📄 মুহরিমের জন্যে যা যা নিষিদ্ধ
৮. মুহরিমের জন্যে যা যা নিষিদ্ধ
শরিয়ত মুহরিম বা ইহরামকারীর জন্য কিছু কাজ নিষিদ্ধ ও হারাম করেছে। সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করছি:
১. স্ত্রী সহবাস এবং স্ত্রী সহবাসের প্ররোচনা ও কামোত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন যাবতীয় কাজ যেমন চুম্বন, যৌন আবেগ সহকারে স্পর্শ করা এবং পুরুষ কর্তৃক স্ত্রীকে সহবাস সম্পর্কীয় কথাবার্তা বলা।
২. মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে ঠেলে দেয় এমন যে কোনো গুনাহর কাজ করা।
৩. সফর সংগী, চাকর বাকর ইত্যাদির সাথে ঝগড়া করা ও কটু বাক্য উমরণ করা। কেননা আল্লাহ বলেছেন: فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الحَجِّ فَلاَرَفَتْ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ .
যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করবে, সে যেন কোনো অশ্লীল কথা বা কাজ, গুনাহর কাজ ও ঝগড়া ঝাটি হজ্জের মধ্যে না করে। (ঝগড়া ঝাটি দ্বারা অন্যায় ঝগড়া বুঝানো হয়েছে। সত্য ও ন্যায়ের স্বার্থে বিতর্ক করা মুস্তাহাব বা ওয়াজিব।)
বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি এমনভাবে হজ্জ করলো যে, তার মাঝে কোনো অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কাজ করলোনা, সে যখন বাড়িতে ফিরবে তখন সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো হয়ে বাড়িতে ফিরবে (অর্থাৎ নিষ্পাপ অবস্থা)।"
৪. যে কোনো সেলাই করা পোশাক পরা। যেমন জামা, পাজামা, টুপি ইত্যাদি। অনুরূপ শান শওকতের রংগীন পোশাক জুতা ও মোজা পরা।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী জামা, পাগড়ি, টুপি, সুগন্ধি মাখানো কাপড় ও মোজা পরবেনা। তবে যার জুতা নেই, সে মোজার পায়ের গিরে পর্যন্ত অংশ কেটে ফেলে দিয়ে মোজা পরতে পারে। যাতে মোজা গিরের নিচে থাকে। বুখারি ও মুসলিম।
আলেমগণ একমত যে, এই বিধি শুধু পুরুষদের বেলায় প্রযোজ্য। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই বিধি প্রযোজ্য নয়। তারা এসব পোশাক পরতে পারে। কেবল সুগন্ধি মাখানো কাপড়, নিকাব ও হাত মোজা পরতে পারবেনা। কেননা ইবনে উমর রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. মহিলাদেরকে ইহরাম অবস্থায় হাত মোজা, নিকাব ও সুগন্ধি মাখানো কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। তারপর হলুদসহ যে কোনো রং এর কাপড়, রেশম গহনা, জামা, পাজামা, বা মোজা পরতে পারে। আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।
বুখারি জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন! রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী নারী নিকাব পরবেনা ও হাত মোজা পরবেনা।
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত, নারীর ইহরাম তার চেহারায় ও হাতের তালুতে। আলেমগণ বলেছেন কোনো জিনিস দিয়ে যদি মুখ ঢেকে রাখে, তবে তাতে ক্ষতি নেই। ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, মুখ খোলার শর্ত আরোপ করা দুর্বল ও ভিত্তিহীন। ছাতা ইত্যাদি দিয়ে পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুখ আড়াল করা বৈধ। তবে ফেতনার (গুনাহর প্ররোচনা) আশংকা থাকলে মুখমণ্ডলকে দৃষ্টির আড়াল করা ওয়াজিব।
আয়েশা রা. বলেছেন: আমরা রসূল সা. এর সাথে ইহরাম সহ চলতাম। তখন পুরুষ উষ্ট্রারোহীরা আমাদের কাছ দিয়ে যেতো। যখন তারা আমাদের মুখোমুখি হতো, তখন আমরা আমাদের মুখে ঘোমটা দিতাম। তারা চলে গেলে আবার মুখ খুলতাম। আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। আতা, মালেক, ছাওরী, শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক মুখের ওপর কাপড় ঝুলিয়ে দেয়ার পক্ষে।
যে ব্যক্তি লুংগী চাদর ও জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, সে যা পায় তাই পরবে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আরাফাতে ভাষণ দিলেন। ভাষণে বললেন: যে ব্যক্তি (সেলাইবিহীন) লুংগী সংগ্রহ করতে পারেনি, সে যেনো পাজামা পরে আর যখন জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, তখন সে যেনো মোজা পরে। -আহমদ, বুখারি, মুসলিম। আহমদ কর্তৃক বর্ণিত অপর হাদিসে রসূল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি ইযার (সেলাইবিহীন লুংগী) সংগ্রহ করতে পারেনা, পাজামা সংগ্রহ করতে পারে, সে যেনো পাজামাই পরে। আর যে জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, মোজা সংগ্রহ করতে পারে, সে যেনো মোজাই পরে। এ হাদিসে মোজা ছোট পরার আদেশ নেই।
এটাই আহমদের মত। তিনি ইহরামকারীকে পাজামা ও মোজা পরার অনুমতি দিয়েছেন যখন সে জুতা ও লুংগী সংগ্রহ করতে অক্ষম হয়। এ অবস্থায় তাকে কোনো কাফফারাও দিতে হবেনা। অধিকাংশ আলেমের অনুসৃত মত হলো, যে ব্যক্তির জুতা নেই, সে মোজা পরবে গিরে পর্যন্ত কেটে। কেননা এতে মোজা জুতার মতো হয়ে যায়। হানাফীদের মতে, যার লুংগী নেই সে পাজামা ফেড়ে ও সেলাই খুলে ফেলে ব্যবহার করবে। সেলাইসহ পরলে ফিদিয়া দিতে হবে। মালেক ও শাফেয়ী বলেছেন: পাজামার সেলাই খুলতে হবেনা, যেভাবে আছে, সেভাবেই পরবে এবং ফিদিয়া দিতে হবেনা। জাবের রা. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূল সা. বলেছেন। যখন ইযার সংগৃহীত হবেনা, তখন পাজামা পড়বে আর যখন জুতা সংগৃহীত হবেনা, তখন সে মোজা পরবে এবং গিরের নিচ পর্যন্ত রেখে মোজার উপরের অংশ কেটে ফেলবে। -নাসায়ী।
পাজামা পরার পর যদি লুংগী যোগাড় হয়, তাহলে পাজামা খুলে ফেলতে হবে। কিন্তু চাদর সংগৃহীত না হলে জামা পরা যাবেনা। কেননা সে যখন জামা পরবে তখন পাজামার সাথে লুংগী পরতে পারবেনা।
৫. নিজের বিয়ের জন্য অথবা অন্যের বিয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া: ইহরাম অবস্থায় এ ধরনের চুক্তি করলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে এবং এর উপর কোনো আইনানুগ প্রভাব পড়বেনা। কেননা মুসলিম উসমান রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী নিজেও বিয়ে করবেনা, অন্য কাউকেও বিয়ে করাবেনা, বিয়ের প্রস্তাবও দেবেনা। তিরমিযিতে প্রস্তাব দেবেনা একথা নেই। এই হাদিস অনুযায়ী মালেক, শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক। ইহরামকারীর জন্য বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেন এবং বিয়ে করলে তা বাতিল গণ্য করেন। "রসূলুল্লাহ সা. ইহরাম অবস্থায় মাইমুনাকে বিয়ে করেছেন" এই মর্মে যে হাদিস বর্ণিত আছে, মুসলিম বর্ণিত হাদিস তার বিপক্ষে। মুসলিমের হাদিসে আছে যে রসূলুল্লাহ সা. ইহরামমুক্ত অবস্থায় তাকে বিয়ে করেছেন। তিরমিযি বলেছেন: রসূল সা. কর্তৃক মাইমুনাকে বিয়ে করার ঘটনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারণ তিনি তাকে মক্কার পথে বিয়ে করেছেন। তাই কেউ কেউ বলেছেন: তা ছিলো তিনি ইহরামমুক্ত অবস্থায় তাকে বিয়ে করেছেন। তবে এই বিয়ের খবর প্রচারিত হয় তার ইহরাম অবস্থায়। তারপর তাঁর বাসর হয় 'সারাফে' ইহরাম মুক্ত অবস্থায়।
হানাফীদের মতে, ইহরাম অবস্থায় বিয়ের আকদ করা বৈধ। কেননা ইহরাম মহিলার বিয়ের আকদকে নিষিদ্ধ করেনা। সহবাসকে নিষিদ্ধ করে। বিয়ের আকদের বৈধতা ইহরামের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়না।
৬ ও ৭. নখ কাটা, চুল কামানো বা ছাঁটা-চাই তা মাথার চুল হোক বা অন্য কোনো চুল হোক। কেননা আল্লাহ বলেছেন: وَلَا تَحْلِقُوا رُووَسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ .
"তোমরা কুরবানির জন্তু কুরবানির জায়গায় না পৌঁছা পর্যন্ত তোমাদের মাথা কামিওনা।" বিনা ওযরে ইহরামকারীর নখ কাটা যে হারাম সে ব্যাপারে সকল আলেম একমত। তবে নখ যদি ভেংগে গিয়ে থাকে, তাহলে তা ফেলে দেয়া যাবে। এজন্য কোনো ফিদিয়া দিতে হবেনা। চুল রাখা যদি কষ্টদায়ক হয়, তাহলে তা ফেলে দেয়া বৈধ। তবে ফিদিয়া দিতে হবে। কিন্তু চোখের ভ্রু যদি ইহরামকারীর জন্য কষ্টদায়ক হয়, তাহলে তা ফিদিয়া ছাড়াই ফেলে দেয়া যাবে। কিন্তু মালেকীদের মতে, ফিদিয়া দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ بِهِ أَذًى مِنْ رَأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِنْ صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكِ .
"তোমাদের কেউ রুগ্ন হলে অথবা মাথা ব্যথায় অশান্তি হলে তাকে রোযা, সদকা কিংবা কুরবানির মাধ্যমে ফিদিয়া দিতে হবে।
৮. পুরুষ বা মহিলার কাপড় বা শরীরে সুগন্ধি মাখানো: ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, উমর রা. মোয়াবিয়ার শরীর থেকে সুগন্ধির ঘ্রাণ পেলেন। অথচ মোয়াবিয়া তখন ইহরামের অবস্থায়। তিনি তাকে বললেন: যাও, ওটা ধুয়ে এসো। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি: যে ব্যক্তি হজ্জ করে, সে ধুলোমলিন ও সুগন্ধিহীন থাকে। -বাযযার।
রসূলুল্লাহ সা. আরো একজনকে তিনবার বলেছিলেন: তোমার গায়ে যে সুগন্ধি রয়েছে, তা ধুয়ে ফেলো।
ইহরাম অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাকে গোসল দেয়া ও কাফন পরানোর সময় সুগন্ধি লাগানো যাবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. ইহরাম অবস্থায় মৃত এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন: তোমরা ওর মাথা ঢেকোনা এবং ওকে সগন্ধি মেখোনা। কেয়ামতের দিন সে যখন পুনরুজ্জীবিত হবে, তখন লাব্বাইকা লাব্বাইকা বলতে থাকবে। তবে ইহরামের পূর্ব থেকে তার শরীরে ও কাপড়ে সুগন্ধির কিছু রেশ অবশিষ্ট থাকলে তাতে কোনো আপত্তি নেই। যে উদ্ভিদ সুগন্ধির উদ্দেশ্যে জন্মেনা, যেমন আপেল ইত্যাদির গাছ তার মধ্যে বিদ্যমান সুগন্ধির ঘ্রাণ নেয়ার অনুমতি আছে। কেননা যেসব উদ্ভিদে সুগন্ধি প্রত্যাশা করা হয়না এবং সুগন্ধি গ্রহণও করা হয়না, আপেল ইত্যাদির গাছ তারই সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে কা'বা শরিফের গায়ে লেগে থাকা সুগন্ধি কোনো ইহরামকারীর গায়ে লেগে গেলে তার হুকুম কি হবে, সে সম্পর্কে সালেহ বিন কায়সান বলেন: আমি আনাস বিন মালেককে দেখেছি, তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর কাপড়ে কাবার সুগন্ধি লেগে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা ধোননি। আতা বলেছেন: এটা ধোয়ারও প্রয়োজন নেই, কোনো ফিদিয়া বা কাফফারাও দেয়া লাগবেনা। তবে শাফেয়ী মাযহাবের মতানুসারে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাবা শরীফের সুগন্ধি নিজের কাপড়ে বা দেহে লাগায় অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে লেগে যায় কিন্তু ধোয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ধুয়ে ফেলেনা, সে গুনাহর কাজ করে এবং তাকে ফিদিয়া দিতে হবে।
৯. সুগন্ধিযুক্ত রং মাখা কাপড় পরা: সুগন্ধিযুক্ত রং মাখা কাপড় পরা সর্বসম্মতভাবে হারাম এ ধরনের কাপড় পরতে হলে ধুয়ে পরতে হবে। যাতে তা থেকে কোনো সুগন্ধি বের না হয়।
কেননা নাফে থেকে ইবনে আব্দুল বার ও তাহাবি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যাফরান বা অনুরূপ কোনো সুগন্ধি মাখা কাপড় না ধুয়ে ইহরাম অবস্থায় পরোনা।"
যে সকল ব্যক্তি অন্যদের জন্য অনুসরণীয় ও আদর্শ স্থানীয় তাদের জন্য এ ধরনের পোশাক (ধৌত করা অবস্থায়ও) পরা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা এতে সাধারণ মানুষ নিষিদ্ধ সুগন্ধিযুক্ত পোশাক পরার প্ররোচনা লাভ করতে পারে। কেননা মালেক নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাবের মুক্ত গোলাম আসলাম বলেছেন: উমর রা. তালহা বিন উবায়দুল্লাহর পরিধানে একটা রং মাখানো পোশাক দেখতে পেলেন। তালহা তখন ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। উমর রা. বললেন, হে তালহা, এই রং মাখানো কাপড় কেন? তালহা বললেন: হে আমিরুল মুমিনীন ওটাকে লাল রং এর মুক্তা দ্বারা রঙ্গীন করা হয়েছে। উমর রা. বললেন, তোমরা হচ্ছো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যাদেরকে সাধারণ মানুষ অনুসরণ করে থাকে। একজন অজ্ঞ ব্যক্তি যদি এই পোশাক দেখে তবে অবশ্যই বলবে: তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ ইহরামকালে রঙ্গীন পোশাক পরতো।' সুতরাং তোমরা এ ধরনের রঙ্গীন পোশাক পরোনা।"
কোনো রান্না করা খাবারে বা পানীয়ে যদি সুগন্ধিযুক্ত কিছু দেয়া হয়, কিন্তু তাতে কোনো স্বাদ, গন্ধ বা রং অবশিষ্ট না থাকে, তবে ইহরামকারী তা খেলে তাকে কোনো ফিদিয়া দিতে হবেনা। কিন্তু ঘ্রাণ অবশিষ্ট থাকলে শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে তা খেয়ে ফিদিয়া দিতে হবে। হানাফীদের মতে ফিদিয়া দিতে হবেনা। কেননা সে তো সুগন্ধি উপভোগ করতে ইচ্ছা করেনি।
১০. শিকার: করা ইহরামকারীর জন্য জলজ প্রাণী শিকর করা, শিকার দেখিয়ে দেয়া ও তার গোশত খাওয়া বৈধ। কিন্তু স্থলজাত প্রাণী শিকার করা, হত্যা করা, যবাই করা, দর্শনীয় হলে দেখিয়ে দেয়া, দর্শনীয় না হলে তার সন্ধান দেয়া অথবা আতংকিত করে পালাতে প্ররোচিত করা হারাম। স্থলজাত প্রাণীর ডিম নষ্ট করা, ক্রয় বিক্রয় করা ও তার দুধ দোহানোও হারাম। (যে সকল প্রাণী স্থলে জন্মে ও সন্তান জন্ম দেয়, তা স্থলজাত প্রাণী, চাই তা পানিতে বাস করুক না কেন। জলজ প্রাণী ঠিক এর বিপরীত। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। শাফেয়ীদের মতে যে প্রাণী শুধু স্থলে অথবা জলে ও স্থলে উভয় জায়গায় বাস করে, তা স্থলজ প্রাণী। আর যে প্রাণী পানিতে ছাড়া বাসই করেনা তা জলজ প্রাণী।) আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحَرَّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ البَرِّ مَا دُمْتُمْ حَرَمًا .
"তোমাদের ও পথিকদের ভোগের উদ্দেশ্যে তোমাদের জন্য জলজ প্রাণী শিকার করা ও খাওয়া হালাল করা হয়েছে। আর তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে স্থলের শিকার ধরা যতোক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে।" (উল্লেখ্য যে, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে শুধুমাত্র হালাল বনজ প্রাণী ও হালাল পাখি শিকর করা হারাম। এ ছাড়া অন্য সকল স্থলজ প্রাণী শিকার ও হত্যা করা বৈধ। কিন্তু অন্যান্য অধিকাংশ আলেমের মতে, হাদিসে নিষিদ্ধ পাঁচটি প্রাণী যথা: কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও কামড়ানো কুকুর ব্যতীত আর সকল প্রাণী হারাম শরিফের বাইরে বা ভেতরে হত্যা করা হারাম, চাই তা হালাল জন্তু হোক বা হারাম জন্তু হোক।)
১১. ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে, তার সাহায্যে বা তাঁর ইংগিতে শিকার করা জন্তুর গোশত খাওয়া ইহরামকারীর জন্য হারাম। কেননা বুখারি ও মুসলিম কাতাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার রসূলুল্লাহ সা. হজ্জ করার উদ্দেশ্যে সফরে বের হলেন। তাঁর সাথে সাহাবিদের একটি দলও বেরুলো। আবু কাতাদাসহ একটি দলকে তিনি পৃথক করে দিয়ে বললেন: তোমরা সমুদ্রের কিনার দিয়ে চলতে থাকো, যতোক্ষণ না আমরা পরস্পরের সাথে মিলিত হই। তারা সমুদ্রের কিনার ধরে চলতে লাগলো। যখন তারা রওয়ানা হলো, তখন আবু কাতাদা ছাড়া সবাই ইহরাম বাঁধলো। চলার পথে তারা কতকগুলো বুনো গাধা দেখতে পেলো। আবু কাতাদা গাধাগুলোর ওপর হামলা করে একটি মাদী গাধাকে হত্যা করলো। সবাই যাত্রা বিরতি করে ঐ গাধার গোশত খেলো। তারা প্রশ্ন তুললো : আমরা তো ইহরামকারী। আমাদের কি শিকারের গোশত খাওয়া ঠিক হলো? মাদী গাধার উদ্বৃত্ত গোস্ত তারা সাথে করে নিয়ে গেলো। যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে উপস্থিত হলো, তখন বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমরা ইহরাম বেঁধেছিলাম কিন্তু আবু কাতাদা ইহরাম বাঁধেনি। পরে আমরা যখন এক পাল বুনো গাধার সাক্ষাৎ পেলাম, তখন আবু কাতাদা তাদের ওপর আক্রমণ চালালো এবং একটা মাদী গাধাকে হত্যা করলো। তারপর আমরা যাত্রা বিরতি করলাম এবং গাধার গোশত খেলাম। তারপর আমরা প্রশ্ন তুললাম যে, ইহরাম অবস্থায় আমাদের শিকারের গোশত খাওয়া কি বৈধ? আমরা উদ্বৃত্ত গোশত সাথে করে নিয়ে এসেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমাদের কেউ কি আবু কাতাদাকে আক্রমণ করতে আদেশ বা ইংগিত দিয়েছিল? তারা বললো না! রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে তোমরা অবশিষ্ট গোশত খেয়ে ফেলো।
ইহরামকারীর জন্য এমন শিকারের গোশত খাওয়া বৈধ যা সে নিজেও শিকার করেনি, তার জন্যও শিকার করা হয়নি। সে শিকার দেখিয়েও দেয়নি। শিকার ধরতে সাহায্যও করেনি। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: স্থলজ প্রাণী তোমাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় খাওয়া হালাল। যদি তোমরা স্বয়ং তা শিকার না করে থাকো, কিংবা তোমাদের জন্য শিকার না করা হয়ে থাকে।” আহমদ ও তিরমিযি। কিছু আলেমের মতে, এই হাদিস অনুযায়ী ইহরামকারী নিজে শিকার না করলে বা তার জন্য শিকার করা না হয়ে থাকলে তার জন্য শিকারের গোশত খাওয়া বৈধ। শাফেয়ী, আহমদ, ইসহাক, মালেক ও অধিকাংশ ইমাম এই মতের পক্ষে। তবে ইহরামকারী নিজে শিকার করলে বা তার জন্য শিকার করা হলে চাই তার অনুমতি নিয়ে করা হোক বা অনুমতি ছাড়া করা হোক, হারাম। কোনো ইহরামমুক্ত ব্যক্তি নিজের জন্য শিকার করলে এই ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে শিকার না করলে, অতপর তার গোশত ইহরামকারীকে উপহার দিলে বা তার কাছে বিক্রি করলে তা ইহরামকারীর জন্য হারাম হবেনা।
আবদুর রহমান তাইমী বলেছেন: আমরা তালহার সাথে সফরে বেরুলাম। আমরা সবাই ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। এ সময় তালহাকে একটা পাখি উপহার দেয়া হলো। তখন তালহা নিদ্রিত। আমাদের কেউ কেউ তা খেলো, কেউ কেউ বর্জন করলো। তালহা যখন জেগে উঠলো, তখন যারা খেয়েছে তাদেরকে সমর্থন জানালো এবং বললো, আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে এটা খেয়েছি। আহমদ ও মুসলিম।
ইহরামকারীর জন্য শিকারের গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ মর্মেও কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন সা'আব বিন জাস্সামার হাদিসে বলা হয়েছে, তিনি রসূলুল্লাহ সা. কে একটা বুনো গাধা উপহার দিলেন। তিনি তখন আবওয়া বা ওয়াদ্দানে অবস্থান করছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. উপহারটি তার কাছে ফেরৎ পাঠালেন। রসূল সা. যখন সা'বের মুখমণ্ডলে এর প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলেন। তখন বললেন: আমরা এটা এজন্যই ফেরত দিয়েছি যে, আমরা ইহরামে আছি।” সকল হাদিসের সমন্বয় করলে বুঝা যায়। এটি ইহরামমুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে শিকার করা হয়েছিল বলেই ফেরত দেয়া হয়েছিল।
ইবনে আব্দুল বার বলেন: এই মতের প্রবক্তাদের যুক্তি এই যে, এই ব্যাখ্যা অনুসারে এই বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদিস সহীহ প্রমাণিত হয়। এই ব্যাখ্যা মেনে নিলে হাদিসগুলোর মধ্যে কোনো স্বার্থবিরোধিতা বা সাংঘর্ষিকতা থাকেনা। হাদিসগুলোকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা উচিত। যাতে এগুলোর প্রয়োগের কোনো পথ যতোক্ষণ পাওয়া যায়, ততোক্ষণ কোনো হাদিস অন্য হাদিসের বিরোধী বলে চিহ্নিত না হয়। ইবনুল কাইয়েম এই মতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন: সাহাবিদের সমস্ত কথা ও কাজ শুধুমাত্র এই ব্যাখ্যাকেই সঠিক প্রমাণ করে।
📄 ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করলে তার বিধান
৯. ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ করলে তার বিধান
যে ব্যক্তি ওযর তথা অনিবার্য কারণবশত ইহরামে যেসব কাজ নিষিদ্ধ স্ত্রী সহবাস ব্যতিত তার কোনো একটা করার প্রয়োজন বোধ করে, যেমন ঠাণ্ডা বা গরম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে মাথা কামানো, সেলাই করা কাপড় পরা, ইত্যাদি। তার জন্য একটা ছাগল যবাই করা, অথবা মাথা প্রতি অর্ধ সা' করে ছয় জন মিসকীনকে খাবার দেয়া। অথবা তিন দিন রোযা রাখা জরুরি। এই তিনটের মধ্যে যে কোনো একটি করা তার ইচ্ছাধীন। স্ত্রী সহবাস ব্যতিত ইহরামের জন্য নিষিদ্ধ আর কোনো কাজ করলে হজ্জ বাতিল হয়না।
কা'ব বিন আজরা থেকে বর্ণিত, হুদাইবিয়ার সময় রসূল সা. তার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন: তোমার মাথার কীটগুলো তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে বুঝি। সে বললো: হা। রসূল সা. বললেন: মাথা কামিয়ে ফেলো, তারপর একটা ছাগল কুরবানি করো অথবা তিন দিন রোযা রাখো অথবা ছয় জন মিসকীনকে তিন সা খোরমা খাওয়াও। -বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ।
অন্য বর্ণনায় এই সাহাবি বললেন: আমার মাথায় কীটের যন্ত্রণা আমাকে পীড়া দিচ্ছেন। তখন হুদাইবিয়ার বছর চলছিল এবং আমি রসূল সা. এর সাথে ছিলাম। এমনকি এ কারণে আমার দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশংকা দেখা দিলো। তখন আল্লাহই তায়ালা নাযিল করলেন: তোমাদের কেউ যদি রোগ জর্জরিত হয় অথবা তার মাথায় কোনো পীড়া থাকে, তাহলে সে যেনো রোযা সদকা বা কুরবানির মাধ্যমে তার ফিদিয়া দেয়।” এরপর রসূলুল্লাহ সা. আমাকে ডাকলেন এবং বললেন: তোমার মাথা কামাও, তারপর তিনদিন রোযা রাখো অথবা ছয় জন মিসকীনকে ষোল রতল কিসমিস দান করো অথবা একটা ছাগল কুরবানি করো। আমি মাথা কামিয়ে ফেললাম তারপর কুরবানির করলাম।"
ইমাম শাফেয়ীর মতে ওষরধারী ও ওযরহীন উভয়কেই ফিদিয়া দিতে হবে। আবু হানিফার মতে, ওযরহীন ব্যক্তি সামর্থ থকলে কুরবানি করা ওয়াজিব, অন্যায় নয়।
আংশিক চুল কাটলে আতা বলেছেন, ইহরামকারী তিনটে বা তার বেশি পশম উপড়ালে তার ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। আর শাফেয়ী বলেছেন, একটা পশমে এক মুদ, দুইটা পশমে দুই মুদ ও তিনটা পশমে একটা ছাগল কুরবানি করা ওয়াজিব।
তেল মাখালে: আল মুসওয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে: খাঁটি তেল বা খাঁটি সেবকা দিয়ে শরীর মর্দন করলে আবু হানিফার মতে কুরবানি ওয়াজিব চাই যে অংগই করা হোক না কেন। আর শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ী সুগন্ধিযুক্ত নয় এমন তেল দ্বারা মাথার চুল ও দাড়ি মর্দন করলে ফিদিয়া দিতে হবে। শরীরের যে কোনো জায়গায় মর্দন করা হোক, ফিদিয়া দিতে হবেনা।
ভুলক্রমে বা অজ্ঞতাবশত নিষিদ্ধ পোশাক পরলে বা সুগন্ধি লাগালে ক্ষতি নেই: ইহরামকারী যখন নিষিদ্ধ বস্তুর কথা না জেনে বা নিজের ইহরামের কথা ভুলে গিয়ে নিষিদ্ধ কাপড় পরে বা সুগন্ধি ব্যবহার করে, তখন তার ফিদিয়া দেয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা ইয়ালা বিন উমাইয়া বলেন: জারানাতে এক ব্যক্তি রসূল সা. এর কাছে উপস্থিত হলো। তখন তার গায়ে একটা জুব্বা এবং দাড়ি ও মাথার চুল হলুদ রং এ রচিত ছিলো। সে বললো: হে রসূলুল্লাহ আমি একটি ওমরার ইহরাম বেধেছি। আমার বেশভূষা যা আছে তাতো দেখতেই আছেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমার হলুদ রংটা ধুয়ে ফেলো জুব্বাটা খুলে ফেলো এবং তুমি হজ্জে যা যা করেছিলে, ওমরাতেও তাই করো।" -ইবনে মাজাহ ব্যতীত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ। আতা বলেছেন: অজ্ঞতাবশত বা ভুলক্রমে নিষিদ্ধ পোশাক পরলে বা সুগন্ধি লাগালে কোনো কাফফারা দিতে হবেনা।-বুখারি।
কিন্তু শিকার করা নিষিদ্ধ একথা না জানার কারণে বা ভুলে যাওয়ার কারণে শিকার হত্যা করলে তার সমান বদলা দিতে হবে। (অর্থাৎ কুরবানি দিতে হবে।) কারণ এর ক্ষতিপূরণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ। আর্থিক ক্ষতিপূরণে জানা অজানা ও ভুল ও স্ব-ইচ্ছা সমান। যেমন মানুষের আর্থিক ক্ষতি সাধন করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
স্ত্রী সহবাসে হজ্জ বাতিল
আলী, উমর ও আবু হুরায়রা রা. হজ্জের ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাসকারী এক ব্যক্তি সম্পর্কে ফতোয়া দিলেন যে, উভয়কে হজ্জ যথাযথভাবে সমাপ্ত করতে হবে। অতপর পরবর্তী বছর পুনরায় হজ্জ ও কুরবানি করতে হবে। আবুল আব্বাস তাবারি বলেছেন: ইহরামকারী প্রথম ইহরামমুক্ত হবার আগেই স্ত্রী সহবাস করলে তার হজ্জ নষ্ট হয়ে যাবে চাই তা আরাদায় অবস্থানের আগে করুক বা পরে করুক। নষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাকে হজ্জের অবশিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে, তাকে একটা উট কুরবানি করতে হবে এবং পরবর্তী বছর হজ্জের কাজা করতে হবে। স্ত্রী যদি নফল ইহরাম করে থাকে তবে তাকে হজ্জ চালিয়ে যেতে হবে, পরবর্তী বছর কাযা করতে হবে এবং কুরবানিও করতে হবে। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। কোনো কোনো আলেম বলেন, তাদের উভয়ের একটা কুরবানিই দিতে হবে। আতাও এই মত পোষণ করেন। বগবী বলেছেন: রমযানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস করলে যেমন কাফফারা দিতে হয়, পুরুষকে এখানেও তেমনি কাফফারা দিতে হবে। পরবর্তী বছর যখন তারা কাযা হজ্জ করতে বেরুবে, তখন যে স্থানে আগের বছর সহবাস সংঘটিত হয়েছিল সে স্থানে উভয়ের পৃথক পৃথক জায়গায় অবস্থান করা মালেক ও আহমদের মতে ওয়াজিব এবং হানাফী ও শাফেয়ী মতে মুস্তাহাব। আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সতর্কতা অবলম্বনের উদ্দেশ্যে এরূপ করা চাই। উট কুরবানি করতে অক্ষম হলে গরু, গরু দিতে অক্ষম হলে সাতটা ছাগল দেবে। তাতেও অক্ষম হলে উটকে টাকার হিসাবে এবং টাকাকে খাদ্যের হিসাবে মূল্যায়ণ করতে হবে এবং প্রত্যেক মিসকীনকে এক মুদ হিসাবে সদকা করতে হবে। এতেও অক্ষম হলে প্রত্যেক মুদের বিনিময়ে একটা করে রোযা রাখবে। যুক্তিবাদীদের অভিমত হলো। আরাফায় অবস্থানের পূর্বে সহবাস করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যাবে এবং তাকে একটা ছাগল অথবা একটা উটের এক সপ্তমাংশ দান করতে হবে। আর আরাফায় অবস্থানের পরে সহবাস করলে হজ্জ বাতিল হবেনা, তবে তাকে একটা উট কুরবানি করতে হবে। কিরাণ হজ্জকারী যখন তার হজ্জ নষ্ট করে, তখন ইফরাদ হজ্জকারীর ওপর যা যা ওয়াজিব হয়, তার ওপরও সেসব জিনিস ওয়াজিব হবে। কিরান হজ্জই তাকে কাযা করতে হবে এবং কিরানের কুরবানি থেকে সে অব্যাহতি পাবেনা। অধিকাংশ আলেমের মতে, প্রথম ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার পর সহবাস করলে হজ্জ বাতিল হবেনা এবং তাকে কাযাও করতে হবেনা। কারো কারো মতে কাযা করা ওয়াজিব এবং তাকে ফিদিয়া দিতে হবে। এটা ইবনে উমর, হাসান ও ইবরাহিমের অভিমত। এখন ফিদিয়া হিসেবে উট না ছাগল দিতে হবে তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইবনে আব্বাস ও আতার মতে উট ওয়াজিব। উট ইকরামার মত ও শাফেয়ীর দুই মতের একটি, যা হানাফীদের মধ্য হতে আল মাবসুত ও আল বাদায়ের লেখক গ্রহণ করেছেন। শাফেয়ীর অপর মতানুসারে ছাগল দেয়া ওয়াজিব হবে। এটা ইমাম মালেকেরও মত। আর যখন ইহরামকারীর স্বপ্নদোষ হয় কিংবা সহবাসের কথা চিন্তা করায় বা কোনো মহিলার দিকে দৃষ্টি দেয়ার উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ও বীর্যপাত হয়, তখন শাফেয়ী মযহাব অনুসারে তার উপর কিছুই ওয়াজিব হবেনা। অন্যেরা বলেন: যে ব্যক্তি কামোত্তেজনা সহকারে স্পর্শ করে বা চুমু দেয়, তার উপর ছাগল কুরবানি করা ওয়াজিব, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক। ইবনে আব্বাস রা. এর মতে, তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। মুজাহিদ বলেন: এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের কাছে এলো এবং বললো: আমি ইহরাম বেঁধেছি। এমতাবস্থায় আমার কাছে অমুক মহিলা সেজেগুজে এলো। ফলে আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারলামনা। আমার ওপর কামোত্তেজনা প্রবল হলো। একথা শুনে ইবনে আব্বাস হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লেন। তারপর বললেন: তুমি একজন কামোন্মাদ। তোমার কোনো সমস্যা নেই। একটা কুরবানি করো ব্যাস তোমার হজ্জ সম্পন্ন হয়ে গেলো। -সাঈদ বিন মানসুর।
শিকার হত্যার ক্ষতিপূরণ: আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদার ৯৫ আয়াতে বলেছেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْتُلُوا الصَّيْدَ وَانْتُمْ حُرُمٌ ط وَمَنْ قَتَلَهُ مِنْكُمْ مُتَعَمِّدًا فَجَزَاء مِثْلُ مَا قَتَلَ مِنَ النَّعَمِ يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِنْكُمْ هَدْيَا بَلِغَ الْكَعْبَةِ أَوْ كَفَّارَةٌ طَعَامٌ مَسْكِينَ أَوْ عَدْلُ ذَلِكَ صِيَامًا لِيَذُوقَ وَبَالَ أَمْرِهِ مَا عَفَا اللَّهُ عَمَّا سَلَفَ مَا وَمَنْ عَادَ فَيَنْتَقِمُ اللَّهُ مِنْهُ طَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انْتِقَا
"হে ঈমানদারগণ তোমরা ইহরামে থাকা অবস্থায় শিকার হত্যা করোনা। তোমাদের কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে শিকার হত্যা করলে তাকে হত্যাকৃত জন্তুর সমান বিনিময় হিসেবে দিতে হবে। তোমাদের মধ্যে দু'জন ন্যায়বিচারক এর নিষ্পত্তি করবে। সে জন্তুটি হাদিয়া হিসেবে কা'বায় পৌঁছাতে হবে। অথবা, তাকে কাফফারা হিসেবে কয়েকজন মিসকীনকে খাওয়াতে হবে অথবা এর সমপরিমাণ রোযা রাখতে হবে, যেন সে তার কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করে। যা গত হয়েছে তা আল্লাহর মাফ করেছেন। তবে কেউ তা পুনরায় করলে আল্লাহ তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণে সক্ষম।"
ইবনে কাছীর বলেছেন: অধিকাংশ আলেমের মতে, ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃত যেভাবেই শিকার হত্যা করা হোক, বিনিময় প্রদান ওয়াজিব। যুহরি বলেছেন: ইচ্ছাকৃতভাবে শিকার হত্যাকারীর ব্যাপারে কুরআন তার ফায়সালা দিয়েছে। আর ভুলক্রমে হত্যাকারীর ওপর সুন্নত কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ কুরআন ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারীর উপর বিনিময় ওয়াজিবরূপে ধার্য করেছে এবং তাকে গুনাহগার আখ্যায়িত করেছে এই উক্তির মাধ্যমে যেন সে তার কৃতকর্মের প্রতিফল ভোগ করে।' আর রসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের ফায়সালা সম্বলিত সুন্নত ভুলক্রমে শিকার হত্যাকারীর উপর বিনিময় ধার্য করেছে। যেমনটি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারীর উপর কুরআন বিনিময় ধার্য করেছে। তাছাড়া শিকার হত্যা একটা ক্ষতি। আর ক্ষতি সাধন ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক বা ভুলক্রমেই হোক, ক্ষতিপূরণ দিতেই হয়। তবে পার্থক্য এই যে, ইচ্ছাকৃতভাবে শিকার হত্যাকারী গুনাহগারও বটে, কিন্তু ভুলক্রমে হত্যাকারী গুনাহগার বলে নিন্দিত নয়। মুস্তয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে। তাকে হত্যাকৃত জন্তুর সমান বিনিময় হিসেবে দিতে হবে। আবু হানিফা এর ব্যাখ্যায় বলেন যে, শিকার হত্যাকারীকে বিনিময় দিতে হবে হত্যাকৃত জন্তুর সমমূল্যের। আর বিনিময়টা যাতে সমমূল্যের হয়, সে জন্য বিনিময় ধার্য করতে হবে দু'জন ন্যায় বিচারক ব্যক্তিকে। হয় অনুরূপ একটা জন্তু দিয়ে বিনিময় দিতে হবে, যা হাদিয়ার আকারে কা'বায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। নচেত মিসকীনদের খাদ্য হিসেবে কাফফারা দিতে হবে। আর ইমাম শাফেয়ীর ব্যাখ্যা হলো: শিকার হত্যাকারীর ওপর বিনিময় দেয়া ওয়াজিব হবে, যা আকার আকৃতিতে হত্যাকৃত জন্তুর সমান হবে এবং একই জাতের জন্তু হবে। আর এদিক দিয়ে তা সমান কিনা তা স্থির করবে দু'জন ন্যায়বিচারক ব্যক্তি। আর এই বিনিময়কে হাদিয়া হিসেবে কা'বায় পৌঁছানো হবে। নচেত এই বিনিময় হবে কোনো কাফফারা বা কাফফারার সমান রোযা।
উমর ও পূর্বতন মনীষীগণের ফায়সালা: মুহাম্মদ ইবনে সিরীন থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি উমর রা. এর কাছে এলো এবং বললো: আমি ও আমার এক সাথী পাহাড়ী পথের একটি গর্তে দুটো ঘোড়া দাবড়িয়ে দিয়ে একটা হরিণ হত্যা করলাম। তখন আমরা দু'জনই ইহরামে ছিলাম। এ কাজটা আপনি কেমন মনে করেন? উমর রা. তার পাশের এক ব্যক্তিকে বললেন: এসো আমি ও তুমি এর ফায়সালা করি। তারপর তারা দু'জনে ফায়সালা করলেন যে, লোকটিকে একটি মাদী ছাগল দিতে হবে। একথা শুনে লোকটি এই বলতে বলতে বিদায় হতে উদ্যত হলো "ইনি হচ্ছেন আমীরুল মুমিনীন, একটা হরিণের ব্যাপারেও ফায়সালা করতে পারেন না, আর এক ব্যক্তিকে ডেকে আনেন তার সাথে ফায়সালা করতে।' উমর রা. লোকটির কথা শুনলেন এবং তাকে কাছে ডাকলেন। তাকে বললেন: তুমি কি সূরা মায়েদা পড়ো? সে বললো: না। তিনি বললেন। এই ব্যক্তিকে চিনো, যে আমার সাথে ফায়সালায় অংশ নিলো? সে বললো: না। উমর রা. বললেন: তুমি যদি আমাকে জানাতে যে, সূরা মায়েদা পড়েছো, তাহলে আমি তোমাকে এমন প্রহার করতাম যাতে ব্যথা পাও। তারপর বললেন: আল্লাহ তায়ালা তাঁর কিতাবে বলেছেন: يَحْكُمُ بِهِ ذَوَا عَدْلٍ مِنْكُمْ هَديَّا بَالِغَ الْكَعْبَةَ .
"তার ব্যাপারে দু'জন ন্যায়বিচারক ব্যক্তি ফায়সালা করবে ....." আর ইনি হচ্ছেন আব্দুর রহমান বিন আওফ।
প্রাচীন মনীষীগণ স্থির করেছেন যে, উটপাখী হত্যা করলে একটা উট, বুনো গাধা, বুনো গরু, ও পাহাড়ী জাগল হত্যা করলে একটা গরু এবং খরগোশ কবুতর, ঘুঘু পাখী, বুনো মোরগ, ও দাবলী নামক পাখী হত্যা করলে একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে। আর হায়েনা হত্যায় একটা ভেড়া। হরিণ হত্যায় একটা মাদী ছাগল, খরগোশ হত্যায় চার মাসের ঊর্ধ্বের মাদী ছাগল, শিয়াল হত্যায় এক বছরের ছাগল এবং ইয়ারবু নামক ইঁদুর সদৃশ জন্তু হত্যায় চার মাস বয়সী মাদী ছাগল দিতে হবে।
বিনিময় সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে যা করণীয়: সাঈদ বিন মানসুর ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: সূরা মায়েদার উক্ত ৯৫নং আয়াত অনুযায়ী ইহরাম অবস্থায় কেউ শিকার হত্যা করলে তার সমান বিনিময় নির্ধারণ করতে হবে। বিনিময় যদি তার কাছে থেকে থাকে তাহলে তা যবাই করবে ও তার গোশত সদকা করে দেবে। আর যদি বিনিময় না থাকে, তবে বিনিময়কে নগদ অর্থের হিসাবে মূল্যায়ণ করতে হবে, তারপর সেই অর্থের সমান খাদ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং খাদ্যের প্রত্যেক অর্ধ সার বিনিময়ে একটা করে রোযা রাখবে। ধরা যাক, সে একটা হরিণ বা তদ্রূপ কোনো জন্তু হত্যা করলো, তাকে একটা ছাগল দিতে হবে, যা মক্কায় যবাই করা হবে। নচেত ছয় জন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। তা না পারলে তিন দিন রোযা রাখবে। আর যদি একটা পাহাড়ি ছাগল হত্যা করে, তাহলে তাকে একটা গরু দিতে হবে। গরু দিতে না পারলে বিশজন মিসকীনকে খাওয়াবে। তাও না পারলে বিশটি রোযা রাখবে। আর যদি একটা উট পাখি কিংবা বুনো গাধা বা অনুরূপ কোনো জন্তু হত্যা করে, তাহলে তাকে একটা উট দিতে হবে। উট দিতে না পারলে ত্রিশজন মিসকীনকে খাওয়াবে। তাও না পারলে ত্রিশটি রোযা রাখবে। ইবনে আবি হাতেম, ইবনে জারীর।
খাওয়ানো ও রোযা রাখার পদ্ধতি: মালেক বলেন: শিকার হত্যাকারীর বিনিময় দান সম্পর্কে আমি সর্বোত্তম যেকথা শুনেছি তা হলো, হত্যাকৃত শিকারের মূল্য নির্ধারণ করে দেখতে হবে, এই মূল্যে কি পরিমাণ খাদ্য পাওয়া যায়। এরপর প্রত্যেক মিসকীনকে এক মুদ পরিমাণ খাওয়াবে। অথবা প্রত্যেক মুদের বাবদে একদিন রোযা রাখবে, আর দেখবে মিসকীনের সংখ্যা কতো। মিসকীনের সংখ্যা যদি দশজন হয় তাহলে দশদিন রোযা রাখবে। আর যদি তাদের সংখ্যা বিশ হয়, তাহলে বিশটি রোযা রাখবে।
যৌথভাবে শিকার হত্যা: যখন একটি দল ইচ্ছাকৃতভাবে যৌথ উদ্যোগে একটা শিকার হত্যা করে, তখন তাদেরকে একটা বিনিময়ই দিতে হবে। কেননা আল্লাহ বলেছেন: হত্যাকৃত জন্তুর সমান বিনিময় দিতে হবে। ইবনে উমর রা. কে একটি হায়েনা হত্যাকারী দল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো যাদের সবাই ইহরামে ছিলো। তিনি বললেন: সবাই মিলে একটা ভেড়া যবাই করো। লোকেরা জিজ্ঞাসা করলো: দলের প্রত্যেক সদস্যের পক্ষ থেকে একটি করে? তিনি বললেন: না সকলের পক্ষ থেকে একটি।
হারাম শরিফে শিকার ও গাছ কাটা: ইহরামকারী ও ইহরামমুক্ত নির্বিশেষে সকলে ওপরই হারাম শরিফে শিকার করা, শিকারকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়া, সাধারণত মানুষের চেষ্টায় উৎপাদিত হয়নি এমন গাছ কাটা, উদ্ভিদ কাটা, এমনকি কাটাওয়ালা গাছ পর্যন্ত কাটা হারাম। একমাত্র সুগন্ধিযুক্ত ইযখির ও সানামকী গাছ কাটা, উপড়ানো ও নষ্ট করা জায়েয। বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। রসূলুল্লাহ সা. মক্কা বিজয়ের দিন বললেন: এই শহর পবিত্র ও সম্মানিত, এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ ও কোনো উদ্ভিদ কাটা যাবেনা। এর কোনো শিকারকে তাড়িয়ে দেয়া যাবেনা এবং কোনো হারানো জিনিস কুড়ানো যাবেনা। তবে শুদ্ধ ঘোষণাকারীর জন্য কুড়ানো বৈধ। আব্বাস বললেন: ইযখির বাদে, কেননা এটা জনগণের জন্য একটা অপরিহার্য বস্তু। এটা বাড়ির জন্য ও কামারের জন্য জরুরি।' তখন রসূল সা. বললেন: হ্যা, ইযখির বাদে।
শওকানি বলেছেন, কুরতুবি বলেছেন: ফকীহগণ নিষিদ্ধ গাছকে মানুষের চেষ্টা ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহর তৈরি গাছের মধ্যে সীমিত রেখেছেন। যে সকল গাছ মানুষের চেষ্টা ও যত্ন দ্বারা উৎপন্ন হয়েছে, তার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে তা কাটা যাবে। শাফেয়ী বলেন: সবকিছুতেই বিনিময় দেয়া জরুরি। ইবনে কুদামা এই মতকে অগ্রগণ্য মনে করেছেন।
প্রথম শ্রেণীর গাছ অর্থাৎ মানুষের চেষ্টা ছাড়া শুধু প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন গাছ কাটার বিনিময় সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে, মালেক বলেন: এতে কোনো বিনিময় নেই। কেবল গুনাহ হবে। আতা বলেন: ক্ষমা চাইবে। আবু হানিফা বলেন: এর মূল্য অনুপাতে একটা উপহার অর্থাৎ জন্তু আদায় করা হবে। শাফেয়ী বলেছেন: বড় গাছ হলে একটা গরু এবং ছোট গাছে ছাগল দিতে হবে। মানুষের চেষ্টা ছাড়া আপনা আপনি ভাংগা ডাল, আপনা আপনি উপড়ে যাওয়া গাছ ও ঝরা পাতা কাজে লাগানো যাবে বলে আলেমগণ রায় দিয়েছেন।
ইবনে কুদামা বলেছেন: হারামের সীমানার ভেতরে মানুষের উৎপাদিত ফসল, তরকারি ও সুগন্ধি দ্রব্য গ্রহণ করা, কাটা ও তা লালন পালন করার ব্যাপারে আলেমদের সর্বসম্মত সম্মতি রয়েছে। রওযা নাদিয়া গ্রন্থে আছে: মক্কার হারাম শরিফে শিকার করা ও গাছ কাটায় ইহরামমুক্ত ব্যক্তির গুনাহ হবে। তবে কোনো বিনিময় দিতে হবেনা। তবে যে ব্যক্তি ইহরাম থাকে, শিকারের জন্য আল্লাহ তায়ালার ঘোষিত বিনিময় দেয়া তার জন্য অপরিহার্য। তবে মক্কার গাছ কাটার জন্য কোনো বিনিময় দিতে হবেনা। কেননা এর স্বপক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। অতপর ইবনে কুদামা বলেছেন: মোদ্দাকথা হলো, শিকার হত্যায় নিষেধাজ্ঞা ও গাছ কাটার নিষেধাজ্ঞার মাঝে এবং বিনিময় বা মূল্য দেয়ার বাধ্যবাধকতার মাঝে কোনো অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক নেই। বরং এই নিষেধাজ্ঞাই প্রকাশ করে যে, শিকার করা ও গাছ কাটা হারাম। আর বিনিময় ও মূল্য বিনা প্রমাণে ওয়াজিব হয়না। সূরা মায়েদার উপরোক্ত ৯৫নং আয়াত ব্যতিত এর আর কোনো প্রমাণ নেই। অথচ এ প্রমাণে শুদ্ধ বিনিময়ের উল্লেখ রয়েছে। কাজেই বিনিময় ছাড়া অন্য কিছু দিতে হবেনা।
📄 মক্কার হারাম শরিফের সীমানা
১০. মক্কার হারাম শরিফের সীমানা
মক্কার হারাম শরিফের সুনির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে। এই সীমানা সমগ্র মক্কা নগরীকে বেষ্টন করে রেখেছে। এর পাঁচ দিকে পাঁচটা প্রতীক রয়েছে। এই প্রতীকগুলো হলো রাস্তার দু'পাশে এক মিটার উপরে রক্ষিত কয়েকটি পাথর। উত্তর দিক থেকে এর সীমানা হলো মক্কা থেকে ছয় কি: মি: দূরে অবস্থিত তানয়ীম। দক্ষিণে এর সীমানা ১২ কি: মি: দূরে অবস্থিত আদাহ। পূর্ব দিক থেকে এর সীমা ১৬ কি: মি: দূরে অবস্থিত জিরানা। উত্তর পূর্ব দিকে সীমানা ১৪ কি: মি: দূরে অবস্থিত 'ওয়াদি নাখেলা'। আর পশ্চিম দিকে সীমানা ১৫ কি: মি: দূরে অবস্থিত 'শুমাইছী' এরই পূর্ব নাম হুদাইবিয়া। যেখানে 'বাইয়াতুর রিদওয়ান' সংঘটিত হয়।
মুহিবুদ্দীন তাবারি উবাইদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন : মক্কার হারাম শরিফের এই সীমানা চিহ্নগুলো ইবরাহিম আ. স্থাপন করেছিলেন এবং জিবরাঈল আ. তাকে এগুলো দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর এ সীমানা আর কেউ নাড়ায়নি। যখন কুসাই এলেন, তখন তিনি এর সংস্কার করলেন। এরপর আর কেউ সীমানা নাড়ায়নি। অবশেষে যখন রসূলুল্লাহ সা. এলেন, তখন তিনি মক্কা বিজয়ের বছর তামীম বিন উসাউদ খাযায়ীকে পাঠালেন এবং তিনি সীমানা চিহ্নগুলো সংস্কার করলেন। এরপর এই সীমানা আর কেউ নাড়ায়নি। অবশেষে যখন উমর রা. এলেন তখন তিনি কুরাইশের চার জন নেতাকে পাঠালেন। তারা হলেন: মাহরামা বিন নওফেল, সাঈদ বিন ইয়ারবু, হুয়াইতিব বিন আব্দুল উযযা ও আযহার বিন আবদ আওফ। তারা এ চিহ্নগুলো সংস্কার করলেন। এরপর মুয়াবিয়াও এর সংস্কার করেন। তারপর আব্দুল মালেক এর সংস্কারের আদেশ জারি করেন।
📄 মদিনার হারাম শরিফ
মক্কার হারাম শরিফে শিকার ও গাছপালা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি মদিনার শিকার ও গাছপালা নিষিদ্ধ।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইবরাহিম আ. মক্কাকে নিষিদ্ধ ও নিরাপদ নগরীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আর আমি মদিনাকে নিষিদ্ধ ও নিরাপদ নগরীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি এর দুটো পাথুরে ভূমির মাঝখানে। এর কোনো কাঁটাযুক্ত গাছ কাটা হবেনা এবং কোনো প্রাণী শিকার করা হবেনা। মুসলিম।
আর আহমদ ও আবু দাউদ আলী রা. থেকে বর্ণনা করেছেন : রসূল সা. মদিনা সম্পর্কে বলেছেন: কেউ এর গাছ কাটবেনা, কেউ এর শিকার তাড়াবেনা, এখানে পাওয়া কোনো হারানো জিনিস কুড়াবেনা, কেবল যে ব্যক্তি তা ঘোষণা করবে সে ব্যতিত। কোনো ব্যক্তি লড়াইর জন্য এখানে অস্ত্র বহন করবেনা, এখানে কেউ কোনো গাছ কাটবেনা কেবল যে ব্যক্তি তার উটকে খাওয়াতে চায় সে ব্যতিত। "বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রসূলুল্লাহ সা. বলেন: "ঈর পাহাড় থেকে দূর পাহাড় পর্যন্ত মদিনা একটি সম্মানিত নগরী।" আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: মদিনার দুই পাথুরে ভূখণ্ডের মাঝে রসূল সা. মদিনাকে সম্মানিত করেছেন এবং মদিনার চার পাশে বারো মাইল এলাকাকে সুরক্ষিত এলাকা বানিয়েছেন। দুই পাথুরে ভূখণ্ড পূর্ব দিকের পাথুরে ভূখণ্ড ও পশ্চিম দিকের পাথুরে ভূখণ্ডের মাঝে মদিনার হারাম শরিফের আয়তন বারো মাইল বলে ধারণা করা হয় যা ঈর থেকে ছুর পর্যন্ত বিস্তৃত। ঈর হলো মীকাতের নিকটবর্তী একটি পাহাড় আর ছুর উত্তর দিকে ওহদের পার্শ্ববর্তী পাহাড়।
রসূলুল্লাহ সা. মদিনাবাসীকে কৃষি সরঞ্জমাদি, বাহনের সরঞ্জমাদি, ইত্যাকার অপরিহার্য জিনিসপত্র তৈরি করার জন্য গাছ গাছালি কাটার অনুমতি দিয়েছেন। তাদের পশুদের খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ঘাস কাটারও অনুমতি দিয়েছেন।
আহমদ জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মদিনা তার দুই পাথরে ভূখণ্ডের মাঝে নিষিদ্ধ নগরী, এর সম্পূর্ণটাই সুরক্ষিত পশুকে খাওয়ানোর জন্য ব্যতিত এর কোনো গাছ কাটা যাবেনা।"
মক্কার হারাম শরিফের অবস্থা এর বিপরীত। কেননা মক্কাবাসী তাদের প্রয়োজনীয় যাবতীয় জিনিসে স্বয়ং সম্পূর্ণ। কিন্তু মদিনাবাসী তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিতে স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়। মদিনার হারাম শরিফের শিকার হত্যায় ও গাছ কাটায় কোনো বিনিময় দিতে হয়না। কিন্তু গুনাহ হয়।
বুখারিতে আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: মদিনা এখান থেকে ওখান পর্যন্ত সুরক্ষিত সম্মানিত নগরী। এর কোনো গাছ কাটা হবেনা। এখানে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব ঘটানো হবেনা। যে ব্যক্তি এখানে কোনো নতুন জিনিসের উদ্ভব ঘটাবে, তার ওপর আল্লাহর ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের অভিসম্পাত। যে ব্যক্তি মদিনার কোনো গাছ কর্তিত দেখতে পায়, তার জন্য কর্তিত অংশ নেয়া বৈধ। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত: তিনি আকীকে তার বাসভবনে গেলেন। সেখানে একটা ক্রীতদাসকে দেখলেন একটা গাছ কাটছে বা লাঠি দ্বারা গাছের পাতা পাড়ছে। তিনি তার কাছ থেকে তা কেড়ে নিলেন। পরে দাসটির আপন জনেরা এসে সা'দকে অনুরোধ করলো দাসটির কাছ থেকে কেড়ে নেয়া জিনিস ফেরত দিতে। সা'দ বললেন: আল্লাহর রসূল সা. যা আমাকে দান করেছেন, তা আমি কখনো দেবোনা। আল্লাহর কাছে এ থেকে আশ্রয় চাই। শেষ পর্যন্ত তিনি তা ফেরত দিলেন না। মুসলিম আবু দাউদ ও হাকেম বর্ণনা করেছেন, রসূল সা. বলেছেন: মদিনার হারাম শরিফে তোমরা যাকে শিকার করতে দেখবে। তার কাছ থেকে তোমরা তা কেড়ে নিতে পারো।
আর কোনো নিরাপদ হারাম আছে কি?
ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: মক্কা ও মদিনার এই দুই হারাম ব্যতিত সারা পৃথিবীতে আর কোনো হারাম শরিফ নেই। বাইতুল মাকদাস বা অন্য কোনো স্থান হারাম নয়। মক্কা ও মদিনা ব্যতিত পৃথিবীর আর কোনো স্থান হারাম নামে আখ্যায়িতও নয়। অজ্ঞ লোকেরা যদিও বাইতুল মাকদাসকে হারামুল মাকদাস এবং খলীল নগরীকে হারামুল খলীল নামে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এ দুটি বা অন্য কোনো স্থান মুসলমানদের সর্বসম্মত মত অনুসারে হারাম তথা নিরাপদ স্থান নয়। সর্বসম্মত হারাম হচ্ছে মক্কার হারাম শরিফ। অধিকাংশ আলেমের নিকট মদিনাও হারাম এবং এর পক্ষে রসূল সা. থেকে প্রচুর হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তায়েফের 'উজা' (وجاء) হচ্ছে একমাত্র তৃতীয় স্থান, যার হারাম হওয়া মুসলমানদের মধ্যে বিতর্কিত। শাফেয়ী ও শওকানিসহ কেউ কেউ এটিকে হারাম মনে করেন। কিন্তু অধিকাংশ আলেম ইমাম ও মনীষী একে হারাম মনে করেন না।