📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নাপাকির প্রকারভেদ

📄 নাপাকির প্রকারভেদ


১. মৃত প্রাণী : মৃত প্রাণী হলো সেগুলো, যেগুলো: স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে, অর্থাৎ যবাই ব্যতিত।⁸ যে প্রাণীকে জীবিতাবস্থায় কেটে ফেলা হয় তাও এই শ্রেণীভুক্ত। আবু ওয়াকেদ লাইছী বলেছেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: "জীবিতাবস্থায় যে চতুষ্পদ জন্তুকে কেটে ফেলা হয় তা মৃত প্রাণী।" (আবু দাউদ ও তিরমিযি) তিরমিযি এটাকে ভালো হাদিস আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন: আলেমগণ এ হাদিস অনুসরণ করে থাকেন।

মৃত প্রাণীর আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও নিম্নোক্তগুলো নাপাক নয়:
ক. মাছ ও পংগপালের মৃতদেহ: এগুলো পাক। ইবনে উমর রা. বলেন, "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: দুটো মৃত দেহ ও দুটো রক্ত আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। মৃত দেহ দুটো হলো মাছ ও পংগপালের। আর রক্ত দুটো হলো যকৃত ও প্লিহা।” (আহমদ, শাফেয়ী, ইবনে মাজাহ, বায়হাকি ও দারু কুতনি কর্তৃক বর্ণিত।) হাদিসটি দুর্বল, তবে ইমাম আহমদের মতে এটি মওকুফ কিন্তু সহীহ। (যে হাদিসের সনদ সাহাবি পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। রসূল সা. পর্যন্ত পৌছেনি তাকে মওকুফ বলে)। আবু যারআ' ও আবু হাতেমও এটাকে মওকুফ ও সহীহ বলেছেন। এ ধরনের হাদিস মারফুর (যার সনদ রসূল সা. পর্যন্ত পৌঁছেছে) পর্যায়ভুক্ত। কোনো কোনো সাহাবি যখন বলেন "এটা আমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে ও এটা আমাদের উপর হারাম করা হয়েছে" তখন তা অবিকল "আমাদেরকে অমুক কাজ করতে আদেশ ও অমুক কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে" বলার সমপর্যায়ের।

ইতিপূর্বে রসূল সা. এর উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে সমুদ্র সম্পর্কে: "সমুদ্র পবিত্রকারী, তার পানি পবিত্র, তার ভেতরের মৃত প্রাণী হালাল।"

খ. প্রবহমান রক্তের অধিকারী নয় এমন প্রাণীর মৃত দেহ। যেমন পিঁপড়ে ও মৌমাছি ইত্যদি। এগুলো পাক। এগুলো কোনো জিনিসের ভেতর পড়লে ও মারা গেলে সেই জিনিস নাপাক হয়না। ইবনুল মুনযির বলেছেন: এসব মৃত দেহ যে জিনিসে পড়ে তার পাক হওয়ার ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ী ব্যতিত কেউ দ্বিমত প্রকাশ করেছে বলে আমার জানা নেই। তাঁর মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ মত হলো এটা নাপাক তবে কোনো তরল জিনিসে পড়লে যতোক্ষণ তা ঐ তরল জিনিসকে পরিবর্তিত না করবে ততোক্ষণ তা পাক থাকবে।

গ. প্রাণীর মৃত দেহের হাড়, শিং, নখ, চুল, পালক, চামড়া এবং এই জাতীয় সব কিছুই পাক। এসব জিনিসের মূল অবস্থা হলো পবিত্রতা। নাপাক হওয়ার জন্য কোনো প্রমাণ নেই। হাতি প্রভৃতি জন্তুর মৃত দেহের হাড়গোড় সম্পর্কে বলেছেন: প্রাচীন আলেমদের অনেককে দেখেছি এর চিরুণী দ্বারা চুল আঁচড়াতে ও এর তেল ব্যবহার করতে। তারা এতে কোনো আপত্তির কিছু দেখেননি। বুখারি কর্তৃক বর্ণিত।

ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, "তিনি বলেছেন: মাইমুনার এক মুক্ত বাদীকে একটা ছাগল ছদকা করা হয়েছিল। পরে সেই ছাগল মারা গেলো। রসূল সা. তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন: তোমরা ছাগলটির চামড়া নিয়ে পাকিয়ে কাজে লাগালেনা কেনো? তারা বললো: ওটা তো মৃত ছিলো। রসূল সা. বললেন: মৃত জন্তু তো শুধু খাওয়া হারাম।” (ইবনে মাজাহ ব্যতিত সব ক'টি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত)

ইবনে মাজাহ এ হাদিস মাইমুনা থেকে বর্ণনা করেছেন। বুখারি ও নাসায়ীতে চামড়া পাকানোর উল্লেখ নেই। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত তিনি সূরা আল আনয়ামের ১৪৫নং আয়াত পাঠ করলেন এবং বললেন: এর যে জিনিস খাওয়া হয় সেটাই অর্থাৎ গোশত হারাম করা হয়েছে। চামড়া, চামড়া থেকে নির্গত বস্তু, দাঁত, হাত, চুল, পশাম এসবই হালাল (ইবনুল মুনযির ও ইবনে আবি হাতেম কর্তৃক বর্ণিত) (সূরা ৬, আয়াত ১৪৩)

দুধ, মৃত ছাগল ছানার পেট থেকে বের হওয়া জমাট দুধ পবিত্র। সাহাবীগণ যখন ইরাক জয় করলেন তখন সেখানকার অগ্নি উপাসকদের তৈরি পনির খেয়েছিলেন। যা মৃত ছাগল শিশুর পেটের জমাট দুধ দিয়ে তৈরি হতো। অথবা তাদের যবাই করা জন্তুকে মৃতদেহ বিবেচনা করা হতো। সালমান ফারসী রা. থেকে বর্ণিত: তাকে পনির, ঘি ও পশুর লোমের তৈরি পোশাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: আল্লাহ তাঁর কিতাবে যা হালাল করেছেন তা হালাল আর যা তার কিতাবে হারাম করেছেন তা হারাম। আর যেসব জিনিস সম্পর্কে মৌনতা অবলম্বন করেছেন সেসব ক্ষেত্রে তিনি অব্যাহতি দিয়েছেন। সালমান যখন মাদায়েনে উমর রা.-এর প্রতিনিধি ছিলেন তখন তাঁকে মূলত অগ্নি উপাসকদের পনির সম্পর্কেই জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।

২. রক্ত:
চাই প্রবাহিত রক্ত হোক- যেমন যবাইকৃত জন্তু থেকে প্রবাহিত রক্ত। অথবা ঋতুবতীর রক্ত হোক। তবে এর খুব সামান্য পরিমাণকে অব্যাহতি দেয়া হয়। উপরোক্ত আয়াতে বর্ণিত "অথবা প্রবাহিত রক্ত" সম্পর্কে ইবনে জুরাইজ বলেছেন, এর অর্থ: যে রক্ত ঝরানো হয়। অবশ্য মৃত প্রাণীর রগের ভেতরে যে রক্ত রয়ে যায় তাতে কোনো আপত্তি নেই। ইবনুল মুনযির কর্তৃক বর্ণিত।

রক্ত সম্পর্কে আবু মিজলায থেকে বর্ণিত আছে, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রক্ত ছাগলের যবাইয়ের জায়গায় থাকলে বা ডেগের উপরে দেখা দিলে কেমন হবে? তিনি বললেন: কোনো দোষ নেই। নিষিদ্ধ হয়েছে শুধু প্রবাহিত রক্ত। এটি আবদ বিন হোমায়েদ ও আবুশ শায়খ থেকে বর্ণিত।

আয়েশা রা. বলেছেন: ডেগচির উপরিভাগে যখন রক্তের রেখা দৃষ্টিগোচর হতো এমতাবস্থায় আমরা গোশত খেতাম। আর হাসান বলেছেন: মুসলমানরা তাদের যখম নিয়েই নামায পড়তো। -বুখারি।

বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত আছে, উমর রা.-এর যখম থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে এমতাবস্থায় নামায পড়েছেন। হাফেয ইবনে হাজর ফতহুল বারীতে বলেছেন: আবু হুরায়রা রা. নামাযে দু'এক ফোটা রক্ত টপকালেও দূষণীয় মনে করতেননা। তবে কীট পতংগের রক্ত ও ফোঁড়া থেকে নির্গত রক্ত সাহাবিগণের এসব উক্তির আলোকে ক্ষমার যোগ্য। শরীরে ও কাপড়ে পুঁজ লাগা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে আবু মিজলায বললেন: পুঁজ কোনো দূষণীয় জিনিস নয়। আল্লাহ রক্তের উল্লেখ করেছেন পুঁজের উল্লেখ করেননি। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: পুঁজ, রক্তমিশ্রিত পুঁজ ও রক্তবিহীন পুঁজ কাপড়ে লাগলে কাপড় ধোয়া জরুরি। তবে তিনি বলেছেন: এগুলোর নাপাক হওয়ার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। যাহোক, এগুলো থেকে যথাসাধ্য দূরে থাকা উচিত।

৩. শুকরের গোশত:
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
قُلْ لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّمًا عَلَى طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَنْ يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنْزِيرٍ فَإِنَّهُ رِجْسٌ .
"বলো, আমার কাছে যে অহি এসেছে তাতে আমি কোনো আহারকারীর আহারের জন্য নিষিদ্ধ কিছু পাইনা কেবল মৃতদেহ, প্রবহমান রক্ত, অথবা শুকরের গোশত ব্যতিত। কেননা ওটা নাপাক।” (সূরা-৬, আল-আনয়াম : আয়াত-১৪৫)

অর্থাৎ উল্লিখিত তিনটি জিনিসই নোংরা যা সুস্থ মনের অধিকারীরা পছন্দ করেনা।

আলেমদের প্রসিদ্ধ মত অনুসারে শুকরের পশম দিয়ে সেলাই এর কাজ করা জায়েয।

৪-৬. মানুষের বমি, পেশাব ও মল:
এ জিনিসগুলোর নাপাক হওয়া সর্বসম্মত। তবে স্বল্পপরিমাণ বমি মার্জনীয়। আর যে শিশু এখনো শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করেনি, তার পেশাবের উপর পানি ছিটিয়ে দেয়া যথেষ্ট। কারণ উম্মে কায়েস রা. বলেন: তিনি তার শক্ত খাবার খাওয়ার যোগ্য হয়নি এমন শিশুপুত্রকে নিয়ে রসূল সা. এর কাছে এলেন। তাঁর সেই শিশুপুত্র রসূল সা. এর কোলে পেশাব করে দিল। রসূল সা. পানি আনতে বললেন এবং তাঁর কাপড়ে একটু বেশি করে ছিটিয়ে দিলেন ধুলেননা।" -বুখারি, মুসলিম।

আলী রা. বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ছেলে শিশুর পেশাবে পানি ছিটাতে হবে, আর মেয়ে শিশুর পেশাব ধুতে হবে। কাতাদা বলেন: যতোদিন তারা শক্ত খাবার না খায় ততোদিনের জন্য এই বিধি। যখন শক্ত খাবার ধরবে, তখন উভয়ের পেশাব ধুতে হবে। -আহমদ, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ। আলোচ্য হাদিসের ভাষা আহমদ থেকে উদ্ধৃত।

হাফেয ইবনে হাজর ফতহুল বারীতে বলেছেন: এ হাদিসের সনদ শুদ্ধ। আর পানি ছিটানো ততোদিনই যথেষ্ট হবে যতোদিন শিশু শুধু দুধ খায়। পুষ্টির জন্য যখন অন্য খাবার খাওয়া শুরু করে তখন সর্বসম্মতভাবে ধোয়া ওয়াজিব। শুধু পানি ছিটানোর অনুমতি দেয়ার কারণ সম্ভবত মানুষের শিশু সন্তানকে সাথে নিয়ে চলার প্রতি অত্যধিক আসক্তি। যার বলে কোলে প্রস্রাবের ঘটনা বেশি ঘটে এবং বারবার কাপড় ধোয়ায় বেশি কষ্ট হয়। তাই এই অনুমতি দ্বারা কষ্ট লাঘব করা হলো।

৭. ওদি
ওদি এক ধরনের সাদা ঘন পানি, যা পেশাবের পর বের হয়। এটি সর্বসম্মতভাবে নাপাক। আয়েশা রা. বলেছেন ওদি পেশাবের পরে বের হয়। যার এটা হবে সে তার জননেন্দ্রিয় ধুয়ে অযু করবে। গোসল করার প্রয়োজন নেই। ইবনুল মুনযির কর্তৃক বর্ণিত, ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: মনি (বীর্য) বেরুলে গোসল করতে হবে। আর মযি ও ওদি বের হলে অযু করে পরিপূর্ণভাবে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। আছরাম ও বায়হাকী কর্তৃক বর্ণিত। বায়হাকীর ভাষা হলো: ওদি ও মযি সম্পর্কে তিনি বলেছেন: তোমরা যৌনাঙ্গ ধুয়ে ফেল এবং নামাযের অযুর মতো অযু করো।

৮. মযি
সাদা পিচ্ছিল পানি, যা সহবাসের চিন্তা করলে বা নরনারীর মেলামেশা ও আদর সোহাগের সময় নির্গত হয়। এটা নির্গত হওয়ার কথা মানুষ টের নাও পেতে পারে। নারী ও পুরুষ উভয়ের যৌনাঙ্গ থেকেই এটা নির্গত হয়ে থাকে। তবে নারীর যৌনাঙ্গ থেকেই অধিকতর। এটি সর্বসম্মতভাবে নাপাক। তবে এটা যখন শরীরে লাগবে তখন শরীর ধোয়া ওয়াজিব হবে। আর কাপড়ে লাগলে পানি ছিটিয়ে দেয়াই যথেষ্ট হবে। কেননা এটা এমন নাপাকি যা থেকে বেঁচে থাকা কষ্টকর। কারণ অবিবাহিত যুবক-যুবতীর কাপড়ে এটা খুব ঘন ঘনই লাগে। কাজেই ছেলে শিশুর পেশাবের চেয়ে এটির ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া অগ্রগণ্য। "আলী রা. বলেছেন: আমার খুব বেশি মযি নির্গত হতো। একজনকে আদেশ দিলাম রসূল সা.কে এর কারণ জিজ্ঞাসা করতে। নিজে করিনি তাঁর মেয়ের বিদ্যমানতার কারণে। লোকটি জিজ্ঞাসা করলে রসূল সা. জবাব দিলেন: তোমার পুরুষাংগ ধৌত করো এবং অযু করো।"-বুখারি ও অন্যন্য গ্রন্থ।

সাহল বিন হানিফ রা. বলেছেন: "আমি মযির কারণে খুবই কষ্ট ভোগ করতাম আর এর জন্য আমি ঘন ঘন গোসল করতাম। বিষয়টা রসূল সা. এর নিকট ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন: তোমার তো অযু করাই যথেষ্ট। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ। আমার কাপড়ে যে মযি লাগে, তার প্রতিকার কিভাবে করবো? তিনি বললেন: তোমার কাপড়ের যেখানে লেগেছে বলে মনে হয় সেখানে এক কোষ পানি ছিটায়ে দেয়াই যথেষ্ট হবে। আবু দাউদ ইবনে মাজাহ ও তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি এটাকে হাসান ও সহীহ বলেছেন।

আছরাম রা.ও এ হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষা এ রকম: "মযির কারণে আমি খুব কষ্টে ছিলাম, তাই রসূল সা. এর নিকট এলাম এবং তাঁকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন: তুমি এক কোষ পানি নিয়ে তা ছিটায়ে দাও এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।

৯. মনি (বীর্য) কোনো কোনো আলেম বীর্যকে নাপাক বলেছেন। তবে দৃশ্যত এটা পাক। কিন্তু ভিজে থাকা অবস্থায় একে ধুয়ে ফেলা এবং শুকনো অবস্থায় ঢলে বা খুটে তুলে ফেলা মুস্তাহাব। "আয়েশা রা. বলেছেন: আমি রসূল সা. এর কাপড় থেকে শুকনো বীর্য খুটে ফেলে দিতাম এবং ভিজা বীর্য ধুয়ে ফেলতাম।” -দারু কুতনি, বাযযার, আবু আওয়ানা।

ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন: "কাপড়ে লেগে থাকা বীর্য সম্পর্কে রসূল সা.কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি জবাবে বলেছেন: ওটা তো কফ ও থুথুর মতো। একটা নেকড়া বা ইযখির ঘাস দিয়ে মুছে ফেললেই যথেষ্ট হবে।"-দার কুতনী, বায়হাকি ও তাহাবি হাদিসটি মারফু না মাওকুফ সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।

১০. যে সকল প্রাণীর গোশত খাওয়া না জায়েয সেগুলোর পেশাব ও গোবর এ দুটোই নাপাক। ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন: "রসূলুল্লাহ সা. পায়খানায় গেলেন। অতপর আমাকে আদেশ দিলেন যেনো তিন টুকরো পাথর এনে তাঁকে দেই। আমি পেলাম দুটো পাথর, তৃতীয়টা খুঁজলাম, কিন্তু পেলামনা। একটা শুকনো গোবর পেলাম এবং সেটাই তাঁকে দিতে এলাম। তিনি পাথর দুটো নিলেন এবং গোবরটা ফেলে দিলেন। তিনি বললেন: এটা নাপাক।" -বুখারি ও ইবনে খুযায়মা।

কোনো কোনো রেওয়ায়েতে সংযোজিত হয়েছে: "এটা নাপাক। এতো গাধার গোবর।" এর সামান্য পরিমাণকে নাপাক হওয়া থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। কারণ এ থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকা কঠিন।

অলিদ বিন মুসলিম বলেছেন: আওযায়ী'কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যেসব চতুষ্পদ জন্তুর গোস্ত খাওয়া জায়েয নেই, যেমন খচ্চর, গাধা ও ঘোড়া, সেগুলোর পেশাবের কী হবে? তিনি জবাব দিলেন: মুসলমানগণ তাদের যুদ্ধবিগ্রহের সময় এগুলোর পেশাব দ্বারা আক্রান্ত হতো। কিন্তু তারা শরীর বা দেহ থেকে তা ধুতোনা। যেসকল জন্তুর গোস্ত হালাল, তার পেশাব ও পায়খানাকে ইমাম মালেক, আহমদ ও শাফেয়ী মাযহাবের একাংশ পবিত্র মনে করেন। ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: কোনো সাহাবিই একে নাপাক বলেননি, বরং একে নাপাক বলা একটা নতুন উদ্ভাবন যা সাহাবাদের কেউ বলেননি। আনাস রা. বলেছেন: "ইকল বা উরাইনা গোত্রের একদল লোক মদিনায় এসে দীর্ঘস্থায়ী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলো। রসূল সা. তাদেরকে দুগ্ধবতী উটনীর পেশাব ও দুধ খেতে আদেশ দিলেন।"-আহমদ, বুখারি, মুসলিম।

এ হাদিস উটের পেশাবের পবিত্রতার প্রমাণ বহন করে। উট ছাড়া অন্যান্য হালাল জন্তুকেও তদ্রূপ মনে করতে হবে। ইবনুল মুনযির বলেন: যারা দাবি করে এটা শুধু উরাইনা বা ইকলের জন্যই নির্দিষ্ট ছিলো, তারা ভুল বলেছেন। কেননা কোনো বিশিষ্টতা বিনা প্রমাণে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন: আলেমগণ কর্তৃক প্রাচীন ও সম্প্রতিককালে তাদের বাজারগুলোতে ছাগল ও ভেড়ার মল বিক্রি এবং ওষুধে উটের পেশাব ব্যবহারে আপত্তি না করা দ্বারা প্রমাণিত হয়, এগুলো পাক। শওকানি বলেছেন: হালাল জন্তু মাত্রেরই মলমূত্র বাহ্যত পাক। কেননা এর মৌলিক অবস্থা হলো পবিত্রতা। নাপাক হওয়া শরিয়তে এমন একটা বিধি, যা তার মূল পবিত্রাবস্থা থেকে তাকে ভিন্ন অবস্থায় রূপান্তরিত করে।

কাজেই তাকে পরিবর্তন করার উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া পরিবর্তিত করার দাবিদারদের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। যারা একে নাপাক বলেন, তাদের কাছ থেকে এ বক্তব্যের সপক্ষে আমরা কোনো প্রমাণ পাইনি।

১১. মলখোর জন্তু মলখোর জন্তুর পিঠে আরোহণ, গোস্ত খাওয়া ও দুধ খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, "মলখোর প্রাণীর দুধ খেতে রসূল সা. নিষেধ করেছেন।” এটি ইবনে মাজাহ ব্যতিত অবশিষ্ট পাচঁটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি একে সহীহ বলেছেন। অপর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে: রসূল সা. মলখোর জন্তুর পিঠে চড়তেও নিষেধ করেছেন- আবু দাউদ। আমর বিন শুয়াইব বর্ণিত হাদিসে রসূল সা. গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে এবং মলখোর জন্তুর পিঠে আরোহণ ও গোশত খেতে নিষেধ করেছেন।"-আহমদ, নাসায়ী ও আবু দাউদ।

মলখোর প্রাণী দ্বারা সাধারণত উট, গরু, ভেড়া, হাঁস ও মুরগী ইত্যাদির মধ্য থেকে যেগুলো বিষ্টা খায় এবং একারণে তাদের ঘ্রানে পরিবর্তন আসে, সেগুলোকে বুঝায়। কিছুকাল আটকে রেখে বিষ্টা খাওয়া বন্ধ রাখলে এবং পবিত্র জিনিস খাওয়ালে যদি গোস্ত পবিত্র হয়ে যায় এবং তাকে আর বিষ্টাখোর জন্তু বলে আখ্যায়িত না করা হয়, তাহলে হালাল হয়ে যাবে। কারণ যে কারণে পরিবর্তন এসেছিল, সেটিই ছিলো নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ। সে কারণ যখন দূর হয়েছে, তখন আর নিষিদ্ধ রইলনা।

১২. মদ অধিকাংশ আলেমের মতে মদ নাপাক। কেননা আল্লাহ বলেছেন: إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَنِ . "মদ, জুয়া প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর- এসব নোংরা-অপবিত্র, শয়তানের কাজ।” (সূরা ৫, মায়েদা : আয়াত ৯০)

এক দল মদকে পাক বলে রায় দিয়েছেন। তাদের মতে 'নোংরা' শব্দটির অর্থ হলো নৈতিক দিক দিয়ে নোংরা। 'নোংরা' কথাটা মদকে লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে। অন্য যে কটি জিনিস আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবিকপক্ষে মোটেই নাপাক বিশেষণে ভূষিত হয়না। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেছেন: "তোমরা নাপাক মূর্তিগুলো ত্যাগ করো।" স্পষ্টতই মূর্তি নৈতিকভাবে নাপাক। সেগুলো স্পর্শ করার কারণে কেউ নাপাক হয়না। আয়াতে যেভাবে এর ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ওটা শয়তানের কাজ, মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণার সৃষ্টি করে এবং নামায ও আল্লাহর স্মরণ থেকে বাধা দেয়। একথা দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, নোংরা অর্থ নৈতিক দিক দিয়ে নোংরা ও নাপাক। সুবুলুস সালাম গ্রন্থে বলা হয়েছে:

প্রকৃত ব্যাপার হলো, দ্রব্য ও বস্তুমাত্রই মূলত পবিত্র। কোনো বস্তু হারাম হলেই তা নাপাক হওয়া অবধারিত হয়না। যেমন- গাজা হারাম, কিন্তু তা পবিত্র। নাপাক জিনিস মাত্রই অনিবার্যভাবে হারাম। কিন্তু হারাম জিনিস মাত্রই নাপাক নয়। কেননা কোনো জিনিসের নাপাক হওয়ার হুকুম বা বিধি হলো সর্বাবস্থায় তার স্পর্শ থেকে দূরে থাকা জরুরি। কাজেই কোনো বস্তুকে নাপাক বলে আখ্যায়িত করা তাকে হারাম ঘোষণা করারই নামান্তর। কিন্তু কোনো বস্তুকে হারাম ঘোষণা করলেই তাকে নাপাক ঘোষণা করা হয়না। পুরুষের জন্য স্বর্ণ ও রেশম পরা হারাম। অথচ এ দুটোই সর্বসম্মতভাবে পবিত্র। সুতরাং মদকে হারাম ঘোষণাকারী আয়াত ও হাদিস দ্বারা তার নাপাক হওয়া প্রমাণিত হয়না। এজন্য অন্য কোনো প্রমাণ জরুরি। নচেত মূলত পবিত্র থাকার সর্বসম্মত নীতিমালার আলোকে তা পবিত্রই থাকবে। যে ব্যক্তি এর বিপরীত দাবি করবে তার দাবির সপক্ষে তাকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

১৩. কুকুর
কুকুর নাপাক। কুকুর কোনো জিনিসকে জিভ দিয়ে চাটলে তা সাতবার ধোয়া ওয়াজিব। তন্মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে ধুতে হবে।

"রসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন: তোমাদের কোনো পাত্র যদি কুকুর চাটে, তবে তাকে পাক করার জন্য, সাতবার ধুতে হবে, তন্মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে।"-মুসলিম, আহমদ, আবু দাউদ ও বায়হাকি। প্রথমবার মাটি দিয়ে ধোয়ার অর্থ মাটির সাথে পানি মিশিয়ে ধুতে হবে। আর যে পাত্রে শক্ত খাবার রয়েছে তা চাটলে চাটা খাবার ও তার আশপাশের খাবার ফেলে দিতে হবে। বাকি অংশ আগের পবিত্রাবস্থায় বহাল থাকবে এবং তা ব্যবহার করা যাবে। তবে কুকুরের পশম পাক। কারণ এর নাপাক হওয়ার প্রমাণ নেই।

টিকা:
৩. নাপাকি দু'রকমের: এক. যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়। যেমন: পেশাব, পায়খানা, রক্ত। দুই. যা ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করা যায়না। যেমন: বীর্যপাতজনিত নাপাকি।
৪. এ দ্বারা শরিয়তসম্মত যবাই বুঝানো হয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 শরীর ও কাপড় পাক করার নিয়ম

📄 শরীর ও কাপড় পাক করার নিয়ম


শরীর ও কাপড়ে যদি নাপাকি লাগে এবং তা যদি দেখা যায়, যেমন- রক্ত, তবে তা দূর না হওয়া পর্যন্ত পানি দিয়ে ধোয়া ওয়াজিব। ধোয়ার পর যদি কিছু চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে, যা দূর করা কঠিন হয়, তবে তা মার্জনীয়। আর যদি দেখা না যায়, যেমন পেশাব, তবে তা ধোয়াই যথেষ্ট হবে- এমনকি যদি একবারও ধোয়া হয় তবে তাতেই চলবে। আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেছেন: এক মহিলা রসূল সা. এর নিকট এসে বললো: "আমাদের একজনের কাপড়ে ঋতুর রক্ত লেগেছে, সে কী করবে? রসূল সা. বললেন: সে আংগুল দিয়ে খুটে ও ঢলে পরিষ্কার করবে, অতপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবে। তারপর তা দিয়ে নামায পড়বে।" -বুখারি ও মুসলিম। আর যখন মহিলার কাপড়ের আঁচলে নাপাকি লাগে, তখন মাটিই তাকে পবিত্র করবে। কেননা হাদিসে আছে, “এক মহিলা উম্মে সালামা রা.-কে বললো: আমি আমার কাপড়ের আঁচল লম্বা রাখি এবং ময়লা জায়গা দিয়ে চলাফেরা করি। উম্মে সালামা রা. বললেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কাপড়ে ময়লা লাগার পরে মাটি লাগলে তা-ই তাকে পাক করে দেবে।” -আহমদ, আবু দাউদ।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 ভূমি পবিত্র করার পদ্ধতি

📄 ভূমি পবিত্র করার পদ্ধতি


ভূমিতে নাপাকি লাগলে তার উপর পানি ঢেলে দিলে পাক হয়ে যাবে। কেননা আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: "জনৈক বেদুঈন মসজিদে গিয়ে পেশাব করলো। লোকেরা তৎক্ষণাৎ তার উপর আক্রমণ করতে ছুটে গেলো। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: ওকে ছেড়ে দাও। ওর পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কেননা তোমাদেরকে তো সহজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠিন করার জন্য পাঠানো হয়নি।" -মুসলিম ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।

ভূমি ও ভূমির সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত জিনিস যথা গাছ ও ভবনের ভিত শুকালেই পাক হয়ে যায়। আবু কুলাবা বলেছেন: ভূমির শুকানোই তার পবিত্র হওয়া। আয়েশা রা. বলেছেন: 'ভূমির পবিত্রতা তার শুষ্কতা।' ইবনে আবি শায়বা কর্তৃক বর্ণিত। এ হচ্ছে নাপাকি যখন তরল হয় তখনকার কথা। নাপাকি যখন শক্ত দেহধারী হয়, তখন তার অস্তিত্ব অপসারিত ও নিশ্চিহ্ন হওয়া ব্যতিত নাপাকি দূর হয়না।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 যি ইত্যাদি পবিত্র করার উপায়

📄 যি ইত্যাদি পবিত্র করার উপায়


ইবনে আব্বাস কর্তৃক মাইমুনা রা. থেকে বর্ণিত। ঘির মধ্যে পতিত ইঁদুর সম্পর্কে রসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি জবাব দিলেন: "ইঁদুরটি ও তার পাশের অংশ উঠিয়ে ফেলে দাও। তারপর তোমাদের ঘি খাও।"-বুখারি।

হাফেয বলেছেন: ইবনে আবদুল বার সর্বসম্মত মত উদ্ধৃত করে বলেছেন, জমাট পদার্থে যখন কোনো মৃত প্রাণী পড়ে, তখন তা ও তার আশপাশের জিনিস ফেলে দিতে হবে। যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, উক্ত মৃত প্রাণীর কোনো অংশ ঐ স্থানের বাইরে যায়নি। অবশ্য তরল পদার্থ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে নাপাকি মিশ্রিত হওয়ার দরুন পুরো জিনিসটাই নাপাক হয়ে যায়। তবে যুহরি ও আওযায়ীসহ একটি দল এর বিপরীত মত পোষণ করেন।⁵

টিকা:
৫. এই দু'জনের মতে তরল পদার্থের বিধি পানির বিধির মতো। নাপাকির মিশ্রণে তার মধ্যে পরিবর্তন ঘটা ব্যতিত তা নাপাক হয়না। পরিবর্তিত নাহলে পাক থাকবে। এ মত ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস ও বুখারির এবং এটাই সঠিক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00