📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তায়াম্মুম শরিয়তে বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণ

📄 তায়াম্মুম শরিয়তে বিধিবদ্ধ হওয়ার কারণ


“আয়েশা রা. বর্ণনা করেন : একদিন আমরা কোনো এক সফরে রসূল সা. এর সাথে বের হলাম। এক মরু প্রান্তরে আমার একটি হার হারিয়ে গেলো। হারটি খোঁজার জন্য রসূল সা. যাত্রাবিরতি করলেন। লোকেরাও (সাহাবিগণ) তাঁর সাথে যাত্রাবিরতি করলো। অথচ সেখানে পানি ছিলোনা। সাহাবিদের নিকটও পানি ছিলোনা। অগত্যা লোকেরা আবু বকরের রা. কাছে এলো। তারা বললো : দেখতে পাচ্ছেন না, (আপনার মেয়ে) আয়েশা কী করেছে? (হার হারিয়ে সবাইকে যাত্রাবিরতি করতে বাধ্য করেছে)। আবু বকর আমার কাছে এলেন। তখন রসূলুল্লাহ সা. আমার উরুর উপর ঘুমিয়ে। আবু বকর আমাকে ভর্ৎসনা করলেন এবং আল্লাহ যেমন চেয়েছিলেন তেমন বকাঝকা করলেন। তারপর ক্রমাগত আমার কোমরে ধাক্কা দিতে লাগলেন (যাতে উঠে রওয়ানা হই), কিন্তু রসূল সা. আমার উরুর উপর ঘুমিয়ে থাকার কারণে আমি নড়াচড়া করতে পারছিলামনা। অবশেষে সকাল পর্যন্ত তিনি পানিবিহীন অবস্থায় ঘুমিয়ে রইলেন। তখন আল্লাহ “তায়াম্মুম করো” আদেশ সম্বলিত আয়াত নাযিল করলেন।
উসাইদ বিন হুযাইর বললেন : হে আবু বকরের বংশধর! এটাই তোমাদের একমাত্র বরকত (শুভাশীষ) নয় (তোমাদের আরো বহু বরকত বা শুভাশীষ রয়েছে)। আয়েশা বলেন : সহসা আমি যে উটটির উপর ছিলাম, তাকে উঠালাম। তার নিচেই হারটি পেয়ে গেলাম।” -তিরমিযি ব্যতিত সবকটি হাদিস গ্রন্থ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে সকল কারণে তায়াম্মুম বৈধ

📄 যে সকল কারণে তায়াম্মুম বৈধ


তায়াম্মুম বৈধ ক্ষুদ্র অপবিত্রতায় যাতে অযুর প্রয়োজন হয় এবং বড় অপবিত্রতায় যাতে গোসলের প্রয়োজন হয়। স্থায়ী নিবাসে হোক বা প্রবাসে হোক, নিম্নোক্ত কারণসমূহের যে কোনো একটি পাওয়া গেলে তাইয়াম্মুম বৈধ :
ক. পানি পাওয়া না গেলে, অথবা পবিত্রতা অর্জনে যথেষ্ট পরিমাণে পানি পাওয়া না গেলে। ইমরান বিন হুসাইন রা. বলেছেন :
"আমরা একটি সফরে রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে ছিলাম। তিনি উপস্থিত জনগণকে সাথে নিয়ে নামায পড়লেন। দেখলেন, এক ব্যক্তি জামাত থেকে আলাদা হয়ে রয়েছে। তিনি তাকে বললেন : তুমি নামাযে যোগ দাওনি কেন? সে বললো: আমি তো জানাবতে (বৃহত্তর অপবিত্রাবস্থায়) আছি, অথচ পানি নেই। তিনি বললেন: তুমি মাটি ব্যবহার করো। এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট।” -বুখারি ও মুসলিম। আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "যে পানি পায়না, তার জন্য মাটিই পবিত্রকারী- চাই দশ বছর ধরেই হোক না কেন।" -আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ। তিরমিযি একে সহীহ ও উত্তম বলেছেন। তবে এ ধরনের ব্যক্তির জন্য তাইয়াম্মুমের পূর্বে তার কাফেলা অর্থাৎ সফর সংগিদের কাছে পানি আছে কিনা খোঁজা ও চেয়ে নেয়ার চেষ্টা করা কর্তব্য। সফর সংগিদের কাছে না পাওয়া গেলে আশপাশে কোথাও পাওয়া যায় কিনা দেখতে হবে। যখন কোথাও নেই বলে নিশ্চিত হবে অথবা অনেক দূরে আছে বলে জানা যাবে, তখন আর খোঁজার প্রয়োজন হবেনা।
খ. যখন তার দেহে কোনো যখম বা রোগ থাকে, আর পানি ব্যবহারে রোগ বেড়ে যাওয়া বা আরোগ্য লাভ বিলম্বিত হবার আশংকা থাকে- চাই এটা অভিজ্ঞতা দ্বারা জানা যাক কিংবা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসকের কাছ থেকে জানা যাক। জাবির রা. বলেন: "আমরা একটা সফরে গেলাম। আমাদের জনৈক সংগি পাথরের আঘাতে আহত হলো। তার মাথা ফেটে গেলো। ঐ অবস্থায় পরে তার স্বপ্নদোষ হলো। সে তার সাথিদেরকে জিজ্ঞাসা করলো: তোমরা কি মনে করো, আমার জন্য তাইয়াম্মুম করা বৈধ? তারা বললো: আমরা মনে করিনা তোমার জন্য এটা বৈধ। তুমি তো পানি ব্যবহারে সক্ষম। এরপর সে গোসল করলো এবং মারা গেলো। পরে যখন আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এলাম, তাঁকে ব্যাপারটা জানানো হলো। তিনি বললেন: ওরা তাকে হত্যা করেছে। তারা যখন জানেনা, তখন জিজ্ঞাসা করলোনা কেন? অজ্ঞতার প্রতিকার তো জিজ্ঞাসা দ্বারাই সম্ভব। তার জন্য তো তাইয়াম্মুম করা, ভিজা কাপড় দিয়ে মুছে নিংড়ে ফেলা, কিংবা ক্ষতস্থানের উপর একটা ন্যাকড়া দিয়ে পট্টি বেঁধে তার উপর মাসেহ করা এবং অবশিষ্ট শরীর ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট ছিলো।” -আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দার কুতনি।
গ. যখন পানি অত্যধিক ঠাণ্ডা থাকে এবং সে পানি ব্যবহারে ক্ষতি হবে বলে প্রবল আশংকা থাকে, এরূপ ক্ষেত্রে কাউকে পারিশ্রমিক দিয়েও যদি পানি গরম করার ব্যবস্থা করা সম্ভব না হয়, কিংবা গোসলখানায় প্রবেশ করা সম্ভব না হয়। তাহলে তাইয়াম্মুম করা বৈধ হবে। আমর ইবনুল আস রা. বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: তাকে যখন যাতুস সালাসিল অভিযানে পাঠানো হলো, তখনকার সম্পর্কে তিনি বলেছেন: একদিন প্রচণ্ড শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হলো। গোসল করলে মরে যেতে পারি বলে আশংকা হলো। তাই আমি তাইয়াম্মুম করলাম এবং সাথিদের নিয়ে ফজরের নামায পড়লাম। পরে যখন রসূল সা. এর কাছে এলাম, তখন সাথিরা রসূল সা. কে ঘটনাটা জানালো। রসূল সা. বললেন: হে আমর, তুমি অপবিত্রাবস্থায় তোমার সাথিদের নামায পড়িয়েছ? আমি বললাম আল্লাহর এই উক্তিটা আমার মনে পড়েছিল: "তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করোনা। আল্লাহ তো তোমাদের প্রতি করুণাময়।” (সূরা ৪, আননিসা: আয়াত ২৯) তাই তাইয়াম্মুম করে নামায পড়িয়েছি। তখন রসূল সা. হেসে দিলেন। আর কিছুই বললেন না।-আহমদ, আবু দাউদ, হাকেম, দার কুতনি, ইবনে হিব্বান, বুখারি।
ঘ. পানি নিকটে থাকলেও তা সংগ্রহ করতে গেলে জীবনহানি, সম্ভ্রমহানি, সম্পদহানি বা সংগিদের হারানোর আশংকা, অথবা পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাঝে এমন শত্রুর অবস্থান, যা দ্বারা ক্ষতির আশংকা রয়েছে, চাই তা মানুষ হোক অথবা অন্য কিছু, অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কারাবন্দী হওয়ার দরুন পানি ব্যবহারে অক্ষম অথবা পানি হস্তগত করার সরঞ্জাম যথা বালতি ও রশির অভাবে পানি যোগাড়ে অক্ষম- এসব ক্ষেত্রে পানির বিদ্যমানতা অবিদ্যমানতারই সমার্থক। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তির গোসল করলে কোনো মিথ্যা অপবাদের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে, তার পক্ষেও তাইয়াম্মুম বৈধ। ১০.
৬. যখন নিজের বা সফর সংগির বর্তমানে বা ভবিষ্যতে পান করার জন্য পানি সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। এমনকি সেই সফর সংগি যদি দংশনে অভ্যস্ত নয় এমন কুকুরও হয় অথবা আটার খামির করা, রান্না করা বা অমোছনীয় নাপাকি দূর করার প্রয়োজনে পানি সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক হয়ে দেখা দেয়, তাহলে তাইয়াম্মুম করবে ও সংগে বিদ্যমান পানিকে সংরক্ষণ করবে। ইমাম আহমদ রা. বলেছেন: বহু সাহাবি শুধুমাত্র নিজেদের পান করার জন্য পানি সংরক্ষণ ও তাইয়াম্মুম করেছেন। আর আলী রা. বলেছেন: কোনো প্রবাসী বৃহত্তর অপবিত্রতায় (জানাবত) আক্রান্ত হলে, তার কাছে স্বল্প পরিমাণ পানি থাকলে এবং পিপাসায় কষ্ট পাওয়ার আশংকা থাকলে সে তাইয়াম্মুম করবে, গোসল করবেনা। -দার কুতনি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: যে ব্যক্তি পানির অভাবে পেশাব বা পায়খানা চেপে রাখে, তার জন্য পেশাব পায়খানা চেপে রেখে অযু রক্ষা করার চেয়ে চেপে না রেখে তাইয়াম্মুম করে নামায পড়া উত্তম।
চ. পানি ব্যবহারের ক্ষমতা থাকলেও পানি দ্বারা অযু বা গোসল করতে গেলে নামাযের সময় পেরিয়ে যাওয়ার আশংকা আছে- এরূপ অবস্থায় তাইয়াম্মুম করে নামায পড়বে। এ নামায আর দোহরাতে হবেনা।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কোন্ মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে হয়?

📄 কোন্ মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে হয়?


পবিত্র মাটি এবং মাটি থেকে উদ্ভূত যে কোনো জিনিস, যেমন বালু, পাথর ও চুন দ্বারা তাইয়াম্মুম বৈধ। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: "তোমরা পবিত্র 'সঈদ' দিয়ে তাইয়াম্মুম করো।” আর আরবি অভিধান বিশেষজ্ঞরা একমত, 'সঈদ' পৃথিবীর উপরি ভাগকে বলা হয়, চাই তা মাটি হোক বা অন্য কিছু হোক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তায়াম্মুমের পদ্ধতি

📄 তায়াম্মুমের পদ্ধতি


তায়াম্মুমকারীর উচিত, সর্বপ্রথমে নিয়ত করা (তায়াম্মুমে নিয়ত করা ফরয। এ ব্যাপারে অযুর অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে)। অতপর আল্লাহর নাম নেবে। পবিত্র মাটির উপর দু'হাত মারবে। আর সেই দু'হাত দিয়ে মুখমণ্ডল ও হাতের কনুই পর্যন্ত মুছে নেবে। এ ব্যাপারে আম্মার রা. এর হাদিসের চেয়ে বিশুদ্ধ ও স্পষ্ট আর কোনো হাদিস বর্ণিত হয়নি। আম্মার বলেন: "আমি জানাবত তথা বড় নাপাকিতে আক্রান্ত হলাম। এরপর পানি পেলামনা। অগত্যা মাটিতে গড়াগড়ি খেলাম এবং নামায পড়লাম। অতপর এ ঘটনা রসূল সা. কে জানালাম। তিনি বললেন: (গড়াগড়ি না খেয়ে) তোমরা শুধু এ রকম করলেই চলতো : এই বলে রসূল সা. তাঁর দু'হাতের তালু মাটিতে মারলেন, হাত দুখানিতে ফুঁ দিলেন (ধুলো ঝেড়ে ফেললেন) তারপর সেই দু'হাত দিয়ে নিজের মুখমণ্ডল ও হাত মুছে নিলেন। -বুখারি ও মুসলিম। অপর বর্ণনার ভাষা হলো: তোমার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, তোমার দু'হাতের তালু মাটিতে মারবে, তারপর হাতের তালুতে ফুঁ দেবে, অতপর সেই হাতের তালু দুখানা দিয়ে তোমার মুখমণ্ডল ও হাতের তালু কনুই পর্যন্ত মুছে নেবে বা মাসেহ করবে। -দার কুতনি। এ হাদিস থেকে জানা গেলো, একবার হাত মারাই যথেষ্ট এবং দু'হাত মাসেহ করার সময় হাতের তালু মাসেহ করাই যথেষ্ট। আর মাটি দিয়ে তাইয়াম্মুম করার সময় ফুঁ দিয়ে হাত থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলা এবং মুখে ধুলো না মাখা সুন্নত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00