📄 যেসব কাজে অযু জরুরি
এক: যে কোনো নামায পড়ার জন্য, চাই তা ফরয হোক বা নফল হোক। এমনকি জানাযার নামায পড়তে হলেও অযু করা চাই। কেননা আল্লাহ বলেছেন: "হে মুমিনগণ, যখন তোমরা নামায পড়তে ইচ্ছা করবে, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত দু'হাত ধৌত করো, তোমাদের মাথা মাসেহ করো, আর গিরে পর্যন্ত দু'পা ধৌত করো।" অর্থাৎ তোমরা বে অযু থাকো, তখন নামায পড়তে চাইলে ধৌত করো। আর রসূল সা. বলেছেন: আল্লাহ পবিত্রতা ব্যতিত নামায কবুল করেননা, আর গনিমতের মাল বণ্টন হওয়ার আগে আত্মসাৎ করলে তা থেকে সদকা কবুল করেননা। -বুখারি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
দুই: পবিত্র কাবা'র তওয়াফ করার জন্যে। কেননা ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তওয়াফ নামাযই। কেবল আল্লাহ এর ভেতর কথা বলা জায়েয করেছেন। তবে যে কথা বলবে, সে যেনো ভাল কথা বলে।-তিরমিযি ও দার কুতনি। হাকেম, ইবনে সাকান ও ইবনে খুযায়মা এটিকে সহীহ বলেছেন।
তিন: পবিত্র কুরআন স্পর্শ করা। কেননা আবু বকর বিন মুহাম্মদ বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. ইয়ামানবাসীর নিকট একটা চিঠিতে লিখলেন: পবিত্র ব্যক্তি ব্যতিত কুরআনকে স্পর্শ করবেনা। -নাসায়ী, দার কুতনি, বায়হাকি, আছরাম। ইবনে আবদুল বার বলেছেন: এ হাদিসটি জনগণের ব্যাপক গ্রহণের কারণে মুতাওয়াতিরের কাছাকাছি চলে গেছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কুরআনকে পবিত্র ব্যক্তি ব্যতিত স্পর্শ করবেনা। -মাজমাউয যাওয়ায়েদ। বস্তুত এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয়, পবিত্র অবস্থায় ব্যতিত কুরআন শরিফ স্পর্শ করা জায়েয নয়। তবে 'পবিত্র' শব্দটা একাধিক অর্থবোধক। বৃহৎ নাপাকি (বীর্য স্খলন বা ঋতু উত্তর নাপাকি) থেকে মুক্ত থাকা, ক্ষুদ্র নাপাকি (পেশাব পায়খানা বা বায়ু নির্গমনজনিত নাপাকি) থেকে মুক্ত থাকা, মুমিন ব্যক্তি- যার শরীরে কোনো নাপাকি নেই- এসব ব্যক্তিকে পবিত্র বলা হয়। একটি অর্থ থেকে কোনো একটিকে নির্দিষ্ট করার জন্য কোনো প্রতীক থাকা প্রয়োজন। তাই ক্ষুদ্র নাপাকিতে লিপ্ত ব্যক্তিকে কুরআন স্পর্শ করতে নিষেধ করার জন্য এ হাদিস কোনো অকাট্য প্রমাণ নয়। কুরআনের উক্তি : লা ইয়ামাসসুহু ইল্লাল মুতহ্হারুন (এ গ্রন্থকে পবিত্র লোকেরা ব্যতিত স্পর্শ করেনা।) (সূরা ৫, ওয়াকিয়া: আয়াত ২৯)
স্পষ্টতই এ আয়াতে গোপনে সুরক্ষিত কিতাব 'লওহে মাহফুয'কে বুঝানো হয়েছে। কেননা ওটাই নিকটতর। আর পবিত্র লোকেরা অর্থ ফেরেশতাগণ। যেমন আল্লাহ বলেছেন:
ফি সুহুফিম মুকাররামাহ মারফূ'আতিম মুতহ্হারাতিন বি আইদি সাফারাতিন কিরামিন বারারাহ।
"সম্মানিত গ্রন্থসমূহে রক্ষিত, সুউচ্চ স্থানে উন্নীত পবিত্র, সম্মানিত মহান লেখকগণের হাতে।" (সূরা ৮০, আবাসা: আয়াত ১৩-১৬)
ইবনে আব্বাস শা'বী, দাহাক, যায়েদ বিন আলী, আল-মুয়াইয়াদ বিল্লাহ, দাউদ যাহেরি, ইবনে হাযম ও হাম্মাদ বিন আবু সুলাইমানের মতে ছোট নাপাকিতে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য কুরআন স্পর্শ করা জায়েয। আর স্পর্শ না করে কুরআন পড়া সর্বসম্মতভাবে জায়েয।
📄 যেসব অবস্থায় অযু করা মুস্তাহাব
১. আল্লাহকে স্মরণ করা বা তাঁর নাম উচ্চারণ করার সময়:
মুহাজির বিন কুনফুয রা. বলেছেন: তিনি রসূলুল্লাহ সা.কে সালাম করলেন। তখন তিনি অযু করছিলেন। অযু শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সালামের জবাব দিলেননা। অযুর শেষে জবাব দিলেন এবং বললেন: তোমার সালামের জবাব না দেয়ার একমাত্র কারণ হলো, আমি পবিত্রাবস্থায় ব্যতিত আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা পছন্দ করিনি।" কাতাদা বলেন: এ কারণে হাসান পবিত্রতা অর্জন না করা পর্যন্ত কুরআন পাঠ বা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা অপছন্দ করতেন। -আহমদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।
আবু জুহাইম ইবনুল হারেস রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. বিরে জামাল (মদিনার পার্শ্ববর্তী একটি জায়গা) থেকে এলেন। এ সময় এক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলো ও তাঁকে সালাম করলো। রসূল সা. তার জবাব না দিয়ে একটি প্রাচীরের কাছে এলেন, তারপর তার মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করলেন (অর্থাৎ তাইয়াম্মুম করলেই) তারপর সালামের জবাব দিলেন। -আহমদ, বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী। এ হচ্ছে মুস্তাহাব ও উত্তম কাজ। অন্যথায় পবিত্রাবস্থা, অপবিত্রাবস্থা, বসা, দাঁড়ানো, শোয়া, হাঁটা- সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকর বা স্মরণ করা জায়েয। কেননা আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. সব সময় আল্লাহর যিকর করতেন। -নাসায়ী ব্যতিত পাঁচটি হাদিস গ্রন্থ। বুখারি এটিকে সনদ ব্যতিত উদ্ধৃত করেছেন।
আলী রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. পায়খানা থেকে এসে আমাদেরকে কুরআন পড়াতেন এবং আমাদের সাথে গোশত খেতেন। একমাত্র জানাবাত (বৃহৎ নাপাকি) ব্যতিত কোনো কিছুই তাকে কুরআন থেকে বিরত রাখতোনা। -পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ, তিরমিযি ও ইবনে সাকান এটিকে সহীহ বলেছেন।
২. ঘুমানোর পূর্বে:
বারা ইবনে আযেব রা. বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যখন তুমি বিছানায় আসবে, তখন নামাযের অযুর মতো অযু করবে। তারপর ডান কাতে শুয়ে বলবে: হে আল্লাহ! তোমার নিকট আমার প্রাণ সমর্পণ করলাম, তোমার দিকে মুখ ফিরালাম, আমার যাবতীয় বিষয় তোমার নিকট অর্পণ করলাম। আমার পিঠ তোমার উপর ঠেকালাম। তোমার প্রতি আগ্রহ ও ভীতি পোষণ করি। তোমার কাছ থেকে মুক্তি ও আশ্রয় লাভের স্থান তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। হে আল্লাহ, তুমি যে কিতাব নাযিল করেছো, তার প্রতি ঈman আনলাম, তুমি যে নবী পাঠিয়েছ তার প্রতি ঈমান আনলাম।" এরপর তুমি সেই রাতে মারা গেলে ঈমানের অবস্থায় মারা যাবে। তবে এই কথাগুলোর পর আর কোনো কথা বলবেনা।" বারা বলেন: আমি এই কথাগুলো রসূল সা. এর সামনে পুনরাবৃত্তি করলাম। যখন এই পর্যন্ত পৌঁছলাম: “হে আল্লাহ, তুমি যে কিতাব নাযিল করেছো, তার প্রতি ঈমান আনলাম।" তখন বললাম, "এবং তোমার রসূলের উপর", রসূল সা. বললেন না, বলো: "তোমার সেই নবীর উপর যাকে পাঠিয়েছ।" -আহমদ, বুখারি, তিরমিযি।
"জানাবত” অর্থাৎ বৃহত্তর নাপাকিতে লিপ্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ইবনে উমর রা. বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আমাদের কেউ কি জানাবত অবস্থায় ঘুমাবে? তিনি বললেন: “হাঁ, অযু করে।" আর আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. যখন জানাবত অবস্থায় ঘুমাতে চাইতেন, গুপ্তাংগ ধুয়ে নামাযের অযুর মতো অযু করতেন।"-সব ক'টি হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।
৩. জুনুবীর জন্য অযু মুস্তাহাব :
বৃহত্তর নাপাকিতে লিপ্ত ব্যক্তি যখন পানাহার করতে বা পুনরায় সহবাস করতে চায় তখন অযু করে নেয়া মুস্তাহাব। কেননা আয়েশা রা. বর্ণনা করেন: রসূলুল্লাহ সা. যখন জুনুবী (বৃহত্তর নাপাকিতে লিপ্ত) থাকতেন এবং আহার করতে বা ঘুমাতে চাইতেন, তখন অযু করে নিতেন।- অনেকগুলো গ্রন্থে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
আম্মার বিন ইয়াসার থেকে বর্ণিত: জুনুবী যখন পানাহার করতে বা ঘুমাতে চায়, তখন তাকে নামাযের অযুর মতো অযু করতে রসূল সা. অনুমতি দিয়েছেন। -আহমদ, তিরমিযি। আর আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন স্ত্রী সহবাসের পর পুনরায় সহবাস করতে চায় তখন তার অযু করে নেয়া উচিত। -বুখারি ব্যতিত সব ক'টি হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।
ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান এবং হাকেমও এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁরা একটি কথা সংযোজন করেছে: “কেননা তা পুনঃ সহবাসের জন্য অধিকতর প্রেরণাদায়ক।"
৪. ওয়াজিব বা মুস্তাহাব গোসলের আগে:
আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. যখন জানাবতের গোসল করতেন, তখন প্রথমে দু'হাত ধুতেন। তারপর ডান হাত দিয়ে বাম হাতে পানি ঢালতেন, তারপর গুপ্তাংগ ধৌত করতেন। তারপর নামাযের অযুর মতো অযু করতেন। -সব ক'টি সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
৫. আগুন স্পর্শ করেছে এমন খাদ্য খাওয়ার পর অযু করা মুস্তাহাব :
ইবরাহীম বিন আবদুল্লাহ বিন কারিষ বলেন: "আমি আবু হুরায়রার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি অযু করছিলেন। তিনি বললেন: তুমি কি জানো, কেন অযু করছি? কারণ আমি পনির খেয়েছি। আমি রসূল সা. কে বলতে শুনেছি: যে খাদ্যে আগুন স্পর্শ করেছে, তা খেয়ে অযু করো।" -আহমদ, মুসলিম ও চারটি হাদিস গ্রন্থ।
আর আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "আগুন যাকে স্পর্শ করেছে, তা খেয়ে অযু করো।" -আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ।
উল্লেখ্য যে, এখানে অযুর আদেশকে মুস্তাহাব অর্থে গ্রহণ করা হয়। কেননা আমর বিন উমাইয়া আদ দুমারির বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, তিনি বলেন; রসূলুল্লাহ সা.কে দেখেছি, একটা ছাগলের (রান্না করা) ঘাড় থেকে গোশত কেটে নিলেন ও খেলেন। পরক্ষণে নামাযের আহ্বান এলো। তখন তিনি উঠলেন, ছুরি রেখে দিলেন এবং অযু না করেই নামায পড়লেন। -বুখারি ও মুসলিম। নববী মন্তব্য করেছেন! এ হাদিসে ছুরি দিয়ে গোশত কাটা জায়েয হওয়ার প্রমাণ বিদ্যমান।
৬. প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুন অযু করা মুস্তাহাব :
বুরাইদা রা. বর্ণনা করেছেন: রসূলুল্লাহ সা. প্রত্যেক নামাযের সময় অযু করতেন। যখন মক্কা বিজয়ের দিন এলো, অযু করলেন। মোজার উপর মাসেহ করলেন এবং এক অযু দিয়ে কয়েক ওয়াক্ত নামায পড়লেন। উমর রা. তাকে বললেন: হে রসূলুল্লাহ, আপনি এখন যা করলেন, আগে তা করতেননা। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হে উমর, এটা আমি ইচ্ছাপূর্বকই করেছি। -আহমদ ও মুসলিম ইত্যাদি।
ইবনে আমর বিন আমের আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: আনাস ইবনে মালেক বলতেন: রসূলুল্লাহ সা. প্রত্যেক নামাযের সময় অযু করতেন। আমি বললাম: আপনারা কিভাবে নামায পড়তেন! তিনি বললেন: আমরা যতোক্ষণ নাপাক না হতাম, এক অযু দিয়ে বহু নামায পড়তাম। -আহমদ ও বুখারি।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমার উম্মতের যদি কষ্ট না হতো, তবে তাদেরকে প্রত্যেক নামাযে অযু করতে আদেশ দিতাম এবং প্রত্যেক অযুতে মেসওয়াক করতে আদেশ দিতাম।-আহমদ।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলতেন: যে পবিত্র থাকা সত্ত্বেও অযু করে, তার জন্য দশটি সওয়াব লেখা হয়।-আবু দাউদ, তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ।
📄 অযু সংক্রান্ত কতিপয় জরুরি জ্ঞাতব্য
১. অযুর মাঝে নির্দোষ কথাবার্তা বলা জায়েয। এটা নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ হাদিসে নেই।
২. অংগ প্রত্যংগ ধৌত করার সময় বিভিন্ন দোয়া পড়ার কোনো ভিত্তি নেই। ইতিপূর্বে অযুর সুন্নতসমূহের বিবরণে যেসব দোয়ার উন্মেষ করা হয়েছে, সেগুলো পড়াই যথেষ্ট।
৩. কয়বার ধৌত করা হলো, এ নিয়ে সন্দেহ হলে যেটি নিশ্চিত, সেটিই ধর্তব্য হবে- অর্থাৎ কম সংখ্যক বার।
৪. অযুর অংগ প্রত্যংগসমূহের যে কোনোটিতে মোম বা অনুরূপ কোনো আবরণ থাকলে অযু বাতিল হয়ে যাবে। তবে শুধু রং যেমন মেহেদী, কলপ ইত্যাদি থাকলে অযুর ক্ষতি হবেনা। কেননা এতে চামড়ায় পানি পৌঁছা ব্যাহত হয়না।
৫. মুস্তাহাযা (যার মাসিক দশদিনের চেয়ে বেশি ও তিনদিনের চেয়ে কম হয়), সর্বক্ষণ পেশাব টপকানো ও বায়ু নিঃসরণের রোগী বা অনুরূপ ওযরধারী ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের জন্য অযু করবে- যখন এই ওযর পুরো নামাযের সময়ব্যাপী অব্যাহত থাকে অথবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। ওযর থাকা সত্ত্বেও তাদের নামায শুদ্ধ গণ্য হবে।
৬. অযুতে অন্যের সাহায্য নেয়া জায়েয।
৭. অযুর পর রুমাল দিয়ে ভিজে অংগ মোছা শীত গ্রীষ্ম-উভয় ঋতুতে জায়েয।