📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 প্রকৃতিগত সুন্নতসমূহ

📄 প্রকৃতিগত সুন্নতসমূহ


আল্লাহ তায়ালা নবীদের আ. জন্য কিছু সুন্নত (চিরন্তন রীতি প্রথা) মনোনীতে করেছেন এবং আমাদেরকে সেগুলো অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। সেগুলোকে এমন কিছু রীতি প্রথারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা ঘন ঘন সংঘটিত হয়, যা দ্বারা তাদের অনুসারীদের চিহ্নিত করা যায় এবং যা দ্বারা অন্যদের থেকে তারা স্বতন্ত্র বলে পরিচিত হয়। এসব রীতি প্রথাকে "শাশ্বত ইসলামী রীতি প্রথা" বা "সুনানুল ফিতরাত-শাশ্বত রীতি" বলা যায়। এগুলোর বিবরণ নিম্নে দেয়া হলো:

১. খতনা করা: পুরুষাংগের অগ্রভাগ আবৃতকারী চামড়াকে কেটে ফেলার নাম খতনা। এর উদ্দেশ্য হলো, এর ভেতরে ময়লা জমা হতে না দেয়া, পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জনের সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সহবাসের আনন্দ পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করতে সমর্থ হওয়া। এ হলো পুরুষের খতনা। পক্ষান্তরে প্রাচীন প্রথা অনুসারে নারীর যৌনাংগের উপরের অংশ কেটে ফেলা হলো নারীর খতনা। তবে নারীর খতনা সম্পর্কে যতোগুলো হাদিস বর্ণিত হয়েছে তার সবই দুর্বল, একটিও সহীহ নয়।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: "দয়াময় আল্লাহর বন্ধু ইবরাহীম আ. আশি বছর বয়সে সিরিয়ার কাদুম নামক স্থানে অথবা কাদুম নামক অস্ত্র দ্বারা খতনা করেছেন।"-বুখারি।

অধিকাংশ আলেমের মতে এটি ওয়াজিব। শাফেয়ীগণ সাত দিন পর পর এটি মুস্তাহাব মনে করেন। শওকানি বলেন: এর জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট করা হয়নি এবং কোথাও একে ওয়াজিব বলা হয়নি।

২-৩. নাভির নিচের লোম কামানো ও বগলের লোম উপড়ে ফেলা: এ দুটো কাজও সুন্নত। কামানো, ছেটে ফেলা, উপড়ে ফেলা ও লোমনাশক পাউডার ব্যবহার- এসবের যে কোনো একটি পন্থা প্রয়োগ করা যথেষ্ট।

৪-৫. নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা বা কামানো: প্রত্যেকটির পক্ষে হাদিস রয়েছে। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, "রসূল সা. বলেছেন: তোমরা মুশরিকদের বিপরীত করো, দাড়ি বাড়াও এবং গোঁফ কামাও।"-বুখারি, মুসলিম।

আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসূল সা. বলেছেন: পাঁচটি বিষয় হলো চিরন্তন সুন্নত: নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, খতনা করা, গোঁফ ছাটা, বগলের লোম উপড়ানো ও নখ কাটা। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।

কাজেই গোঁফ ছাটা বা কামানো- যে কোনোটি করলেই চলবে। উদ্দেশ্য হলো, গোঁফ যেনো লম্বা না হয়, লম্বা হলে খাদ্য ও পানীয় তাতে লেগে যেতে পারে এবং তাতে ময়লা জমা হয়ে যেতে পারে। যায়েদ বিন আরকাম রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যে ব্যক্তি তার গোঁফ খাটো করেনা, সে আমার দলভুক্ত নয়। -আহমদ, নাসায়ী, তিরমিযি এটিকে সহীহ বলেছেন।

সর্বোচ্চ মানের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা এবং মনের স্বস্তি অর্জনের লক্ষ্যে প্রতি সপ্তাহেই নাভির নিচের লোম সাফ করা, বগলের লোম উঠানো, নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা বা কামানো উত্তম। কেননা শরীরে কিছু লোম অবশিষ্ট থাকলেই এক ধরনের অস্বস্তি ও কষ্ট অনুভূত হয়। চল্লিশ দিন পর্যন্ত এগুলো সাফ না করারও অনুমতি দেয়া হয়েছে। চল্লিশ দনি পর সাফ না করার পক্ষে কোনো ওযর দেয়া যাবেনা। আনাস রা. বলেছেন: রসূল সা. আমাদেরকে নির্দিষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, গোঁফ ছাটা, নখ কাটা, বগলের লোম পরিষ্কার করা ও নাভির নিচের লোম কামানোর কাজ যেনো চল্লিশ দিনের চেয়ে বেশি ফেলে না রাখি। -আহমদ, আবু দাউদ প্রমুখ।

৬. দাড়িকে ছেড়ে দেয়া, যাতে তা বাড়ে এবং ব্যক্তিত্বের প্রতীকে পরিণত হয়। কাজেই এমনভাবে ছাঁটা যাবেনা, যা কামানোর কাছাকাছি মনে হয় এবং এতটা ছেড়েও দেয়া যাবেনা, বালখিল্যতায় পরিণত হয়। বরং মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাই শ্রেয়। বস্তুত: সব কিছুতেই মধ্যম পন্থা সর্বোত্তম। মনে রাখতে হবে, দাড়ি পৌরুষ ও বীরত্বের পূর্ণতার প্রতীক। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রসূল সা. বলেছেন: তোমরা মুশরিকদের বিপরীত আচরণ করো, দাড়ি বাড়াও গোঁফ কামাও। -বুখারি ও মুসলিম।

বুখারি সংযোজন করেছেন: "ইবনে উমর যখন হজ্জ বা ওমরায় যেতেন, তাঁর দাড়িকে মুষ্টিবদ্ধ করে ধরতেন, এক মুঠের চেয়ে বেশি যা হতো, ছেঁটে ফেলতেন।"

৭. চুল যখন রাখা হয় ও বাড়ে, তখন তার যত্ন নেয়া: কেননা আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে রসূল সা. বলেছেন: যার চুল আছে, সে যেনো যত্ন করে।-আবু দাউদ।

আতা ইবনে আবি ইয়াসার বলেন: "এক ব্যক্তি এমন অবস্থায় রসূল সা. এর কাছে এলো যে, তার চুল ও দাড়ি এলোমেলো, তেলবিহীন উস্কো খুস্কো। রসূল সা. তার দিকে এমনভাবে ইংগিত করলেন যেনো তাকে তার চুল ও দাড়ি ঠিক করতে আদেশ দিচ্ছেন। সে চুল দাড়ি ঠিক করে ফিরে এলো। রসূল সা. বললেন: শয়তানের মতো উস্কো খুস্কো চুল নিয়ে আসার চেয়ে এটা কি ভালো হয়নি?" -মালেক।

আবি কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত: আবু কাতাদার বড় বাবরী চুল ছিলো। তিনি সে সম্পর্কে রসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তাকে চুলের যত্ন নিতে ও প্রতিদিন আঁচড়াতে আদেশ দিলেন। -নাসায়ী।

ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তায় হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন: হে রসূলুল্লাহ, আমার তো ঘাড় পর্যন্ত বারবী চুল। আমি কি তা আঁচড়াবো। রসূল সা. বললেন, হাঁ, বরং তার আরো যত্ন নেবে। তারপর আবু কাতাদা প্রায় প্রতিদিন দু'বার চুলে তেল মাখতেন শুধু রসূল সা. কর্তৃক চুলের যত্ন করার আদেশ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে। আর মাথার চুল কামানো জায়েয। যে ব্যক্তি চুলের যত্ন করতে পারবে, তার জন্য তা লম্বা করাও জায়েয। কেননা ইবনে উমর রা. বলেছেন, রসূল সা. বলেছেন : হয় পুরো চুল রাখো, নতুবা পুরো চুল কামাও।" -আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী।

মাথার কিছু অংশ কামিয়ে কিছু অংশ রাখা মাকরূহ তানযিহী। নাফে ইবনে উমর রা. থেকে বলেন: রসূল সা. কাযা' করতে নিষেধ করেছেন। নাফে'কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কাযা কী? তিনি বললেন: শিশুদের মাথার কিছু অংশ কামিয়ে কিছু অংশ রেখে দেয়া। -বুখারি ও মুসলিম। এ ছাড়া ইবনে উমর রা. এর উপরোক্ত হাদিসটিও বিবেচ্য।

৮. পেকে যাওয়া চুল মাথার হোক বা দাড়িতে হোক রেখে দেয়া। এ ব্যাপারে নারী ও পুরুষ সমান। কেননা আমর ইবনে শুয়াইব বর্ণিত হাদিসে রসূল সা. বলেছেন: পাকা চুল তোলা উচিত নয়। কেননা ওটা মুসলমানের নূর। কোনো মুসলমানের মুসলমান থাকা অবস্থায় চুল পাকলে প্রতিটি পাকা চুলের জন্য একটা সওয়াব, একটা মর্যাদা বৃদ্ধি ও একটি গুনাহ মোচন করা হবে। -আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমরা মাথা ও দাড়ি থেকে সাদা চুল তোলা অপছন্দ করতাম। -মুসলিম।

৯. পাকা চুলে মেহেদী, লাল, হলুদ ইত্যাদি রং লাগানো। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসূল সা. বলেছেন: ইহুদী ও খৃষ্টানরা চুলে রং দেয়না। তোমরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করো। সব কটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ। আর আবু যর রা. বলেন, রসূল সা. বলেছেন: তোমাদের যৌবনে পরিবর্তিত হবার অর্থাৎ পাকা চুলকে বদলানোর সর্বোত্তম রং হলো মেহেদী ও কাতাম (কাতাম এক ধরনের তৃণ, যা রংকে লালচে কাল করে)। -পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

চুলে দাড়িতে খেযাব লাগানো মাকরূহ- এই মর্মেও হাদিস রয়েছে। মনে হয়, বয়স ও রীতি প্রথা ভেদে এটা বিভিন্ন হয়। কোনো কোনো সাহাবি বলেছেন, খেযাব (রং দেয়া) বর্জন করা উত্তম। কেউ কেউ বলেছেন, খেযাব করা উত্তম। তাদের কেউ কেউ হলুদ খেযাব করতেন, কেউবা মেহেন্দী ও কাতাম-খেযাব লাগাতেন, কেউ বা জাফরান দিতেন। একদল কালো খেযাবও লাগাতেন। জাহেয বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে শিহাব যুহরী বলেছেন : মুখমণ্ডল যখন তরতাজা থাকতো তখন আমরা কালো খেযাব নিতাম। কিন্তু যখন চেহারা ও দাঁতের চমক অবশিষ্ট থাকতোনা তখন আমরা তা বর্জন করতাম। তবে জাবির রা. বর্ণিত হাদিসে রয়েছে: আবু বকর রা. এর পিতা আবু কুহাফাকে যখন মক্কা বিজয়ের দিন, রসূল সা.-এর নিকট আনা হলো, তখন তাঁর মাথার চুলে 'ছাগামা'র (সাদা) খেযাব ছিলো। রসূল সা. বললেন, ওকে তার কোনো স্ত্রীর নিকট নিয়ে যাও, সে যেনো তার চুলকে অন্য একটি রং দিয়ে পাল্টে দেয় এবং তারা তাকে কালো খেযাব লাগিযে দেয়। -বুখারি ও তিরমিযি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

এ হাদিস একটি নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সংশিষ্ট, যা সাধারণভাবে সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়না। তাছাড়া আবু কুহাফার ন্যায় এক ব্যক্তি, যার চুল সাদা হয়ে গেছে বার্ধক্যবশত তার চুল কালো রং এ রঞ্জিত করা শোভন নয়। কাজেই এটা বৃদ্ধ বয়েসের ব্যক্তির সাথে খাপ খায়না।

১০. মনকে আনন্দিত ও প্রফুল্ল করে এমন সুগন্ধি মাখানো। কেননা আনাস রা. বলেন, রসূল সা. বলেছেন: حيب إِلَى مِنَ الدُّنْيَا النِّسَاء وَالطَّيِّبُ وَجُعِلَتْ قُرَّةً عَيْنِي فِي الصَّلاةِ.
"পৃথিবীতে আমার নিকট প্রিয় বানোনো হয়েছে নারী ও সুগন্ধিকে, আর নামাযকে বানানো হয়েছে আমার চক্ষু শীতলকারী।" -আহমদ ও নাসায়ী।

আর আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূল সা. বলেছেন: যাকে কোনো সুগন্ধি দেয়া হয়, সে যেনো তা প্রত্যাখ্যান না করে। কেননা তা বহনে হাল্কা, গন্ধে উত্তম। -মুসলিম, নাসায়ী ও আবু দাউদ।

আবু সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত: রসূল সা. বলেছেন: মেশক হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সুগন্ধি। বুখারি ও ইবনে মাজাহ ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।

আর নাফে' থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ইবনে উমর ধূপ দেয়ার কাঠ 'উলুয়া' অন্য কিছুর সাথে মিশ্রিত না করেই ব্যবহার করতেন ও নিজেকে সুরভিত করতেন। মুসলিম ও নাসায়ী।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ্

📄 পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ্


১. পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহের বৈধতা
পট্টি বা ব্যাণ্ডেজ বা অনুরূপ যে সকল জিনিস অসুস্থ অংগের উপর বাঁধা হয় তার উপর মাসেহ করা বৈধ। এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস রয়েছে। এ সকল হাদিস দুর্বল হলেও এগুলোর একটি অপরটিকে জোরদার ও সবল করে এবং এগুলোকে বৈধতা প্রমাণের যোগ্য বানায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাবির রা. এর বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন:
"জনৈক ব্যক্তি পাথরের আঘাতে আহত হলো। তার মাথা ফেটে গেলো। তারপর তার স্বপ্নদোষ হলো। সে তার সাথিদের জিজ্ঞাসা করলো : তোমরা কি মনে করো আমার তাইয়াম্মুম করার অনুমতি আছে? তারা বললো : আমরা তোমার জন্য তাইয়াম্মুমের অনুমতির অবকাশ দেখিনা। তুমি তো পানি ব্যবহারে সক্ষম। এরপর লোকটি গোসল করলো এবং পরক্ষণেই মারা গেলো। পরে যখন আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট পৌঁছলাম এবং তাঁকে উক্ত ঘটনা জানানো হলো, তখন তিনি বললেন: ওরা তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ ওদের হত্যা করুন! তারা যখন জানেনা তখন কেন জিজ্ঞাসা করলোনা? অজ্ঞতার প্রতিকার তো জিজ্ঞাসা দ্বারাই করা যায়। তার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিলো যে, তাইয়াম্মুম করে নিতো, ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতো অথবা ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে তার উপর মাসেহ করতো। তার পর অবশিষ্ট শরীর ধুয়ে ফেলতো। -আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দার কুতনি। ইবনে উমর থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত। তিনি পট্টি ও ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করেছেন।
২. মাসেহর বিধি
পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করার বিধি হলো অযু ও গোসলে রুগ্ন অংগ ধোয়া বা মাসেহ করার পরিবর্তে পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করা ওয়াজিব।
৩. মাসেহ করা কখন ওয়াজিব-
যার শরীরের কোনো অংগে ক্ষত বা ভাংগা বিদ্যমান এবং সে অযু বা গোসল করতে ইচ্ছুক, তার উপর তার অংগগুলো ধোয়া ওয়াজিব। সেজন্য পানি গরম করার প্রয়োজন হলে গরম করে নিতে হবে। কিন্তু অসুস্থ অংগটি ধোয়ায় যদি ক্ষতির আশংকা থাকে, যেমন- ধুলে কোনো রোগ দেখা দিতে পারে, অথবা বিদ্যমান ব্যথা বেড়ে যেতে পারে অথবা বিদ্যমান রোগের নিরাময় বিলম্বিত হতে পারে, তাহলে এই ধৌতকরণের ফরযটি রুগ্ন অংগের জন্যে মাসেহ্ রূপান্তরিত হবে। মাসেহ করাতেও যদি ক্ষতির ভয় থাকে, তাহলে তার ক্ষতের উপর একটি পট্টি বা ভাংগার উপর ব্যাণ্ডেজ বাঁধা ওয়াজিব। এই পট্টি বা ব্যাণ্ডেজ এমনভাবে বাঁধতে হবে, তা যেনো বাঁধার প্রয়োজন ব্যতিত অসুস্থ অংগের সীমা অতিক্রম না করে। তারপর সমগ্র পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর এমনভাবে মাসেহ করবে যেনো, একটু জায়গাও বাদ না যায়। এই পট্টি বা ব্যান্ডেজ বাঁধার আগে শরীর পবিত্র থাকতে হবে এমন কোনো শর্ত নেই এবং এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও নেই। যতক্ষণ ওযর থাকবে ততোক্ষণ অব্যাহতভাবে অযু ও গোসলে পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করতে হবে।
৪. যেসব কারণে মাসেহ্ বাতিল হয়
পট্টি বা ব্যাণ্ডেজ সংশ্লিষ্ট স্থানের রোগ সেরে যাওয়ার কারণে খুলে ফেলা বা আপনা থেকে পড়ে যাওয়া অথবা ব্যাণ্ডেজ খুলে ফেলা না হলেও শুধু রোগ সেরে যাওয়ার কারণে মাসেহ বাতিল হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহর বৈধতা

📄 পট্টি বা ব্যান্ডেজের উপর মাসেহর বৈধতা


পট্টি বা ব্যাণ্ডেজ বা অনুরূপ যে সকল জিনিস অসুস্থ অংগের উপর বাঁধা হয় তার উপর মাসেহ করা বৈধ। এ ব্যাপারে একাধিক হাদিস রয়েছে। এ সকল হাদিস দুর্বল হলেও এগুলোর একটি অপরটিকে জোরদার ও সবল করে এবং এগুলোকে বৈধতা প্রমাণের যোগ্য বানায়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাবির রা. এর বর্ণিত হাদিস। তিনি বলেন:
"জনৈক ব্যক্তি পাথরের আঘাতে আহত হলো। তার মাথা ফেটে গেলো। তারপর তার স্বপ্নদোষ হলো। সে তার সাথিদের জিজ্ঞাসা করলো : তোমরা কি মনে করো আমার তাইয়াম্মুম করার অনুমতি আছে? তারা বললো : আমরা তোমার জন্য তাইয়াম্মুমের অনুমতির অবকাশ দেখিনা। তুমি তো পানি ব্যবহারে সক্ষম। এরপর লোকটি গোসল করলো এবং পরক্ষণেই মারা গেলো। পরে যখন আমরা রসূলুল্লাহ সা. এর নিকট পৌঁছলাম এবং তাঁকে উক্ত ঘটনা জানানো হলো, তখন তিনি বললেন: ওরা তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ ওদের হত্যা করুন! তারা যখন জানেনা তখন কেন জিজ্ঞাসা করলোনা? অজ্ঞতার প্রতিকার তো জিজ্ঞাসা দ্বারাই করা যায়। তার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিলো যে, তাইয়াম্মুম করে নিতো, ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে ফেলতো অথবা ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে তার উপর মাসেহ করতো। তার পর অবশিষ্ট শরীর ধুয়ে ফেলতো। -আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দার কুতনি। ইবনে উমর থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত। তিনি পট্টি ও ব্যান্ডেজের উপর মাসেহ করেছেন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের জন্য যা যা নিষিদ্ধ

📄 ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের জন্য যা যা নিষিদ্ধ


জুনুবির (বীর্যপাতজনিত অপবিত্র ব্যক্তি উপর ইতিপূর্বে যা যা হারাম বলে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত মহিলার উপরও সেসব কাজ হারাম। তাছাড়া এই তিনজনকেই 'বড় অপবিত্রতায় লিপ্ত' আখ্যায়িত করা হয়। ঋtuvati ও নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য ইতিপূর্বে যা যা নিষিদ্ধ বলা হয়েছে, তা ছাড়া নিম্নোক্ত কাজগুলোও নিষিদ্ধ:
১. রোযা ঋতুবতী ও নিফাসগ্রস্ত নারীর জন্য রোযা রাখা বৈধ নয়। যদি রোযা রাখে তবে তা বাতিল বলে গণ হবে। ঋতু ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের জন্য রমযানে যেসব রোযা বাদ যাবে, তা রমযানের পর কাযা করতে হবে। কিন্তু নামায কাযা করতে হবেনা। মহিলাদের উপর থেকে মাত্রাতিরিক্ত কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। কেননা নামায ঘন ঘন পড়তে হয়। রোযা অতোটা ঘন ঘন করতে হয়না। আবু সাঈদ খুদরীর হাদিস থেকে এ তথ্যটি জানা যায়:
আবু সাঈদ খুদরীর রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার জন্য ঈদগাহে যাওয়ার সময় কিছু সংখ্যক মহিলার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন বললেন: হে মহিলাগণ, তোমরা সদকা করো। কেননা আমি তোমাদের অধিকাংশকে দোযখবাসী দেখেছি। তারা বললো: হে রসূলুল্লাহ সা. এর কারণ কী? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: তোমরা অত্যধিক অভিশাপ দিয়ে থাকো এবং আত্মীয়-স্বজনকে অবজ্ঞা করে থাকো। বুদ্ধিমত্তায় ও ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণ হয়েও তোমরা যেভাবে অত্যন্ত দৃঢ়চেতা পুরুষের মনও কেড়ে নিতে পারো, তেমন আমি আর কাউকে দেখিনি। মহিলারা বললো: আমাদের বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণতা কোথায়? তিনি বললেন: একজন মহিলার সাক্ষ্য কি একজন পুরুষের সাক্ষ্যের অর্ধেকের সমান নয়? তারা বললো: জ্বী। তিনি বললেন: এটাই বুদ্ধির অসম্পূর্ণতা। নারী যখন ঋতুবতী হয়; তখন সে কি নামায রোযা বর্জন করেনা? তারা বললো: জ্বী। রসূল সা. বললেন: এটাই তাদের ধর্মীয় তৎপরতায় অসম্পূর্ণতা। -বুখারি ও মুসলিম।
মুয়াযা রা. বলেছেন: আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম, ঋতুবতীকে রোযা কাযা করতে হয়, অথচ নামায কাযা করতে হয়না- এর কারণ কী? আয়েশা রা. বললেন: রসূল সা. এর আমলে আমরা যখন ঋতুবতী হতাম তখন আমাদেরকে রোযা কাযা করার আদেশ দেয়া হতো, নামায কাযা করার আদেশ দেয়া হতোনা। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
২. হায়েয-নিফাস অবস্থায় সহবাস কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নির্দেশনা বলে মুসলামনদের সর্বসম্মতিক্রমে এটি হারাম। তাই ঋতুবতীর ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাবতা মহিলার সাথে সহবাস হালাল নয়- যতোক্ষণ না সে পবিত্র হয়। আনাস রা. এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ইহুদীরা তাদের স্ত্রী ঋতুবতী হলে তার সাথে খানাপিনাও করতোনা, সহবাসও করতোনা। সাহাবিগণ রসূল সা.কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে আল্লাহ সূরা বাকারার ২২২ নং আয়াতটি নাযিল করলেন: "তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বলো, ওটা বিব্রতকর অবস্থা। কাজেই ঋতুকালে নারীকে তোমরা এড়িয়ে চলো। যতোক্ষণ না তারা পবিত্র হয়, ততোক্ষণ তাদের কাছে যেওনা। যখন পবিত্র হয়, তখন আল্লাহ যেভাবে আদেশ করেন, সেভাবে তাদের কাছে এসো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদেরকে ভালোবাসেন এবং পবিত্রদেরকে ভালোবাসেন। রসূলুল্লাহ সা. অতপর বললেন: সহবাস ছাড়া সব কিছুই করতে পারো। -বুখারি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ।
ইমাম নববী বলেছেন: কোনো মুসলমান যদি বিশ্বাস করে, ঋতুবতী মহিলার সাথে তার যৌনাংগে সহবাস করা বৈধ, তাহলে সে কাফির ও ইসলামতা্যগী হয়ে যাবে। আর যদি বৈধ বলে বিশ্বাস না করেও ভুলক্রমে, কিংবা হারাম হওয়ার কথা না জেনে, কিংবা ঋতুবতী হওয়ার কথা না জেনে সহবাস করে, তাহলে গুনাহ হবেনা। কাফফারাও দিতে হবেনা। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে, ঋতুবতী জানা সত্ত্বেও এবং হারাম বলে জানা সত্ত্বেও স্বেচ্ছায় সহবাস করে, তবে সে কবীরা গুনাহকারী গণ্য হবে এবং তার উপর তওবা করা ওয়াজিব হবে। কাফফারা ওয়াজিব হবে কিনা সে ব্যাপারে দুটো মত রয়েছে। কাফফারা ওয়াজিব হবেনা- এই মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ। তিনি আরো বলেছেন, দ্বিতীয় প্রকার হলো: নাভির উপরে ও হাটুর নিচে সহবাস করবে। এটা সর্বসম্মতভাবে বৈধ। তৃতীয় প্রকার হলো নাভি ও হাঁটুর মাঝখানে যৌনাংগ ও মলদ্বার ব্যতিত আর সেখানে ইচ্ছা সহবাস করবে। তবে অধিকাংশ আলেম এটি হারাম মনে করেন। তবে নববীর মতে মাকরূহ কিন্তু হালাল। কেননা প্রমাণের দিক দিয়ে এটাই অধিকর জোরদার।
এর যে প্রমাণ তিনি উল্লেখ করেছেন, তা হলো রসূল সা. এর স্ত্রীদের বর্ণনা: রসূল সা. যখন কোনো ঋতুবতী স্ত্রীর নিকট কিছু কামনা করতেন, তখন প্রথমে তার যৌনাংগের উপর কোনো জিনিস রেখে নিতেন। -আবু দাউদ। আর মাসরূক বিন আজদা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আয়েশাকে জিজ্ঞাসা করলাম: স্ত্রী যখন ঋতুবতী হয়, তখন স্বামী তার কাছ থেকে কতটুকু আশা করতে পারে? তিনি বললেন: যৌনাংগ ছাড়া সব কিছু। -বুখারি রচিত ইতিহাস গ্রন্থ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00