📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গর্ভের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মেয়াদ

📄 গর্ভের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মেয়াদ


গর্ভের সন্তানের পূর্ণতা লাভ ও জীবিত ভূমিষ্ঠ হওয়ার সর্বনিম্ন মেয়াদ ছয় মাস। কেননা আল্লাহ্ বলেছেন: وَحَمْلَهُ وَفِصْلُهُ ثَلَثُونَ شَهْرًا তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তাকে স্তন ছাড়াতে ত্রিশ মাস লাগে'। (সূরা আহ্কাফ, আয়াত ১৫) এবং وَفِصْلُهُ فِي عَامَيْنِ 'তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে' (সূরা লুকমান, আয়াত ১৪) দুধ ছাড়াতে যখন দু'বছর লাগে, তখন ছয় মাসের বেশি অবশিষ্ট থাকেনা। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।
হানাফি ফকিহ্ কামাল ইবনে হুমাম বলেন: সচরাচর গর্ভের মেয়াদ ছয় মাসের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। ঠিক ছয় মাসে সন্তান হওয়ার কথা যুগ যুগ কাল পরও কদাচিৎ শোনা যায়। কোনো কোনো হাম্বলি ফকিরে মতে গর্ভের ন্যূনতম মেয়াদ নয় মাস।
আধুনিক আইনে অধিকাংশ আলেমের মতের বিরোধিতা করে কতিপয় হাম্বলি ফকিহ ও শরিয়তানুগত চিকিৎসকের মতানুসারে গর্ভের সর্বনিম্ন মেয়াদ নয়টি চন্দ্রমাস অর্থাৎ ২৭০ দিন ধার্য করা হয়েছে। কেননা এটা অধিকাংশের মতের সাথে সংগতিপূর্ণ। গর্ভের সর্বনিম্ন মেয়াদের ন্যায় সর্বোচ্চ মেয়াদের ব্যাপারেও ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফি ফকিহদের মতে দুই বছর, মালিকি ফকিহ্ মুহাম্মদ ইবনুল হাকামের মতে নয় মাস এবং কারো কারো মতে এক চান্দ্র বৎসর অর্থাৎ ৩৫৪ দিন। আধুনিক আইনে শরিয়ত সম্মত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতানুসারে এক সৌর বছর (৩৬৫ দিন) ধার্য করেছে এবং এটিকে সন্তানের বংশ, উত্তরাধিকার, ওয়াক্ফ ও অসিয়ত নির্ধারণের ভিত্তি গণ্য করেছে।
ইমাম আবু ইউসুফের মতের উপর হানাফি মযহাবের ফতোয়ার ভিত্তি। আধুনিক আইন তার সেই মতকেই গ্রহণ করেছে। সেটি হলো, কুরআনের দুই আয়াতের যেটাতে বৃহত্তর মেয়াদ উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাই গর্ভের সর্বোচ্চ মেয়াদ। আধুনিক আইন তিন ইমামের এই মতকেও অনুসরণ করেছে যে, সন্তানের জীবিত ভূমিষ্ঠ হওয়া তার উপর উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হওয়ার শর্ত, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর বা স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদের এক বছরের মধ্যে সন্তানের জন্ম হওয়া তার উত্তরাধিকার লাভের শর্ত---- মুহাম্মদ ইবনে হাকামের এ মতও আধুনিক আইনে গৃহীত হয়েছে। ৪২, ৪৩ ও ৪৪নং ধারায় বলা হয়েছে:
৪২ নং ধারা: মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে গর্ভস্থ সন্তানের জন্য নারী বা পুরুষ হিসাবে যে অংশ বৃহত্তর, সেটা রেখে দিতে হবে।
৪৩ নং ধারা: স্বামী যখন স্ত্রীকে বা ইদ্দত পালনরতা স্ত্রীকে রেখে মারা যাবে, তখন তার গর্ভস্থ সন্তান কেবল তখনই তার উত্তরাধিকারী হবে যখন সে মৃত্যু বা বিচ্ছেদের দিন থেকে তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে জীবিত ভূমিষ্ঠ হবে। এই সন্তান নিম্নের দুই অবস্থা ব্যতীত পিতা ছাড়া আর কারো উত্তরাধিকারী হবেনা। ১. যদি তার মা মৃত্যু বা বিচ্ছেদ জনিত ইদ্দত পালনরত থাকে। যদি উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া ব্যক্তি ঐ ইদ্দতেই মারা যায় এবং মৃত্যু বা বিচ্ছেদের দিন থেকে সর্বোচ্চ তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে সন্তান জীবিত ভূমিষ্ঠ হয়। ২. মৃতের মৃত্যুর সময় যদি দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকে এবং তার মৃত্যুর দিন থেকে সর্বোচ্চ দু'শো সত্তর দিনের মধ্যে সন্তান জীবিত ভূমিষ্ট হয়।
৪৪ নং ধারা: যাকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় তার প্রাপ্যের চেয়ে কম দেয়া হয়। সে তার অংশের বেশিটুকু যে উত্তরাধিকার পেয়েছে তার কাছ থেকে বাকিটুকু ফেরত নেবে। আর যদি সে পাওনার চেয়ে বেশি পেয়ে থাকে, তবে যে উত্তরাধিকারীর অংশের বেশিটুকু নিয়েছে তাকে তা ফেরত দেবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নিখোঁজ

📄 নিখোঁজ


নিখোঁজ: যখন কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়, তার খবরাদি জানা না যায়, কোথায় থাকে এবং জীবিত আছে না মৃত, জানা না যায় এবং বিচারক তাকে মৃত ধরে নেয়, তখন তাকে নিরুদ্দেশ বলা হয়। বিচারকের সিন্ধান্ত: এ ধরনের ব্যক্তি সম্পর্কে বিচারকের সিদ্ধান্ত হয় কোনো সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গৃহীত হবে, যেমন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য অথবা দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পর এমন সব আলামতের ভিত্তিতে গৃহীত হবে যা প্রমাণ হিসাবে গৃহীত হবার যোগ্য নয়। প্রথমাবস্থায় যে সময় তার মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যাবে তখন থেকে সে নিশ্চিত মৃত বিবেচিত হবে। দ্বিতীয় অবস্থায় যখন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে বিচারক তাকে মৃত বলে রায় দেয় তখন তাকে কার্যত মৃত ধরা হবে। কেননা তার জীবিত থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কতদিন পরে নিখোঁজকে মৃত ধরা হবে

📄 কতদিন পরে নিখোঁজকে মৃত ধরা হবে


কতদিন পরে নিরুদ্দেশ ব্যক্তিকে মৃত ধরা হবে সে ব্যাপারে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক বলেন: চার বছর পর। কেননা উমর (রা) বলেছেন: যে মহিলার স্বামী নিখোঁজ হয়ে গেছে এবং সে কোথায় থাকে জানা যায়না, সে মহিলাকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে, চার বছর পর চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে, তারপর সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করতে পারবে।'-বুখারি, শাফেয়ি।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম মালেকের সুপ্রসিদ্ধ মত এই যে, এ জন্য কোনো মেয়াদ ধার্য করা হবেনা, বরং প্রত্যেক যুগের বিচারকদের বিবেচনার উপর সমর্পিত থাকবে। 'আল মুগনি' গ্রন্থে যে নিরুদ্দেশের মৃত্যু সংক্রান্ত ধারণা প্রবলতর হয়নি, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে: 'তার মৃত্যু হয়েছে এ কথা নিশ্চিত ভাবে না জানা পর্যন্ত তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবেনা, তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করবেনা। অনুরূপ, এত দীর্ঘ মেয়াদ না কেটে যাওয়া পর্যন্তও তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবেনা ও তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করবেনা যত দিন পর্যন্ত সাধারণত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকেনা। এটা কত দিন ধরা যেতে পারে তা নির্ধারণ করবে বিচারক। এটা ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মত। কেননা তার বেঁচে থাকাই স্বাভাবিক অবস্থা। 'ইমাম আহমদ বলেন: সে যতো দিন এমন ভাবে নিরুদ্দেশ হয় যে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর হয়, তাহলে সূক্ষ্ম চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে চার বছর অতিক্রম করার পর তার মৃত্যুর ফায়সালা করা হবে। (যুদ্ধের ময়দানে বা বহু সামরিক অভিযানের পর কেউ নিখোঁজ হলে অথবা কেউ বাড়িতে থাকা অবস্থায় এশার নামাযে বা অন্য কোনো কাজে বের হয়ে আর ফিরলো না এবং তার কোনো খবরও জানা গেলনা- এ ধরনের লোকের মতই)। আর যদি কেউ এমন সফরে থাকে, যেখানে নিরাপদে থাকার সম্ভাবনাই বেশি (যেমন হজ্জ, ব্যবসায় বা শিক্ষা সফর) তবে তার ব্যাপারও বিচারকের উপর সোপর্দ থাকবে। তিনি যতো দিন পর সমীচীন মনে করেন এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার জীবিত বা মৃত থাকার বিষয়ে তদন্ত করে তার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেবেন।
যে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর হয়, সে ক্ষেত্রে আহমদের মতটি আধুনিক আইনে গৃহীত হয়েছে। সেখানে তার মতানুসারে চার বছরের মেয়াদ ধার্য করা হয়েছে। আর যে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর নয়, সে ক্ষেত্রে বিষয়টা বিচারকের মতের উপর সোপর্দ হবে।
১৯২৯ সালের ২৫ নং আইনের ২১ নং ধারায় বলা হরেছে: এ ক্ষেত্রে যে নিরুদ্দেশ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা প্রবলতর, তাকে তার নিখোঁজ হওয়ার তারিখ থেকে চার বছর পর মৃত বলে গণ্য করা হবে। অন্যান্য অবস্থায় কতদিন পরে তাকে মৃত ধরে নেয়া হবে তা বিচারক নির্ধারণ করবে। নিরুদ্দেশ ব্যক্তি জীবিত না মৃত তা জানবার জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে সর্বাত্মক অনুসন্ধান চালানোর পরই বিচারক এটা নির্ধারণ করবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নিখোঁজের উত্তরাধিকার

📄 নিখোঁজের উত্তরাধিকার


নিরুদ্দেশ ব্যক্তি যদি কিছু সম্পত্তি রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে থাকে, তবে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি ততক্ষণ পর্যন্ত তার মালিকানায় থাকবে এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবেনা, যতক্ষণ তার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর না জানা যায় কিংবা বিচারক তাকে মৃত ঘোষণা না করে। যখন তার মৃত্যুর নিশ্চিত খবর জানা যাবে কিংবা বিচারক তাকে মৃত ঘোষণা করবে, তখন যারা উত্তরাধিকারী, তারা মৃত্যুর সময় বা মৃত ঘোষিত হওয়ার সময়েই উত্তরাধিকার পাওয়ার হকদার হবে। তার আগে যে মারা গেছে কিংবা তারপরে উত্তরাধিকারী হয়েছে, সে উত্তরাধিকার পাবেনা।
পক্ষান্তরে যখন সে অন্যের উত্তরাধিকারী হবে, তখন মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তার অংশ স্থাগিত রাখা হবে। যখন তাকে মৃত ঘোষণা করা হবে, তখন তার স্থগিত অংশ অন্য উত্তরাধিকারীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাবে। আধুনিক আইনেও এ কথাই বলা হয়েছে। ৪৫ নং ধারায় বলা হয়েছে:
নিরুদ্দেশ ব্যক্তির অবস্থা স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত মৃতের উত্তরাধিকারে তার প্রাপ্য অংশ স্থগিত থাকবে। যদি জানা যায় যে, সে জীবিত তবে তার অংশ গ্রহণ করবে। আর যদি মৃত বলে জানা যায়, তবে মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সময়ে অন্য যারা তার উত্তরাধিকারী ছিলো, তাদেরকে এই অংশটি দেয়া হবে। মৃত ঘোষিত হওয়ার পর যদি সে জীবিত প্রমাণিত হয়, তবে অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের দখলে তার অংশের যতোটুকু অবশিষ্ট আছে তা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেবে। (এ হচ্ছে উত্তরাধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধি, যদি তার স্ত্রী থেকে থাকে তবে সে সম্পর্কে ১৯২৯ সালের ২৫ নং আইনের ২২ নং ধারায় বলা হয়েছে:
'পূর্ববর্তী ধারায় যে ভাবে বর্ণিত হয়েছে, তদনুযায়ী নিরুদ্দেশকে মৃত ঘোষণা করার পর তার স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুর পর যেভাবে ইদ্দত পালন করতে হয় সেভাবে ইদ্দত পালন করবে এবং তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি সে সব উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে, যারা বিচারকের রায় ঘোষণার সময় বিদ্যমান ছিলো। আর ১৯২০ সালের ২৫ নং আইনের ৭নং ধারায় বলা হয়েছে: যখন নিরুদ্দেশ ব্যক্তি ফিরে আসবে অথবা জানা যাবে যে, সে জীবিত আছে, তখন তার স্ত্রীর দ্বিতীয় স্বামী যদি তার সাথে সহবাস না করে থাকে তবে সে তার সাথে সহবাস করবে। আর যদি দ্বিতীয় স্বামী প্রথম স্বামীর জীবিত থাকার কথা না জেনে তার সাথে সহবাস করে থাকে তবে স্ত্রী দ্বিতীয় স্বামীরই থাকবে, যদি তার বিয়ে প্রথম স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দতের ভেতরে না হয়ে থাকে।')

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00