📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকারসমূহ

📄 পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকারসমূহ


পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকার চার প্রকার। এগুলো সব সমান নয়, বরং একটি অপরটির চেয়ে অগ্রগণ্যতার দাবি রাখে এবং আগে সেই খাতে ব্যয় করতে হয়। যেমন:
১ প্রথম অধিকার: পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে সর্ব প্রথম ব্যয় করা হবে মৃতের কাফন-দাফন বাবদ, যেমন জানাযা ও কাফন-দাফন সংক্রান্ত আলোচনায় ইতোপূর্বে বলা হয়েছে।
২. দ্বিতীয় অধিকার: তার ঋণ পরিশোধ করা। এ ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ি ও ইবনে হাযম আল্লাহ্ ঋণ যথা যাকাত ও কাফ্ফারাকে বান্দার ঋণের চেয়ে অগ্রগণ্য মনে করেন। কিন্তু হানাফিগণ মৃত্যুর সাথে সাথে আল্লাহর অধিকার রহিত হয় বলে মনে করেন। ফলে উত্তরাধিকারীদের উপর তা পরিশোধ করার দায়িত্ব অর্পিত হয়না। তবে তারা স্বেচ্ছায় সেটা পরিশোধ করতে পারে কিংবা মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বে তা পরিশোধ করার অসিয়ত করলে পরিশোধ করতে পারে। যদি সে অসিয়ত করে তবে তা একজন অচেনা বা অনাত্মীয়কে অসিয়ত করার মতো হবে। উত্তরাধিকারী বা যাকে অসিয়ত করা হয়েছে সে কাফন দাফন ও বান্দাদের ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে তার এক চতুর্থাংশের ভেতর থেকে তা পরিশোধ করবে। এ ব্যবস্থা গৃহীত হবে তখন যখন তার কোনো উত্তরাধিকারী থাকবে। উত্তরাধিকারী না থাকলে সমগ্র সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করা হবে। হাম্বলি ফকিহগণ সর্বাবস্থায় গোটা সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করার পক্ষপাতী। তা ছাড়া তারা বান্দার নির্দিষ্ট সামগ্রীর ঋণ সাধারণ ঋণের আগে পরিশোধ করা জরুরি, এ ব্যাপারে একমত।
৩. তৃতীয় অধিকার: ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে তার একতৃতীয়াংশ থেকে অসিয়ত বাস্তবায়ন।
৪. চতুর্থ অধিকার: অবশিষ্ট পরিত্যক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 উত্তরাধিকারের মূল উপাদান

📄 উত্তরাধিকারের মূল উপাদান


উত্তরাধিকার তিনটি উপাদানের উপস্থিতি দাবি করে:
১. উত্তরাধিকারী: অর্থাৎ এমন ব্যক্তি, যে উত্তরাধিকারের কারণসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি কারণে মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত।
২. মৃত ব্যক্তি বা এমন নিখোঁজ ব্যক্তি, যাকে মৃত গণ্য করা হয়েছে।
৩. উত্তরাধিকার বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি; যে সম্পত্তি বা অধিকার মৃত ব্যক্তির মালিকানা থেকে উত্তরাধিকারীর মালিকানায় হস্তান্তরিত হয়।

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 উত্তরাধিকারের কারণসমূহ

📄 উত্তরাধিকারের কারণসমূহ


তিন কারণে উত্তরাধিকার পাওনা হয়ে থাকে:
১. প্রকৃত সম্পর্ক বা প্রত্যক্ষ আত্মীয়তা: আল্লাহ্ সূরা আনফালে বলেন:
وَأُولُوا الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتٰبِ اللَّهِ .
'আত্মীয়গণ আল্লাহ্ বিধানে একে অন্য অপেক্ষা অধিক হকদার।' (আনফাল: ৭৫)
২. পরোক্ষ আত্মীয়তা: যেমন রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: ক্রীতদাসকে মুক্ত করা জনিত আত্মীয়তা প্রকৃত আত্মীয়তার মত। (ইবনে হাব্বান ও হাকেম)। [প্রকৃত আত্মীয় উত্তরাধিকারী নেই এমন ব্যক্তি যখন অন্য কারো সাথে এভাবে মৈত্রী বা বন্ধুত্বের চুক্তি সম্পাদন করে যে, নিজের মৃত্যুর পর একে অপরকে নিজের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বানায় এবং সে ভুলক্রমে কাউকে নিহত বা আহত করলে প্রয়োজনীয় দিয়াত বা রক্তপণ পরিশোধ করার দায়িত্ব অর্পণ করে ও অপরজন তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, তখন যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়, তা ইমাম আবু হানিফার নিকট উত্তরাধিকারের একটি কারণ হিসাবে গণ্য। কিন্তু অন্যান্যদের নিকট গণ্য নয়। প্রচলিত আইনে শেষোক্ত মতের প্রতিফলন ঘটেছে।]
৩. বিশুদ্ধ বৈবাহিক বন্ধন: আল্লাহ্ বলেন: 'তোমাদের স্ত্রীগণ যে সম্পত্তি রেখে যায়, তার অর্ধাংশ তোমাদের প্রাপ্য, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে।'

📘 ফিকাহুস সুন্নাহ > 📄 উত্তরাধিকারের অন্তরায়সমূহ

📄 উত্তরাধিকারের অন্তরায়সমূহ


উত্তরাধিকারের জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে:
১. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু অথবা এমনভাবে নিখোঁজ হওয়া যে, বিচারকের রায়ে সে মৃত বলে ঘোষিত হয়। এ ধরনের রায় তাকে মৃত বলেই সাব্যস্ত করে। পক্ষান্তরে কোনো অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রীর উপর কেউ আক্রমণ চালালে এবং তার ফলে সে মৃত সন্তান প্রসব করলে তাকে জীবিত গণ্য করা হবে, যদিও সে তখন মৃত।
২. মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর কার্যত জীবিত থাকা শর্ত। যেমন গর্ভজাত সন্তান। কারণ সে কার্যত জীবিত। কারণ এমন হওয়া অসম্ভব নয় যে, তার দেহে এখনো প্রাণ সঞ্চারিত হয়নি। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী জীবিত থাকা না থাকার বিষয় যদি অজানা থাকে যেমন ডুবে যাওয়া, আগুনে পোড়া ও বিধ্বস্ত ভবনের নিচে থাকা ব্যক্তি। এ ধরনের লোকেরা যদি বিধি মোতাবেক পরস্পরের উত্তরাধিকারী হয়ও, তবুও তারা পরস্পরের উত্তরাধিকারী গণ্য হবে না, বরং তাদের সম্পত্তি তাদের জীবিত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
৩. উত্তরাধিকার কার্যকর হওয়ার পথে নিম্নোক্ত অন্তরায়গুলো না থাকা।
উত্তরাধিকারের অন্তরায়সমূহ: সে ব্যক্তি উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, যে উত্তরাধিকার লাভের সমস্ত যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তার সেই সব যোগ্যতা কেড়ে নেয়া হয়েছে কোনো না কোনো অন্তরায় থাকার কারণে। এ ধরনের অন্তরায় চারটি:
১. দাসত্ব, চাই তা পূর্ণ দাসত্ব হোক বা আংশিক।
২. ইচ্ছাকৃত হারাম হত্যাকান্ড ঘটানো। উত্তরাধিকারী যদি তার উত্তরাধিকার দাতাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে সে সর্বসম্মতভাবে তার উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। নাসায়ি বর্ণনা করেন, রসূল (সা) বলেন: 'হত্যাকারীর জন্য কোনো প্রাপ্য নেই।'
ইচ্ছাকৃত ও অন্যায় হত্যাকান্ড সম্পর্কে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি বলেন: প্রত্যেক হত্যাই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, চাই তা কোনো পাগল বা অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে সংঘটিত হোক এবং চাই তা হক বা কিসাস বাস্তবায়ন বা অনুরূপ বৈধ প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হোক। মালেকি মযহাবের ফকিহগণ বলেন: একমাত্র ইচ্ছাকৃত অবৈধ হত্যাই উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, চাই তা প্রত্যক্ষভাবে সংঘটিত হোক বা পরোক্ষভাবে। (মিসরীয়) আইনের ৫ম ধারায় এই মতই অনুসৃত হয়েছে। ধারাটি হলো: উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, উত্তরাধিকার দাতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা, চাই হন্তা মূল অপরাধী হোক বা তার সহযোগী, অথবা এমন মিথ্যা সাক্ষ্যদাতা, যার সাক্ষ্যের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেয়া ও কার্যকর করা হয়, যখন এই হত্যা অবৈধ ও কোনো ওজর ব্যতীত সংঘটিত হয়, হত্যাকারী প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক ও পঁচিশ বছর বয়স্ক হয়। আইন সংগত ভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ছিনিয়ে নেয়াকে ওজর গণ্য করা হয়।
৩. ধর্মের পার্থক্য: কোনো মুসলমান কাফেরের এবং কোনো কাফের মুসলমানের উত্তরাধিকারী হবে না। কেননা চারটি সহিহ হাদিস গ্রন্থ উসামা ইবনে যায়েদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 'মুসলমান কাফেরের উত্তরাধিকারী হবেনা এবং কাফের মুসলমানের উত্তরাধিকারী হবেনা।' অপর দিকে মুয়ায, মুয়াবিয়া, ইবনুল মুসাইয়াব, মাস্ত্রক ও নাসায়ি থেকে বর্ণিত মুসলমান কাফেরের উত্তরাধিকারী হবে, কিন্তু কাফের মুসলমানের উত্তরাধিকারী হবেনা, ঠিক যেমন মুসলমান কাফের মহিলাকে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু কাফের মুসলিম মহিলাকে বিয়ে করতে পারেনা। কিন্তু অমুসলিমরা পরস্পরের উত্তরাধিকারী হবে। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে তারা সবাই একই ধর্মাবলম্বী।
৪. দেশের পার্থক্য: অর্থাৎ জাতীয়তা ও নাগরিকত্বের পার্থক্য। জাতীয়তা ও নাগরিকত্বের পার্থক্য মুসলমানদের পরস্পরের উত্তরাধিকারী হওয়ার অন্তরায় নয়, চাই দুই দেশের ব্যবধান ও দূরত্ব যতোই বেশি হোক। কিন্তু অমুসলিমদের মধ্যে দেশ, জাতীয়তা ও নাগরিকত্বের পার্থক্য সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে, এটা তাদের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকারের অন্তরায় নয়, যেমন মুসলমানদের মধ্যেও নয়। 'আল মুগনি' গ্রন্থে বলা হয়েছে: এক ধর্মের অনুসারীরা জাতীয়তার পার্থক্য থাকলেও পরস্পরের উত্তরাধিকারী হবে। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ্ উক্তিসমূহের ব্যাপকতা ও শর্তহীনতা তাদের পারস্পরিক উত্তরাধিকারের দাবি জানায়। কুরআন বা সুন্নায় এমন কোনো উক্তিই পাওয়া যায়না এবং এই মর্মে কোনো ইজমাও দেখা যায়না যে, তারা পরস্পরের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কিয়াসেরও কোনো সুযোগ নেই। প্রচলিত আইনে এই মতই অনুসৃত হয়েছে কেবল একটি ক্ষেত্রে ব্যতীত। ইমাম আবু হানিফা বলেন, যখন ভিন্ন কোনো দেশের আইন তার বিদেশী নাগরিকদের উত্তরাধিকার দিতে অস্বীকার করে। আইনটির ৬নং ধারায় বলা হয়েছে: 'বিদেশী সরকারের অনুসৃত আইন বিদেশীদেরকে উত্তরাধিকার দিতে অস্বীকার করা ব্যতীত আর কোনো কারণে জাতীয়তার পার্থক্য মুসলমানদের মাঝে বা অমুসলমানদের মাঝে উত্তরাধিকার প্রদানের অন্তরায় সৃষ্টি করেনা।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00