📄 সংজ্ঞা
শরিয়তের পরিভাষায় ফারায়েয হচ্ছে উত্তরাধিকারীর জন্যে নির্দিষ্ট সম্পত্তির অংশ। এ সংক্রান্ত বিদ্যাকে ইলমুল মিরাস বা ইলমুল ফারায়েয বলা হয়।
📄 শরিয়তে ফারায়েযের স্থান
প্রাগ ইসলামিক জাহিলি যুগে আরবরা শুধু পুরুষদেরকে উত্তরাধিকার দিতো, নারীদেরকে নয় এবং শুধু বয়স্কদেরকে দিতো, অপ্রাপ্তবয়স্কদেরকে নয়। সেখানে শপথের মাধ্যমে পরস্পরকে উত্তরাধিকারী করা হতো। এ সব প্রথাকে আল্লাহ বাতিল করে দিয়ে নাযিল করেন: يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْنِ ۚ فَإِنْ كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ۖ وَإِنْ كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ ۚ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِنْ كَانَ لَهُ وَلَدٌ ۚ فَإِنْ لَمْ يَكُنْ لَهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ ۚ فَإِنْ كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ ۚ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۗ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا ۚ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
'আল্লাহ্ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন: এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান। কিন্তু কেবল কন্যা দুইয়ের অধিক থাকলে তাদের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্যে অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে তার পিতামাতা প্রত্যেকের জন্যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ। সে নিঃসন্তান হলে এবং পিতামাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্য এক-তৃতীয়াংশ। তার ভাইবোন থাকলে মাতার জন্যে এক-ষষ্ঠাংশ। এ সবই সে যা অসিয়ত করে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর তা তোমরা অবগত নও। এটা আল্লাহ্র বিধান। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সূরা নিসা, আয়াত ১১)।
আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ: জাবির (রা) সূত্রে বর্ণিত, নিম্নোক্ত হাদিসে এ আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে: জাবির (রা) বলেন: সাদ ইবনে রবির স্ত্রী সাদের ঔরসজাত তার দুই কন্যাকে নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে এসে বললো: হে রসূল! এরা দুজন সাদ ইবনে রবির কন্যা। ওদের বাবা আপনার সাথে যুদ্ধ করার সময় ওহুদে শহীদ হয়। ওদের চাচা ওদের সম্পত্তি নিয়ে নিয়েছে, ওদের জন্যে কিছুই রাখেনি। অথচ সম্পত্তি ছাড়া এই দুই মেয়ের বিয়ে দেয়া সম্ভবপর নয়। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: এ ব্যাপারে আল্লাহ্ ফায়সালা করবেন। তখন উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হলো। অত:পর রসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের চাচাকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে বললেন: সাদের কন্যাদ্বয়ের প্রত্যেককে এক তৃতীয়াংশ করে ও তাদের মাকে এক অষ্টমাংশ দাও। তারপর যা অবশিষ্ট থাকবে তা তোমার।' (নাসায়ি ব্যতীত অপর পাঁচটি সহিহ হাদিস গ্রন্থ)।
📄 ফারায়েযের ইলমের মর্যাদা
১. ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: তোমরা কুরআন শিখ ও শিখাও। আর ফারায়েয শিখ ও শিখাও। কেননা আমি একজন মরণশীল মানুষ এবং জ্ঞানও একদিন অন্তর্হিত হবে। অচিরেই এমন একদিন আসতে পারে, যখন ফারায়েয ও মাসয়ালায় দুটি নাম ভিন্ন ভিন্ন রকমের হবে, অথচ তাদেরকে জানানোর জন্য কাউকে পাওয়া যাবে না।' (আহমদ)।
২. আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: জ্ঞান তিন রকমের। এ ছাড়া আর সব কিছু অতিরিক্ত; সুস্পষ্ট বিধান সংবলিত আয়াত, বাস্তবায়িত সুন্নাত এবং ন্যায়সংগত উত্তরাধিকার।' (আবুদাউদ, ইবনে মাজা)।
৩. আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: তোমরা ফারায়েয শিখ ও শিখাও। কারণ এটা জ্ঞানের অর্ধেক। এটা একদিন ভুলে যাওয়া হবে এবং এটাই সর্ব প্রথম আমার উম্মতের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হবে। (ইবনে মাজা, দারু কুতনি)।
পরিত্যক্ত সম্পত্তি: পরিত্যক্ত সম্পত্তির সংজ্ঞা হানাফি মযহাব অনুযায়ী: মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সমগ্র সম্পত্তি। ইমাম ইবনে হাযম এই সংজ্ঞার সমর্থনে বলেন: 'মানুষ তার মৃত্যুর পর যে সম্পদ রেখে যায়, তাতে আল্লাহ্ উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেছেন, যা সম্পদ নয় তাতে নির্ধারণ করেননি। অধিকারসমূহের মধ্যে যা সম্পদের অন্তর্ভুক্ত বা সম্পদের পর্যায়ভুক্ত, তা ব্যতীত আর কোনোটায় উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেননি, যেমন উপকার পাওয়ার অধিকার, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব লাভের অধিকার। নির্মাণ ও চাষাবাদের জন্য নির্ধারিত জমিতে অবস্থানের অধিকার। মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মযহাবে এ অধিকারসমূহ মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সমস্ত সম্পত্তিও অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, চাই এ সব অধিকার আর্থিক হোক বা আর্থিক ব্যতীত অন্য কিছু হোক।
📄 পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকারসমূহ
পরিত্যক্ত সম্পত্তি সংক্রান্ত অধিকার চার প্রকার। এগুলো সব সমান নয়, বরং একটি অপরটির চেয়ে অগ্রগণ্যতার দাবি রাখে এবং আগে সেই খাতে ব্যয় করতে হয়। যেমন:
১ প্রথম অধিকার: পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে সর্ব প্রথম ব্যয় করা হবে মৃতের কাফন-দাফন বাবদ, যেমন জানাযা ও কাফন-দাফন সংক্রান্ত আলোচনায় ইতোপূর্বে বলা হয়েছে।
২. দ্বিতীয় অধিকার: তার ঋণ পরিশোধ করা। এ ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ি ও ইবনে হাযম আল্লাহ্ ঋণ যথা যাকাত ও কাফ্ফারাকে বান্দার ঋণের চেয়ে অগ্রগণ্য মনে করেন। কিন্তু হানাফিগণ মৃত্যুর সাথে সাথে আল্লাহর অধিকার রহিত হয় বলে মনে করেন। ফলে উত্তরাধিকারীদের উপর তা পরিশোধ করার দায়িত্ব অর্পিত হয়না। তবে তারা স্বেচ্ছায় সেটা পরিশোধ করতে পারে কিংবা মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর পূর্বে তা পরিশোধ করার অসিয়ত করলে পরিশোধ করতে পারে। যদি সে অসিয়ত করে তবে তা একজন অচেনা বা অনাত্মীয়কে অসিয়ত করার মতো হবে। উত্তরাধিকারী বা যাকে অসিয়ত করা হয়েছে সে কাফন দাফন ও বান্দাদের ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে তার এক চতুর্থাংশের ভেতর থেকে তা পরিশোধ করবে। এ ব্যবস্থা গৃহীত হবে তখন যখন তার কোনো উত্তরাধিকারী থাকবে। উত্তরাধিকারী না থাকলে সমগ্র সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করা হবে। হাম্বলি ফকিহগণ সর্বাবস্থায় গোটা সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করার পক্ষপাতী। তা ছাড়া তারা বান্দার নির্দিষ্ট সামগ্রীর ঋণ সাধারণ ঋণের আগে পরিশোধ করা জরুরি, এ ব্যাপারে একমত।
৩. তৃতীয় অধিকার: ঋণ পরিশোধের পর যে সম্পত্তি উদ্বৃত্ত থাকে তার একতৃতীয়াংশ থেকে অসিয়ত বাস্তবায়ন।
৪. চতুর্থ অধিকার: অবশিষ্ট পরিত্যক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন।