📄 হজুব কয় প্রকার
হজুব দুই প্রকার:
১. উত্তরাধিকার হ্রাসকারী
২. উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চনাকারী।
উত্তরাধিকার হ্রাসকারী হজুব হলো, অন্য কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে উত্তরাধিকার হ্রাস পাওয়া। এটা পাঁচ ব্যক্তির কারণে হয়ে থাকে:
১. সন্তান, যার উপস্থিতিতে স্বামীর উত্তরাধিকার অর্ধেক থেকে সিকিতে নেমে যায়।
২. সন্তান, যার উপস্থিতিতে স্ত্রীর উত্তরাধিকার সিকি থেকে এক অষ্টমাংশে নেমে যায়।
৩. উত্তরাধিকারী সন্তানের উপস্থিতির কারণে মায়ের উত্তরাধিকার এক তৃতীয়াংশ থেকে এক ষষ্ঠাংশে নেমে যায়।
৪. ছেলের মেয়ে।
৫. বৈমাত্রেয় বোন।
📄 উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চনাকারী হজুব
অন্য কারো উপস্থিতির কারণে কোনো ব্যক্তির সমগ্র উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া হচ্ছে বঞ্চনাকারী হজুব। যেমন ছেলের উপস্থিতির কারণে ভাই এর উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। ছয়জন উত্তরাধিকারীর উত্তরাধিকার এই ধরনের সার্বিক বঞ্চনা থেকে মুক্ত, যদি তাদের উত্তরাধিকার থেকে আংশিক বঞ্চনা সম্ভবপর। এই ছয়জন হচ্ছে:
১-২. পিতা ও মাতা
৩-৪. ছেলে ও মেয়ে
৫-৬. স্বামী ও স্ত্রী।
এই ছয়জন উত্তরাধিকারী ব্যতীত অন্যান্য উত্তরাধিকারীর উত্তরাধিকার থেকে সার্বিক বঞ্চনার সম্ভাবনা আছে। এই সার্বিক বঞ্চনাকারী হজ্বের দুইটি ভিত্তি:
১. যে ব্যক্তির সম্পর্ক মৃত ব্যক্তির সাথে অন্য কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সে ঐ ব্যক্তির উপস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হয়না, যেমন ছেলের ছেলে। কেননা সে ছেলের উপস্থিতিতে উত্তরাধিকারী হয়, যদিও তারা তার মাধ্যমেই মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত।
২. ঘনিষ্ঠতর ব্যক্তিকে দূরতর ব্যক্তির উপর অগ্রাধিকার দিতে হয়। তাই ছেলের কারণে ভ্রাতুষ্পুত্র বঞ্চিত হয়। সবাই যদি ঘনিষ্ঠতায় সমান হয় তবে আত্মীয়তা অধিকতর শক্তিশালী হলে অগ্রাধিকার পায়। যেমন সহোদর ভাই বৈমাত্রেয় ভাইকে বঞ্চিত করে।
📄 মাহরুম ও মাহজুবে পার্থক্য
নিম্নোক্ত দু’টি ক্ষেত্রে মাহরুম ও মাহজুবের পার্থক্য হয়ে যায়:
১. মাহরুম আদৌ উত্তরাধিকারের হকদার নয়, যেমন হত্যাকারী। পক্ষান্তরে মাহজুব উত্তরাধিকারে হকদার। কিন্তু উত্তরাধিকার প্রাপ্তিতে তার চেয়ে অগ্রগণ্য একজনের উপস্থিতির কারণে সে বঞ্চিত।
২. উত্তরাধিকার থেকে যে ব্যক্তি মাহরুম বা বঞ্চিত, সে অন্য কিছুতে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। তাই সে তাকে তা থেকে আদৌ বঞ্চিত করে না, বরং ওটাকে অস্তিত্বহীনের মত করে দেয়। যেমন কোনো ব্যক্তি যদি একজন কাফের ছেলে ও মুসলমান ভাই রেখে মারা যায়, তবে গোটা উত্তরাধিকার ভাইয়ের ছেলে কিছুই পাবেনা।
পক্ষান্তরে মাহজুব অন্য জিনিসে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ফলে সে কাউকে উত্তরাধিকার থেকে আংশিকভাবে বা সার্বিকভাবে বঞ্চিত করতে পারে। দুই বা ততোধিক ভাই পিতা ও মাতার উপস্থিতিতে উত্তরাধিকার পায়না। কেননা পিতা উপস্থিত। তবে তারা উভয়ে মায়ের অংশ এক তৃতীয়াংশ থেকে এক ষষ্ঠাংশে নামাতে পারে।
📄 যাবিল আরহাম
যাবিল আরহাম এমন আত্মীয়কে বলা হয়, যে কোনো নির্দিষ্ট অংশের অধিকারীও (আসহাবুল ফুরুষ) নয় এবং আসাবাও নয়। ফকিহগণ তাদেরকে উত্তরাধিকার প্রদানের ব্যাপারে নানা মত পোষণ করেন।
ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ির মতে তারা উত্তরাধিকারের হকদার বা প্রাপক নয়। বরং পরিত্যক্ত সম্পত্তি বাইতুল মালে জমা হবে। এ মত আবু বকর (রা) উমর (রা) উসমান (রা) যায়েদ, যুহারি, আওযায়ি ও দাউদেরও। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদের মতে তারা উত্তরাধিকারের হকদার। এ মত আলি (রা) ইবনে আব্বাস (রা) ও ইবনে মাসউদেরও, যখন আসহাবুল ফুরুষ ও আসাবা থাকেনা তখন। সাইদ ইবনুল মুসাইয়াব বলেন; মেয়ের সাথে মামাও উত্তরাধিকারী হয়। আধুনিক আইনে এই মতের প্রতিফলন ঘটেছে। ৩১ থেকে ৩৮ নং ধারায় তাদেরকে উত্তরাধিকার দেয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে:
ধারা ৩১: প্রত্যক্ষ আসাবা ও প্রত্যক্ষ আসহাবুল ফুরুষের মধ্য থেকে যখন কাউকে পাওয়া যায়না, তখন পরিত্যক্ত সম্পত্তি বা তার অবশিষ্টাংশ যাবিল আরহামের জন্য হবে।
যাবিল আরহাম চার শ্রেণির, তন্মধ্যে উত্তরাধিকারে কতকের উপর কতকের প্রাধান্য রয়েছে নিম্মোক্ত ধারাবাহিকতা অনুসারে:
প্রথম শ্রেণি: মেয়ের সন্তানেরা এবং ছেলের মেয়ের সন্তানেরা, যতো নিম্নের হোক।
দ্বিতীয় শ্রেণি: নানা যতো ঊর্ধ্বের হোক এবং নানি যতো ঊর্ধ্বের হোক।
তৃতীয় শ্রেণি: বৈপিত্রেয় ভাইদের ছেলেরা ও তাদের সন্তানরা, যতো নিচের হোক, আপন বোন বা সৎ বোনদের মেয়েরা, যতো নিচের হোক, আপন বোনদের মেয়েরা বা সৎ বোনদের মেয়েরা, যতো নিচের হোক, আপন বা বৈমাত্রেয় ভাইদের ছেলেদের মেয়েরা, যতো নিচের হোক, এবং তাদের সন্তানেরা যতো নীচের হোক।
চতুর্থ শ্রেণি: চতুর্থ শ্রেণিতে ছয়টি গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত, যাদের মধ্যে একটি অপরটি অপেক্ষা উত্তরাধিকারে অগ্রগণ্যতার দাবি রাখে। অগ্রগণ্যতা অনুসারে তাদের ধারাক্রম নিম্নরূপ:
১. মৃত ব্যক্তির বৈপিত্রেয় চাচারা, আপন ফুফুরা, খালারা ও মামারা অথবা বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় ফুফুরা, মামারা ও খালারা।
২. উপরিউক্তদের সন্তানেরা যতো নিচের হোক, মৃতের আপন চাচাতো বোন অথবা বৈমাত্রেয় চাচাতো বোন এবং তাদের ছেলেদের মেয়েরা যতো নিচের হোক এবং উপরোক্তদের সন্তান যতো নিচের হোক।
৩. মৃতের পিতার বৈপিত্রেয় চাচারা, তার আপন ফুফুরা, মামারা, খালারা বা বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় ফুফুরা, মামারা, খালারা এবং মৃতের আপন চাচারা, ফুফুরা, মামারা ও খালারা অথবা মৃতের মায়ের বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় চাচারা, ফুফুরা, মামারা ও খালারা।
৪. উপর্যুক্তদের সন্তানেরা যতো নিচের হোক, মৃতের পিতার আপন কিংবা বৈমাত্রেয় চাচাতো বোনেরা এবং তাদের পৈত্রীরা যতো নিচের হোক এবং তাদের সন্তানেরা যতো নিচের হোক।
৫. মৃতের পিতার পিতার বৈপিত্রেয় চাচারা, মৃতের মায়ের পিতার আপন অথবা বৈমাত্রেয় চাচারা এবং পিতা ও মাতা উভয়ের আপন অথবা বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় ফুফুরা, মামারা ও খালারা। মৃতের মায়ের মায়ের চাচারা, মৃতের পিতার মায়ের চাচারা এবং মাতাও পিতা উভয়ের আপন কিংবা বৈপিত্রেয় বা বৈমাত্রেয় ফুফুরা, খালারা ও মামারা।
৬. উপর্যুক্তদের সন্তানেরা যতো নিচের হোক। মৃতের পিতার পিতার আপন অথবা বৈমাত্রেয় চাচাতো বোনেরা এবং তাদের বৈপিত্রের যতো নিচের হোক এবং উপর্যুক্তদের সন্তানেরা যতো নিচের হোক।
ধারা ৩২: যাবিল আরহামের প্রথম শ্রেণিটির মধ্যে উত্তরাধিকার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার তারাই যারা মৃতের সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ জন। যদি তারা সবাই সমান ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে আসহাবুল ফুরুযের সন্তান যাবিল আরহামের সন্তানের চেয়ে অগ্রগণ্য। আর যদি তারা সবাই ঘনিষ্ঠতায় সমান হয় এবং তাদের মধ্যে কোনো আসহাবুল ফুরুষের সন্তান না থাকে অথবা সবাই আসহাবুল ফুরুষের কোনো একজনের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে তারা সবাই উত্তরাধিকারের অংশীদার হবে।
ধারা ৩৩: যাবিল আরহামের দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বেশি হকদার তারাই যারা মৃতের ঘনিষ্ঠতম। যদি সবাই ঘনিষ্ঠতায় সমান হয় তবে অগ্রগণ্য হবে যাবিল ফুরুযের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি। তাতেও যদি সবাই সমান হয় অর্থাৎ হয় সবাই যাবিল ফুরুষের সাথে সম্পৃক্ত, কিংবা কেউ তা নয়, তবে তারা আত্মীয়তার ঘনিষ্ঠতায় সমপর্যায়ের কিনা দেখতে হবে। যদি সমপর্যায়ের হয় তবে উত্তরাধিকারে সমান অংশীদার হবে। আর যদি সমপর্যায়ের না হয়, তবে পিতার আত্মীয়রা পাবে দুই তৃতীয়াংশ এবং মায়ের আত্মীয়রা এক তৃতীয়াংশ।