📄 বদলী সা.-এর হজ্জ
মুসলিম বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন বলেছেন: আমরা জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. এর কাছে গেলাম। তিনি সমবেত লোকদের হালহাকিকত জিজ্ঞাসা করলেন। এক পর্যায়ে আমাকেও জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম আমি মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন। সংগে সংগে তিনি আমার মাথার দিকে তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমার বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর বললেন: হে ভাতিজা, তোমাকে স্বাগতম, কী জিজ্ঞাসা করতে চাও করো। তিনি তখন অন্ধ হয়ে গেছেন। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম। তখন নামাযের ওয়াক্ত হলো। তিনি আমাদেরকে নামায পড়ালেন। তারপর আমি বললাম আমাকে বলুন, রসূলুল্লাহ সা. কিভাবে হজ্জ করতেন? তখন তিনি হাত দিয়ে কথা বলতে লাগলেন। অর্থাৎ হাত দিয়ে নয় গুণলেন। তারপর বললেন: রসূলুল্লাহ সা. হজ্জ না করেই মদিনায় নয়টি বছর কাটিয়ে দিয়েছে। তারপর দশম বছরে ঘোষণা করা হলো, রসূলুল্লাহ সা. হজ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘোষণা হওয়া মাত্রই মদিনায় বহু লোক সমবেত হলো। প্রত্যেকেরই ইচ্ছা, রসূলুল্লাহর সা. সাথে হজ্জ করবে। আমরা তাঁর সাথে সফরে বেরিয়ে যুল হুলায়ফাতে এলাম। এই সময়ে আবু বকর রা. এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস একটি পুত্র সুন্তান প্রসব করলেন, যার নাম রাখা হলো মুহাম্মদ বিন আবু বকর। তিনি রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে দূত মারফত জানতে চাইলেন, এখন তিনি কী করবেন? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: গোসল করো, রক্তপাত থামানোর জন্য একটা প্রশস্ত কাপড় দিয়ে লজ্জাস্থান বন্ধ করে তার সামনের ও পেছনের দুই প্রান্ত বেঁধে নাও এবং ইহরাম বাঁধো। এরপর রসূলুল্লাহ সা. নামায পড়লেন। নামাযের পর তাঁর উটনী 'কাসওয়ার' পিঠে আরোহণ করলেন। তাঁর উটনী যখন তাঁকে নিয়ে চলা শুরু করলো, তখন মরু প্রান্তরে পৌঁছে আমি তাঁর সামনে, ডানে ও বামে ও পেছনে যতদূর চোখ যায় দৃষ্টি দিলাম, দেখলাম, বিপুল সংখ্যক লোক বাহনে আরোহণ করে ও পদব্রজে চলছে। রসূলুল্লাহ সা. আমাদের মাঝ দিয়ে চলছেন এবং তাঁর ওপর কুরআন নাযিল হচ্ছে। তিনি নাযিল হওয়া আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা করে বুঝাচ্ছেন। তিনি তদনুসারে যে রূপ আমল করেন, আমরাও তদ্রূপ আমল করে চলছি। তিনি উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়তেন :
لَبَّيْكَ اللَّهُ لَبِيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ.
“হে আল্লাহ! আমরা তোমার আহ্বানে উপস্থিত হয়েছি, উপস্থিত হয়েছি, তোমার কাছে উপস্থিত হয়েছি, তোমার কোনো শরিক নেই, আমরা হাজির হয়েছি। সমস্ত প্রশংসা, নিয়ামত ও সাম্রাজ্য তোমারই। তোমার কোনো শরিক নেই।' লোকেরা এই তালবিয়া সমস্বরে পড়তে লাগলো। রসূলুল্লাহ সা. তাদের তালবিয়ার কোনো অংশ ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন না। তিনি নিজের তালবিয়া পড়ছিলেন। জাবের রা. বলেন: আমরা হজ্জ ব্যতিত আর কিছু করতে চাইছিলাম না। আমরা ওমরা কী জিনিস তাও জানতামনা। অবশেষে যখন আমরা তাঁর সাথে কাবাগৃহে উপনীত হলাম, তখন তিনি রুকনে ইয়ামানীকে হাত দিয়ে ধরলেন, তিনবার রমল করলেন এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটলেন চারবার। তারপর মাকামে ইবরাহীমে গিয়ে পড়লেন: "তোমরা মাকামে ইবরাহীমে নামায পড়ো।” তিনি মাকামে ইবরাহীমকে নিজের ও পবিত্র কা'বার মধ্যস্থলে রাখলেন এবং সেখানে দুই রাকাত নামায পড়লেন, তাতে সূরা ইখলাস ও সূরা কাফিরূন পড়লেন তারপর রুকনে ইয়ামানীতে ফিরে এলেন, তা হাত দিয়ে ধরলেন, তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে সাফার দিকে চলে গেলেন।
অতপর যখন সাফার কাছাকাছি পৌঁছলেন, তখন বললেন : إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ "সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনাবলির অন্যতম।" তারপর বললেন: আল্লাহ সাফা দিয়ে শুরু করেছেন। আমিও সাফা দিয়ে শুরু করছি।" অতপর তিনি সাফা দিয়ে শুরু করলেন। সাফার উপর আরোহণ করলেন, সেখান থেকে কা'বা শরিফকে দেখতে পেলেন, কিবলার দিকে মুখ করলেন, আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করলেন ও আল্লাহু আকবার বললেন। তারপর বললেন: لا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الأَحْزَابَ وَحْدَهُ .
আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তারই, প্রশংসাও তাঁরই, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি নিজের কৃত প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন, নিজের বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং শত্রুদলগুলোকে একাই পরাজিত করেছেন।" তারপর দোয়া করলেন। এভাবে তিনবার দোয়া করলেন: তারপর মারওয়ায় নামলেন। তারপর যখন বাতনুল ওয়াদীতে তার দু'পা দাঁড়ালো, তখন তিনি সাঈ করলেন। তারপর আমরা যখন আরোহণ করলাম, তখন তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। তারপর যখন মারওয়ায় এলেন, তখন সাফায় যা যা করেছিলেন তাই করলেন। মারওয়ায় শেষ চক্কর দেয়ার পর বললেন আমি যেটা পরে করলাম তা যদি আগে করতাম তাহলে কুরবানির জানোয়ার নিয়ে আসতামনা এবং একে ওমরায় পরিণত করতাম। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যার সাথে কুরবানির জন্তু নেই, সে ইহরাম খুলে ফেলুক এবং একে ওমরায় পরিণত করুক। একথা শুনে খাসয়াম গোত্রের সুরাকা বিন মালেক উঠে দাঁড়ালো এবং বললো : হে রসূলুল্লাহ সা., এ ব্যবস্থা কি শুধু এ বছরের জন্য, না চিরদিনের জন্য। তখন রসূল সা. তার এক হাতের আঙ্গুলের মধ্যে অপর হাতের আঙ্গুল ঢুকিয়ে বললেন: হজ্জের মধ্যে ওমরা প্রবেশ করেছে দু'বার। না, বরং এটা চিরদিনের জন্য।”
আলী রা. রসূল সা. এর জন্য ইয়ামান থেকে কোরবানীর উটের পাল সাথে নিয়ে এসে রসূলুল্লাহর সা. সাথে হজ্জে শরিক হলেন। তখন আমরা ফাতেমা রা. কে ইহরাম খুলে ফেলতে ও রঙ্গীন পোশাক পরতে দেখলাম। তিনি চোখে সুরমাও লাগালেন। এতে আলী রা. অসন্তোষ প্রকাশ করলে ফাতেমা বললেন: আমার আব্বা আমাকে এরূপ করতে আদেশ করেছেন। পরবর্তী সময় আলী রা. ইরাকে বলতেন: ফাতেমা যে কাজ করেছে তা রসূল সা.কে জানানোর জন্য এবং রসূল সা. সম্পর্কে ফাতেমা যে কথা বলেছে, তা সঠিক কিনা জিজ্ঞাসা করার জন্য আমি রসূল সা. এর কাছে গিয়েছিলাম। আমি রসূলুল্লাহ সা.কে বললাম, ফাতেমার একাজ আমি অপছন্দ করেছি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ফাতেমা ঠিক বলেছে, ঠিক বলেছে? তুমি যখন হজ্জের নিয়ত করেছো, তখন কী বলেছো? আলী রা. বলেন: আমি জবাব দিলাম, হে আল্লাহ, তোমার রসূল যে উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধেছেন, আমি সেই উদ্দেশ্যে ইহরাম বাঁধছি। রসূল সা. বললেন: আমার সাথে তো কুরবানির জন্তু আছে। তাই আমরা ইহরাম, খুলবোনা। জাবের রা. বলেন: যে উটের পাল আলী পাঠিয়েছিলেন তাতে ছিলো একশো উট। এরপর সাহাবিগণ সবাই ইহরাম খুললেন এবং চুল ছেঁটে ফেললেন। কিন্তু রসূলুল্লাহ সা. ও যারা কুরবানির জন্তু এনেছিলেন তারা ইহরাম খুললেননা। জিলহজ্জ মাসের আট তারিখে সবাই মিনা অভিমুখে যাত্রা করলেন এবং হজ্জের ইহরাম বাঁধলেন। রসূল সা. উটে আরোহণ করেছেন এবং মিনায় গিয়ে যোহর, আসর, মাগরিব ও এশা পড়লেন। তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই সূর্য উঠলো। রসূল সা. নামেরায় তাঁর জন্য তাঁবু স্থাপনের আদেশ দিলেন। এরপর রসূল সা. যাত্রা করলেন। কুরাইশের কোনো সন্দেহ ছিলনা যে, রসূল সা. মাশআরিল হারামে (মুযদালিফার একটা পাহাড়) অবস্থান করবেন। যেমন কুরাইশরা জাহেলিয়াতের যুগে করতো। * অতপর রসূল সা. মুযদালিফা ছাড়িয়ে গিয়ে আরাফাতে পৌঁছালেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন নামেরায় তাঁর জন্য তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। তিনি সেখানে অবস্থান করলেন। অতপর সূর্য যখন পশ্চিমে ঢলে পড়লো, তখন তাঁর উট কাসওয়াকে আনতে আদেশ দিলেন এবং আরাফাতের ময়দান বাতনুল ওয়াদীতে পৌঁছলেন। সেখান থেকে জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। ভাষণে তিনি বললেন: "তোমাদের রক্ত ও সম্পদ তোমাদের জন্যে পবিত্র তোমাদের এই দিন, তোমাদের এই শহর এবং তোমাদের এই মাস যেমন পবিত্র। জেনে রাখো জাহেলিয়াতের প্রতিটি জিনিস বাতিল, জাহেলিয়াতের সকল হত্যা বাতিল (অর্থাৎ প্রতিশোধ বাতিল), আমাদেরর সর্বপ্রথম যে হত্যার প্রতিশোধ আমি বাতিল করছি তা হচ্ছে, রবিয়া ইবনুল হারেসের হত্যা। সে বনু সাদের দুধ পালিত ছিলো, হুযাইল তাকে হত্যা করেছিল। জাহেলিয়তের সুদ বাতিল। সর্বপ্রথম যে সুদ আমি বাতিল করছি, তা হচ্ছে, আমাদের সুদ, আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ। এ সুদ সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর যিম্মাদারিতে গ্রহণ করেছ। আল্লাহর বাণীর ভিত্তিতে তাদের লজ্জাস্থানকে তোমরা নিজেদের জন্য হালাল করেছ। এখন তাদের উপর তোমাদের অধিকার এই যে, তারা তোমাদের বিছানায় অন্য কাউকে আসতে দেবেনা, যা তোমরা অপছন্দ করো। যদি তা করে, তাহলে তাদেরকে এতোটুকু প্রহার করতে পারো, যা কষ্টদায়ক না হয়। তাদের খাদ্য ও বস্ত্রের সুব্যবস্থা করা তোমাদের কর্তব্য। তোমাদের কাছে আমি এমন একটা জিনিস রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো বিপথগামী হবেনা। তা হলো আল্লাহর কিতাব তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তখন তোমরা কী বলবে? লোকেরা বললো: আমরা সাক্ষ্য দেবো, আপনি আল্লাহর বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমাদের শুভ কামনা করেছেন। তখন রসূলুল্লাহ সা. তার তর্জনী আঙ্গুল আকাশের দিকে তুলে এবং পরক্ষণে তা জনতার দিকে ঘুরিয়ে তাদের প্রতি ইংগিত করে "হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো, হে আল্লাহ তুমি সাক্ষী থাকো" তিনবার বললেন। তারপর আযান দেয়া হলো। তারপর ইকামত দেয়া হলো। তারপর তিনি যোহরের নামায পড়ালেন। তারপর পুনরায় ইকামত দেয়া হলো এবং আসরের নামায পড়ালেন। এ দুই নামাযের মাঝে আর কোনো নামায পড়লেন না। *
এরপর রসূলুল্লাহ সা. উটের ওপর আরোহণ করলেন, অবস্থান স্থলে পৌঁছলেন, তাঁর উটনী কাসওয়ার পেট পাহাড়গুলোর দিকে রাখলেন। সমবেত জনতা জমায়েত হওয়ার স্থানকে নিজের সম্মুখে রাখলেন এবং কিবলামুখি হলেন।
সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি আরাফাতে অবস্থান করলেন, তারপর ক্রমান্বয়ে সূর্যের হলুদ রং মিলিয়ে গেলো এবং তিনি উসামাকে নিজের পেছনে বসালেন। রসূলুল্লাহ সা. উটনীকে ধাক্কা দিলেন। লাগাম জোরে টানলেন এবং ডান হাত উঁচিয়ে বললেন: হে জনমণ্ডলী, প্রশান্তি, প্রশান্তি।' যখন পথিমধ্যে কোনো পাহাড়ের কাছে পৌঁছেন, লাগামকে শিথিল করেন। এভাবে চলতে চলতে মুযদালিফায় এলেন। সেখানে এক আযানে ও দুই ইকামতে মাগরিব ও এশার নামায পড়লেন এবং এই দুই নামাযের মাঝে আর মাঝে কিছুই পড়লেন না। তারপর রসূল সা. শুয়ে পড়লেন। অবশেষে ভোর হলো এবং সকাল হয়েছে মর্মে নিশ্চিত হওয়া এক আযান ও এক ইকামতে ফজরের নামায পড়ালেন। তারপর পুনরায় কাসওয়ার পিঠে আরোহণ করলেন এবং মাশআরুল হারামে (মুযদালিফায়) পৌঁছে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহু আকবর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়লেন। ভোর পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তিনি মাশআরুল হারামে অবস্থান করলেন। যখন প্রভাত আরো উজ্জ্বল হলো, তখন সূর্য না উঠতেই উটনীকে ধাক্কা দিলেন এবং ফযলকে পেছনে বসালেন। ফযল ছিলেন খুবই সুদর্শন যুবক। রসূল সা. যখন উটনীকে যাত্রার সংকেতস্বরূপ ধাক্কা দিলেন তখন তার কাছ দিয়ে মহিলারা যেতে লাগলো এবং ফযল তাদের দিকে তাকাতে লাগলো। এ সময় রসূলুল্লাহ সা. তাঁর হাত ফযলের মুখের উপর রাখলেন। ফযল তৎক্ষণাৎ নিজের মুখ অন্যদিকে ফেরালো এবং দেখতে লাগলো। রসূল সা. পুনরায় তার মুখের উপর হাত রাখলেন এবং তার মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। এভাবে তিনি বাতনে মুহাসসার এলেন। এবার উটকে সামান্য নাড়া দিলেন। তারপর তিনি মধ্যবর্তী রাস্তা ধরে চলতে লাগলেন, যা বড় জামরার উপর দিয়ে বেরিয়েছে (অর্থাৎ আরাফাতে যাওয়ার সময় যে রাস্তা ব্যবহার করেছিলেন। তা থেকে ভিন্ন রাস্তা। ঈদের মতো আরাফাতেও যাওয়া ও আসার পথ ভিন্ন হওয়া সুন্নত)। তিনি গাছের নিকট অবস্থিত জামরায় পৌঁছলেন এবং তার প্রতি সাতটি কংকর নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি কংকর আল্লাহু আকবর বলে নিক্ষেপ করছিলেন এবং বাতনুল ওয়াদি থেকে নিক্ষেপ করছিলেন (অর্থাৎ মিনা, আরাফাত ও মুযদালিফাকে ডান দিকে ও মক্কাকে বাম দিকে রেখে পাথর নিক্ষেপ করেন)। তারপর চলে গেলেন কুরবানির জায়গায়। সেখানে স্বহস্তে তেষট্টিটি জন্তু কুরবানি দিলেন। তারপর আলী রা.কে দায়িত্ব অর্পণ করলেন। আলী রা. অবশিষ্ট কুরবানি দিলেন এবং রসূল সা. কে তার কুরবানিতে শরিক করলেন। তারপর প্রত্যেক উট থেকে খানিকটা গোশত নিয়ে ডেগচিতে করে রান্না করা হলো। রসূল সা. ও আলী রা. তার গোশত ও ঝোল খেলেন। এরপর রসূলুল্লাহ সা. উটে চড়লেন। পবিত্র কাবায় তাওয়াফে এফাযা করলেন এবং মক্কায় যোহরের নামায পড়লেন। তারপর বনু আব্দুল মুত্তালিবের কাছে এসে যমযমের পানি পান করালেন এবং বললেন, হে বনু আব্দুল মুত্তালিব, তোমরা বালতি ও রশি দিয়ে পানি তোলো। আমার যদি এ আশংকা না থাকতো যে, জনগণ যমযমের পানি পান করানোকে হজ্জের অংশ মনে করে ভিড় করবে এবং তোমাদেরকে পানি পান করানোর কাজ থেকে বিচ্যুত করবে, তাহলে আমি তোমাদের সাথে পানি তুলতাম ও পান করাতাম। কেননা এটা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এ সময় বনু আব্দুল মুত্তালিব রসূল সা. কে এক বালতি পানি দিলো এবং তিনি তা থেকে পান করলেন।"
আলেমগণ বলেছেন: এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল বিশাল হাদিস। কাযী ইয়ায বলেছেন : এ হাদিসে যে ফেকাহ সংক্রান্ত বিধিমালা রয়েছে, তার উপর অনেক আলোচনা হয়েছে। এ হাদিস নিয়ে ইবনুল মুনযির একটি বিরাট গ্রন্থ লিখেছেন। যাতে দেড় শতাধিক ফিকহী বিধি রচনা করেছেন। তিনি বলেছেন: বিস্তারিত অনুসন্ধান চালালে আরো বেশি বিধি রচনা করা যেতো।
আলেমগণ বলেছেন: এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, (১) ইহরামের গোসল হায়েয ও নেফাসধারিণী মহিলাদের জন্যও সুন্নত, অন্যদের জন্যতো বটেই। (২) হায়েয ও নেফাসধারিণীদের রক্তস্রাব থেকে শরীর ও পোশাক পবিত্র রাখার জন্য যোনিমুখে বিশেষ ধরনের কাপড় বাঁধা উচিত। (৩) তাদের উভয়ের ইহরাম শুদ্ধ। (৪) ইহরাম ফরয বা নফল নামাযের পরে বাঁধা উচিত। (৫) ইহরামকারিকে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়তে হবে। (৬) রসূলুল্লাহ সা. যে তালবিয়া পড়তেন, তার মধ্যেই সীমিত থাকা উচিত। তবে কিছু বাড়ানোতে ক্ষতি নেই। যেমন উমর রা. বলতেন: হে অঢেল নিয়ামতের মালিক, হে চমৎকার অনুগ্রহের মালিক, আমি তোমার দরবারে উপস্থিত, তোমার ভয়ে উপস্থিত এবং তোমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উপস্থিত।” (৭) হাজী সাহেবের প্রথমে মক্কায় গিয়ে তওয়াফে কুদুম করা। (৮) তওয়াফের আগে হাজরে আসওয়াদ হাত দিয়ে ধরা। (৯) তওয়াফে কুদুমের প্রথম তিন চক্করে রমল করা অর্থাৎ উভয় রুকনে ইয়ামানীর বাইরে অপেক্ষাকৃত দ্রুত চলা এবং তার পরে স্বাভাবিক গতিতে চলা। (১০) তওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহীমে গিয়ে আয়াত পাঠ করা: وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى "মাকামে ইবরাহিম (ইবরাহিমের দাঁড়ানোর জায়গা) থেকে একটি জায়গা নামাযের জন্য নির্বাচন করো।" অত:পর মাকামে ইবরাহীমকে নিজের ও কাবা শরিফের মাঝে রেখে দু'রাকাত নামায পড়া উচিত। নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর সূরা কাফেরুন ও দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া উত্তম। (১১) হাদিসটি থেকে এও জানা গেলো যে, মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় যেমন হাজরে আসওয়াদ ধরা সুন্নত, তেমনি বের হবার সময়ও। আলেমগণ একমত হয়েছেন যে, হাজরে আসওয়াদ ধরা সুন্নত। অনুরূপ, তওয়াফের পর সাঈ করবে, যা সাফা থেকে শুরু করবে এবং তার উপরে আরোহণ করবে। কিবলামুখি হয়ে অবস্থান করবে। আল্লাহর যিকর করবে। তিনবার দোয়া করবে। চিহ্নিত দুই স্তম্ভের মাঝে রমল করবে। এই রমল সাঈর সাত চক্করের সকল চক্করে করতে হবে। তওয়াফে কুদুমের মতো শুধু প্রথম তিন চক্করে নয়। সাফার ন্যায় মারওয়ারও উপরে আরোহণ করা চাই এবং যিকর ও দোয়া করা চাই। এগুলো সম্পন্ন করলেই ওমরা পূর্ণ হয়ে যাবে। এরপর চুল ছাঁটলে বা কামালে ইহরাম খুলে যাবে। সাহাবিগণও এভাবেই হজ্জ করেছেন। তাদেরকে হজ্জ ও ওমরা এক সাথে করতে রসূল সা. আদেশ দিয়েছেন। তবে যিনি হজ্জে কেরান করেন, তিনি চুল ছাঁটাইবেনও না, কামাবেনও না। তিনি ইহরাম অব্যাহত রাখবেন। তারপর যিনি উমরা আদায়ের পর ইহরাম খুলেছেন (অর্থাৎ তামাতু হজ্জ করার নিয়ত করেছেন) তিনি জিলহজ্জের অষ্টম দিনে ইয়াওমুত তারবিয়াতে হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাঁধবেন। তিনি ও কেরান হজ্জকারী ইহরাম বেঁধে মিনায় যাবেন। মিনায় এই দিনের যোহর থেকে পরদিন ফযর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া ও রাত যাপন করা সুন্নত। এটা জিলহজ্জের নবম রাত।
৯ই জিলহজ্জ আরাফা দিবস। এই দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায না পড়ে মিনা থেকে বের না হওয়া এবং সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার আগে আরাফাত ময়দানে প্রবেশ না করা সুন্নত। রসূলুল্লাহ সা. যোহর ও আসরের নামায পড়ার পর নামেরাতে অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যা আরাফাতের বাইরে অবস্থিত। এ দুই নামায পড়ার আগে তিনি আরাফার ময়দানের অবস্থান স্থলে প্রবেশ করেননি। 'এ দুই নামাযের মাঝখানে কিছু নামায পড়া এবং জনতাকে উদ্দেশ্য করে ইমাম সাহেবের খুতবা দেয়া সুন্নত। এটা হজ্জের অন্যতম সুন্নত খুতবা। দ্বিতীয় সুন্নত খুতবা হলো জিলহজ্জের সাত তারিখে যোহরের নামাযের পর কাবা শরিফের সামনে প্রদত্ত খুতবা। তৃতীয় সুন্নত খুতবা হলো কুরবানির দিনের খুতবা। চতুর্থ সুন্নত খুতবা হলো জিলহজ্জের তেরো তারিখের খুতবা।
হাদিসে আরাফাত সংক্রান্ত কিছু সুন্নত ও আদবের উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে হলো:
- যোহর ও আসরের নামায পড়ার পর আরাফাতের ময়দানের অবস্থান স্থলে যাওয়া।
- আরাফাতে বাহনের ওপর অবস্থান করা উত্তম।
- টিলাগুলোর কাছে রসূল সা. এর অবস্থানের জায়গার নিকটে অবস্থান করা।
- কেবলামুখি হয়ে অবস্থান করা।
- সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করা।
অবস্থানকালে সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকা, বুক পর্যন্ত হাত তুলে দোয়া করা, সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর ধীরে ও শান্তভাবে আরাফাত থেকে প্রস্থান করা, অবস্থানকারী অন্যান্যরা যদি তার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে এসব কাজ করার আদেশ দেয়া।
মুযদালিফায় পৌঁছার পর যাত্রাবিরতি করা, মাগরিব ও এশা এশার ওয়াক্তে এক আযানে ও দুই ইকামতে পড়া এবং এ দুই নামাযের মাঝে কোনো নফল না পড়া। এ দুই নামায এক সাথে পড়ার ব্যাপারে সকল আলেম একমত। মতভেদ রয়েছে শুধু তার কারণ সম্পর্কে। কারো মতে, এটা একটা ইবাদত। কারো মতে, সফরে থাকাই এর কারণ। মুযদালিফায় অবস্থানের অন্যতম সুন্নত হলো সেখানে রাত যাপন। এটা যে ইবাদত সে সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই। মতভেদ রয়েছে এটা সুন্নত না ওয়াজিব সে ব্যাপারে। আরেকটি সুন্নত হলো মুযদালিফায় ফজরের নামায পড়া, তারপর সেখান থেকে যাত্রা করা। যাত্রা করার পর মাশআরুল হারামে এসে যাত্রাবিরতি করা ও দোয়া করা। এখানে কিছু সময় অবস্থান করাও ইবাদত।
তারপর প্রভাত অত্যধিক উজ্জ্বল হওয়ার পর সেখান থেকে রওনা হওয়া। বাতনুল মুহাসসারে পৌঁছালে দ্রুত যাওয়া। কেননা ওটা আবরাহা বাদশার হাতিবাহিনীর ওপর আল্লাহর গযব নাযিল হওয়ার স্থান। সেখানে থামাও উচিৎ নয়। ধীরে চলাও বাঞ্ছনীয় নয়।
তারপর যখন জামরাতুল আকাবাতে পৌঁছবে, তখন বাতনুল ওয়াদিতে অবস্থান করবে এবং জামরায় শীমের বীজের আকারের সাতটি নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করবে। নিক্ষেপ করার সময় প্রতিটিতে আল্লাহু আকবর বলবে।
তারপর সেখান থেকে কুরবানির জায়গায় যাবে এবং নিজের সাথে কুরবানির জন্তু থাকলে তা সেখানে কুরবানি করবে। কুরবানির পর মাথার চুল কামাবে। তারপর মক্কায় এসে তওয়াফে যিয়ারত করবে। এরপর তার জন্য ইহরাম দ্বারা যা কিছু হারাম হয়ে গিয়েছিল, তার সবই হালাল হবে, এমনকি স্ত্রী সহবাসও।
তবে জামরাতুল আকাবায় কংকর নিক্ষেপের পর তওয়াফে যিয়ারত না করলে স্ত্রী সহবাস ব্যতীত আর সব কাজ হালাল হবে। এ হলো রসূল সা. এর হজ্জ। এ হজ্জ যে করবে তাকে এর অনুসরণ করতে হবে। কেননা রসূল সা. বলেছেন: "তোমাদের ইবাদত আমার কাছ থেকে গ্রহণ করো।" তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণে হজ্জ সম্পন্ন করলেই সঠিক ও নিখুঁত হজ্জ হবে।
এবার হজ্জের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে আলেমদের মতামত ও সকল মযহাবের বিধি বিধান সর্বস্তরে আলোচনা করা যাচ্ছে।
📄 মীকাত
মীকাত দু'রকমের: সময়ের মীকাত ও স্থানের মীকাত।
সময়ের মীকাত: সময়ের মীকাত বলতে সেই সময়গুলোকে বুঝায় যে সময়ের মধ্যে হজ্জের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক এবং সেই সময়ের বাইরে হজ্জের কোনো কাজ শুদ্ধ হবেনা। এর বিবরণ আল্লাহ কুরআন মজিদে দিয়েছেন:
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيْتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ وَقَالَ الْحَجِّ أَشْمَرٌ مَعْلُومَات .
"ওরা তোমাকে চাঁদ মাসগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলে দাও, ওগুলো হচ্ছে মানুষের জন্য ও হজ্জের জন্য কর্মসূচি নির্ণয়ের সময়।" তিনি আরো বলেছেন: "হজ্জ হলো কয়েকটা নির্ধারিত মাস।" অর্থাৎ হজ্জের সময় কয়েকটা পরিচিত মাস।
আলেমগণ একমত যে, হজ্জের মাস দ্বারা শাওয়াল ও জিলকদ মাসকে বুঝানো হয়েছে। জিলহজ্জ মাস নিয়ে একটু মতভেদ রয়েছে। পুরো জilহজ্জ মাসই হজ্জের সময়, না এর দশ দিন? প্রথমটি ইমাম মালেকের এবং দ্বিতীয়টি ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, ইবনে মাসউদ, হানাফী, শাফেয়ী ও আলেমদের অভিমত। ইবনে হাযম মালেকের মতকে অগ্রগণ্য মনে করেন। তিনি বলেন, আয়াতে বলা হয়েছে: "কয়েকটা নিষিদ্ধ মাস।" বহুবচনে ব্যবহৃত কয়েকটা নির্দিষ্ট মাস দ্বারা দুই মাস বুঝানো সম্ভব নয়। তাছাড়া কংকর নিক্ষেপ হজ্জেরই অন্যতম কাজ, যা জিলহজ্জের আওতাধীন। এটা করা হয় জিলহজ্জ মাসের তের তারিখে। আর তওয়াফে যিয়ারত যা হজ্জের অন্যতম ফরয কাজ, এটাও সর্বসম্মতভাবে পুরো জিলহজ্জে মাসে করা যায়। সুতরাং সময়ের মীকাত যে তিন মাস সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই।
উপরোক্ত মতভেদের ফলাফল প্রকাশ পাবে দশই জিলহজ্জের পরে সম্পাদিত হজ্জের কার্যকলাপে। যারা বলে পুরো জিলহজ্জ মাসই মীকাত, তাদের মতানুসারে এই বিলম্বের জন্য 'দম' দেয়া লাগবেনা। আর যারা বলে, জিলহজ্জের দশ তারিখ পর্যন্ত মীকাত সীমাবদ্ধ, তাদের মতানুসারে বিলম্বের জন্য দম দেয়া লাগবে।
হজ্জের মাসগুলো আসার আগে ইহরাম বাঁধা: ইবনে আব্বাস, ইবনে উমর, জাবের ও শাফেয়ীর মতে, হজ্জের মাসগুলোর বাইরে ইহরাম বৈধ হবেনা। (হজ্জের মাসগুলোর বাইরে হজ্জের ইহরাম বাঁধা হলে তা ওমরার ইহরামে গণ্য হবে- হজ্জের জন্য তা যথেষ্ট হবেনা।)
ইমাম বুখারি বলেছেন: ইবনে উমর রা. এর মতে, হজ্জের মাস হচ্ছে শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জের প্রথম দশদিন। আর ইবনে আব্বাসের মতে, হজ্জের মাসগুলোতে ব্যতিত হজ্জের ইহরাম না করা সুন্নত। ইবনে জরির ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন: হজ্জের মাসগুলোতে ছাড়া হজ্জের ইহরাম বাঁধা বৈধ নয়।
হানাফি মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মতে, হজ্জের মাসগুলোর আগমনের পূর্বে ইহরাম বাঁধা শুদ্ধ, কিন্তু মাকরূহ। শওকানি প্রথমোক্ত মতটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহ তায়ালা হজ্জের কাজগুলো করার জন্য কয়েকটা পরিচিত মাসকে নির্দিষ্ট করেছেন। এই নির্দিষ্ট করার কারণে হজ্জের মাসগুলো আগমনের পূর্বে ইহরাম বাঁধা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ইহরাম হজ্জের একটা কাজ। যিনি দাবি করবেন যে, ঐ মাসগুলোর আগমনের পূর্বে ইহরাম বাঁধা জায়েয, তাকে তার এই দাবির পক্ষে অবশ্যই প্রমাণ দর্শাতে হবে।
স্থানের মীকাত: স্থানের মীকাত হলো সেসব স্থান, যেখান থেকে হজ্জ বা ওমরা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে ইহরাম বাঁধতে হয় এবং ইহরাম ব্যতিত কোনো হজ্জযাত্রী বা ওমরা যাত্রীর সেই স্থান অতিক্রম করা জায়েয নয়। রসূলুল্লাহ সা. এই স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন।
মদিনাবাসির মীকাত হচ্ছে যুলহুলায়ফা যা মক্কা থেকে ৪৫০ কি.মি. উত্তরে। সিরিয়ার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন জুহফাকে, যা মক্কা থেকে ১৮৭ কি.মি. উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। এ জায়গাটা মক্কা থেকে ২০৪ কি. মি. দূরে অবস্থিত রাবেগের কাছাকাছি অবস্থিত। জুহফার চিহ্ন মুছে যাওয়ার পর মিশরবাসী, সিরিয়াবাসী এবং মিশর ও সিরিয়ার মধ্য দিয়ে গমনাগমনকারীদের জন্য রাবেগই মীকাতে পরিণত হয়েছে। নাজদবাসীর মীকাত হলো কারনুল মানাযিল (মক্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত একটা পাহাড়, যেখান থেকে আরাফাত দেখা যায়। মক্কা থেকে এর দূরত্ব ৯৪ কি. মি.)। আর ইয়ামানবাসীর মীকাত ইয়ালামলাম। মক্কার ৫৪ কি. মি. দক্ষিণে অবস্থিত এটা একটা পাহাড়ের নাম। আর ইরাকবাসীর মীকাত যাতু ইরক। এটি মক্কা থেকে ৯৪ কি. মি. উত্তর পূর্বে অবস্থিত এটি জায়গা।
এ হচ্ছে রসূল সা. কর্তৃক চিহ্নিত ও নির্ধারিত মীকাতসমূহ। এ স্থানগুলো দিয়ে অতিক্রমকারী প্রত্যেকের জন্যই এগুলো নির্ধারিত, চাই তারা সেখানকার অধিবাসী হোক অথবা অন্য কোনো অঞ্চলের অধিবাসী হোক। (উদাহরণ স্বরূপ কোনো সিরিয়াবাসী যদি হজ্জ করতে ইচ্ছুক হয় এবং মদিনায় প্রবেশ করে তবে তার মীকাত হবে যুলহুলায়ফা। কেননা যুলহুলায়ফা হয়েই তাকে যেতে হবে। তার আসল মীকাত রাবেগে যাওয়া পর্যন্ত ইহরাম বিলম্বিত করা তার জন্য বৈধ হবেনা। যদি তা করে তবে গুনাহ হবে এবং অধিকাংশ আলেমের মতে তার ওপর 'দম' (কুরবানি) দেয়া ওয়াজিব হবে।) রসূল সা. দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন: এই মীকাতগুলো এ অঞ্চলগুলোর অধিবাসীদের মধ্য হতে এবং এ অঞ্চলগুলো দিয়ে যাতায়াতকারীদের মধ্য হতে যারা হজ্জ ও ওমরা করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য।" আর যদি কেউ এসব অঞ্চলের অধিবাসী না হয়েও হজ্জ বা ওমরার জন্য মক্কা যেতে ইচ্ছুক হয়, তবে সে এসব স্থান থেকে ইহরাম করবে। আর যে ব্যক্তি মক্কায় থাকে, তার মীকাত তার মক্কাস্থ বাসস্থান। হজ্জ করতে চাইলে সেখান থেকে ইহরাম করবে। আর ওমরা করতে চাইলে তার মীকাত হেরেম শরিফের সীমানার বাইরে। হারাম শরিফ থেকে বেরিয়ে তাকে সেখানে চলে যেতে হবে এবং ইহরাম করে আসতে হবে। অন্তত পক্ষে তাকে 'তানয়ীম' পর্যন্ত যেতে হবে। আর যে ব্যক্তি মক্কা ও মীকাতের মাঝখানে বাস করে তার বাসস্থানই তার জন্য মীকাত। ইবনে হাযম বলেন: যার মক্কা গমনের পথ এসব মীকাতের কোনো একটির মধ্য দিয়েও অতিক্রম করেনা, সে জলপথ বা স্থলপথের যে কোনো জায়গা থেকে ইহরাম করবে।
মীকাতের পূর্বে ইহরাম: ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত, যে ব্যক্তি মীকাতের পূর্বে ইহরাম করে, তার ইহরাম বৈধ। তবে মাকরূহ। কেননা সাহাবায়ে কেরামের উক্তি "রসূল সা. মদিনাবাসীর জন্য যুলহুলায়ফাকে মীকাত নির্ধারণ করেছেন" এসব মীকাত থেকে ইহরাম বাঁধার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে এবং এতে কোনো হেরফের ও কমবেশি করতে নিষেধ করে। কাজেই হেরফের যদি হারাম নাও হয়। তবে অন্তত তা বর্জন করা শ্রেয় অবশ্যই।
📄 ইহরাম
ইহরামের সংজ্ঞা: ইহরাম বলা হয় হজ্জ বা ওমরার নিয়ত করাকে অথবা উভয়টার নিয়ত করাকে। এটা হজ্জের রুকন অর্থাৎ ফরয ও অবিচ্ছেদ্য অংগ। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ .
"তাদেরকে শুধু এই আদেশই দেয়া হয়েছে যেন তারা একান্তভাবে আল্লাহর আনুগত্যের লক্ষ্যেই তাঁর ইবাদত করে।" আর রসূল সা. বলেছেন: নিয়ত দ্বারাই আমল স্থির হয়। প্রত্যেক মানুষ যা নিয়ত করে শুধু তাই পায়।" নিয়তের হাকীকত বা তাৎপর্য নিয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে (ওযু অধ্যায় দেখুন)। সেখানে বলা হয়েছে নিয়তের স্থান হলো মন। ইবনুল হুমাম বলেছেন: কোনো বর্ণনাকারী রসূল সা.কে একথা বলতে শোনেনি যে, আমি ওমরা বা হজ্জের নিয়ত করলাম।
ইহরামের জন্য কিছু নিয়ম বিধি বা আদব রয়েছে, যা মেনে চলা আবশ্যক। নিম্নে এই নিয়মবিধিগুলোর উল্লেখ করছি:
১. পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা: নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা, বোগলের পশম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের পশম কামানো, ওযু বা গোসল করা। গোসল করাই উত্তম। আর দাড়ি ও মাথার চুল পরিচ্ছন্ন করা। এসব কাজ দ্বারাই পরিচ্ছন্নতা অর্জিত হতে পারে। ইবনে উমর রা. বলেছেন: ইহরামের ইচ্ছা করলে এবং মক্কায় প্রবেশ করতে চাইলে গোসল করা সুন্নত। -বাযযার, দার কুতনি, হাকেম।
ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন : রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হায়েয ও নেফাসধারিণীরা ইহরামের গোসলের নিয়তে গোসল করবে। এতেই তার ইহরাম করা ও হজ্জ বা ওমরার সকল কাজ করা বৈধ হবে। তবে হায়েয ও নেফাস থেকে পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত কাবা শরিফের তওয়াফ করতে পারবেনা। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি। (এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, মুহদিস অবস্থায় ওযু প্রয়োজন এরূপ অপবিত্রাবস্থায় ইহরাম চলবে।)
২. সেলাই করা কাপড় বর্জন ও ইহরামের দুটো কাপড় পরিধান করা। এই দুটো কাপড়ের একটি হলো, মাথা ব্যতীত দেহের ওপরের অর্ধাংশ আচ্ছাদনকারী চাদর এবং শরীরের নিম্নের অর্ধাংশ আচ্ছাদনকারী সেলাইবিহীন লুঙ্গি। দুটোই সাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা সাদা কাপড় আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়। ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: রসূল সা. ও তার সাহাবিগণ বাহন থেকে নামা, তেল ব্যবহার করা এবং চাদর ও লুংগি পরিধান করার পর রওনা হলেন।-বুখারি।
৩. শরীরে ও পোশাকে সুগন্ধি লাগানো। চাই ইহরামের পরেও তাতে তার প্রভাব অবশিষ্ট থাকুক বা না থাকুক। কোনো কোনো আলেম এটা মাকরূহ মনে করলেও এ হাদিস তাদের অভিমত খণ্ডন করে। আয়েশা রা. বলেন: "ইহরাম অবস্থায় রসূল সা. এর চুলের সিঁথি সুগন্ধি দ্রব্যের কারণে যেভাবে চকচক করছিল, সে দৃশ্য যেনো আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি। -বুখারি, মুসলিম। বুখারি ও মুসলিম আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণনা করেন, ইহরামের পূর্বে আমি রসূল সা.কে ইহরামের জন্য এবং কংকর নিক্ষেপের পর তাঁর ইহরাম খোলার জন্য কা'বা শরিফের তওয়াফের পূর্বে আমি তাঁকে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম।' আয়েশা রা. বলেন: আমরা রসূল সা.-এর সাথে মক্কায় গিয়েছি, তখন ইহরামের সময় আমরা আমাদের কপালকে মেসক দ্বারা সুবাসিত করতাম। তারপর যখন আমাদের কেউ ঘর্মাক্ত হতো, তখন ঐ মেসক তার মুখমণ্ডল দিয়ে প্রবাহিত হতো। রসূল সা. তা দেখতেন। কিন্তু আমাদেরকে নিষেধ করতেন না। -আহমদ ও আবু দাউদ।
৪. দু'রাকাত নামায। ইহরামের সুন্নত হিসেবে নিয়ত করবে। প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর 'কাফেরুন' এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়বে। ইবনে উমর রা. বলেছেন: রসূল সা. যুলহুলায়ফাতে দু'রাকাত নামায পড়তেন। -মুসলিম। এ সময় ফরয নামায পড়লে আর কোনো নামায পড়ার প্রয়োজন হবেনা, যেমন মসজিদে প্রবেশ করেই কেউ ফরয নামায পড়লে তাহিয়াতুল মসজিদ পড়ার প্রয়োজন হয়না। ইহরাম কয় প্রকার ও কি কি: ইহরাম তিন প্রকার: ১. কিরান, ২. তামাতু ও ৩. ইফরাদ। এই তিন প্রকারের ইহরামের সবকটাই সর্বসম্মত বৈধ।
আয়েশা রা. বলেছেন: বিদায় হজ্জের বছর আমরা রসূল সা.-এর সাথে বের হলাম। তখন আমাদের কেউবা ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছে। কেউ হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য ইহরাম বেঁধেছে, আবার কেউ শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বেঁধেছে রসূল সা. শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধলেন। যে ব্যক্তি শুধু ওমরার জন্য ইহরাম বেঁধেছিল, যা তার তওয়াফ কুদুম অর্থাৎ মক্কায় পৌঁছেই তওয়াফ করে ইহরাম মুক্ত হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি শুধু হজ্জের ইহরাম বেঁধেছে, অথবা হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য ইহরাম বেঁধেছে, সে তাওয়াফে কুদুম দ্বারা ইহরামমুক্ত হয়নি। কেবল ১০ই জিলহজ্জ তারিখে কুরবানি ও চুল কামানোর মাধ্যমেই সে ইহরাম থেকে মুক্ত হতো।' -আহমদ, বুখারি, মুসলিম, মালেক।
কিরান ও তার অর্থ: মীকাত থেকে হজ্জ ও ওমরা উভয়ের উদ্দেশ্য ইহরাম বাঁধা এবং তালবিয়ার সময়ে বলা “লাব্বাইকা বিহাজ্জিন ওয়া উমরাতিন” (হজ্জ ও উমরা উভয়ের উদ্দেশ্যে বান্দা হাজির) এই ইহরামের কারণে ইহরামকারী হজ্জ ও ওমরার যাবতীয় কাজ করা পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।
তামাতু ও তার অর্থ: হজ্জের মাসগুলোতে ওমরা করা ও ওমরা করার বছরেই হজ্জ সমাধা করার নাম তামাত্তু। একে তামাতু (উপকৃত হওয়া) নামকরণ করার কারণ হলো, এ পদ্ধতিতে একজন ইহরামকারী একই বছরের হজ্জের মাসে হজ্জ ও ওমরা উভয় ইবাদত সমাধা করতে পারে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন না করেই। তাছাড়া ইহরামকারী ওমরা শেষে ইহরামমুক্ত হয়ে একজন সাধারণ মানুষের মতো সেলাই করা কাপড় ও সুগন্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারে।
তামাত্তুর পদ্ধতি হলো, মীকাত থেকে শুধু ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধতে হয় এবং তালবিয়া পড়ার সময় বলতে হয় : লাব্বাইকা বি উমরাতিন" (ওমরার জন্য বান্দা হাজির)
এ ইহরামের ফলে ইহরামকারীকে মক্কায় পৌঁছা কা'বার তওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা (চক্কর দেয়া) চুল কামানো বা ছাঁটা, অতপর ইহরাম মুক্ত হওয়া এবং ইহরামের কাপড় খুলে স্বাভাবিক কাপড় পরা এবং যা কিছু ইতিপূর্বে ইহরাম দ্বারা তার উপর হারাম হয়েছিল, তা হালাল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ইহরামের অবস্থায় থাকতে হয়। তারপর যখন ৮ই জিলহজ্জ সমাগত হয়, তখন মক্কা থেকে হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধতে হয়।
ফাতহুল বারীতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ আলেমের মতে, তামাতু হলো, এক ব্যক্তি কর্তৃক একই সফরে একই বছরের হজ্জের মাসগুলোতে হজ্জ ও ওমরা একসাথে করা এবং প্রথমে ওমরা করা। এই শর্তগুলোর একটিও বাদ পড়লে তামাত্তু হবেনা।
ইফরাদের অর্থ: হজ্জ গমনেচ্ছু ব্যক্তি কর্তৃক মীকাত থেকে শুধু হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধা এবং “লাব্বাইক বিহাজ্জ” (হজ্জের জন্য বান্দা হাজির) বলে তালবিয়া পড়ার নাম ইফরাদ। ইফরাদের ইহরামকারী হজ্জের যাবতীয় কাজ সমাধা হওয়া পর্যন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকে। এরপর ইচ্ছা করলে সে ওমরা করতে পারবে।
তিন প্রকার ইহরামের মধ্যে কোন্টি উত্তম: সর্বোত্তম ইহরাম কোন্টি তা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। (আর এই মতভেদের কারণ হলো, রসূল সা. কোন্টি করেছেন তা নিয়ে মতভেদ। তবে বিশুদ্ধ মত হলো, তিনি কিরান করেছেন। কেননা তিনি কুরবানির জন্তু সাথে নিয়ে গেছেন) শাফেয়ী মযহাবের মতে, ইফরাদ ও তামাত্তু কিরানের চেয়ে ভালো। কেননা তামাতু অথবা ইফরাদকারী হজ্জ ও ওমরা দুটোই পূর্ণাংগভাবে আদায় করতে সক্ষম। কিন্তু কিরানকারী শুধু হজ্জের কাজ আদায় করে থাকে। শাফেয়ীগণ আরো বলেছেন: তামাতু ও ইফরাদ সম্পর্কে দু'রকমের মত রয়েছে: একটি মত হলো: তামাতু ভালো। অপর মতে ইফরাদ ভালো। হানাফিগণ বলেন: তামাত্তু ও ইফরাদের চেয়ে কিরান ভালো। আর ইফরাদের চেয়ে তামাতু ভালো। মালেকীদের মতে, তামাতু ও কিরানের চেয়ে ইফরাদ ভালো। আর হাম্বলীদের নিকট তামাত্তু ও কিরান ইফরাদের চেয়ে ভালো। হাম্বলীদের মতটাই জনসাধারণের জন্য সহজতর ও অধিকতর নমনীয়। আর এটাই রসূল সা. নিজের জন্য কামনা করতেন এবং সাহাবিদেরকে করতে আদেশ দিতেন।
মুসলিম জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেন, জাবের রা. বলেন: আমরা রসূলের সাহাবিরা শুধুমাত্র হজ্জের জন্য ইহরাম বাঁধতাম। রসূলুল্লাহ সা. জিলহজ্জ মাসের চার তারিখ সকালে এসে আমাদেরকে ইহরাম খোলার আদেশ দিলেন। তিনি বললেন: হালাল হয়ে যাও এবং স্ত্রীদের কাছে যাও। তিনি এটাকে বাধ্যতামূলক করেননি। তবে স্ত্রীদেরকে স্বামীদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। আমরা বললাম: আরাফা দিবসের মাত্র পাঁচদিন বাকি থাকতে আমাদেরকে এ রকম আদেশ কেন দেয়া হলো? আমরা আমাদের স্ত্রীদের কাছে যাবো। তারপর এমন অবস্থায় আরাফায় হাজির হবো যে আমরা তখনো অপবিত্র থাকবো। একথা শুনে রসূল সা. আমাদের সামনে এরূপ ভাষণ দিলেন: তোমরা তো জানো, আমি তোমাদের চেয়েও বেশি আল্লাহকে ভয় করি, তোমাদের চেয়ে বেশি সত্যবাদী, তোমাদের চেয়ে বেশি পুণ্যবান! আমার সাথে যদি কুরবানির জন্তু না থাকতো, তাহলে আমিও তোমাদের মতো ইহরামমুক্ত হয়ে যেতাম। আমি নিজের ব্যাপারে যদি শৈথিল্যকামী হতাম, তাহলে সাথে করে কুরবানির জন্তু আনতামনা। সুতরাং তোমরা ইহরাম খোলো। অতএব আমরা ইহরাম খুললাম এবং আদেশ শুনলাম ও আনুগত্য করলাম।
সাধারণভাবেও ইহরাম বাঁধা জায়েয
যে ব্যক্তি ইহরামের এই প্রকারভেদ ও বিশদ বিবরণ না জানার কারণে এই তিন ধরনের ইহরামের কোনো একটির নাম উল্লেখ ছাড়াই কেবল আল্লাহর অর্পিত ফরয আদায়ের নিয়ত করে সাধারণভাবে ইহারাম বাঁধে, তার ইহরাম বৈধ ও শুদ্ধ হবে। আলেমগণ বলেন: কেউ যদি শুধু অন্যদের দেখাদেখি ইবাদতের নিয়তে ইহরাম বাঁধে ও তালবিয়া পড়ে, কোনো নাম উল্লেখ না করে এবং মনে মনেও কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ইহরামের চিন্তা না করে, ইফরাদ, কিরান বা তামাতু কোনোটারই উল্লেখ না করে, তার হজ্জও শুদ্ধ হবে। সে এই তিনটের যে কোনো একটা করতে পারে।
কিরান ও তামাত্তুকারীর তওয়াফ ও সাঈ এবং হারাম শরিফবাসীর জন্য শুধুই ইফরাদ: ইবনে আব্বাসকে তামাত্তু হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন: বিদায় হজ্জে আনসার, মুহাজির ও রসূলুল্লাহ সা. এর স্ত্রীগণ ইহরাম বাঁধলেন। আমরাও ইহরাম বাঁধলাম। যখন মক্কায় উপস্থিত হলাম, তখন রসূল সা. বললেন: হজ্জের জন্য কৃত তোমাদের ইহরামকে ওমরার জন্যও ইহরামে পরিণত করো। তবে যে ব্যক্তি কুরবানির জন্তুর সাথে করে নিয়ে এসেছে, তার কথা আলাদা। আমরা আল্লাহর ঘরের তওয়াফ করলাম, সাফা ও মারওয়ায় সা'ঈ করলাম; স্ত্রীদের কাছে গেলাম ও পোশাক পরলাম। রসূল সা. বললেন: যে ব্যক্তি কুরবানির জন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, সে উক্ত জন্তু কুরবানির নির্দিষ্ট জায়গায় না পৌঁছা পর্যন্ত ইহরামমুক্ত হবেনা। তারপর ৮ই জিলহজ্জের সন্ধ্যায় আমাদেরকে হজ্জের ইহরাম বাঁধতে আদেশ দেয়া হলো। হজ্জের কাজগুলো সমাধা করার পর আমরা মক্কায় এলাম এবং কা'বার তওয়াফ করলাম ও সাফা মারওয়ার সা'ঈ করলাম। এ পর্যন্ত আমরা হজ্জ সমাধা করলাম এবং আমাদের ওপর কুরবানির হুকুম অবশিষ্ট রইল। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
فَمَنْ تَمَتَّعَ بِالْعُمْرَةِ إِلَى الْحَجِّ فَمَا اسْتَيْسَرَ مِنَ الْهَدْيِ، فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ فِي الْحَجِّ وَسَبْعَةِ إِذَا رَجَعْتُمْ إِلَى أَمْصَارِكُمْ .
“যে ব্যক্তি ওমরা দ্বারা হজ্জ পর্যন্ত উপকৃত হয়, সে যেন সাধ্যমত কুরবানি করে। যে ব্যক্তি কুরবানি করতে অক্ষম হয়, সে যেন হজ্জের দিনগুলোতে তিন দিন এবং দেশে ফিরে সাত দিন রোযা রাখে।" কুরবানির জন্য ছাগল যথেষ্ট। অতপর তারা এক বছরে দুটো ইবাদত হজ্জ ও ওমরা সমাধা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এটা তাঁর কিতাবে ও রসূলের সুন্নতে নাযিল করেছেন আর মক্কাবাসী ব্যতিত সকল মানুষের জন্য বৈধ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন:
ذَلِكَ لِمَنْ لَمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِي الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ ..
"এ ব্যবস্থা তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের অধিবাসী নয়।" আর যে মাসগুলোকে আল্লাহ হজ্জের মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তা হলো শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জ। এই মাসগুলোতে যে ব্যক্তি তামাকু করবে তার উপর কুরবানি অথবা রোযার হুকুম রয়েছে।-বুখারি।
১. এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, হারাম শরিফের অধিকবাসীদের জন্য তামাত্তু ও কিরান কোনোটা নয়। তারা হজ্জ করলেও ইফরাদ ওমরা করলেও ইফরাদ করবে। (তবে মালেক, শাফেয়ী ও আহমদের মতে, মক্কাবাসী তামাতু ও কিরান করতে পারে। এটা তাদের জন্য মাকরূহ নয়।)
এটা ইবনে আব্বাস ও আবু হানিফার মত। তারা উপরোক্ত আয়াতের বরাত দিয়ে থাকেন। মসজিদুল হারামের অধিবাসী বলতে কি বুঝানো হয়েছে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। মালেকের মতে, তারা মক্কাবাসী। তাহাবি এই মতকে অগ্রাধিকার দেন। ইবনে আব্বাস ও তাউস প্রমুখের মতে, এর অর্থ হারাম শরিফ থেকে কসর আদায় করতে হয় যত দূরত্বে তন্মধ্যে ন্যূনতম দূরত্বের অধিবাসী। ইবনে জারির এই মত সমর্থন করেছেন। হানাফীদের মতে, যার পরিবার পরিজন মীকাত বা তার চেয়ে কম দূরে অবস্থান করে। উল্লেখ্য যে, বসবাসের স্থানই ধর্তব্য, জন্মস্থান নয়।
হাদিস থেকে এ-ও জানা যায় যে, তামাত্তুকারীকে সর্বপ্রথম ওমরার জন্য তওয়াফ ও সাঈ করতে হবে। এতে তার তওয়াফে কুদুমের প্রয়োজন থাকবেনা। এরপর আরাফায় অবস্থানের পর তওয়াফে যিয়ারত ও তারপর সা'ঈ করতে হবে।
কিরান সম্পর্কে অধিকাংশ আলেমের মত হলো, তার জন্য হজ্জের কাজগুলোই যথেষ্ট। তাকে আরাফায় অবস্থানের পর শুধু একবার তওয়াফে যিয়ারত করতে হবে এবং একবার সাঈ করতে হবে। এই এক তওয়াফ ও এক সাঈ তার হজ্জ ও ওমরা উভয়ের জন্য যথেষ্ট। যেমন, ইফরাদ হজ্জ আদায়কারীর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। (পার্থক্য শুধু এই যে, কিরানে হজ্জ ও ওমরা উভয়ের নিয়ত করতে হয়। আর ইফরাদে শুধু হজ্জের।)
জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধে, তার জন্য এক তওয়াফ ও এক সা'ঈ যথেষ্ট। -তিরমিযি।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ্জ ও ওমরার জন্য ইহরাম বাঁধে, তার জন্য এক তওয়াফ ও এক সা'ঈ যথেষ্ট। -তিরমিযি।
মুসলিম বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. আয়েশাকে বলেছেন: তোমার কা'বায় এবং সাফা ও মারওয়ার তওয়াফ তোমার হজ্জ ও ওমরার জন্য যথেষ্ট।
আবু হানিফার মতে, হজ্জ ও ওমরার জন্য দুটো করে তওয়াফ ও সা'ঈ জরুরি। কিন্তু প্রথমোক্ত মতটি অগ্রগণ্য। কেননা তার প্রমাণ অধিকতর শক্তিশালী।
এ হাদিস থেকে আরো জানা যাচ্ছে, কিরান ও তামাত্তুকারী উভয়ের কুরবানি করা জরুরি। অন্ততপক্ষে একটা ছাগল কুরবানি করতে হবে। এটা করতে অক্ষম হলে হজ্জের ভেতরে তিনটে রোযা এবং দেশে ফিরে আসার পর সাতটা রোযা রাখতে হবে। হজ্জের সময়ে যে তিনটে রোযা রাখতে হবে, তা আরাফার দিনের আগে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে রাখা উত্তম। কোনো কোনো আলেম, যথা তাউস ও মুজাহিদ, শাওয়ালের শুরুতে রাখাও বৈধ বলে রায় দিয়েছেন। ইবনে উমরের রা. মতে এই তিন রোযা এভাবে রাখা উচিত: ৮ই জিলহজ্জের আগে এক দিন, ৮ই জিলহজ্জ এবং ৯ই জিলহজ্জ। একদিন যদি রোযা না রাখে অথবা ঈদের আগে এর অংশ বিশেষ রাখে, তবে তার জন্য আইয়ামে তাশরিকে বাকি রোযাগুলো রাখা বৈধ। কেননা আয়েশা রা. ও ইবনে উমর রা. বলেছেন: আইয়ামে তাশরিকে রোযা রাখা জায়েয নেই। তবে যে ব্যক্তি কুরবানি দিতে পারেনা তার জন্য জায়েয।-বুখারি।
আর যখন হজ্জের ভেতরে তিনটি রোযা রাখা সম্ভব হয়না, তখন তা পরে কাযা করতে হবে। অবশিষ্ট সাত রোযা দেশে ফিরে এসে রাখতে হবে। কেউ বলেন: নিজের কাফেলার কাছে ফিরলে রাখা যাবে। শেষোক্ত মতানুসারে পথিমধ্যেই রোযা রাখা জায়েয। এই দশটা রোযা এক নাগাড়ে রাখা জরুরি নয়। আর যখন নিয়ত করবে ও ইহরাম করবে, তখন তাকে তালবিয়া পড়তে হবে।
📄 তালবিয়া (লাব্বাইকা বলা)
তালবিয়া সংজ্ঞা বিধান:
আলেমগণ একমত যে, তালবিয়া হজ্জের একটি শরয়ী বিধান। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: হে মুহাম্মাদের বংশধর, তোমাদের মধ্যে য ব্যক্তি হজ্জ করবে, সে যেন তার হজ্জে তালবিয়া পড়ে। -আহমদ, ইবনে হিববান। (যমখশারীর মতে, লাব্বাইকা শব্দের অর্থ হলো, বান্দা সর্বক্ষণ তোমার আনুগত্যে বহাল আছে) শরিয়তে লাব্বাইকা বলা কতখানি জরুরি, কোন্ সময় বলতে হয় এবং বিলম্বিত হলে কী হবে, ইত্যাদি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। শাফেয়ী ও আহমদের মতে এটা সুন্নত এবং ইহরামের সাথে সাথে এটা বলা মুস্তাহাব। কেউ যদি হজ্জ বা ওমরার নিয়ত করে এবং তালবিয়া উচ্চারণ না করে, তবে তার হজ্জ ও ওমরা শুদ্ধ হবে। কোনো কাফফারা ইত্যাদি তাকে দিতে হবেনা। কেননা শাফেয়ী ও আহমদের মতে, ইহরাম শুধু নিয়ত দ্বারাও শুদ্ধ হয়।
হানাফিদের মতে, তালবিয়া বা তার স্থলাভিষিক্ত বা তার কাছাকাছি অর্থবোধক দোয়া বা তাসবীহ এবং কুরবানির জন্তু নিয়ে যাওয়া ইহরামের অন্যতম শর্ত। তাই তালবিয়া বা তাসবীহ ব্যতীত এবং কুরবানির জন্তু ব্যতিত ইহরাম শুদ্ধ হয়না। হানাফীদের এই উক্তির ভিত্তি এই যে, তাদের নিকট ইহরাম হচ্ছে নিয়ত ও হজ্জের কোনো একটা কাজের সমন্বিত রূপ। তাই যখন কেউ ইহরামের নিয়ত করবে এবং হজ্জের কোনো না কোনো কাজ করবে, যেমন তাসবীহ বা তালবিয়া পড়বে অথবা তালবিয়া না পড়ে কুরবানির জন্তু সাথে নিয়ে যাবে, তখন তার ইহরাম বাঁধার কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। তবে তালবিয়া পড়া বাদ দেয়ার কারণে দম (কুরবানি) দিতে হবে। মালেকী মাযহাবের সুপরিচিত মত হলো, তালবিয়া পড়া ওয়াজিব। তালবিয়া ত্যাগ করা বা ইহরামের অব্যবহিত পর তালবিয়া না পড়ায় যার কুরবানি দেয়া সামর্থ্য আছে তার ওপর কুরবানি দেয়া ওয়াজিব।
তালবিয়ার ভাষা:
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. এর তালবিয়া ছিলো এরূপ: لَبَيْكَ اللَّهُمَّ لَبِيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ.
নাফে বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এতে সংযোজন করতেন : লাব্বাইকা, লাব্বাইকা, লাব্বাইকা, ওয়া সাদাইকা, ওয়াল খাইরু বিয়াদাইকা, লাব্বাইকা ওয়ার রাগবাউ ইলাইকা ওয়াল আমালু।” আলেমগণ রসূল সা. এর তালবিয়ার মধ্যে তালবিয়াকে সীমিত রাখা মুস্তাহাব মনে করেন। এর ওপর অতিরিক্ত ভাষা সংযোজনে তাদের মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, সংযোজনে কোনো ক্ষতি নেই। কেননা ইবনে উমর রা. সহ বহু সাহাবি সংযোজন করতেন, রসূল সা. তা শুনেও কিছু বলতেন না। -আবু দাউদ, বায়হাকি।
মালেক ও আবু ইউসুফ রসূল সা. এর তালবিয়ার ওপর সংযোজনকে মাকরূহ মনে করেন।
তালবিয়ার ফযীলত:
ইবনে মাজাহ জাবের রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : কোনো ইহরামকারী যদি পুরো দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত তালবিয়া পড়ে কাটিয়ে দেয়, তবে তার গুনাহগুলো উধাও হয়ে যায়। ফলে সে সদ্যপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।
তাবারানি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো তালবিয়াকারী তালবিয়া করলেই সুসংবাদ পায় এবং কোনো তকবীরদাতা তকবীর দিলেই (আল্লাহু আকবর বললে) সুসংবাদ পায়। জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রসূলুল্লাহ, বেহেশতের সুসংবাদ? তিনি বললেন: হ্যাঁ।
সাহল বিন সাদ থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো মুসলমান তালবিয়া পড়লে তার ডানে ও বামে যতো গাছ, পাথর বা নুড়িপাথর আছে, সবাই তার সাথে সাথে তালবিয়া পড়ে, যতক্ষণ না পৃথিবী এখান থেকে আর এখান থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। -ইবনে মাজাহ, বায়হাকি, তিরমিযি ও হাকেম।
তালবিয়া উচ্চস্বরে পড়া মুস্তাহাব:
যায়দ বিন খালেদ রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: আমার কাছে জিবরীল এসেছে এবং বলেছে: আপনার সাথিদেরকে আদেশ দিন উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়ুক। এটাই হজ্জের নিদর্শন। -ইবনে মাজাহ, আহমদ, ইবনে খুযায়মা ও হাকেম।
আবু বকর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কি ধরনের হজ্জ উত্তম? তিনি বললেন: উচ্চস্বরে তালবিয় পড়া ও জন্তু কুরবানি করা হয় যে হজ্জে। -তিরমিযি, ইবনে মাজাহ।
আবু হাযেম বলেন: রসূল সা.এর সাহাবিগণ যখন ইহরাম বাঁধতেন, তখন রওহা পর্যন্ত পৌঁছাতে না পৌঁছতেই তাদের আওয়াজ প্রচণ্ড আকার ধারণ করতো। এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ আলেম উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া পছন্দ করেন।
ইমাম মালেক বলেছেন: ছোট ছোট মসজিদগুলোতে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়া হবেনা। শুধু নিজেকে শুনানো যথেষ্ট। কেবল মিনার মসজিদ ও মসজিদুল হারামে উচ্চস্বরে তালবিয়া পড়বে। এ হলো পুরুষদের জন্য।
মহিলারা এমনভাবে তালবিয়া পড়বে যে, সে নিজে ও পার্শ্ববর্তী ব্যক্তি শুধু শুনতে পাবে। এর চেয়ে জোরে পড়া মাকরূহ। আতা বলেন: পুরুষরা উচ্চস্বরে ও মহিলারা শুধু নিজেকে শুনিয়ে তালবিয়া পড়বে।
যেসব ক্ষেত্রে তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব:
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও অবস্থায় তালবিয়া পড়া মুস্তাহাব। যেমন বাহনে আরোহণের সময়, বাহন থেকে নামার সময় যখনই কোনো উচ্চ জায়গায় আরোহণ করা হয়, কোনো নিচু জায়গায় অবতরণ করা হয়, কিংবা কোনো আরোহীর সাথে সাক্ষাৎ হয়। প্রত্যেক নামাযের শেষে এবং শেষ রাতে। ইমাম শাফেয়ীর মতে, সর্বাবস্থায় এটা পড়া মুস্তাহাব।
তালবিয়ার সময়:
ইহরামকারী ইহরামের সময় থেকেই তালবিয়া পড়া শুরু করবে এবং কুরবানির দিনের সর্বশেষ জামরাতুল আকাবায় প্রথম কংকর নিক্ষেপ পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখবে। প্রথম কংকরের পর তালবিয়া বন্ধ করবে। কেননা রসূল সা. জামরায় পৌঁছা পর্যন্ত ক্রমাগত তালবিয়া পড়তেন। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
এটা হানাফী, শাফেয়ী, ছাওরী ও অধিকাংশ আলেমের অভিমত।
আহমদ ও ইসহাক বলেন: সবকটা কংকর নিক্ষেপ করা পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে, তারপর বন্ধ করবে। মালেক বলেন: আরাফার দিন সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়া পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে, তারপর বন্ধ করবে। এ হচ্ছে হজ্জের ক্ষেত্রে। কিন্তু ওমরাকারী হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করা পর্যন্ত তালবিয়া পড়বে। কেননা ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. ওমরায় তালবিয়া পড়া বন্ধ করতেন হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময়।-তিরমিযি।
অধিকাংশ আলেম এর ওপরই আমল করতেন *
তালাবিয়ার পর রসূল সা.-এর প্রতি সালাত পাঠ এবং দোয়া করা: কাসেম বিন মুহাম্মদ বিন আবু বকর থেকে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তির তালবিয়া পড়া শেষ হলে রসূল সা.-এর প্রতি সালাত বা দরূদ পড়া মুস্তাহাব। রসূলুল্লাহ সা. তালবিয়ার পর আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও তার সন্তোষ চাইতেন এবং খারাপ মানুষ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। -তাবারানি।