📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 মায়ের পেটে সন্তান

📄 মায়ের পেটে সন্তান


১. মায়ের পেটে যে সন্তান থাকে, সে যখন উত্তরাধিকারী হয়না অথবা অন্যের কারণে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তার জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে কিছুই স্থগিত রাখা যাবেনা। যখন কোন ব্যক্তি স্ত্রী, পিতা এবং তার পিতা ব্যতীত অন্যের ঔরসের সন্তান গর্ভে ধারণকারিণী মাতাকে রেখে মারা যায়, তখন এই গর্ভস্থ সন্তান কোনো উত্তরাধিকার পাবেনা। কেননা এই সন্তান বৈপিত্রেয় ভাই বা বোন ছাড়া অন্য কিছু হতে পারেনা। আর আসল উত্তরাধিকারী পিতার সাথে বৈপিত্রেয় ভাই-বোন উত্তরাধিকারী হয়না।
২. গর্ভের সন্তান যদি উত্তরাধিকারী হয় এবং তার সাথে আর কোনো উত্তরাধিকারী একেবারেই না থাকে অথবা তার সাথে এমন একজন উত্তরাধিকারী থাকে, যে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত, তবে গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তির বণ্টন স্থগিত রাখা হবে। অনুরূপ যখন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত নয় এমন উত্তরাধিকারীরা তার সাথে থাকবে এবং তারা সবাই স্পষ্টভাবে, মৌনভাবে বা বণ্টনের দাবি না জানানোর মাধ্যমে বন্টন স্থগিত রাখতে সম্মত থাকে তাহলেও বণ্টন স্থগিত রাখা হবে।
৩. গর্ভস্থ সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে যে উত্তরাধিকারীর হিসসা পরিবর্তিত হয়না, তার পুরো হিসসা দিয়ে দেয়া হবে এবং অন্যদের উত্তরাধিকার বণ্টন স্থগিত রাখা হবে। যেমন যখন কেউ দাদি ও গর্ভবতী স্ত্রী রেখে মারা যায় তখন দাদিকে এক ষষ্ঠাংশ দিয়ে দেয়া হবে। কেননা সন্তান ছেলে বা মেয়ে যাই হোক দাদির হিসসা অপরিবর্তিতই থাকবে।
৪. যে উত্তরাধিকারীর উত্তরাধিকার গর্ভস্থ সন্তানের দুই অবস্থার এক অবস্থায় রহিত হয় এবং অপর অবস্থায় রহিত হয় না, তাকে কোনো অংশ দেয়া হবেনা। কেননা তার প্রাপ্য অংশ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যেমন কেউ যদি ভাই ও গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে মারা যায় তবে ভাই কিছুই (আপাতত) পাবেনা। কারণ গর্ভস্থ সন্তান ছেলে হতে পারে। এটা অধিকাংশ আলেমের মত।
৫. গর্ভস্থ সন্তানের লিংগভেদে আসহাবুল ফুরুষের মধ্য হতে যার অংশ পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাকে দুই অংশের মধ্যে যেটি ক্ষুদ্রতর সেটি দেয়া হবে এবং বৃহত্তর অংশ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে। সন্তান যদি জীবিত ভূমিষ্ঠ হয় এবং বৃহত্তর অংশ তার প্রাপ্য হয়, তবে সে বৃহত্তর অংশটি নেবে। আর যদি বৃহত্তর অংশ তার প্রাপ্য না হয় বরং ক্ষুদ্রতর অংশ প্রাপ্য হয় তবে সে সেটি নেবে এবং অবশিষ্টাংশ সে উত্তরাধিকারীদেরকে ফেরত দেবে। যদি মৃত সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তবে সে কিছুই পাবেনা এবং সমগ্র পরিত্যক্ত সম্পত্তি নবজাতককে ভ্রুক্ষেপ না করেই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 গর্ভের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মেয়াদ

📄 গর্ভের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মেয়াদ


গর্ভের সন্তানের পূর্ণতা লাভ ও জীবিত ভূমিষ্ঠ হওয়ার সর্বনিম্ন মেয়াদ ছয় মাস। কেননা আল্লাহ্ বলেছেন: وَحَمْلَهُ وَفِصْلُهُ ثَلَثُونَ شَهْرًا তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তাকে স্তন ছাড়াতে ত্রিশ মাস লাগে'। (সূরা আহ্কাফ, আয়াত ১৫) এবং وَفِصْلُهُ فِي عَامَيْنِ 'তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে' (সূরা লুকমান, আয়াত ১৪) দুধ ছাড়াতে যখন দু'বছর লাগে, তখন ছয় মাসের বেশি অবশিষ্ট থাকেনা। এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।
হানাফি ফকিহ্ কামাল ইবনে হুমাম বলেন: সচরাচর গর্ভের মেয়াদ ছয় মাসের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। ঠিক ছয় মাসে সন্তান হওয়ার কথা যুগ যুগ কাল পরও কদাচিৎ শোনা যায়। কোনো কোনো হাম্বলি ফকিরে মতে গর্ভের ন্যূনতম মেয়াদ নয় মাস।
আধুনিক আইনে অধিকাংশ আলেমের মতের বিরোধিতা করে কতিপয় হাম্বলি ফকিহ ও শরিয়তানুগত চিকিৎসকের মতানুসারে গর্ভের সর্বনিম্ন মেয়াদ নয়টি চন্দ্রমাস অর্থাৎ ২৭০ দিন ধার্য করা হয়েছে। কেননা এটা অধিকাংশের মতের সাথে সংগতিপূর্ণ। গর্ভের সর্বনিম্ন মেয়াদের ন্যায় সর্বোচ্চ মেয়াদের ব্যাপারেও ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হানাফি ফকিহদের মতে দুই বছর, মালিকি ফকিহ্ মুহাম্মদ ইবনুল হাকামের মতে নয় মাস এবং কারো কারো মতে এক চান্দ্র বৎসর অর্থাৎ ৩৫৪ দিন। আধুনিক আইনে শরিয়ত সম্মত চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতানুসারে এক সৌর বছর (৩৬৫ দিন) ধার্য করেছে এবং এটিকে সন্তানের বংশ, উত্তরাধিকার, ওয়াক্ফ ও অসিয়ত নির্ধারণের ভিত্তি গণ্য করেছে।
ইমাম আবু ইউসুফের মতের উপর হানাফি মযহাবের ফতোয়ার ভিত্তি। আধুনিক আইন তার সেই মতকেই গ্রহণ করেছে। সেটি হলো, কুরআনের দুই আয়াতের যেটাতে বৃহত্তর মেয়াদ উল্লেখ করা হয়েছে, সেটাই গর্ভের সর্বোচ্চ মেয়াদ। আধুনিক আইন তিন ইমামের এই মতকেও অনুসরণ করেছে যে, সন্তানের জীবিত ভূমিষ্ঠ হওয়া তার উপর উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হওয়ার শর্ত, মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর বা স্বামী স্ত্রীর বিচ্ছেদের এক বছরের মধ্যে সন্তানের জন্ম হওয়া তার উত্তরাধিকার লাভের শর্ত---- মুহাম্মদ ইবনে হাকামের এ মতও আধুনিক আইনে গৃহীত হয়েছে। ৪২, ৪৩ ও ৪৪নং ধারায় বলা হয়েছে:
৪২ নং ধারা: মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে গর্ভস্থ সন্তানের জন্য নারী বা পুরুষ হিসাবে যে অংশ বৃহত্তর, সেটা রেখে দিতে হবে।
৪৩ নং ধারা: স্বামী যখন স্ত্রীকে বা ইদ্দত পালনরতা স্ত্রীকে রেখে মারা যাবে, তখন তার গর্ভস্থ সন্তান কেবল তখনই তার উত্তরাধিকারী হবে যখন সে মৃত্যু বা বিচ্ছেদের দিন থেকে তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে জীবিত ভূমিষ্ঠ হবে। এই সন্তান নিম্নের দুই অবস্থা ব্যতীত পিতা ছাড়া আর কারো উত্তরাধিকারী হবেনা। ১. যদি তার মা মৃত্যু বা বিচ্ছেদ জনিত ইদ্দত পালনরত থাকে। যদি উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া ব্যক্তি ঐ ইদ্দতেই মারা যায় এবং মৃত্যু বা বিচ্ছেদের দিন থেকে সর্বোচ্চ তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে সন্তান জীবিত ভূমিষ্ঠ হয়। ২. মৃতের মৃত্যুর সময় যদি দাম্পত্য সম্পর্ক বহাল থাকে এবং তার মৃত্যুর দিন থেকে সর্বোচ্চ দু'শো সত্তর দিনের মধ্যে সন্তান জীবিত ভূমিষ্ট হয়।
৪৪ নং ধারা: যাকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার অপেক্ষায় তার প্রাপ্যের চেয়ে কম দেয়া হয়। সে তার অংশের বেশিটুকু যে উত্তরাধিকার পেয়েছে তার কাছ থেকে বাকিটুকু ফেরত নেবে। আর যদি সে পাওনার চেয়ে বেশি পেয়ে থাকে, তবে যে উত্তরাধিকারীর অংশের বেশিটুকু নিয়েছে তাকে তা ফেরত দেবে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 নিখোঁজ

📄 নিখোঁজ


নিখোঁজ: যখন কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়, তার খবরাদি জানা না যায়, কোথায় থাকে এবং জীবিত আছে না মৃত, জানা না যায় এবং বিচারক তাকে মৃত ধরে নেয়, তখন তাকে নিরুদ্দেশ বলা হয়। বিচারকের সিন্ধান্ত: এ ধরনের ব্যক্তি সম্পর্কে বিচারকের সিদ্ধান্ত হয় কোনো সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে গৃহীত হবে, যেমন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য অথবা দীর্ঘ সময় কেটে যাওয়ার পর এমন সব আলামতের ভিত্তিতে গৃহীত হবে যা প্রমাণ হিসাবে গৃহীত হবার যোগ্য নয়। প্রথমাবস্থায় যে সময় তার মৃত্যুর প্রমাণ পাওয়া যাবে তখন থেকে সে নিশ্চিত মৃত বিবেচিত হবে। দ্বিতীয় অবস্থায় যখন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে বিচারক তাকে মৃত বলে রায় দেয় তখন তাকে কার্যত মৃত ধরা হবে। কেননা তার জীবিত থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 কতদিন পরে নিখোঁজকে মৃত ধরা হবে

📄 কতদিন পরে নিখোঁজকে মৃত ধরা হবে


কতদিন পরে নিরুদ্দেশ ব্যক্তিকে মৃত ধরা হবে সে ব্যাপারে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম মালেক বলেন: চার বছর পর। কেননা উমর (রা) বলেছেন: যে মহিলার স্বামী নিখোঁজ হয়ে গেছে এবং সে কোথায় থাকে জানা যায়না, সে মহিলাকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে, চার বছর পর চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে, তারপর সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করতে পারবে।'-বুখারি, শাফেয়ি।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম মালেকের সুপ্রসিদ্ধ মত এই যে, এ জন্য কোনো মেয়াদ ধার্য করা হবেনা, বরং প্রত্যেক যুগের বিচারকদের বিবেচনার উপর সমর্পিত থাকবে। 'আল মুগনি' গ্রন্থে যে নিরুদ্দেশের মৃত্যু সংক্রান্ত ধারণা প্রবলতর হয়নি, তার সম্পর্কে বলা হয়েছে: 'তার মৃত্যু হয়েছে এ কথা নিশ্চিত ভাবে না জানা পর্যন্ত তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবেনা, তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করবেনা। অনুরূপ, এত দীর্ঘ মেয়াদ না কেটে যাওয়া পর্যন্তও তার সম্পত্তি বণ্টন করা হবেনা ও তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করবেনা যত দিন পর্যন্ত সাধারণত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকেনা। এটা কত দিন ধরা যেতে পারে তা নির্ধারণ করবে বিচারক। এটা ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবু ইউসুফের মত। কেননা তার বেঁচে থাকাই স্বাভাবিক অবস্থা। 'ইমাম আহমদ বলেন: সে যতো দিন এমন ভাবে নিরুদ্দেশ হয় যে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর হয়, তাহলে সূক্ষ্ম চিন্তা-গবেষণার মাধ্যমে চার বছর অতিক্রম করার পর তার মৃত্যুর ফায়সালা করা হবে। (যুদ্ধের ময়দানে বা বহু সামরিক অভিযানের পর কেউ নিখোঁজ হলে অথবা কেউ বাড়িতে থাকা অবস্থায় এশার নামাযে বা অন্য কোনো কাজে বের হয়ে আর ফিরলো না এবং তার কোনো খবরও জানা গেলনা- এ ধরনের লোকের মতই)। আর যদি কেউ এমন সফরে থাকে, যেখানে নিরাপদে থাকার সম্ভাবনাই বেশি (যেমন হজ্জ, ব্যবসায় বা শিক্ষা সফর) তবে তার ব্যাপারও বিচারকের উপর সোপর্দ থাকবে। তিনি যতো দিন পর সমীচীন মনে করেন এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার জীবিত বা মৃত থাকার বিষয়ে তদন্ত করে তার মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেবেন।
যে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর হয়, সে ক্ষেত্রে আহমদের মতটি আধুনিক আইনে গৃহীত হয়েছে। সেখানে তার মতানুসারে চার বছরের মেয়াদ ধার্য করা হয়েছে। আর যে ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধারণা প্রবলতর নয়, সে ক্ষেত্রে বিষয়টা বিচারকের মতের উপর সোপর্দ হবে।
১৯২৯ সালের ২৫ নং আইনের ২১ নং ধারায় বলা হরেছে: এ ক্ষেত্রে যে নিরুদ্দেশ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা প্রবলতর, তাকে তার নিখোঁজ হওয়ার তারিখ থেকে চার বছর পর মৃত বলে গণ্য করা হবে। অন্যান্য অবস্থায় কতদিন পরে তাকে মৃত ধরে নেয়া হবে তা বিচারক নির্ধারণ করবে। নিরুদ্দেশ ব্যক্তি জীবিত না মৃত তা জানবার জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে সর্বাত্মক অনুসন্ধান চালানোর পরই বিচারক এটা নির্ধারণ করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00