📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অযুর সুন্নতসমূহ

📄 অযুর সুন্নতসমূহ


সুন্নত হলো যে সমস্ত কাজ, কথা ও রীতি রসূল সা. থেকে সঠিক বলে বিশ্বস্ত সূত্রে প্রমাণিত এবং যেগুলো বাধ্যতামূলকও নয় আর যে ব্যক্তি এগুলো বর্জন করে তার প্রতি কোনো অসন্তোষও প্রকাশ করা হয়নি। এসব সুন্নতের বিবরণ নিম্নরূপ:

১. শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা:
অযুর জন্য বিমসিল্লাহ বলার পক্ষে কিছু দুর্বল হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তবে সেগুলো একত্রিত হয়ে তাতে যথেষ্ট শক্তি বৃদ্ধি করে এবং প্রমাণ করে যে, এগুলোর একটা ভিত্তি আছে। তাছাড়া এটা মূলত একটা ভালো কাজ এবং সামগ্রিক বিবেচনায় এটা শরিয়ত সম্মত কাজ।

২. মেসওয়াক করা:
এ দ্বারা যে গাছের ডাল দিয়ে সচরাচর দাঁত পরিষ্কার করা হয়, তা ব্যবহারপূর্বক দাঁত পরিষ্কার করাও বুঝায়, আবার শুধু উক্ত গাছের ডাল বা অনুরূপ এমন যে কোনো শক্ত জিনিস দ্বারা দাঁত মাজাকেও বুঝায়, যা দ্বারা দাঁত পরিষ্কার করা হয়। সবচেয়ে ভালো মেসওয়াক হলো হেজায থেকে আমদানি করা, 'আরাক' গাছের ডাল। কেননা এটা দাঁতের গোঁড়া শক্ত করে, দাঁতের রোগ প্রতিরোধ করে, হযম শক্তি বাড়ায় ও পেশাবের বাধা দূর করে। অবশ্য ব্রাশ জাতীয় এমন যে কোনো জিনিস দ্বারাও সুন্নত আদায় হয়ে যায়, যা দাঁতের হলুদ রং দূর করে এবং মুখকে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন করে। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমার উম্মতের অত্যধিক কষ্ট হবে- এ আশংকা যদি আমি বোধ না করতাম, তাহলে তাদেরকে প্রত্যেক অযুতে মেসওয়াক করার আদেশ দিতাম। -মালেক, শাফেয়ী, বায়হাকি, হাকেম।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: মেসওয়াক করলে মুখ পবিত্র হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। -আহমদ, নাসায়ী, তিরমিযি।

বস্তুত মেসওয়াক করা সব সময়ই মুস্তাহাব। কিন্তু পাঁচটি সময়ে অধিকতর মুস্তাহাব:
১. অযুর সময়
২. নামাযের পূর্বে
৩. কুরআন তেলাওয়াতের পূর্বে
৪. ঘুম থেকে জেগে উঠে
৫. মুখের অবস্থার পরিবর্তন হলে।

কেউ রোযাদার হোক বা অ-রোযাদার হোক, দিনের প্রথম ভাগে বা শেষ ভাগে সমভাবে মেসওয়াক করতে পারে। কেননা আমের ইবনে রবীয়া রা. বলেছেন: "আমি রসূল সা. কে অগণিত বার রোযাদার অবস্থায় মেসওয়াক করতে দেখেছি।" -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি।
আর পরিচ্ছন্নতার খাতিরে প্রতিবার মেসওয়াক ব্যবহারের পর তা ধুয়ে ফেলা সুন্নত। কেননা আয়েশা রা. বলেছেন: "রসূল সা. মেসওয়াক করতেন। আর মেসওয়াক করার পর আমাকে মেসওয়াকটি দিতেন যেনো আমি তা ধুয়ে রাখি। অতপর আমি তা দিয়ে আবার মেসওয়াক করে আবার ধুয়ে রাখতাম এবং তা তাঁকে দিতাম।"-আবু দাউদ, বায়হাকি।

যার দাঁত নেই, তার জন্য শুধু আংগুল দিয়ে দাঁত মেজে ফেলা সুন্নত। কেননা আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, "তিনি বললেন: হে রসূলুল্লাহ, যার দাঁত পড়ে গেছে, সেও কি মেসওয়াক করবে? তিনি বললেন: হাঁ। আমি বললাম কিভাবে করবে? তিনি বললেন: নিজের আংগুল মুখে ঢুকিয়ে। -তাবারানি।

৩. অযুর শুরুতে তিনবার হাতের তালু ধোয়া:
আওস বিন আওস সাকাফী বলেছেন: আমি দেখেছি, রসূলুল্লাহ সা. অযু করলেন এবং তিনবার হাতের তালু ধুলেন। -আহমদ, নাসায়ী।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হয়, তখন তার হাত তিনবার না ধুয়ে যেনো পানির পাত্রে না ডুবায়, কারণ সে জানেনা তার হাত রাত্রে কোথায় ছিলো।" -সব কটি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত। তবে বুখারি হাত ধোয়ার সংখ্যা উল্লেখ করেনি।

৪. তিনবার কুলি করা:
লাকীত বিন সাবেরা রা. বলেন: "রসূল সা. বলেছেন, তুমি যখন অযু করবে, তখন কুলি করো।" -আবু দাউদ, বায়হাকি।

৫. নাকে পানি দেয়া ও নাক সাফ করা:
আবু হুরায়রা রা. এর বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন অযু করে, তখন সে যেনো তার নাকে পানি দেয়, অতপর নাক পরিষ্কার করে।"-বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ।

সুন্নত হলো, নাকে ডান হাত দিয়ে পানি দেবে এবং বাম হাত দিয়ে নাক পরিষ্কার করবে। আলী রা. এর হাদিসে রয়েছে: "তিনি (আলী) অযুর পানি আনতে বললেন, অতপর কুলি করলেন, তারপর নাকে পানি দিলেন ও বাম হাত দিয়ে নাক সাফ করলেন। এ রকম তিনবার করলেন। তারপর বললেন: এ হচ্ছে আল্লাহর নবী সা. এর পবিত্রতা অর্জনের পদ্ধতি। -আহমদ, নাসায়ী।
আর যখন কোনোভাবে নাক ও মুখ পর্যন্ত পানি পৌঁছে যাবে, তখন কুলি ও নাকে পানি দেয়ার কাজ আপনা থেকেই সম্পন্ন হয়ে উভয় সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে রসূল সা. থেকে বিশুদ্ধভাবে এটাই প্রমাণিত যে, তিনি এ কাজ দু'টি সংযুক্তভাবে (অর্থাৎ কুলির অব্যবহিত পর নাকে পানি দেয়া) সম্পন্ন করতো। যেমন আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত: "রসূল সা. তিন মুষ্টি পানি দিয়ে কুলি করতেন ও নাকে পানি দিতেন।" -বুখারি, মুসলিম।

যে রোযাদার নয়, তার জন্য সুন্নত হলো খুব ভালো করে কুলি করা ও নাকে পানি দেয়া। লাকীত রা. বর্ণিত হাদিসে আছে, তিনি বলেন, আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ, আমাকে অযুর নিয়ম শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন: ভালোভাবে অযু করো, আংগুলের মাঝে খিলাল করো (অর্থাৎ পানি পৌছাও) এবং খুব ভালোভাবে নাকে পানি দাও। তবে রোযাদার হলে তা করোনা।-পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত। তিরমিযি এটিকে সহীহ বলেছে।

৬. দাড়ি খিলাল করা:
উসমান রা. বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: রসূলুল্লাহ সা. দাড়ি খিলাল করতেন। -ইবনে মাজাহ, তিরমিযি।

আর আনাস রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. যখন অযু করতেন, তখন এক অঞ্জলি পানি নিয়ে তার তাঁর চোয়ালে ঢুকিয়ে দিতেন এবং তা দিয়ে খিলাল করতেন। আর বলতেন: আমার প্রতিপালক এভাবেই আমাকে আদেশ দিয়েছেন। -আবু দাউদ, বায়হাকি, হাকেম।

৭. আংগুলের মধ্যে খিলাল করা:
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যখন তুমি অযু করবে, তখন তোমার দু'হাত ও দু'পায়ের আংগুলের মাঝখানে খিলাল করবে। (আংগুল ঢুকিয়ে মর্দনপূর্বক ধুয়ে ফেলা) -আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ।

মুসতাওরিদ বিন শাদ্দাদ রা. থেকে বর্ণিত: আমি রসূল সা. কে তাঁর কনিষ্ঠ আংগুল দিয়ে দু'পায়ের আংগুলগুলোকে খিলাল করতে দেখেছি। -আহমদ ব্যতিত পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ বর্ণিত। কিছু কিছু হাদিস থেকে আংটি, চুড়ি, কঙ্কন ইত্যাদি নাড়ানো মুstাহাব বলে জানা যায়। তবে সে হাদিসগুলো সহীহ নয়। তথাপি উত্তমরূপে অযু করার আদেশের আওতায় পড়ে বিধায় সেই হাদিসগুলোর উপর আমল করা ভালো।

৮. তিনবার করে ধোয়া
এটা সেই সুন্নত, যা ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়ে আসছে। এর বিপরীত যেসব হাদিস আছে, তা শুধু বৈধতা প্রমাণ করার উদ্দেশ্যেই বর্ণিত হয়েছে। যেমন আমার বিন
শুয়াইবের দাদা বলেছেন: জনৈক বেদুঈন রসূল সা. এর কাছে এলো এবং অযুর নিয়ম জিজ্ঞাসা করলো। রসূল সা. তাকে তিনবার করে দেখালেন এবং বললেন: এ হচ্ছে অযু। যে ব্যক্তি এর চেয়ে বেশি করবে, সে অন্যায় করবে, বাড়াবাড়ি করবে ও যুলুম করবে। -আহমদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ।

আর উসমান রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. তিনবার তিনবার করে অযু সম্পন্ন করেছেন। -আহমদ, মুসলিম, তিরমিযি।

সহীহ হাদিস থেকে এও প্রমাণিত, তিনি একবার একবার করে ও দু'বার দু'বার করে অযু সম্পন্ন করেছেন। তবে মাথা মাসেহ একবারই করেছেন। এটাই অধিক বর্ণিত।

৯. ডান দিক থেকে শুরু করা:
অর্থাৎ দু'হাত ও দু'পা ধোয়ার সময় বাম হাত ও বাম পার আগে ডান হাত ও ডান পা ধোয়ার মাধ্যমে শুরু করা। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্রতা অর্জন ও সকল কাজ ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন। -বুখারি ও মুসলিম।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যখন তোমরা অযু করবে ও পোশাক পরবে, তখন ডান দিক থেকে শুরু করবে। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী।

১০. মর্দন:
কোনো অংগের উপর পানি দিয়ে বা পানি ব্যবহারের পর হাত চালানো। আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. এর নিকট এক মুদের এক তৃতীয়াংশ পানি আনা হলো। তিনি অযু করলেন, অতপর তার বাহু দুটি মর্দন করতে লাগলেন। -ইবনে খুযায়মা।

আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ থেকে অপর এক রেওয়ায়েত এরূপ: রসূল সা. অযু করলেন, তারপর বলতে লাগলেন: এভাবে মর্দন করতে হয়। -আবু দাউদ, তায়ালিসী, আহমদ, ইবনে হিব্বান, আবু ইয়ালা।

১১. বিরতিহীন প্রক্রিয়া:
অর্থাৎ একটা অংগ ধৌত করার পর বিরতিহীনভাবে অপর অংগ ধৌত করা, যেনো অযুকারী অযুর মাঝখানে অন্য এমন কোনো কাজ করে অযু বন্ধ করে না দেয়, যার দরুন সে অযু বর্জন করেছে বলে মনে করা হয়। অযু করার এরূপ বিরতিহীন প্রক্রিয়াই ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে চালু রয়েছে এবং মুসলমানগণ এই নিয়মই অনুসরণ করে আসছেন।

১২. দু'কান মাসেহ করা:
সুন্নত হলো তর্জনী আংগুল দিয়ে কানের ভেতরে ও বুড়ো আংগুল দিয়ে কানের বাইরে মাথা মাসেহ করার অবশিষ্ট পানি দিয়ে মাসেহ করা। কেননা কান মাথারই অংশ। মিকদাম ইবনে মাদীকারাব রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. অযুর সময় তাঁর মাথা ও উভয় কানের ভেতর ও বাহির মাসেহ করলেন এবং তার দু' আংগুলকে তার কানের গহ্বরে প্রবেশ করালেন। -আবু দাউদ ও তাহাবি।

ইবনে আব্বাস রা. রসূল সা. এর অযুর বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছেন: তিনি তার মাথা ও দু'কান এক সাথেই মাসেহ করলেন। -আহমদ ও আবু দাউদ।

অন্য রেওয়ায়েতে রয়েছে: তিনি তার মাথা ও কানের অভ্যন্তরে উভয় তর্জনী দিয়ে এবং উভয় কানের বাইরে বুড়ো আংগুল দিয়ে মাসেহ করলেন।

১৩. ললাটের ও হাত পায়ের শুভ্রতা দীর্ঘায়িত করা:
ললাটের শুভ্রতা দীর্ঘতর করার উপায় হলো মাথার সামনের এমন একটা অংশ ধৌত করা, যা মুখমণ্ডল ধৌত করার ফরয অংশের অতিরিক্ত। আর হাত-পায়ের শুভ্রতা দীর্ঘতর করার পন্থা হলো কনুই ও পায়ের গিরের উপর খানিকটা অংশ ধৌত করা। কেননা আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে আছে: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আমার উম্মত কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে, তাদের মুখমণ্ডল ও হাত পা অযুর আলামত হিসেবে উজ্জ্বল শুভ্র থাকবে।¹ আবু হুরায়রা বলেছেন: সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার শুভ্রতা দীর্ঘতর করতে পারে সে যেনো তা করে। -আহমদ, বুখারি ও মুসলিম। আবু যারআ' থেকে বর্ণিত: "আবু হুরায়রা অযুর পানি আনতে আদেশ দিলেন, অতপর অযু করলেন এবং হাত এমনভাবে ধুলেন যে, কনুই ছাড়িয়ে গেলো। তারপর যখন পা ধুলেন, তখন পায়ের গিরে ছাড়িয়ে থোড়া পর্যন্ত ধুলেন। আমি বললাম এটা কী? তিনি বললেন: এটা হচ্ছে শুভ্রতার শেষ সীমা। -আহমদ।

১৪. যথাসাধ্য কম পানি ব্যবহার করা উচিত- যদিও সমুদ্র থেকে কোষ ভরে পানি নেয়া হয়:
কারণ আনাস রা. বর্ণিত হাদিসে আছে: "রসূলুল্লাহ সা. এক 'সা'' থেকে পাঁচ 'মুদ' পর্যন্ত পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং এক 'মুদ' দিয়ে অযু করতেন।" -বুখারি ও মুসলিম। আর উবাইদুল্লাহ ইবনে আবি ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত: "এক ব্যক্তি ইবনে আব্বাস রা. কে বললো: কতোটুকু পানি আমার অযুর জন্য যথেষ্ট? তিনি বললেন: এক মুদ। সে বললো: গোসলের জন্য কতোটুকু পানি যথেষ্ট? তিনি বললেন: এক সা। লোকটি বললো: এটা আমার জন্য যথেষ্ট হবেনা। ইবনে আব্বাস বললেন: তোমার কোনো মা নেই! (মৃদু ভর্ৎসনামূলক প্রবাদ বাক্য) তোমার চেয়ে যিনি উত্তম সেই রসূল সা.-এর জন্যও এটা যথেষ্ট হয়েছিল।" -আহমদ, বাযযার, তাবারানি।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. সা'দের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সা'দ তখন অযু করছিলেন। তিনি বললেন: এই অপচয়ের কারণ কী হে সা'দ? সা'দ বললেন: পানিতেও অপচয় হয় নাকি? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হাঁ, প্রবহমান নদীতেও যদি অযু করো তাহলেও (অপচয় হতে পারে।) -আহমদ, ইবনে মাজাহ।

শরিয়ত সম্মত প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করলেই তা অপচয় গণ্য হবে, যেমন তিনবারের বেশি ধোয়া।

আমর বিন শুয়াইব বর্ণিত হাদিসে আছে: জনৈক বেদুঈন রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট এলো এবং তাঁকে অযুর নিয়ম জিজ্ঞাসা করলো। তিনি তাকে তিনবার করে ধোয়া দেখালেন। তারপর বললেন: এ হলো অযু। যে ব্যক্তি এরচেয়ে বেশি করবে সে অন্যায় করবে, বাড়াবাড়ি করবে ও যুলুম করবে। -আহমদ, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ, ইবনে খুযায়মা।

আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল রা. বলেন: আমি রসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি এই উম্মতে অচিরেই এমন কিছু লোক আবির্ভূত হবে, যারা পবিত্রতা ও দোয়ায় বাড়াবাড়ি করবে। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। ইমাম বুখারি বলেছেন: অযুর পানিতে রসূল সা. এর কাজ দ্বারা সাব্যস্ত পরিমাণ অতিক্রম করাকে আলেমগণ অপছন্দ করেছেন।

১৫. অযুর মাঝে দোয়া:
একমাত্র আবু মূসা আশআরী রা. বর্ণিত হাদিস ব্যতিত রসূল সা. থেকে অযুর আর কোনো দোয়া প্রমাণিত হয়নি। আবু মূসা রা. বলেন: রসূল সা. কে অযুর পানি এনে দিলাম। তিনি অযু করলেন। তখন শুনলাম, তিনি দোয়া করছেন:
"হে আল্লাহ, আমার গুনাহ মাফ করে দাও, আমার গৃহে প্রশস্ততা দাও এবং আমার জীবিকায় বরকত দাও।" আমি বললাম: হে আল্লাহর নবী! আমি আপনাকে এই শব্দাবলী দ্বারা দোয়া করতে শুনলাম। তিনি বললেন: এই শব্দাবলী কি কিছু বাদ রেখেছে? -নাসায়ী ও ইবনুস সুন্নি সহীহ সনদে। তবে নাসায়ী এ হাদিসের শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে: "অযুর শেষে যা বলতে হবে"। আর ইবনুস্ সুন্নির শিরোনাম হলো: "অযুর ভেতরে যা বলতে হয়।" নববী বলেছেন: উভয় শিরোনামই যথার্থ হতে পারে।

১৬. অযুর পরের দোয়া:
উমর রা. বলেছেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে কেউ উত্তমরূপে অযু করার পর বলবে: "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই, আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ সা. তার বান্দা ও রসূল।" তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে। তন্মধ্যে সে যেটি দিয়ে প্রবেশ করতে চায় করবে। -মুসলিম।

আবু সাঈদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি অযু করার পর বলবে:
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা।
"হে আল্লাহ, তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তোমার প্রশংসা করছি। সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই। তোমার কাছে ক্ষমা চাই ও তওবা করি।" তার এই দোয়া প্রথমে একটি সাদা কাগজের ফলকে লেখা হবে, তারপর একটি সিলমোহরে সংরক্ষিত করা করা হবে। তারপর আর কেয়ামত পর্যন্ত তা ভাংবেনা। -তাবারানি, নাসায়ী। নাসায়ীর রেওয়ায়েতের শেষে বলা হয়েছে: "তার উপর সিল মেরে আরশের নিচে রাখা হবে। অতপর কেয়ামত পর্যন্ত তা আর ভাংবেনা।"

তিরমিযিতে কিঞ্চিৎ দুর্বল সনদে এই দোয়াটিও বর্ণিত হয়েছে: “হে আল্লাহ, আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো।"

১৭. অযুর পরে দু'রাকাত নামায পড়া:
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বিলালকে বললেন: হে বিলাল, তুমি ইসলাম গ্রহণের পর সবচেয়ে বেশি আশাপ্রদ যে নেক কাজটি করেছো, তা আমাকে বলো। আমি জান্নাতে আমার সামনে তোমার জুতার আওয়াজ শুনেছি। তিনি বললেন: আমি দিনে বা রাতে যখনই পবিত্রতা অর্জনের কোনো কাজ করেছি, তখন সেই পবিত্রতা নিয়ে যতোটা আমার ভাগ্যে জুটেছে নামায পড়েছি। এরচেয়ে বেশি আশাপ্রদ কোনো নেক কাজ করিনি। -বুখারি, মুসলিম।

উকবা ইবনে আমের থেকে বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অযু করার পর একান্ত মনোযোগ সহকারে দু'রাকাত নামায পড়বে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। -মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও ইবনে খুযায়মা।

উসমান রা. এর স্বাধীনকৃত গোলাম খুমরান থেকে বর্ণিত: তিনি উসমান রা. কে দেখলেন অযুর পানি আনতে বললেন। তারপর পাত্র থেকে কিছু পানি নিজের ডান হাতে ঢেলে হাতটি তিনবার ধুলেন, তারপর তার ডান হাত অযুর পানিতে ঢুকালেন, তারপর তিনবার কুলি করলেন, নাকে পানি দিলেন, নাক সাফ করলেন ও মুখ ধুলেন। তারপর বললেন: আমি রসূল সা. কে আমার এই অযুর মতো অযু করতে দেখেছি। যে ব্যক্তি আমার এই অযুর মতো অযু করবে, তারপর দু'রাকাত নামায পড়বে, এই সময়ে নিজের মনে মনে কোনো কথা বলবেনা। তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। -বুখারি, মুসলিম ইত্যাদি।

এছাড়া চোখের পাতা ও মুখমণ্ডলের ভাজ মর্দন, আংটি নাড়ানো, ঘাড় মাসেহ করা, এসবের উল্লেখ করলামনা। কারণ এ সংক্রান্ত হাদিসগুলো সহীহর পর্যায়ভুক্ত নয়। তবে পরিচ্ছন্নতাকে পূর্ণতা দান করার উদ্দেশ্যে এ কাজগুলো করা হয়ে থাকে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অযুর মাকরূহসমূহ

📄 অযুর মাকরূহসমূহ


উপরোক্ত সুন্নতগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি ত্যাগ করা অযুকারীর জন্য মাকরূহ। এতে সে সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কেননা মাকরূহ কাজ করা সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর সুন্নত তরক করাই মাকরূহের সমার্থক।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 অযু ভংগের কারণসমূহ

📄 অযু ভংগের কারণসমূহ


যেসকল কারণে অযু নষ্ট হয় এবং যে কাজের উদ্দেশ্যে অযু করা হয়েছে সে কাজ করা অবৈধ হয়ে যায়, সেগুলো নিম্নরূপ:

১. পেশাব ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে যে কোনো জিনিস নির্গত হওয়া, যেমন:
ক. পেশাব, খ. মল।

আল্লাহ বলেন: “অথবা তোমাদের কেউ যদি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে আসে।” এ কথা দ্বারা পেশাব ও পায়খানা দুটোই বুঝানো হয়েছে।

গ. মলদ্বার থেকে নির্গত বায়ু।
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন নাপাক হয়, তখন অযু না করা পর্যন্ত তার নামায আল্লাহ কবুল করেননা।" হাজরামাউত থেকে আগত এক ব্যক্তি বললো: নাপাক হওয়ার অর্থ কী হে আবু হুরায়রা? তিনি বললেন: 'বায়ু নি:সরণ।' -বুখারি ও মুসলিম।

আবু হুরায়রা রা. থেকে আরো বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কেউ যখন পেটে কিছু অনুভব করে কিন্তু পেট থেকে কিছু বের হয়েছে কিনা বুঝতে পারেনা, তখন সে যেনো কিছুতেই মসজিদ থেকে বের না হয়, যতোক্ষণ না কোনো শব্দ শুনতে পায় অথবা দুর্গন্ধ টের পায়।-মুসলিম।

প্রকৃতপক্ষে শব্দ শোনা বা গন্ধ পাওয়া শর্ত নয়। এ দ্বারা পেট থেকে কিছু নির্গত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়াই বুঝানো হয়েছে।

ঘ. ঙ. চ. মনি (বীর্য), মযি ও ওদি নির্গমন:
রসূলুল্লাহ সা. মযি সম্পর্কে বলেছেন: "এতে অযু করা লাগবে।" আর মনি সম্পর্কে ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: মনি নির্গত হলে গোসল করতেই হবে। তবে মযি ও ওদি সম্পর্কে তিনি বলেছেন: তোমার গুপ্তাংগ ধুয়ে ফেলো এবং নামাযের জন্য অযু করো।-বায়হাকি।

২. এমন ঘুম যাতে চেতনা থাকেনা এবং যথাস্থানে বসেও থাকতে পারেনা। সাফওয়ান বিন আসমাল রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে সফরে থাকা অবস্থায় আদেশ দিতেন যেনো 'জানাবাত' (বৃহত্তর অপবিত্রতা) ব্যতিত মোজা না খুলি তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত। তবে পেশাব, পায়খানা ও ঘুমের কারণে খোলা যায়। -আহমদ, নাসায়ী ও তিরমিযি। তাই যখন কেউ বসে বসে ঘুমায় এবং যথাস্থানে বসে থাকতে সক্ষম হয়। তখন তার অযু নষ্ট হবেনা। আনাস রা.-এর এ হাদিসটি থেকেও একই কথা বুঝা যায়। তিনি বলেন: রসূল সা. এর সাহাবিগণ রাতের শেষ ভাগে এশার নামায পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তাদের মাথা
চুলে পড়তো, তারপর অযু না করেই নামায পড়তেন। -শাফেয়ী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি।

শু'বার সূত্রে বর্ণিত হাদিসে তিরমিযির ভাষা এরূপ: আমি রসূলের সাহাবিদেরকে দেখেছি, নামাযের জন্য তাদেরকে জাগানো হতো, এমনকি তাদের কারো কারো নাক ডাকানিও শুনতাম, তারপর তারা উঠে নামায পড়তেন, অযু করতেননা। ইবনুল মুবারক বলেছেন আমাদের মতে তারা তখন বসা অবস্থায় থাকতেন।

৩. সংজ্ঞা লোপ পাওয়া:
চাই এটা মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে ঘটুক, অজ্ঞান হওয়ার কারণে ঘটুক, মাতাল হওয়ার কারণে হোক, কিংবা কোনো ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় ঘটুক, চাই অল্প হোক বা বেশি হোক এবং চাই যথা স্থানে বসে থাকতে পারুক বা না পারুক। কেননা এসব কারণে যে সংজ্ঞাহীনতা ঘটে, তা ঘুমের চেয়ে অনেক বেশি। এর উপর আলেমগণ একমত।

৪. আবরণ ছাড়াই গুপ্তাংগ স্পর্শ করা:
বুস্রা বিনতে সাফওয়ান রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি তার গুপ্তাংগ স্পর্শ করেছে, সে যেন অযু না করা পর্যন্ত নামায না পড়ে। -পাঁচটি সহীহ্ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি এটিকে সহীহ বলেছেন। বুখারি বলেছেন, এটি এ বিষয়ে সবচেয়ে সহীহ হাদিস। মালেক, শাফেয়ী ও আহমদ প্রমুখও এটি বর্ণনা করেছেন। আবু দাউদ বলেছেন: আমি ইমাম আহমদকে বললাম: বুস্ট্রার হাদিসটি সহীহ নয়। তিনি বললেন: অবশ্যই ওটা সহীহ। আহমদ ও নাসায়ীতে বুস্রা থেকে বর্ণিত: তিনি রসূল সা. কে বলতে শুনেছেন: "যৌনাংগ স্পর্শ করলে অযু করতে হবে।" নিজের যৌনাংগ ও অপরের যৌনাংগ উভয়ই এর আওতাভুক্ত। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. বলেছেন : যে ব্যক্তি কোনো আবরণ ছাড়াই হাত দিয়ে যৌনাংগ স্পর্শ করলো, তার জন্য অযু করা ওয়াজিব। -আহমদ, ইবনে হিব্বান, হাকেম। হাকেম ও ইবনে আবদুল বার এটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনুস্ সাকান বলেছেন: এ অধ্যায়ে এটিই সবচেয়ে সহীহ হাদিস। ইমাম শাফেয়ীর হাদিসের ভাষা হলো: তোমাদের কেউ যখন এমন অবস্থায় যৌনাংগে হাত দেয় যে, হাত ও যৌনাংগের মাঝে কোনো আবরণ নেই, তখন তার অযু করা জরুরি। আমর বিন শুয়াইব তার পিতা থেকে ও তার দাদা থেকে বর্ণনা করেছেন: যে কোনো পুরুষ নিজের গুপ্তাংগ স্পর্শ করুক এবং যে কোনো নারী নিজের গুপ্তাংগ স্পর্শ করুক, উভয়কে অযু করতে হবে। -আহমদ। ইবনুল কাইয়িম বলেছেন: হাযেমীর মতে এটি সহীহ্ বর্ণনা। একটি বিশুদ্ধ হাদিসের ভিত্তিতে হানাফীদের মত হলো, গুপ্তাংগ স্পর্শ করলে অযু ভংগ হয়না। হাদিসটি হলো: এক ব্যক্তি রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করলো: "এক ব্যক্তি নিজের পুরুষাংগ স্পর্শ করলো। তার কি অযু করতে হবে? তিনি বললেন: না। ওটা তো তোমারই একটা অংশ।"-পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত। ইবনে হিব্বান এটিকে সহীহ বলেছেন। ইবনুল মদিনী বলেছেন: এটি বুস্রার হাদিসের চেয়ে উত্তম। *

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যে সমস্ত কারণে অযু ভংগ হয়না

📄 যে সমস্ত কারণে অযু ভংগ হয়না


সেই কারণগুলো উল্লেখ করা সমীচীন মনে হচ্ছে, যেগুলোকে অযু ভংগকারী বলে মনে করা হয়, অথচ সেগুলো অযু ভংগকারী নয়। কেননা সেগুলোর সপক্ষে কোনো নির্ভুল প্রমাণ নেই। সেগুলো নিম্নরূপ:

১. আবরণ ব্যতিত স্ত্রীকে স্পর্শ করা:
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. রোযাদার অবস্থায় তাকে চুমু খেয়েছেন এবং বলেছেন: চুমু খেলে অযুও ভংগ হয়না, রোযাও ভংগ হয়না। -ইসহাক বিন রাহওয়াই এটি বর্ণনা করেছেন। বাযযার এটি বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন। আবদুল হক বলেছেন: এ হাদিসের এমন কোনো ত্রুটি জানিনা যার জন্য তা বর্জন করতে হবে।

আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন: একদিন রাতে দেখলাম, রসূলুল্লাহ সা. বিছানায় নেই। আমি তাকে খুঁজতে লাগলাম। সহসা তার পায়ের মধ্যস্থলে আমার হাত পড়লো। তিনি তখন মসজিদে। তাঁর পা দুটো বিস্তৃত। তিনি বলছিলেন: “হে আল্লাহ আমি তোমার অসন্তোষ থেকে সন্তুষ্টির নিকট পানাহ চাই। তোমার আযাব থেকে তোমার ক্ষমার নিকট পানাহ চাই। তোমার থেকে তোমার নিকট আশ্রয় চাই। তোমার প্রশংসা গুণে শেষ করতে পারিনা। তুমি তেমনই, যেমন নিজের প্রশংসা করেছো।" -মুসলিম, তিরমিযি।

আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণিত: রসূলুল্লাহ সা. তাঁর জনৈক স্ত্রীকে চুমু খেলেন। তারপর মসজিদে গেলেন। অযু করলেননা। -আহমদ ও চারটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বিশুদ্ধ সনদ সহকারে বর্ণিত।

আয়েশা রা. থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেছেন: আমি রসূল সা. এর সামনে ঘুমিয়ে থাকতাম। তখন আমার পা দুটো তাঁর সামনে থাকতো (অর্থাৎ সাজদার জায়গায়) তাই যখন তিনি সাজদায় যেতেন, আমাকে হাত দিয়ে টিপতেন, আমি তৎক্ষণাত পা গুটিয়ে নিতাম। অন্য বর্ণনার ভাষা হলো: তিনি যখন সাজদা করতে চাইতেন, আমার পায়ে টিপ দিতেন। -বুখারি ও মুসলিম।

২. স্বাভাবিক নির্গমন স্থান ব্যতিত অন্য স্থান থেকে রক্ত নির্গমন, চাই জখমের কারণে হোক, কিংবা শিংগা লাগানোর কারণে হোক, কিংবা নাক দিয়ে রক্ত পড়ুক, আর চাই তা পরিমাণে কম হোক বা বেশি। হাসান রা. বলেছেন: মুসলমানরা নিজেদের ক্ষতস্থান নিয়েই নামায পড়তো। -বুখারি।

বুখারি আরো বলেছেন: ইবনে উমর তার ব্রণ বা ফুসকুড়িতে চাপ দিলেন, অমনি তা থেকে রক্ত বেরুলো। কিন্তু তিনি অযু করলেননা। ইবনে আবি আওফার থুথুর সাথে রক্ত বের হওয়া সত্ত্বেও তিনি নামায অব্যাহত রাখলেন। আর উমর রা. এর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল এ অবস্থায় তিনি নামায পড়েছেন। আব্বাদ বিন বিশর নামাযরত অবস্থায় তীরবিদ্ধ হলেন এবং তিনি নামায অব্যাহত রাখলেন। -আবু দাউদ, ইবনে খুযায়মা ও বুখারি।

৩. বমি: চাই মুখ ভর্তি বমি হোক বা কম হোক, এ দ্বারা অযু ভংগ হয়- এ মর্মে কোনো প্রামাণ্য হাদিস পাওয়া যায়নি।

৪. উটের গোশত খাওয়া: চার খলিফা ও বহু সংখ্যক সাহাবি ও তাবেয়ীর মতে উটের গোস্ত খেলে অযু ভংগ হয়না। তবে এ জন্য অযু করার আদেশ সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। জাবের বিন সামুরা রা. থেকে বর্ণিত: "এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলো, ভেড়া বা ছাগলের গোশত খেয়ে অযু করবো নাকি? তিনি বললেন: ইচ্ছা হলে করো, নচেত করোনা। সে বললো: উটের গোশত খেয়ে অযু করবো কি? তিনি বললেন: হাঁ। উটের গোশত খেয়ে অযু করো। সে বললো: ছাগল ভেড়ার থাকার জায়গায় নামায পড়তে পারবো কি? তিনি বললেন: হাঁ। সে বললো: উটের থাকার জায়গায় নামায পড়া যাবে কি? তিনি বললেন: না।" -আহমদ ও মুসলিম।

বারা ইবনে আযেব থেকে বর্ণিত: রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো: উটের গোশত খেয়ে কি অযু করতে হবে? তিনি বললেন: অযু করো। জিজ্ঞাসা করা হলো: ছাগল ভেড়ার গোশত খেয়ে? তিনি বললেন: অযু করো না। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো: উটের পালের থাকার জায়গায় কি নামায পড়া যাবে? তিনি বললেন: ওখানে নামায পড়োনা। ওটা শয়তানের জায়গা। ছাগল ভেড়ার থাকার জায়গায় নামায পড়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন: ওখানে নামায পড়ো। কারণ ওটা বরকতের জায়গা। -আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান। ইবনে খুযায়মা বলেছেন: এই হাদিসের বর্ণনাকারীর সততার কারণে এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে হাদিস বিশারদদের মধ্যে কোনো মতভেদ দেখিনি। ইমাম নববী বলেছেন: এই মত প্রমাণের দিক দিয়ে অপেক্ষাকৃত সবল- যদিও অধিকাংশ আলেম এ মতের বিপক্ষে।

৫. অযুকারীর অযু হওয়া নিয়ে সন্দেহ: যখন পবিত্র ব্যক্তির সন্দেহ হয় অযু ভংগ হয়েছে কিনা, তখন এই সন্দেহে কোনো ক্ষতি হবে না এবং অযু ভংগ হবেনা, চাই নামাযের ভেতরে থাকুক বা বাইরে। অযু ভংগ হয়েছে মর্মে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অযু ভংগ হবেনা। আব্বাদ বিন তামীম থেকে তার চাচার সূত্রে বর্ণিত: এক ব্যক্তি রসূল সা. কে জানালো যে, নামাযের মধ্যে তার ধারণা জন্মে তার একটা কিছু হয়েছে। (অর্থাৎ অযু ভংগকারী কিছু ঘটেছে।) তিনি বললেন: কোনো শব্দ না শোনা বা গন্ধ না পাওয়া পর্যন্ত নামায ছেড়ে যাবেনা। -তিরমিযি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যখন তোমাদের কেউ তার পেটে (অস্বাভাবিক) কিছু টের পায়। কিন্তু পেট থেকে কিছু বেরিয়েছে কিনা বুঝতে পারেনা, তখন সে যতোক্ষণ কোনো শব্দ না শুনবে কিংবা কোনো গন্ধ না পাবে, ততোক্ষণ যেনো মসজিদ থেকে বের না হয়।-মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি। এখানে নির্দিষ্টভাবে শব্দ শোনা ও গন্ধ পাওয়াই উদ্দেশ্য নয়, বরং নিশ্চিত হওয়া, পেট থেকে কিছু বের হয়েছে কিনা। ইবনুল মুবারক বলেছেন: নাপাক হওয়া সম্পর্কে কেবল সন্দেহ হলে অযু করার প্রয়োজন নেই, যতোক্ষণ না ততোটা নিশ্চিত হয় যে, কসম খেতে পারে। কিন্তু যখন নাপাক হওয়া নিশ্চিত হয় এবং পাক থাকা নিয়ে সন্দেহ হয়, তখন মুসলমানদের সর্বসম্মত মত অনুসারে তাকে অযু করতে হবে।

৬. নামাযে অট্ট হাসিতে অযু ভংগ হবেনা। কেননা এ সংক্রান্ত হাদিস সহীহ নয়।

৭. মৃত ব্যক্তিকে গোসল করালে অযু করা জরুরি নয়, কারণ অযু ভংগ হওয়ার প্রমাণ দুর্বল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00