📄 এর শরয়ী প্রমাণ
রসূলুল্লাহ সা. থেকে সহীহ হাদিস দ্বারা মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয সাব্যস্ত হয়েছে। নববী বলেছেন: যে সকল আলেমের মতামতের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তারা মোজার উপর মাসেহ জায়েয হওয়ার পক্ষে একমত হয়েছেন, চাই নিজের আবাসিক এলাকায় থাকুক কিংবা সফরে থাকুক এবং চাই প্রয়োজনে হোক কিংবা অপ্রয়োজনে। এমনকি সার্বক্ষণিকভাবে ভৃত্যগিরীতে নিয়োজিত মহিলা কিংবা অচল প্রতিবন্ধীর জন্যও জায়েয। কেবল শিয়া ও খারেজীগণ এর বিরোধিতা করে। তাদের বিরোধিতা গ্রহণযোগ্য নয়। হাফেয ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে বলেছেন: হাদিসের একদল হাফেয সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মোজার উপর মাসেহ একটি মুতাওয়াতির (সার্বজনীন বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত) ব্যাপার। কেউ কেউ এর বর্ণনাকারীদের তালিকা তৈরি করেছেন, যা আশি (৮০) ছাড়িয়ে গেছে। মোজার উপর মাসেহ সংক্রান্ত হাদিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রামাণ্য হাদিসটি বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ ও তিরমিযি ইমাম নাখয়ী থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি হলো: জারির বিন আবদুল্লাহ পেশাব করলেন, তারপর অযু করলেন ও নিজের মোজার উপর মাসেহ করলেন। তাকে বলা হলো: আপনি এটা করলেন? অথচ আপনি তো পেশাব করেছেন। জারির বললেন: হ্যাঁ, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে দেখেছি, পেশাব করলেন, তারপর অযু করলেন এবং মোজার উপর মাসেহ করলেন। ইবরাহীম বলেন, এ হাদিস তাদেরকে বিস্মিত করতো। কেননা জারির ইসলাম গ্রহণ করেন সূরা মায়েদা নাযিল হওয়ার পর। অর্থাৎ তিনি সূরা মায়েদার অযুর বিধান সম্বলিত যে আয়াতে দু'পা ধোয়ার আদেশ রয়েছে, সেটি নাযিল হবার পর দশম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। সুতরাং তার হাদিস থেকে একথা প্রমাণিত যে, আয়াতে ধৌত করার যে হুকুম পাওয়া যায়, তা মোজা পরিহিত নয় এমন ব্যক্তির জন্য। আর যে মোজা পরিহিত, তার জন্য ওয়াজিব হলো মাসেহ করা। কাজেই হাদিস দ্বারা আয়াতের প্রয়োগস্থল নির্দিষ্ট হতে পারে।
📄 চামড়ার মোজার উপর মাসেহর বৈধতা
জাওরাব বা চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয। বহু সংখ্যক সাহাবি থেকে এটি বর্ণিত। আবু দাউদ বলেছেন: আলী বিন আবু তালেব, ইবনে মাসউদ, বারা বিন আযেব, আনাস বিন মালেক, আবু উমামা, সাহল বিন সা'দ ও আমর বিন হুরাইছ জাওরাবের উপর মাসেহ করেছেন। আর উমর ইবনুল খাত্তাব এবং ইবনে আব্বাস থেকেও একথা বর্ণিত হয়েছে। আম্মার, বিলাল ও ইবনে উমর থেকেও বর্ণিত হয়েছে। ইবনুল কাইয়েম রচিত তাহযীবুস্ সুনানে ইবনুল মুনযির থেকে বর্ণিত: জাওরাবের উপর মাসেহ বৈধ- এটা ইমাম আহমদ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। এটা তার সঠিক সিদ্ধান্ত। এটা এ সকল সাহাবির ইচ্ছাকৃত কাজ ও সুস্পষ্ট কিয়াস। কেননা মোজা ও জাওরাব (চামড়ার মোজা)-এর মাঝে তেমন বাস্তব পার্থক্য দৃষ্টি
গোচর হয়না। তাই মোজার হুকুম জাওরাবের উপর প্রয়োগ করা চলে। আর উভয়টির উপর মাসেহ জায়েয- এটা অধিকাংশ আলেমের অভিমত। যারা উভয়টির উপর মাসেহ জায়েয বলেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন- সুফিয়ান ছাওরী, ইবনুল মুবারক, আতা, হাসান বস্ত্রি ও সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব। আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ বলেছেন: মোজা ও চামড়ার মোজা যদি এতো ঘন হয় যে, তার নিচে কি আছে দেখা যায়না, তাহলে তার উপর মাসেহ জায়েয। আবু হানিফা ঘন চামড়ার মোজার উপরও মাসেহ নাজায়েয বলতেন। তবে তাঁর মৃত্যুর তিন দিন বা সাত দিন আগে মত পাল্টান এবং জায়েয বলে রায় দেন। তখন অসুস্থ অবস্থায় তিনি চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করেন এবং যারা তাকে দেখতে এসেছিল তাদেরকে বলেন, আমি যা করতে নিষেধ করতাম তা এখন নিজেই করলাম। মুগীরা ইবনে শু'বা থেকে বর্ণিত:
রসূলুল্লাহ সা. অযু করলেন এবং জুতা ও চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করলেন। -আহমদ, তাহাবি, ইবনে মাজাহ, তিরমিযি। তিরমিযি একে সহীহ ও আবু দাউদ দুর্বল বলেছেন। জাওরাব তথা চামড়ার মোজার উপর মাসেহই মূল লক্ষ্য ছিলো। না'ল বা জুতার উপর মাসেহ্র বিষয়টি নিছক আনুসংগিকভাবে এসে গেছে।
জাওরাব বা চামড়ার মোজার উপর মাসেহ যেমন জায়েয, তেমনি পায়ের উপর পরিধেয় যে কোনো আবরণ তথা মোজার উপর মাসেহ করা জায়েয- যেগুলো ঠাণ্ডার ভয়ে, আঘাত লাগার ভয়ে বা নগ্ন পদতার ভয়ে বা অনুরূপ অন্য কোনো কারণে পরা হয়। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, "পায়ের আবরণের উপর মাসেহ করা জায়েয। মোজা ও চামড়ার মোজার উপর মাসেহ করার চেয়ে আবরণের উপর মাসেহ অগ্রগণ্য। কারণ সচরাচর প্রয়োজনের খাতিরেই আবরণ পরা হয় এবং তা খুললে নানা রকম ক্ষতি হয়। হয় ঠাণ্ডা লাগে, না হয় নগ্ন পদজনিত কষ্ট হয়, নচেত আঘাত লাগে। কাজেই মোজা ও চামড়ার মোজার উপর মাসেহ যখন জায়েয, তখন আবরণের উপর মাসেহ অবশ্যই জায়েয হবে। যে ব্যক্তি এর কোনো একটিতে আলেমদের ইজমা অর্থাৎ ঐকমত্যের দাবি করে, সে নিজের অজ্ঞতাই প্রকাশ করে। খ্যাতনামা দশজন আলেমও একে নিষিদ্ধ বলেছেন বলে প্রমাণ করা যাবেনা, ইজমা তো দূরের কথা। ইবনে তাইমিয়া আরো বলেন: যে ব্যক্তি রসূল সা. এর উক্তি নিয়ে চিন্তা গবেষণা করবে এবং যথার্থভাবে কিয়াস করবে, সে বুঝবে এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খুবই প্রশস্ত ও ব্যাপক। এটা শরিয়তের একটি কল্যাণময় বৈশিষ্ট্য এবং শরিয়তের উদারতা ও মহানুভবতা।” মোজায় বা জাওরাবে যদি ছেঁড়া ফাটা থাকে, তাহলে মাসেহ করাতে আপত্তি নেই, যতোক্ষণ তা প্রথাগতভাবে পরিধান করা হয়। ছাওরী বলেন: মুহাজির ও আনসারদের মোজা ছেঁড়া ফাটা থেকে মুক্ত থাকতোনা। এজন্য যদি মাসেহ নিষিদ্ধ হতো, তবে তা তাদের কাছ থেকে অবশ্যই উদ্ধৃত হতো।
টিকাঃ
৯. এ হাদিসে মূল শব্দ দুটি হলো না'ল (১১) ও জাওরাব (جورب)। না'ল হলো, যা পাকে মাটি থেকে রক্ষা করে। এটা মোজা নয়। জুতা, স্যান্ডেল বা খড়ম জাতীয় জিনিস হতে পারে। রসূল সা. এর না'লের দুটো ফিতে ছিলো। একটি ফিতে পায়ের বুড়ো আংগুল ও তার পার্শ্ববর্তী আংগুলের মাঝখানে এবং অপরটি মধ্যমা ও তার পার্শ্ববর্তী আংগুলের মাঝে থাকতো। আর এই দুটো ফিতে পায়ের পিঠের উপরের ফিতের সাথে মিলিত হতো, যাকে শিরাক বলা হয়। আর জাওরাব হলো, পায়ের পাতা জুড়ে থাকা চামড়ার মোজা, যাকে শিরাক বলা হয়।
📄 মোজা ইত্যাদি উপর মাসেহর শর্তাবলী
মোজা বা অনুরূপ আবৃতকারী কোনো জিনিসের উপর মাসেহ জায়েয হওয়ার শর্ত হলো, অযু থাকা অবস্থায় তা পরা চাই। কেননা মুগীরা ইবনে শু'বা বর্ণনা করেন: আমি এক রাতে সফরে রসূলুল্লাহ সা. এর সাথে ছিলাম। তখন আমি তাঁকে বদনা থেকে পানি ঢেলে দিলাম। তা দিয়ে তিনি নিজের মুখমণ্ডল ও দু'হাত ধুলেন এবং মাথা মাসেহ করলেন। এরপর আমি তাঁর মোজা
খোলার জন্য নিচু হলাম। তখন তিনি বললেন: থাক, মোজা খুলোনা। কারণ আমি পবিত্র অবস্থায় ও দুটো পরেছি। অতপর তিনি সেগুলোর উপর মাসেহ করলেন। -আহমদ, বুখারি ও মুসলিম।
হুমায়দী স্বীয় মুসনাদে মুগীরা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আমরা বললাম, “হে রসূল, আমরা কি মোজার উপর মাসেহ করবো? তিনি বললেন: হ্যাঁ, যদি তা পবিত্র অবস্থায় পায়ে ঢুকানো হয়।” কোনো কোনো ফকীহ শর্ত আরোপ করেছেন, মোজা ফরযের স্থানটিকে আবৃতকারী হওয়া চাই এবং কোনো ফিতে ইত্যাদি দিয়ে বাঁধা ছাড়াই পায়ে লেগে থাকে- এমন হওয়া চাই। আর সেই সাথে তা পরে অবিরাম চলা ফেরা করার যায় এমন হওয়া চাই। তবে ইবনে তাইমিয়া তার ফতোয়া গ্রন্থে এসব শর্তকে দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন।
📄 মাসেহর স্থান
শরিয়ত নির্ধারিত মাসেহের স্থান হলো মোজার পিঠ। কারণ: মুগীরা রা. বলেন: আমি রসূল সা.কে মোজার পিঠের উপর মাসেহ করতে দেখেছি। -আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযি।
আলী রা. বলেছেন: "ইসলাম যদি মানুষের মতামত ভিত্তিক ধর্ম হতো, তাহলে মোজার উপরের অংশের চেয়ে নিচের অংশ মাসেহ করাই অগ্রগণ্য হতো। আমি রসূল সা.কে মোজার উপরিভাগে মাসেহ করতে দেখেছি।" -আবু দাউদ, দার কুতনি। আর শাব্দিক ও আভিধানিকভাবে মাসেহ বলতে যা বুঝায়, সেটাই ওয়াজিব। এর মধ্যে নির্দিষ্ট করার কিছু নেই। আর এ ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদিসে কিছুই উল্লেখ নেই।