📄 যে সামগ্রীর ওসিয়ত করা হয় তার শর্তাবলী
যে জিনিসটি দেয়ার জন্যে অসিয়ত করা হয়, সেটি অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর কাউকে তার মালিক বানানো যায়, এরূপ হওয়া জরুরি, চাই তা যেভাবেই হোক না কেন, তাই এমন যে কোনো জিনিসের অসিয়ত করা বৈধ, যার আর্থিক মূল্য আছে অথবা যা দ্বারা সেবা বা উপকার গ্রহণ করা যায়। কারো গাছে যে ফল হয় বা কারো গাভীর পেটে যে বাছুর রয়েছে, তা দেয়ার অসিয়ত সে করতে পারে। কারণ উত্তরাধিকারী সূত্রে এই দুটোরই মালিকানা লাভ করা সম্ভব। কাজেই অসিয়তকারীর মৃত্যুর সময় যে জিনিসের অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান, সে জিনিসের মালিকানা যার নামে অসিয়ত করা হয়, সে লাভ করতে পারে। কিন্তু যে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, তার অসিয়ত অচল ও অশুদ্ধ। ঋণ দান বা ঘরে বসবাস করতে দেয়ার জন্যে অসিয়ত শুদ্ধ। যে জিনিস সম্পদ পদবাচ্য নয়, যেমন মৃতদেহ, তার অসিয়ত অবৈধ। অনুরূপ মুসলমানদের জন্যে মদের অসিয়তও বৈধ নয়। কেননা এটা দুই পক্ষের কারো জন্যেই সম্পদ নয়।
📄 এক তৃতীয়াংশের ওসিয়ত
ইবনে আব্দুল বার বলেন: প্রাচীন মনীষীদের মধ্যে যারা অসিয়তকে ওয়াজিব মনে করেন তারা কতটুকু সম্পত্তিতে অসিয়ত ওয়াজিব হয় এবং যারা মুস্তাহাব মনে করেন তারা কতটুকু সম্পত্তিতে মুস্তাহাব হয় তা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন। আলি (রা) থেকে কেউ কেউ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: ছয়শো বা সাতশো দিরহাম পরিমাণ সম্পত্তিতে অসিয়ত করা যায়না। আবার কেউ কেউ বর্ণনা করেন আলি (রা) বলেছেন: এক হাজার দিরহাম পরিমাণ সম্পত্তিতে অসিয়ত করা যায়। ইবনে আব্বাস বলেন: আটশো দিরহামে অসিয়ত চলে না। আয়েশা (রা) বলেন: যে ব্যক্তির চারটি সন্তান আছে এবং তিন হাজার দিরহাম আছে, তার সম্পত্তিতে অসিয়তের অবকাশ নেই। ইবরাহিম নাখয়ী বলেন: এক হাজার দিরহাম থেকে দেড় হাজার দিরহাম পর্যন্ত অসিয়ত চলে না। কাতাদার মতে এক হাজার দিরহাম বা তার উপরে অসিয়ত চলবে। আলি (রা) বলেন: যে ব্যক্তি অল্প সম্পত্তি রেখে যায়, তার পক্ষে ঐ সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের জন্যে রেখে যাওয়াই উত্তম। আয়েশা (রা) বলেন: আটশো দিরহামে অসিয়ত চলবে না।
এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত: এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তির অসিয়ত বৈধ। এর চেয়ে বেশি বৈধ নয়। এর চেয়ে কম উত্তম। এটা সর্বসম্মত মত। বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি ও ইবনে মাজা সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সূত্রে বর্ণনা করেন: তিনি বলেন: আমি মক্কায় রুগ্ন থাকা অবস্থায় রসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে দেখতে এলেন। যে জায়গা থেকে আমি হিজরত করেছি সেখানে মৃত্যু বরণ করা আমার পছন্দ ছিলনা। রসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ্ ইবনে আফরাকে কৃপা করুন। আমি বললাম: হে রসূলুল্লাহ্, আমি কি আমার সমগ্র সম্পত্তি অসিয়ত করে দেব? তিনি বললেন: না। আমি বললাম: তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন: না। আমি বললাম: তিন ভাগের এক ভাগ? তিনি বললেন: ঠিক আছে। এক তৃতীয়াংশ অসিয়ত কর। এক তৃতীয়াংশও অনেক। তোমার উত্তরাধিকারীদেরকে অমুখাপেক্ষী অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদেরকে পরমুখাপেক্ষী অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে ভাল। তারা দরিদ্র থাকবে ও অন্যের কাছে হাত পাতবে এটা কাম্য নয়। তুমি তোমার পরিবারের উপর যা কিছু খরচ করবে তা সদকা। এমনকি তোমার স্ত্রীর মুখে যে খাদ্যের গ্রাস তুলে দেবে তাও সদকা। অচিরেই এমন দিন আসবে যখন আল্লাহ্ তোমাকে সমৃদ্ধি দেবেন, তখন তোমার দ্বারা অনেকে উপকৃত হবে এবং অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সময় সাদের একটি মেয়ে ছাড়া কোনো সন্তান ছিলনা। (ওয়াকেদির মতে, পরবর্তীকালে সাদের চারটা ছেলে হয়।)
📄 এক তৃতীয়াংশে হিসাব করা হবে সমুদয় সম্পত্তি থেকে
অধিকাংশ আলিমের মতে অসিয়তকারীর পরিত্যক্ত সমুদয় সম্পত্তি থেকে তিন ভাগের এক ভাগ হিসাব করা হবে। ইমাম মালেক বলেন: অসিয়তকারী যে সম্পত্তির কথা জানে তা থেকে এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে। যে সম্পত্তির কথা তার জানা নেই বা নতুন অর্জিত হয়েছে কিন্তু তার অজানা, তা বাদে অসিয়ত করা হবে।
মালেক, নাখয়ি ও উমর ইবনে আব্দুল আযীযের মতে পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে অসিয়তের সময় থেকে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা, আহমদ ও ইমাম শাফেয়ির দুটি মতের মধ্যে যেটি বিশুদ্ধতর তা হলো, তার মৃত্যুর সময়কার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে এক তৃতীয়াংশ হিসাব করা হবে। এটা আলি (রা) ও কিছু সংখ্যক তাবেয়ির মত।
📄 এক তৃতীয়াংশের চেয়ে বেশির ওসিয়ত করা
অসিয়তকারীর যদি উত্তরাধিকারী থাকে তবে তার পক্ষে এক তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তির অসিয়ত করা বৈধ নয়। যদি করে তবে কার্যকর হবে না, যতোক্ষণ না উত্তরাধিকারীরা তার অনুমতি দেয়। এর কার্যকারিতার জন্যে দুটো শর্ত রয়েছে:
১. অসিয়ত মৃত্যুর পরে কার্যকর করতে হবে। কেননা অসিয়তকারীর মৃত্যুর পূর্বে উত্তরাধিকারীর কোনো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই তার অনুমতির কোনো মূল্য নেই। তার জীবদ্দশায় অনুমতি দিলে সে যখন ইচ্ছা অসিয়ত প্রত্যাহার করতে পারে। মৃত্যুর পর অনুমতি দিলে অসিয়ত কার্যকর হবে। যুহরি ও রবিয়া বলেন: অসিয়তকারী কখনো প্রত্যাহার করতে পারবে না।
২. অনুমতি দানকারী উত্তরাধিকারীর অনুমতি দানের সময় পূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী হওয়া জরুরি। নির্বোধ হওয়ার কারণে তার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হওয়া চাই। আর যদি কোনো উত্তরাধিকারী না থাকে তাহলেও অধিকাংশ আলেমের মতে এক তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করা জায়েয নয়।
হানাফি মযহাব, ইস্হাক, শুরাইহ্ ও এক বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদের মত হলো, এক তৃতীয়াংশের বেশি অসিয়ত করা জায়েয। এটা আলি (রা) ও ইবনে মাস্টদেরও মত। কেননা এ অবস্থায় অসিয়তকারী এমন কাউকে রেখে যাচ্ছে না, যার অভাবে পতিত হওয়ার আশংকা রয়েছে। তাছাড়া যেহেতু আয়াতে অসিয়তের কথা শর্তহীনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই এক তৃতীয়াংশের মধ্যে অসিয়তকে সীমিত করা বৈধ নয়। হাদিসে এই সীমা আরোপ করা হয়েছে যার উত্তরাধিকারী আছে তার জন্য। কাজেই যার উত্তরাধিকারী নেই, তার ব্যাপারে কোনো সীমা আরোপ করা বৈধ নয়।