওয়াফের পর দু'রাকাত নামায আদায় সম্পন্ন করে এবং তারপর ঋতুবতী হয়। তখন তার সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ সম্পন্ন করা উচিত। সাঈদ বিন মানসুর। তবে সকল ইবাদতেই পবিত্রাবস্থা বজায় রাখা মুস্তাহাব। কেননা পবিত্রতা শরিয়তে খুবই কাঙ্ক্ষিত বিষয়।
সাঈতে হেঁটে চলা ও বাহনে চলা : সাঈ হেঁটেও করা যাবে, বাহনে চড়েও করা যাবে। তবে হেঁটে করা উত্তম। ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিস থেকে জানা যায় যে, তিনি হেঁটে সাঈ করতেন। তারপর যখন মানুষের ভিড় বেড়ে গেলো, তখন বাহনে আরোহণ করে করতে শুরু করলেন, যাতে লোকেরা তাকে দেখতে পায় এবং জিজ্ঞাসা করতে পারে। আবুত তুফাইল ইবনে আব্বাস রা.কে বললেন: আমাকে বলুন, বাহনে আরোহণ করে সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ (সাঈ) করা সুন্নত কি? কেননা আপনার জনগণ এটাকে সুন্নত দাবি করে।
ইবনে আব্বাস রা. বললেন : তাদের দাবি সত্যও, মিথ্যাও। আবুত তুফাইল বললেন : এ কী বলছেন: সত্যও, মিথ্যাও? ইবনে আব্বাস বললেন : রসূলুল্লাহ সা. এর ওপর মানুষের ভিড় বেড়ে গিয়েছিল। লোকেরা এসে বলতো, এই যে মুহাম্মদ, এই যে মুহাম্মদ। এমনকি যুবতী মেয়েরাও ঘর থেকে বেরিয়ে যেতো। রসূলুল্লাহ সা. তাঁর সামেন ভিড় করা লোকজনেক ধাক্কা দিয়ে হটিয়ে দিতেননা। যখন ভিড় বেড়ে গেলো, তখন বাহনে আরোহণ করলেন। হেঁটে চলা ও দৌড়ে চলা উত্তম। (সমতল ভূমিতে দুই খুঁটির মাঝখানে দৌড়াবে, আর অবশিষ্ট জায়গায় হেঁটে চলবে।) সাঈতে বাহনে আরোহণ বৈধ হলেও মাকরূহ। তিরমিযি বলেছেন: আলেমদের একটি দল বাইতুল্লাহ ও সাফা মারওয়ায় বিনা ওযরে বাহনে আরোহণ করে তওয়াফ করা অপছন্দ করেছেন। এটা ইমাম শাফেয়ীরও মত। মালেকীদের মতে, যে ব্যক্তি বিনা ওযরে বাহনে আরোহণ করে সাঈ করে, সময় থাকলে তার পুনরায় সাঈ করা জরুরি। সময় না থাকলে তাকে দম দিতে হবে। কেননা হেঁটে চলতে সক্ষম ব্যক্তির হেঁটে সাঈ করা তাদের
নিকট ওয়াজিব। আবু হানিফাও এই মতের প্রতিনিধিত্ব করে বলেন: রসূলুল্লাহ সা. এর বাহনে আরোহণের কারণ ছিলো তাঁর পাশে জনগণের অতিমাত্রায় ভিড় করা ও ঘিরে ধরা। এটা একটা ওযর। এজন্য আরোহণ করা বৈধ।
চিহ্নিত দুটো খুঁটির মাঝে দৌঁড়ানো মুস্তাহাব দুই চিহ্নিত খুঁটির মাঝে ছাড়া সাফা ও মারওয়ার সাঈ হেঁটে করা মুস্তাহাব। দুই খুঁটির মাঝে রমল করা মুستাহাব। ইতিপূর্বে হাবিবার হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে: "রসূলুল্লাহ সা. এতো জোরে দৌড়াতেন যে, তাঁর পরনের লুংগি প্রবল ঘুরপাক খাচ্ছিলো।"
তবে জোরে দৌড়ানো ছড়া সাঈ বা তওয়াফ করলে তা শুদ্ধ হবে। সাঈদ বিন জুবাইর রা. বলেন: আমি ইবনে উমরকে সাফা ও মারওয়ার মাঝে ধীরে হাঁটতে দেখেছি। তারপর তিনি বললেন: “যদি ধীর স্থিরভাবে হেঁটে থাকি, তাহলে তা জায়েয হবে। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সা.কে ধীরে হাঁটতে দেখেছি। আর যদি দ্রুত দৌড়ে থাকি তবে রসূলুল্লাহ সা.কে আমি দ্রুত দৌড়াতেও দেখেছি। আমি তো অতিশয় বৃদ্ধ মানুষ।" আবু দাউদ, তিরমিযি।
একমাত্র পুরুষদের জন্যই এটা মুস্তাহাব। মহিলাদের জন্য দ্রুত চলা নয় বরং স্বাভাবিক গতিতে চলা মুস্তাহাব।
শাফেয়ী আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: কিছু মহিলাকে দ্রুত চলতে দেখে আয়েশা রা. বললেন: তোমাদের মহিলাদের জন্য কি আমাদের নিকট কোনো আদর্শ নেই? তোমাদের জন্য জোরে জোরে চলা জরুরি নয়।
কা'বার দিকে মুখ করে সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ ও দোয়া করা: সাফা ও মারওয়ায় আরোহণ করা ও কেবলামুখি হয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা মুস্তাহাব। রসূলুল্লাহ সা. এর সম্পর্কে বর্ণিত: তিনি সাফার দরজার দিক থেকে বের হলেন, তারপর সাফার কাছাকাছি পৌঁছেই সাফা ও মারওয়া সংক্রান্ত আয়াত পাঠ করলেন: "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন।" তারপর বললেন: আল্লাহ যেভাবে শুরু করেছেন, আমি সেভাবে শুরু করবো। তারপর সাফা দিয়ে শুরু করলেন এবং সাফার উপরে আরোহণ করলেন। আরোহণ করে যখন বাইতুল্লাহকে দেখতে পেলেন তখন কেবলামুখি হয়ে তিনবার করে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ বললেন। তারপর বললেন :
لا إله إلا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
তারপর এর মাঝে দোয়া করলেন এবং তিনবার এই দোয়া পড়লেন। তারপর নেমে এসে মারওয়ার দিকে গেলেন। তার উপর আরোহণ করলেন। বাইতুল্লাহর দিকে দৃষ্টি দিলেন। এভাবে সাফায় যা যা করেছিলেন, মারওয়ায়ও তা তা করলেন।
নাফে বলেছেন: আবদুল্লাহ ইবনে উমরকে সাফায় থাকা অবস্থায় এরূপ দোয়া করতে শুনেছি:
اللهُمَّ إِنَّكَ قُلْتَ : ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ وَإِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ، وَإِنِّي أَسْأَلُكَ - كَمَا هَدَيْتَنِي لِلْإِسْلَامِ - أَنْ لَا تَنْزِعَهُ مِنِّي حَتَّى تَتَوَفَّانِي وَأَنَا مُسْلِمٌ .
"হে আল্লাহ, তুমি বলেছো, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেবো। তুমি তো ওয়াদা ভংগ করোনা। আমি তোমার কাছে চাই, আমাকে যেমন ইসলামে দিক্ষিত করেছো তেমনি মৃত্যু পর্যন্ত আমার কাছ থেকে ইসলামকে ছিনিয়ে নিওনা।"
সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে যে দোয়া করা মুস্তাহাব: সাফা ও মারওয়ার মাঝে দোয়া করা, আল্লাহকে স্মরণ করা ও কুরআন তেলাওয়াত করা মুস্তাহাব। বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ সা. তার সাঈ চলাকালে এই দোয়া করতেন : رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَاهْدِنِي السَّبِيلَ الأقوم "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো ও দয়া করো এবং আমাকে সর্বাপেক্ষা সঠিক পথে চালাও।" এই দোয়াও বর্ণিত হয়েছে : رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَرِ إِنَّكَ الْأَعَز الأكرم "হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করো ও দয়া করো। তুমি পরম সম্মানিত ও মহৎ।"
তওয়াফ ও সাঈর মাধ্যমে হজ্জ ও ওমরার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়। ইহরামকারী যদি তামাত্তু হজ্জকারী হয়, তবে সে এরপর চুল কামিয়ে বা ছেঁটে ইহরামমুক্ত হবে। আর কিরান হজ্জকারী হলে তার ইহরাম ১০ই জিলহজ্জ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কিরানকারী এই সাঈ করলে তার আর ফরয তওয়াফের পর সাঈ করতে হবেনা। তামাত্তুকারী হলে ফরয তওয়াফের পর পুনরায় সাঈ করবে এবং সে ৮ই জিলহজ্জ পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করবে।