📄 প্রথম প্রকার: সাধারণ পানি
সাধারণ পানির বিধি হলো, এ পানি পবিত্র এবং পবিত্র করে। নিম্নলিখিত পানিগুলো সাধারণ পানির পর্যায়ভুক্ত:
১. বৃষ্টির পানি, বরফগলা পানি ও তুষারের পানি: কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন: وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ
"তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে তা দিয়ে তোমাদের পবিত্র করেন।” (সূরা ৮, আনফাল: আয়াত ১১) মহান আল্লাহ আরো বলেছেন: وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا
"আর আমি আকাশ থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করেছি।" (সূরা-২৫, আল ফুরকান: আয়াত ৪৮) আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ সা. যখন নামাযে তাকবীর বলতেন, কিরাতের পূর্বে সামান্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতেন। আমি একদিন বললাম: হে রসূলুল্লাহ! আপনার উপর আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। তাকবীর ও কিরাতের মাঝে আপনার যে নীরবতা, এর কারণ কী? আপনি এ সময়ে কী বলেন? রসূল সা. বললেন: আমি বলি: اللَّهُمَّ بَاعِدُ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْت بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ نَقْنِي مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اَللَّهُمَّ اغْسِلْنِي مِنْ خَطَايَايَ بِالثَّلْجِ وَالْمَاءِ وَالْبَرْدِ.
“হে আল্লাহ! পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে আপনি যতো দূরত্ব সৃষ্টি করছেন, আমার ও আমার গুনাহসমূহের মাঝে ততোটা দূরত্ব সৃষ্টি করুন। হে আল্লাহ! আমাকে আমার গুনাহগুলো থেকে সেভাবে পরিষ্কার করুন, যেভাবে কাপড়কে পরিষ্কার করা হয় ময়লা থেকে। হে আল্লাহ! আমাকে বরফ, পানি ও তুষার দিয়ে আমার গুনাহগুলো থেকে ধুয়ে মুছে মাফ করে দিন।" -তিরমিযি ব্যতিত সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।
২. সমুদ্রের পানি: আবু হুরায়রা রা. বলেছেন: "এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলো, হে রসূলুল্লাহ! আমরা সমুদ্রে ভ্রমণ করে থাকি। সে সময় আমাদের সাথে অল্প পানি থাকে। তা দিয়ে যদি অযু করি তাহলে পিপাসায় কষ্ট পেতে হয়। সুতরাং আমরা কি সমুদ্রের পানি দিয়ে অযু করতে পারি? রসূলুল্লাহ সা. বলেলেন: সমুদ্রের পানি পবিত্রতা দানকারী¹ আর সমুদ্রের মৃত প্রাণী (মাছ) হালাল।" পাঁচটি সহীহ হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত। তিরমিযি বলেছেন: 'এ হাদিস সহীহ ও উত্তম। আমি মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারিকে জিজ্ঞাসা করলাম এ হাদিস কেমন? তিনি বললেন: সহীহ।'
৩. যমযমের পানি: আলী রা. বর্ণনা করেছেন: “রসূলুল্লাহ সা. এক বালতি যমযমের পানি আনার আদেশ দিলেন। অতপর সে পানি থেকে কিছুটা পান করলেন এবং বাকীটুকু দ্বারা অযু করলেন।” (মুসনাদে আহমদ)
৪. রং পরিবর্তিত পানি: দীর্ঘ দিন আবদ্ধ থাকার কারণে, চৌবাচ্চা বা পাত্রে থাকার কারণে কিংবা শ্যাওলা ও গাছের পাতা ইত্যাকার যেসকল বস্তু, পানির সাথে প্রায়শ যুক্ত হয়, তার মিশ্রণের কারণে যে পানি পরিবর্তন হয়ে যায়, আলেমগণ এ ধরনের পানিকেও সাধারণ পানি মনে করেন।
এ পর্যায়ে মূলনীতি হলো, যে পানিকে সাধারণ পানিরূপে গণ্য করা হয় এবং কোনো বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করা হয়না, তা দ্বারা পবিত্রতা অর্জন বৈধ ও বিশুদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا "যদি পানি না পাও সেক্ষেত্রে তাইয়াম্মুম করে।" (সূরা ৫, মায়েদা: আয়াত ৬)
টিকাঃ
১. রসূলুল্লাহ সা. প্রশ্নের জবাবে 'হাঁ' বলেননি। কারণ তিনি বিধির সাথে সাথে তার যুক্তি উল্লেখ করতে চেয়েছেন। সেটি হচ্ছে পানির পবিত্রতা দানের বৈশিষ্ট্য। সেই সাথে তিনি আরো একটি বিধি জানিয়ে দিলেন, যা জিজ্ঞেস করা হয়নি। সেটি হলো, পানি মধ্যের মৃত প্রাণী হালাল। এভাবে তার জবাবটি তথ্যগত দিক থেকে পূর্ণতা লাভ করলো এবং জিজ্ঞেস করা হয়নি- এমন একটি বর্ধিত বিধিও জানিয়ে দেয়া হলো। বিধিটির যখন প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন এটি কাজে লাগবে। এটি ফতোয়ার একটি উত্তম বৈশিষ্ট্য।
📄 দ্বিতীয় প্রকার: ব্যবহৃত পানি
এটি অযুকারী ও গোসলকারীর অংগ প্রত্যংগ থেকে ঝরে পড়া পানি। এর বিধি হলো, সাধারণ পানির মতোই এটি পবিত্রতাদানকারী। মূল পানি যেমন পবিত্রকারী, এটিও অবিকল তেমনি পবিত্রকারী। উভয়টিই সমান। এটিকে পবিত্রকারী পানি থেকে ব্যতিক্রমী সাব্যস্ত করার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া, রুবাই' বিনতে মুয়াওয়ায বর্ণিত হাদিস থেকেও এটি প্রমাণিত। তিনি রসূলুল্লাহ সা. এর অযুর বিবরণ দিয়ে বলেছেন: "আর তিনি তাঁর অষুর যে পানি হাতে লেগে ছিলো তা দিয়ে মাথা মাসেহ করলেন।" -আহমদ ও আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত।
আবু দাউদ বর্ণিত বক্তব্য এরূপ: "রসূলুল্লাহ সা. তাঁর হাতে লেগে থাকা অবশিষ্ট পানি দিয়ে তাঁর মাথা মাসেহ করলেন।"
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রসূল সা. এর সাথে মদিনার এক রাস্তায় তার সাক্ষাত হলো। আবু হুরায়রা তখন বীর্যপাতজনিত কারণে অপবিত্র তথা 'জুনুবি'। তাই তিনি রসূল সা. এর সামনে থেকে চলে গেলেন, গোসল করলেন এবং তারপর ফিরে এলেন। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: হে আবু হুরায়রা! তুমি কোথায় ছিলে? তিনি বললেন: আমি অপবিত্র ছিলাম। অপবিত্র অবস্থায় আপনার সাথে একত্রে বসা আমি পছন্দ করিনি। রসূলুল্লাহ সা. বললেন: সুবহানাল্লাহ, মুমিন কখনো অপবিত্র হয়না। -সকল সহীহ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত।
এ হাদিস থেকে ব্যবহৃত পানি যে পবিত্রকারী তা প্রমাণিত হয়। কোনো মুমিন যখন নাপাক হয়না, তখন নিছক তার দেহের স্পর্শে আসার কারণেই পানি তার পবিত্রকারী বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে-এর কোনো কারণ নেই। এই স্পর্শে বড়জোর এক পবিত্র জিনিস আরেক পবিত্র জিনিসের সাথে মিলিত হয়। তাতে কোনোই ক্ষতি হয়না। ইবনুল মুনযির বলেছেন: আলী, ইবনে উমর, আবি উমামা, আতা, হাসান, মাকহুল ও নাখয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তারা বলেছেন: যে ব্যক্তি তার মাথা মাসেহ করতে ভুলে গেছে। তারপর দেখতে পেলো, তার দাড়ি ভিজা, ঐ দাড়ির পানি দিয়ে মাথা মাসেহ করা তার জন্য যথেষ্ট হবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, তারা ব্যবহৃত পানিকে পবিত্রকারী মনে করেন। আমিও এই মতই পোষণ করি। এটি ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ীর মাযহাব- এই মর্মে একটি রেওয়ায়েত রয়েছে। ইবনে হাযম বলেছেন, এটি সুফীয়ান ছাওরী, আবু ছাওর ও সকল যাহেরি উলামার অভিমত।
📄 তৃতীয় প্রকার: যে পানির সাথে কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়
তৃতীয় প্রকার: যে পানির সাথে কোনো পবিত্র বস্তু মিশ্রিত হয়, যেমন সাবান, যাফরান ও আটা প্রভৃতি এবং যে পানি এসব থেকে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়না
এর বিধি হলো, যতোক্ষণ তা সাধারণ পানি পদবাচ্য থাকে ততোক্ষণ তা পবিত্রকারী থাকবে। কিন্তু যদি সাধারণ পানি পদবাচ্য না থাকে তাহলে তার বিধি এই যে, তা নিজে পবিত্র কিন্তু অপরকে পবিত্র করবেনা। উম্মে আতিয়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "রসূল সা. তাঁর মেয়ে যয়নবের মৃত্যুর পর আমাদের কাছে এলেন এবং বললেন : তোমরা ওকে তিনবার গোসল করাও, অথবা পাঁচবার অথবা আরো বেশিবার। তোমরা যদি ভালো মনে করো, বরইর পাতা ও পানি দিয়ে গোসল করাও। অতপর শেষবারের গোসলে কর্পূর অথবা কর্পূর থেকে তৈরি কোনো দ্রব্য ব্যবহার করো। যখন গোসল শেষ হবে তখন আমাকে ডাকবে। গোসল শেষে তাঁকে জানালাম। তিনি তাঁর লুঙ্গী আমাদের দিলেন এবং বললেন, এটি দিয়ে ওকে আবৃত করে দাও।" হাদিসটি সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলোর সব কটিতেই বর্ণিত হয়েছে।
আর মৃত ব্যক্তিকে একমাত্র সেই পানি দিয়েই গোসল করানো জায়েয, যা দিয়ে জীবিত ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জন জায়েয।
আর আহমদ, নাসায়ী ও ইবনে খুযাইমা উম্মে হানীর হাদিস বর্ণনা করেন: রসূল সা. ও তাঁর স্ত্রী মাইমুনা রা. একই পাত্র থেকে গোসল করেছেন। সেটি ছিলো তাঁর স্ত্রী খাদ্যদ্রব্য রাখার এমন একটি পাত্র, যাতে আটার চিহ্ন ছিলো।
দেখা যাচ্ছে, উভয় হাদিসেই পানির সাথে মিশ্রণ পাওয়া গেছে, তবে এই মিশ্রণ এতো বেশি নয় যে, তার উপর পানি নামটির প্রয়োগ বন্ধ করে দিতে হবে।
📄 চতুর্থ প্রকার: যে পানির সাথে নাপাক জিনিসের মিশ্রণ ঘটে
চতুর্থ প্রকার: যে পানির সাথে নাপাক জিনিসের মিশ্রণ ঘটে মিশ্রণ দু'রকমের হতে পারে:
এক: নাপাক দ্রব্যের মিশ্রণের কারণে পানির স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া। এরূপ পানি দ্বারা সর্বসম্মতভাবেই পবিত্রতা অর্জন জায়েয হয়না। ইবনুল মুনযির ও ইবনুল মুলকিন একথা বলেছেন।
দুই: পানি তার স্বাভাবিক অবস্থায় বহাল থাকবে এবং তার উল্লিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যের একটিও পরিবর্তিত হবেনা। এর বিধি হলো, এই পানি নিজেও পবিত্র, অন্যকেও পবিত্র করে, চাই কম হোক, বা বেশি হোক। এর প্রমাণ আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিস: "জনৈক বেদুঈন মসজিদে প্রবেশ করে তাতে প্রস্রাব করলো। লোকেরা তৎক্ষণাৎ তার দিকে তেড়ে গেলো এবং তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করলো। তখন রসূলুল্লাহ সা. বললেন, ওকে ছেড়ে দাও এবং ওর প্রস্রাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। তোমাদেরকে তো পাঠানো হয়েছে দীনকে সহজভাবে পেশ করার জন্য, কঠিনভাবে পেশ করার জন্য তোমাদের পাঠানো হয়নি।" এ হাদিস মুসলিম ব্যতিত আর সবকটি হাদিস গ্রন্থ কর্তৃক বর্ণিত।
আবু সাঈদ খুদরী রা.-এর হাদিস দ্বারাও এটি প্রমাণিত। তিনি বলেন: জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: "হে রসূলুল্লাহ! আমরা কি বুযায়ার কুয়া থেকে অযু করবো? রসূলুল্লাহ সা. বললেন: পানি পবিত্রকারী, তাকে কোনো জিনিস অপবিত্র করেনা।" হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আহমদ, শাফেয়ী, আবু দাউদ, নাসায়ী ও তিরমিযি। তিরমিযি এটিকে ভালো হাদিস এবং আহমদ সহীহ হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইয়াহিয়া ইবনে মঈন এবং আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযমও বলেছেন এটি সহীহ হাদিস।
ইবনে আব্বাস, আবু হুরায়রা, হাসান বসরী, ইবনুল মুসাইয়াব, ইকরামা, ইবনে আবি লায়লা, ছাওরী, দাউদ যাহেরী, নায়ী ও মালেক প্রমুখ এই মতই পোষণ করতেন। গাযযালী বলেছেন: শাফেয়ীর মাযহাব যদি পানির ব্যাপারে মালেকের মাযহাবের মতো হতো তবে আমার মতে ভালো হতো।
"রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, পানি যখন দুই কুল্লা পরিমাণ হয়, তখন তা নাপাকি দূর করতে পারেনা"। ইবনে উমর রা. থেকে পাঁচটি হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত এ হাদিসটি সনদ ও মূল ভাষা উভয় দিক দিয়েই দুর্বল। (বড় কলসীকে কুল্লা বলা হয়-অনুবাদক)
ইবনে আব্দুল বার ভূমিকায় বলেছেন: ইমাম শাফেয়ী অনুসৃত দুই কুল্লা সংক্রান্ত হাদিস যুক্তির দিক দিয়ে যেমন দুর্বল, সনদের দিক দিয়েও তেমনি প্রমাণসিদ্ধ নয়।
টিকা:
২. বুযায়া' হচ্ছে মদিনার একটি কুয়া। আবু দাউদ বলেছেন: কুতায়বা ইবনে সাঈদকে বলতে শুনেছি, বুযায়া' কয়ার তত্ত্বাবধায়ককে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার গভীরতা কতোটুকু? তিনি বললেন: সবচেয়ে বেশি পানি যখন হয় তখন তলপেট পর্যন্ত হয়। আমি বললাম যখন কমে? তিনি বললেন: শরীরের যে অংশ ঢেকে রাখার হুকুম রয়েছে তার নিচ পর্যন্ত। আবু দাউদ বলেছেন: আমি আমার চাদর দিয়ে বুযায়ার কুয়া মেপেছি। চাদরটি তার ওপর লম্বা করে রেখে পরে মেপে দেখেছি, তার প্রশস্ততা ছয় হাত। যে ব্যক্তি আমাকে বাগানের দরজা খুলে দিয়ে তার ভেতরে প্রবেশ করলো তাকে জিজ্ঞেস করলাম: এই কুয়া আগে যেমন ছিলো তা থেকে কি কোনো পরিবর্তন করা হয়েছে? সে বললো না। আমি ঐ কুয়ার পানির রং পরিবর্তিত দেখেছি।