📄 যাকাতের নিসাব
যাকাতের নিসাব:
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য তার নিসাব পরিমাণ হওয়া জরুরি। যাকাতের নিসাব হলো এমন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ, যা তার অতিরিক্ত অংশ মালিকের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “পাঁচ ওয়াসাকের কমে কোনো সাদকা নেই, পাঁচটা উটের কমে কোনো সাদকা নেই এবং পাঁচ উকিয়ার কমে কোনো সাদকা নেই।” (বুখারি ও মুসলিম) এখানে ‘সাদকা’ দ্বারা যাকাত বুঝানো হয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তির এসব সম্পদের মালিকানা নেই, তার উপর যাকাত ফরয নয়। যেসব সম্পদে যাকাত ফরয, তার নিসাব ও পরিমাণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. স্বর্ণের নিসাব: বিশ দিনার বা তার সমমূল্য। দিনার হচ্ছে স্বর্ণমুদ্রা। এক দিনার একচল্লিশ ও এক-পঞ্চমাংশ গম দানার সমান। ওযনে চার গ্রাম বা তার কাছাকাছি। বিশ দিনার পঁচাশি গ্রাম স্বর্ণের সমান। তাই যার পঁচাশি গ্রাম স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের রৌপ্যমুদ্রা অথবা তার সমমূল্যের ব্যবসায়িক সম্পদ রয়েছে, তার উপর যাকাত ফরয।
২. রৌপ্যমুদ্রার নিসাব: দু'শ দিরহাম বা তার সমমূল্য। এক দিরহামের ওজন বাইশ ও এক-পঞ্চমাংশ গম দানার সমান। ওযনে প্রায় তিন গ্রাম। সুতরাং দু’শ দিরহাম ৫৯৫ গ্রাম রূপার সমান। আর দু’শ দিরহামের মূল্যের চেয়ে বেশি যার কাছে থাকে তার উপর যাকাত ফরয।
৩. নগদ অর্থ: কাগজের মুদ্রা বা ব্যাংক নোট স্বর্ণ ও রূপার স্থানে ব্যবহৃত হয়। সুতরাং যার কাছে স্বর্ণ ও রূপার নিসাব পরিমাণ নগদ অর্থ থাকে, তার উপর যাকাত ফরয। নগদ অর্থের পরিমাণকে স্বর্ণের নিসাবের সাথে তুলনা করা হলে বর্তমান বিশ্বের বাজার দরের আলোকে যার কাছে ৯৬০ আমেরিকান ডলার রয়েছে তার উপর যাকাত ফরয। আর রূপার নিসাবের সাথে তুলনা করা হলে যার কাছে ১২৪ আমেরিকান ডলার রয়েছে তার উপর যাকাত ফরয। ফকিহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, নগদ অর্থের নিসাব স্বর্ণ ও রূপার নিসাবের মতোই, এই দু’রকমের যেকোনো একটির নিসাবের সমান হলেই যাকাত ফরয হবে।
📄 শিশু ও পাগলের সম্পদের যাকাত
শিশু ও পাগলের সম্পদের যাকাত:
অধিকাংশ আলেমের মতে, শিশুদের ও পাগলদের সম্পদের উপর যাকাত ফরয। তাদের যাকাত তাদের অভিভাবকরা আদায় করবে। ইমাম শাফেয়ী, মালেক, আহমদ ও তাদের শিষ্যরা এই মতই পোষণ করেন। তাদের প্রমাণ নিম্নরূপ:
১. আল্লাহ বলেন: خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا (অর্থ: তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে।) আল্লাহ সকল প্রকার সম্পদের উপর যাকাত আরোপ করেছেন। এ আয়াতে কোনো সম্পদকেই ব্যতিক্রম করেননি, চাই তা শিশুর হোক বা বড়দের।
২. আবু বকর (রা) বলেছেন: “যাকাত মালের উপর ফরয।” তিনি সকল মালকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
৩. উমার (রা) বলেছেন: “এতিমের মাল দ্বারা ব্যবসা করো, যাতে তা যাকাত দ্বারা নিঃশেষ না হয়ে যায়।” হযরত উমার (রা) বলেছেন: “আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ সম্পদ থাকতো, আর আমি আল্লাহর ঋণ (যাকাত) পরিশোধকারী হতাম, তবে তিনটে স্বর্ণ মুদ্রার চেয়ে বেশি নিজের জন্য রাখতাম না।” এ উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে, যাকাত দ্বারা ধন সম্পদ কমে যায়। তাই যাকাতের কারণে এতিমের সম্পত্তি কমে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবসা করার উপদেশ দিয়েছেন। এর অর্থ যাকাত এতিমের উপর ফরয।
৪. রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “ইসলাম পাঁচটি জিনিসের উপর নির্মিত। এর অন্যতম হলো যাকাত।” এর মাধ্যমে যাকাতকে মৌলিক কর্তব্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা, সাওরি, ইবনে আবি লায়লা ও হাসান বসরী প্রমুখ বলেছেন যে, যাকাত প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্ক ব্যক্তির উপর ফরয। তাদের প্রমাণ ইতিপূর্বে উল্লিখিত হাদিস: রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “তিন ব্যক্তি যাবতীয় দায়দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগ্রত হয়, বালক যতক্ষণ না যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ মস্তিষ্ক হয়।”
📄 ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাত
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যাকাত:
যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ যার রয়েছে, সে যদি ঋণগ্রস্ত হয় এবং ঋণ পরিশোধ করে দিলে তার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তবে তার উপর যাকাত ফরয নয়। এ ব্যাপারে হানাফিরা বলেছেন, যাকাতের জন্য সম্পদ মালিকানাধীন হওয়া শর্ত, সম্পদ বন্ধক থাকা শর্ত নয়। শাফেয়ী মাযহাবের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো শাফেয়ী আলেম বলেছেন: ঋণ যাকাতের পথে বাধা নয়। কেননা যাকাত সম্পদ দ্বারা আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার। আর আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার মানুষের অধিকারের উপর অগ্রাধিকার পায়। তাদের প্রমাণ হযরত উসমান (রা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হয়, সে যেন নিজের ঋণ পরিশোধ করে দেয়, তারপর যাকাত দেয়।” উসমান (রা) থেকে আরো বর্ণিত: তিনি বলেছেন: “এই হচ্ছে তোমাদের মাসের মাস। যার কাছে ঋণ রয়েছে, সে যেন নিজের ঋণ পরিশোধ করে দেয়। আর যার কাছে যাকাত দেয়ার মতো সম্পদ রয়েছে, সে যেন তা আদায় করে দেয়।”
📄 যাকাত না দিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির যাকাত
যাকাত না দিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির যাকাত:
কোনো ব্যক্তি যাকাত না দিয়ে মারা গেলে তার সম্পত্তি থেকে সর্বপ্রথম যাকাত আদায় করা হবে, যদি সে মৃত্যুর আগে যাকাতের ওসিয়ত করে থাকে। আর যদি যাকাতের ওসিয়ত না করে থাকে, তাহলেও যাকাত আদায় করা হবে। কেননা যাকাত আল্লাহর হক। আল্লাহর হক মানুষের হকের উপর অগ্রাধিকার পায়। এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
তবে উলামাদের মধ্যে যাকাতের ওসিয়ত না করলে তার মাল থেকে যাকাত আদায় করা হবে কিনা সে ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। হযরত উসমান (রা) যাকাত আদায় করেছেন। কিন্তু হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন: “যে যাকাত না দিয়ে মারা যায়, তাকে তার কবরে নিয়ে যাওয়া হবে।” এই উক্তি থেকে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, যাকাত কেবল তার জীবিত থাকাকালে ফরয ছিলো। আবু বকর (রা) যাকাত না দেয়া উটের মালিককে বলেছেন: “তার কাছ থেকে যাকাত গ্রহণ করো এবং তার উটও গ্রহণ করো।”