📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 তৃতীয় প্রকার: যে পানির সাথে কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়

📄 তৃতীয় প্রকার: যে পানির সাথে কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়


তৃতীয় প্রকার: যে পানির সাথে কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়, যেমন সাবান, যাফরান ও আটা প্রভৃতি এবং যে পানি এসব থেকে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়না

এর বিধি হলো, যতোক্ষণ তা সাধারণ পানি পদবাচ্য থাকে ততোক্ষণ তা পবিত্রকারী থাকবে। কিন্তু যদি সাধারণ পানি পদবাচ্য না থাকে তাহলে তার বিধি এই যে, তা নিজে পবিত্র কিন্তু অপরকে পবিত্র করবেনা। উম্মে আতিয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "রসূল সা. তাঁর মেয়ে যয়নবের মৃত্যুর পর আমাদের কাছে এলেন এবং বললেন : তোমরা ওকে তিনবার গোসল করাও, অথবা পাঁচবার অথবা আরো বেশিবার। তোমরা যদি ভালো মনে করো, বরইর পাতা ও পানি দিয়ে গোসল করাও। অতপর শেষবারের গোসলে কর্পূর অথবা কর্পূর থেকে তৈরি কোনো দ্রব্য ব্যবহার করো। যখন গোসল শেষ হবে তখন আমাকে ডাকবে। গোসল শেষে তাঁকে জানালাম। তিনি তাঁর লুঙ্গী আমাদের দিলেন এবং বললেন, এটি দিয়ে ওকে আবৃত করে দাও।" হাদিসটি সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলোর সব কটিতেই বর্ণিত হয়েছে।

আর মৃত ব্যক্তিকে একমাত্র সেই পানি দিয়েই গোসল করানো জায়েয, যা দিয়ে জীবিত ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জন জায়েয।

আর আহমদ, নাসায়ী ও ইবনে খুযাইমা উম্মে হানীর হাদিস বর্ণনা করেন: রসূল সা. ও তাঁর স্ত্রী মাইমুনা রা. একই পাত্র থেকে গোসল করেছেন। সেটি ছিলো তাঁর স্ত্রী খাদ্যদ্রব্য রাখার এমন একটি পাত্র, যাতে আটার চিহ্ন ছিলো।

দেখা যাচ্ছে, উভয় হাদিসেই পানির সাথে মিশ্রণ পাওয়া গেছে, তবে এই মিশ্রণ এতো বেশি নয় যে, তার উপর পানি নামটির প্রয়োগ বন্ধ করে দিতে হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 চতুর্থ প্রকার: যে পানির সাথে নাপাক জিনিসের মিশ্রণ ঘটে

📄 চতুর্থ প্রকার: যে পানির সাথে নাপাক জিনিসের মিশ্রণ ঘটে


চতুর্থ প্রকার: যে পানির সাথে নাপাক জিনিসের মিশ্রণ ঘটে মিশ্রণ দু'রকমের হতে পারে:

এক: নাপাক দ্রব্যের মিশ্রণের কারণে পানির স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া। এরূপ পানি দ্বারা সর্বসম্মতভাবেই পবিত্রতা অর্জন জায়েয হয়না। ইবনুল মুনযির ও ইবনুল মুলকিন একথা বলেছেন।

দুই: পানি তার স্বাভাবিক অবস্থায় বহাল থাকবে এবং তার উল্লিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যের একটিও পরিবর্তিত হবেনা। এর বিধি হলো, এই পানি নিজেও পবিত্র, অন্যকেও পবিত্র করে, চাই কম হোক, বা বেশি হোক। এর প্রমাণ আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিস: "জনৈক বেদুঈন মসজিদে প্রবেশ করে তাতে প্রস্রাব করলো। লোকেরা তৎক্ষণাৎ তার দিকে তেড়ে গেলো এবং তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ওকে ছেড়ে দাও এবং ওর প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। তোমাদেরকে তো পাঠানো হয়েছে দীনকে সহজভাবে পেশ করার জন্য, কঠিনভাবে পেশ করার জন্য তোমাদের পাঠানো হয়নি।" এ হাদিস মুসলিম ব্যতিত আর সবকটি হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।

আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর হাদিস দ্বারাও এটি প্রমাণিত। তিনি বলেন: জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: "হে রসূলুল্লাহ! আমরা কি বুযায়ার কুয়া থেকে অযু করবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: পানি পবিত্রকারী, তাকে কোনো জিনিস অপবিত্র করেনা।" হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আহমদ, শাফেয়ী, আবু দাউদ, নাসায়ী ও তিরমিযি। তিরমিযি এটিকে ভালো হাদিস এবং আহমদ সহীহ হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইয়াহিয়া ইবনে মঈন এবং আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযমও বলেছেন এটি সহীহ হাদিস।

ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা, হাসান বসরী, ইবনুল মুসাইয়াব, ইকরামা, ইবনে আবি লায়লা, ছাওরী, দাউদ যাহেরী, নায়ী ও মালেক প্রমুখ এই মতই পোষণ করতেন। গাযযালী বলেছেন: শাফেয়ীর মাযহাব যদি পানির ব্যাপারে মালেকের মাযহাবের মতো হতো তবে আমার মতে ভালো হতো।

"রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, পানি যখন দুই কুল্লা পরিমাণ হয়, তখন তা নাপাকি দূর করতে পারেনা"। ইবনে উমর রা. থেকে পাঁচটি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত এ হাদিসটি সনদ ও মূল ভাষা উভয় দিক দিয়েই দুর্বল। (বড় কলসীকে কুল্লা বলা হয়-অনুবাদক)

ইবনে আব্দুল বার ভূমিকায় বলেছেন: ইমাম শাফেয়ী অনুসৃত দুই কুল্লা সংক্রান্ত হাদিস যুক্তির দিক দিয়ে যেমন দুর্বল, সনদের দিক দিয়েও তেমনি প্রমাণসিদ্ধ নয়।

টিকা:
২. বুযায়া' হচ্ছে মদিনার একটি কুয়া। আবু দাউদ বলেছেন: কুতায়বা ইবনে সাঈদকে বলতে শুনেছি, বুযায়া' কয়ার তত্ত্বাবধায়ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার গভীরতা কতোটুকু? তিনি বললেন: সবচেয়ে বেশি পানি যখন হয় তখন তলপেট পর্যন্ত হয়। আমি বললাম যখন কমে? তিনি বললেন: শরীরের যে অংশ ঢেকে রাখার হুকুম রয়েছে তার নিচ পর্যন্ত। আবু দাউদ বলেছেন: আমি আমার চাদর দিয়ে বুযায়ার কুয়া মেপেছি। চাদরটি তার ওপর লম্বা করে রেখে পরে মেপে দেখেছি, তার প্রশস্ততা ছয় হাত। যে ব্যক্তি আমাকে বাগানের দরজা খুলে দিয়ে তার ভেতরে প্রবেশ করলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম: এই কুয়া আগে যেমন ছিলো তা থেকে কি কোনো পরিবর্তন করা হয়েছে? সে বললো না। আমি ঐ কুয়ার পানির রং পরিবর্তিত দেখেছি।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পঞ্চম প্রকার: এঁটো বা উচ্ছিষ্ট পানি

📄 পঞ্চম প্রকার: এঁটো বা উচ্ছিষ্ট পানি


পঞ্চম প্রকার: এটো বা উচ্ছিষ্ট পানি পানি কারো পান করার পর পাত্রে যেটুকু পানি অবশিষ্ট থাকে সেটা উচ্ছিষ্ট। উচ্ছিষ্ট কয়েক প্রকারের:

১. মানুষের উচ্ছিষ্ট: এটা পবিত্র- চাই মুসলমানের হোক, অমুসলমানের হোক, বীর্যপাতজনিত অপবিত্র বা ঋতুবতীর হোক। অবশ্য আল্লাহ যে বলেছেন: 'মুশরিকরা তো অপবিত্র।' (সূরা ৯, আত্-তাওবা : আয়াত-২৮) তার অর্থ হলো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অপবিত্রতা। মুশরিকদের বাতিল আকীদা বিশ্বাসের কারণে এবং নাপাকি ও নোংরামি থেকে আত্মরক্ষা না করার কারণে এই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অপবিত্রতার সৃষ্টি হয়। তাদের দেহ ও জিনিসপত্র বা অপবিত্র ব্যাপার তা নয়। তারা তো মুসলমানদের সাথে মেলামেশা করতো এবং তাদের দূতেরা ও প্রতিনিধি দল রসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আসতো, এমনকি মসজিদে নববীতেও প্রবেশ করতো। তিনি কখনো তাদের দেহের সংস্পর্শে আসার কারণে কোনো জিনিসকে ধুয়ে ফেলতে আদেশ দেননি।

"আয়েশা রা. বলেছেন: আমি ঋতুবতী থাকা অবস্থায় কতো কি পান করতাম, তারপর সেই জিনিস রসূলুল্লাহ সা. কে দিতাম। আমি যেখানে মুখ রেখে পান করতাম সেইখানে মুখ রেখে তিনিও পান করতেন।” -মুসলিম।

২. হালাল জন্তুর উচ্ছিষ্ট: এটা পবিত্র। কেননা এসব জন্তুর লালা পবিত্র গোশত থেকে সৃষ্ট। তাই এটাও পবিত্র। আবু বকর ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলেমগণের সর্বসম্মত মত হলো, যে জন্তুর গোশত হালাল, তার উচ্ছিষ্ট পানি পান করাও জায়েয। তা দিয়ে অযু করাও বৈধ।

৩. গাধা, খচ্চর, হিংস্র জন্তু ও শিকারী পাখির উচ্ছিষ্ট: এটা পবিত্র। "জাবের রা. বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো: গাধার উচ্ছিষ্ট পানি দিয়ে কি আমরা অযু করতে পারবো? তিনি বললেন, হাঁ। শুধু তাই নয়, যাবতীয় হিংস্র প্রাণীর উচ্ছিষ্ট দিয়ে অযু করা চলবে”। (শাফেয়ী, দারু কুতনি ও বায়হাকি) এ হাদিসের বহু সনদ রয়েছে যা মিলিত হলে এটি সবল হয়।

"ইবনে উমর রা. বলেন: একবার রসূলুল্লাহ সা. রাত্রিকালে সফরে বের হলেন। তিনি সদলবলে এমন এক ব্যক্তির কাছে উপস্থিত হলেন, যে তার একটি পানির চৌবাচ্চার সামনে বসেছিল। উমর রা. বললেন: আপনার চৌবাচ্চা থেকে কি কোনো হিংস্র প্রাণী রাতের বেলা পানি চেটে খেয়েছে? রসূল সা. তৎক্ষণাৎ লোকটাকে বললেন: হে চৌবাচ্চার মালিক! ওকে জানিওনা। সে একজন খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ। হিংস্র প্রাণী যদি কিছু খেয়ে থাকে তবে তা তার পেটে আছে। আর যা অবশিষ্ট আছে তা আমাদের জন্য পান যোগ্য ও পবিত্রকারী"। -দার কুতনি।

"ইয়াহিয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত, উমর রা. একটি কাফেলার সাথে সফরে বের হলেন। সেই কাফেলায় আমর ইবনুল আ'স ছিলেন। কাফেলা যখন একটা কুয়ার কাছে পৌঁছলো, তখন আমর ইবনুল আ'স বললেন: হে কূয়ার মালিক! আপনার কৃয়ায় কি কোনো হিংস্র জন্তু আসে? উমর রা. তৎক্ষণাৎ বললেন: আপনি এ খবর জানাবেননা। কারণ আমরাও হিংস্র জন্তুর কাছে যাই, তারাও আমাদের কাছে আসে।"-মুয়াত্তায়ে মালেক।

৪. বিড়ালের উচ্ছিষ্ট: এটাও পবিত্র। কেননা আবু কাতাদার সংসারে অবস্থানকারিণী কাবশা বিনতে কা'ব বলেছেন: "আবু কাতাদা আমার কাছে এলেন। আমি তাকে পানি ঢেলে দিলাম। এ সময় একটা বিড়াল পানি পান করতে এলো। আবু কাতাদা তার দিকে পানির পাত্রটা এগিয়ে দিলেন এবং বিড়াল তা থেকে পানি পান করলো। কাবশা বললেন: আবু কাতাদা দেখলেন, আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি। তিনি বললেন: হে আমার ভাতিজী, তুমি কি অবাক হচ্ছো? আমি বললাম: হাঁ, তিনি বললেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: বিড়ালের উচ্ছিষ্ট নাপাক নয়। বিড়াল তো সর্বক্ষণ তোমাদের আশপাশে ঘুরে বেড়ায়।” (পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত, তিরমিঝি বলেছেন: এটি সহীহ ও ভালো হাদিস, বুখারি প্রমুখ একে সহীহ বলেছেন।

৫. কুকুর ও শুকরের উচ্ছিষ্ট: এটি অপবিত্র এবং এটি থেকে দূরে থাকা ওয়াজিব। কুকুরের উচ্ছিষ্ট অপবিত্র হওয়ার কারণ হলো, বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে: "রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: যখন কুকুর তোমাদের কোনো পাত্র থেকে পানি পান করে তখন ঐ পাত্রকে সাত বার ধোয়া আবশ্যক।"

"আর আহমদ ও মুসলিমে আছে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের কোনো পাত্র কুকুরে চাটলে সেটি সাত বার ধুলে পবিত্র হবে। তন্মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে ঘষে ধুতে হবে।" আর শুকরের উচ্ছিষ্ট অপবিত্র শুকরের অপবিত্রতা ও নোংরামীর কারণে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00