📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের জন্য যা যা নিষিদ্ধ

📄 ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের জন্য যা যা নিষিদ্ধ


জুনুবির (বীর্যপাতজনিত অপবিত্র ব্যক্তি উপর ইতিপূর্বে যা যা হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলার উপরও সেসব কাজ হারাম। তাছাড়া এই তিনজনকেই 'বড় অপবিত্রতায় লিপ্ত' আখ্যায়িত করা হয়। ঋtuvati ও নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য ইতিপূর্বে যা যা নিষিদ্ধ বলা হয়েছে, তা ছাড়া নিম্নোক্ত কাজগুলোও নিষিদ্ধ:
১. রোযা ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য রোযা রাখা বৈধ নয়। যদি রোযা রাখে তবে তা বাতিল বলে গণ হবে। ঋতু ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের জন্য রমযানে যেসব রোযা বাদ যাবে, তা রমযানের পর কাযা করতে হবে। কিন্তু নামায কাযা করতে হবেনা। মহিলাদের উপর থেকে মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। কেননা নামায ঘন ঘন পড়তে হয়। রোযা অতোটা ঘন ঘন করতে হয়না। আবু সাঈদ খুদরীর হাদিস থেকে এ তথ্যটি জানা যায়:
আবু সাঈদ খুদরীর রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার জন্য ঈদগাহে যাওয়ার সময় কিছু সংখ্যক মহিলার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বললেন: হে মহিলাগণ, তোমরা সদকা করো। কেননা আমি তোমাদের অধিকাংশকে দোযখবাসী দেখেছি। তারা বললো: হে রসূলুল্লাহ সা. এর কারণ কী? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমরা অত্যধিক অভিশাপ দিয়ে থাকো এবং আত্মীয়-স্বজনকে অবজ্ঞা করে থাকো। বুদ্ধিমত্তায় ও ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণ হয়েও তোমরা যেভাবে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা পুরুষের মনও কেড়ে নিতে পারো, তেমন আমি আর কাউকে দেখিনি। মহিলারা বললো: আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণতা কোথায়? তিনি বললেন: একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেকের সমান নয়? তারা বললো: জ্বী। তিনি বললেন: এটাই বুদ্ধির অসম্পূর্ণতা। নারী যখন ঋতুবতী হয়; তখন সে কি নামায রোযা বর্জন করেনা? তারা বললো: জ্বী। রসূল সা. বললেন: এটাই তাদের ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণতা। -বুখারি ও মুসলিম।
মুয়াযা রা. বলেছেন: আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম, ঋতুবতীকে রোযা কাযা করতে হয়, অথচ নামায কাযা করতে হয়না- এর কারণ কী? আয়েশা রা. বললেন: রসূল সা. এর আমলে আমরা যখন ঋতুবতী হতাম তখন আমাদেরকে রোযা কাযা করার আদেশ দেয়া হতো, নামায কাযা করার আদেশ দেয়া হতোনা। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
২. হায়েয-নিফাস অবস্থায় সহবাস কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নির্দেশনা বলে মুসলামনদের সর্বসম্মতিক্রমে এটি হারাম। তাই ঋতুবতীর ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাবতা মহিলার সাথে সহবাস হালাল নয়- যতোক্ষণ না সে পবিত্র হয়। আনাস রা. এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ইহুদীরা তাদের স্ত্রী ঋতুবতী হলে তার সাথে খানাপিনাও করতোনা, সহবাসও করতোনা। সাহাবিগণ রসূল সা.কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ সূরা বাকারার ২২২ নং আয়াতটি নাযিল করলেন: "তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বলো, ওটা বিব্রতকর অবস্থা। কাজেই ঋতুকালে নারীকে তোমরা এড়িয়ে চলো। যতোক্ষণ না তারা পবিত্র হয়, ততোক্ষণ তাদের কাছে যেওনা। যখন পবিত্র হয়, তখন আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেন, সেভাবে তাদের কাছে এসো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন এবং পবিত্রদেরকে ভালোবাসেন। রসূলুল্লাহ সা. অতপর বললেন: সহবাস ছাড়া সব কিছুই করতে পারো। -বুখারি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
ইমাম নববী বলেছেন: কোনো মুসলমান যদি বিশ্বাস করে, ঋতুবতী মহিলার সাথে তার যৌনাংগে সহবাস করা বৈধ, তাহলে সে কাফির ও ইসলামতা্যগী হয়ে যাবে। আর যদি বৈধ বলে বিশ্বাস না করেও ভুলক্রমে, কিংবা হারাম হওয়ার কথা না জেনে, কিংবা ঋতুবতী হওয়ার কথা না জেনে সহবাস করে, তাহলে গুনাহ হবেনা। কাফফারাও দিতে হবেনা। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে, ঋতুবতী জানা সত্ত্বেও এবং হারাম বলে জানা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সহবাস করে, তবে সে কবীরা গুনাহকারী গণ্য হবে এবং তার উপর তওবা করা ওয়াজিব হবে। কাফফারা ওয়াজিব হবে কিনা সে ব্যাপারে দুটো মত রয়েছে। কাফফারা ওয়াজিব হবেনা- এই মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ। তিনি আরো বলেছেন, দ্বিতীয় প্রকার হলো: নাভির উপরে ও হাটুর নিচে সহবাস করবে। এটা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। তৃতীয় প্রকার হলো নাভি ও হাঁটুর মাঝখানে যৌনাংগ ও মলদ্বার ব্যতিত আর সেখানে ইচ্ছা সহবাস করবে। তবে অধিকাংশ আলেম এটি হারাম মনে করেন। তবে নববীর মতে মাকরূহ কিন্তু হালাল। কেননা প্রমাণের দিক দিয়ে এটাই অধিকর জোরদার।
এর যে প্রমাণ তিনি উল্লেখ করেছেন, তা হলো রসূল সা. এর স্ত্রীদের বর্ণনা: রসূল সা. যখন কোনো ঋতুবতী স্ত্রীর নিকট কিছু কামনা করতেন, তখন প্রথমে তার যৌনাংগের উপর কোনো জিনিস রেখে নিতেন। -আবু দাউদ। আর মাসরূক বিন আজদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করলাম: স্ত্রী যখন ঋতুবতী হয়, তখন স্বামী তার কাছ থেকে কতটুকু আশা করতে পারে? তিনি বললেন: যৌনাংগ ছাড়া সব কিছু। -বুখারি রচিত ইতিহাস গ্রন্থ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ইস্তেহাযা (রোগজনিত রক্তস্রাব)

📄 ইস্তেহাযা (রোগজনিত রক্তস্রাব)


১. সংজ্ঞা: অসময়ে ও অনিয়মিত অব্যাহত রক্তস্রাবকে এস্তেহাযা বলা হয়। ২. মুস্তাহাযার (রোগজনিত রক্তস্রাবগ্রস্ত মহিলার) অবস্থা মুস্তাহাযার তিন রকমের অবস্থা হতে পারে: ক. এস্তেহাযার পূর্বে ঋতুস্রাবের একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ তার জানা ছিলো। এমতাবস্থায় সেই পরিচিত মেয়াদটাই তার ঋতুস্রাবের মেয়াদ গণ্য হবে। বাদবাকি সময়টা গণ্য হবে এস্তেহাযা হিসেবে। কেননা উম্মে সালামার হাদিসে উল্লেখ রয়েছে: তিনি অনিয়মিত রক্তস্রাবগ্রস্ত জনৈক মহিলা সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি জবাব দেন মহিলা কতদিন ঋতুবতী থাকতো, তা গুণে দেখবে এবং তা মাসের কতদিন তা হিসাব করবে, তারপর গোসল করবে। যৌনাংগে ন্যাকড়া বাঁধবে, অতপর নামায পড়বে। -মালেক, শাফেয়ী ও তিরমিযি ব্যতিত পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত। খাত্তাবী বলেছেন: এটা সেই মহিলার বিধি, যার সুস্থাবস্থায় ঋতুবতী হওয়ার দিনের সংখ্যা জানা ছিলো রোগ হওয়ার পূর্বে। এরপর রোগ দেখা দিলো এবং অব্যাহত রক্তস্রাব হতে থাকলো। তাই রসূল সা. তাকে আদেশ করলেন, যতদিন সুস্থাবস্থায় ঋতুবতী থাকতো ততদিন নামায বর্জন করবে। সেই দিনগুলো শেষে একবার গোসল করবে, তখন সে পবিত্র বলে গণ্য হবে।
খ. ক্রমাগত রক্তস্রাব হয়, অথচ ইতিপূর্বেকার ঋতুর দিনের সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিলোনা। এর কারণ, সে তার অভ্যাসের কথা ভুলে গেছে। অথবা যৌবনে পদার্পণই করেছে মুস্তাহাযা অবস্থায়। ফলে সে ঋতুর রক্ত ও এস্তেহাযার রক্তের পার্থক্য করতে পারেনা। এ পরিস্থিতিতে তার ঋতু ছয় দিন বা সাত দিন ধরতে হবে, যা অধিকাংশ মহিলার অভ্যাস। কেননা হামনা বিনতে জাহাশের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: তিনি বলেছেন: আমার খুব বেশি এস্তেহাযা হতো। তাই রসূলুল্লাহর কাছে এলাম তাঁর কাছ থেকে জেনে নেয়া ও তাঁকে আমার অবস্থা অবহিত করার জন্য। তাঁকে পেলাম আমার বোন যয়নব বিনতে জাহাশের বাড়িতে। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ সা., আমার অত্যধিক এস্তেহাযা হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী? এর কারণে আমার তো নামায রোযা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বললেন: আমি তোমাকে তুলা ব্যবহারের ব্যবস্থা দিচ্ছি। এতে তোমার রক্ত বন্ধ হবে। হামনা বললেন: রক্তের প্রবাহ তার চেয়েও বেশি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তাহলে রক্তের স্থানে এক টুকরো ন্যাকড়া বেঁধে নাও লাগামের মতো করে। হামনা বললো: রক্তের প্রবাহ এর চেয়েও বেশি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: আমি তোমাকে দুটো কাজের আদেশ দেবো। এর যে কোনো একটা করলেই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। আর যদি দুটো করতে সক্ষম হও তাহলে সেটা তুমিই ভালো জানো। রসূলুল্লাহ সা. তাকে বললেন: এটা শয়তানের একটা ধাক্কা। কাজেই তুমি ছয় থেকে সাতদিন ঋতু হিসাবে ধরে নাও, প্রকৃত সংখ্যা আল্লাহর জ্ঞানের উপরই সোপর্দ করো। তারপর গোসল করো। যখন দেখবে, তুমি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয়ে গেছো, তখন তেইশ দিন বা চব্বিশ দিন নামায ও রোযা করো। এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। এভাবে তুমি প্রতি মাসে করো, যেমন মহিলারা তাদের ঋতু ও পবিত্রতার মেয়াদ অনুসারে ঋতুবতী ও পবিত্র হয়ে থাকে। আর যদি যোহর বিলম্বিত ও আসর ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হও, তাহলে গোসল করে যোহর ও আসর এক সাথে পড়ো। পুনরায় মাগরিবকে বিলম্বিত ও এশা ত্বরান্বিত করো এবং গোসল করে মাগরিব ও এশা এক সাথে পড়ো, আর ফজরের সাথে গোসল করো ও নামায পড়ো। এভাবে তুমি চালিয়ে যাও, নামায পড়ো ও রোযা করো, যদি তা করতে সক্ষম হও। রসূলুল্লাহ সা. বললেন উক্ত দুই কাজের মধ্যে এটাই আমার নিকট অধিকতর পছন্দনীয়।” -আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি। তিরিমিযি এটিকে উত্তম ও সহীহ বলেছেন। বুখারিও একে উত্তম বলেছেন। আহমদ ইবনে হাম্বলও একে উত্তম ও সহীহ হাদিস বলেছেন। খাত্তাবী এই হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেছেন: এই মহিলা প্রথম ঋতুবতী ছিলেন, ইতিপূর্বে তার কোনো ঋতুর দিন অতিবাহিত হয়নি এবং তিনি ঋতুর রক্ত চিনতেও সক্ষম ছিলেননা। তার রক্ত প্রবাহ অব্যাহত থাকায় অধিকাংশ সময়ই তার স্রাব চলতো। এজন্য রসূলুল্লাহ সা. তার ব্যাপারটাকে প্রচলিত রীতি এবং মহিলাদের অধিকাংশ সময় যে অবস্থা থাকে তার আলোকে বিচার বিবেচনা করেন। অনুরূপ তিনি মহিলাদের প্রচলিত রীতি অনুসারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে রকম হয়ে থাকে, তার প্রতি মাসে একবার ঋতুবতী হওয়াকে সেই আলোকে নির্ধারণ করে দিলেন। রসূলুল্লাহ সা. এর উক্তি: "যেমন মহিলারা তাদের ঋতু ও পবিত্রতার মেয়াদে ঋতুবতী ও পবিত্র হয়ে থাকে" দ্বারা সে কথাই প্রতিষ্ঠিত হয়। খাত্তাবী বলেন: ঋতুস্রাব, সন্তান ধারণ, বয়োপ্রাপ্ত হওয়া ও অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে মহিলাদের একজনের অবস্থা আর একজনের অবস্থার আলোকে বিচার বিবেচনার জন্য এটাই মূল সূত্র।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00