📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইহরাম

📄 ইহরাম


ইহরামের সংজ্ঞা: ইহরাম বলা হয় হজ্জ বা ওমরার নিয়ত করাকে অথবা উভয়টার নিয়ত করাকে। এটা হজ্জের রুকন অর্থাৎ ফরয ও অবিচ্ছেদ্য অংগ। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ .
"তাদেরকে শুধু এই আদেশই দেয়া হয়েছে যেন তারা একান্তভাবে আল্লাহর আনুগত্যের লক্ষ্যেই তাঁর ইবাদত করে।" আর রসূল সা. বলেছেন: নিয়ত দ্বারাই আমল স্থির হয়। প্রত্যেক মানুষ যা নিয়ত করে শুধু তাই পায়।" নিয়তের হাকীকত বা তাৎপর্য নিয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে (ওযু অধ্যায় দেখুন)। সেখানে বলা হয়েছে নিয়তের স্থান হলো মন। ইবনুল হুমাম বলেছেন: কোনো বর্ণনাকারী রসূল সা.কে একথা বলতে শোনেনি যে, আমি ওমরা বা হজ্জের নিয়ত করলাম।
ইহরামের জন্য কিছু নিয়ম বিধি বা আদব রয়েছে, যা মেনে চলা আবশ্যক। নিম্নে এই নিয়মবিধিগুলোর উল্লেখ করছি:
১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বোগলের পশম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের পশম কামানো, ওযু বা গোসল করা। গোসল করাই উত্তম। আর দাড়ি ও মাথার চুল পরিচ্ছন্ন করা। এসব কাজ দ্বারাই পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হতে পারে। ইবনে উমর রা. বলেছেন: ইহরামের ইচ্ছা করলে এবং মক্কায় প্রবেশ করতে চাইলে গোসল করা সুন্নত। -বাযযার, দার কুতনি, হাকেম।
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হায়েয ও নেফাসধারিণীরা ইহরামের গোসলের নিয়তে গোসল করবে। এতেই তার ইহরাম করা ও হজ্জ বা ওমরার সকল কাজ করা বৈধ হবে। তবে হায়েয ও নেফাস থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কাবা শরিফের তওয়াফ করতে পারবেনা। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি। (এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহদিস অবস্থায় ওযু প্রয়োজন এরূপ অপবিত্রাবস্থায় ইহরাম চলবে।)
২. সেলাই করা কাপড় বর্জন ও ইহরামের দুটো কাপড় পরিধান করা। এই দুটো কাপড়ের একটি হলো, মাথা ব্যতীত দেহের ওপরের অর্ধাংশ আচ্ছাদনকারী চাদর এবং শরীরের নিম্নের অর্ধাংশ আচ্ছাদনকারী সেলাইবিহীন লুঙ্গি। দুটোই সাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা সাদা কাপড় আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: রসূল সা. ও তার সাহাবিগণ বাহন থেকে নামা, তেল ব্যবহার করা এবং চাদর ও লুংগি পরিধান করার পর রওনা হলেন।-বুখারি।
৩. শরীরে ও পোশাকে সুগন্ধি লাগানো। চাই ইহরামের পরেও তাতে তার প্রভাব অবশিষ্ট থাকুক বা না থাকুক। কোনো কোনো আলেম এটা মাকরূহ মনে করলেও এ হাদিস তাদের অভিমত খণ্ডন করে। আয়েশা রা. বলেন: "ইহরাম অবস্থায় রসূল সা. এর চুলের সিঁথি সুগন্ধি দ্রব্যের কারণে যেভাবে চকচক করছিল, সে দৃশ্য যেনো আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি। -বুখারি, মুসলিম। বুখারি ও মুসলিম আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণনা করেন, ইহরামের পূর্বে আমি রসূল সা.কে ইহরামের জন্য এবং কংকর নিক্ষেপের পর তাঁর ইহরাম খোলার জন্য কা'বা শরিফের তওয়াফের পূর্বে আমি তাঁকে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম।' আয়েশা রা. বলেন: আমরা রসূল সা.-এর সাথে মক্কায় গিয়েছি, তখন ইহরামের সময় আমরা আমাদের কপালকে মেসক দ্বারা সুবাসিত করতাম। তারপর যখন আমাদের কেউ ঘর্মাক্ত হতো, তখন ঐ মেসক তার মুখমণ্ডল দিয়ে প্রবাহিত হতো। রসূল সা. তা দেখতেন। কিন্তু আমাদেরকে নিষেধ করতেন না। -আহমদ ও আবু দাউদ।
৪. দু'রাকাত নামায। ইহরামের সুন্নত হিসেবে নিয়ত করবে। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর 'কাফেরুন' এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়বে। ইবনে উমর রা. বলেছেন: রসূল সা. যুলহুলায়ফাতে দু'রাকাত নামায পড়তেন। -মুসলিম। এ সময় ফরয নামায পড়লে আর কোনো নামায পড়ার প্রয়োজন হবেনা, যেমন মসজিদে প্রবেশ করেই কেউ ফরয নামায পড়লে তাহিয়াতুল মসজিদ পড়ার প্রয়োজন হয়না। ইহরাম কয় প্রকার ও কি কি: ইহরাম তিন প্রকার: ১. কিরান, ২. তামাতু ও ৩. ইফরাদ। এই তিন প্রকারের ইহরামের সবকটাই সর্বসম্মত বৈধ।
আয়েশা রা. বলেছেন: বিদায় হজ্জের বছর আমরা রসূল সা.-এর সাথে বের হলাম। তখন আমাদের কেউবা ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছে। কেউ হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য ইহরাম বেঁধেছে, আবার কেউ শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধেছে রসূল সা. শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধলেন। যে ব্যক্তি শুধু ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছিল, যা তার তওয়াফ কুদুম অর্থাৎ মক্কায় পৌঁছেই তওয়াফ করে ইহরাম মুক্ত হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি শুধু হজ্জের ইহরাম বেঁধেছে, অথবা হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য ইহরাম বেঁধেছে, সে তাওয়াফে কুদুম দ্বারা ইহরামমুক্ত হয়নি। কেবল ১০ই জিলহজ্জ তারিখে কুরবানি ও চুল কামানোর মাধ্যমেই সে ইহরাম থেকে মুক্ত হতো।' -আহমদ, বুখারি, মুসলিম, মালেক।
কিরান ও তার অর্থ: মীকাত থেকে হজ্জ ও ওমরা উভয়ের উদ্দেশ্য ইহরাম বাঁধা এবং তালবিয়ার সময়ে বলা “লাব্বাইকা বিহাজ্জিন ওয়া উমরাতিন” (হজ্জ ও উমরা উভয়ের উদ্দেশ্যে বান্দা হাজির) এই ইহরামের কারণে ইহরামকারী হজ্জ ও ওমরার যাবতীয় কাজ করা পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।
তামাতু ও তার অর্থ: হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করা ও ওমরা করার বছরেই হজ্জ সমাধা করার নাম তামাত্তু। একে তামাতু (উপকৃত হওয়া) নামকরণ করার কারণ হলো, এ পদ্ধতিতে একজন ইহরামকারী একই বছরের হজ্জের মাসে হজ্জ ও ওমরা উভয় ইবাদত সমাধা করতে পারে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন না করেই। তাছাড়া ইহরামকারী ওমরা শেষে ইহরামমুক্ত হয়ে একজন সাধারণ মানুষের মতো সেলাই করা কাপড় ও সুগন্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারে।
তামাত্তুর পদ্ধতি হলো, মীকাত থেকে শুধু ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধতে হয় এবং তালবিয়া পড়ার সময় বলতে হয় : লাব্বাইকা বি উমরাতিন" (ওমরার জন্য বান্দা হাজির)
এ ইহরামের ফলে ইহরামকারীকে মক্কায় পৌঁছা কা'বার তওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা (চক্কর দেয়া) চুল কামানো বা ছাঁটা, অতপর ইহরাম মুক্ত হওয়া এবং ইহরামের কাপড় খুলে স্বাভাবিক কাপড় পরা এবং যা কিছু ইতিপূর্বে ইহরাম দ্বারা তার উপর হারাম হয়েছিল, তা হালাল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকতে হয়। তারপর যখন ৮ই জিলহজ্জ সমাগত হয়, তখন মক্কা থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধতে হয়।
ফাতহুল বারীতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ আলেমের মতে, তামাতু হলো, এক ব্যক্তি কর্তৃক একই সফরে একই বছরের হজ্জের মাসগুলোতে হজ্জ ও ওমরা একসাথে করা এবং প্রথমে ওমরা করা। এই শর্তগুলোর একটিও বাদ পড়লে তামাত্তু হবেনা।
ইফরাদের অর্থ: হজ্জ গমনেচ্ছু ব্যক্তি কর্তৃক মীকাত থেকে শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধা এবং “লাব্বাইক বিহাজ্জ” (হজ্জের জন্য বান্দা হাজির) বলে তালবিয়া পড়ার নাম ইফরাদ। ইফরাদের ইহরামকারী হজ্জের যাবতীয় কাজ সমাধা হওয়া পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকে। এরপর ইচ্ছা করলে সে ওমরা করতে পারবে।
তিন প্রকার ইহরামের মধ্যে কোন্টি উত্তম: সর্বোত্তম ইহরাম কোন্টি তা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। (আর এই মতভেদের কারণ হলো, রসূল সা. কোন্টি করেছেন তা নিয়ে মতভেদ। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, তিনি কিরান করেছেন। কেননা তিনি কুরবানির জন্তু সাথে নিয়ে গেছেন) শাফেয়ী মযহাবের মতে, ইফরাদ ও তামাত্তু কিরানের চেয়ে ভালো। কেননা তামাতু অথবা ইফরাদকারী হজ্জ ও ওমরা দুটোই পূর্ণাংগভাবে আদায় করতে সক্ষম। কিন্তু কিরানকারী শুধু হজ্জের কাজ আদায় করে থাকে। শাফেয়ীগণ আরো বলেছেন: তামাতু ও ইফরাদ সম্পর্কে দু'রকমের মত রয়েছে: একটি মত হলো: তামাতু ভালো। অপর মতে ইফরাদ ভালো। হানাফিগণ বলেন: তামাত্তু ও ইফরাদের চেয়ে কিরান ভালো। আর ইফরাদের চেয়ে তামাতু ভালো। মালেকীদের মতে, তামাতু ও কিরানের চেয়ে ইফরাদ ভালো। আর হাম্বলীদের নিকট তামাত্তু ও কিরান ইফরাদের চেয়ে ভালো। হাম্বলীদের মতটাই জনসাধারণের জন্য সহজতর ও অধিকতর নমনীয়। আর এটাই রসূল সা. নিজের জন্য কামনা করতেন এবং সাহাবিদেরকে করতে আদেশ দিতেন।
মুসলিম জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন, জাবের রা. বলেন: আমরা রসূলের সাহাবিরা শুধুমাত্র হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধতাম। রসূলুল্লাহ সা. জিলহজ্জ মাসের চার তারিখ সকালে এসে আমাদেরকে ইহরাম খোলার আদেশ দিলেন। তিনি বললেন: হালাল হয়ে যাও এবং স্ত্রীদের কাছে যাও। তিনি এটাকে বাধ্যতামূলক করেননি। তবে স্ত্রীদেরকে স্বামীদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। আমরা বললাম: আরাফা দিবসের মাত্র পাঁচদিন বাকি থাকতে আমাদেরকে এ রকম আদেশ কেন দেয়া হলো? আমরা আমাদের স্ত্রীদের কাছে যাবো। তারপর এমন অবস্থায় আরাফায় হাজির হবো যে আমরা তখনো অপবিত্র থাকবো। একথা শুনে রসূল সা. আমাদের সামনে এরূপ ভাষণ দিলেন: তোমরা তো জানো, আমি তোমাদের চেয়েও বেশি আল্লাহকে ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশি সত্যবাদী, তোমাদের চেয়ে বেশি পুণ্যবান! আমার সাথে যদি কুরবানির জন্তু না থাকতো, তাহলে আমিও তোমাদের মতো ইহরামমুক্ত হয়ে যেতাম। আমি নিজের ব্যাপারে যদি শৈথিল্যকামী হতাম, তাহলে সাথে করে কুরবানির জন্তু আনতামনা। সুতরাং তোমরা ইহরাম খোলো। অতএব আমরা ইহরাম খুললাম এবং আদেশ শুনলাম ও আনুগত্য করলাম।
সাধারণভাবেও ইহরাম বাঁধা জায়েয
যে ব্যক্তি ইহরামের এই প্রকারভেদ ও বিশদ বিবরণ না জানার কারণে এই তিন ধরনের ইহরামের কোনো একটির নাম উল্লেখ ছাড়াই কেবল আল্লাহর অর্পিত ফরয আদায়ের নিয়ত করে সাধারণভাবে ইহারাম বাঁধে, তার ইহরাম বৈধ ও শুদ্ধ হবে। আলেমগণ বলেন: কেউ যদি শুধু অন্যদের দেখাদেখি ইবাদতের নিয়তে ইহরাম বাঁধে ও তালবিয়া পড়ে, কোনো নাম উল্লেখ না করে এবং মনে মনেও কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ইহরামের চিন্তা না করে, ইফরাদ, কিরান বা তামাতু কোনোটারই উল্লেখ না করে, তার হজ্জও শুদ্ধ হবে। সে এই তিনটের যে কোনো একটা করতে পারে।
কিরান ও তামাত্তুকারীর তওয়াফ ও সাঈ এবং হারাম শরিফবাসীর জন্য শুধুই ইফরাদ: ইবনে আব্বাসকে তামাত্তু হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন: বিদায় হজ্জে আনসার, মুহাজির ও রসূলুল্লাহ সা. এর স্ত্রীগণ ইহরাম বাঁধলেন। আমরাও ইহরাম বাঁধলাম। যখন মক্কায় উপস্থিত হলাম, তখন রসূল সা. বললেন: হজ্জের জন্য কৃত তোমাদের ইহরামকে ওমরার জন্যও ইহরামে পরিণত করো। তবে যে ব্যক্তি কুরবানির জন্তুর সাথে করে নিয়ে এসেছে, তার কথা আলাদা। আমরা আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করলাম, সাফা ও মারওয়ায় সা'ঈ করলাম; স্ত্রীদের কাছে গেলাম ও পোশাক পরলাম। রসূল সা. বললেন: যে ব্যক্তি কুরবানির জন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, সে উক্ত জন্তু কুরবানির নির্দিষ্ট জায়গায় না পৌঁছা পর্যন্ত ইহরামমুক্ত হবেনা। তারপর ৮ই জিলহজ্জের সন্ধ্যায় আমাদেরকে হজ্জের ইহরাম বাঁধতে আদেশ দেয়া হলো। হজ্জের কাজগুলো সমাধা করার পর আমরা মক্কায় এলাম এবং কা'বার তওয়াফ করলাম ও সাফা মারওয়ার সা'ঈ করলাম। এ পর্যন্ত আমরা হজ্জ সমাধা করলাম এবং আমাদের ওপর কুরবানির হুকুম অবশিষ্ট রইল। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ، فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةِ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَى أَمْصَارِكُمْ .
“যে ব্যক্তি ওমরা দ্বারা হজ্জ পর্যন্ত উপকৃত হয়, সে যেন সাধ্যমত কুরবানি করে। যে ব্যক্তি কুরবানি করতে অক্ষম হয়, সে যেন হজ্জের দিনগুলোতে তিন দিন এবং দেশে ফিরে সাত দিন রোযা রাখে।" কুরবানির জন্য ছাগল যথেষ্ট। অতপর তারা এক বছরে দুটো ইবাদত হজ্জ ও ওমরা সমাধা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এটা তাঁর কিতাবে ও রসূলের সুন্নতে নাযিল করেছেন আর মক্কাবাসী ব্যতিত সকল মানুষের জন্য বৈধ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন:
ذَلِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ..
"এ ব্যবস্থা তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের অধিবাসী নয়।" আর যে মাসগুলোকে আল্লাহ হজ্জের মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তা হলো শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জ। এই মাসগুলোতে যে ব্যক্তি তামাকু করবে তার উপর কুরবানি অথবা রোযার হুকুম রয়েছে।-বুখারি।
১. এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হারাম শরিফের অধিকবাসীদের জন্য তামাত্তু ও কিরান কোনোটা নয়। তারা হজ্জ করলেও ইফরাদ ওমরা করলেও ইফরাদ করবে। (তবে মালেক, শাফেয়ী ও আহমদের মতে, মক্কাবাসী তামাতু ও কিরান করতে পারে। এটা তাদের জন্য মাকরূহ নয়।)
এটা ইবনে আব্বাস ও আবু হানিফার মত। তারা উপরোক্ত আয়াতের বরাত দিয়ে থাকেন। মসজিদুল হারামের অধিবাসী বলতে কি বুঝানো হয়েছে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মালেকের মতে, তারা মক্কাবাসী। তাহাবি এই মতকে অগ্রাধিকার দেন। ইবনে আব্বাস ও তাউস প্রমুখের মতে, এর অর্থ হারাম শরিফ থেকে কসর আদায় করতে হয় যত দূরত্বে তন্মধ্যে ন্যূনতম দূরত্বের অধিবাসী। ইবনে জারির এই মত সমর্থন করেছেন। হানাফীদের মতে, যার পরিবার পরিজন মীকাত বা তার চেয়ে কম দূরে অবস্থান করে। উল্লেখ্য যে, বসবাসের স্থানই ধর্তব্য, জন্মস্থান নয়।
হাদিস থেকে এ-ও জানা যায় যে, তামাত্তুকারীকে সর্বপ্রথম ওমরার জন্য তওয়াফ ও সাঈ করতে হবে। এতে তার তওয়াফে কুদুমের প্রয়োজন থাকবেনা। এরপর আরাফায় অবস্থানের পর তওয়াফে যিয়ারত ও তারপর সা'ঈ করতে হবে।
কিরান সম্পর্কে অধিকাংশ আলেমের মত হলো, তার জন্য হজ্জের কাজগুলোই যথেষ্ট। তাকে আরাফায় অবস্থানের পর শুধু একবার তওয়াফে যিয়ারত করতে হবে এবং একবার সাঈ করতে হবে। এই এক তওয়াফ ও এক সাঈ তার হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য যথেষ্ট। যেমন, ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। (পার্থক্য শুধু এই যে, কিরানে হজ্জ ও ওমরা উভয়ের নিয়ত করতে হয়। আর ইফরাদে শুধু হজ্জের।)
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধে, তার জন্য এক তওয়াফ ও এক সা'ঈ যথেষ্ট। -তিরমিযি।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধে, তার জন্য এক তওয়াফ ও এক সা'ঈ যথেষ্ট। -তিরমিযি।
মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. আয়েশাকে বলেছেন: তোমার কা'বায় এবং সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ তোমার হজ্জ ও ওমরার জন্য যথেষ্ট।
আবু হানিফার মতে, হজ্জ ও ওমরার জন্য দুটো করে তওয়াফ ও সা'ঈ জরুরি। কিন্তু প্রথমোক্ত মতটি অগ্রগণ্য। কেননা তার প্রমাণ অধিকতর শক্তিশালী।
এ হাদিস থেকে আরো জানা যাচ্ছে, কিরান ও তামাত্তুকারী উভয়ের কুরবানি করা জরুরি। অন্ততপক্ষে একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে। এটা করতে অক্ষম হলে হজ্জের ভেতরে তিনটে রোযা এবং দেশে ফিরে আসার পর সাতটা রোযা রাখতে হবে। হজ্জের সময়ে যে তিনটে রোযা রাখতে হবে, তা আরাফার দিনের আগে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে রাখা উত্তম। কোনো কোনো আলেম, যথা তাউস ও মুজাহিদ, শাওয়ালের শুরুতে রাখাও বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। ইবনে উমরের রা. মতে এই তিন রোযা এভাবে রাখা উচিত: ৮ই জিলহজ্জের আগে এক দিন, ৮ই জিলহজ্জ এবং ৯ই জিলহজ্জ। একদিন যদি রোযা না রাখে অথবা ঈদের আগে এর অংশ বিশেষ রাখে, তবে তার জন্য আইয়ামে তাশরিকে বাকি রোযাগুলো রাখা বৈধ। কেননা আয়েশা রা. ও ইবনে উমর রা. বলেছেন: আইয়ামে তাশরিকে রোযা রাখা জায়েয নেই। তবে যে ব্যক্তি কুরবানি দিতে পারেনা তার জন্য জায়েয।-বুখারি।
আর যখন হজ্জের ভেতরে তিনটি রোযা রাখা সম্ভব হয়না, তখন তা পরে কাযা করতে হবে। অবশিষ্ট সাত রোযা দেশে ফিরে এসে রাখতে হবে। কেউ বলেন: নিজের কাফেলার কাছে ফিরলে রাখা যাবে। শেষোক্ত মতানুসারে পথিমধ্যেই রোযা রাখা জায়েয। এই দশটা রোযা এক নাগাড়ে রাখা জরুরি নয়। আর যখন নিয়ত করবে ও ইহরাম করবে, তখন তাকে তালবিয়া পড়তে হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তালবিয়া (লাব্বাইকা বলা)

📄 তালবিয়া (লাব্বাইকা বলা)


তালবিয়া সংজ্ঞা বিধান:
আলেমগণ একমত যে, তালবিয়া হজ্জের একটি শরয়ী বিধান। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে মুহাম্মাদের বংশধর, তোমাদের মধ্যে য ব্যক্তি হজ্জ করবে, সে যেন তার হজ্জে তালবিয়া পড়ে। -আহমদ, ইবনে হিববান। (যমখশারীর মতে, লাব্বাইকা শব্দের অর্থ হলো, বান্দা সর্বক্ষণ তোমার আনুগত্যে বহাল আছে) শরিয়তে লাব্বাইকা বলা কতখানি জরুরি, কোন্ সময় বলতে হয় এবং বিলম্বিত হলে কী হবে, ইত্যাদি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ী ও আহমদের মতে এটা সুন্নত এবং ইহরামের সাথে সাথে এটা বলা মুস্তাহাব। কেউ যদি হজ্জ বা ওমরার নিয়ত করে এবং তালবিয়া উচ্চারণ না করে, তবে তার হজ্জ ও ওমরা শুদ্ধ হবে। কোনো কাফফারা ইত্যাদি তাকে দিতে হবেনা। কেননা শাফেয়ী ও আহমদের মতে, ইহরাম শুধু নিয়ত দ্বারাও শুদ্ধ হয়।
হানাফিদের মতে, তালবিয়া বা তার স্থলাভিষিক্ত বা তার কাছাকাছি অর্থবোধক দোয়া বা তাসবীহ এবং কুরবানির জন্তু নিয়ে যাওয়া ইহরামের অন্যতম শর্ত। তাই তালবিয়া বা তাসবীহ ব্যতীত এবং কুরবানির জন্তু ব্যতিত ইহরাম শুদ্ধ হয়না। হানাফীদের এই উক্তির ভিত্তি এই যে, তাদের নিকট ইহরাম হচ্ছে নিয়ত ও হজ্জের কোনো একটা কাজের সমন্বিত রূপ। তাই যখন কেউ ইহরামের নিয়ত করবে এবং হজ্জের কোনো না কোনো কাজ করবে, যেমন তাসবীহ বা তালবিয়া পড়বে অথবা তালবিয়া না পড়ে কুরবানির জন্তু সাথে নিয়ে যাবে, তখন তার ইহরাম বাঁধার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। তবে তালবিয়া পড়া বাদ দেয়ার কারণে দম (কুরবানি) দিতে হবে। মালেকী মাযহাবের সুপরিচিত মত হলো, তালবিয়া পড়া ওয়াজিব। তালবিয়া ত্যাগ করা বা ইহরামের অব্যবহিত পর তালবিয়া না পড়ায় যার কুরবানি দেয়া সামর্থ্য আছে তার ওপর কুরবানি দেয়া ওয়াজিব।
তালবিয়ার ভাষা:
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. এর তালবিয়া ছিলো এরূপ: لَبَيْكَ اللَّهُمَّ لَبِيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ.
নাফে বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এতে সংযোজন করতেন : লাব্বাইকা, লাব্বাইকা, লাব্বাইকা, ওয়া সাদাইকা, ওয়াল খাইরু বিয়াদাইকা, লাব্বাইকা ওয়ার রাগবাউ ইলাইকা ওয়াল আমালু।” আলেমগণ রসূল সা. এর তালবিয়ার মধ্যে তালবিয়াকে সীমিত রাখা মুস্তাহাব মনে করেন। এর ওপর অতিরিক্ত ভাষা সংযোজনে তাদের মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, সংযোজনে কোনো ক্ষতি নেই। কেননা ইবনে উমর রা. সহ বহু সাহাবি সংযোজন করতেন, রসূল সা. তা শুনেও কিছু বলতেন না। -আবু দাউদ, বায়হাকি।
মালেক ও আবু ইউসুফ রসূল সা. এর তালবিয়ার ওপর সংযোজনকে মাকরূহ মনে করেন।
তালবিয়ার ফযীলত:
ইবনে মাজাহ জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : কোনো ইহরামকারী যদি পুরো দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত তালবিয়া পড়ে কাটিয়ে দেয়, তবে তার গুনাহগুলো উধাও হয়ে যায়। ফলে সে সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।
তাবারানি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো তালবিয়াকারী তালবিয়া করলেই সুসংবাদ পায় এবং কোনো তকবীরদাতা তকবীর দিলেই (আল্লাহু আকবর বললে) সুসংবাদ পায়। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রসূলুল্লাহ, বেহেশতের সুসংবাদ? তিনি বললেন: হ্যাঁ।
সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো মুসলমান তালবিয়া পড়লে তার ডানে ও বামে যতো গাছ, পাথর বা নুড়িপাথর আছে, সবাই তার সাথে সাথে তালবিয়া পড়ে, যতক্ষণ না পৃথিবী এখান থেকে আর এখান থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। -ইবনে মাজাহ, বায়হাকি, তিরমিযি ও হাকেম।
তালবিয়া উচ্চস্বরে পড়া মুস্তাহাব:
যায়দ বিন খালেদ রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: আমার কাছে জিবরীল এসেছে এবং বলেছে: আপনার সাথিদেরকে আদেশ দিন উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়ুক। এটাই হজ্জের নিদর্শন। -ইবনে মাজাহ, আহমদ, ইবনে খুযায়মা ও হাকেম।
আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কি ধরনের হজ্জ উত্তম? তিনি বললেন: উচ্চস্বরে তালবিয় পড়া ও জন্তু কুরবানি করা হয় যে হজ্জে। -তিরমিযি, ইবনে মাজাহ।
আবু হাযেম বলেন: রসূল সা.এর সাহাবিগণ যখন ইহরাম বাঁধতেন, তখন রওহা পর্যন্ত পৌঁছাতে না পৌঁছতেই তাদের আওয়াজ প্রচণ্ড আকার ধারণ করতো। এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ আলেম উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া পছন্দ করেন।
ইমাম মালেক বলেছেন: ছোট ছোট মসজিদগুলোতে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া হবেনা। শুধু নিজেকে শুনানো যথেষ্ট। কেবল মিনার মসজিদ ও মসজিদুল হারামে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়বে। এ হলো পুরুষদের জন্য।
মহিলারা এমনভাবে তালবিয়া পড়বে যে, সে নিজে ও পার্শ্ববর্তী ব্যক্তি শুধু শুনতে পাবে। এর চেয়ে জোরে পড়া মাকরূহ। আতা বলেন: পুরুষরা উচ্চস্বরে ও মহিলারা শুধু নিজেকে শুনিয়ে তালবিয়া পড়বে।
যেসব ক্ষেত্রে তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব:
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও অবস্থায় তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব। যেমন বাহনে আরোহণের সময়, বাহন থেকে নামার সময় যখনই কোনো উচ্চ জায়গায় আরোহণ করা হয়, কোনো নিচু জায়গায় অবতরণ করা হয়, কিংবা কোনো আরোহীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। প্রত্যেক নামাযের শেষে এবং শেষ রাতে। ইমাম শাফেয়ীর মতে, সর্বাবস্থায় এটা পড়া মুস্তাহাব।
তালবিয়ার সময়:
ইহরামকারী ইহরামের সময় থেকেই তালবিয়া পড়া শুরু করবে এবং কুরবানির দিনের সর্বশেষ জামরাতুল আকাবায় প্রথম কংকর নিক্ষেপ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখবে। প্রথম কংকরের পর তালবিয়া বন্ধ করবে। কেননা রসূল সা. জামরায় পৌঁছা পর্যন্ত ক্রমাগত তালবিয়া পড়তেন। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
এটা হানাফী, শাফেয়ী, ছাওরী ও অধিকাংশ আলেমের অভিমত।
আহমদ ও ইসহাক বলেন: সবকটা কংকর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে, তারপর বন্ধ করবে। মালেক বলেন: আরাফার দিন সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়া পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে, তারপর বন্ধ করবে। এ হচ্ছে হজ্জের ক্ষেত্রে। কিন্তু ওমরাকারী হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করা পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে। কেননা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. ওমরায় তালবিয়া পড়া বন্ধ করতেন হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময়।-তিরমিযি।
অধিকাংশ আলেম এর ওপরই আমল করতেন *
তালাবিয়ার পর রসূল সা.-এর প্রতি সালাত পাঠ এবং দোয়া করা: কাসেম বিন মুহাম্মদ বিন আবু বকর থেকে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তির তালবিয়া পড়া শেষ হলে রসূল সা.-এর প্রতি সালাত বা দরূদ পড়া মুস্তাহাব। রসূলুল্লাহ সা. তালবিয়ার পর আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও তার সন্তোষ চাইতেন এবং খারাপ মানুষ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। -তাবারানি।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুহরিমের জন্যে জায়েয বৈধ

📄 মুহরিমের জন্যে জায়েয বৈধ


৭. মুহরিমের জন্য যেসব কাজ বৈধ:
১. গোসল করা ও ইহরামের কাপড় বদলানো: ইবরাহিম নাখয়ী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমাদের ইমামগণ যখন মাইমুনের কুয়ার কাছে আসতেন, তখন গোসল করতেন এবং ভালো পোশাক পরতেন। ইবনে আব্বাস জুহফার গোসলখানায় যখন প্রবেশ করতেন, তখন তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। তাকে বলা হলো: আপনি ইহরাম অবস্থায় গোসলখানায় ঢুকছেন? তিনি বললেন: আল্লাহ তায়ালার আমাদের শরীরের ময়লা ও আবর্জনার প্রয়োজন নেই।
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, ইহরামকারী গোসল করবে এবং নিজের কাপড় ধৌত করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে হুনাইন বলেন: ইবনে আব্বাস ও মিসওয়ার আবওয়াতে বিতর্কে লিপ্ত হলেন। ইবনে আব্বাস বললেন: ইহরামকারী তার মাথা ধুয়ে ফেলবে। মিসওয়ার বললেন: ইহরামকারী মাথা ধুবেনা। এরপর ইবনে আব্বাস আমাকে আবু আইয়ুব আনসারীর কাছে পাঠালেন। তাকে দেখলাম, পুকুরের দুই প্রান্তের মাঝে গোসল করছেন এবং একটা কাপড় নিয়ে চলেছেন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি বললেন: তুমি কে? আমি বললাম, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে হুনাইন। ইবনে আব্বাস আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করেছেন, রসূল সা. ইহরামে থাকা অবস্থায় কিভাবে গোসল করতেন? আবু আইয়ুব কাপড়ের উপর হাত রাখলেন এবং তা মাথার ওপর থেকে সরালেন। ফলে তার মাথা আমার সামনে উন্মোচিত হলো। তারপর বললেন: মানুষ মাত্রেই নিজের গায়ে পানি ঢালে। আমি ঢালছি। এই বলে তিনি মাথায় পানি ঢাললেন। তারপর নিজের হাত দ্বারা মাথা রগড়ালেন। হাত একবার সামনে একবার পেছনে নিলেন। তারপর বললেন: রসূল সা. কে এভাবেই গোসল করতে দেখেছি। -তিরমিযি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
বুখারি তাঁর বর্ণনায় সংযোজন করেছেন: এরপর আমি ইবনে আব্বাস ও মিসওয়ারের কাছে ফিরে গেলাম। তখন মিসওয়ার ইবনে আব্বাসকে বললেন: আমি আর কখনো আপনার সাথে তর্ক করবোনা। শওকানি বলেছেন, এ হাদিস প্রমাণ করে যে, ইহরামকারীর জন্য গোসল করা বৈধ। গোসলের সময় হাত দিয়ে মাথা ঢাকাও জায়েয। ইবনুল মুনযির বলেছেন: ইহরামকারীর বীর্যপাতজনিত অপবিত্রাবস্থা হলে গোসল করা ওয়াজিব- এ ব্যাপারে সবাই একমত। এছাড়া অন্যান্য অবস্থায় গোসল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মালেক তাঁর মুয়াত্তা গ্রন্থে নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনে উমর স্বপ্নদোষ হওয়া ছাড়া আর কোনো কারণে ইহরাম অবস্থায় মাথা ধুতেননা। মালেক থেকে বর্ণিত: ইহরামকারীর জন্য পানিতে মাথা ডুবিয়ে দেয়া মাকরূহ। ময়লা পরিষ্কারের সাবান ইত্যাদি ব্যবহার করা বৈধ। শাফেয়ী ও হাম্বলীদের মতে, সুগন্ধিযুক্ত সাবান দিয়ে গোসলা করা ইহরামকারীর জন্য বৈধ। অনুরূপ, চুলের বেশি বা খোপা ভাংগা ও চিরুনী দেয়া জায়েয। রসূল সা. আয়েশা রা. কে বলেছিলেন, তোমার চুলের গোছা ভাংগ এবং চিরুনী করো।-মুসলিম।
নববী বলেন: আমাদের মতে চুলের গোছা ভাংগা ও চিরুনী দেয়া ইহরামকারীর জন্য বৈধ। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে যেনো কোনো চুল উপরে না যায়। তবে বিনা ওযরে চিরুনী দেয়া মাকরূহ। তবে নিজের মালপত্র মাথায় বহন করায় দোষ নেই।
২. খাটো পাজামা পরা: বুখারি আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি (আয়েশা) ইহরামকারীর জন্য খাটো পাজামা পরায় কোনো দোষ আছে বলে মনে করতেন না। (এটা আয়েশা রা.-এর নিজস্ব মত। অধিকাংশের মত এই যে, (সেলাই করা পোশাক হিসেবে) পাজামা ও খাটো পাজামায় কোনো পার্থক্য নেই। দুটোই ইহরামকারীর জন্য নিষিদ্ধ। ফাতহুল বারী)
৩. মুখ ঢাকা: শাফেয়ী ও সাঈদ বিন মানসুর কাসেম থেকে বর্ণনা করেছেন: উসমান রা. যায়দ বিন ছাবেত ও মারওয়ান ইহরাম অবস্থায় মুখ ঢাকতেন। তাউস বলেন: ধুলাবালি থেকে রক্ষা পেতে ইহরামকারী মুখ ঢাকতে পারবে। মুজাহিদ বলেছেন: ইহরাম অবস্থায় প্রবল বাতাস প্রবাহিত হলে সাহাবিগণ মুখ ঢেকে চলতেন। কেউ এতে আপত্তি করতেন না।
৪. নারীর জন্য মোজা পরা: আবু দাউদ ও শাফেয়ী আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূল সা. মহিলাদের জন্য মোজা পরার অনুমতি দিয়েছেন।
৫. ভুলক্রমে মাথা ঢাকা: শাফেয়ীগণ বলেন: কেউ যদি ভুলক্রমে মাথা ঢাকে অথবা ভুলক্রমে জামা পরে, তবে তাতে কোনো ক্ষতি নেই। আতা বলেন; তার কোনো কাফফারা ইত্যাদি দিতে হবেনা। তবে আল্লাহর কাছে মাফ চাইতে হবে। হানাফীগণের মতে, তাকে ফিদিয়া দিতে হবে। না জেনে অথবা ভুলক্রমে সুগন্ধি ব্যবহার করলেও অনুরূপ মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ীদের মূলনীতি হলো অজ্ঞতা ও ভুল যে কোনো নিষিদ্ধ কাজে ওযর হিসেবে গণ্য। যার কারণে কোনো ফিদিয়া দিতে হয়না। তবে তাতে যদি কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় যেমন শিকার করা অথবা চুল কামানো ও নখ কাটা, তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
৬. রক্ত মোক্ষণ, ফোড়া ফুটো করা, দাঁত ফেলা ও রগ কাটা: রসূল সা. ইহরাম অবস্থায় মাথার মাঝখানে রক্ত মোক্ষণ করিয়েছিলেন। এর প্রমাণ আছে।*
মালেক বলেন: প্রয়োজনে ফোড়ায় ছিদ্র করা, ক্ষতস্থান বাঁধা ও রগ কাটাতে ক্ষতি নেই। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: ইহরামকারী দাঁত ফেলতে ও ফোড়া ফাটাতে পারে।
নববী বলেছেন: ইহরামকারী যদি বিনা প্রয়োজনে রক্ত মোক্ষণ করাতে চায়, তবে দেখতে হবে তাতে চুল কাটা জড়িত হয় কিনা। যদি হয় তার এ ধরনের রক্ত মোক্ষণ চুল কাটা জড়িত হওয়ার কারণে হারাম। তা না হলে অধিকাংশ আলেমের মতে হারাম নয়। কিন্তু মালেকের মতে মাকরূহ। হাসানের মতে চুল কাটা জড়িত না হলেও এজন্য ফিদিয়া দিতে হবে। যদি রক্ত মোক্ষণ জরুরি হয়ে থাকে তাহলে চুল কাটা ঠিক হবে। কিন্তু ফিদিয়া দিতে হবে। যাহেরী মযহাবের মতে শুধুমাত্র মাথার চুল কাটা পড়লে ফিদিয়া দিতে হবে।
৭. মাথা ও শরীর চুলকানো আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: তাকে ইহরামকারী শরীর চুলকাতে ও রগড়াতে পারবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: হ্যাঁ, বরং ভালোভাবে চুলকানো ও রগড়ানো উচিত। বুখারি, মুসলিম ও মালেক। মালেক সাংযোজন করেছেন: আয়েশা বলেন: যদি আমার হাত বেঁধে রাখা হতো তাহলে আমি পা দিয়ে চুলকাতাম ও রগড়াতাম। ইবনে আব্বাস, জাবের সাঈদ, আতা, ও ইবরাহিম নাখয়ী থেকেও অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
৮-৯. আয়না দেখা ও সুগন্ধি শুঁকা : বুখারি ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: ইহরামকারী সুগন্ধি শুঁকতে পারবে, আয়নাও দেখতে পারবে এবং তেল ও ঘি খাওয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে পারবে।
ওমর ইবনে আব্দুল আযীয রা. থেকে বর্ণিত, তিনি ইহরাম অবস্থায় আয়না দেখতেন এবং মেসওয়াক করতেন।
ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমগণ একমত যে, ইহরামকারীর জন্য তেল, চর্বি ও ঘি খাওয়া বৈধ এবং সমস্ত শরীরে সুগন্ধি মাখানো অবৈধ। আর হানাফীদের মতে, এমন ঘরে অবস্থান করা মাকরূহ, যেখানে আতর জাতীয় সুগন্ধি দ্রব্য রয়েছে, চাই তার ঘ্রাণ শুকার ইচ্ছা থাক বা না থাক। হাম্বলী ও শাফেয়ীদের মতে, ঘ্রাণ শুঁকার ইচ্ছা থাকলে হারাম, নচেত হারাম নয়।
শাফেয়ী মযহাবের মতে, সুগন্ধি বিক্রেতার কাছে এমন জায়গায় বসা জায়েয, যেখানে বাতাসে সুগন্ধি ছড়ায়। এটা ইচ্ছাকৃতভাবে সুগন্ধি ব্যবহারের পর্যায়ে পড়েনা। তবে এটা বর্জন করা মুস্তাহাব। কিন্তু বিশেষ বিশেষ স্থানে, যেখানে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় এটা বর্জন করা মুস্তাহাব নয়। যেমন কাবার নিকটে বসা যা সুবাসিত করা হয়ে থাকে। সেখানে এটা মাকরূহ নয়। কেননা কাবার নিকটে বসা আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহায়ক। সুতরাং একটা ঠিক কাজে সুবাস বর্জন মুস্তাহাব নয়। কোনো শিশি, বোতল বা নেকড়ায় বেধে সুগন্ধি দ্রব্য বহন করা বৈধ এবং কোনো ফিদিয়া দেয়া লাগবেনা।
১০-১১. ইহরামকারীর কোমরে টাকার থলি বেঁধে চলা ফেরা করা : ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: ইহরামকারীর টাকার থলি বহন ও আংটি পরাতে ক্ষতি নেই।
১২. সুরমা লাগানো : ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: চোখ দিয়ে পানি পড়ুক বা না পড়ুক ইহরামকারী এমন সুরমা ব্যবহার করতে পারবে, যাতে কোনো সুগন্ধি নেই। সাজসজ্জার জন্য না হয়ে চিকিৎসার জন্য সুরমা ব্যবহার সর্বসম্মতভাবে বৈধ।
১৩. ইহরামকারীর হাতা, তাঁবু, ছাদ বা অনুরূপ যে কোনো বস্তুর ছায়ায় অবস্থান : আব্দুল্লাহ ইবনে আমের রা. বলেন: আমি উমর রা. এর সাথে বেরিয়েছিলাম। তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় গাছের সাথে চামড়ার বিছানা টানিয়ে। তার ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছিলেন। -ইবনে আবি শায়বা।
উম্মে হুসাইন রা. বলেছেন: আমি রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে বিদায় হজ্জ করেছি। সে সময় উসামা ও বিলালকে দেখলাম। তাদের একজন রসূল সা. এর উটনীর বলগা ধরে রেখেছে। আর অপরজন তাঁর কাপড় উঁচিয়ে তাঁকে উত্তপ্ত রোদ থেকে আড়াল করছে। এভাবে তিনি জামরায় পাথর নিক্ষেপ করলেন। আহমদ ও মুসলিম।
আতা বলেন: ইহরামকারী রোদ থেকে নিজেকে ছায়ায় রাখবে এবং বৃষ্টি ও বাতাস থেকে নিজকে রক্ষণ করবে। ইবরাহিম নখয়ী বলেন: আসওয়াদ বিন ইয়াদ বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে নিজের মাথার উপর একটা কম্বল রেখেছিলেন। তখন তিনি ইহরামে ছিলেন।
১৪. মেহেদী দ্বারা রং লাগানো : হাম্বলীদের মতে, ইহরামকারী নারী হোক বা পুরুষ হোক, তার জন্য মাথা ছাড়া শরীরের আর কোনো জায়গায় মেহেদী দ্বারা রং লাগানো হারাম নয়। শাফেয়ী মাযহাবের মতে, ইহরাম বাঁধা অবস্থায় দুই পা ও দুই হাত ব্যতিত পুরুষের দেহের সকল অংশে মেহেদীর রং লাগানো জায়েয। বিনা প্রয়োজনে হাত ও পায়ে মেহেদীর রং লাগানো হারাম। মাথায় গাঢ় মেহেদী রং লাগাবেনা। ইহরামরত অবস্থায় মহিলার জন্য মেহেদীর রং লাগানো মাকরূহ। তবে স্বামীর মৃত্যুর পরবর্তী ইদ্দত চলাকালে মেহেদীর রং লাগানো হারাম।'
অনুরূপ নকশা করে মেহেদী লাগানো হারাম। হানাফী ও মালেকী মাযহাবের মতে, ইহরামকারী পুরুষ হোক বা মহিলা হোক, শরীরের কোনো অংশেই মেহেদীর রং লাগানো জায়েয নয়। কেননা এটা একটা সুগন্ধি যা ইহরামকারীর জন্য হারাম। মাওলা বিনতে হাকীমের মাতা বলেন: রসূলুল্লাহ সা. উম্মে সালমা রা. কে বললেন: তুমি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় সুগন্ধি ব্যবহার করোনা। মেহেদী স্পর্শ করোনা। কেননা ওটা সুগন্ধি। -তাবারানি ও বায়হাকি।
১৫. শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে চাকরকে মারধর করা: আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেছেন: আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে হজ্জে বেরিয়েছিলাম। যখন আরাযে পৌঁছলাম, তখন রসূল সা. এবং আমরা যাত্রাবিরতি করলাম। আয়েশা রা. রসূলুল্লাহ সা. এর পাশে বসলেন এবং আমি আবু বকরের পাশে বসলাম। রসূল সা. ও আবু বকরের সফরের সরঞ্জমাদি এক সাথেই ছিলো এবং আবু বকরের একজন চাকরের কাছে ছিলো। আবু বকর রা. তাঁর চাকরের অপেক্ষায় ছিলেন। সে উপস্থিত হলো। কিন্তু তার সাথে তার উটটা ছিলনা। তিনি বললেন তোমার উটটা কোথায়? সে বললো: গত রাতে সেটি হারিয়ে ফেলেছি। আবু বকর রা. বললেন: একটা মাত্র উট। তাও হারিয়ে ফেলেছিস? বলেই তাকে প্রহার করলেন। রসূল সা. তা দেখে মুচকি হাসতে লাগলেন। বললেন: এই ইহরামকারীকে দেখো। কী করেছে? রসূল সা. শুধু এই ইহরামকারীকে দেখো কী করছে একথা বলছিলেন আর মুচকি হাসছিলেন। এর বেশি কিছুই বলছিলেন না।-আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ।
১৬. মাছি, আঠালি ও পিঁপড়ে হত্যা করা: এক ব্যক্তি আতাকে জিজ্ঞাসা করলো গা বেয়ে ওঠা আঠালি ও পিঁপড়ে ইহরাম চলাকালে হত্যা করা যাবে কিনা? জবাবে তিনি বললেন: যা তোমার শরীরের অংশ নয়, তা ফেলে দাও। ইবনে আব্বাস রা. বললেন: ইহরামকারী ছোট বড় সব রকমের আঠালি হত্যা করতে পারবে। ইহরামকারীর উটের শরীর থেকে আঠালি ফেলে দেয়া জায়েয। ইকরামা বলেছেন: তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ইবনে আব্বাস তাকে একটা উটের আঠালি ফেলার আদেশ দিলেন। এ আদেশ ইকরামা অপছন্দ করলেন। ইবনে আব্বাস বললেন: যাও, উটটা যবাই করো। ইকরামা তৎক্ষণাৎ সেটি যবাই করলেন। ইবনে আব্বাস তাকে মৃদু ভর্ৎসনা করে বললেন: এখন এই উটটার ছোট বড় কতোগুলো আঠালি তুমি হত্যা করলে?
১৭. পাঁচটা ব্যতিক্রমী প্রাণী এবং প্রত্যেক কষ্টদায়ক প্রাণী হত্যা: আয়েশা রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: পাঁচটা প্রাণী ব্যতিক্রমী। হারাম শরিফের ভেতের ও বাইরে তাদেরকে ইহরাম চলাকালে হত্যা করা যাবে। কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও দংশনকারী কুকুর। -মুসলিম ও বুখারি। বুখারি এগুলোর সাথে সাপও সংযোজন করেছেন।
ফসল থেকে ছোট কাকও ইহরাম অবস্থায় হত্যা করা আলেমদের সর্বসম্মত মতানুসারে বৈধ। দংশনকারী কুকুর বলতে এমন জন্তুকে বুঝায়, যা মানুষকে কামড়ায়, ভয় দেখায় ও মানুষের উপর হামলা করে, যেমন সিংহ ও বাঘ।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: يَسْأَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ ؟ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتِ، وَمَا عَلَّمْتُم مِنَ الْجَوَارِحِ مُكَلِّبِينَ تُعَلِّمُونَهُن مِمَّا عَلَيْكُمُ اللهُ .
"লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কি কি জিনিস তাদের জন্য হালাল করা হয়েছে? আপনি বলুন, তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে পবিত্র জিনিসসমূহ এবং যেসব শিকারি পশু পাখিকে তোমরা শিকারের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছো, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন।" শিকারি পশুপাখি দ্বারা সেসব হিংস্র পশু ও পাখিকে বুঝায় যাদেরকে শিকার ধরে আনার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় যেমন কুকুর ও বাজপাখি। হানাফী মাযহাবের মত হলো, কুকুর শব্দ দ্বারা শুধু কুকুর ও বাঘকেই বুঝানো হবে, অন্য কিছু নয়। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: যেসব প্রাণী স্বভাবগতভাবেই মানুষকে কষ্ট দেয়, যেমন সাপ, বিচ্ছু। ইঁদুর, কাক ও কামড়ানো কুকুর সেগুলোকে হত্যা করা ইহরামকারীর জন্য বৈধ।
তাছাড়া সেসব মানুষ ও জীবজন্তুকেও জাতিরোধ করা বৈধ, যারা তাকে নির্যাতন ও উৎপীড়ন করে। এমনকি এদের কেউ যদি তার ওপর আক্রমণ চালায় এবং তার সাথে যুদ্ধ না করা ব্যতিত সে নিবৃত হয়না, তাহলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও বৈধ। কেননা রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, যে ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ। যে ব্যক্তি নিজের ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ এবং যে ব্যক্তি নিজের মান সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ।' উকুন ও মশা যখন ইহরামকারীকে কামড়ায়, তখন তাকে হত্যা করা তার জন্য বৈধ। এতে তাকে কোনো কাফফারা দিতে হবেনা। তবে তাকে হত্যা করার চেয়ে তাড়িয়ে দেয়া উত্তম। আলেমদের অধিকাংশের মতে, বাঘ ও সিংহের ন্যায় হিংস্র প্রাণী হত্যা করলেও কোনো কাফফারা দিতে হবেনা। মাথায় কোনো অশ্বস্তি না থাকা সত্ত্বেও উকুন বাছা এক ধরনের বিনোদন। এটা করা অনুচিত। তবে করলে কোনো কাফফরা দিতে হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মুহরিমের জন্যে যা যা নিষিদ্ধ

📄 মুহরিমের জন্যে যা যা নিষিদ্ধ


৮. মুহরিমের জন্যে যা যা নিষিদ্ধ
শরিয়ত মুহরিম বা ইহরামকারীর জন্য কিছু কাজ নিষিদ্ধ ও হারাম করেছে। সেগুলো নিম্নে উল্লেখ করছি:
১. স্ত্রী সহবাস এবং স্ত্রী সহবাসের প্ররোচনা ও কামোত্তেজনা সৃষ্টি করে এমন যাবতীয় কাজ যেমন চুম্বন, যৌন আবেগ সহকারে স্পর্শ করা এবং পুরুষ কর্তৃক স্ত্রীকে সহবাস সম্পর্কীয় কথাবার্তা বলা।
২. মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে ঠেলে দেয় এমন যে কোনো গুনাহর কাজ করা।
৩. সফর সংগী, চাকর বাকর ইত্যাদির সাথে ঝগড়া করা ও কটু বাক্য উমরণ করা। কেননা আল্লাহ বলেছেন: فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الحَجِّ فَلاَرَفَتْ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ .
যে ব্যক্তি হজ্জের সংকল্প করবে, সে যেন কোনো অশ্লীল কথা বা কাজ, গুনাহর কাজ ও ঝগড়া ঝাটি হজ্জের মধ্যে না করে। (ঝগড়া ঝাটি দ্বারা অন্যায় ঝগড়া বুঝানো হয়েছে। সত্য ও ন্যায়ের স্বার্থে বিতর্ক করা মুস্তাহাব বা ওয়াজিব।)
বুখারি ও মুসলিম আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি এমনভাবে হজ্জ করলো যে, তার মাঝে কোনো অশ্লীলতা ও নিষিদ্ধ কাজ করলোনা, সে যখন বাড়িতে ফিরবে তখন সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো হয়ে বাড়িতে ফিরবে (অর্থাৎ নিষ্পাপ অবস্থা)।"
৪. যে কোনো সেলাই করা পোশাক পরা। যেমন জামা, পাজামা, টুপি ইত্যাদি। অনুরূপ শান শওকতের রংগীন পোশাক জুতা ও মোজা পরা।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী জামা, পাগড়ি, টুপি, সুগন্ধি মাখানো কাপড় ও মোজা পরবেনা। তবে যার জুতা নেই, সে মোজার পায়ের গিরে পর্যন্ত অংশ কেটে ফেলে দিয়ে মোজা পরতে পারে। যাতে মোজা গিরের নিচে থাকে। বুখারি ও মুসলিম।
আলেমগণ একমত যে, এই বিধি শুধু পুরুষদের বেলায় প্রযোজ্য। মহিলাদের ক্ষেত্রে এই বিধি প্রযোজ্য নয়। তারা এসব পোশাক পরতে পারে। কেবল সুগন্ধি মাখানো কাপড়, নিকাব ও হাত মোজা পরতে পারবেনা। কেননা ইবনে উমর রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. মহিলাদেরকে ইহরাম অবস্থায় হাত মোজা, নিকাব ও সুগন্ধি মাখানো কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। তারপর হলুদসহ যে কোনো রং এর কাপড়, রেশম গহনা, জামা, পাজামা, বা মোজা পরতে পারে। আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।
বুখারি জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন! রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী নারী নিকাব পরবেনা ও হাত মোজা পরবেনা।
এ হাদিস থেকে প্রমাণিত, নারীর ইহরাম তার চেহারায় ও হাতের তালুতে। আলেমগণ বলেছেন কোনো জিনিস দিয়ে যদি মুখ ঢেকে রাখে, তবে তাতে ক্ষতি নেই। ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, মুখ খোলার শর্ত আরোপ করা দুর্বল ও ভিত্তিহীন। ছাতা ইত্যাদি দিয়ে পুরুষের দৃষ্টি থেকে মুখ আড়াল করা বৈধ। তবে ফেতনার (গুনাহর প্ররোচনা) আশংকা থাকলে মুখমণ্ডলকে দৃষ্টির আড়াল করা ওয়াজিব।
আয়েশা রা. বলেছেন: আমরা রসূল সা. এর সাথে ইহরাম সহ চলতাম। তখন পুরুষ উষ্ট্রারোহীরা আমাদের কাছ দিয়ে যেতো। যখন তারা আমাদের মুখোমুখি হতো, তখন আমরা আমাদের মুখে ঘোমটা দিতাম। তারা চলে গেলে আবার মুখ খুলতাম। আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। আতা, মালেক, ছাওরী, শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক মুখের ওপর কাপড় ঝুলিয়ে দেয়ার পক্ষে।
যে ব্যক্তি লুংগী চাদর ও জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, সে যা পায় তাই পরবে। ইবনে আব্বাস রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. আরাফাতে ভাষণ দিলেন। ভাষণে বললেন: যে ব্যক্তি (সেলাইবিহীন) লুংগী সংগ্রহ করতে পারেনি, সে যেনো পাজামা পরে আর যখন জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, তখন সে যেনো মোজা পরে। -আহমদ, বুখারি, মুসলিম। আহমদ কর্তৃক বর্ণিত অপর হাদিসে রসূল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি ইযার (সেলাইবিহীন লুংগী) সংগ্রহ করতে পারেনা, পাজামা সংগ্রহ করতে পারে, সে যেনো পাজামাই পরে। আর যে জুতা সংগ্রহ করতে পারেনা, মোজা সংগ্রহ করতে পারে, সে যেনো মোজাই পরে। এ হাদিসে মোজা ছোট পরার আদেশ নেই।
এটাই আহমদের মত। তিনি ইহরামকারীকে পাজামা ও মোজা পরার অনুমতি দিয়েছেন যখন সে জুতা ও লুংগী সংগ্রহ করতে অক্ষম হয়। এ অবস্থায় তাকে কোনো কাফফারাও দিতে হবেনা। অধিকাংশ আলেমের অনুসৃত মত হলো, যে ব্যক্তির জুতা নেই, সে মোজা পরবে গিরে পর্যন্ত কেটে। কেননা এতে মোজা জুতার মতো হয়ে যায়। হানাফীদের মতে, যার লুংগী নেই সে পাজামা ফেড়ে ও সেলাই খুলে ফেলে ব্যবহার করবে। সেলাইসহ পরলে ফিদিয়া দিতে হবে। মালেক ও শাফেয়ী বলেছেন: পাজামার সেলাই খুলতে হবেনা, যেভাবে আছে, সেভাবেই পরবে এবং ফিদিয়া দিতে হবেনা। জাবের রা. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূল সা. বলেছেন। যখন ইযার সংগৃহীত হবেনা, তখন পাজামা পড়বে আর যখন জুতা সংগৃহীত হবেনা, তখন সে মোজা পরবে এবং গিরের নিচ পর্যন্ত রেখে মোজার উপরের অংশ কেটে ফেলবে। -নাসায়ী।
পাজামা পরার পর যদি লুংগী যোগাড় হয়, তাহলে পাজামা খুলে ফেলতে হবে। কিন্তু চাদর সংগৃহীত না হলে জামা পরা যাবেনা। কেননা সে যখন জামা পরবে তখন পাজামার সাথে লুংগী পরতে পারবেনা।
৫. নিজের বিয়ের জন্য অথবা অন্যের বিয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া: ইহরাম অবস্থায় এ ধরনের চুক্তি করলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে এবং এর উপর কোনো আইনানুগ প্রভাব পড়বেনা। কেননা মুসলিম উসমান রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ইহরামকারী নিজেও বিয়ে করবেনা, অন্য কাউকেও বিয়ে করাবেনা, বিয়ের প্রস্তাবও দেবেনা। তিরমিযিতে প্রস্তাব দেবেনা একথা নেই। এই হাদিস অনুযায়ী মালেক, শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক। ইহরামকারীর জন্য বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেন এবং বিয়ে করলে তা বাতিল গণ্য করেন। "রসূলুল্লাহ সা. ইহরাম অবস্থায় মাইমুনাকে বিয়ে করেছেন" এই মর্মে যে হাদিস বর্ণিত আছে, মুসলিম বর্ণিত হাদিস তার বিপক্ষে। মুসলিমের হাদিসে আছে যে রসূলুল্লাহ সা. ইহরামমুক্ত অবস্থায় তাকে বিয়ে করেছেন। তিরমিযি বলেছেন: রসূল সা. কর্তৃক মাইমুনাকে বিয়ে করার ঘটনা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারণ তিনি তাকে মক্কার পথে বিয়ে করেছেন। তাই কেউ কেউ বলেছেন: তা ছিলো তিনি ইহরামমুক্ত অবস্থায় তাকে বিয়ে করেছেন। তবে এই বিয়ের খবর প্রচারিত হয় তার ইহরাম অবস্থায়। তারপর তাঁর বাসর হয় 'সারাফে' ইহরাম মুক্ত অবস্থায়।
হানাফীদের মতে, ইহরাম অবস্থায় বিয়ের আকদ করা বৈধ। কেননা ইহরাম মহিলার বিয়ের আকদকে নিষিদ্ধ করেনা। সহবাসকে নিষিদ্ধ করে। বিয়ের আকদের বৈধতা ইহরামের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়না।
৬ ও ৭. নখ কাটা, চুল কামানো বা ছাঁটা-চাই তা মাথার চুল হোক বা অন্য কোনো চুল হোক। কেননা আল্লাহ বলেছেন: وَلَا تَحْلِقُوا رُووَسَكُمْ حَتَّى يَبْلُغَ الْهَدْيُ مَحِلَّهُ .
"তোমরা কুরবানির জন্তু কুরবানির জায়গায় না পৌঁছা পর্যন্ত তোমাদের মাথা কামিওনা।" বিনা ওযরে ইহরামকারীর নখ কাটা যে হারাম সে ব্যাপারে সকল আলেম একমত। তবে নখ যদি ভেংগে গিয়ে থাকে, তাহলে তা ফেলে দেয়া যাবে। এজন্য কোনো ফিদিয়া দিতে হবেনা। চুল রাখা যদি কষ্টদায়ক হয়, তাহলে তা ফেলে দেয়া বৈধ। তবে ফিদিয়া দিতে হবে। কিন্তু চোখের ভ্রু যদি ইহরামকারীর জন্য কষ্টদায়ক হয়, তাহলে তা ফিদিয়া ছাড়াই ফেলে দেয়া যাবে। কিন্তু মালেকীদের মতে, ফিদিয়া দিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ مَرِيضًا أَوْ بِهِ أَذًى مِنْ رَأْسِهِ فَفِدْيَةٌ مِنْ صِيَامٍ أَوْ صَدَقَةٍ أَوْ نُسُكِ .
"তোমাদের কেউ রুগ্ন হলে অথবা মাথা ব্যথায় অশান্তি হলে তাকে রোযা, সদকা কিংবা কুরবানির মাধ্যমে ফিদিয়া দিতে হবে।
৮. পুরুষ বা মহিলার কাপড় বা শরীরে সুগন্ধি মাখানো: ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, উমর রা. মোয়াবিয়ার শরীর থেকে সুগন্ধির ঘ্রাণ পেলেন। অথচ মোয়াবিয়া তখন ইহরামের অবস্থায়। তিনি তাকে বললেন: যাও, ওটা ধুয়ে এসো। কেননা আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি: যে ব্যক্তি হজ্জ করে, সে ধুলোমলিন ও সুগন্ধিহীন থাকে। -বাযযার।
রসূলুল্লাহ সা. আরো একজনকে তিনবার বলেছিলেন: তোমার গায়ে যে সুগন্ধি রয়েছে, তা ধুয়ে ফেলো।
ইহরাম অবস্থায় কেউ মারা গেলে তাকে গোসল দেয়া ও কাফন পরানোর সময় সুগন্ধি লাগানো যাবেনা। কেননা রসূলুল্লাহ সা. ইহরাম অবস্থায় মৃত এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেন: তোমরা ওর মাথা ঢেকোনা এবং ওকে সগন্ধি মেখোনা। কেয়ামতের দিন সে যখন পুনরুজ্জীবিত হবে, তখন লাব্বাইকা লাব্বাইকা বলতে থাকবে। তবে ইহরামের পূর্ব থেকে তার শরীরে ও কাপড়ে সুগন্ধির কিছু রেশ অবশিষ্ট থাকলে তাতে কোনো আপত্তি নেই। যে উদ্ভিদ সুগন্ধির উদ্দেশ্যে জন্মেনা, যেমন আপেল ইত্যাদির গাছ তার মধ্যে বিদ্যমান সুগন্ধির ঘ্রাণ নেয়ার অনুমতি আছে। কেননা যেসব উদ্ভিদে সুগন্ধি প্রত্যাশা করা হয়না এবং সুগন্ধি গ্রহণও করা হয়না, আপেল ইত্যাদির গাছ তারই সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে কা'বা শরিফের গায়ে লেগে থাকা সুগন্ধি কোনো ইহরামকারীর গায়ে লেগে গেলে তার হুকুম কি হবে, সে সম্পর্কে সালেহ বিন কায়সান বলেন: আমি আনাস বিন মালেককে দেখেছি, তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর কাপড়ে কাবার সুগন্ধি লেগে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি তা ধোননি। আতা বলেছেন: এটা ধোয়ারও প্রয়োজন নেই, কোনো ফিদিয়া বা কাফফারাও দেয়া লাগবেনা। তবে শাফেয়ী মাযহাবের মতানুসারে কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কাবা শরীফের সুগন্ধি নিজের কাপড়ে বা দেহে লাগায় অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে লেগে যায় কিন্তু ধোয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ধুয়ে ফেলেনা, সে গুনাহর কাজ করে এবং তাকে ফিদিয়া দিতে হবে।
৯. সুগন্ধিযুক্ত রং মাখা কাপড় পরা: সুগন্ধিযুক্ত রং মাখা কাপড় পরা সর্বসম্মতভাবে হারাম এ ধরনের কাপড় পরতে হলে ধুয়ে পরতে হবে। যাতে তা থেকে কোনো সুগন্ধি বের না হয়।
কেননা নাফে থেকে ইবনে আব্দুল বার ও তাহাবি বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যাফরান বা অনুরূপ কোনো সুগন্ধি মাখা কাপড় না ধুয়ে ইহরাম অবস্থায় পরোনা।"
যে সকল ব্যক্তি অন্যদের জন্য অনুসরণীয় ও আদর্শ স্থানীয় তাদের জন্য এ ধরনের পোশাক (ধৌত করা অবস্থায়ও) পরা বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা এতে সাধারণ মানুষ নিষিদ্ধ সুগন্ধিযুক্ত পোশাক পরার প্ররোচনা লাভ করতে পারে। কেননা মালেক নাফে থেকে বর্ণনা করেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাবের মুক্ত গোলাম আসলাম বলেছেন: উমর রা. তালহা বিন উবায়দুল্লাহর পরিধানে একটা রং মাখানো পোশাক দেখতে পেলেন। তালহা তখন ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। উমর রা. বললেন, হে তালহা, এই রং মাখানো কাপড় কেন? তালহা বললেন: হে আমিরুল মুমিনীন ওটাকে লাল রং এর মুক্তা দ্বারা রঙ্গীন করা হয়েছে। উমর রা. বললেন, তোমরা হচ্ছো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যাদেরকে সাধারণ মানুষ অনুসরণ করে থাকে। একজন অজ্ঞ ব্যক্তি যদি এই পোশাক দেখে তবে অবশ্যই বলবে: তালহা বিন ওবায়দুল্লাহ ইহরামকালে রঙ্গীন পোশাক পরতো।' সুতরাং তোমরা এ ধরনের রঙ্গীন পোশাক পরোনা।"
কোনো রান্না করা খাবারে বা পানীয়ে যদি সুগন্ধিযুক্ত কিছু দেয়া হয়, কিন্তু তাতে কোনো স্বাদ, গন্ধ বা রং অবশিষ্ট না থাকে, তবে ইহরামকারী তা খেলে তাকে কোনো ফিদিয়া দিতে হবেনা। কিন্তু ঘ্রাণ অবশিষ্ট থাকলে শাফেয়ী মাযহাব অনুসারে তা খেয়ে ফিদিয়া দিতে হবে। হানাফীদের মতে ফিদিয়া দিতে হবেনা। কেননা সে তো সুগন্ধি উপভোগ করতে ইচ্ছা করেনি।
১০. শিকার: করা ইহরামকারীর জন্য জলজ প্রাণী শিকর করা, শিকার দেখিয়ে দেয়া ও তার গোশত খাওয়া বৈধ। কিন্তু স্থলজাত প্রাণী শিকার করা, হত্যা করা, যবাই করা, দর্শনীয় হলে দেখিয়ে দেয়া, দর্শনীয় না হলে তার সন্ধান দেয়া অথবা আতংকিত করে পালাতে প্ররোচিত করা হারাম। স্থলজাত প্রাণীর ডিম নষ্ট করা, ক্রয় বিক্রয় করা ও তার দুধ দোহানোও হারাম। (যে সকল প্রাণী স্থলে জন্মে ও সন্তান জন্ম দেয়, তা স্থলজাত প্রাণী, চাই তা পানিতে বাস করুক না কেন। জলজ প্রাণী ঠিক এর বিপরীত। এটা অধিকাংশ আলেমের মত। শাফেয়ীদের মতে যে প্রাণী শুধু স্থলে অথবা জলে ও স্থলে উভয় জায়গায় বাস করে, তা স্থলজ প্রাণী। আর যে প্রাণী পানিতে ছাড়া বাসই করেনা তা জলজ প্রাণী।) আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ الْبَحْرِ وَطَعَامُهُ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِ وَحَرَّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ البَرِّ مَا دُمْتُمْ حَرَمًا .
"তোমাদের ও পথিকদের ভোগের উদ্দেশ্যে তোমাদের জন্য জলজ প্রাণী শিকার করা ও খাওয়া হালাল করা হয়েছে। আর তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে স্থলের শিকার ধরা যতোক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাকবে।" (উল্লেখ্য যে, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবে শুধুমাত্র হালাল বনজ প্রাণী ও হালাল পাখি শিকর করা হারাম। এ ছাড়া অন্য সকল স্থলজ প্রাণী শিকার ও হত্যা করা বৈধ। কিন্তু অন্যান্য অধিকাংশ আলেমের মতে, হাদিসে নিষিদ্ধ পাঁচটি প্রাণী যথা: কাক, চিল, বিচ্ছু, ইঁদুর ও কামড়ানো কুকুর ব্যতীত আর সকল প্রাণী হারাম শরিফের বাইরে বা ভেতরে হত্যা করা হারাম, চাই তা হালাল জন্তু হোক বা হারাম জন্তু হোক।)
১১. ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে, তার সাহায্যে বা তাঁর ইংগিতে শিকার করা জন্তুর গোশত খাওয়া ইহরামকারীর জন্য হারাম। কেননা বুখারি ও মুসলিম কাতাদা থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার রসূলুল্লাহ সা. হজ্জ করার উদ্দেশ্যে সফরে বের হলেন। তাঁর সাথে সাহাবিদের একটি দলও বেরুলো। আবু কাতাদাসহ একটি দলকে তিনি পৃথক করে দিয়ে বললেন: তোমরা সমুদ্রের কিনার দিয়ে চলতে থাকো, যতোক্ষণ না আমরা পরস্পরের সাথে মিলিত হই। তারা সমুদ্রের কিনার ধরে চলতে লাগলো। যখন তারা রওয়ানা হলো, তখন আবু কাতাদা ছাড়া সবাই ইহরাম বাঁধলো। চলার পথে তারা কতকগুলো বুনো গাধা দেখতে পেলো। আবু কাতাদা গাধাগুলোর ওপর হামলা করে একটি মাদী গাধাকে হত্যা করলো। সবাই যাত্রা বিরতি করে ঐ গাধার গোশত খেলো। তারা প্রশ্ন তুললো : আমরা তো ইহরামকারী। আমাদের কি শিকারের গোশত খাওয়া ঠিক হলো? মাদী গাধার উদ্বৃত্ত গোস্ত তারা সাথে করে নিয়ে গেলো। যখন রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে উপস্থিত হলো, তখন বললো: হে রসূলুল্লাহ, আমরা ইহরাম বেঁধেছিলাম কিন্তু আবু কাতাদা ইহরাম বাঁধেনি। পরে আমরা যখন এক পাল বুনো গাধার সাক্ষাৎ পেলাম, তখন আবু কাতাদা তাদের ওপর আক্রমণ চালালো এবং একটা মাদী গাধাকে হত্যা করলো। তারপর আমরা যাত্রা বিরতি করলাম এবং গাধার গোশত খেলাম। তারপর আমরা প্রশ্ন তুললাম যে, ইহরাম অবস্থায় আমাদের শিকারের গোশত খাওয়া কি বৈধ? আমরা উদ্বৃত্ত গোশত সাথে করে নিয়ে এসেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমাদের কেউ কি আবু কাতাদাকে আক্রমণ করতে আদেশ বা ইংগিত দিয়েছিল? তারা বললো না! রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে তোমরা অবশিষ্ট গোশত খেয়ে ফেলো।
ইহরামকারীর জন্য এমন শিকারের গোশত খাওয়া বৈধ যা সে নিজেও শিকার করেনি, তার জন্যও শিকার করা হয়নি। সে শিকার দেখিয়েও দেয়নি। শিকার ধরতে সাহায্যও করেনি। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: স্থলজ প্রাণী তোমাদের জন্য ইহরাম অবস্থায় খাওয়া হালাল। যদি তোমরা স্বয়ং তা শিকার না করে থাকো, কিংবা তোমাদের জন্য শিকার না করা হয়ে থাকে।” আহমদ ও তিরমিযি। কিছু আলেমের মতে, এই হাদিস অনুযায়ী ইহরামকারী নিজে শিকার না করলে বা তার জন্য শিকার করা না হয়ে থাকলে তার জন্য শিকারের গোশত খাওয়া বৈধ। শাফেয়ী, আহমদ, ইসহাক, মালেক ও অধিকাংশ ইমাম এই মতের পক্ষে। তবে ইহরামকারী নিজে শিকার করলে বা তার জন্য শিকার করা হলে চাই তার অনুমতি নিয়ে করা হোক বা অনুমতি ছাড়া করা হোক, হারাম। কোনো ইহরামমুক্ত ব্যক্তি নিজের জন্য শিকার করলে এই ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে শিকার না করলে, অতপর তার গোশত ইহরামকারীকে উপহার দিলে বা তার কাছে বিক্রি করলে তা ইহরামকারীর জন্য হারাম হবেনা।
আবদুর রহমান তাইমী বলেছেন: আমরা তালহার সাথে সফরে বেরুলাম। আমরা সবাই ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। এ সময় তালহাকে একটা পাখি উপহার দেয়া হলো। তখন তালহা নিদ্রিত। আমাদের কেউ কেউ তা খেলো, কেউ কেউ বর্জন করলো। তালহা যখন জেগে উঠলো, তখন যারা খেয়েছে তাদেরকে সমর্থন জানালো এবং বললো, আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে এটা খেয়েছি। আহমদ ও মুসলিম।
ইহরামকারীর জন্য শিকারের গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ মর্মেও কিছু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন সা'আব বিন জাস্সামার হাদিসে বলা হয়েছে, তিনি রসূলুল্লাহ সা. কে একটা বুনো গাধা উপহার দিলেন। তিনি তখন আবওয়া বা ওয়াদ্দানে অবস্থান করছিলেন। রসূলুল্লাহ সা. উপহারটি তার কাছে ফেরৎ পাঠালেন। রসূল সা. যখন সা'বের মুখমণ্ডলে এর প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলেন। তখন বললেন: আমরা এটা এজন্যই ফেরত দিয়েছি যে, আমরা ইহরামে আছি।” সকল হাদিসের সমন্বয় করলে বুঝা যায়। এটি ইহরামমুক্ত ব্যক্তি কর্তৃক ইহরামকারীর উদ্দেশ্যে শিকার করা হয়েছিল বলেই ফেরত দেয়া হয়েছিল।
ইবনে আব্দুল বার বলেন: এই মতের প্রবক্তাদের যুক্তি এই যে, এই ব্যাখ্যা অনুসারে এই বিষয়ে বর্ণিত সকল হাদিস সহীহ প্রমাণিত হয়। এই ব্যাখ্যা মেনে নিলে হাদিসগুলোর মধ্যে কোনো স্বার্থবিরোধিতা বা সাংঘর্ষিকতা থাকেনা। হাদিসগুলোকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা উচিত। যাতে এগুলোর প্রয়োগের কোনো পথ যতোক্ষণ পাওয়া যায়, ততোক্ষণ কোনো হাদিস অন্য হাদিসের বিরোধী বলে চিহ্নিত না হয়। ইবনুল কাইয়েম এই মতকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করেছেন এবং বলেছেন: সাহাবিদের সমস্ত কথা ও কাজ শুধুমাত্র এই ব্যাখ্যাকেই সঠিক প্রমাণ করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00