📄 মদিনার হারাম শরিফ
মক্কার হারাম শরিফে শিকার ও গাছপালা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি মদিনার শিকার ও গাছপালা নিষিদ্ধ।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইবরাহিম আ. মক্কাকে নিষিদ্ধ ও নিরাপদ নগরীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর আমি মদিনাকে নিষিদ্ধ ও নিরাপদ নগরীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি এর দুটো পাথুরে ভূমির মাঝখানে। এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা হবেনা এবং কোনো প্রাণী শিকার করা হবেনা। মুসলিম।
আর আহমদ ও আবু দাউদ আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন : রসূল সা. মদিনা সম্পর্কে বলেছেন: কেউ এর গাছ কাটবেনা, কেউ এর শিকার তাড়াবেনা, এখানে পাওয়া কোনো হারানো জিনিস কুড়াবেনা, কেবল যে ব্যক্তি তা ঘোষণা করবে সে ব্যতিত। কোনো ব্যক্তি লড়াইর জন্য এখানে অস্ত্র বহন করবেনা, এখানে কেউ কোনো গাছ কাটবেনা কেবল যে ব্যক্তি তার উটকে খাওয়াতে চায় সে ব্যতিত। "বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেন: "ঈর পাহাড় থেকে দূর পাহাড় পর্যন্ত মদিনা একটি সম্মানিত নগরী।" আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: মদিনার দুই পাথুরে ভূখণ্ডের মাঝে রসূল সা. মদিনাকে সম্মানিত করেছেন এবং মদিনার চার পাশে বারো মাইল এলাকাকে সুরক্ষিত এলাকা বানিয়েছেন। দুই পাথুরে ভূখণ্ড পূর্ব দিকের পাথুরে ভূখণ্ড ও পশ্চিম দিকের পাথুরে ভূখণ্ডের মাঝে মদিনার হারাম শরিফের আয়তন বারো মাইল বলে ধারণা করা হয় যা ঈর থেকে ছুর পর্যন্ত বিস্তৃত। ঈর হলো মীকাতের নিকটবর্তী একটি পাহাড় আর ছুর উত্তর দিকে ওহদের পার্শ্ববর্তী পাহাড়।
রসূলুল্লাহ সা. মদিনাবাসীকে কৃষি সরঞ্জমাদি, বাহনের সরঞ্জমাদি, ইত্যাকার অপরিহার্য জিনিসপত্র তৈরি করার জন্য গাছ গাছালি কাটার অনুমতি দিয়েছেন। তাদের পশুদের খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস কাটারও অনুমতি দিয়েছেন।
আহমদ জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মদিনা তার দুই পাথরে ভূখণ্ডের মাঝে নিষিদ্ধ নগরী, এর সম্পূর্ণটাই সুরক্ষিত পশুকে খাওয়ানোর জন্য ব্যতিত এর কোনো গাছ কাটা যাবেনা।"
মক্কার হারাম শরিফের অবস্থা এর বিপরীত। কেননা মক্কাবাসী তাদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসে স্বয়ং সম্পূর্ণ। কিন্তু মদিনাবাসী তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়। মদিনার হারাম শরিফের শিকার হত্যায় ও গাছ কাটায় কোনো বিনিময় দিতে হয়না। কিন্তু গুনাহ হয়।
বুখারিতে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: মদিনা এখান থেকে ওখান পর্যন্ত সুরক্ষিত সম্মানিত নগরী। এর কোনো গাছ কাটা হবেনা। এখানে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব ঘটানো হবেনা। যে ব্যক্তি এখানে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব ঘটাবে, তার ওপর আল্লাহর ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। যে ব্যক্তি মদিনার কোনো গাছ কর্তিত দেখতে পায়, তার জন্য কর্তিত অংশ নেয়া বৈধ। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত: তিনি আকীকে তার বাসভবনে গেলেন। সেখানে একটা ক্রীতদাসকে দেখলেন একটা গাছ কাটছে বা লাঠি দ্বারা গাছের পাতা পাড়ছে। তিনি তার কাছ থেকে তা কেড়ে নিলেন। পরে দাসটির আপন জনেরা এসে সা'দকে অনুরোধ করলো দাসটির কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জিনিস ফেরত দিতে। সা'দ বললেন: আল্লাহর রসূল সা. যা আমাকে দান করেছেন, তা আমি কখনো দেবোনা। আল্লাহর কাছে এ থেকে আশ্রয় চাই। শেষ পর্যন্ত তিনি তা ফেরত দিলেন না। মুসলিম আবু দাউদ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূল সা. বলেছেন: মদিনার হারাম শরিফে তোমরা যাকে শিকার করতে দেখবে। তার কাছ থেকে তোমরা তা কেড়ে নিতে পারো।
আর কোনো নিরাপদ হারাম আছে কি?
ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: মক্কা ও মদিনার এই দুই হারাম ব্যতিত সারা পৃথিবীতে আর কোনো হারাম শরিফ নেই। বাইতুল মাকদাস বা অন্য কোনো স্থান হারাম নয়। মক্কা ও মদিনা ব্যতিত পৃথিবীর আর কোনো স্থান হারাম নামে আখ্যায়িতও নয়। অজ্ঞ লোকেরা যদিও বাইতুল মাকদাসকে হারামুল মাকদাস এবং খলীল নগরীকে হারামুল খলীল নামে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এ দুটি বা অন্য কোনো স্থান মুসলমানদের সর্বসম্মত মত অনুসারে হারাম তথা নিরাপদ স্থান নয়। সর্বসম্মত হারাম হচ্ছে মক্কার হারাম শরিফ। অধিকাংশ আলেমের নিকট মদিনাও হারাম এবং এর পক্ষে রসূল সা. থেকে প্রচুর হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তায়েফের 'উজা' (وجاء) হচ্ছে একমাত্র তৃতীয় স্থান, যার হারাম হওয়া মুসলমানদের মধ্যে বিতর্কিত। শাফেয়ী ও শওকানিসহ কেউ কেউ এটিকে হারাম মনে করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেম ইমাম ও মনীষী একে হারাম মনে করেন না।
📄 মদিনার উপর মক্কার শ্রেষ্ঠত্ব
অধিকাংশ আলেমের মতে মক্কা মদিনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আহমদ, ইবনে মাজাহ ও তিরমিযি আব্দুল্লাহ বিন আদী থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. মক্কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন : আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম ভূখণ্ড এবং আল্লাহর নিকট প্রিয়তম ভূখণ্ড। আমাকে যদি তোমা থেকে বহিষ্কৃত করা না হতো, তবে আমি বের হতামনা।" তিরমিযি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. মক্কাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন: আমার নিকট তোমার চেয়ে ভালো ও প্রিয় নগরী আর নেই। আমার জাতি যদি আমাকে তোমা থেকে বের করে না দিতো, তবে আমি তোমার যমীনে ব্যতীত আর কোথাও বসবাস করতামনা।"
📄 ইহরাম ব্যতিত মক্কায় প্রবেশ
যে ব্যক্তি হজ্জ বা ওমরা করতে ইচ্ছুক নয়, তার জন্য ইহরাম ব্যতিত মক্কায় প্রবেশ বৈধ চাই তার প্রবেশ এমন কোনো প্রয়োজনে হোক, যা ঘন ঘন দেখা দেয়, যেমন কাঠ ঘাস ও পানির সরবরাহকারী ও সংগ্রহকারী শিকারী ইত্যাদি অথবা ঘন ঘন দেখা দেয়না, যেমন ব্যবসায়ী পর্যটক ইত্যাদি এবং চাই সে নিরাপদ ব্যক্তি হোক অথবা আতংকগ্রস্ত হোক। ইমাম শাফেয়ীর দুটি মতের মধ্যে এটি বিশুদ্ধতর মত। তার শিষ্য্যরা এই মত অনুসারেই ফতোয়া দিয়ে থাকেন। মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, রসূলুল্লাহ সা. কালো পাগড়ি মাথায় দিয়ে বিনা ইহরামে মক্কায় প্রবেশ করেছেন। ইবনে উমর রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি কোনো এক সফর থেকে ফিরে বিনা ইহরামে মক্কায় প্রবেশ করেছেন।
ইবনে শিহাব বলেছেন: বিনা ইহরামে মক্কায় প্রবেশে কোনো বাধা নেই। ইবনে হাযম বলেছেন: বিনা ইহরামে মক্কায় প্রবেশ বৈধ। কেননা রসূল সা. শুধুমাত্র হজ্জ ও ওমরা পালনে ইচ্ছুক ব্যক্তির জন্য মীকাত নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি হজ্জ বা ওমরা পালনে ইচ্ছুক নয়, তার জন্য মীকাত নির্ধারণ করেননি। আল্লাহ ও তার রসূল সা. কোথাও এ মর্মে আদেশ দেননি যে, মক্কায় বিনা ইহরামে প্রবেশ করা যাবেনা। সবার জন্য ইহরাম বাধ্যতামূলক করা হলে তা হবে শরিয়ত বহির্ভূত একটা বিধি।
📄 মক্কা শরিফ ও মসজিদুল হারামে প্রবেশের জন্য যা করা মুস্তাহাব
মক্কায় প্রবেশের জন্য নিম্নোক্ত কাজগুলো করা মুস্তাহাব :
১. গোসল করা। বর্ণিত আছে, ইবনে উমর রা. মক্কায় প্রবেশের জন্য গোসল করতেন। ২. আয যাহের অঞ্চলের যীতুয়াতে রাত যাপন। কেননা রসূলুল্লাহ সা. সেখানে রাত্র যাপন করছেন। নাফে বলেছেন: ইবনে উমরও এরূপ করতেন। -বুখারি ও মুসলিম।
৩. সর্বোচ্চ গিরিপথ ছানিয়া কিদা দিয়ে প্রবেশ করা। রসূলুল্লাহ সা. মুয়াল্লার দিক দিয়ে প্রবেশ করেছেন। যার পক্ষে এটা সহজ সাধ্য হয়, সে এই পথ দিয়ে প্রবেশ করবে। নচেত যেদিক দিয়ে প্রবেশ করা তার পক্ষে সম্ভব সেদিক দিয়ে প্রবেশ করবে। এতে কোনো বাধা নেই।
৪. কোনো নিরাপদ জায়গায় জিনিসপত্র রেখে আল্লাহর ঘরে যাওয়া এবং বনু শায়বার প্রবেশ দ্বার বাবুস সালাম দিয়ে প্রবেশ করা এবং একাগ্রতা ও কাকুতি মিনতি সহকারে বলা: أَعُوذُ بِاللَّهِ الْعَظِيمِ، وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيمِ، وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيمِ، مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَسَلَّمَ.
"মহামহিম আল্লাহর নিকট তারা মহিমান্বিত সত্তার নিকট তার অনাদি ও অনন্ত পরাক্রমের নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ মুহাম্মদের উপর ও তাঁর বংশধর ও অনুসারিদের ওপর রহমত ও সালাম পাঠাও। হে আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করো এবং আমার জন্য তোমার রহমতের দুয়ার খুলে দাও।"
৫. আল্লাহর ঘরের ওপর দৃষ্টি পড়া মাত্রই হাত উঁচু করে বলবে: اللَّهُمَّ زِدْ هُذَا الْبَيْتَ تَشْرِيفًا، وَتَعْظِيمًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةٌ، وَزِدْ مَنْ شَرَّفَهُ وَكَرَمَهُ مِمَّنْ حَجَّهُ، أَوْ اعْتَمَرَهُ وَتَشْرِيفًا وَتَكْرِيمًا وَتَعْظِيمًا وَبِرًا .
"হে আল্লাহ, এই ঘরের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করো, এ ঘরের প্রতাপ বৃদ্ধি করো, যে সকল হাজি ও ওমরাকারী এ ঘরকে সম্মান করবে তাদেরও সম্মান ও নেক আমল বৃদ্ধি করো।" -শাফেয়ী কর্তৃক বর্ণিত। তারপর বলবে: اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ، وَمِنْكَ السَّلَامُ، فَحَيِّنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ
"হে আল্লাহ, তুমি শান্তি, তোমার কাছ থেকেই শান্তি আসে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে শান্তিতে জীবন যাপন করাও।"
৬. এরপর হাজরে আসওয়াদের কাছে যাবে এবং তাকে বিনা শব্দে চুমু দেবে। চুমু দিতে না পারলে হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করবে ও হাতকে চুমু দেবে। তাও করতে না পারলে হাজরে আসওয়াদের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করবে।
৭. তারপর হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে তওয়াফ শুরু করবে।
৮. তাহিয়াতুল মসজিদ নামায পড়বেনা। কেননা এখানে তওয়াফই তাহিয়াতুল মসজিদ (মসজিদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ও অভিবাদন)। তবে ফরয নামায শুরু হয়ে গেলে বা আসন্ন হলে ইমামের সাথে তা পড়বে। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যখন জামাতে নামায শুরু হয় তখন ফরয ব্যতিত আর কোনো নামায নেই।" অনুরূপ যদি আশংকা হয় নামাযের ওয়াক্ত চলে যাবে তা হলে আগে ফরয নামায পড়ে নেবে তারপর তওয়াফ করবে।